বিজয়া। পরেশকে কেমন দেখলেন, বললেন না?
নরেন। বিশেষ ভাল না। ওর খুব বেশী জ্বর, পিঠে গলায় বেদনা, এদিকে বসন্ত হচ্ছে, মনে হয় পরেশেরও বসন্ত হতে পারে।
বিজয়া। (সভয়ে) বসন্ত হবে কেন?
নরেন। হবে কেন সে অনেক কথা। কিন্তু ওর লক্ষণ দেখলে ওই মনে হয়। যাই হোক, ওর মাকে একটু সাবধান হতে বলবেন, আমি কাল কিংবা পরশু টাকা নিয়ে আসব, অবশ্য যদি পাই। তখন ওকে দেখে যাব।
বিজয়া। (ব্যাকুল বিবর্ণমুখে) নইলে আসবেন না? আমারও নিশ্চয় বসন্ত হবে নরেনবাবু। কাল রাত্তিরে আমারও খুব জ্বর—আমারও গায়ে ভয়ানক ব্যথা।
নরেন। (হাসিয়া) ব্যথা ভয়ানক নয়। ভয়ানক হয়েছে সে আপনার ভয়। বেশ ত জ্বরই যদি একটু হয়ে থাকে তাতেই বা কি? এদিকে বসন্ত দেখা দিয়েছে বলেই যে গ্রামসুদ্ধ সকলেরই হবে তার মানে নেই।
বিজয়া। হলেই বা আমার কে আছে? আমাকে দেখবে কে?
নরেন। দেখবার লোক অনেক পাবেন সে ভাবনা নেই, কিন্তু কিছু হবে না আপনার।
বিজয়া। না হলেই ভালো, কিন্তু সত্যিই আমি বড় অসুস্থ। তবু সকালে উঠে সব জোর করে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে একটু বাইরে যাচ্ছিলুম।
নরেন। না, আজ কোথাও যাওয়া চলবে না, চুপ করে শুয়ে থাকুন গে। কাল আবার আসব।
বিজয়া। টাকা না পেলেও আসবেন ত?
নরেন। না পেলেও আসবো।
বিজয়া। ভুলে যাবেন না?
নরেন। না। আমি অন্যমনস্ক প্রকৃতির লোক হলেও আপনার অসুখের কথাটা ভুলব না নিশ্চয়।
[কালীপদ প্রবেশ করিল]
কালীপদ। মা, খাবার দেওয়া হয়েছে।
বিজয়া। (নলিনীকে দেখাইয়া) এঁরও দেওয়া হয়েছে?
কালীপদ। হাঁ, মা, দু’জনেরই।
বিজয়া। আমি দেখি গে কি দিলে। আর যদি কখনো সময় না পাই আজ কাছে বসে আপনাদের দু’জনের আমি খাওয়া দেখব।
নলিনী। মিস রায়, এ কি বলছেন? ভয় কিসের?
বিজয়া। কি জানি আজ আমার কেবলি ভয় করচে। মনে হচ্ছে অসুখ আমার খুব বেশী বেড়ে উঠবে। নরেনবাবু, আজকের দিনটা থাকুন না আপনি?
নরেন। বেশ, আমি রাত্রের ট্রেনেই যাব, কিন্তু আমার কথা শুনতে হবে। নড়াচড়া করতে পাবেন না, এখুনি গিয়ে শুয়ে পড়া চাই।
বিজয়া। না সে আমি শুনব না। আপনাদের খাওয়া আজ আমি দেখবই। তারপরে গিয়ে শোবো।
[প্রস্থান। সঙ্গে সঙ্গে কালীপদও চলিয়া গেল
নলিনী। কি ব্যাকুল মিনতি! ডক্টর মুখার্জী, আমি যাব, কিন্তু আপনি আজ থাকুন। যাবেন না।
নরেন। এবেলা আছি। মামার বাড়ি থেকে যাবার আগে সন্ধ্যাবেলায় আর একবার দেখে যাব। জ্বরটা বেশী, ভয় হয় ভোগাবে।
নলিনী। ভোগাবে? তবে তো বড় মুশকিল?
নরেন। তাই ত মনে হচ্চে।
নলিনী। চমৎকার মেয়েটি। আপনার প্রতি ওর কি বিশ্বাস! মনে হয় না যে এ আপনাকে ঘরছাড়া করতে পারে।
নরেন। (হাসিয়া) পেরেছে ত দেখা গেল। বড়লোকের মেয়ে, গরীবের কথা বড় ভাবে না। বাড়ি ত গেলই, শেষ সম্বল microscope-টি যখন দায়ে পড়ে বেচতে হলো তখন সিকি দামে দুশো টাকা মাত্র দিয়ে স্বচ্ছন্দে কিনে নিলেন—সঙ্গে উপরি বকশিশ দিলেন ঠক জোচ্চোর প্রভৃতি বিশেষণ। আজ সেইটেই যখন দুশো টাকা দিয়ে ফিরিয়ে নিতে চাইলুম, অনায়াসে বললেন অত কমে হবে না—যাচাই করিয়ে দেখেছেন দাম চারশো টাকার কম নয়—সুতরাং আরও দুশো চাই। দয়া-মায়া আছে তা মানতেই হবে।
নলিনী। বিশ্বাস হয় না ডক্টর মুখার্জী—কোথাও হয়ত মস্ত ভুল আছে।
নরেন। ভুল আছে? না, কোথাও নেই মিস নলিনী—সমস্ত জলের মত পরিষ্কার।
নলিনী। (মাথা নাড়িয়া) এমন কিন্তু হতেই পারে না ডক্টর মুখার্জী। মেয়েরা এত বড় মিনতি তাকে করতেই পারে না—এমন করে তার পানে যে তারা চাইতেই পারে না।
নরেন। তা হবে। মেয়েদের কথা আপনিই ভাল জানেন, কিন্তু আমি যেটুকু জানতে পেলুম তা ভারী কঠোর, ভারী কঠিন।
[কালীপদ প্রবেশ করিল]
কালীপদ। চলুন। মা ডেকে পাঠালেন, আপনাদের খাবার দেওয়া হয়েছে।
নরেন। চলো যাই।
[সকলের প্রস্থান
[দয়াল ও রাসবিহারীর কথা কহিতে কহিতে প্রবেশ]
রাস। হাঁ, এই মন্দির-প্রতিষ্ঠা নিয়ে, অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করে, বিলাস যে এতটা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল তা কেউ বুঝতে পারেনি। সেদিন তার চেহারা দেখে ভয় পেয়ে বললুম, বিলাস হয়েছে কি? এমন করচ কেন? ও বললে, বাবা, আজ আমি অন্যায় করেছি—দয়ালবাবুকে কঠিন কথা বলেছি। বিজয়াকেও বলেছি।—সেও আমাকে বলেছে—কিন্তু সেজন্যে নয়, দয়ালবাবুকে আমি কি বলতে কি বলে ফেলেছি, হয়ত রাগ করে তিনি আর আমাদের আচার্যের কাজ করবেন না। এই বলে তার দু’চোখ বেয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল। আমি বললুম ভয় নেই বাবা, অপরাধ যদি হয়েই থাকে তবে এই অনুতাপের অশ্রুতেই সমস্ত ধুয়ে গেল। (এই বলিয়া তিনি ক্ষণকাল মুদিতনেত্রে অধোমুখে থাকিয়া) আর তাই ত হলো দয়ালবাবু, আপনার উদারতার কথা বুঝতে পেরে বিলাস আজ আমায় বললে, বাবা, সেদিন তুমি সত্যিই বলেছিলে দয়ালবাবুর সমস্ত চিত্ত ভগবৎপ্রেমে পরিপূর্ণ, হৃদয় করুণায় মমতায় বিশ্বাসে ভরা, সেখানে আমাদের মত ছেলেমানুষের কথা প্রবেশ করতে পারে না।
দয়াল। সেদিনের কথা আমি সত্যিই কিছু মনে রাখিনি আপনি বলবেন বিলাসবাবুকে।
রাস। বাবু নয়। বাবু নয়। আপনার কাছে শুধু সে বিলাস—বিলাসবিহারী। কে যায় ওখানে? কালীপদ?
[কালীপদ প্রবেশ করিল]
রাস। মা বিজয়া এখন কি তাঁর লাইব্রেরি-ঘরে?
কালীপদ। না, তিনি শোবার ঘরে শুয়ে পড়েছেন—তাঁর জ্বর।
রাস। জ্বর? জ্বর বললে কে?
কালীপদ। ডাক্তারবাবু।
রাস। কে ডাক্তারবাবু?
