বিজয়া। না। এবার ঝাপসার বদলে ধোঁয়া খুব গাঢ় হয়েছে।
নরেন। গাঢ় হয়েছে? তা কি করে হবে?
বিজয়া। (মুখ তুলিয়া) সে আমি কি করে জানব? ধোঁয়া দেখলে কি আগুন দেখছি বলব?
নরেন। তাই কি আমি বলছি? এই স্ক্রুটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের চোখের মত করে নিন না? এতে শক্তটা আছে কোন্খানে?
[বিজয়া কলে চোখ পাতিয়া হাত দিয়া স্ক্রু ঘুরাইতেছিল—নরেন ব্যস্ত হইয়া]
নরেন। আহা-হা করেন কি? কত ঘুরোচ্ছেন,—এ কি চরকা? দাঁড়ান, আমি ঠিক করে দিই। এইবার দেখুন (বিজয়া পুনরায় দেখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল) কেমন, পেলেন দেখতে?
বিজয়া। না।
নরেন। না কেন? বেশ ত দেখা যাচ্ছে—পেলেন দেখতে?
বিজয়া। না।
নরেন। আপনার পেয়েও কাজ নেই। এমন মোটাবুদ্ধি আমি জন্মে দেখিনি।
বিজয়া। মোটাবুদ্ধি আমার, না আপনি দেখাতে জানেন না?
নরেন। (অনুতপ্ত-কণ্ঠে) আর কি করে দেখাব বলুন। আপনার বুদ্ধি কিছু আর সত্যিই মোটা নয়, কিন্তু আমার নিশ্চয় বোধ হচ্ছে আপনি মন দিচ্ছেন না। আমি বকে মরছি, আর আপনি মিছিমিছি ওটাতে চোখ রেখে মুখ নীচু করে হাসছেন।
বিজয়া। কে বললে আমি হাসছি?
নরেন। আমি বলছি।
বিজয়া। আপনার ভুল।
নরেন। আমার ভুল? আচ্ছা বেশ। যন্ত্রটা ত আর ভুল নয়, তবে কেন দেখতে পেলেন না?
বিজয়া। যন্ত্রটা আপনার খারাপ।
নরেন। (বিস্ময়ে) খারাপ! আপনি জানেন এরকম powerful microscope এখানে বেশী লোকের নেই? এমন বড় এবং স্পষ্ট দেখাতে—
[বলিয়া স্বচক্ষে একবার যাচাই করিয়া লইবার অতি ব্যগ্রতায়
ঝুঁকিতে গিয়া দু’জনের মাথা ঠুকিয়া গেল]
বিজয়া। উঃ। (মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে) মাথা ঠুকে দিলে কি হয় জানেন? শিং বেরোয়।
নরেন। শিং বেরুলে আপনার মাথা থেকেই বেরুনো উচিত।
বিজয়া। তা বৈ কি! এই পুরানো ভাঙ্গা microscope-কে ভাল বলিনি বলে—আমার মাথাটা শিং বেরুবার মত মাথা।
নরেন। (শুষ্ক হাসি হাসিয়া) আপনাকে সত্যি বলছি এটা ভাঙ্গা নয়। আমার কিছু নেই বলেই আপনার সন্দেহ হচ্ছে—আমি ঠকিয়ে টাকা নেবার চেষ্টা করছি, কিন্তু আপনি পরে দেখবেন।
বিজয়া। পরে দেখে আর কি করব বলুন? তখন আপনাকে আমি পাব কোথায়?
নরেন। (তিক্তস্বরে) তবে কেন বললেন আপনি নেবেন? কেন এতক্ষণ মিথ্যে কষ্ট দিলেন? আমার কলকাতা যাওয়া আজ আর হলো না।
বিজয়া। (গম্ভীরভাবে) আপনিই বা কেন না বললেন এটা ভাঙ্গা!
নরেন। (মহাবিরক্ত হইয়া) একশোবার বলছি ভাঙ্গা নয়, তবু বলবেন ভাঙ্গা? (ক্রোধ সংবরণ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া) আচ্ছা তাই ভালো! আমি আর তর্ক করতে চাইনে। এটা ভাঙ্গাই বটে। কিন্তু সবাই আপনার মত অন্ধ নয়। আচ্ছা চললুম।
[যন্ত্রটা বাক্সের মধ্যে পুরিবার উপক্রম করিল]
বিজয়া। (গম্ভীরভাবে) এখুনি যাবেন কি করে? আপনাকে যে খেয়ে যেতে হবে!
নরেন। না তার দরকার নেই।
বিজয়া। কে বললে নেই?
নরেন। কে বললে? আপনি মনে মনে হাসছেন? আমাকে কি উপহাস করছেন?
বিজয়া। আপনাকে কিন্তু নিশ্চয় খেয়ে যেতে হবে। একটু বসুন আমি এখুনি আসছি। (বিজয়া বাহির হইয়া গেল। নরেন microscope-টা বাক্সের মধ্যে পুরিয়া টিপয় হইতে নামাইয়া রাখিল। বিজয়া স্বহস্তে খাবারের থালা এবং কালীপদর হাতে চায়ের সরঞ্জাম দিয়া ফিরিয়া আসিল।) এর মধ্যেই ওটা বন্ধ করে ফেলেছেন? আপনার রাগ ত কম নয়!
নরেন। (উদাসকণ্ঠে) আপনি নেবেন না তাতে রাগ কিসের? শুধু খানিকক্ষণ বকে মরলুম এই যা।
বিজয়া। (থালাটা টেবিলের উপর রাখিয়া) তা হতে পারে। কিন্তু যেটুকু বকেছেন, সেটুকু নিছক নিজের জন্যে। একটা ভাঙ্গা জিনিস গছিয়ে দেবার মতলবে। আচ্ছা, খেতে বসুন আমি চা তৈরি করে দিই। (নরেন সোজা বসিয়া রহিল) আচ্ছা। আমিই না হয় নেব, আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে না। আপনি খেতে আরম্ভ করুন।
নরেন। আপনাকে দয়া করতে ত আমি অনুরোধ করিনি।
বিজয়া। সেদিন কিন্তু করেছিলেন। যেদিন মামার হয়ে পূজোর সুপারিশ করতে এসেছিলেন।
নরেন। সে পরের জন্যে, নিজের জন্যে নয়। এ অভ্যাস আমার নেই।
বিজয়া। তা সে যাই হোক, ওটা কিন্তু আর আপনার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া চলবে না। এখানেই থাকবে। এবার খেতে বসুন।
নরেন। এ কথার মানে?
বিজয়া। মানে একটা কিছু আছে বৈ কি?
নরেন। (ক্রুদ্ধ হইয়া) সেইটে কি তাই আমি আপনার কাছে শুনতে চাইছি। আপনি কি ওটি আটকে রাখতে চান? এও কি বাবা আপনার কাছে বাঁধা রেখেছিলেন? আপনি ত দেখছি তা হলে আমাকেও আটকাতে পারেন, বলতে পারেন বাবা আমাকেও আপনার কাছে বাঁধা দিয়ে গেছেন?
বিজয়া। (আরক্তমুখে ঘাড় ফিরাইয়া) কালীপদ, তুই দাঁড়িয়ে কি করছিস? পান নিয়ে আয়। (কালীপদ চায়ের সরঞ্জাম টেবিলে রাখিয়া চলিয়া গেল) নিন আর ঝগড়া করবেন না—এবার খেয়ে নিন।
[নরেন নিঃশব্দে গম্ভীরমুখে আহার করিতে লাগিল]
নরেন। শুনুন।
বিজয়া। শুনব পরে। আগে পেট ভরে খান।
নরেন। অনেক ত খেলুম।
বিজয়া। আরও অনেক যে পড়ে রইল।
নরেন। তা বলে আমি কি করব? আর আমি পারব না।
বিজয়া। তা জানি, আপনার কোন কিছু পারবারই শক্তি নেই। আচ্ছা microscope দেখতে শিখে আমার কি লাভ হবে?
নরেন। (সবিস্ময়ে) দেখতে শিখে কি লাভ হবে?
বিজয়া। হাঁ, তাই ত। এ শেখায় লাভ যদি আমাকে বুঝিয়ে দিতে পারেন আমি খুশী হয়ে ওটা কিনব, তা যতই কেননা ভাঙ্গা হোক।
নরেন। কিনতে হবে না আপনাকে।
বিজয়া। বেশ ত বুঝিয়েই দিন না।
নরেন। দেখুন, আপনাকে দেখাতে চেয়েছিলুম—জীবাণুর গঠন। খালি চোখে ওদের দেখা যায় না—যেন অস্তিত্বই নেই। ওদের ধরা যায় শুধু ঐ যন্ত্রটার মধ্য দিয়ে। সৃষ্টি ও প্রলয়ের কত বড় শক্তি নিয়ে যে ওরা পৃথিবীময় ব্যাপ্ত হয়ে আছে—ওদের সেই জীবন-ইতিহাস—কিন্তু আপনি ত কিছুই শুনছেন না।
