আগন্তুক। আমাদিগের ফারম যদি সামান্য ফারম হইত, তাহা হইলে আপনার চাকরী পরিত্যাগ করিতে আমি কখনই পরামর্শ প্রদান করিতাম না। আপনি যে কারমের কথা বলিতে ছেন, সেই ফারম অপেক্ষা ধনবান্ ও উৎকৃষ্ট ফারম এ দেশে যদি কাহারও থাকে, তাহা আমাদিগের। যে ফারমের শাখা ভারতবর্ষের সমস্ত প্রধান প্রধান নগরীতে আছে, সেই স্থানে চাকরী করা শ্লাঘার বিষয়। বিশেষতঃ আপনি আমাদিগের ফরমের নিয়ম প্রভৃতি অবগত নহেন বলিয়াই, এইরূপ কথা বলিতেছেন। আমাদিগের ফারমের কর্ম্মচারীগণ তাহাদের কার্যদক্ষতা দেখাইয়া আপনাদের কাৰ্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতে পারিলে, মূল ফারমের লভ্য অংশ হইতে কমিশন বলিয়া বাৎসরিক একটী অংশও পাইয়া থাকেন। সে অংশ শুনিতে অতি সামান্য হইলেও, কাৰ্য্যে কিন্তু সামান্য নহে। এমন কি, এক একজন কর্ম্মচারী বৎসর বৎসর তাহার বেতনাদি বাদে পাঁচ ছয় সহস্র পৰ্য্যন্ত টাকা পাইয়া থাকেন। তদ্ব্যতীত আমাদিগের কাৰ্য্যের আর একটী প্রধান সুবিধা আছে, যে সুবিধা কেবলমাত্র আমাদিগের ফারম ব্যতীত এ পর্যন্ত অপর কোন স্থানেই পরিলক্ষিত হয় নাই। যিনি যে স্থানেই চাকরী করুন না কেন, একমাস চাকরী পূর্ণ না হইলে সেই মাসের বেতন কেহই প্রাপ্ত হন না; কিন্তু আমাদিগের নিয়ম সেরূপ নহে। আমরা সকলেই অগ্রিম বেতন পাইয়া থাকি, অর্থাৎ যেমন মাস পড়িবে, অমনি আমরা সেই মাসের বেতন অগ্রিম প্রাপ্ত হইব। এরূপ অবস্থায় আপনি সবিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখুন যে, আপনি আমাদিগের সরকারে কাৰ্য্য করিতে প্রস্তুত আছেন কি না? যদি আপনি আমাদিগের প্রস্তাবিত চাকরী গ্রহণ করিতে সম্মত হন, তাহা হইলে আপনি কল্য আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন। এখন আমি আপন স্থানে প্রস্থান করিতেছি।
এই বলিয়া তিনি প্রত্যাগমন করিতে উদ্যত হইলে, আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, মহাশয়! আমি কল্য আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়া, কাহার অনুসন্ধান করিব? মহাশয়ের নাম ত আমি এ পর্যন্ত জানিতে পারি নাই।
আগন্তুক। আমার নাম মাণিক চাঁদ। আপনি আমার নাম করিয়া অনুসন্ধান করিলেই আমাকে দেখিতে পাইবেন।
আমি। কোন্ স্থানে গমন করিলে, আমি আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিতে সমর্থ হইব?
মাণিক। আমার বাসায়।—না, আমার বাসায় যাইবার প্রয়োজন নাই, বেলা দশটা হইতে পাঁচটা পর্যন্ত আমি আমার বাসায় থাকিব না। নির্জনে একটী ঘর লইয়াছি, সেই স্থানে বসিয়া আমি কি প্রণালীতে কার্যের বন্দোবস্ত করিব, তাহাই ঠিক করিতেছি। আপনি সেই স্থানে গমন করিবেন, সেই স্থানেই আমার সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইবে।
আমি। সে স্থান কোথায়?
মাণিক। বড়বাজার রাজার কারা। রাজার কাটরায় দোতালার উপর পচিশ ছাব্বিশ নম্বরের ঘর।
আমি। আচ্ছা মহাশয়অদ্য আমি এ বিষয় একটু সবিশেষ রূপে বিবেচনা করিয়া দেখি, এবং আমার দুই একজন বন্ধু-বান্ধবের সহিত পরামর্শ করিয়া দেখি। পরামর্শ করিয়া আমি যেরূপ সাব্যস্ত করিব, তাহা আমি আপনার নিকট গমন করিয়া বলিয়া আসিব। যদি আপনাদিগের নিকট চাকরী করি, তাহাও গিয়া বলিয়া আসিব, আর না করি, তাহাও আপনাকে জানাইব।
আমার সহিত এইরূপ কথাবার্তা হইবার পর, মাণিকবাবু আমার বাড়ী হইতে প্রস্থান করিলেন। সেই চাকরী গ্রহণ করা আমি একরূপ স্থিরই করিয়াছিলাম। তথাপি দুই একজন বন্ধু বান্ধবকে একবার জিজ্ঞাসা করা কর্তব্য মনে করিলাম।
সেই দিবস রাত্রিতেই আমি আমার দুই একজন বন্ধু-বান্ধবের সহিত পরামর্শ করিলাম, সকলেই আমাকে মাণিকচাঁদের প্রস্তাবিত কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইতে পরামর্শ প্রদান করিলেন। আমিও তাহাই স্থির করিয়া পরদিবস মাণিকবাবুর নিকট গমন করিয়া তাহাদিগের ফারমেই কাৰ্য্য করিতে প্রবৃত্ত হইব, মনে মনে এইরূপ স্থির করিলাম।
পরদিবস বেলা আন্দাজ এগারটার সময় আমি রাজার কাটুরায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। রাজার কাটার প্রত্যেক ঘরই আমি পূৰ্ব্ব হইতে জানিতাম। দোতালার উপর গমন করিয়া পঁচিশ ছাব্বিশ নম্বরের গৃহের সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই দুইটা ঘর অনেকদিবস হইতে খালি ছিল। সেখানকার প্রত্যেক ঘরেরই বারান্দার দিকে দুইটী করিয়া দরজা আছে মাত্র। কোন কোন ঘরের মধ্যে এক ঘর হইতে অপর ঘরে যাতায়াত করিবার নিমিত্ত একটী একটী দরজা আছে। কোন ব্যক্তি দুইটী ঘর একত্র গ্রহণ করিলে উভয় ঘরের মধ্য দিয়া যাতায়াতের নিমিত্ত প্রায়ই সেই দরজা খুলিয়া রাখেন। আর যদি কেবলমাত্র একটী ঘর গ্রহণ করেন, তাহা হইলে সেই দরজা বন্ধ থাকে।
আমি পঁচিশ নম্বরের ঘরের সম্মুখে গিয়া দেখিলাম, উহার বাহিরের দুইটী দরজাই ভিতর হইতে বন্ধ। ছাব্বিশ নম্বরের ঘরেরও একটী দরজা ভিতর হইতে বন্ধ; কিন্তু একটা দরজা খোলা। সেই দরজার উপর একখানি পরদা বোলান আছে। সেই পরদার বাহিরে দ্বারবান সদৃশ একটী লোক বসিয়া আচ্ছে। আমি সেই স্থানে গমন করিয়া প্রথমেই সেই দ্বারবানকে জিজ্ঞাসা করিলাম, মাণিকচাঁদ বাবু নামে কোন ব্যক্তি এই স্থানে আছেন কি? তখন সেই দ্বারবান্ সেই ঘর দেখাইয়া দিয়া উত্তরে আমাকে কহিল, হ মহাশয়! বাবুসাহেব এই ঘরেই থাকেন, তিনি এখন ইহার ভিতরেই আছেন।
দ্বারবানের এই কথা শুনিয়া সেই পরদা ঠেলিয়া আমি সেই ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম, মাড়োয়ারীগণ সর্বদা যেরূপ স্থানে বা যেরূপ ভাবে বসিয়া আপন আপন কার্য নির্বাহ করিয়া থাকেন, ইনি কিন্তু সেরূপ ভাবে বসিয়া আপন কার্যে প্রবৃত্ত নহেন। ঘরের মেঝের উপর কোনরূপ বিছানা বা যেরূপ ভাবে মাড়োয়ারীগণ গদি বিছাইয়া তাহার উপর উপবেশন করেন, সেই ঘরের ভিতর সেইরূপ ভাবের কোন দুবাই নাই। যাহা আছে, তাহা মাড়োয়ার-পদ্ধতির সম্পূর্ণরূপ বিপরীত। সেই ঘরের ঠিক মধ্যস্থলে একখানি টেবিল রহিয়াছে, একখানি চেয়ারে বসিয়া মাণিকচাঁদ সেই টেবিলের উপর কাগজ-পত্র বিছাইয়া লেখাপড়া করিতেছেন, এবং তাহার বাম ও দক্ষিণ দুই পার্শ্বে দুইখানি খালি চেয়ার রাখা আছে।
