বিজয়া। নরেনবাবুর বড় রাত হয়ে যাচ্চে কাকাবাবু।
রাস। ও হাঁ। বেশ, ওকে ডেকে পাঠিয়ে তাই বলে দাও, দুশো টাকাই দেওয়া হবে।
বিলাস। টাকা কি খোলামকুচি? একজনের খেয়াল চরিতার্থ করতে দুশো টাকা নষ্ট করতে হবে? তুমি তাতেই রাজি হচ্চো?
রাস। বিলাস, ক্ষুণ্ণ হ’য়ো না বাবা। তোমাদের অনেক আছে—যাক দুশো। নিয়ে যাক ও দুশো টাকা। মা বিজয়া আমার দয়াময়ী, দুঃখীকে সামান্য ক’টা টাকা যদি সাহায্য করতেই চান বিরক্ত হওয়া উচিত নয়। কিন্তু আর নয় বাবা, অন্ধকার হয়ে আসছে, চল। কাল সকালে অনেক কাজ অনেক ঝঞ্ঝাট পোহাতে হবে। চল যাই। আসি মা বিজয়া।
[রাসবিহারী নিষ্ক্রান্ত হইলেন। বিলাস বিজয়ার প্রতি একটা ক্রুদ্ধ
কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া পিতার অনুসরণ করিল]
বিজয়া। (ক্ষণকাল স্তব্ধ থাকিয়া) কালীপদ?
[নেপথ্যে ‛যাই মা’ বলিয়া কালীপদ প্রবেশ করিল]
কালীপদ, নরেনবাবু বোধ হয় বাইরে কোথাও বসে আছেন। তাঁকে ডেকে নিয়ে এসো।
[কালীপদ মাথা নাড়িয়া প্রস্থান করিল
নরেন। (প্রবেশ করিয়া) এটা আমি সঙ্গে নিয়েই যাচ্ছি। কিন্তু আজকের দিনটা আপনার বড় খারাপ গেল। অনেক অপ্রিয় কথা আমি নিজেও আপনাকে বলেছি। ওঁরাও বলে গেলেন। কি জানি কার মুখ দেখে আজ আপনার প্রভাত হয়েছিল!
বিজয়া। তার মুখ দেখেই যেন আমার প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে নরেনবাবু! বাইরে দাঁড়িয়ে আপনি সমস্ত কথা নিজেই শুনতে পেয়েছেন বলেই বলছি যে, আপনার সম্বন্ধে তাঁরা যে সব অসম্মানের কথা বলে গেলেন সে তাঁদের অনধিকার-চর্চা। কাল আমি সে কথা তাঁদের বুঝিয়ে দেব।
নরেন। তার আবশ্যক কি? এ-সব জিনিসের ধারণা নেই বলেই তাঁদের আমার উপর সন্দেহ জন্মেছে—নইলে আমাকে অপমান করায় তাঁদের লাভ নেই কিছু। কিন্তু রাত হয়ে যাচ্ছে, আমি যাই এবার।
বিজয়া। কাল কি পরশু একবার আসতে পারবেন না?
নরেন। কাল কি পরশু? কিন্তু তার ত আর সময় হবে না। কাল আমাকে কলকাতায় যেতে হবে। সেখানে দু’-তিনদিন থেকেই এটা বিক্রি করে আমি চলে যাব। আর বোধ করি দেখা হবে না।
[বিজয়ার দুই চক্ষু জলে ভরিয়া গেল, সে না পারিল
মুখ তুলিতে, না পারিল কথা কহিতে।]
নরেন। (একটু হাসিয়া) আপনি নিজে এত হাসাতে পারেন, আর আপনারই এত সামান্য কথায় রাগ হয়! আমিই বরঞ্চ একবার রেগে উঠে আপনাকে মোটাবুদ্ধি প্রভৃতি কত কি বলে ফেলেছি। কিন্তু তাতে ত রাগ করেন নি, বরঞ্চ মুখ টিপে হাসছিলেন দেখে আমার আরও রাগ হচ্ছিল। কিন্তু দেখা যদি আর আমাদের নাও হয় আপনাকে আমার সর্বদা মনে পড়বে।
[বিজয়া মুখ ফিরাইয়া অশ্রু মুছিতে গিয়া নরেনের চোখে পড়িয়া
গেল, সে ক্ষণকাল সবিস্ময়ে নিরীক্ষণ করিয়া]
নরেন। একি! আপনি কাঁদছেন যে! না—না, এটা নিতে পারলেন না বলে কোনো দুঃখ করবেন না। কলকাতায় আমি সত্যিই বেচতে পারব, আপনি ভাববেন না।
[এই বলিয়া সে বাক্সটি ধীরে ধীরে হাতে তুলিয়া লইল।]
বিজয়া। না আমি দেব না, ওটা আমার। রেখে দিন।
[কান্না চাপিতে না পারিয়া টেবিলের উপর মাইক্রস্কোপটির উপর মুখ গুঁজিয়া পড়িয়া
কাঁদিতে লাগিল। নরেন হতবুদ্ধিভাবে একটু দাঁড়াইয়া
ধীরে ধীরে চলিয়া গেল।]
বিজয়া – ২.২
দ্বিতীয় দৃশ্য
গ্রাম্যপথ
[আমন্ত্রিত পুরুষ ও মহিলারা বিজয়ার গৃহ কৃষ্ণপুর গ্রামের অভিমুখে ধীরে ধীরে গল্প করিতে করিতে চলিয়াছেন। রঙ্গমঞ্চে সকলেই একত্রে প্রবেশ করিবেন না, দুইজনে প্রবেশ করিয়া বাহির হইয়া গেলে আবার দুই-তিনজন প্রবেশ করিবেন]
১ম। দয়ালবাবুই আচার্য হবেন, এ কি স্থির হয়েছে?
২য়। হাঁ স্থির বৈ কি। তিনি কালই এসে পৌঁচেছেন শুনতে পেলাম।
১ম। কিন্তু তাঁর উপাসনা ত শুনেছি তেমন হৃদয়গ্রাহী নয়। ঢাকার যোগেশবাবুর পিতৃশ্রাদ্ধে সান্ধ্য-উপাসনাটা তাই আমাকেই করতে হলো। শরীর অসুস্থ, সর্দিতে গলা ভাঙ্গা, বার বার অস্বীকার করলাম, কিন্তু কেহ ছাড়লেন না। কিন্তু করুণাময়ের কি অপার করুণা! এই দীনহীনের উপাসনা শুনে সেদিন উপস্থিত সকলকেই ঘন ঘন অশ্রুপাত করতে হলো। মহিলাদের ত কথাই নেই। ভাবাবেশে তাঁরা প্রায় বিহ্বল হয়ে পড়লেন।
২য়। তাতে সন্দেহ কি? আপনার উপাসনা যে এক স্বর্গীয় বস্তু!
১ম। কিন্তু ত্রিশ টাকার কমে ত দয়ালবাবুর সংসারযাত্রা নির্বাহ হতে পারে না।
২য়। ত্রিশ টাকা কি বলছেন প্রভাতবাবু? বনমালীবাবুর এস্টেটে তাঁকে সামান্য কি একটু কাজও করতে হবে, শুনেছি সত্তর টাকা করে দেওয়া হবে। বাড়িভাড়া ত লাগবেই না।
১ম। বলেন কি? সত্তর টাকা! ঈশ্বর তাঁর মঙ্গল করুন!
২য়। তা ছাড়া বনমালীবাবুর মেয়েটি শুনেছি যেমন সুশীলা তেমনি দয়াবতী। প্রসন্ন হলে একশো টাকা হওয়াও বিচিত্র নয়।
১ম। এক—শো! পল্লীগ্রামে ত কোন খরচই নেই! একশো! ঈশ্বর তাঁর মঙ্গল করুন। বড় সুসংবাদ। একটু দ্রুত চলুন। তাঁর প্রাতঃকালীন উপাসনায় যেন যোগ দিতে পারি।
[প্রস্থান]
[৩য়, ৪র্থ ও ৫ম ভদ্রব্যক্তির প্রবেশ। সঙ্গে জন-দুই মহিলা]
৩য়। এ বিবাহ যদি ঘটে বনমালীবাবুর কন্যা ভাগ্যবতী—এ কথা বলতেই হবে। বিলাসবিহারী অতি সুপাত্র। যেমন বলবান, তেমনি উদ্যমশীল। যেমন ভগবদ্ভক্তি, তেমনি স্বধর্মনিষ্ঠা। সমাজের উদীয়মান স্তম্ভস্বরূপ বললেও অত্যুক্তি হয় না। আধুনিক কালের শিথিল-বিশ্বাস ভ্রষ্টাচারী বহু যুবকের তিনি দৃষ্টান্তস্থল।
৪র্থ। বনমালীবাবুর সম্পত্তি কি বেশ বড়?
