পরেশ। হিঁ, এ হাতে এক পয়সার পাঁচ গোণ্ডা গুণে নিয়ে বলব—দোকানী, এ হাতে আরো পাঁচ গোণ্ডা গুণে দাও। দিলে বলব—মা-ঠান বলে দে’ছে দুটো ফাউ দিতে—না? তবে পয়সা দুটো দেব—না?
বিজয়া। (হাসিয়া) হাঁ, তবে পয়সা দুটো হাতে দিবি। আর অমনি দোকানীকে জিজ্ঞেস করবি—ওই যে বড়ো বাড়িতে নরেনবাবু থাকত—সে কোথায় গেছে? কি রে পারবি ত?
পরেশ। (মাথা নাড়িয়া) আচ্ছা পয়সা দুটো দাও না তুমি—আমি ছুট্টে গিয়ে নিয়ে আসি।
বিজয়া। (তাহার হাতে পয়সা দিয়া) বাতাসা হাতে পেয়ে ভুলে যাবিনে ত?
পরেশ। নাঃ—(বলিয়াই দৌড় দিল। বিজয়া ফিরিয়া আসিয়া একটা চৌকিতে বসিতেই পরেশের মা প্রবেশ করিল)
পরেশের মা। পরেশকে বুঝি কোথাও পাঠালে দিদিমণি? ঊর্ধ্বমুখে ছুটেছে। ডাকলুম সাড়া দিলে না।
বিজয়া। (হাসিয়া) ও—পরেশ ছুটেছে বুঝি? তবে নিশ্চয় দিঘ্ড়ায় বাতাসা কিনতে দৌড়েছে। হঠাৎ আমার কাছে দুটো পয়সা পেলে কিনা।
পরেশের মা। কিন্তু বাতাসা ত কাছেই মেলে—সেখানে কেন?
বিজয়া। কি জানি সেখানে কে এক গোবিন্দ দোকানী আছে সে নাকি একটু বেশি দেয়।
পরেশের মা। বইগুলো যে গুছিয়ে তোলবার কথা ছিল—তুলবে না?
বিজয়া। এখন থাক গে পরেশের মা!
পরেশের মা। একটা কথা তোমায় বলতে চাই দিদিমণি, ভয়ে বলতে পারিনি।
বিজয়া। কেন তোমার ভয়টা কিসের? কি কথা?
পরেশের মা। কালীপদ বলছিল সে ত আর টিকতে পারে না। ছোটবাবু তাকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না। যখন তখন ধমকানি। ও ছিল কর্তাবাবুর খানসামা—অভ্যেস ছিল কলকাতায় থাকার। কাল নাকি ছোটবাবু তাকে হুকুম দিয়েছেন তার এখানে কাজ কম, উড়ে মালীর সঙ্গে বাগানে খাটতে হবে, নইলে জবাব দেওয়া হবে। বয়েস হয়েছে পারবে কেন বাগানে গিয়ে কোদাল পাড়তে দিদি?
বিজয়া। (দৃঢ়কণ্ঠে) না, তাকে কোদাল পাড়তে হবে না। ছোটবাবুকে আমি বলে দেবো।
পরেশের মা। আমাদের যদু ঘোষ গোমস্তা-মশাই বলছিল যে—
বিজয়া। এখন থাক পরেশের মা। আমার একখানি দরকারী চিঠি লেখবার আছে, পরে শুনব। এখন তুমি যাও।
পরেশের মা। আচ্ছা যাচ্ছি দিদিমণি।
[পরেশের মা চলিয়া গেলে বিজয়া জানালার কাছে গিয়া বাহিরে উঁকি মারিয়া দেখিল কিন্তু পরক্ষণেই ফিরিয়া আসিয়া একটা চিঠির কাগজ টানিয়া লইয়া লিখিতে বসিল। কালীপদ দ্বারের কাছে মুখ বাড়াইয়া ডাকিল—]
কালীপদ। মা!
বিজয়া। (মুখ তুলিয়া) পরেশের মাকে ত বলতে বলে দিয়েছি কালীপদ, বাগানে গিয়ে তোমাকে কাজ করতে হবে না।
কালী। কিন্তু ছোটবাবু—
বিজয়া। সে তাঁকে আমি বলে দেব, তোমার ভয় নেই। আচ্ছা যাও এখন।
কালী। যে কাপড়গুলো রোদে দেওয়া হয়েছে সে যে—
বিজয়া। এখন থাক কালীপদ। এই দরকারী চিঠিটা শেষ না করে আমি উঠতে পারব না।
[কালীপদ প্রস্থান করিলে বিজয়া উঠিয়া আর একবার জানালাটা ঘুরিয়া আসিয়া বসিল। চিঠির কাগজটা ঠেলিয়া দিয়া খবরের কাগজ টানিয়া লইল। ভাবে বোধ হয় অতিশয় চঞ্চল, কিছুতেই মন দিতে পারে না।]
যদু। (নেপথ্য হইতে ডাকিল) মা!
বিজয়া। কে?
যদু। (দরজার নিকট হইতে) আমি যদু। একবার আসতে পারি কি?
বিজয়া। না যদুবাবু, এখন আমার সময় নেই। আপনি আর কোন সময়ে আসবেন।
যদু। আচ্ছা মা!
[প্রস্থান]
[বিজয়া কাগজ পড়িতেছিল। অন্য ধার দিয়া অত্যন্ত সন্তর্পণে পরেশ প্রবেশ করিল। বিজয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া অত্যন্ত ব্যগ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করিল]
বিজয়া। দোকানী কি বললে পরেশ?
পরেশ। (বস্ত্রাঞ্চলে লুকানো বাতাসার প্রতি ইঙ্গিত করিয়া।) বাতাসা ত? পয়সার ছ’গণ্ডা করে।
বিজয়া। আরে না, না,—সে নরেনবাবুর কথা কি বললে বল না?
পরেশ। (মাথা নাড়িয়া) জানিনে। দোকানী পয়সায় ছ’গণ্ডার কথা কাউকে বলতে মানা করে দেছে। বলে কি জান মা-ঠাকরুন—
বিজয়া। তুই নরেনবাবুর কথা কি জেনে এলি তাই বল না?
পরেশ। সে হোথা নেই—কোথায় চলে গেছে। গোবিন্দ বলে কি জানো মা-ঠান? বলে বারো গণ্ডার—
বিজয়া। (রুক্ষস্বরে) নিয়ে যা তোর বারো গণ্ডা বাতাসা আমার সুমুখ থেকে।
[বিজয়া জানালার কাছে সরিয়া গিয়া দাঁড়াইল]
পরেশ। (ঠোঙা দুইটা হাতে করিয়া) এর বেশি যে দেয় না মা-ঠান!
বিজয়া। (একটু পরে মুখ ফিরাইয়া কহিল) পরেশ ওগুলো তুই খেগে যা।
[বলিয়া পুনরায় জানালার বাহিরে চাহিয়া রহিল]
পরেশ। (সভয়ে) সব খাবো?
বিজয়া। (মুখ না ফিরাইয়া) হাঁ, সব খেগে যা। ওতে আমার কাজ নেই।
পরেশ। এর বেশি দিলে না যে মা-ঠান! কত তারে বলনু।
বিজয়া। না দিক গে। আমি রাগ করিনি পরেশ, বাতাসা তুই নিয়ে যা—খেগে।
পরেশ। সব একলা খাব? (একটু চুপ করিয়া) কানা ভট্চায্যিমশায়ের কাছে গিয়ে জেনে আসব মা-ঠান?
বিজয়া। কে কানা ভট্চায্যিমশাই রে? কি জেনে আসবি?
পরেশ। জেনে আসব কোথায় গেছে নরেনবাবু?
[মুখ ফিরাইতেই দেখিল নরেন ঘরে প্রবেশ করিতেছে, তাহার হাতে একটি চামড়ার বাক্স। নীচে সেটা রাখিয়া দিয়া হাত তুলিয়া বিজয়াকে নমস্কার করিল]
বিজয়া। (লজ্জিত হইয়া) যা যা আর জিজ্ঞাসা করবার দরকার নেই। তুই যা!
পরেশ। (ক্ষুণ্ণস্বরে) কানা ভট্চায্যিমশাই তেনাদের পাশের বাড়িতেই থাকে কিনা। গোবিন্দ দোকানী বললে, নরেন্দরবাবুর খবর তিনিই জানে।
বিজয়া।(শুষ্ক হাসিয়া) আসুন বসুন। (পরেশের প্রতি) তুই এখন যা না পরেশ। ভারী তো কথা—তার আবার—সে আরেকদিন তখন জেনে আসিস না হয়। এখন যা—
[পরেশ কিছু না বুঝিয়া চলিয়া গেল]
নরেন। আপনি নরেনবাবুর খবর জানতে চান? তিনি কোথায় আছেন এই?
