বিজয়া। কিন্তু আপনার ত ভয় নেই। এই ত স্বচ্ছন্দে উপেক্ষা করে চলে যাচ্চেন।
নরেন। উপেক্ষা করে নয়, তাঁদের কথা দিয়েছি বলে। আর খাওয়াই শুধু নয়, একটা বইয়ের কতকগুলো জিনিস নলিনীর বেধেছে সেইগুলো তাঁকে বুঝিয়ে দিতে হবে।
বিজয়া। কি বই?
নরেন। একটা ডাক্তারি বই। তাঁর ইচ্ছে বি. এ. পাসের পরে মেডিকেল কলেজে গিয়ে ভর্তি হন। তাই সামান্য যা জানি অল্পস্বল্প তাঁকে সাহায্য করি।
বিজয়া। আপনি কি তাঁর প্রাইভেট টিউটার? মাইনে কি পান?
নরেন। এ বলা আপনার অন্যায়। আপনার কথাবার্তায় আমার প্রায় মনে হয় তাঁর প্রতি আপনি প্রসন্ন নন। কিন্তু তিনি আপনাকে কত যে শ্রদ্ধা করেন জানেন না। এখানে এসে পর্যন্ত যত ভালো কাজ আপনি করেছেন সমস্ত তাঁর মুখে শুনতে পাই। আপনার কত কথা। এক কলেজে পড়তেন আপনারা — আপনি কলেজে আসতেন মস্ত একটা জুড়ি–গাড়ি করে, মেয়েরা সবাই চেয়ে থাকত। নলিনী বলছিলেন, যেমন রূপ তেমনি নম্র আচরণ,—পরিচয় ছিল না, কিন্তু তখন থেকে আমরা সবাই বিজয়াকে মনে মনে ভালবাসতুম। এমনি কত গল্প হয়।
বিজয়া। কেবল গল্পই যদি হয় আপনি পড়ান কখন?
নরেন। পড়াই কখন? আমি কি তাঁর মাস্টার, না পড়ানোর ভার আমার ওপর? আপনার কথাগুলো সব এত বাঁকা যে মনে হয় সোজা কথা বলতে কখনো শেখেন নি।
বিজয়া। শিখব কি করে, মাস্টার ত ছিল না।
নরেন। আবার সেই বাঁকা কথা!
বিজয়া। (হাসিয়া ফেলিয়া) কিন্তু আপনি যাবেন কখন? খাওয়া আজ না হয় না–ই হলো, কিন্তু পড়ানো না হলে যে ভয়ানক ক্ষতি!
নরেন। আবার সেই! চললুম। (টুপিটা হাতে লইয়া কয়েক পদ অগ্রসর হইয়া দ্বারের নিকটে সহসা থমকিয়া দাঁড়াইয়া) একটা কথা বলবার ছিল, কিন্তু ভয় হয় পাছে রাগ করে বসেন।
বিজয়া। রাগই যদি করি তাতে আপনার ভাবনা কি? দেনা শোধ করুন বলে চোখ রাঙ্গাবো সে জো–ও নেই। ভয়টা আপনার কিসের?
নরেন। আবার তেমনি বাঁকা কথা। কিন্তু শুনুন। এখানে এসে পর্যন্ত আপনি বহু সৎকার্য করেছেন। কত দুঃস্থ প্রজার খাজনা মাপ করেছেন, কত দরিদ্রকে দান করেছেন, ধর্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন—
বিজয়া। এ-সব শোনালে কে? নলিনী?
নরেন। হাঁ, তাঁর মুখেই শুনেছি। কত দরিদ্র কত কি পেলে, আমি কি কিচ্ছু পাব না? আমাকে সেই মাইক্রোস্কোপটা আজ উপহার দিন, কাল–পরশু দামটা তার পাঠিয়ে দেব।
বিজয়া। দাম দিয়ে উপহার নেবার বুদ্ধি আপনাকে কে যোগালে? নলিনী?
নরেন। না না, তিনি নয়। তিনি শুধু বলছিলেন সেটা আপনার ত কোন কাজে লাগল না, কিন্তু তিনি পেলে অনেক কিছু শিখতে পারেন—সে শিক্ষা পরে তাঁর অনেক কাজে লাগবে।
বিজয়া। অর্থাৎ, সেটা গিয়ে পৌঁছবে তাঁর হাতে? আমি বেচলে আপনি নিয়ে গিয়ে তাঁকে উপহার দেবেন—এই ত প্রস্তাব?
নরেন। না না, তা নয়। কিন্তু সেটা আপনারও কোন কাজে এল না, অথচ, সকলেরই চক্ষুশূল হয়ে রইল। তাই বলছিলুম—
বিজয়া। বলার কোন দরকার ছিল না নরেনবাবু। আপনার টাকার অভাব নেই, দোকানেও মাইক্রোস্কোপ কিনতে পাওয়া যায়। কিনেই যদি উপহার দিতে হয় তাঁকে বাজার থেকে কিনেই দিবেন। এটা আমার চক্ষুশূল হয়েই আমার কাছে থাক।
নরেন। কিন্তু—
বিজয়া। কিন্তুতে আর কাজ নেই। আপনি নিরর্থক নিজেরও সময় নষ্ট করছেন, আমারও করছেন। আরও ত কাজ আছে।
নরেন। (ক্ষণকাল হতবুদ্ধিভাবে চাহিয়া থাকিয়া) আপনার সুমুখে সব কথা আমি গুছিয়ে বলতে পারিনে, আপনিও রেগে ওঠেন। হয়ত আপনার মনে হয় নিজের অবস্থাকে ডিঙিয়ে আপনাদের সমকক্ষ হয়ে আমি চলতে চাই, কিন্তু তা কখনো সত্যি নয়। আপনার বাড়িতে আসতে কত যে সঙ্কুচিত হই সে আমিই জানি। এসে কি বলতে কি বলি, নিজের ওজন রাখতে পারিনে, আপনি উত্যক্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু সে আমার অন্যমনস্ক প্রকৃতির দোষে, আপনাকে অমর্যাদা করার জন্যে না। কিন্তু আর আপনাকে বিরক্ত করতে আমি আসব না। নমস্কার।
[নরেন ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল
[ব্যগ্রপদে রাসবিহারীর প্রবেশ। তাঁহার পিছনে দয়াল, হাতে রৌপ্যপাত্রে ফুল, চন্দন ও একজোড়া মোটা সোনার বালা। তাঁহার পিছনে দুইজন ভৃত্যের হাতে ফুল, মালা ইত্যাদি এবং তাহাদের পিছনে কর্মচারীর দল। বিজয়া চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইল]
রাস। মা বিজয়া, আজ যে নব–বৎসরের প্রথম দিন সে কথা কি তোমার স্মরণ আছে?
বিজয়া। একটু পূর্বেই আপনি বলে গেলেন, নইলে ছিল না।
রাস। (মৃদু হাসিয়া) তুমি ভুলতে পার, কিন্তু আমি ভুলি কি করে? এই যে আমার ধ্যান–জ্ঞান। বনমালী বেঁচে থাকলে আজকের দিনে তিনি কি করতেন মনে পড়ে মা?
বিজয়া। পড়ে বৈ কি। আজকের দিনে বিশেষ করে তিনি আমাকে আশীর্বাদ করতেন।
রাস। বনমালী নেই, কিন্তু আমি আজ আছি। ভেবেছিলাম এই কর্তব্য প্রভাতেই নিষ্পন্ন করব, তোমাদের স্বাস্থ্য, আয়ু, নির্বিঘ্ন–জীবন ভগবানের শ্রীচরণে প্রসাদ ভিক্ষা করে নেব, কিন্তু নানা কারণে তাতে বাধা পড়ল। কিন্তু বাধা ত সত্যি নয়, সে মিথ্যে। তাকে স্বীকার করে নিতে পারিনে ত মা! জানি আজ তোমার মন চঞ্চল, তবু দয়ালকে বললাম, ভাই, আজকের এই পুণ্যদিনটিকে আমি ব্যর্থ যেতে দিতে পারব না, তুমি আয়োজন কর। আয়োজন যত অকিঞ্চনই হোক,—কিন্তু নিজেই যে আমি বড় অকিঞ্চন মা! দয়াল বললেন, সময় কৈ? বেলা যে যায়। সজোরে বললুম, যায়নি বেলা—আছে সময়। কোন বিঘ্নই আজ আমি মানব না। আয়োজনের স্বল্পতায় কি আসে–যায় দয়াল, আড়ম্বরে বাইরের লোককেই শুধু ভোলানো যায়, কিন্তু এ যে বিজয়া! মা যে বুঝবেই এ তার পিতৃকল্প কাকাবাবুর অন্তরের শুভ–কামনা। লোক ছুটল আমার বাড়িতে, বাগানে ছুটল মালী ফুল তুলতে—মাঙ্গলিক যা– কিছু সংগৃহীত হতে বিলম্ব ঘটল না। মুকুট-মালা না-ই বা হলো—এ যে কাকাবাবুর আশীর্বাদ! কিন্তু বিলাস এল না কেন? তখনি স্মরণ হলো সে আসবে কি করে? সে সাহস তার কৈ? ভাবলাম ভালই হয়েছে যে সে লজ্জায় লুকিয়ে আছে। এমনিই হয় মা,—অপরাধের দণ্ড এমনি করেই আসে। জগদীশ্বর! (একমুহূর্ত পরে) তখন কাছারিঘরে ডাক দিয়ে বললাম, তোমরা কে কে আছ এসো আমাদের সঙ্গে। আজকের দিনে তোমাদের কাছেও বিজয়ার চিরদিনের কল্যাণ–ভিক্ষা করে আমি নিতে চাই। এসো ত মা আমার কাছে। (এই বলিয়া তিনি নিজেই অগ্রসর হইয়া গেলেন। বিজয়া উদ্ভ্রান্ত–মুখে এতক্ষণ নীরবে চাহিয়াছিল, এইবার ঘাড় হেঁট করিল। রাসবিহারী তাহার কপালে চন্দনের ফোঁটা দিলেন, মাথায় ফুল ছড়াইয়া দিতে দিতে ) সংসারে আনন্দ লাভ কর, স্বাস্থ্য–আয়ু–সম্পদ লাভ কর, ব্রহ্মপদে অবিচলিত শ্রদ্ধা–ভক্তি–বিশ্বাস লাভ কর, আজকের পুণ্যদিনে এই তোমার কাকাবাবুর আশীর্বাদ মা।
