বাঙলা ভিন্ন অন্য যেকোনো ভাষার চর্চা আমরা করি না কেন, সে ভাষার শব্দ বাঙলাতে ঢুকবেই। সংস্কৃত চর্চা এদেশে ছিল বলে বিস্তর সংস্কৃত শব্দ বাঙলায় ঢুকেছে, এখনও আছে বলে অল্পবিস্তর ঢুকছে, যতদিন থাকবে ততদিন আরও ঢুকবে বলে আশা করতে পারি। স্কুল-কলেজ থেকে যে আমরা সংস্কৃতচর্চা উঠিয়ে দিতে চাইনে তার অন্যতম প্রধান কারণ বাঙলাতে এখনও আমাদের বহু সংস্কৃত শব্দের প্রয়োজন, সংস্কৃত চর্চা উঠিয়ে দিলে আমরা অন্যতম প্রধান খাদ্য থেকে বঞ্চিত হব।
ইংরেজির বেলাতেও তাই বিশেষ করে দর্শন, নন্দনশাস্ত্র, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা ইত্যাদি জ্ঞান এবং ততোধিক প্রয়োজনীয় বিজ্ঞানেরও শব্দ আমরা চাই। রেলের ইঞ্জিন কী করে চালাতে হয়, সে সম্বন্ধে বাঙলাতে কোনও বই আছে বলে জানিনে, তাই এসব টেকনিকল শব্দের প্রয়োজন যে আরও কত বেশি সে সম্বন্ধে কোনও সুস্পষ্ট ধারণা এখনও আমাদের মনের মধ্যে নেই। সুতরাং ইংরেজি চর্চা বন্ধ করার সময় এখনও আসেনি।
একমাত্র আরবি-ফারসি শব্দের বেলা অনায়াসে বলা যেতে পারে যে, এই দুই ভাষা থেকে ব্যাপকভাবে আর নতুন শব্দ বাঙলাতে ঢুকবে না। পশ্চিম বাঙলাতে আরবি-ফারসির চর্চা যাব যাব করছে, পুব বাঙলায়ও এসব ভাষার প্রতি তরুণ সম্প্রদায়ের কৌতূহল অতিশয় ক্ষীণ বলে তার আয়ু দীর্ঘ হবে বলে মনে হয় না এবং শেষ কথা আরব-ইরানে অদূর ভবিষ্যতে যে হঠাৎ কোনও অভূতপূর্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা আরম্ভ হয়ে বাঙলাকে প্রভাবান্বিত করবে তার সম্ভাবনাও নেই।
কিন্তু যেসব আরবি-ফারসি শব্দ বাঙলাতে ঢুকে গিয়েছে তার অনেকগুলো যে আমাদের ভাষাতে আরও বহুকাল ধরে চালু থাকবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই এবং দ্বিতীয়ত, কোনও কোনও লেখক নতুন বিদেশি-শব্দের সন্ধান বর্জন করে পুরনো বাঙলার চণ্ডী থেকে আরম্ভ করে ‘হুতোম’ পর্যন্ত– অচলিত আরবি-ফারসি শব্দ তুলে নিয়ে সেগুলো কাজে লাগাবার চেষ্টা করছেন। কিছুদিন পূর্বেও এই এক্সপেরিমেন্ট করা অতিশয় কঠিন ছিল কিন্তু অধুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে বাধ্য হয়ে পুরনো বাঙলা পড়তে হয়– তারা এইসব শব্দের অনেকগুলো অনায়াসে বুঝতে পারবে বলে অচলিত অনেক আরবি-ফারসি শব্দ নতুন মেয়াদ পাবে।
এই পরিস্থিতির সামনে জীবন্মুত এসব শব্দের একটা নতুন খতেন নিলে ভালো হয়।
***
সংস্কৃত, গ্রিক, বাঙলা আর্য ভাষা, আরবি, হিব্রু সেমিতি ভাষা। ফারসি, উর্দু, কাশ্মিরি, সিন্ধিও আর্য ভাষা, কিন্তু এদের ওপর সেমিতি আরবি ভাষা প্রভাব বিস্তার করেছে প্রচুর। উত্তর ভারতের অন্যান্য ভাষাদের মধ্যে বাঙলা এবং গুজরাতিই আরবি ভাষার কাছে ঋণী, কিন্তু এই ঋণের ফলে বাঙলার মূল সুর বদলায়নি। গুজরাতির বেলাও তাই।
হিব্রু এবং আরবি সাহিত্যের ঐশ্বর্য সর্বজনবিদিত। ঠিক সেইরকম প্রাচীন আর্য ভাষা ফারসি তার ভগ্নি সংস্কৃতের ন্যায় খ্রিস্টের জন্মের পূর্বেই সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠেছিল। আরবরা যখন ইরান জয় করে তখন তারা ইরানিদের তুলনায় সভ্যতা-সংস্কৃতিতে পশ্চাৎপদ। কিন্তু তারা সঙ্গে আনল যে ধর্ম সেটি জরথুস্ত্রি ধর্মের চেয়ে প্রগতিশীল, সর্বজনীন এবং দুঃখীর বেদনা উপশমকারী। ফলে তাবৎ ইরান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল এবং আপন ভাষা ও সাহিত্য বর্জন করে আরবিকে রাষ্ট্রভাষা ও সংস্কৃতির বাহনরূপে স্বীকার করে নিল। আরবি ভাষা ও সাহিত্যে তাই ইরানিদের দান অতুলনীয়।
চারশত বৎসর পরে কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হল। ইরানিদের আপন ভাষা তখন মাহমুদ বাদশার উৎসাহে নবজন্ম লাভ করে নব নব সাহিত্য-সৃষ্টির পথে এগিয়ে চলল। বাল্মীকি যেরকম আদি এবং বিশ্বজগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, ফিরদৌসিও এই নব ইরানি (ফারসি) ভাষার আদি এবং শ্রেষ্ঠ কবি। আরবি থেকে শব্দ এবং ভাবসম্পদ গ্রহণ করে ফারসি সাহিত্য যে অভূতপূর্ব বিচিত্র রূপ ধারণ করল তা আজও বিশ্বজনের কাছে বিস্ময়ের বস্তু। রুমি, হাফিজ, সাদি, খৈয়াম আপন আপন রশিমণ্ডলে সবিতাস্বরূপ। সেমিতি আরবি এবং আর্য ফারসি ভাষার সংঘর্ষের ফলেই এই অনির্বাণ হোমানলের সৃষ্টি হল।
পরবর্তী যুগে এই ফারসি সাহিত্যই উত্তর ভারতে ব্যাপকরূপে প্রভাব বিস্তার করল। ভারতীয় মক্তব-মাদ্রাসায় যদিও প্রচুর পরিমাণে আরবি ভাষা পড়ানো হয়েছিল তবু কার্যত দেখা গেল ভারতীয় আর্যগণ ইরানি আর্য সাহিত্য অর্থাৎ ফারসির সৌন্দর্যে অভিভূত হলেন বেশি। উর্দু সাহিত্যের মূল সুর তাই ফারসির সঙ্গে বাঁধা– আরবির সঙ্গে নয়। হিন্দি গদ্যের ওপরও বাইরের যে প্রভাব পড়েছে সেটা ফারসি– আরবি নয়।
একদা ইরানে যেরকম আর্য ইরানি ভাষা ও সেমিতি আরবি ভাষার সংঘর্ষে নবীন ফারসি জন্মগ্রহণ করেছিল, ভারতবর্ষে সেই সংঘর্ষের ফলে সিন্ধি, উর্দু ও কাশ্মিরি সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। কিন্তু আরবির এই সংঘর্ষ ফারসির মাধ্যমে ঘটেছিল বলে কিংবা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, ভারতবর্ষীয় এ তিন ভাষা ফারসির মতো নব নব সৃষ্টি দিয়ে ঐশ্বর্যশালী সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারল না। উর্দুতে কবি ইকবালই এ তত্ত্ব সম্যক হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন ও নতুন সৃষ্টির চেষ্টা করে উর্দুকে ফারসির অনুকরণ থেকে কিঞ্চিৎ নিষ্কৃতি দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
***
