কালীপদ। নরেনবাবু এসেছিলেন, তিনিই হাত দেখে বললেন জ্বর—বললেন চুপ করে শুয়ে থাকতে।
রাস। নরেন? সে কি জন্যে এসেছিল? কখন এসেছিল? কালীপদ, মাকে একবার খবর দাও যে আমি একবার দেখতে যাব।
দয়াল। আমিও যে মাকে একবার দেখতে চাই কালীপদ। জ্বর শুনে যে বড় ভাবনা হলো।
কালীপদ। কিন্তু মা আমাকে বারণ করে দিয়েছেন তিনি নিজে না ডাকলে কেউ যেন না তাঁকে ডাকে। আমি গেলে হয়ত রাগ করবেন।
রাস। রাগ করবে? সে কি কথা? জ্বর যে! সমস্ত ভার, সমস্ত দায়িত্ব যে আমার মাথায়! বিলাসকে কেউ ছুটে গিয়ে খবর দিয়ে আসুক। আজ তারও শরীর ভাল নয়, বাড়িতেই আছে। কিন্তু সে বললে কি হবে—শিগগির এসে একটা ব্যবস্থা করুক। শহরে গাড়ি পাঠিয়ে আমাদের অকিঞ্চনবাবুকে একটা কল্ দিক। না হয় কলকাতায়—আমাদের প্রেমাঙ্কুর ডাক্তার—চলুন চলুন দয়ালবাবু, যাই আমরা, সময় যেন না নষ্ট হয়।
দয়াল। ব্যস্ত হবেন না রাসবিহারীবাবু, জগদীশ্বরের কৃপায় ভয় কিছু নেই। নরেন নিজে যখন দেখে গেছে—ভাবনার বিষয় হলে সে নিশ্চয়ই আপনাকে একটা সংবাদ দিতে বলে দিত।
রাস। নরেন দেখে গেছে? কি জানে সেটা?
[বলিতে বলিতে তিনি দ্রুতবেগে প্রস্থান করিলেন।
পিছনে পিছনে গেলেন দয়াল এবং কালীপদ
বিজয়া – ২.৫
পঞ্চম দৃশ্য
বিজয়ার শয়নকক্ষ
[অসুস্থ বিজয়া বিছানায় শুইয়া, অনতিদূরে উপবিষ্ট পিতা-পুত্র রাসবিহারী ও বিলাসবিহারী। ঘরে অন্য আসন নাই, রোগীর প্রয়োজনীয় সকল দ্রব্যই নিকটে রক্ষিত, ব্যস্ত পদক্ষেপে নরেন প্রবেশ করিল—তাহার মুখে উৎকণ্ঠার চিহ্ন]
নরেন। কি ব্যাপার? কালীপদর মুখে শুনলাম জ্বর নাকি একটু বেড়েচে। তা হোক—কেমন আছেন এখন?
বিলাস। আপনি সকালে এসে নাকি ওঁকে বসন্তের ভয় দেখিয়ে গেছেন?
বিজয়া। (ক্ষীণস্বরে দুই বাহু বাড়াইয়া) বসুন। (নরেন অগত্যা বিছানার একাংশে বসিল) কোথায় ছিলেন এতক্ষণ? কেন এত দেরি করে এলেন? আমি যে সমস্তক্ষণ শুধু আপনার পথ চেয়ে ছিলুম। (বিলাসের মুখের অবস্থা ভীষণ হইয়া উঠিল। নরেনের হাতখানা বুকের উপর টানিয়া লইয়া) কিন্তু আমি ভাল না হওয়া পর্যন্ত কোথাও যাবেন না বলুন। আপনি চলে গেলে হয়ত আমি বাঁচব না। (নরেন হতবুদ্ধি হইয়া, মুখ তুলিতেই দুইজোড়া ভীষণ চক্ষুর সহিত তাহার চোখাচোখি হইল—কালীপদ একবার পর্দার ফাঁক হইতে উঁকি মারিতেই বিলাস গর্জিয়া উঠিল)
বিলাস। এই শূয়ার, এই জানোয়ার—একটা চেয়ার আন্।
[কালীপদ ভয়ে হতবুদ্ধি হইয়া রহিল]
রাসবিহারী। (গম্ভীর স্বরে) ওঘর থেকে একটা চেয়ার নিয়ে এস কালীপদ। বাবুকে বসতে দাও (নরেন উঠিয়া পড়িল। শান্তকণ্ঠে বিলাসের প্রতি) রোগী মানুষের ঘর—অমন hasty হয়ো না বিলাস। Temper lose করা কোনও ভদ্রলোকের পক্ষেই শোভা পায় না।
[কালীপদ চেয়ার লইয়া প্রবেশ করিল]
বিলাস। মানুষ এতে temper lose করে না ত করে কিসে শুনি? হারামজাদা চাকর, বলা নেই, কওয়া নেই, এমন একটা অসভ্য লোককে ঘরে এনে ঢোকালে যে ভদ্রমহিলার সম্মান পর্যন্ত রাখতে জানে না।
[বিজয়ার জ্বরের ঘোরটা হঠাৎ ঘুচিয়া গেল। নরেনের হাত ছাড়িয়া
সে দেওয়ালের দিকে মুখ করিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল]
রাস। আমি সবই বুঝি বিলাস, এ-ক্ষেত্রে তোমার রাগ হওয়াটা যে অস্বাভাবিক নয়—বরঞ্চ খুবই স্বাভাবিক তাও মানি, কিন্তু এটা তোমার ভাবা উচিত ছিল যে, সবাই ইচ্ছা করে অপরাধ করে না। সকলেই যদি ভদ্র রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার জানত—তা হলে ভাবনা ছিল কি? সেইজন্য রাগ না করে শান্তভাবে মানুষের দোষত্রুটি সংশোধন করে দিতে হয়।
বিলাস। না বাবা! এরকম impertinence সহ্য হয় না। তা ছাড়া আমার এ বাড়ির চাকরগুলো হয়েছে যেমন হতভাগা—তেমনি বজ্জাত। কালই আমি ব্যাটাদের সব দূর করে তবে ছাড়ব।
রাস। এর মন খারাপ হয়ে থাকলে যে কি বলে তার ঠিকানাই নাই। আর ছেলেকেই বা দোষ দোব কি, আমি বুড়োমানুষ, আমি পর্যন্ত অসুখ শুনে কি রকম চঞ্চল হয়ে উঠেছিলুম। বাড়িতেই হলো একজনের বসন্ত—তার ওপর উনি ভয় দেখিয়ে গেলেন।
নরেন। না, আমি কোনরকম ভয় দেখিয়ে যাইনি।
বিলাস। আলবত ভয় দেখিয়ে গেছেন। কালীপদ তার সাক্ষী আছে।
নরেন। কালীপদ ভুল শুনেছে।
[বিলাস ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিবে এমন সময়ে]
রাস। আঃ কর কি বিলাস! উনি যখন অস্বীকার করছেন তখন কি কালীপদকে বিশ্বাস করতে হবে? নিশ্চয়ই ওঁর কথা সত্যি।
বিলাস। তুমি বুঝছ না বাবা—(বিলাস বাধা দিতে চাহিল)
রাস। এই সামান্য অসুখেই মাথা হারিয়ো না বিলাস। স্থির হও! মঙ্গলময় জগদীশ্বর যে শুধু আমাদের পরীক্ষা করবার জন্যই বিপদ পাঠিয়ে দেন, বিপদে পড়লে তোমরা সকলের আগে এই কথাটাই কেন ভুলে যাও—আমি ত ভেবে পাইনে। (একটু স্থির থাকিয়া) আর তাই যদি একটা ভুল অসুখের কথা বলেই থাকেন, তাতেই বা কি? কত পাস-করা ভাল ভাল, বিচক্ষণ ডাক্তারেরও যে ভ্রম হয়, ইনি ত ছেলেমানুষ। যাক। (নরেনের প্রতি) জ্বর ত তা হলে অতি সামান্যই আপনি বলছেন। চিন্তা করবার কোনই কারণ নেই—এই ত আপনার মত।
নরেন। আমার মতামতে কি আসে-যায় রাসবিহারীবাবু? আমার ওপর ত নির্ভর করছেন না। বরং তার চেয়ে কোন ভাল পাস-করা বিচক্ষণ ডাক্তার দেখিয়ে তাঁর অভিমত নিন।
বিলাস। (চেঁচাইয়া উঠিয়া) তুমি কার সঙ্গে কথা কইছ, মনে করে কথা কয়ো বলে দিচ্ছি। এ-ঘর না হয়ে, আর কোথাও হলে তোমার বিদ্রূপ করা—
