ছোট দ্বীপটার অন্য দিক অর্থাৎ পূর্বদিকটানিবিড় ছায়ায় আচ্ছাদিত। খুব গম্ভীর অথচ শান্ত সুন্দর বিষণ্ণ ছায়া সেদিকটা পুরোপুরি ঢেকে রেখেছে।
পূর্বদিকে গাছগুলোর রঙ এ অঞ্চলের গাছগুলোর তুলনায় অনেক, অনেক বেশি গাঢ়। মনে হয় বুঝি কোনো অদৃশ্য হাত সেখানকার গাছগুলোর গায়ে গাঢ় সবুজের প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছে। আর তা এতই গাঢ় সবুজ যে, কালো বললেও ভুল হবে না।
সে সেদিককার গাছগুলোর আবরণ শোকাকুল, অস্বাভাবিক দুঃখ-যন্ত্রণায় বুঝি বাকশক্তি হারিয়ে তারা বধির হয়ে গেছে। প্রতি মুহূর্তে অন্তরের পুঞ্জিভূত যন্ত্রণায় অনবরত কাতড়াচ্ছে। মৃত্যুলোকের পুঞ্জিভূত জ্বালা আর অকাল মৃত্যু প্রেত ছায়ার মধ্যে প্রতিভাত হচ্ছে।
শোকের চিহ্ন সেখানকার গাছগাছালি, লতাগুল্ম আর ঘাসগুলোকে পর্যন্ত নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে।
শোক সন্তপ্ত ঘাস-জমির বুক চিরে সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে রেখেছে পরপর কয়েকটা টিলা। তবে উন্নতশির বলতে যা বোঝায়, এরা কিন্তু ঠিক সে রকম নয়, কেউ-ই নয়। তবে তাদের আকৃতি কিছুটা লম্বাটে। গোরস্থানের কবরের মতোই মনে হচ্ছে। তবে কোনোটাই কিন্তু কবর নয়।
টিলাগুলোকে ঘিরে রেখেছে রোজসারি ফুলের গোছা। তাদের অন্য কারো মনকে পুলকিত করলেও তারা কিন্তু আমার কাছে এক-একটা যন্ত্রণার মূর্ত প্রতীক ছাড়া কিছুই নয়।
দ্বীপে গা-ঘেঁষে স্থায়ীভাবে অবস্থান করছে গাছগাছালির ছায়া। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয়, তারা যেন গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে চায়, আত্মহুতি দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে পড়েছে।
গাছগাছালিগুলো পানির নিচে দুর্বার কল্পনা দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে মিলেমিশে অধিকতর কুটিল করে তুলেছে, যা আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। আর মনের মধ্যেকার জমাটবাধা কল্পনা দিয়ে আমি যেন এও লক্ষ্য করলাম–বিদায়ী সূর্যটা যতই নিচের দিকে নামছে, প্রতিটা গাছের প্রতিটা ছায়া যেন ততই গাছগুলোর দেহ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেনিচ্ছে। যে গাছ থেকে তারা জন্ম নিয়েছে, সে জন্মজাতকের কাছ থেকে তারা ক্রমেই একটু একটু করে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। আর তারা জলধারার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
আর যেসব ছায়া সমাধির অতল গহ্বরে প্রবেশ করছে, তারাও নিজেদের নদীর জলে অল্প অল্প করে গুলিয়ে নিচ্ছে, মিশে যাচ্ছে।
আমার মাথায় অদ্ভুত এধারণাটা একবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই আমি যেন কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। আধ-বোঝা চোখে ঢুকছিলাম আর কল্পনার ইন্দ্রজাল বুনে চলছিলাম। একটু পরেই আমি আবার প্রায় অস্ফুট স্বওে বিড়বিড় করতে লাগলাম। তবে, তবে এটাই সেই পরীর রাজ্য। এখানেই পরীর দল আপন খেয়াল খুশিতে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। এখানেই তবে কুহকমায়ার ছোঁয়া লেগেছে।
এক সময় কুহকিনী পরীরা তো পৃথিবীর ছকে ছিলই। আজও তবে কোমল হাওয়া স্নিগ্ধকায়া অপরূপাদের সে প্রজাতির উপস্থিতি পৃথিবীর বুকে অবস্থান করছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। বর্তমানে তারা সংখ্যায় বেশি থাকলেও কয়েকজন আজও নির্জন দ্বীপের শান্ত পরিবেশে আনন্দে দিনযাপন করছে, ফুলের মতো রূপ লাবণ্য নিয়ে।
তবে কি মখমলের মতো সবুজ ঘাসের পুরু আস্তরণ বিছানো ঢিবিগুলোই তাদের নিশ্চিন্ত বাসস্থল? নাকি মানুষ যেমন আয়ু ফুরিয়ে গেলে পৃথিবী, থেকে চির বিদায় নিয়ে অনন্ত সুন্দর লোকের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়, ঠিক সেরকমই পরীরাও কি তবে মাটির নিচের অন্ধকার-ঠাণ্ডা কফিনে শান্তিতে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছে?
গাছগাছালি যেমন পানিতে ছায়া ছড়িয়ে দিয়ে একটু একটু করে নিজেদের অস্তিত্ব বিলিয়ে দিতে চলেছে, ঠিক তেমন করেই কি পরীরা নিজেদের অস্তিত্ব অল্প অল্প করে খুইয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে না?
পরীরা নিজেদের সত্ত্বা একটি পরসত্ত্বার সঙ্গে মিশিয়ে দেবার সময় তাদের মন প্রাণ কি ডুকড়ে ডুকড়ে কেঁদে ওঠে না?
গাছের ঘন-সবুজ ছায়া অতল পানির অন্ধকার পরিবেশকে আরও অনেক, অনেক বেশি গাঢ় করে তুলছে না? পরীদের জীবনের পরিসমাপ্তি মৃত্যুর আধারকে নিকটতর করে দিচ্ছে না?
আমি ঘন-সবুজ ঘাসের বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় এলিয়ে পড়ে থেকে যখননিবিষ্ট মনে এসব কথা ভেবে চলেছি আর অনুচ্চ কণ্ঠে অনর্গল বিড়বিড় করছি, ঠিক তখনই সূর্যদেব তার সাত ঘোড়ার রথে চেপে ক্রমেই পশ্চিম দিগন্ত পথে এগিয়ে চলেছে, বিদায় নেবার তীব্র উৎসাহে।
আলো আর অন্ধকার যখন প্রতিমুহূর্তে স্থান পরিবর্তন করে চলেছে আর ক্রমেই সরে সরে যাচ্ছে, আর ডুমুর গাছের সাদা বাকলের ঝিলিমিলি যখন পানির উপরিতলে বারবার চমকে উঠছে আর যখন অস্থির জলরাশি দ্রুত পাক খেয়ে চলেছে ছোট দ্বীপটাকে চক্কর মেরে চলছে–সে মুহূর্তে, ঠিক সে মুহূর্তেই আলো আঁধারীর সারাময় পরিবেশে এক পরী আমার দৃষ্টিকোণে ভেসে উঠল। আমি দেখলাম, স্পষ্ট দেখলাম তাকে। সে পশ্চিমের আলোর রাজ্য ছেড়ে পূর্বে অন্ধকার যমপুরীতে নিঃশব্দে আবির্ভূত হলো।
বাতাসের কাঁচে আলতো করে ভর দিয়ে, রূপ সৌন্দর্যের ডালি মেলে পরীটা ধীরমন্থর গতিতে এগিয়ে চলেছে। পর মুহূর্তেই আবার সে অপরূপাকে নৌকার গলুইয়ের ওপর একেবারে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে নাচতে দেখতে পেলাম।
