বিজয়া। (একটু ইতস্ততঃ করিয়া) হাঁ, তা সে একদিন জানলেই হবে।
নরেন। কেন? কোন দরকার আছে?
বিজয়া। দরকার ছাড়া কি কেউ কারো খবর রাখতে চায় না?
নরেন। কেউ কি করে না করে সে ছেড়ে দিন। কিন্তু আপনার সঙ্গে ত তার সমস্ত সম্বন্ধ চুকে গেছে। আবার কেন তার সন্ধান নিচ্ছেন? ঋণ কি এখনো সব শোধ হয়নি? (বিজয়া নীরব রহিল) যদি আরও কিছু দেনা বার হয়ে থাকে, তা হলেও আমি যতদূর জানি, তার এমন কিছু আর নেই যা থেকে সেই বাকী টাকা শোধ হতে পারে। এখন আর তার খোঁজ করা বৃথা।
বিজয়া। কে আপনাকে বললে, আমি দেনার জন্যেই তাঁর সন্ধান করছি?
নরেন। তা ছাড়া আর যে কি হতে পারে, আমি ত ভাবতে পারিনে। তিনিও আপনাকে চেনেন না, আপনিও তাঁকে চেনেন না।
বিজয়া। তিনিও আমাকে চেনেন, আমিও তাঁকে চিনি!
নরেন। তিনি আপনাকে চেনেন এ কথা সত্যি, কিন্তু আপনি তাঁকে চেনেন না।
বিজয়া। কে বললে আমি তাঁকে চিনি না?
নরেন। আমি জানি। ধরুন, আমিই যদি বলি আমার নাম নরেন, তাতেও ত আপনি না বলতে পারবেন না।
বিজয়া। না বলতে সত্যিই পারব না, এবং আপনাকেও বলব এই সত্যি কথাটা আপনারও অনেক পূর্বেই আমাকে বলা উচিত ছিল। (নরেন মলিন মুখে নীরব হইয়া রহিল) অন্য পরিচয়ে নিজের আলোচনা শোনা, আর লুকিয়ে আড়ি পেতে শোনা, দুটোই কি আপনার সমান বলে মনে হয় না নরেনবাবু? আমার ত হয়। তবে কিনা আমরা ব্রাহ্ম-সমাজের, আর আপনারা হিন্দু এই যা প্রভেদ।
নরেন। (একটুখানি মৌন থাকিয়া) আপনার সঙ্গে অনেক রকম আলোচনার মধ্যে নিজের আলোচনাও ছিল বটে, কিন্তু তাতে মন্দ অভিপ্রায় কিছুই ছিল না। শেষ দিনটায় পরিচয় দেব মনেও করেছিলাম, কিন্তু কি জানি, কেন হয়ে উঠল না। কিন্তু এতে ত আপনার কোন ক্ষতি হয়নি!
বিজয়া। ক্ষতি একজনের ত কত রকমেই হতে পারে নরেনবাবু। আর যদি হয়ে থাকে সে হয়েই গেছে। আপনি এখন আর তার উপায় করতে পারবেন না। সে থাক, কিন্তু এখন যদি সত্যিই আপনার নিজের সম্বন্ধে কোন কথা জানতে চাই তা হলে কি—
নরেন। রাগ করব? না—না—না।
[প্রশান্ত নির্মলহাস্যে তাহার মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল]
বিজয়া। আপনি এখন আছেন কোথায়?
নরেন। গ্রামান্তরে আমার দূর-সম্পর্কের এক পিসী এখনো বেঁচে আছেন, তাঁর বাড়িতেই গিয়েছি।
বিজয়া। কিন্তু আপনার সম্বন্ধে যে সামাজিক গোলযোগ আছে তা কি সে গ্রামের লোকেরা জানে না?
নরেন। জানে বৈ কি!
বিজয়া। তবে?
নরেন। (একটুখানি ভাবিয়া) তাঁদের যে ঘরটায় আছি সেটাকে ঠিক বাড়ির মধ্যে বলাও যায় না। আর আমার অবস্থা শুনেও বোধ করি সামান্য কিছুদিনের জন্যে তাঁর ছেলেরা আপত্তি করেনি। তবে বেশীদিন বাড়িতে থেকে তাঁদের বিব্রত করা চলবে না সে ঠিক। (একটু চুপ করিয়া) আচ্ছা সত্যি কথা বলুন ত, কেন এ-সব খোঁজ নিচ্ছিলেন? বাবার কি আরও কিছু দেনা বেরিয়েছে? (বিজয়া চেষ্টা করিয়াও কোন কথা কহিতে পারিল না) পিতৃঋণ কে না শোধ করতে চায়? কিন্তু সত্যি বলছি আপনাকে স্বনামে বেনামে এমন কিছু আমার নেই যা বেচে টাকা দিতে পারি। শুধু এই microscope-টা আছে। এটা কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছি, যদি কোথাও বেচে অন্যত্র যাবার খরচ যোগাড় করতে পারি। পিসীমার অবস্থাও খুব খারাপ। এমন কি খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত—(বিজয়া মুখ ফিরাইয়া আর একদিকে চাহিয়া রহিল) তবে যদি দয়া করে কিছু সময় দেন, তাহলে বাবার দেনা যতই হোক—আমি নিজের নামে লিখে দিয়ে যেতে পারি। ভবিষ্যতে শোধ দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করব। আপনি রাসবিহারীবাবুকে একটু বললেই তিনি এ বিষয়ে এখন আর আমাকে পীড়াপীড়ি করবেন না।
বিজয়া। বেলা প্রায় তিনটা বাজে, আপনার খাওয়া হয়েছে?
নরেন। হাঁ, হয়েছে একরকম। কলকাতা যাব বলেই বেরিয়েছি কিনা; পথে ভাবলুম একবার দেখা করে যাই। তাই হঠাৎ এসে পড়লুম।
বিজয়া। কিন্তু, আপনার মুখ দেখে মনে হয় যেন খাওয়া এখনও হয়নি।
নরেন। (সহাস্যে) গরীব-দুঃখীদের মুখের চেহারাই এইরকম—খাওয়ার ছবিটা সহজে ফুটতে চায় না। আপনাদের সঙ্গে আমাদের তফাত ঐখানে।
বিজয়া। তা জানি। আচ্ছা আপনার microscope-দাম কত?
নরেন। কিনতে আমার পাঁচশো টাকার বেশি লেগেছিল, এখন আড়াইশো টাকা—দুশো টাকা পেলেও আমি দিই। একেবারে নতুন আছে বললেও হয়।
বিজয়া। এত কমে দেবেন? আপনার কি ওর সব কাজ শেষ হয়ে গেছে?
নরেন।কাজ? কিছুই হয়নি।
বিজয়া। আমার নিজের একটা অনেকদিন থেকে কেনবার শখ আছে—কিন্তু হয়ে ওঠেনি। আর কিনেই বা কি হবে? কলকাতা ছেড়ে চলে এসেছি; এখানে শিখবোই বা কি করে?
নরেন। আমি সমস্ত শিখিয়ে দিয়ে যাব। দেখবেন? (বিজয়ার সম্মতির অপেক্ষা না করিয়াই microscope-টা বাহির করিয়া একটি ছোট টিপায়ার উপর রাখিয়া যন্ত্রটা দেখিবার মত করিয়া লইল) আপনি ঐ চেয়ারটায় বসুন। আমি এক্ষুনি সমস্ত দেখিয়ে দিচ্ছি। অণুবীক্ষণ-যন্ত্রটির সঙ্গে যাদের সাক্ষাৎ পরিচয় নেই, তারা ভাবতেও পারে না, কতবড় বিস্ময় এই ছোট জিনিসটার ভিতর লুকোনো আছে। এই slide-টা ভারী স্পষ্ট। জীবজগতের কতবড় বিস্ময়ই না এইটুকুর মধ্যে রয়েছে। এই দেখুন—(বিজয়া যন্ত্রটায় চোখ রাখিয়া দেখিতে লাগিল) কেমন, দেখতে পাচ্ছেন ত?
বিজয়া। হাঁ পাচ্ছি। ঝাপসা ধোঁয়ায় সব একাকার দেখাচ্ছে।
নরেন। ধোঁয়া? দাঁড়ান—দাঁড়ান—বোধ হয়—(কলকব্জা কিছু কিছু ঘুরাইয়া নিজে দেখিয়া লইয়া মুখ তুলিয়া) এইবার দেখুন। ঐ যে ছোট্ট একটুখানি—কেমন আর ত ঝাপসা নেই?
