[বিজয়া মুখ ফিরাইয়া ব্যথিত সুরে]
বিজয়া। আমি যতদিন বাঁচব নরেনবাবু, আপনার কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব। কিন্তু এঁরা যখন অন্য ডাক্তার দিয়ে আমার চিকিৎসা করা স্থির করেছেন, তখন আর আপনি অনর্থক অপমান সইবেন না।
[পুনরায় মুখ ফিরাইয়া শুইল]
রাস। (ব্যস্ত হইয়া) বিলক্ষণ, যাঁকে তুমি ডেকে পাঠিয়েছ তাঁকে অপমান করে কার সাধ্য মা? (ক্ষণকাল পরে) এ কথাও সত্যি বিলাস! এই অসংযত ব্যবহারের জন্য তোমার অনুতপ্ত হওয়া উচিত। মানি, সমস্তই মানি যে মা বিজয়ার অসুখের গুরুত্ব কল্পনা করেই তোমার মানসিক চঞ্চলতা শতগুণে বেড়ে গেছে, তবু—স্থির ত তোমাকে হতেই হবে। সমস্ত ভাল-মন্দ সমস্ত দায়িত্ব ত শুধু তোমারই মাথায় বাবা! মঙ্গলময়ের ইচ্ছায় যে গুরুভার একদিন তোমাকেই শুধু বহন করতে হবে—এ ত শুধু তারই পরীক্ষার সূচনা—(নরেন নিঃশব্দে লাঠি ও ছোট ব্যাগটি তুলিয়া লইল) নরেনবাবু, আপনার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আলোচনা করবার আছে—চলুন।
[রাসবিহারী নরেনকে লইয়া রঙ্গমঞ্চের সম্মুখের দিকে আসিতেই মধ্যের পর্দা পড়িয়া রোগীর কক্ষটিকে সম্পূর্ণ আবৃত করিয়া দিল। উভয়ে মুখোমুখি দুইখানি চৌকিতে উপবেশন করিল]
রাস। পাঁচজনের সামনে তোমায় বাবুই বলি, আর যাই বলি, বাবা, এটা কিন্তু ভুলতে পারিনে, তুমি আমাদের সেই জগদীশের ছেলে। নইলে তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলুম এ কথা তোমার মুখের ওপর বলে তোমাকে ক্লেশ দিতুম না।
নরেন। যা সত্য তাই বলেছেন—এতে দুঃখ করবার কিছু নেই।
রাস। না না, ও কথা বলো না নরেন। কঠোর কথা মনে বাজে বৈ কি! যে শোনে তার ত বাজেই, যে বলে তারও বড় কম বাজে না বাবা। জগদীশ্বর! কিন্তু তুমি, বাবা, বিলাসের মনের অবস্থা বুঝে মনের মধ্যে কোনও ক্ষোভ রাখতে পারবে না। আর একটা অনুরোধ আমার এই রইল, এদের বিবাহ ত সামনের বৈশাখেই হবে, যদি কলকাতাতেই থাকো বাবা, শুভকর্মে যোগ দিতে হবে। না বললে চলবে না।
নরেন। আচ্ছা। কিন্তু—
রাস। না, কোন কিন্তু নয় বাবা, সে আমি শুনব না। ভাল কথা, কলকাতাতেই কি এখন থাকা হবে? একটু সুবিধে-টুবিধে—
নরেন। আজ্ঞে হাঁ। একটা বিলিতী ওষুধের দোকানে সামান্য একটা কাজ পেয়েছি।
রাস। বেশ, বেশ, ওষুধের দোকানে কাঁচা পয়সা! টিকে থাকতে পারলে আখেরে গুছিয়ে নিতে পারবে নরেন।
নরেন। আজ্ঞে।
রাস। তা হলে মাইনেটা কি রকম?
নরেন। পরে কিছু বেশী দিতে পারে। এখন চারশো টাকা মাত্র দেয়।
রাস। (বিবর্ণমুখে চোখ কপালে তুলিয়া) চারশো! আহা বেশ—বেশ! শুনে বড় সুখী হলুম।
নরেন। সেই পরেশ ছেলেটি কেমন আছে বলতে পারেন?
রাস। তাকে একটু আগেই তাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নরেন। গ্রামটা কি দূরে?
রাস। তা জানিনে বাবা।
নরেন। (ক্ষণকাল স্তব্ধভাবে থাকিয়া) তা হলে আর উপায় কি। সে কথা যাক, কিন্তু আমার হয়ে বিলাসবাবুকে আপনি একটা কথা জানাবেন। বলবেন—প্রবল জ্বরে মানুষের আবেগ নিতান্ত সামান্য কারণে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতে পারে। বিজয়ার সম্বন্ধে ডাক্তারের মুখের এই কথাটা তিনি যেন অবিশ্বাস না করেন।
রাস। অবিশ্বাস করবে কি নরেন, এ কি আমরা জানিনে? বাপ হয়ে এ কথা বলতে আমার মুখে বাধে, কিন্তু তুমি আপনার জন বলেই বলি, দুজনের কি গভীর ভালবাসার চিহ্নই যে মাঝে মাঝে আমার চোখে পড়ে সে প্রকাশ করিবার আমার ভাষা নেই। মনে হয় ভগবান যেন সঙ্কল্প করেই পরস্পরের জন্যে এদের সৃজন করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাঁকে প্রণাম করি, আর ভাবি সার্থক এদের মিলন, সার্থক এদের জীবন।
নরেন। এই বৈশাখেই বুঝি এঁদের বিবাহ হবে?
রাস। হাঁ নরেন। সেদিন কিন্তু তোমাকে আসতে হবে, উপস্থিত থেকে নব-দম্পতিকে আশীর্বাদ করতে হবে। তাড়াতাড়ি করার আমার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু সকলেই পুনঃ পুনঃ বলচেন অন্তরের আত্মা যাঁদের এমন করে এক হয়েছে বাইরে তাদের পৃথক করে রাখা অপরাধ। আমি বললুম, তাই হোক। তোমাদের সকলের ইচ্ছেই আমার ভগবানের ইচ্ছে। এই বৈশাখেই এক হয়ে এরা সংসার-সমুদ্রে জীবন-তরণী ভাসাক। জগদীশ্বর! আমার দিন শেষ হয়েছে, কিন্তু তুমি এদের দেখো—তোমার চরণেই এদের সমর্পণ করলুম। (যুক্তকর ললাটে স্পর্শ করিয়া হেঁট হইয়া তিনি প্রণাম করিলেন) কিন্তু তোমার যে রাত হয়ে যাচ্ছে বাবা, আজই কি কলকাতায় ফিরে না গেলেই নয়?
নরেন। না আমাকে যেতেই হবে। সাড়ে-আটটার ট্রেনেই যাব।
রাস। জিদ করতে পারিনে নরেন, নতুন চাকরি, কামাই হওয়া ভাল নয়—মনিব রাগ করতে পারে। আজকের দিনটাও ত তোমার বৃথায় নষ্ট হ’লো। কিন্তু কি জন্যে আজ এসেছিলে বাবা, জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?
নরেন। দিনটা নষ্ট হলো সত্যি, কিন্তু সকালে এসেছিলুম এই আশা করে যদি টাকাটা দিয়ে সেই মাইক্রস্কোপটা ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি।
রাস। টাকাটা দিয়ে? বেশ ত, বেশ ত—নিয়ে গেলে না কেন?
নরেন। বিজয়া দিলেন না। বললেন, তার দাম চারশো টাকা—এর এক পয়সা কমে হবে না।
রাস। সে কি কথা নরেন? দুশো টাকার বদলে চারশো টাকা! বিশেষতঃ তাতে যখন তোমার এত দরকার অথচ তাঁর কোন প্রয়োজন নেই।
নরেন। ভেবেছি তাঁকে চারশো টাকা দিয়েই আমি নিয়ে যাব।
রাস। না, সে কোনমতেই হতে পারে না। এত বড় অধর্ম আমি সইতে পারব না। ও আমার ভাবী পুত্রবধূ, এ অন্যায় যে আমাকে পর্যন্ত স্পর্শ করবে নরেন। (ক্ষণকাল অধোমুখে নিঃশব্দে থাকিয়া) একটা কথা আমি বার বার ভেবে দেখেচি। তোমার সঙ্গে ওর কথাবার্তায়, বাইরের আচরণে আমি দোষ দেখতে পাইনে কিন্তু অন্তরে কেন তোমার প্রতি বিজয়ার এতবড় ক্রোধ! কেবল যে তোমার ঐ বাড়িটার ব্যাপারেই দেখতে পেলাম তাই নয় এই microscope-টার ব্যাপারেও ঢের বেশী চোখে পড়ল! ওটা নিতে আমার নিজেরই আপত্তি ছিল শুধু যে দরকার নেই বলেই তা নয়—ওতে তোমার নিজেরই অনেক বেশী প্রয়োজন বলে। কিন্তু যখনি টের পেলাম তোমার টাকার প্রয়োজন, যখনি কানে এল তোমাকে কথা দেওয়া হয়েছে, তখনি সঙ্কল্প আমার স্থির হয়ে গেল। ভাবলাম, দাম ওর যাই হোক কিন্তু টাকা দিতেই হবে, কিছুতে অন্যথা করা চলবে না। মনে মনে বললাম, বিজয়ার যখন ইচ্ছে, যতদিনে ইচ্ছে আমাকে টাকা শোধ দিন, কিন্তু আমি বিলম্ব করতে পারব না। তাই তোমাকে দুশো টাকা সকালেই পাঠিয়ে দিলাম। এ যে আমার কর্তব্য—সত্যরক্ষা আমাকে যে করতেই হবে।
