টেবিলের উপর যে সকল কাগজ-পত্ৰ ছড়ান রহিয়াছে, তাহার মধ্যে মাডােয়রীদিগের ব্যবহার-উপযোগী কোনরূপ খাতা পত্র নাই, কতকগুলি সাদা ও লেখা ফুলিকেপ কাগজ।
আমি সেই ঘরের ভিতর প্রবেশ করিবামাত্রই মাণিকচাঁদ বাবুর সহিত আমার সাক্ষাৎ হইল। তখন তিনি সবিশেষ অভ্যর্থনা করিয়া আমাকে তাঁহার বামপার্শ্বের চেয়ারের উপর বসাইলেন। তাহার নির্দেশানুসারে আমি সেই স্থানে উপবেশন করিলে পর, তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি কতক্ষণ এখানে আগমন করিয়াছেন?
আমি। এখনই আসিতেছি।
মাণিক। আমার এই স্থান অনুসন্ধান করিয়া লইতে আপনার সবিশেষ কোনরূপ কষ্ট হয় নাই ত?
আমি। কোন কষ্ট হয় নাই; কারণ, এই স্থান আমি উত্তমরূপে চিনি। সুতরাং আপনার এই স্থান অনুসন্ধান করিয়া লইতে আমার কিছুমাত্র কষ্ট হয় নাই।
মাণিক। আপনি এ পর্যন্ত কিছু ঠিক করিয়া উঠিতে পারিয়াছেন কি?
আমি। আমার চাকরী করা সম্বন্ধে?
মাণিক। হাঁ।
আমি। স্থির না করিলে আর আমি এ স্থানে আসিব কেন?
মাণিক। কি স্থির করিলেন, আমাদিগের নিকট চাকরী করা স্থির করিলেন, কি পূৰ্ব্ব হইতে যে স্থানে চাকরী পাইয়াছেন, সেই স্থানেই গমন করাই স্থির হইল?
আমি। না মহাশয়! আমি আর সেই স্থানে গমন করিতেছি। আপনাদিগের অধীনেই চাকরী করাই আমি স্থির করি য়াছি। এখন কোন্ সময় হইতে এবং কোথায় আমাকে কাৰ্য্যে নিযুক্ত হইতে হইবে, তাহা আপনি আমাকে বলিয়া দিন, আমি সেই স্থানে গমন করিয়া কৰ্ম্ম করিতে প্রবৃত্ত হই।
মাণিক। আমি পূৰ্বেই বলিয়াছি, কলিকাতা পরিত্যাগ করিয়া আপাততঃ আপনাকে কোন স্থানেই গমন করিতে হইবে না। এই স্থান হইতেই সমস্ত কাৰ্য্য নিৰ্বাহ হইবে; কেবলমাত্র মফঃস্বলের যখন যে স্থানে আমাদিগের মনিব একটী করিয়া শাখা-ব্যবসায় স্থাপন করিবেন, সেই সময় কেবলমাত্র একবার সেই স্থানে গমন করিলেই চলিবে। তৎপরে সেই স্থানের কার্যের বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া, পুনরায় আপনি এই কলিকাতায় আগমন করিবেন।
আমি। কোন্ তারিখ হইতে আমি এই কার্যে নিযুক্ত হইব?
মাণিক। অদ্য হইতেই আপনি আমাদিগের কার্যে নিযুক্ত হইলেন। বেতন অদ্য হইতে আপনি পাইবেন; কিন্তু নিয়োগ পত্র আজ আমি আপনাকে প্রদান করিতেছি না। আপনি কল্য এই সময় একবার এখানে আগমন করিবেন, সেই সময়ে আমাদিগের কার্যের নিয়ম অনুসারে আমি আপনাকে একমাসের অগ্রিম বেতন সহ আপনার নিয়োগ-পত্র আপনাকে প্রদান করিব, এবং আপাততঃ আপনাকে কি কি কাৰ্য্য করিতে হইবে, তাহাও আপনাকে বলিয়া দিব। বোম্বাই সহরের যে মহাজনের নিকট আপনি চাকরী পাইয়াছিলেন, তাহার লিখিত যে সকল চিঠিপত্র আপনার নিকট আছে, এবং নূতন কার্যে নিযুক্ত হইবার যে নিয়োগ-পত্ৰ আপনি প্রাপ্ত হইয়াছেন, কল্য যে সময় আপনি আমার নিকট আগমন করিবেন, সেই সময় সেই সকল আপনার সঙ্গে করিয়া আনিবেন।
আমি। সে গুলিতে আপনার প্রয়োজন?
মাণিক। প্রয়োজন আছে বলিয়াই বলিতেছি। আনিলেই দেখিতে পাইবেন।
আমি। আচ্ছা, তাহাই হইবে।
এই বলিয়া আমি সে দিবস সেই স্থান পরিত্যাগ করিয়া, আপন স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। একবার মনে করিলাম, আমার নিয়োগ-পত্ৰ বা চিঠিপত্রে উহার প্রয়োজন কি? কেন আমি সেই সকল দ্রব্য তাহার নিকট লইয়া যাইব। আবার ভাবিলাম, আমি যে অপর স্থানে চাকরী সংগ্রহ করিতে পারি য়াছি, তাহা হয় ত তিনি আমার কথায় বিশ্বাস করেন নাই, এই নিমিত্তই সেই কাগজ দেখিতে চাহিয়াছেন। আমি তাঁহার নিকট যে সকল কথা বলিয়াছি, তাহা প্রকৃত, কি মিথ্যা, তাহাই মাণিকচাঁদ বাবু, বোধ হয়, জানিতে চাহেন। সে যাহাই হউক, সেই সকল কাগজ-পত্র তাহাকে দেখাইতে আমি কোনরূপ অনিষ্ট-জনক বলিয়া বুঝিতে পারিতেছি না।
মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া পরদিবস আমি আমার নিয়োগ পত্রের সহিত পুনরায় সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, দ্বারবান্ সেইরূপ ভাবেই বসিয়া আছে, মাণিকচাঁদ বাবু সেই স্থানে সেইরূপ ভাবে বসিয়া সবিশেষ মনোযোগর সহিত আপন কাৰ্যে নিযুক্ত আছেন।
পূৰ্ব দিবসের ন্যায় আমি মাণিকচাঁদ বাবুর ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলে, তিনি আমাকে সেই চেয়ারের উপর উপবেশন করিতে কহিলেন। আমি সেই স্থানে উপবেশন করিলে, তিনি তাহার হস্তস্থিত লেখনী সেই টেবিলের উপর রাখিয়া আমার দিকে একটু ঘূরিয়া বসিলেন ও আমাকে কহিলেন, কেমন মহাশয়! আপনি আমাদিগের কার্যে নিযুক্ত হইয়াছেন ত?।
আমি। হাঁ মহাশয়! সে কথা আমি গত কল্যই ত আপনাকে বলিয়াছি।
মাণিক। আমি যে সকল কাগজ-পত্ৰ আনিতে বলিয়া ছিলাম, তাহা আপনি সঙ্গে করিয়া আনিয়াছেন, না ভুল-ক্রমে আপনার বাসায় রাখিয়া আসিয়াছেন?
আমি। না মহাশয়! আমি ভুল-ক্রমে উহা রাখিয়া আসি নাই, সঙ্গে করিয়াই আনিয়াছি। উহা আমি আপনার হস্তে এখনই প্রদান করিব কি?
মাণিক। না, এখন নয়, একটু অপেক্ষা করুন। যখন আমার প্রয়োজন হইবে, তখনই আপনি উহা আমাকে প্রদান করিবেন। এখন আপনি আপনার অগ্রিম বেতন গ্রহণ করিয়া আপনার কাৰ্যে নিযুক্ত হউন।
এই কথা শুনিয়া মাণিকচাঁদ তাহার টেবিলের দেরাজ হইতে দশখানি দশ টাকা হিসাবের নোট বাহির করিয়া আমার হস্তে প্রদান করিলেন ও কহিলেন, এই নিন্ মহাশয়! আপনার অগ্রিম বেতন।
আমি। নোট দশখানি আপন হস্তে গ্রহণ করিয়া কহিলাম, ইহার নিমিত্ত আমার কোনরূপ রসিদ দিতে হইবে কি?
