প্রকাশিত বিবরণ থেকে মনে হয়, মুদ্রগুলিকে দু ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে পড়ে সুবৰ্ণমুদ্রগুলি যার সঙ্গে গুপ্তোত্তর বাঙলায় প্রচলিত অপেক্ষাকৃত পাতলা ওজনের ‘নকল’ স্বর্ণমুদ্রার কোনও পার্থক্য নেই বললেই চলে; এ-ধরনের মুদ্রা সপ্তম শতকের শেষ পর্যন্তও প্রচলিত ছিল। এই মুদ্রগুলির একদিকের বামপাশে দণ্ডায়মান একটি নারীমূর্তি, আর একদিকে একটি উপবিষ্ট অথবা দণ্ডায়মান নরমূর্তি, খুব সম্ভব, যথাক্রমে রাজা ও রানীর, অথবা রাজা ও শ্ৰী বা লক্ষ্মীর। অনেকগুলি মুদ্রার একদিকে, গুপ্তমুদ্রার অনুকরণে, দণ্ডায়মান মূর্তির বাম হাতের নীচে ছোট এক লাইন একটি লেখ। এই লেখগুলির পাঠোদ্ধার এখনও হয় নি, তবে একটি মুদ্রায় যে “বলভট’ বলে একটি ব্যক্তিনাম লেখা আছে, সে-সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নেই – আর একটিতে যা লেখা আছে তা পড়া হয়েছে “ভঙ্গল মৃগাঙ্কস্য’ বলে; পড়েছেন ময়নামতীর বিবরণ লেখক এফ. এ. খান, প্রধানত দেববংশীয় রাজাদের শীলমোহর ও তাম্রশাসনোৎকীর্ণ “শ্ৰীভঙ্গল মৃগাঙ্ক”-লাঞ্ছনটি অনুসরণ করে। দীনেশচন্দ্র সরকার মশায় মনে করেন, এই পাঠ যথার্থ নয়, শুদ্ধ পাঠ হওয়া উচিত ‘অভিনব মৃগাঙ্কস্য’, যেহেতু দেববংশীয় রাজা ভবদেবের শীলমোহর ও তাম্রশাসনে যা লেখা আছে তার পাঠ “শ্ৰীঅভিনব মৃগাঙ্ক”। যাই হোক, সন্দেহ নেই, দক্ষিণ-পূর্ববাঙলায় এই ‘নিকল, গুপ্তোত্তর সুবর্ণমুদ্রার প্রচলন হয়েছিল দেববংশের রাজত্বের আমলে, অষ্টম শতকে।
আর-এক পর্যায়ের মুদ্রা ময়নামতীতে পাওয়া গেছে, অধিকাংশই রৌপ্যমুদ্রা, সংখ্যায়। সুপ্রচুর ওজনে খুব হালকা, এবং বোধ হয় একাধিক মূল্যমানের। যত মুদ্রা পাওয়া গেছে সবই প্রকৃতিতে এতই একই রকমের যে এর ভেতর কোনও ক্রমবিবর্তন-বিবর্ধন নেই বললেই চলে, অর্থাৎ কালের কোনও চিহ্ন যেন এগুলির উপর মুদ্রিত নেই। এই মুদ্রগুলির একদিকে আছে একটি বিন্দুবলয়চক্ৰ, তার ভেতরে একটি রেখাচক্ৰ; আর বাঁ দিক ঘেষে আছে একটি উপবিষ্ট বৃষমূর্তি। অন্য দিকে আছে দুটি বৃত্ত, বাইরে রেখাবৃত্ত, ভেতরে বিন্দুবৃত্ত। এফ. এ. খান এই রেখা ও বিন্দুবৃত্ত-অলংকৃত লাঞ্ছনটিকে ত্রিরত্ন কেন বলেছেন, বোঝা দুষ্কর। কতকগুলি মুদ্রার একদিকে একটি ছোট লেখ আছে; লেখটিকে কেউ কেউ পড়েছেন ‘পটিকোৰ্য বলে, কেউ কেউ পড়েছেন ‘পট্টিকের বলে। আবার অন্য কতকগুলি মুদ্রায় যে লেখাটি আছে সেটিকে “হরিকেল বলে পড়া চলে। বুঝতে কষ্ট হয় না, মুদ্রগুলি যথাক্রমে পট্টিকের ও হরিকেলের তঙ্কশালায় মুদ্রিত ও সেখান থেকে নিৰ্গত হয়েছিল। কতগুলি মুদ্রার উল্টেপিঠে “ধর্মবিজয়’, কতগুলির উল্টেপিঠে “ললিতকরঃ’ বলে ছোট একটি লেখ আছে; ধর্মবিজয় ও ললিতকর বোধ হয় ব্যক্তিনাম বা উপাধি, হয় স্থানীয় শাসনকর্তার বা তাঙ্কশালার অধিকর্তার। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এই রৌপ্যমুদ্রগুলি প্রায় সবই দক্ষিণ-পূর্ববঙ্গের চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের রাজত্বকালের (দশম-একাদশ শতাব্দী)। পট্টিকের ও হরিকেল দুইই এদের রাজ্যভুক্ত ছিল। মুদ্রগুলিতে যে লেখ আছে তার অক্ষর সাক্ষ্য আমার এ-ধারণার প্রতিকূল নয়। কিন্তু আমার এই ধারণার অন্য কারণও আছে। এ-তথ্য সুবিদিত যে, আরাকানে এক চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের রাজত্ব খ্ৰীষ্টীয় অষ্টম শতাব্দী কি তারও আগে থেকে শুরু করে অন্তত একাদশ শতাব্দীর মধ্যপাদ পর্যন্ত অক্ষুন্ন ছিল। সেই সময় পাগান-রাজ আনাউরহথা (১০৪৪-১০৭৭) উত্তর আরাকান জয় ও অধিকার করেন, যার ফলে র্তার রাজ্যের পশ্চিম সীমা পট্টিকের পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই চন্দ্রবংশীয় রাজাদের শঙ্খ, বৃষ, অংকুশ, চামর, শ্ৰীবৎসচিহ্ন প্রভৃতি লাঞ্ছিত এবং রেখা ও বিন্দুচক্রালংকৃত প্রচুর রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গেছে। এই মুদ্রগুলির মধ্যে যেগুলি প্রাচীনতর। সেগুলির সঙ্গে প্রাচীন ফুনান, দ্বারবতী, এবং প্রাচীন পুত্ব ও মোন রাজাদের অন্যান্য রাজধানীতে প্রাপ্ত মুদ্রার আত্মীয়তা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কিন্তু যে মুদ্রগুলি পরবতী কালের (সেগুলি সংখ্যায় কিছু কম নয়), সেগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা লালমাই-ময়নামতীতে পাওয়া রৌপ্যমুদ্রগুলির সঙ্গে; বৃষ লাঞ্ছন এবং রেখা ও বিন্দুচক্রালংকার প্রায় একই রকমের। আরাকানের চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের রাজধানী প্রাচীন বৈশালীতে প্রাপ্ত বহু বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য প্রতিমার সঙ্গে ময়নামতীর সাম্প্রতিক উৎখনন থেকে প্রাপ্ত প্রতিমার অনেকগুলির সঙ্গে আশ্চর্য মিল; উভয়ক্ষেত্রেই শৈলসাক্ষ্যের ইঙ্গিতে প্রতিমাগুলির তারিখ মোটামুটি দশম শতাব্দী।
কিন্তু মুদ্রায় সামাজিক ধনের রূপ প্রসঙ্গে আলোচ্য বিষয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে লালমাই-ময়নামতীতে পাওয়া রৌপ্যমুদ্রগুলির রূপা ধাতুটি এল কোথা থেকে।- গুপ্তোত্তর ‘নকল’ ও হালকা ওজনের, খাদ মেশানো সুবর্ণমুদ্রার সোনা নিয়ে বড় কিছু প্রশ্ন নেই; শশাঙ্কের আমল থেকে তো এই প্রকৃতির সুবর্ণমুদ্রাই বাঙলা দেশে অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত। এই সোনা প্রাচীনতর, ওজনে ভারী, প্রায় নিখাদ সুবর্ণমুদ্রা থেকে অথবা সোনার তাল গলিয়ে পাওয়া সোনা। কিন্তু প্রাচীন বাঙলায় রূপা এত সহজলভ্য ছিল না। এই প্রসঙ্গে মূল গ্রন্থমধ্যেই বলা হয়েছে, কিছু বিস্তৃতভাবেই গুপ্ত আমলে এবং পরে পাল আমলে রৌপ্যমুদ্রা প্রচলনের কথা। সেই প্রসঙ্গেই উল্লেখ করেছিলাম। বৈগ্রাম-পট্টোলী কথিত রূপক মুদ্রার কথা, স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রার আপেক্ষিক মূল্য-সম্বন্ধের কথা, রৌপ্যের অপ্রতুলতার কথা, এবং শেষ পর্যন্ত রৌপ্যমুদ্রার একান্ত অনস্তিত্বের কথা। পাল আমলে যে কিছুটা চেষ্টা হয়েছিল রৌপ্যমুদ্রার পুনঃপ্রচলনের এবং সে চেষ্টা যে সার্থক হয়নি, সে কথাও বলেছিলাম। আজও এ কথা সত্য। কিন্তু এতে বিস্মিত হবার কারণ নেই। রৌপ্য বিদেশাগত; যে কারণেই হোক, দেশে রূপার আমদানি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং রৌপ্যমুদ্রাও অপ্রচলিত হয়ে যায়; পাল আমলের রৌপ্যমুদ্রা তো অত্যন্ত নিকৃষ্ট পর্যায়ের। সে রূপা পূর্বতন রৌপ্যমুদ্রা থেকে পাওয়া। আমার ধারণা, গুপ্তপর্বেই রূপার অপ্রতুলতা ঘটতে শুরু হয়; বস্তুত (প্রথম) কুমারগুপ্তের পর রৌপ্যমুদ্রার আর উল্লেখও নেই। বৈদেশিক বাণিজ্যে যে সব ভারতীয় তথা বাঙালী বণিকেরা লিপ্ত হতেন তারা দ্রব্য বিনিময়ে সোনা ছাড়া, সুবর্ণমুদ্রা ছাড়া আর কোনও ধাতু বা ধাতুমুদ্রা নিতে চাইতেন না; দ্বিতীয় শতাব্দীর প্লিনি এবং নবম-একাদশ শতাব্দীর আরব বণিকদের সাক্ষ্য থেকে ভারতীয় বণিকদের এই অপরূপ স্বর্ণপ্ৰিয়তার অল্পবিস্তর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সুতরাং রূপা দুর্লভ বস্তু হবে, আপেক্ষিকতায় সোনার চেয়ে রূপার দাম হবে বেশি, এতে বিস্মিত হবার কিছু নেই।
