[বিজয়া দুই হাত জোড় করিয়া নিজের ললাট স্পর্শ করিয়া নমস্কার
করিল। অনেকের হাতেই ফুল ছিল তাহারা ছড়াইয়া দিল]
রাস। দেখি মা তোমার হাত–দুটি—(এই বলিয়া বিজয়ার হাত টানিয়া লইয়া একে একে সেই সোনার বালা–দুটি পরাইয়া দিলেন) টাকার মূল্যে এ–বালার দাম নয় মা, এ তোমার—(দীর্ঘশ্বাস মোচন করিয়া) এ আমার বিলাসের জননীর হাতের ভূষণ। চেয়ে দেখ মা কত ক্ষয়ে গেছে। মৃত্যুকালে তিনি বলেছিলেন এ যেন না কখনো নষ্ট করি, এ যেন শুধু আজকের দিনের জন্যেই—
[রাসবিহারীর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠস্বর এইবার একেবারে ভাঙ্গিয়া পড়িল]
দয়াল। (আশীর্বাদ করিতে কাছে আসিয়া ব্যস্তভাবে) মা, মুখখানি যে বড় পাণ্ডুর দেখাচ্চে, অসুখ করেনি ত?
বিজয়া। (মাথা নাড়িয়া) না।
দয়াল। সুখী হও, আয়ুষ্মতী হও, জগদীশ্বরের কাছে এই প্রার্থনা করি।
[বিজয়া জানু পাতিয়া তাঁহার পায়ের কাছে প্রণাম করিল]
দয়াল। (ব্যস্ত হইয়া) থাক মা থাক—আনন্দময় তোমাকে আনন্দে রাখুন। কিন্তু মুখ দেখে তোমাকে বড় শ্রান্ত মনে হচ্চে। বিশ্রাম করার প্রয়োজন।
রাস। প্রয়োজন বৈ কি দয়াল, একান্ত প্রয়োজন। আজ বনমালীর উল্লেখ করে হয়তো তোমার মনে বড় কষ্ট দিয়েছি, কিন্তু না করেও যে উপায় ছিল না। আজকের শুভদিনে তাঁকে স্মরণ করা যে আমার কর্তব্য। কিন্তু আর কথা কয়ে তোমাকে ক্লান্ত করব না মা, যাও বিশ্রাম কর গে। দয়াল, চল ভাই আমরা যাই। (কর্মচারীদের লক্ষ্য করিয়া) তোমরা সকলেই বয়োজ্যেষ্ঠ, তোমাদের মঙ্গলকামনা কখনো নিষ্ফল হবে না। শুধু দয়াল নয়, তোমাদের কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু চল সকলে যাই, মাকে বিশ্রাম করার একটু অবসর দিই।
[সকলের একে একে প্রস্থান
[বিজয়া বালা–জোড়া হাত হইতে খুলিয়া ফেলিল এবং নিঃশব্দে ফিরিয়া আসিয়া টেবিলে মাথা রাখিয়া উপবেশন করিল। ক্ষণেক পরে পরেশ প্রবেশ করিয়া ক্ষণকাল নীরবে চাহিয়া রহিল]
পরেশ। মা গো!
বিজয়া। (মুখ তুলিয়া) কি রে পরেশ?
পরেশ। তোমার যে বিয়ে হবে গো!
বিজয়া। বিয়ে হবে? কে তোরে বললে?
পরেশ। সবাই বলচে। এই যে আশীর্বাদ হয়ে গেল আমরা সবাই দেখনু।
বিজয়া। কোথা দিয়ে দেখলি?
পরেশ। উই দোরের ফাঁক দিয়ে। আমি, মা, সতুর পিসী—সব্বাই। দু-গণ্ডা পয়সা দাও না মা, একটা ভালো নাটাই কিনব—(জানালার বাহিরে দৃষ্টিপাত করিয়া) উই গো! ডাক্তারবাবু যায় মা। হনহন করে চলেচ ইস্টিসানে—
বিজয়া। (দ্রুতপদে জানালার কাছে আসিয়া বাহিরে চাহিয়া) পরেশ, ধরে আনতে পারিস ওঁকে? তোকে খুব ভালো লাটাই কিনে দেব।
পরেশ। দেবে ত মা?
[পরেশ দৌড় মারিল। পরেশের মা মৃদুপদে প্রবেশ করিল]
পরেশের মা। আজকে কি কিছু খাবে না দিদিমণি? একফোঁটা চা পর্যন্ত যে খাওনি! (টেবিলের কাছে আসিয়া বালা-দুটা হাতে তুলিয়া লইয়া) একি কাণ্ড! আজকের দিনে কি হাত থেকে সরাতে আছে দিদিমণি! তোমার যে ভুলো মন, হয়ত এখানেই ফেলে চলে যাবে, যার চোখে পড়বে সে কি আর দেবে!—তোমার পরেশকে কিন্তু একটা আংটি গড়িয়ে দিতে হবে দিদিমণি, তার কতদিনের শখ।
বিজয়া। আর তোমাকে একটা হার,—না?
পরেশের মা। তামাশা করছ বটে, কিন্তু না নিয়েই কি ছাড়ব ভেবেছ?
বিজয়া। না, ছাড়বে কেন, এই ত তোমাদের পাবার দিন।
পরেশের মা। সত্যি কথাই ত! এসব কাজকর্মে পাব না ত কবে পাব বল ত? পাওনা যাবে না আমাদের, তোলাই আছে, কিন্তু কি খাবে বলত? এক বাটি চা আর কিছু খাবার নিয়ে আসব? না হয় তোমার শোবার ঘরে চল, আমি সেখানেই দিয়ে আসি গে।
বিজয়া। তাই যাও পরেশের মা, আমার শোবার ঘরেই দাও গে।
পরেশের মা। যাই দিদিমণি, বামুনঠাকুরকে দিয়ে খান-কতক গরম লুচি ভাজিয়ে নিই গে।
[পরেশের মা চলিয়া গেল। প্রবেশ করিল পরেশ এবং তাহার পিছনে নরেন]
বিজয়া। এই নে পরেশ একটা টাকা। খুব ভালো লাটাই কিনিস, ঠকিস নে যেন!
পরেশ। না—
[পরেশ নিমিষে অদৃশ্য হইয়া গেল
নরেন। ওঃ—তাই ওর এত গরজ! আমাকে নিশ্বাস নেবার সময় দিতে চায় না। লাটাই কেনার টাকা ঘুষ দেওয়া হলো! কিন্তু কেন? হঠাৎ যে আবার ডাক পড়ল?
বিজয়া। (ক্ষণকাল নরেনের মুখের প্রতি চাহিয়া) মুখ ত শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে উঠেচে। কি খেলেন সেখানে?
নরেন। খাইনি। দোরগোড়া পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এলুম, ঢুকতে ইচ্ছেই হলো না।
বিজয়া। কেন?
নরেন। কি জানি কেন! মনে হলো কোথাও কারো কাছে আর যাবো না,—এদিকেই আর আসব না।
বিজয়া। আমি মন্দ লোক, মিছিমিছি রাগ করি, আর আপনি ভয়ানক ভালো লোক—না?
নরেন। কে বলেছে আপনাকে মন্দ লোক?
বিজয়া। আপনি বলেছেন। আমাকেই অপমান করলেন, আর আমাকেই শাস্তি দিতে না খেয়ে কলকাতা চলে যাচ্ছেন—কি করেছি আপনার আমি?
[বলিতে বলিতে তাহার চক্ষু অশ্রুপূর্ণ হইয়া উঠিল এবং তাহাই গোপন
করিতে সে জানালার বাহিরে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইল]
নরেন। কি আশ্চর্য! বাসায় ফিরে যাচ্চি তাতেও আমার দোষ!
[কালীপদ প্রবেশ করিল]
কালীপদ। মা, আপনার শোবার ঘরে খাবার দেওয়া হয়েছে!
বিজয়া। (নরেনের প্রতি) চলুন আপনার খাবার দিয়েছে।
নরেন। আমার কি রকম? আমি যে আসব নিজেই ত জানতুম না।
বিজয়া। আমি জানতুম, চলুন।
নরেন। আমার খাবার ব্যবস্থা আপনার শোবার ঘরে? এ কখনো হয়? হাঁ কালীপদ, কার খাবার দেওয়া হয়েছে সত্যি করে বল ত?
কালীপদ। আজ্ঞে মা’র। আজ সারাদিন উনি প্রায় কিছুই খাননি।
নরেন। তাই সেগুলো এখন আমাকে গিলতে হবে? দেখুন, অন্যায় হচ্চে—এতটা জুলুম আমার ‘পরে চালাবেন না।
