নরেন। সামান্য দুশো টাকা দেবারও বুঝি ওঁর ইচ্ছে ছিল না? বিশ্বাস ছিল ঠকিয়ে নিয়ে যাচ্চি?
রাস। (জিভ কাটিয়া) না না না। কিন্তু সে বিচারে আর ত প্রয়োজন নেই নরেন। কিন্তু তাই বলে এ কি অসঙ্গত প্রস্তাব! এ কি অন্যায়! দুশোর বদলে চারশো! না বাবা, এ তাঁকে আমি কোনমতে করতে দেব না, তুমি দুশো টাকা দিয়েই তোমার জিনিস ফিরিয়ে নিয়ে যেও।
নরেন। না রাসবিহারীবাবু, আমার হয়ে আপনি তাঁকে অনুরোধ করবেন না। তিনি ভাল হলে জানাবেন তাঁকে চারশো টাকাই এনে দেব—তাঁর এতটুকু অনুগ্রহও আমি গ্রহণ করব না। বিলাসবাবুকে বলবেন তিনি যেন আমাকে ক্ষমা করেন—এত কথা আমি কিছুই জানতুম না। কিন্তু আর না—আমার গাড়ির সময় হয়ে আসছে আমি চললুম।
[প্রস্থান
বিজয়া – ৩.১
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
বিজয়ার বসিবার ঘর
[বিজয়া সুস্থ হইয়াছে, তবে শরীর এখনও দুর্বল। কালীপদর প্রবেশ]
কালী। (অশ্রুবিকৃত-স্বরে) মা, এতদিন তোমার অসুখের জন্যেই বলতে পারিনি, কিন্তু এখন আর না বললেই নয়। ছোটবাবু আমাকে জবাব দিয়েছেন।
বিজয়া। কেন?
কালী। কর্তাবাবু স্বর্গে গেছেন—তাঁর কাছে কখনো মন্দ শুনিনি, কিন্তু ছোটবাবু আমাকে দু’চক্ষে দেখতে পারেন না—দিনরাত গালাগালি করেন। কোন দোষ করিনে তবু—(চোখ মুছিয়া ফেলিয়া) সেদিন কেন তাঁকে জানাই নি, কেন নরেনবাবুকে তোমার ঘরে ডেকে এনেছিলুম,—তাই জবাব দিয়েছেন।
বিজয়া। (কঠিনস্বরে) তিনি কোথায়?
কালী। কাছারিঘরে বসে কাগজ দেখছেন।
বিজয়া। হুঁ। আচ্ছা দরকার নেই—এখন তুই কাজ করগে যা।
[কালীপদর প্রস্থান
[দয়াল প্রবেশ করিলেন]
দয়াল। তোমার কাছেই আসছিলাম মা!
বিজয়া। আসুন দয়ালবাবু, আপনার স্ত্রী ভাল আছেন ত?
দয়াল। আজ ভাল আছেন। নরেনবাবুকে চিঠি লিখতে, কাল বিকেলে এসে তিনি ওষুধ দিয়ে গেছেন। কি অদ্ভুত চিকিৎসা মা, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই পীড়া যেন বারো আনা আরোগ্য হয়ে গেছে।
বিজয়া। ভাল হবে না! আপনাদের সকলের কি সোজা বিশ্বাস ওঁর উপর!
দয়াল। সে কথা সত্যি। কিন্তু বিশ্বাস ত শুধু শুধু হয় না মা! আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি কিনা, মনে হয় ঘরে পা দিলেই সমস্ত ভাল হয়ে যাবে।
বিজয়া। তা হবে!
দয়াল। একটা কথা বলব মা—রাগ করতে পাবে না কিন্তু। তিনি ছেলেমানুষ সত্যি, কিন্তু যে-সব নামজাদা বিজ্ঞ চিকিৎসকের দল তোমার মিথ্যে চিকিৎসা করে টাকা আর সময় নষ্ট করলে, তাদের চেয়ে তিনি ঢের বেশী বিজ্ঞ—এ আমি শপথ করে বলতে পারি। আর একটা কথা মা, নরেনবাবু শুধু ওঁরই চিকিৎসা করে যাননি—আরও একজনের ব্যবস্থা করে গেছেন। (টেবিলের উপর একটুকরা কাগজ মেলিয়া) তোমাকে কিন্তু উপেক্ষা করতে দেব না, ওষুধটা একবার পরীক্ষা করে দেখতেই হবে বলে দিচ্চি।
বিজয়া। কিন্তু এ যে অন্ধকারে ঢিল ফেলা দয়ালবাবু—রুগী না দেখে prescription লেখা।
দয়াল। ইস, তাই বুঝি! কাল যখন তুমি তোমাদের বাগানের রেলিং ধরে দাঁড়িয়েছিলে—তখন ঠিক তোমার সুমুখের পথ দিয়েই যে তিনি হেঁটে গেছেন। তোমাকে ভাল করেই দেখে গেছেন—বোধ হয় অন্যমনস্ক ছিলে বলেই—
বিজয়া। তাঁর কি পরনে সাহেবী-পোশাক ছিল?
দয়াল। ঠিক তাই। দূর থেকে দেখলে ভুল হয়, বাঙালী বলে হঠাৎ চেনাই যায় না।
বিজয়া। (হাসিয়া) ওটা আপনার অত্যুক্তি দয়ালবাবু—স্নেহের বাড়াবাড়ি।
দয়াল। স্নেহ করি—খুবই করি সত্যি। তবু কথাটা আমার বাড়াবাড়ি নয় মা। অতবড় পণ্ডিত লোক, কিন্তু কথাগুলি যেমন মিষ্টি তেমনি শিশুর মত সরল। কিছুতে যেতে দিতে ইচ্ছে করে না, মনে হয় আরও কিছুক্ষণ ধরে রেখে দিই।
বিজয়া। ধরে রেখে দেন না কেন?
দয়াল। (হাসিয়া) সে কি হয় মা, তাঁর কত কাজ, কত পরিশ্রম তাঁকে করতে হয়। তবু গরীব বলে আমাদের ওপর কত দয়া। স্ত্রী রুগ্ন, তাঁকে দেখতে প্রায় ওঁকে আসতে হয়।
[বিলাস প্রবেশ করিল]
বিলাস। (বিজয়ার প্রতি) কেমন আছ আজ?
বিজয়া। ভালো আছি।
বিলাস। ভালো ত তেমন দেখায় না। (দয়ালের প্রতি) আপনি এখানে করছেন কি?
দয়াল। মাকে একবার দেখতে এলাম।
বিলাস। (টেবিলের উপর prescription-টার প্রতি দৃষ্টি পড়ায় হাতে তুলিয়ে লইয়া) prescription দেখচি যে। কার? (পরীক্ষা করিয়া) নরেনের নাম দেখচি যে! স্বয়ং ডাক্তারসাহেবের। কিন্তু এটা এল কি করে? (বিজয়া ও দয়াল উভয়েই নীরব)
বিলাস। শুনি না এল কি করে? ডাকে নাকি? হুঁ। ডাক্তার ত নরেন ডাক্তার? তাই বুঝি এদের ওষুধ খাওয়া হয় না; শিশির ওষুধ শিশিতেই পচে, তারপর ফেলে দেওয়া হয়? তা না হয় হলো—কিন্তু এই কলির ধন্বন্তরীটি কাগজখানি পাঠালেন কি করে? কার মারফতে? কথাটা আমার শোনা দরকার। (দয়ালের প্রতি) আপনি ত এতক্ষণ খুব lecture দিচ্ছিলেন—সিঁড়ি থেকেই গলা শোনা যাচ্ছিল—বলি, আপনি কিছু জানেন? একেবারে যে ভিজে বেড়ালটি হয়ে গেলেন। বলি জানেন কিছু?
দয়াল। আজ্ঞে হাঁ।
বিলাস। ওঃ—তাই বটে! কোথায় পেলেন সেটাকে?
দয়াল। আজ্ঞে তিনি আমার স্ত্রীকে দেখতে আসেন কিনা—আর বেশ সুন্দর চিকিৎসা করেন—তাই আমি বলেছিলুম, মা বিজয়ার জন্যে যদি একটা—
বিলাস। তাই বুঝি এই ব্যবস্থাপত্র? আপনি দাঁড়িয়েছেন মুরুব্বি? হুঁ। (একমুহূর্ত পরে) আপনাকে গেল বছরের হিসাবটা সারতে বলেছিলুম,—সেটা সারা হয়েছে?
দয়াল। আজ্ঞে, দু’দিনের মধ্যেই সেরে ফেলব।
বিলাস। হয়নি কেন?
দয়াল। বাড়িতে ভারী বিপদ যাচ্ছিল—নিজ হাতে রাঁধতে হতো—আসতেই পারিনি।
