৩য়। বড়! অগাধ। যেমন জমিদারি তেমনি নগদ টাকা। একমাত্র কন্যার জন্যে বনমালী প্রভূত ঐশ্বর্য রেখে গেছেন। বিলাসের হাতে তা বহুগুণিত হবে আমি বললেম।
৫ম। কিন্তু শুনেচি যুবকটি একটু রূঢ়ভাষী।
৩য়। রূঢ়ভাষী নয়, স্পষ্টভাষী। সত্যের আদর তিনি জানেন। (১ম মহিলাটিকে ইঙ্গিতে দেখাইয়া) আমার স্ত্রীর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়ে বনমালীর কন্যা বিজয়াকে দিয়ে তিনি একশো টাকা সাহায্য করিয়েছিলেন। তাদের পুরস্কার-বিতরণের জন্যে আরও একশো টাকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
১ম মহিলা। আহা, পথের মধ্যে ও-সব কথা কেন?
৪র্থ। তা হলে বালিকা বিদ্যালয়ের দিকে ত তাঁদের বেশ ঝোঁক আছে?
৩য়। ঝোঁক? মুক্তহস্ত।
৪র্থ। মুক্তহস্ত? বেশ বেশ, মঙ্গলময় তাঁদের মঙ্গল-বিধান করুন।
[প্রস্থান।
[৬ষ্ঠ ও ৭ম ব্যক্তিদ্বয়ের প্রবেশ]
৬ষ্ঠ। না আর দূর নেই, আমরা এসে পড়েছি। হাঁ স্বর্গীয় বনমালীবাবুর সম্পত্তির সমস্ত ভার তাঁর বাল্যবন্ধু রাসবিহারীবাবুর পরেই। শুধু এখন নয়, বরাবরই এই ব্যবস্থা। বনমালীবাবু সেই যে দেশ ছেড়ে কলকাতায় এসেছিলেন আর ত কখনো ফিরে যাননি।
৭ম। তাঁর কন্যার সঙ্গে রাসবিহারীবাবুর পুত্রের বিবাহ কি স্থির হয়ে গেছে?
৬ষ্ঠ। স্থির বৈ কি। সম্বন্ধ কন্যার পিতা নিজেই করে যান, হঠাৎ মৃত্যু না হলে বিবাহ তিনিই দিয়ে যেতেন।
৭ম। এ বিবাহ কি গ্রামেই হবে?
৬ষ্ঠ। এই কথাই তো রাসবিহারীবাবু সেদিন নিজেই বললেন। শুধু তাই নয়, বিয়ের পর ছেলে-বৌ দেশেই বাস করবে, শহরের নানা প্রলোভনের মধ্যে তাদের পাঠাবেন না এই তাঁর সঙ্কল্প। অন্ততঃ, যতদিন বেঁচে আছেন। বিশেষতঃ, এত বড় সম্পত্তি দূর থেকে দেখাশোনা যায় না, নষ্ট হবার ভয় থাকে। নিজের জীবিতকালেই সমস্ত কাজকর্ম ছেলেকে শিখিয়ে দিয়ে যাবেন।
৭ম। অতিশয় সৎ বিবেচনা। বিবাহ হবে কবে।?
৬ষ্ঠ। ইচ্ছা যত শীঘ্র সম্ভব। মন্দির-প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই কথাবার্তা বোধ করি আপনাদের সম্মুখেই পাকা হয়ে যাবে। এ বড় সুখের বিবাহ অবিনাশবাবু। বর-বধূর পরে ভগবান তাঁর শুভহস্ত প্রসারিত করুন আমরা এই প্রার্থনা করি। চলুন, এই বাগানটার শেষেই বনমালীবাবুর বাড়ি।
৭ম। আপনি কি পূর্বে এখানে এসেছিলেন?
৬ষ্ঠ। (সহাস্যে) বহুবার। রাসবিহারীবাবু আমার অনেককালের বন্ধু। তিনি পত্রে জানিয়েছেন, নূতন মন্দির-গৃহটি আছে নদীর ওপারে—একটু দূরে। আমাদের থাকার জায়গাও সেইখানেই নির্দিষ্ট হয়েছে, কিন্তু বিজয়ার ইচ্ছে আজ সকালেই একটি ছোট অনুষ্ঠান তাঁর গৃহেই সম্পন্ন হয় এবং পরে সে-বাড়িতে যাই।
৭ম। উওম প্রস্তাব। চলুন, আমাদের হয়ত বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে।
[প্রস্থান
বিজয়া – ২.৩
তৃতীয় দৃশ্য
বিজয়ার বাড়ির নীচে হলঘর
[বেলা পূর্বাহ্ন। বিজয়ার অট্টালিকার নীচের বড় ঘরটি ফুল-লতা-পাতা দিয়া কিছু কিছু সাজানো হইয়াছে, মাঝখানে দাঁড়াইয়া রাসবিহারী ও বিলাসবিহারী এই-সকল পরীক্ষা করিতেছিলেন, এমন সময়ে সদ্যসমাগত অতিথিগণ একে একে প্রবেশ করিলেন]
রাসবিহারী। (বদ্ধাঞ্জলিপূর্বক) স্বাগতম্! স্বাগতম্! আজ শুধু এই গৃহ নয়, আজ আমাদের সমস্ত গ্রামখানি আপনাদের চরণধূলিতে চরিতার্থ হলো। আজ আমি ধন্য। আপনার আসন গ্রহণ করুন।
১ম। আমরাও তেমনি ধন্য হয়েছি রাসবিহারীবাবু, এমন পুণ্যকর্মে আমন্ত্রিত হয়ে যোগ দিতে পারা জীবনের সৌভাগ্য।
রাস। পথে কোন ক্লেশ হয়নি ত?
সকলে। না না, কিছুমাএ না। কোন ক্লেশ হয়নি।
রাস। হবার কথাও নয় যে। এ যে তাঁর সেবা তাঁর কর্ম নিয়েই আপনাদের আগমন,—মানবজাতির পরম কল্যাণের জন্যই ত সকলে সমবেত হয়েছি।
১ম ব্যক্তি। ওঁ স্বস্তি! ওঁ স্বস্তি! ওঁ স্বস্তি!
রাস। স্বর্গগত বনমালীর কন্যা বিজয়া এবং তাঁর ভাবী জামাতা বিলাসবিহারী—এ মঙ্গল অনুষ্ঠান তাঁদেরই। আমি কেউ নয়—কিছুই নয়। শুধু চোখে দেখে পুণ্য সঞ্চয় করে যাব এই আমার একমাত্র বাসনা। বাবা বিলাস, মা বিজয়া বুঝি এখনও খবর পাননি। কালীপদকে ডেকে বলে দাও পূজনীয় অতিথিরা পৌঁচেছেন।
বিলাস। কিন্তু খবর পাওয়া তাঁর উচিত ছিল।
[বিলাসের প্রস্থান
২য় ব্যক্তি। শুনেছি দয়ালবাবু ইতিপূর্বেই এসেচেন, কৈ তাঁকে ত—
রাস। দুর্ভাগ্যক্রমে এসেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। আজ ভাল আছেন। তিনি এলেন বলে।
১ম ব্যক্তি। আচার্যের কাজ ত?—
রাস। হাঁ তিনিই সম্পাদন করবেন স্থির হয়েছে—এই যে নাম করতেই তিনি—আসুন, আসুন, দয়ালবাবু আসুন। দেহটা সুস্থ হয়েছে?
[দয়ালচন্দ্রের প্রবেশ ও সকলকে অভিবাদন]
শরীর দুর্বল, নিজে গিয়ে সংবাদ নিতে পারিনি, কিন্তু ওঁর কাছে (ঊর্ধ্বমুখে চাহিয়া) নিরন্তর প্রার্থনা করছি আপনি শীঘ্র নিরাময় হন, শুভকর্মে যেন বিঘ্ন না ঘটে।
[ইহার পরে কিয়ৎকাল ধরিয়া সকলের কুশল-প্রশ্নাদি ও প্রীতিসম্ভাষণ
চলিল। সকলে পুনরায় উপবেশন করিলে]
রাস। আমার আবাল্য সুহৃদ বনমালী আজ স্বর্গগত। ভগবান তাঁকে অসময়ে আহ্বান করে নিলেন—তাঁর মঙ্গল ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার নালিশ নেই, কিন্তু তিনি যে আমাকে কি করে রেখে গেছেন আমার বাইরে দেখে সে আপনারা অনুমান করতে পারবেন না। আমাদের উভয়ের সাক্ষাতের ক্ষণটি যে প্রতিদিন নিকটবর্তী হয়ে আসছে সে আভাস আমি প্রতিমুহূর্তেই পাই। তবুও সেই পরমব্রহ্মপদে এই প্রার্থনা আমার, সেই দিনটিকে যেন তিনি আরও সন্নিকটবর্তী করে দেন। (রাসবিহারী জামার হাতায় চোখটা মুছিয়া আত্মসমাহিতভাবে রহিলেন। উপস্থিত অভ্যাগতরাও তদ্রূপ করিলেন। আবার কিছুকাল চুপ করিয়া থাকিয়া) বনমালী আমাদের মধ্যে আজ নেই—তিনি চলে গেছেন; কিন্তু আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাই, ওই তিনি মৃদু মৃদু হাস্য করছেন। (সকলেই চোখ বুজিলেন। এই সময় বিজয়া ও বিলাস প্রবেশ করিলেন। বিজয়ার মুখের উপর বিষাদ ও বেদনার চিহ্ন ঘনীভূত হইয়া উঠিয়াছে তাহা স্পষ্ট দেখা যায়) ওই তাঁর একমাত্র কন্যা বিজয়া, পিতার সর্বগুণের অধিকারিণী! আর ঐ আমার পুত্র বিলাসবিহারী, কর্তব্যে কঠোর, সত্যে নির্ভীক। এঁরা বাইরে এখনো আলাদা হলেও অন্তরে—হাঁ আরও একটি শুভদিন আসন্ন হয়ে আসছে, যেদিন আবার আপনাদের পদধূলির কল্যাণে এঁদের সম্মিলিত নবীন জীবন ধন্য হবে।
