বিজয়া। শুনছি বৈ কি।
নরেন। কি শুনলেন, বলুন ত?
বিজয়া। বাঃ, একদিনেই নাকি শুনে শেখা যায়? আপনিই বুঝি একদিনে শিখেছিলেন?
নরেন। (হোহো করিয়া হাসিয়া) কিন্তু আপনার যে একশো বছরেও হবে না। তা ছাড়া এ-সব আপনাকে শেখাবেই বা কে?
বিজয়া। (মুখ টিপিয়া হাসিয়া) কেন আপনি। নইলে এই ভাঙ্গা কলটা আমি ছাড়া আর কে নেবে?
নরেন। আপনার নিয়েও কাজ নেই, আমি শেখাতেও পারব না।
বিজয়া। পারতেই হবে আপনাকে। জিনিস বিক্রি করে যাবেন আপনি, আর শেখাতে আসবে আর একজন? না হয় ত আর এক কাজ করুন। শুনেছি আপনি ভাল ছবি আঁকতে পারেন। তাই আমাকে শিখিয়ে দিন। এ ত শিখতে পারব।
নরেন। (উত্তেজিত হইয়া) তাও না। যে-বিষয়ে মানুষের নাওয়া-খাওয়া জ্ঞান থাকে না—তাতেই যখন মন দিতে পারলেন না—মন দেবেন ছবি আঁকতে? কিছুতেই না।
বিজয়া। তা হলে ছবি আঁকতেও শিখতে পারবো না?
নরেন। না, আপনি যে কিছুই মন দিয়ে শোনেন না!
বিজয়া। (ছদ্ম-গাম্ভীর্যের সহিত) কিছুই না শিখতে পারলে কিন্তু সত্যিই মাথায় শিং বেরোবে।
নরেন। (উচ্চহাস্য করিয়া) সেই হবে আপনার উচিত শাস্তি।
বিজয়া। (মুখ ফিরাইয়া হাসি গোপন করিয়া) তা বৈ কি! আপনার শেখবার ক্ষমতা নেই তাই কেন বলুন না। কিন্তু চাকরেরা কি করছে? আলো দেয় না কেন? একটু বসুন, আমি আলো দিতে বলে আসি।
[বিজয়া দ্রুতপদে উঠিয়া দ্বারের পর্দা সরাইয়া অকস্মাৎ যেন ভূত দেখিয়া পিছাইয়া
আসিল। পিতা-পুত্র রাসবিহারী ও বিলাসবিহারী প্রবেশ করিয়া হাতের কাছে
দু’খানা চেয়ার অধিকার করিয়া বসিলেন। বিলাসের মুখের
উপর যেন এক ছোপ কালি মাখানো, এমনি বিশ্রী চেহারা।
বিজয়া আপনাকে সংবরণ করিয়া]
বিজয়া। আপনি কখন এলেন কাকাবাবু!
রাস। (শুষ্কহাস্যে) প্রায় আধঘণ্টা হলো এসে ঐ সামনের বারান্দায় বসে। কিন্তু তুমি কথাবার্তায় বড় ব্যস্ত বলে আর ডাকলাম না। ঐ বুঝি সেই জগদীশের ছেলে? কি চায় ও?
বিজয়া। (মৃদুস্বরে) একটা microscope বিক্রি করে উনি চলে যেতে চান। তাই দেখাচ্ছিলেন।
বিলাস। (গর্জন করিয়া) microscope! ঠকাবার জায়গা পেলে না বুঝি!
[নরেন ধীরে ধীরে অন্য দ্বার দিয়া বাহির হইয়া গেল]
রাস। আহা, ও-কথা বলো কেন? তার উদ্দেশ্য ত আমরা জানিনে। ভালও ত হতে পারে। অবশ্য জোর করে কিছুই বলা যায় না—সেও ঠিক। তা সে যাই হোক গে ওতে আমাদের আবশ্যক কি? দূরবীন হলেও না হয় কখনো কালেভদ্রে দূরেটুরে দেখতে কাজে লাগতে পারে।
[আলো হাতে করিয়া কালীপদ প্রবেশ করিল]
রাস। কালীপদ, সেই বাবুটি বোধ করি ওদিকে কোথাও বসে অপেক্ষা করছে, তাকে বলে দাওগে—ঐ যন্ত্রটা আমরা কিনতে পারব না—আমাদের দরকার নেই। এসে নিয়ে চলে যাক।
বিজয়া। (ভয়ে ভয়ে) তাঁকে বলেছি আমি নেব।
রাস। (আশ্চর্য হইয়া) নেবে? কেন, ওতে প্রয়োজন কি?
[বিজয়া নীরব]
রাস। উনি দাম কত চান?
বিজয়া। দুশো টাকা।
রাস। দুশো? দুশো টাকা চায়? বিলাস ত তাহলে নেহাত—কি বল বিলাস? কলেজে তোমাদের F. A.class-এ Chemistry তে এ-সব অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করেছ, দুশো টাকা একটা microscope এর দাম? এ ত কেউ কখনো শোনেনি। কালীপদ, যা ওকে নিয়ে যেতে বলে আয়। এ-সব ফন্দি এখানে খাটবে না।
বিজয়া। কালীপদ, তুমি তোমার কাজে যাও। তাঁকে যা বলবার আমি নিজেই বলব।
[কালীপদর প্রস্থান
বিলাস।(শ্লেষ করিয়া) কেন বাবা তুমি মিথ্যে অপমান হতে গেলে? ওঁর হয়ত এখনো কিছু দেখিয়ে নিতে বাকী আছে। (রাসবিহারী নীরব) আমরাও অনেক রকম microscope দেখেছি বাবা, কিন্তু হোহো করে হাসবার বিষয় কোনটার মধ্যে পাইনি।
[বিজয়া তাহার দিকে সম্পূর্ণ পিছন ফিরিয়া রাসবিহারীকে]
বিজয়া। আমার সঙ্গে কি আপনার কোন বিশেষ কথা আছে কাকাবাবু?
রাস। (অলক্ষ্যে পুত্রের প্রতি ক্রুদ্ধ কটাক্ষ করিয়া ধীরভাবে) কথা আছে বৈ কি মা। কিন্তু কিনবে বলে কি ওকে সত্যিই কথা দিয়ে ফেলেছ? সে যদি হয়ে থাকে ত নিতেই হবে। দাম ওর যাই হোক তবু নিতে হবে। সংসারে ঠকা-জেতাটাই বড় কথা নয় বিজয়া, সত্যটাই বড়। সত্যভ্রষ্ট হতে ত তোমাকে আমি বলতে পারব না।
বিলাস। তাই বলে ঠকিয়ে নিয়ে যাবে?
রাস। যাক। নিক ও ঠকিয়ে। জগদীশের ছেলের কাছে এর বেশি প্রত্যাশা করো না বিলাস। কালীপদ গিয়ে বলে আসুক কাল এসে যেন কাছারি থেকে টাকাটা নিয়ে যায়।
বিজয়া। যা বলবার আমিই তাঁকে বলব। আর কারো বলার আবশ্যক নেই কাকাবাবু।
রাস। বেশ বেশ তাই বলো মা। বলে দিও ওর কোন ভয় নেই, দুশো টাকাই যেন নিয়ে যায়।
বিজয়া । রাত হয়ে যাচ্ছে, ওঁকে অনেক দূর যেতে হবে। কাল কি আপনার সঙ্গে কথা হতে পারে না কাকাবাবু?
রাস। বেশ ত মা কালই হবে। (প্রস্থানোদ্যম—সহসা ফিরিয়া) কিন্তু শুনেছ বোধ হয় তোমার মন্দিরের ভাবী আচার্য দয়ালবাবু আজ সকালেই এসে পড়েছেন—মন্দির-গৃহেই আছেন—আবার কাল সকালে আমাদের সমাজের মান্যব্যক্তি যাঁরা—যাঁদের সসম্মানে আমরা আমন্ত্রণ করেছি—তাঁরা আসবেন। তোমাদের উভয়কে তাঁদের কাছে আমি পরিচিত করিয়ে দেব। আর ক’টা দিনই বা বাঁচবো মা!
বিজয়া। (সবিস্ময়ে) তাঁরা সব কালই আসবেন? কৈ আমি ত কিছুই শুনিনি!
রাস। (সবিস্ময়ে) শোনোনি? তা হলে তাড়াতাড়িতে বলতে বোধ হয় ভুলে গেছি মা।
বুড়ো বয়সের দোষই এই।
বিজয়া। কিন্তু বড়দিনের ছুটির ত এখনো অনেক বিলম্ব কাকাবাবু!
রাস। বিলম্ব বলেই ভাবলাম শুভকর্মে দেরি আর করব না। বাড়িটা ত তাঁর মন্দিরের জন্যে মনে মনে তোমরা উৎসর্গই করেছ, শুধু অনুষ্ঠানই বাকী। যত শীঘ্র পারা যায় কর্তব্য সমাপন করাই উচিত। তাঁরাও যখন আসতে রাজী হলেন তখন পুণ্যকার্য ফেলে রাখতে মন চাইলে না। বল দিকি মা, এ কি ভাল করিনি?
