বিজয়া। (মুখ ফিরাইয়া) অভিনন্দন আজ না জানিয়ে বরঞ্চ সেইদিনই আশীর্বাদ করবেন।
নরেন। সেদিন? কিন্তু ততদিন পারব থাকতে?
বিজয়া। না, সে হবে না। রাসবিহারীবাবুকে কথা দিয়েছেন, আপনাকে থাকতেই হবে।
নরেন। কথা দিইনি বটে, কিন্তু দিতেই ইচ্ছে করে। যদি থাকি আসবই। (বিজয়া অলক্ষ্যে চোখ মুছিয়া ফেলিল) ভাল কথা। আমার আর একটা ক্ষমা চাইবার আছে। সেদিন কালীপদকে দিয়ে হঠাৎ microscope-টা পাঠিয়েছিলেন কেন?
বিজয়া। আপনার জিনিস আপনি নিজেই ত ফিরে চেয়েছিলেন।
নরেন। তা বটে, কিন্তু দামের কথাটা ত বলে পাঠান নি? তা হলে ত—
বিজয়া। আমার ভুল হয়েছিল। কিন্তু সেই ভুলের শাস্তি আপনি ত আমাকে কম দেননি!
নরেন। কিন্তু কালীপদ যে বললে—
বিজয়া। যাই বলুক সে, কিন্তু আপনাকে উপহার দেবার স্পর্ধা আমার থাকতে পারে এমন কথা কেমন করে বিশ্বাস করলেন? আর সত্যিই তাই যদি করে থাকি, কেন নিজের হাতে শাস্তি দিলেন না? কেন চাকরকে দিয়ে আমার অপমান করলেন? আপনার কি করেছিলুম আমি?
[শেষের দিকে তাহার গলা ভাঙ্গিয়া আসিল, সে উঠিয়া গিয়া
জানালার বাহিরে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিল]
নরেন। কাজটা আমার যে ভাল হয়নি তা তখনি টের পেয়েছিলুম। তারপরে অনেক ভেবে দেখচি—আর ঐ দেখুন—ঐ ঈর্ষা জিনিসটা যে কত মন্দ তার সীমা নেই। ও যে শুধু নিজের ঝোঁকে বেড়ে চলে তাই নয়, সংক্রামকব্যাধির মত অপরকে আক্রমণ করতেও ছাড়ে না। আজ ত নিশ্চয় জানি আমাকে ঈর্ষা করার মত ভুল বিলাসবাবুর আর নেই, কিন্তু সেদিন নলিনীর মুখের ঐ ঈর্ষা শব্দটা আমার কানের মধ্যে গিয়ে বিঁধে রইল, কিছুতেই যেন আর ভুলতে পারিনে।
বিজয়া। (মুখ না ফিরাইয়া) তারপরে? ভুললেন কি করে?
নরেন। (হাসিয়া) অনেক চেষ্টায়। অনেক দুঃখে। কেবলি মনে হতে লাগল—নিশ্চয়ই কিছু কারণ আছে, নইলে মিছেমিছি কেউ কারুকে হিংসে করে না। আপনাকে আজ আমি সত্যি বলচি তার পরের ক’দিন চব্বিশ ঘণ্টাই শুধু আপনাকে ভাবতুম, আর মনে পড়ত আপনার জ্বরের ঘোরের সেই কথাগুলি। তাই ত বলেছিলুম এ কি ভয়ানক ছোঁয়াচে রোগ। কাজকর্ম চুলোয় গেল—দিবারাত্রি আপনার কথাই শুধু মনের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। এর কি আবশ্যক ছিল বলুন ত! আর শুধু কি এই? আপনাকে দেখার জন্যেই কেবল দু-তিনদিন এই পথে হেঁটে গেছি। দিনকতক সে এক আচ্ছা পাগলা ভূত আমার কাঁধে চেপেছিল।
[এই বলিয়া সে হাসিতে লাগিল। বিজয়া কোন কথা না বলিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল]
নরেন। (সেইদিকে সবিস্ময়ে চাহিয়া) এ আবার কি হলো! রাগ করবার কথা কি বললুম!
[কালীপদ প্রবেশ করিল]
কালীপদ। আপনি চলে যাবেন না যেন। মা বলে দিলেন আপনি চা খেয়ে যাবেন।
নরেন। না না, তাঁকে বারণ করে দাও গে—আমি দয়ালবাবুর ওখানে চা খাব।
কালীপদ। কিন্তু মা দুঃখ করবেন যে!
নরেন। না, দুঃখ করবেন না। তাঁকে বলো গে আজ আমার সময় নেই।
কালীপদ। বলচি, কিন্তু তিনি কখখনো শুনবেন না।
[কালীপদ প্রস্থান করিল
[অন্য দ্বার দিয়া বিজয়া প্রবেশ করিল]
নরেন। অমন করে হঠাৎ চলে গেলেন যে বড়?
বিজয়া। কেমন করে চলে গেলুম শুনি?
নরেন। যেন রাগ করে।
বিজয়া। আপনার চোখের দৃষ্টিটা খুলচে দেখচি তা হলে! আচ্ছা, সেই ভূতের কাহিনীটি শেষ করুন এবার।
নরেন। কোন্ ভূতের কাহিনী?
বিজয়া। সেই যে পাগলা ভূতটা দিন–কতক আপনার কাঁধে চেপেছিল? সে নেবে গেছে ত?
নরেন। (সহাস্যে) ওঃ—তাই? হাঁ সে নেবে গেছে।
বিজয়া। যাক তা হলে বেঁচে গেছেন বলুন। নইলে আরও কতদিন যে আপনাকে এই পথে ঘোড়দৌড় করিয়ে বেড়াত কে জানে।
[কালীপদ প্রবেশ করিল]
কালীপদ। (নরেনকে দেখাইয়া) উনি চা খাবেন না।
বিজয়া। (কালীপদকে) কেন খাবেন না? যা তুই ঠিক করে আনতে বলে দি গে।
[কালীপদ প্রস্থান করিল
নরেন। আমাকে মাপ করবেন, আজ আমি চা খেতে পারব না।
বিজয়া। কেন পারবেন না?—আপনাকে নিশ্চয় খেয়ে যেতে হবে!
নরেন। (মাথা নাড়িয়া) না না, সে ঠিক হবে না। সেদিন তাঁদের কথা দিয়েছিলুম আজ এসে তাঁদের বাড়িতে খাব। না খেলে তাঁরা বড় দুঃখ করবেন।
বিজয়া। তাঁরা কে? দয়ালবাবুর স্ত্রী, না নলিনী?
নরেন। দুজনেই দুঃখ পাবেন। হয়ত আমার জন্যে আয়োজন করে রেখেচেন।
বিজয়া। আয়োজনের কথা থাক, কিন্তু দুঃখ পেতে বুঝি শুধু তাঁরাই আছেন, আর কেউ নেই নাকি?
নরেন। আর কেউ কে, দয়ালবাবু? ( হাসিয়া ) না না, তিনি বড় শান্ত মানুষ—সাদাসিধে নিরীহ লোক। তা ছাড়া তাঁকে ত এ বাড়িতেই দেখলুম। তাঁকে ভয় নেই, কিন্তু ওঁরা বড় রাগ করবেন।
বিজয়া। ওঁরা কারা নরেনবাবু? ওঁরা কেউ নেই—আছেন শুধু নলিনী। এখানে খেয়ে গেলে তিনিই রাগ করবেন। বলুন তাঁকেই আপনার ভয়, বলুন এই কথাই সত্যি।
নরেন। রাগ করতে আপনারা কেউ কম নয়। আপনাকে কথা দিয়ে সেখানে খেয়ে এলে আপনিই কি রাগ কম করতেন নাকি?
বিজয়া। হাঁ, তাই যান। শিগগির যান, আপনার অনেক দেরি হয়ে গেছে, আর আপনাকে আটকাব না।
নরেন। হাঁ, দেরি হয়ে গেছে বটে। ফিরে যাবার সাতটার ট্রেনটা হয়ত আর ধরতে পারব না।
বিজয়া। পারবেন না কেন? এখন থেকে সাতটা পর্যন্ত আপনাকে ধরে বসিয়ে নলিনী খাওয়াবেন নাকি? এখানে ত একটুখানি খেয়েই—না না করতে থাকেন, শত উপরোধেও কথা রাখেন না, উপেক্ষা করে উঠে পড়েন।
নরেন। একেবারে উলটো অভিযোগ? মানুষকে বেশী খাওয়ানোর রোগ আপনার চেয়ে সংসারে কারো আছে নাকি? উপেক্ষা করা? আপনাকে উপেক্ষা করে কারো নিস্তার আছে? ভয়েই ত সারা হয়ে যায়।
