প্রত্নসাক্ষ্যই হোক বা লিপি বা প্রাচীনগ্রন্থ-সাক্ষ্যই হোক, মুদ্রা প্রচলনের যত প্রমাণ প্রাচীন বাঙলায় পাওয়া যাচ্ছে, তা হয় উত্তরবঙ্গ (বগুড়া, দিনাজপুর) থেকে না-হয় নিম্নগাঙ্গেয় দক্ষিণবঙ্গ থেকে। এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। নানা প্রসঙ্গে এই গ্রন্থের নানা জায়গায় বলা হয়েছে, কী করে ইতিহাসের সূচনা থেকেই বাঙলার ভাগ্য নির্ণীত হয়েছে মধ্য-গাঙ্গেয় উত্তর-ভারতের ইতিহাসদ্বারা, কী করে সেখানকার ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত, অবস্থার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি বাঙলা দেশে এসে ঢেউ তুলেছে এবং তার ফলে এ দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। মুদ্রা-প্রসঙ্গে যে-সময়ের কথা বলা হচ্ছে সে-সময়ে এবং তার অনেক পরেও মধ্য-গাঙ্গেয় ভারতের জীবন-প্রবাহের পূর্বর্যাত্রার পথ ছিল প্রধানত দুটি : একটি পাটলিপুত্রে গঙ্গা পার হয়ে উত্তর-বিহারের চম্পা থেকে সোজা উত্তর-বঙ্গের ভেতর দিয়ে ব্ৰহ্মপুত্রের পূর্বতীরবর্তী কামরূপ পর্যন্ত; আর আর-একটি রাজমহলে গঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে বাঙলাদেশে ঢুকে নদীর দুই তীর ধরে ধরে একবারে সাগর মোহনা পর্যন্ত। দুটি পথই প্রাচীন ব্যাবসা-বাণিজ্যের পথ, উত্তর-ভারতীয় সংস্কৃতির পূর্বাভিযানের পথ। প্রথম পথের উপর মহাস্থান, কোটিবর্ষ (বাণগড়); দ্বিতীয় পথের শেষ প্রান্তে, সাগরতীরে তাম্রলিপ্ত, গঙ্গাবিন্দর, চন্দ্ৰকেতুগড়। মীের্যবংশ প্রতিষ্ঠার আগেও এই পথ-দুটির অস্তিত্ব ছিল; লোকজনের আসা-যাওয়া, ব্যাবসা-বাণিজ্যও চলত পথ দুটি ধরে। প্রাচীন বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থে তার আভাস-ইঙ্গিত একেবারে অপ্রতুল নয়। কিন্তু খ্ৰীষ্টপূর্ব ৩০০-র আগে মুদ্রার প্রচলন ছিল এ-সব অঞ্চলে, এমন মনে হয় না; প্রয়োজনও বোধহয় ছিল না। তার প্রধান কারণ বোধহয়, তার আগে ভারতের পূর্বাঞ্চলে রাষ্ট্র গঠনের কোনও সার্থক প্রয়াস দেখা দেয়নি। সে-প্রয়াসের প্রথম ইঙ্গিত, গ্ৰীক ঐতিহাসিককুল-কথিত Prasioi) ও Gangaridae রাষ্ট্র দুটি। দ্বিতীয় ইঙ্গিত, বাঙলাদেশে মৌর্যরাষ্ট্রের বা অন্তত মৌর্য রাষ্ট্ৰীয় প্রভাবের সক্রিয় অনুপ্রবেশ। আমার এ-ব্যাখ্যা যুক্তিসিদ্ধ মনে হলে স্বীকার করতে হয়, শীলমোহরিত মুদ্রা বা তঙ্কশালা-নিৰ্গত ঢালাই মুদ্ৰাই হোক, গণ্ডক বা কাকনিক মুদ্ৰাইহোক, অথবা ক্যালটিস স্বর্ণমুদ্ৰাই হোক, প্রাচীনতম বঙ্গের কোনও মুদ্ৰাই মোটামুটি খ্ৰীষ্টপূর্ব ৩০০-র আগে নয়, এবং সে মুদ্রা মধ্য-গাঙ্গেয় উত্তর-ভারতের প্রতিধ্বনি মাত্র।
মৌর্য আমলের পর থেকে শুরু করে গুপ্তপর্ব সূচনার আগে পর্যন্ত, এই দীর্ঘকালের মধ্যে প্রাচীন বঙ্গে কী ধরনের মুদ্রা প্রচলিত ছিল তা জানিবার কোনও উপায় নেই। তবে দেশের নানা জায়গায় প্রচুর কুষাণ মুদ্রা পাওয়া গেছে; মনে হয়, কুষাণ আমলে, এবং হয়তো তার পরেও উত্তর-ভারতের সঙ্গে ব্যাবসা-বাণিজ্যের সূত্রে এইসব মুদ্রা কিছু কিছু এই অঞ্চলেও প্রচলিত হয়েছিল। উত্তর-ভারতের অন্যান্য মুদ্রাও এই সময়ে অল্পবিস্তর প্রচলিত হয়েছিল, এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে। সন্দেহ নেই যে, ব্যাবসা-বাণিজ্য সূত্রেই তা হয়েছিল। কিন্তু কুষাণ মুদ্রাই হোক বা উত্তর-ভারতীয় অন্যান্য মুদ্রাই হোক, এই সব মুদ্রার সঙ্গে স্থানীয় কেনাবেচার জন্য প্রচলিত পূর্বতন কড়ি, গণ্ডক, কাকনিক, শীলমােহরিত ও তঙ্কশালা-নিৰ্গত প্রভৃতি মুদ্রার সম্বন্ধ কী ছিল এবং স্থানীয় দ্রব্যমূল্যের সঙ্গেই বা কী সম্বন্ধ ছিল এ-সম্বন্ধে কিছু বলবার কোনও উপায়ই আজও আমরা জানিনে।
গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী আমলে প্রাচীন বাঙলায় প্রচলিত মুদ্রা সম্বন্ধে মূল গ্রন্থে সবিস্তারে প্রচুর কথা বলা হয়েছে। তারপর গত পঁচিশ বছরের ভেতর বেশ-কিয়েকজন পণ্ডিত এ-সম্বন্ধে বেশকিছু আলোচনা গবেষণা করেছেন, কিন্তু তার ভেতর না তথ্যের দিক থেকে না ব্যাখ্যার দিক থেকে আমি এমন-কিছু পেয়েছি যা এই সংযোজনে উল্লেখ করতে পারি। মুদ্রার সঙ্গে ব্যাবসা-বাণিজ্যের, বিশেষভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্বন্ধের প্রসঙ্গটি বোধহয় আমিই প্রথম উত্থাপন করেছিলাম, এবং সেইসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্নেরও উল্লেখ করেছিলাম। সদ্যোক্ত আলোচনা-গবেষণায় সৌভাগ্যত প্রসঙ্গটির স্বীকৃতির অন্তত লক্ষ্য করেছি, কিন্তু প্রশ্নগুলির উত্তরের চেষ্টা লক্ষ্য করি নি। যে-ভাবে আমি প্রশ্নগুলি উত্থাপন করেছিলাম, আমার ইতিহাসগত উত্তর তার মধ্যেই নিহিত আছে, বেশকিছুটা স্পষ্টভাবেই। পঁচিশ বছরের আলোচনা -গবেষণায় এমন-কিছু আমি পাইনি যাতে আমার মতামত পরিবর্তনের প্রয়োজন বোধ করতে পারি। তবে, একটি আবিষ্কার ইতোমধ্যে ঘটেছে যা অর্থবহ এবং যার উল্লেখ ও আলোচনা অপরিহার্য। কুমিল্লা জেলার ময়নামতীর উৎখননের ফলে কয়েকটি স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার মজুত ভাণ্ডার (hoard) আবিষ্কৃত হয়েছে। দুঃখের বিষয়, প্রত্নোৎখননের কোন সংস্তর থেকে কোন ভাণ্ডারটি পাওয়া গেছে, কীভাবে পাওয়া গেছে, প্রকাশিত বিবরণে তা খুব পরিষ্কার নয়; বস্তুত সংস্তরণ ক্রিয়াটিই যেন খুব সুস্পষ্টতায় করা হয় নি। তাছাড়া, এই মুদ্রগুলির বিশদ বিবরণ এবং আলোচনাও এ-যাবৎ প্রকাশিত হয় নি; সংক্ষিপ্তভাবে যা হয়েছে তা থেকে কিছু কিছু মন্তব্য মাত্র করা যেতে পারে। বলা উচিত, মুদ্রগুলি দেখবার সুযোগ আমার হয় নি।
