রাস। বিজয়া বলচেন হবে না? বল কি? আচ্ছা স্থির হও বাবা, স্থির হও। কোন অবস্থাতেই উতলা হতে নেই। আগে শুনি সব। নিমন্ত্রণ হয়ে গেছে? হয়েছে। বেশ, সে ত আর প্রত্যাহার করা যায় না—অসম্ভব। এদিকে দিনও বেশি নেই, করতে হলে এর মধ্যেই সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ করা চাই। এতে ত সন্দেহ নেই মা।
বিজয়া। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে না গেলে ত কিছুতেই হতে পারে না কাকাবাবু!
রাস। কার স্বেচ্ছায় বাড়ি ছাড়ার কথা বলছ মা, জগদীশের ছেলের? সে ত বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে—শোননি?
[বিজয়া বিলাসের দিক হইতে ফিরিয়া দাঁড়াইল। তাহার ঠোঁট কাঁপিতে লাগিল। নিজেকে সংযত করিয়া]
বিজয়া। না শুনিনি। কিন্তু তাঁর জিনিসপত্র কি হলো? সমস্ত নিয়ে গেছেন?
বিলাস। (হাসির ভঙ্গীতে) শুনেচি থাকবার মধ্যে ছিল নাকি একটা ভাঙ্গা খাট—তার ওপরই বোধ করি তাঁর শয়ন চলত। আমি সেটা বাইরে গাছতলায় টেনে ফেলে দেবার হুকুম দিয়ে কলকাতায় গিয়েছিলুম। আজ স্টেশনে নেবেই দরোয়ানের মুখে খবর পেলুম সেগুলো নেবার জন্যে আজ সকালে নাকি সে আবার এসেছে। যা কিছু তার আছে নিয়ে যাক, আমার কোন আপত্তি নেই।
রাস। তোমার দোষ বিলাস। মানুষ যেমন অপরাধীই হোক, ভগবান তাকে যত দণ্ডই দিন, তার দুঃখে আমাদের দুঃখিত হওয়া, সমবেদনা প্রকাশ করা উচিত। আমি বলছি নে যে অন্তরে তুমি তার জন্যে কষ্ট পাও না, কিন্তু বাইরেও সেটা প্রকাশ করা কর্তব্য। তাকে একবার আমার সঙ্গে দেখা করতে বললে না কেন? দেখতুম—যদি কিছু—
বিলাস। তাঁর সঙ্গে দেখা করে নিমন্ত্রণ করা ছাড়া আমার ত আর কাজ ছিল না বাবা! তুমি কি যে বল তার ঠিক নেই। তা ছাড়া আমার পৌঁছুবার আগেই ত ডাক্তারসাহেব তাঁর তোরঙ্গ-পেটরা যন্ত্রপাতি গুটিয়ে নিয়ে সরে পড়েছেন। বিলাতের ডাক্তার! একটা অপদার্থ humbug কোথাকার!
রাস। না বিলাস, তোমার এরকম কথাবার্তা আমি মার্জনা করতে পারিনে। নিজের ব্যবহারে তোমার লজ্জিত হওয়া উচিত—অনুতাপ করা উচিত।
বিলাস। কি জন্যে শুনি? পরের দুঃখে দুঃখিত হওয়া, পরের ক্লেশ নিবারণ করার শিক্ষা আমার আছে, কিন্তু যে দাম্ভিক বাড়ি বয়ে অপমান করে যায়—তাকে আমি মাপ করিনে। অত ভণ্ডামি আমার নেই।
রাস। কে আবার তোমাকে বাড়ি বয়ে অপমান করে গেল? কার কথা তুমি বলছ?
বিলাস। জগদীশবাবুর সুপুত্র নরেনবাবুর কথাই বলছি বাবা। তিনি একদিন ওঁর ঘরে বসেই আমাকে অপমান করে গিয়েছিলেন। তখন তাকে চিনতুম না তাই—(বিজয়াকে দেখাইয়া) নইলে ওঁকেও অপমান করে যেতে সে বাকী রাখেনি। তোমরা জান সে কথা? (বিজয়ার প্রতি) পূর্ণবাবুর ভাগনে বলে নিজের পরিচয় দিয়ে যে তোমাকে পর্যন্ত সেদিন অপমান করে গিয়েছিল সে কে? তখন যে তাকে ভারী প্রশ্রয় দিলে! সেই নরেন। তখন নিজের যথার্থ পরিচয় দিতে যদি সে পারত—তবেই বলতে পারতুম সে পুরুষমানুষ। ভণ্ড কোথাকার!
বিজয়া। তিনিই নরেনবাবু! দরোয়ান পাঠিয়ে তাঁকেই বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছেন? আমারই নাম করে?
আমারই দেনার দায়ে?
[ক্রোধ ও ক্ষোভে সে যেন ছুটিয়া চলিয়া গেল]
রাস। (হতবুদ্ধিভাবে) এ আবার কি?
বিলাস। আমি তার কি জানি!
রাস। যদি জানো না ত অত কথা দম্ভ করে বলতেই বা গেলে কেন? গোড়া থেকে শুনচ জগদীশের ছেলের ওপর ও জোর-জবরদস্তি চায় না, তবুও—
বিলাস। অত ভণ্ডামি আমি পারিনে। আমি সোজা পথে চলতে ভালবাসি।
রাস। তাই বেসো। সোজা পথ ও-ই একদিন তোমাকে আশ মিটিয়ে দেখিয়ে দেবে’খন। সোজা পথ! সোজা পথ!
[বলিতে বলিতে তিনি দ্রুতপদে নিষ্ক্রান্ত হইয়া গেলেন]
বিজয়া – ২.১
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
বিজয়ার বসিবার ঘর
[বিজয়া বাহিরে কাহার প্রতি যেন একদৃষ্টে চাহিয়াছিল—পরে উঠিয়া জানালার কাছে গিয়া তাহাকে ইঙ্গিতে আহ্বান করিতে একটি বালক প্রবেশ করিল—-খালি গা, কোঁচড়ে মুড়ি তখনও চিবানো শেষ হয় নাই]
পরেশ। ডাকছিলে কেন মা-ঠাকরুন?
বিজয়া। কি করছিলি রে?
পরেশ। মুড়ি খাচ্ছিনু।
বিজয়া। এ কাপড়খানা তোকে কে কিনে দিলে পরেশ? নতুন দেখছি যে!
পরেশ। হুঁ নতুন। মা কিনে দিয়েছে।
বিজয়া। এই কাপড় কিনে দিয়েছে! ছি ছি, কি বিশ্রী পাড় রে! (নিজের শাড়ীর চওড়া সুন্দর পাড়খানি দেখাইয়া) এমনধারা পাড় নইলে কি তোকে মানায়?
পরেশ। (ঘাড় নাড়িয়া সায় দিয়া) মা কিচ্ছু কিনতে জানে না। তোমাকে কে কিনে দিলে?
বিজয়া। আমি আপনি কিনেছি।
পরেশ। আপনি? দামটা কত পড়ল শুনি?
বিজয়া। তোর তাতে কি রে? কিন্তু দ্যাখ আমি তোকে এমনি একখানা কাপড় কিনে দিই যদি তুই—
পরেশ। কখন কিনে দেবে?
বিজয়া। কিনে দিই যদি তুই একটা কথা শুনিস। কিন্তু তোর মা কি আর কেউ যেন না জানতে পারে।
পরেশ। মা জানবে ক্যাম্নে? তুমি বলো না—আমি এক্ষুনি শুনব।
বিজয়া। তুই দিঘ্ড়া চিনিস?
পরেশ। ওই ত হোথা। গুটিপোকা খুঁজতে কতদিন ত দিঘ্ড়ে যাই।
বিজয়া। ওখানে সবচেয়ে কাদের বড়ো বাড়ি তুই জানিস?
পরেশ। হিঁ—বামুনদের গো! সেই যে আর বছর রস খেয়ে যে ছাত থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তেনাদের। এই যেন হেথায় গোবিন্দর মুড়ি-বাতাসার দোকান, আর ওই হোথা তেনাদের কোটা। গোবিন্দ কি বলে জানো মা-ঠাকরুন! বলে সব মাগ্যি-গোণ্ডা—আধ-পয়সায় আর আড়াই গোণ্ডা বাতাসা মিলবে না, এখন মোটে দু’ গোণ্ডা! কিন্তু তুমি যদি একসঙ্গে গোটা পয়সার আনতে দাও ত আমি পাঁচ গোণ্ডা আনতে পারি।
বিজয়া। তুই দু’পয়সার বাতাসা কিনে আনতে পারিস?
