খুন না চুরি

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে। হাতের কাজ শেষ করিয়া অফিস–ঘরে বসিয়া আছি, এমন সময়ে পশ্চিমদেশীয় একজন ভদ্র লোক আমার সম্মুখে আসিয়া নমস্কার করতঃ একখানি পত্ৰ দিলেন। পত্ৰখানি গ্ৰহণ করিয়া দেখিলাম, উহা আমারই উপরিতন কৰ্ম্মচারীর লেখা। খুলিয়া পাঠ করিলাম। ভবানীপুর পদ্মপুকুর রোডে খুন হইয়াছে, আমাকে তখনই পত্রবাহকের সহিত তাহার তদ্বির করিতে যাইতে হইবে।

কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া আমি দাঁড়াইয়া উঠিলাম। আগন্তুক আমার অভিপ্ৰায় বুঝতে পারিয়া পরম আপ্যায়িত হইয়া বলিলেন, আসুন মহাশয়! আমি ধনে প্রাণে মারা গেলাম। সকল কথা গাড়ীতেই শুনিতে পাইবেন।

দ্বিরুক্তি না করিয়া আমি তাহার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বাহির হইলাম। ফটকের সন্মুখেই তাঁহার গাড়ী ছিল, উভয়েই সেই গাড়ীতে উঠিলাম। কোচমান শকট চালনা করিল।

লোকটীর বয়স প্ৰায় পয়ত্ৰিশ বৎসর, দেখিতে অতি সুপুরুষ। বেশ হৃষ্ট–পুষ্ট দেহ। তাঁহার পরিধানে একখানি পাতলা দেশী কালাপেড়ে ধুতি, একটা আদ্ধির পিরাণ, একখানি মান্দ্ৰাজী জরিপেড়ে উড়ানি, মস্তকে একটা ফিরোজা রঙের পাগড়ী, গলায় গিনি সোণার মোটা হার, কৰ্ণে হীরাবসান ফুল, হস্তে হীরার আংটী, পায়ে বাৰ্ণিশ করা জুতা।

কিছুদূর যাইতে না যাইতে তিনি অতি বিমৰ্ষভাবে বলিলেন, মহাশয়, আমার সাৰ্ব্বনাশ হইয়াছে। আমার ভাবী–পত্নীকে কে খুন করিয়াছে।

ভাবী পত্নীর কথা শুনিয়া আমি বিস্মিত হইলাম, তাহার মুখের দিকে একদৃষ্টি চাহিয়া রহিলাম। তিনি আমার মনোগত ভাব বুঝিয়া বলিলেন, দুই বৎসর হইল আমার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হয়। তাঁহার মৃত্যুর পরে আমার একমাত্র পুত্রও মারা পড়ে। মনে করিয়াছিলাম, আর সংসারে লিপ্ত হইব না; কিন্তু বিধিলিপি অখণ্ডনীয়। ভবানীপুর পদ্মপুকুর রোডে শোভন সিং নামে আমার এক বন্ধু বাস করিতেন। আমি প্রায়ই তাঁহার বাড়ীতে যাতায়াত কিরিতাম। শোভন সিংএর অবস্থা বড় ভাল ছিল না। তাঁহার একটী কন্যা ছিল। মেয়েটার বিবাহের বয়স উৰ্ত্তীর্ণ হইলেও অর্থঅভাবে তিনি বিবাহ দিতে পারেন নাই। কন্যার নাম রূপসী। তাহার বয়স প্ৰায় চৌদ্দ বৎসর, দেখিতে বেশ সুন্দরী। একদিন কথায় কথায় শোভন সিং কন্যার বিবাহের কথা উত্থাপন করেন এবং আমাকে বিবাহ করিবার জন্য অত্যন্ত অনুরোধ করেন। উদ্ধাপসী সুন্দরী যুবতী, ঈশ্বরের ইচ্ছায় আমার, দু–পয়সার সঙ্গতিও আছে। আমিও পিতার একমাত্র সন্তান, বিবাহ না করিলেন বংশ লোপ হইবে, এই আশঙ্কায় বিবাহে সন্মত হইলাম। কিন্তু তাহার পর হইতে শোভন সিং আর বিবাহের কথা উত্থাপন করেন না দেখিয়া আমি তাঁহাকে বিবাহের দিন স্থির করিতে বলি। শোভন সিং আমার কথায় যেন বিরক্ত হইলেন। বলিলেন, পাঁচশত টাকা না দিলে আমি রূপসীকে দান করিতে পারিব না।

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, শোভন সিং কি পূৰ্ব্বে টাকার কথা বলেন নাই?

তিনি ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, না, টাকার নামও করেন নাই। টাকা দিতে হইবে শুনিয়া আমার কেমন সন্দেহ হইল। ভাবিলাম, হয় ত তিনি আর কোথাও পাত্র ঠিক করিয়াছেন। এখন টাকা চাহিয়া আমাকে তাড়াইবার চেষ্টায় আছেন। আমার তখন বিবাহে ইচ্ছা হইয়াছে। রূপসীও জানিতে পারিয়াছে যে, তাহার সহিত আমার বিবাহ হইবে। পূর্বের মত সে ও আর আমার কাছে অসিত না। কাজেই আমি সন্মত হইলাম। বলিলাম, আমি টাকা দিতে প্রস্তুত আছি। আপনি বিবাহের দিন স্থির করুন। তখনই একজন দৈবজ্ঞকে ডাকা হইল। তিনি আসিয়া আমাদের বিবাহের দিন ধাৰ্য্য করিয়া দিলেন। কিন্তু দুরদৃষ্ট বশতঃ সে লগ্নে আমাদের বিবাহ হইল না।

আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, কেন?

তিনি বলিলেন, বিবাহের দুই দিন পূর্বে শোভন সিংএর এক জ্ঞাতি বিয়োগ হয়। কালাশৌচ, কাজেই বিবাহ হইল না। অশৌচান্তে আবার দিন স্থির হইল। কিন্তু সেবারও বিবাহ হইল না। রূপসীর সাংঘাতিক জর হইল। প্ৰায় তিন মাস ভুগিয়া রূপসী আরোগ্যলাড করিল। এইরূপে আরও তিন চারিবার দিন ধার্য্য হইল, কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে তখনও বিবাহ হইল না। কোন না কোনো অছিলা করিয়া শোভন সিং বিবাহের দিন ক্রমাগত পিছাইয়া দিতে লাগিলেন। প্ৰায় আট মাস কাল এইরূপে অতিবাহিত হইল। পরে একদিন শোভন সিং বলিলেন যে, রূপসী ও বাড়ীর অন্যান্য লোকের চিকিৎসায় তাহার অনেক অর্থব্যয় হইয়া গিয়াছে। যদি আমি আরও তিন শত টাকা দিই, তাহা হইলে আমাদের শীঘ্রই বিবাহ হইতে পারে। আমি তখন অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছি। কাজেই শোভন সিংএর প্রস্তাবে সম্মত হইলাম। বোধ হয় তিনি ভাবিয়াছিলেন, আমি আর অধিক টাকা দিতে স্বীকৃত হইব না। কিন্তু যখন আমি তাহাতেও সম্মত হইলাম, তখন তিনি আন্তরিক বিরক্ত হইলেন। মুখে বলিলেন, সমস্ত টাকা অগ্রিম দিলেই বিবাহ হইবে। আমিও নাছোড় বান্দা, পরদিনই আটশত টাকা আনিয়া শোভন সিংএর হস্তে দিলাম। তিনি আনন্দিত মনে উহা গ্রহণ করিলেন, কিন্তু কোন রসিদ দিলেন না, আমিও চক্ষু লজ্জায় পড়িয়া কোন রসিদ চাহিলাম না। তবে যখন টাকা, দিই, সেই সময়ে সেখানে তিন চারিজন লোক ছিলেন। তাঁহারাই সাক্ষী স্বরূপ ছিলেন। সে যাহা হউক, টাকা পাইয়া শোভন সিং আবার বিবাহের দিন স্থির করিলেন। আজই সেই দিন। বেলা পাঁচটার সময় আমি কয়েকজন মাত্র বরযাত্ৰ লইয়া কন্যার গৃহে উপস্থিত হইলাম। বাড়ীতে প্ৰবেশ করিবামাত্র একটা ভয়ানক গোলযোগ আমার কর্ণগোচর হইল। ক্ৰমে চীৎকার, ক্ৰন্দনধ্বনিও শুনিতে পাইলাম। মনে একটা কেমন আতঙ্ক উপস্থিত হইল। আমার সঙ্গীগণ দেখিয়া শুনিয়া অবাক হইলেন। বর বা বরযাত্র বসিবার স্থান পৰ্য্যন্ত করা হয় নাই। কি করিব, কোথায় বসিব ভাবিতেছি, এমন সময়ে শোভন সিং কাঁদিতে কাঁদিতে আমাদের নিকটে আসিলেন। বলিলেন, রূপসীকে কে খুন করিয়াছে। ক্ৰন্দনের শব্দ শুনিয়া প্রতিবেশিগণ ছুটিয়া আসিল, বাড়ীতে লোকে লোকারণ্য হইল। রূপসীর মৃত্যু–সংবাদে দুঃখ হওয়া দূরে থাক, আমার অত্যন্ত ক্ৰোধ হইল। আমি অতি কৰ্কশ স্বরে বলিলাম, চলুন–আমি মৃতদেহ দেখিতে চাই। কেমন করিয়া কেই বা রূপসীকে খুন করিল, আপনিই বা এখনও থানায় এ সংবাদ দেন নাই কেন? আমি বড় ভাল বুঝিতেছি না। ইহার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনরূপ ষড়যন্ত্র আছে। রূপসী যদি সত্য সত্যই খুন হইয়া থাকে, তাহা হইলে আমি আপনাকে সহজে ছাড়িব না। এই দণ্ডে আমার আটশত টাকা চাই।

আমার কথায় শোভন সিং কাতর হইলেন। বলিলেন, আমার কন্যার মৃতদেহ পৰ্যন্ত পাইতেছি না। অগ্ৰে তাহার সন্ধান না করিয়া কেমন করিয়া থানায় সংবাদ দিব। যদি আপনার ইচ্ছা হয়, আপনি এখনই সংবাদ দিতে পারেন। আমি এক কোনদিক দেখিব?

কথা শুনিয়া আমার সন্দেহ আরও বৃদ্ধি পাইল। আমি তখনই সেখান হইতে বিদায় লইলাম এবং তৎক্ষণাৎ বরবেশ ত্যাগ করিয়া আপনার নিকট উপস্থিত হইয়াছি। এখন আপনিই আমার একমাত্র ভরসা। রূপসীকে পাই ভালই, নচেৎ আমার আটশত টুকো ফিরাইয়া চাই। আপনাকে ঐ টাকা আদায় করিয়া দিতে হইবে।

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনার নিবাস কোথায়? নামই বা কি?

তিনি বলিলেন, আমার নাম লাল সিং, বাড়ি শিয়ালদহের নিকট।

লালসিং–এর টাকার কথায় আমি কোন উত্তর করিলাম না দেখিয়া, তিনি পুনরায় ঐ কথা তুলিলেন। আমি বলিলাম, টাকা আদায় করিবার ক্ষমতা আমাদের নাই। আমি কেবল খুনের তদ্বির করিতে পারিব।

এই কথা শেষ হইতে না হইতে গাড়ীখানি একটী ক্ষুদ্র অট্টালিকার সম্মুখে থামিল। লালসিং অগ্ৰে গাড়ী হইতে অবতরণ করিলেন। আমিওঁ নামিয়া তাঁহার সঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করিলাম।

কিছুদূর অগ্রসর হইয়া আমরা একটী ক্ষুদ্র প্রাঙ্গণে উপস্থিত হইলাম। দেখিলাম, বিবাহোৎসব সম্পন্ন করিবার জন্য বাড়ীখানি বেশ সাজানো হইয়াছে। চারিদিকে বেলোয়ারি ঝাড় ঝুলিতেছে, একখানি চাঁদোয়া দ্বারা সমস্ত প্রাঙ্গন আচ্ছাদিত রহিয়াছে। তাহারই নিম্নে একটা ঢালা বিছানা পাড়া ছিল। সেই বিছানার এক পার্শ্বে পাত্রের বসিবার স্থান নির্দিষ্ট হইয়াছে। কিন্তু একজন লোককে ও সেই শয্যার উপর দেখিতে পাইলাম না। অন্দর হইতে রমণীদিগের রোদনশব্দ আমার কর্ণগোচর হইতে লাগিল। কিন্তু শোভনসিংকে দেখিতে পাইলাম না।

কিছুক্ষণ প্রাঙ্গণে দাঁড়াইয়া আছি, এমন সময় লালসিং অঙ্গুলি নির্দেশ দ্বারা একজনকে দেখাইয়া বলিলেন, ইনিই শোভন সিং আমার ভাবী শ্বশুর।

শোভন সিং আমাকে দেখিয়া স্তম্ভিত হলেন। কিন্তু তখনই আত্মসংবরণ করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনিই কি আমার কন্যার মৃতদেহ দেখিতে আসিয়াছেন?

আমি লালসিংকে দেখাইয়া বলিলাম, ইনি বলেন, আপনার কন্যা খুন হইয়াছে। কিন্তু আপনি ইঁহাকে তাহার মৃতদেহ দেখাইতেছেন না। আমি ইঁহার মুখে সমস্তই শুনিয়াছি। এখন লাস কোথায় বলুন?

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

আমার কথা শুনিয়া শোভন সিং চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। পরে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিলেন, মহাশয়। আমার একমাত্ৰ সন্তান–ঐ কন্যা ভিন্ন আমার আর কোন সন্তানাদি হয় নাই। তাহার বিয়োগে আমি যে অত্যন্ত কাতর হইয়াছি এ কথা বলাই বাহুল্য।

শোভন সিংএর অবস্থা দেখিয়া এবং তাঁহার কথাবার্তা শুনিয়া আমার কেমন সন্দেহ হইল। তাহার বয়স প্ৰায় বিয়াল্লিশ বৎসর; কিন্তু এই বয়সেই তাহার দেহের মাংস শিথিল হইয়াছে, সম্মুখের, উপর–পাটীর দুইটী দাঁত পড়িয়া গিয়াছে। গোঁপ শ্মশ্রু ও মস্তকের কেশ পাক ধরিয়াছে। তাঁহাকে দেখিতে গৌরবর্ণ, তাঁহার দেহ দীর্ঘ ও শীর্ণ, হস্ত প্ৰায় আজানুলম্বিত, চক্ষু ক্ষুদ্র ও কোটরগ্ৰস্ত নাসিক উন্নত এবং ললাট প্রশস্ত। মুখ দেখিয়াই কেমন ক্রূর প্ৰকৃতি বলিয়া বোধ হইল।

অপর কথায় সময় নষ্ট করিতেছেন দেখিয়া আমি বিরক্ত হইলাম। বলিলাম,–আমি আপনার দুঃখের কথা শুনিতে আসি নাই। কন্যাবিয়োগে আপনি যে কাতর হইবেন, ইহাতে আর আশ্চর্য্য কি? এখন আমি যাহা জিজ্ঞাসা করি, তাহার উত্তর দিন; আপনার কন্যার লাস কোথায় বলুন?

আত্ম সংবরণ করিয়া শোভন সিং বলিলেন,–সেই কথাই বলিতেছি,–রূপসীর লাস পাওয়া যাইতেছে না।

আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়া আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–সে কি! লাস পাওয়া যাইতেছে না কি?

কাঁদ কাঁদ হইয়া শোভন সিং বলিলেন,–এখান হইতে কিছু দূরে আমার এক আত্মীয় বাস করেন, রূপসী আজি প্রাতে তাঁহাদের বাড়ীতে গিয়াছিল। বাছা আমার সেই অবধি আর ফিরে নাই।

তবে খুন হইয়াছে বলিতেছেন কেন? আপনার কন্যা নিরুদেশ হইয়াছে। হয় সে নিজে পলায়ন করিয়াছে, নচেৎ কোন লোক তাহাকে লইয়া পলায়ন করিয়াছে।

না মহাশয়! সকল কথা শুনিলে বুঝিতে পরিবেন। রূপসী আর এ জগতে নাই।

এই বলিয়া শোভন সিং আবার চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। কন্যাবিয়োগে তিনি বড়ই কাতর হইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণ পরে শান্ত হইয়া আবার বলিতে লাগিলেন,–প্ৰাতে রূপসী একজন সঙ্গিনী লইয়া এ বাড়ী হইতে বাহির হয়। পথে এক বৃদ্ধা তাহার সহিত আলাপ করে এবং উভয়কেই ভুলাইয়া লইয়া যায়। যে রূপসীর সঙ্গে গিয়াছিল, অনেকক্ষণ পরে সে ফিরিয়া আসিয়াছে, কিন্তু রূপসী আর ফিরে নাই। গৌরীর মুখে যাহা যাহা এখন শুনিতেছি, তাহা বড়ই ভয়ানক।

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–গৌরী কে?

গৌরী আমার ভাগিনেয়ী, রূপসীর বিবাহ উপলক্ষে এখানে আসিয়াছে। গৌরীই রূপসীর সহিত প্ৰাতে আমার আত্মীয়ের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ রক্ষায় গিয়াছিল।

আ। সে কি বলে?

শো। আমি তাহাকে ডাকিয়া আনিতেছি, আপনি তাহার মুখেই সকল কথা শুনুন। এমন ইংরাজ রাজত্বে এখনও যে এই লোমহর্ষণ কাণ্ড ঘটিতে পারে, আমার এমন ধারণা ছিল না।

এই বলিয়া আমার উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া তিনি অন্দরে প্ৰবেশ করিলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই এক খৰ্বীকৃতি বালিকার হস্তধারণ করিয়া পুনরায় তথায় উপস্থিত হইলেন। পরে আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন–এই বালিকার নাম গৌরী, আপনি ইহার মুখেই সমস্ত শুনতে পারবেন। আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, গৌরী যখন ফিরিয়া আইসে, তখন তাহার কিছুমাত্র জ্ঞান ছিল না। সে যেন পাগলের মত হইয়া গিয়াছিল।

গৌরীকে দেখিতে খৰ্ব্বাকৃতি হইলেও আমার অনুমানে তাহার বয়স অন্ততঃ পনের বৎসর বলিয়া বোধ হইল। তাহার দেহ শীর্ণ কিন্তু তাহাতে যৌবনের চিহ্নগুলি ক্ৰমেই ফুটিয়া উঠিতেছে। গৌরীর আয়ত চক্ষু সদাই চঞ্চল, মুখখানি কাঁদ কাঁদ।

গৌরীর মুখের দিকে চাহিয়া আমি বলিলাম,–বল মা! কি জান বল?

কাঁদ কাঁদ হইয়া গৌরী উত্তর করিল—খুব ভোরে আমরা এখান হইতে বাহির হই। পথে লোক ছিল না বলিলেও অমন বাহির হইলাম বটে, কিন্তু দু-জনেরই গা কেমন ছমছম করিতে লাগিল। যখন আমরা পদ্মপুকুরের ধারে গিয়া উপস্থিত হই, দেখিলাম, এক বুড়ী যেন আমাদেরই দিকে আসিতেছে। কাছে অসিলে দেখিলাম, সে আমাদেরই দিকে কটমট করিয়া চাহিয়া রহিয়াছে। চারি চক্ষু মিলিত হইবা মাত্ৰ বুড়ী এক গাল হাসিয়া আমাদের নিকটে আসিল এবং নিমেষ মধ্যে দুই হাতে দুইটি জবা বাহির করিয়া আমাদের উভয়ের নাসিকার নিকট ধরিয়া বলিল,–দেখ দেখি, জবায় কেমন গোলাপ-গন্ধ? আর কখন এমন জবা দেখেছ কি?

সত্যসত্যই গোলাপের গন্ধ পাইলাম, জবাফুলে গোলাপ–গন্ধ পাইয়া কেমন হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলাম। তখন উভয়েই সমস্ত কথু ভুলিয়া গেলাম। রূপসীর বিবাহের কথা ভুলিলাম, কোথায় যাইতেছিলাম ভুললাম, বাড়ী ভূলিলাম, এমন কি, আপনাদের অস্তিত্ব পৰ্য্যন্ত ভুলিলাম। রহিল কেবল সেই বৃদ্ধ। আমরা তাহার হাতের খেলনা স্বরূপ হইলাম। সে আমাদিগকে যাহা বলিতে লাগিল, আমরা অনায়াসে তাহা করিতে লাগিলাম। প্ৰথমে সে আমাদিগকে কিছুদূরে লইয়া গেল। সেখানে একখানি গাড়ী ছিল। আমরা তিনজনে গাড়ীতে উঠিলাম। কতক্ষণ পরে বনের ভিতর একটা ভাঙ্গা বাড়ীর দরজায় আসিয়া গাড়ী থামিয়া গেল। আমরা সকলেই গাড়ী হইতে নামিয়া সেই বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম, একটা প্ৰকাণ্ড ঘরের মধ্যে তিনজন সন্ন্যাসী একদৃষ্টি সম্মুখের প্রজ্জলিত অগ্নির দিকে চাহিয়া রহিয়াছে। সন্ন্যাসী তিনজনের মধ্যে একজনকে দেখিতে অতি ভয়ানক, অপর দুইজনকে তাহার শিষ্য বলিয়াই বোধ হইল।

আমাদের পায়ের শব্দে সেই ভয়ানক সন্ন্যাসী উপরদিকে চাহিল এবং বুড়ীকে দেখিয়া ঈষৎ হাসিয়া নিকটস্থ দুইখানি কুশাসন ইঙ্গিত করিয়া দেখাইয়া দিল। বৃদ্ধাও তাহার সঙ্কেত বুঝিতে পারিয়া আমাদের দুইজনকে সেই দুইখানি আসনে বসিতে বলিয়া স্বয়ং নিকটে দাঁড়াইয়া রহিল।

কতক্ষণ এইরূপে কাটিল বলিতে পারি না। কিন্তু কিছু পরেই অপর দুই সন্ন্যাসী রূপসীর হাত ধরিয়া সেখান হইতে লইখা গেল, আমি চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলাম, কিন্তু আমার চীৎকারে কেহ ভ্রূক্ষেপও করিল না। আর ও কিছুক্ষণ এইরূপে অতিবাহিত হইল। তাহার পরে দেখিলাম, রূপসীর অচেতন দেহ সেই অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিল। পরক্ষণেই বুড়ী আমার হাত ধরিয়া ঘর হইতে বাহিরে আনিল এবং কত পথ ঘুরাইয়া একটা বাগানের নিকট আমায় ছাড়িয়া দিয়া উর্দ্ধশ্বাসে পলায়ন করিল।

আমিও চীৎকার করিতে লাগিলাম, কিন্তু যে স্থানে সেই বৃদ্ধ অ্যামকে ছাড়িয়া দিয়াছিল, সেখানে লোকজন নাই বলিলে ও চলে; এত চীৎকার করিলাম, এত কাঁদিলাম, কেহই আমার সাহায্যের জন্য আসিল না। এই সময় হইতে আমার আর কিছুই মনে নাই। আমি তাহার পর কি করিলাম, কেমন করিয়া এখানে ফিরিয়া আসিলাম, এখানে আসিয়াই বা কি করিলাম, কিছুই জানি না। যখন রাত্ৰি হইল, বর আসিয়া উপস্থিত হইল, তখন আমার জ্ঞান হইল; তখন আমি সমস্ত কথা প্ৰকাশ করিলাম।

এই বলিয়া গৌরী স্থির হইল এবং একদৃষ্টি আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। আমি তাহাকে কোন কথা  জিজ্ঞাসা না করিয়া শোভন সিংকে জিজ্ঞাসা করিলাম,–আপনার কন্যার গাত্রে কোন অলঙ্কার ছিল কি?

শো। আজ্ঞে হ্যাঁ, প্ৰায়; দুই সহস্র টাকার অলঙ্কার রূপসীর গাত্রে ছিল।

আ। আপনার ভাবী জামাতার মুখে শুনিলাম, আপনার আর্থিক অবস্থা বড় ভাল নহে। আপনি এত টাকার গহনা কোথায় পাইলেন?

শো। আমার ভাবী জামাতা সত্য সত্যই বলিয়াছেন। আমি অত্যন্ত দরিদ্র। কিন্তু বিবাহের দুই দিন পূর্বে আমার আত্মীয়গণ এখানে আসিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে অনেকেই ধন্যবানের পত্নী। তাঁহারাই জোর করিয়া তাহদের অলঙ্কারগুলি রূপসীকে পরাইয়া দিয়াছিল। আমি এখন ধনে প্ৰাণে মারা গেলাম।

আ। এ অঞ্চলে আপনার কেহ শত্ৰু আছে কি?

শোভন সিং কিছুক্ষণ চিন্তা করিলেন। পরে বলিলেন,  আমারই এক আত্মীয় আমার ঘোর শত্রু ছিলেন। তাঁহারও নিবাস এই গ্রামে ছিল। কিন্তু এক বৎসর হইল, ভজন সিং কোথায় নিরুদেশ হইয়া গিয়াছেন। শুনিয়াছিলাম, তিনি না কি সন্ন্যাসী হইয়া দেশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছেন।।

আ। তাহা হইলে যে সন্ন্যাসী রূপসীকে খুন করিয়াছে সেই হয় তা ভজন সিং–আপনার পুর্ব শত্ৰু। এতদিন কোনরূপ সুবিধা করিতে না পারায় আপনার উপর কোনরূপ প্ৰতিহিংসা লইতে পারে নাই। আজ আপনার কন্যার গাত্রে অনেক টাকা গহনা দেখিয়া কৌশলে সেই বুড়িকে পাঠাইয়া দিয়াছিল।

শো। আপনার অনুমান সত্য হইলেও হইতে পারে।

আ। আপনার আর কোন আত্মীয় আছে?

শো। আত্মীয়ের মধ্যে ভগ্নী—গৌরি তাহারই কন্যা।

আ। গহনাগুলিও কি তাঁহারই?

শো। আজ্ঞে না—সেও আমার মত দরিদ্রা, অত টাকা গহনা সে কোথায় পাইবে?

আ। তাঁহার নিবাস কোথায়?

শো। শিয়ালদহ ষ্টেশন হইতে কিছু দূরে।

আ। সধবা না বিধবা?

শো। আজ্ঞে সধবা–এই যে আমার ভগ্নিপতি আপনার সম্মুখেই দণ্ডায়মান।

এই বলিয়া শোভন সিং একজন বলিষ্ঠ যুবককে দেখাইয়া দিলেন।

 

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

শোভন সিংকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া আমি গৌরীকে বলিলাম, মা, আমাকে সেই ভাঙ্গা বাড়ীতে নিয়ে যেতে পার?

কিছুক্ষণ ভাবিয়া গৌরী বলিল, না–কোন রাস্তা দিয়ে যে সেই বুড়ি আমাদের দুজনকে নিয়ে গিয়েছিল, সে কথা আমার কিছুই মনে নাই। তা ছাড়া, তখন আমরা যে যে কার্য্য করেছি, যেন অজ্ঞান হয়েই করেছি।

আ। তুমি ত বলেছিলে, গাড়ী করে গিয়েছিলে?

গৌ। আজ্ঞে হাঁ–গাড়ী ক’রেই গিয়েছিলাম।

আ। কোচমানকে চেন?

গৌ। দেখলে চিনতে পারি।

আ। গাড়ীখানা কোথাকার?

গৌরী বিরক্ত হইয়া বলিল, সে কথা আমি কি জানি?

গৌরীকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিলাম না। ভাবিলাম, তাহার দ্বারা আমার কোন সাহায্য হইবে না। পদ্মপুকুর আমার জানা ছিল। সেখান হইতে কিছুদূরে আজ কাল যেখানে জণ্ড বাবুর বাজার সেখানে একটা ঠিকা গাড়ীর আস্তাবলও ছিল। সেই আস্তাবলে গিয়া সন্ধান লইবার ইচ্ছা হইল।

আমি তখন লাল সিংকে আশ্বাস দিয়া তাহার নিকট বিদায় লাইলাম এবং শোভন সিং এর বাটী হইতে বাহির হইবার উদযোগ করতেছি, এমন সময়ে শোভন সিং কাঁদিতে কাঁদিতে আমার কাছে আসিয়া বলিলেন, আমি ধনে প্ৰাণে মারা গেলাম। এই দুঃসময়ে লাল সিং আমাকে অন্যায় করিয়া যৎপরোনাস্তি অপমান করিতেছে। কিন্তু সে যাহাই হউক, আপনি আমার একটা উপকার করুন।–মে ব্যক্তি রূপসীকে খুন করিয়াছে তাহাকে ফাঁসী দিন। এখন আমার বেশ মনে পড়িতেছে যে, আমার সেই পূৰ্ব্বশত্রুই রূপসীকে খুন করিয়া তাহার গাত্রের অলঙ্কার গুলি আত্মসাৎ করিয়াছে। কিন্তু সে আপনাদিগের হস্ত হইতে পলায়ন করিতে পরিবে না, আপনাদের চক্ষে ধূলি দিতে পরিবে না। আজই হউক বা কালই হউক, সে নিশ্চয়ই ধরা পড়িবে। আপনি তাহাকে ফাঁসী দিয়া আমার অন্তরের জালা নিবারণ করুন। এই বলিয়া চিৎকার করিয়া রোদন করিতে লাগিলেন। অনেক সান্ত্বনার পর তিনি কিছু সুস্থ হইলে আমি সেখান হইতে বাহির হইলাম।

রাত্রি দশটা বাজিয়া গেল। যে সময়ের কথা বলিতেছি, তখন ভবানীপুর সহর হয় নাই। এখনকার মত এত লোকেরও বাস ছিল না। পথের দুই পার্থে তৈলের আলো মিটু মিটু করিয়া জ্বলিতেছিল, দুই একটা কুকুর পথের আবর্জনারাশির নিকট দাঁড়াইয়া আহারের দ্রব্য অন্বেষণ করিতেছিল; আর মধ্যে মধ্যে চীৎকার করিয়া পরস্পর বিবাদ করিতেছিল।

অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমি আস্তাবলে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। দুই তিন ব্যক্তি তখনই আমার নিকটে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আমার গাড়ীর প্রয়োজন আছে বি না?–আমারও গাড়ীর আবশ্যক ছিল, সেই মত উত্তর দিয়া একজনকে বলিলাম, তোমাদের মধ্যে কেহ কি আজ প্রাতে দুইটা বালিকা ও একজন বৃদ্ধাকে এখান হইতে কোথাও লইয়া গিয়াছিলে?

আমার প্রশ্ন শুনিয়া কিছুক্ষণ কেহ কোন কথা কহিল না; পরস্পর মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। কিছু পরে একজন উত্তর করিল, কই, না মহাশয়!

তাহার কথা আমার বিশ্বাস হইল না। আমি তাহার মুখ দেখিয়াই বুঝিতে পারিলাম যে, সে মিথ্যা কথা বলিয়াছে। বলিলাম,–কেন বাপু মিথ্যা কথা বলিতেছ? ভাড়া পাইয়াছ, লইয়া গিয়াছ, কোন অন্যায় কাজ কর নাই, লুকাইবার প্রয়োজন কি?

আমার কথায় আশ্বস্ত হইয়া একজন বলিয়া উঠিল,–আজ্ঞে সলামত কোচমান সে সওয়ারি নিয়ে গিয়েছিল। এখনও গাড়ী ফিরে আসে নি।

এই কথা শেষ হইতে না হইতে গাড়ীর শব্দ শোনা গেল। কিছুক্ষণ পরেই একখানা সেকেওক্লাস গাড়ী লইয়া সলামত উপস্থিত। তাহাকে দেখিয়া পূৰ্ব্বোক্ত ব্যক্তি বলিয়া উঠিল, ইহারই নাম সলামত।

আমার পোষাক দেখিয়া ও তাহার নাম শুনিয়া সলামতের ভয় হইল। সে লাগামটী গাড়ীর চালে বাঁধিয়া নামিয়া পড়িল। পরে আমার নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল,–কেন মশায়? আমাকে কি দরকার?

আমি বলিলাম,–আজি প্ৰাতে তুমি দুইটী বালিকা ও এক বৃদ্ধাকে যেখানে লইয়া গিয়াছিলে আমাকে এখনই সেখানে লইয়া চল।

সলামত প্রথমে কোন উত্তর করিল না। সে একমনে কি ভাবিতে লাগিল। আমি বললাম,–তোমার ঘোড়া যদি ক্লান্ত হইয়া থাকে আর দুইটী ঘোড়া ভাড়া কর। আমি ঘণ্টা হিসাবে ভাড়া দিব।

তবুও সলামত উত্তর করিল না। সে কেবল আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,–কথার উত্তর–দিতেছি না কেন? সহজে না রাজী হও অন্য উপায় দেখিব।

অনেক কষ্টে সলামত উত্তর করল,–সে জায়গাটা আমার ঠিক মনে নাই।

আমার রাগ হইল। আমি কর্কশ স্বরে বললাম,–দেখ সলামত! এই কাজ অনেকদিন থেকে করছি। তোমার মত অনেক লোক দেখেছি। তুমি একজন প্ৰবীণ লোক হ’য়ে মিথ্যা ক’রে বল, যে জায়গাটা মনে নাই? বিশেষ তুমি একজন পাকা কোচমান। একবার যে স্থান দেখবে সে আর জন্মে ভুলবে না।

আমার তোষামোদপূর্ণ কথায় সলামত ভুলিয়া গেল। বলিল, হুজুর, আমি মিছা বলি নি। যে পথ দিয়ে বুড়ী আমাকে নিয়ে গেল, সে পথ আমি আগে দেখি নি। এখনও যে আপনাকে সহজে নিয়ে যেতে পারবো এমন বোধ হয় না। চলুন, আমার ঘোড়া আজি বড় বেশী খাটে নাই, পাঁচটার সময় ঘোড়া বদল করেছি।

আমি দ্বিরুক্তি না করিয়া সলামতের গাড়ীতে উঠিলাম। বাসায় যাইবার জন্য যে গাড়ী ঠিক করিতেছিলাম, তাহার কোচমান ভাড়া না পাওয়ায় অতিরিক্ত বিরক্ত হইল, গাড়ী ঘুরাইয়া লইয়া সলামত অশ্বে কশাঘাত করিল। সেই রাত্রে বাসা ছাড়িয়া অন্যত্র যাইতে পক্ষীরাজদ্বয়ের ইচ্ছা ছিল না; তাহারা দু-একবার অনিচ্ছা প্ৰকাশ করিল। কিন্তু উপযুপরি কশাঘাতে অগত্যা দৌড়িতে বাধ্য হইল।

 

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

নকুলেশ্বর-তলা পার হইয়া গাড়ী ক্ৰমাগত দক্ষিণমুখেই যাইতে লাগিল। পূৰ্ব্বে দুই একটা আলোক দেখিতে পাইতেছিলাম, কিন্তু ক্ৰমে আর তাহাও দেখা গেল না। পথটা অতি সঙ্কীর্ণ, দুইপাৰ্থে বাগান বা বন। বড় বড় বৃক্ষ গুলিতে খদ্যোতকুল আশ্ৰয় লইয়াছিল। দূর হইতে সেগুলিকে অতি মনোরম দেখাইতেছিল।

একে রাত্রি দশটা বাজিয়া গিয়াছিল, তাহার উপর আকাশে চন্দ্র নাই। চারদিক ভয়ানক অন্ধকারে আচ্ছন্ন। পথে জনপ্রাণীর সাড়া-শব্দ নাই, কোথাও একটীও আলোক নাই। কোচমান অতি কষ্টে গাড়ীর আলোকে শকট-চালনা করিতেছিল।

কিছুদূর এইরূপে গমন করিয়া কোচমান সহসা গাড়ী থামাইল। আমি ভাবিলাম, বুঝি সে যথাস্থানে আসিয়া পড়িয়াছে এবং সেই মনে করিয়া গাড়ী হইতে অবতরণ করিতে উদ্যত হইয়াছি, এমন সময় কোচমান বলিল, বাবু! পথ ভুলে অন্যদিকে এসে পড়েছি। সে বাগান খানি এদিকে নয়। আমরা পূৰ্ব্বদিকে যে গলিটা ছেড়ে এসেছি, বোধ হয়। সেই পথেই আমাদিগকে যেতে হবে।

একে রাত্রি অধিক, তাহার উপর সেই ঘোর অন্ধকার, তাহতে আবার আমি ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম, কোচমানের কথায় আমার সৰ্ব্বাঙ্গ জলিয়া উঠিল। ক্ৰোধে কাঁপিতে কাঁপিতে আমি কর্কশাস্বরে বলিলাম, তুমি কি মনে করিয়াছ যে, আমার চক্ষে ধূলি দিয়া পলায়ন করিবে? আমি বহুদিন হইতে এই কাৰ্য্য করিতেছি। চোর, ডাকাত, দসু্যাদিগের সহিত আমার চির বিবাদ, বদ–মায়েসগণ আমার নাম শুনিলে থর থর বিকম্পিত হয়! আর তুমি একজন সামান্য কোচমান হষ্টয়া আমার সহিত চাতুরী করিতেছ? ধন্য তোমার সাহস! কিন্তু তুমি মনে করিও না যে, আমি তোমার কথায় ভুলিব না। যদি ভালো চাও, এখনই সেইস্থানে লইয়া চল।

আমাকে অত্যন্ত রাগান্বিত দেখিয়া কোচমান গাড়ি হইতে অবতরণ করিল এবং আমার পদতলে বসিয়া জোড়হাত করিয়া বলিল, হুজুর! আমার এমন সাহস নাই যে, আমি পুলিসের বাবুকে প্ৰবঞ্চনা করবো। আল্লার দোহাই, আমি সত্য সত্যই পথ ভুলে গিয়েছি। একে____ তে এই ঘোর অন্ধকার, আমি রাস্তা চিনতে পাচ্চি না। আপনি একটু এই গাড়ীতে বসুন, আমি একবার দেখে আসি।

এই বলিয়া উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই সে সেখান হইতে চলিয়া গেল। আমি সেই ভয়ানক তমসাচ্ছন্ন নিশীথে একাকী সেই অপরিচিত স্থানে বসিয়া রহিলাম। একবার মনে হইল, লোকটা যদি দলবল লইয়া হঠাৎ আমায় আক্ৰমণ করে, তাহা হইলেই আমার সর্বনাশ! এক দুই জনের বিরুদ্ধেও আত্মরক্ষা করিতে পারা যায়, কিন্তু যদি তিন চারিজন বা ততোধিক লোকে একেবারে চারিদিক হইতে আক্রমণ করে, তাহা হুইলে কি করিব? লোকটাকে ছাড়িয়া দিয়া ভাল করি নাই। সে ত স্বচ্ছন্দে গাড়ী লইয়া পথ অন্বেষণ করিতে পারিত! গাড়ীর সহিত আমাকে এখানে রাখিয়া গেল কেন? নিশ্চয়ই তাহার মনে কোন দুরক্তিসন্ধি আছে।

এই প্ৰকার চিন্তা করিয়া আমি পকেট হইতে ক্ষুদ্র পিস্তলটি বাহির করিলাম এবং গাড়ী হইতে নামিয়া নিকটস্থ একটা প্ৰকাণ্ড বৃক্ষের তলে গিয়া প্রচ্ছন্নভাবে দাঁড়াইয়া রহিলাম। ভাবিলাম, যদি কোচমান এক আইসে, তাহা হইলে কোন কথাই নাই। কিন্তু যদি লোক জন লইয়া আইসে, তাহা হইলে তাহার অভিপ্ৰায় নিশ্চয়ই মন্দ।

কিছুক্ষণ পরে অদূরে কাহার পদশব্দ শুনিতে পাইলাম। আমি পিস্তলটী ঠিক করিয়া ধরিলাম। কিন্তু আমার অনুমান মিথ্যা হইল। কোচমান একাই ফিরিয়া আসিয়া একেবারে গাড়ীর নিকটে গেল এবং দরজার নিকট দাঁড়াইয়া বলিল, হুজুর! পথ ঠিক করিয়াছি। আর কোন ভয় নাই।

কোচমানের কথায় আন্তরিক প্রীত হইলাম এবং ধীরে ধীরে আসিয়া পুনরায় গাড়ীতে উঠিয়া বসিলাম। কোচমান ভাবিল, আমি বুঝি প্রস্রাব করিতে গিয়াছিলাম। সেই ভাবিয়া সে বলিল, বাবু, প্রস্রাব করতে কতদূরে গিয়েছিলেন, এই অন্ধকারে কে আপনাকে দেখতে পেত, পেলেই বা আপনার কি করতো?

আমি সে কথার কোন উত্তর করিলাম না, বলিলাম, যদি ঠিক সন্ধান পাইয়া থাক, তবে একটু শীঘ্ৰ লইয়া চল। রাত্ৰি অনেক হইয়া গিয়াছে। এমন সময় সেখানে গিয়া যে আজ কাৰ্য্য সিদ্ধ করিতে পারি, এমন ত বোধ হয় না।

কোচমান কোন উত্তর না দিয়া অশ্বে কশাঘাত করিল। অশ্বদ্বয় উৰ্দ্ধশ্বাসে দৌড়িল। প্ৰায় আধঘণ্টা পরে একটি প্ৰকাণ্ড বাগানের ভাঙ্গা ফটকের নিকট গাড়ী থামাইয়া কোচমান বলিল, হুজুর, এই সেই বাগান। এই বাগানের ভিতর একখানা ভাঙ্গা বাড়ী আছে। বুড়ী মেয়ে দুটিকে নিয়ে সেই বাড়ীতে গিয়েছিল। তার পর কি হ’ল আমি জানি না।

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, বাগানখানি কার? কো।

কো। আজ্ঞে সে কথা বলতে পারলাম না। এদিকে আমি কখনও আসি নাই।

আ। নিকটে কোন বাড়ী আছে?

কো। আজ্ঞে না। চারদিকেই বাগান।

আ। বাগান থাকিলে নিশ্চয়ই মালি আছে, তাহাঁদের বাস করিবার ঘরও আছে। সকালে কোন মালীর সহিত তোমার দেখা হইয়াছিল?

কো। অজ্ঞে না–জন প্ৰাণী না।

আ। এইখান হইতে ফাঁড়ী করদূর?

কো। প্ৰায় এক ক্ৰোশ।

আ। তোমাকে বলিষ্ট বলিয়া বোধ হইতেছে, চল দেখি, উভয়ে বাগানের ভিতর যাই। প্রয়োজন হইলে তোমাকে আমার সাহায্য করিতে হইবে। পরিবে?

কো। হুজুর–খুব পারিব। আমি একাই তিনজনকে রাখবো।

ঈষৎ হাসিয়া কোচমানকে সঙ্গে লইলাম এবং অতি সন্তর্পণে সেই অন্ধকারের ভিতর দিয়া বাগানে প্ৰবেশ করিলাম। আমার পকেটে চোরা লণ্ঠন ছিল, বাহির করিয়া জ্বলিয়া ফেলিলাম এবং সেই আলোকের সাহায্যে অতি ধীরে ধীরে একটা ভগ্ন অট্টালিকার দ্বারে উপনীত হইলাম। দেখিলাম, দরজা খোলা। কোচমানকে সঙ্গে লইয়া আনি সেই দ্বার অতিক্ৰম করিলাম এবং অতি সন্তৰ্পণে ভিতরে প্রবেশ করিলাম।

বাহিরেও যেমন অন্ধকার, ভিতরেও ততোধিক, যতক্ষণ বাহিরে ছিলাম, চোরা লণ্ঠনটি হাতে ছিল, তাহারই মৃদু আলোকে কিছু? কিছু দেখিতে পাইতেছিলাম না। কিন্তু ভিতরে যাইয়া লণ্ঠনটীপকেটে রাখিলাম। ভাবিলাম, যদি কেহ দেখিতে পায়, এখনই পলায়ন করিবে, তাহা হইলে সেই ঘোর অন্ধকারের মধ্যে কাহকেও খুঁজিয়া বাহির করা বড় সহজ হইবে না।

কিছুদূর অগ্রসর হইয়া একটা প্ৰকাণ্ড ঘরের দরজার সম্মুখে আসিলাম। বাহির হইতে দেখিলাম, ভিতরে তিনজন প্ৰশান্তমূৰ্ত্তি সন্ন্যাসী একমনে ধ্যানে নিমগ্ন। সকলেরই চক্ষু মুদিত; সকলেই নাভীর নিম্নে করন্থয় মিলিত করিয়া একাগ্ৰচিত্তে ঈশ্বরোপাসনায় নিযুক্ত। সম্মুখে প্ৰজ্বলিত অগ্নি ধুধু শব্দে জ্বলিতেছিল।

তাহাদের গভীর ও প্ৰশান্ত মূৰ্ত্তি দেখিয়া আমার ভক্তির উদ্রেক হইল। যে কাৰ্য্যে গিয়াছিলাম, সহসা তাহা করিতে পারিলাম না। ভাবিলাম, এমন শান্তমূৰ্ত্তি যাহাঁদের, তাহারা নারীহত্যা করিবে কেন? কিন্তু পরিক্ষণেই দেখিলাম, তিনজনের ললাটদেশে সিন্দুরের দীর্ঘফোটা, গলে রুদ্রাক্ষ মালা, হস্তেও অনেকগুলি রুদ্রাক্ষ, পরিধানে রক্তবর্ণ পট্টবাস, গলে যজ্ঞোপবীত। বেশ দেখিয়াই বোধ হইল, তাহারা কাপালিক। শক্তি–উপাসক। শুনিয়াছি, কাপালিকগণ  সিদ্ধ হইবার জন্য নরহত্যা করিতেও পশ্চাৎপদ হয় না। এরূপ ঘটনা অনেক শোনা গিয়াছিল। কিন্তু তাহদের দ্বারা নারীহত্য এক প্রকার অসম্ভব বলিয়া বোধ হইল। যে শক্তির উপাসনার জন্য তাহারা সেই কঠোর নিয়ম প্ৰতিপালন করিতেছে, ইচ্ছা! করিয়া কেন তাহারা সেই শক্তিকে খুন করিবে, বুঝলাম না।

যাহাই হউক, দ্বার সমীপে গিয়া যখন দেখিলাম, তিনজন মাত্র সন্ন্যাসী—আর কোন লোক নাই, তখন আমার সাহস হইল। আমি বাহির হইতে জুতার শব্দ করিতে লাগিলাম। ভাবিলাম, সে শব্দে তাহাদের ধ্যান ভঙ্গ হইবে। কিন্তু আমার অনুমান মিথ্যা হইল। তাহাদের কেহই চক্ষু উল্মীলন করিল না, সকলেই পূর্বের মত ধ্যানে নিমগ্ন রহিল।

আমি আর বিলম্ব করিতে পারিলাম না। কোচমানকে ৰাহিরে রাখিয়া আনি একাই ভিতরে যাইলাম এবং চীৎকার করিয়া ডাকিতে লাগিলাম। অনেক ডাকাডাকির পর সর্বাপেক্ষা কনিষ্ঠ চক্ষু চাহিল, কিন্তু সম্মুখে আমাকে দেখিয়া পুনরায় চক্ষু মুদিত করিল। আমি বিষম ফাপরে পড়িলাম। কাহারও নাম জানি না. সুতরাং কি বলিয়া ডাকিব স্থির করিতে না পারিয়া, পুনরায় চিৎকার করিতে লাগিলাম। প্ৰায় আধা ঘণ্টা পরে বয়োজ্যেষ্ঠ সন্ন্যাসী চক্ষু উন্মীলন করিল, আমাকে পরিষ্কার বাঙ্গালা ভাষায় জিজ্ঞাসা করিল, কেন বাপু! এখানে এত গোলযোগ করিতেছি? গোলমালের ভয়ে আমরা লোকালয় ছাড়িয়া এই নির্জন বনের মধ্যে আশ্ৰয় লইয়াছি। আর তুমি কি না। স্বচ্ছন্দে এখানে আসিয়া আমাদের ধ্যান ভঙ্গ করিতেছ। আকৃতি দেখিয়া তোমায় জ্ঞানবান বলিয়া বোধ হইতেছে, কিন্তু এ কি কাজ তোমার!

গৌরীর মুখে যাহা শুনিয়াছিলাম, তাহাতে তাহদের উপর কিছুমাত্র ভক্তির উদ্রেক হয় নাই। বরং তাহার মুখে ঐ কথা শুনিয়া আমার ক্ৰোধ হইল। রাগ সম্বরণ করিয়া ঈষৎ কর্কশ স্বরে বলিলাম, আর তোমার সাধুগিরিতে কাজ নাই। এখন ওঠ, আমার সঙ্গে থানায় চল।

থানার নাম শুনিয়া সন্ন্যাসীর কিছুমাত্র ভয় হইল না। সে হাসিয়া উঠিল, পরে বলিল, চল, আমাদিগকে যেখানে লইয়া যাইবে সেইখানেই যাইব। কিন্তু সেখানে যেন একটু নির্জন স্থান পাই, আমরা যেন নির্বিবাদে ধ্যান করিতে পারি।

আমি হাসিয়া উঠিলাম। হাসিতে হাসিতে বলিলাম, এখন বুজরুকি রাখ ঠাকুর! সকালে যে কাণ্ড করেছ, তাহাতে শীঘ্রই চিরধ্যানে নিমগ্ন হতে হবে। আগে উঠ, পরে এই দুই জনকে নিয়ে শীঘ্র আমার সঙ্গে এস।

সন্ন্যাসী গম্ভীরভাবে বলিল, সত্যই কি আমাদিগকে তোমার সহিত যাইতে হইবে? সকালে কি কাণ্ড করেছি বাবা?

আ। এখনও বলিতেছি, বুজরুকি রাখ, সকালে কি করেছ জান না কি?

স। ধৰ্ম্মই আমাদের একমাত্র অবলম্বন। আমি সেই ধৰ্ম্মের দোহাই দিয়ে বলিতেছি যে, সত্যই আমি তোমার কথা কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না।

আমি বিস্মত হইলাম। বলিলাম, সে কি! শোভন সিংহের কন্যাকে খুন করিয়া আবার মিথ্যা কথা বলিতেছ? তুমি কেমন সন্ন্যাসী? শক্তির উপাসক হইয়া শক্তিকে খুন?

আমার কথা শুনিয়া সন্ন্যাসী হাসিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ পরে বলিল, বাবা! তোমার ভুল হইয়াছে। কোথায় আসিতে কোথায় আসিয়াছ, আমরা শোভন সিংএর কন্যাকে আজ দেখিও নাই।

আ। আজ দেখ নাই, তবে কি আর কখনও দেখিয়াছিলে?

স। সে অনেক দিনের কথা।

আ। তবে তুমি শোভন সিংকে চেন?

স। বেশ চিনি, আমারই এক আত্মীয়ের নাম শোভন সিং। রূপসী নামে তার এক কন্যা ছিল। কিন্তু জানি না, সে এখন ও জীবিত কাছে কি না?

আ। তোমার আত্মীয়ের নিবাস কোথায়?

স। নিকটেই–এই ভবানীপুরেই তাহার বাড়ী।

আ। আর তোমার?

স। তাহারই বাড়ীর নিকটে ছিল; কিন্তু এখন আর নাই। এখন _____ সেই আমার বাড়ী।

আ। কত দিন হইল তুমি এই বেশ ধরিয়াছ?

স। প্ৰায় দুই বৎসর হইল।

আ। সংসার ত্যাগ করিলে কেন?

স। সে অনেক কথা।

আ। শোভন সিং কি তোমার শত্রু।

স। না–এ জগতে আমার শত্রু ও কেহ নাই, মিত্ৰও কেহ নাই।

সন্ন্যাসীর কথা শুনিয়া আমার সন্দেহ বৃদ্ধি হইল। ভাবিলাম, সে নিশ্চয়ই মিথ্যা কথা বলিতেছে। পাছে শোভন সিংকে শক্ৰ বলিয়া প্ৰকাশ করিলে আমার মনে সন্দেহ হয়, এই মনে করিয়া সে বোধ হয় কথাটা লুকাইল। এইরূপ চিন্তা করিয়া বলিলাম, আজি প্ৰাতে কি কোন বৃদ্ধা তোমার নিকট দুইজন বালিকা আনিয়া ছিল?

স। কেমন করিয়া জানিব? সমস্ত দিনের পর এই আমি চক্ষু চাহিতেছি।

দআ। বৃদ্ধ যে দুইটী বালিকাকে এখানে আনিয়াছিল তাহার সাক্ষী আছে। যে গাড়ীতে করিয়া তাহারা তোমার নিকট আসিয়া ছিল, সেই গাড়ীর কোচমান আমার সঙ্গেই আছে।

স। হইতে পারে—আপনার কথা যথার্থ হইতে পারে। কিন্তু আমি আজ সমস্ত দিনই ধ্যানে নিমগ্ন।

কথায় কথায় রাত্রি অনেক হইয়া গেল দেখিয়া, আমি তাহাকে বলিলাম, বিচার পরে হইলে, এখন তোমরা তিনজন আমাদের সঙ্গে আইস।

দ্বিরুক্তি না করিয়া সেই সন্ন্যাসী অপর দুইজনের ধ্যান ভঙ্গ করিল। তখন তিনজনে মিলিয়া আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বাহির হইল এবং বাগান পার হইয়া সেই ভাঙ্গা ফটকের নিকট উপস্থিত হইল। ফটকের সম্মুখেই গাড়ী ছিল। আমি সন্ন্যাসী তিনজনকে তাহাতে উঠিতে বলিলাম। সকলে গাড়ীতে উঠিলে, কোচমান শকট চালনা করিল।

বাসায় ফিরিতে রাত্রি একটা বাজিয়া গেল। তখন সন্ন্যাসী তিনজনকে আটক করিতে বলিয়া আমি বিশ্ৰাম লাভ করিলাম।

 

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পরদিন প্ৰাতঃকালে সমস্ত কাৰ্য্য ত্যাগ করিয়া অগ্ৰে সেই সন্ন্যাসীত্রিয়কে দেখিতে গেলাম। যে ঘরে তাহাদিগকে আবদ্ধ করিয়া রাখিতে বলিয়ছিলাম, তাহার দ্বারে দুইজন প্রহরী ছিল। সন্ন্যাসীদিগের কাৰ্য্য লক্ষ্য করিতে এবং তাহদের কথোপকথন শুনিবার জন্য আমি তাহাদিগকে পূর্ব রাত্রে নিযুক্ত করিয়াছিলাম। প্রহরীদ্বয়ের মুখে যাহা শুনিলাম, তাহাতে তাহাদিগের উপর কোনরূপ সন্দেহ করা যায় না। তাহারা বলিল, সন্ন্যাসীগণ কোন কথা কহে নাই, যেখানে বসিতে বলা হইয়াছিল সমস্ত রাত্রি সেই–স্থানে চক্ষু মুদিত করিয়া বসিয়াছিল। ঘরে এক সামান্য আলোক দেয়া হইয়াছিল কিন্তু একমুহূর্ত্তের জন্যেও চক্ষু উন্মীলন করে নাই, কথা কহা দূরে থাক, কেহ একটী শব্দও করে নাই। অথচ গৌরীর মুখে যাহা শুনিলাম, তাহাতে ত তাহাদিগের উপরই ভয়ানক সন্দেহ হয়। এ কি রহস্য!

একজন সন্ন্যাসীর মুখে শুনিলাম, শোভন সিং তাহার পরিচিত। শোভন সিং বলিয়াছিলেন, ঐ সন্ন্যাসী তাহার পরম শক্রি। এত দিন সুবিধা পায় নাই বলিয়া কোন অপকার করিতে পারে নাই। সন্ন্যাসী। কিন্তু সে কথা স্বীকার করিল না। তবে কি সন্ন্যাসীত্রয় নির্দোষী? আমি কি অন্যায় সন্দেহ করিয়া তাহাদিগকে অবরুদ্ধ করিয়াছি। যদি তাঁহাই হয়, তাহা হইলে আমার যথেষ্ট পাপ সঞ্চয় হইল, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু গৌরীর কথাই বা কেমন করিয়া মিথ্যা বলি। গৌরীর বয়স চৌদ্দ–পনের বৎসরের অধিক হইবে না। এ বয়সে সে যদি এত মিথ্যা কথা সাজাইয়া বলিতে পারে, তাহা হইলে বড় হইলে সে কি করিবে বলা যায় না। এইরূপ চিন্তা করিয়া আমি সন্ন্যাসীদিগের নিকট গমন করিলাম। দেখিলাম, তখনও তাঁহাদের চক্ষু মুদিত। একবার তাহাদের জিনিষপত্রগুলি দেখিবার ইচ্ছা হইল। কিন্তু সন্ন্যাসীদিগের আবার কি জিনিষ থাকিবে? যাহারা সংসার ত্যাগ করিয়াছে, যাহারা মন হইতে বাসনা দূর করিয়াছে, তাহারা আবার সঞ্চয় করিবে কি? তবে যদি ভণ্ড হয়, তাহা হইলে কিছু পাইলেও পাইতে পারি। এই ভাবিয়া আমি তাহদের পরিচ্ছদ, কমণ্ডলু প্রভৃতি দ্রব্য গুলি অন্বেষণ করিতে আদেশ করিলাম।

যে দুইজন কনষ্টেবল প্রহরী ছিল, তাহারা তখনই আমার আদেশ পালন করিল, কিন্তু আমার উদ্দেশ্য সফল হইল না। ভাবিয়াছিলাম, যদি দুই একখানা গহনা বাহির করিতে পারি, তাহা হইলে তাহারা নিশ্চয়ই রূপসীকে খুন করিয়াছে। কিন্তু সেরূপ কোন? নিদর্শন পাওয়া গেল না।

এইরূপ গোলযোগে সন্ন্যাসীগণের ধ্যান ভঙ্গ হইল। আমি তখন অপর সকলকে সেখান হইতে দূর করিয়া। গত রাত্রে যাহার সাহিত কথা কহিয়াছিলাম, তাহাকে বললাম, শোভন সিং তোমার নামে যে দোষারোপ করিয়াছেন, তাহাতে তোমাকে ফাঁসী কাষ্ঠে ঝুলিতে হইবে। যদি নিজের মঙ্গল চাও, তাহা হইলে যাহা জানি সত্য করিয়া প্ৰকাশ কর। শোভন সিং বলেন যে, তুমি তাহার পরম শত্রু এবং আর কোন উপায়ে প্ৰতিশোধ লইতে না পারিয়া অবশেষে তাহার এক কাত্ৰ কন্যাকে হত্যা করতঃ তাহার গাত্রের প্ৰায় দুই সহস্র টাকার অলঙ্কার অপহরণ করিয়াছ। শোভন সিংএর মুখে শুনিয়াছিলাম, সেই সন্ন্যাসীর নাম ভজন সিং। সত্য মিথ্যা জানিবার জন্য আমি সন্ন্যাসীকে নাম জিজ্ঞাসা করিলাম। সন্ন্যাসী উত্তর করিল, সত্যই তার নার নাম ভজন সিং।

আমার কথা শুনিয়া ভজন সিং হাসিয়া উঠিল। বলিল, আমি তাহার শত্রু? না মহাশয়, সংসার-বিরাগী সন্ন্যাসী কাহারও শত্রুতাচরণ করে না। এ জগতে আমারও শত্রু কেহ নাই, আমিও কাহার শত্রু নয়। যেরূপ করিলে আপনার বিশ্বাস হয়, আপনি স্বচ্ছন্দে তাঁহাই করুন, আমার তাহাতে কোন প্ৰকার ক্ষতি বৃদ্ধি হইবে না। জীবন ক্ষণস্থায়ী, আজ হউক বা দুদিন পরেই হউক, কোন না কোন দিন আমাকে মরিতেই হইবে।

আ। আমি শুনিয়াছি, তুমি অতি অল্পদিনেই বিবাগী হইয়াছ, এখনকার কথা বলিতেছি না, পূর্বে যখন তুমি সংসারাশ্রমে ছিলে, তখনকার কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি। শোভন সিংএর সহিত  তোমার কিরূপ সম্পর্ক আছে? কেনই বা তুমি সংসার ছাড়িয়া সন্ন্যাসী হইলে?

স। সমস্তই বলিতেছি—যদি একান্তই শুনিতে চান, শুনুন। পূৰ্বেই বলিয়াছি, আমার নাম ভজন সিং, আমি পিতার একমাত্র পুত্র। অল্প বয়সেই মাতৃহীন হওয়ায় আমি পিতার বড় আদরের সামগ্ৰী ছিলাম। আমার এক জ্ঞাতি ভগ্নী ছিল, পিতৃমাতৃহীন হওয়ায় সে আমাদের বাড়ীতেই প্ৰতিপালিতা। তাহার সহিত শোভন সিংহের বিবাহ হয়। শোভন সিং সম্পর্কে ভগ্নীপতি। ভগ্নীপতি হইলেও শোভন সিং আমাকে দেখিতে পারিত না। আমিও তাতার সহিত মিশিতাম না। ক্ৰমে এই মনোবিধাদের বুদ্ধি হইতে লাগিল, আমি তাহার ছায়াও স্পর্শ করিতাম না। শোভন সিং কিন্তু আমার অপকারের চেষ্টা করিতে লাগিল। সুবিধা পাইলেই আমার অনিষ্ট করিতে লাগিল। এই সময়ে হঠাৎ হৃদরোগে আমার পিতার মৃত্যু হয়। যখন আমি তাহার সমম্ভ সম্পত্তির অধিকারী হইলাম, তখন হইতে শোভন সিংহের মতিগতি ফিরিতে লাগিল। উপযাচক হইয়া আমার সহিত দেখা করিল, কত মিষ্ট কথায় আমাকে সান্ত্বনা করিল, আপনার অসদাচরণের জন্যবারম্বার ক্ষমা প্রার্থনা করিল। শোভন সিংহের তৎকালীন অবস্থা ও কথাবাৰ্ত্তা শুনিয়া আমার মনে কেমন বিশ্বাস হইল। আমি তাহার বশীভূত হইলাম। ক্রমে ঘনিষ্টতা হইল। উভয়ে মিলিয়া জুয়ার দলে মিশিলাম। তাহার পর যাহা ঘটিল তাহা আর বলিবার নয়। অল্প দিনের মধ্যে আমি নিঃসম্বল হইয়া পড়িলাম। পিতার বহু কষ্টে সঞ্চিত প্ৰায় লক্ষাধিক টাকা জুয়া খেলিয়া জলে ফেলিয়া দিলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাহার অধিকাংশই শোভন সিংএর উদর পূর্ণ করিয়াছিল। আমাকে নিঃস্ব করিয়াও শোভন সিংএর তৃপ্তি হইল না, সে আমাকে চোর বলিয়া ধরাইয়া দিল। সৌভাগ্যক্রমে দুইজন, ভদ্রলোক সাক্ষী ছিলেন বলিয়াই সে যাত্ৰা অব্যাহিত পাই। এইরূপে নানা কারণে মনে কেমন বৈরাগ্য উপস্থিত হইল, আমি সংসার ছাড়িয়া গুরুর নিকট যাইলাম। সেখানে দীক্ষা লইয়া সেই নির্জন বনে সাধনা করিতে থাকি। কিছুদিন হইল, এই দুইজনের ইচ্ছায় আমাকে এখানে আসিতে হইয়াছে। কিন্তু এখানেও নিস্তার নাই—শোভন সিং আমাকে প্ৰাণে মারিবার চেষ্টা করিতেছে। কিন্তু তাহাতে সন্ন্যাসীর কি করিবে?

এই বলিয়া সন্ন্যাসী স্থির হইল। সে যে ভাবে কথা গুলি বলিল, তাহাতে তাহার কথা অবিশ্বাস করিতে পারিলাম না। তাহার কথাবার্ত্তায় তাহাকে বিদ্বান ও মহাশয় ব্যক্তি বলিয়া বোধ হইল এবং এতক্ষণ যে তাহার প্রতি উপযুক্ত সন্মান প্ৰদৰ্শন করা হয় নাই, তজ্জন্য অনুতপ্ত হইলাম। আমি তখন অতি বিনীতভাবে বলিলাম—শোভন সিং আপনাকেই তাঁহার কন্যার হত্যাকারী বলিয়া সন্দেহ করিয়াছে এবং তাঁহারই কথামত আমি আপনাদিগকে গ্রেপ্তার করিতে বাধ্য হইয়াছি। এখন আপনার মুখে যে সকল কথা শুনিলাম, তাহাতে আমার অবিশ্বাস নাই। কিন্তু তাহা হইলেও আমি এখন আপনাকে মুক্তি দিতে পারিব না। যতদিন না। আপনার বিচার হয়, ততদিন এরূপে থাকিতে হইবে। শোভন সিংয়ের ভাগীনেয়ী আপনাকে দেখিয়াছিল। আমি এখনই তাহাকে এখানে ডাকিয়া আনাইতেছি। যদি সে সনাক্ত করে, তাহা হইলে বিচারে কি হয় বলা যায় না।

সন্যাসী ভজন সিং ঈষৎ হাসিয়া বলিল—মৃত্যুর জন্য ভয় করি না–যদি অদৃষ্ট থাকে তবে আমার এই অপঘাত মৃত্যুও কেহ রোধ করিতে পরিবে না। কিন্তু দেখিতেছি, আপনি ব্ৰাহ্মণ সন্তান। দেখিবেন, যেন ভ্ৰমক্রমে একজন নিরীহ ব্ৰাহ্মণের মৃত্যুর উপলক্ষ না হন।

আমি সাগ্রহে উত্তর করিলাম,–আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করিব। যাহাতে প্ৰকৃত দোষীকে গ্রেপ্তার করিয়া আপনাকে মুক্ত করিতে পারি, তজ্জন্য প্ৰাণপণে চেষ্টা করিব। তবে ভবিতব্যের কথা বলিতে পারি, এমন ক্ষমতা আমার নাই।

 

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

সন্ন্যাসী ভজন সিংএর নিকট বিদায় লইয়া আমি তখনই একজন লোককে শোভন সিংএর বাড়ীতে পাঠাইয়া দিলাম, দুইজন উপযুক্ত লোককে সন্ন্যাসীদিগের আড্ডায় গিয়া সেই ঘরটি বিশেষ করিয়া অন্বেষণ করিতে আদেশ করিলাম এবং অপর একজনকে লাল সিংএর নিকট প্রেরণ করিলাম।

সন্ন্যাসী গ্ৰেপ্তার হইয়াছে শুনিয়া, শোভন সিং ভাগিনেয়ীকে লইয়া কিছুক্ষণ পরেই আমার নিকটে আসিলেন। আমি গৌরীকে সেই সন্ন্যাসিদিগের নিকট লইয়া গেলাম। গৌরী তাহাদিগকে দেখিয়াই চীৎকার করিয়া সেখান হইতে পলায়ন করতঃ শোভন সিংএর পশ্চাতে গমন করিল। তাঁহার ভাব-গতিক দেখিয়া অমি স্পষ্টই বুঝিতে পারিলাম যে, সে ঐ সন্ন্যাসী তিনজনকেই দেখিয়াছিল।

শোভন সিং আমার নিকট যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিলেন। এক রাত্রের মধ্যে হত্যাকারীকে গ্ৰেপ্তার করিয়াছি বলিয়া আমার যথেষ্ট সুখ্যাতি করিলেন। কিন্তু আমার সে সকল বড় ভাল বোধ হইল না। আমিও মিষ্ট কথায় তাহাকে বিদায় দিয়া বলিলাম, প্ৰয়োজন হইলে সংবাদ দিব।

শোভন সিং চলিয়া গেলেন। প্ৰায় একঘণ্টা পরে যে দুইজন লোককে সন্ন্যাসীর সেই বাসস্থানে অন্বেষণ করিতে পাঠাইয়াছিলাম, তাহারাও ফিরিয়া আসিল এবং একছড়া স্বৰ্ণ-হার আমার হস্তে দিয়া বলিল যে, তাহারা সেই ঘরাটী তন্ন তন্ন করিয়া অন্বেষণ করিয়াছে কিন্তু ঐ একছড়া হার ভিন্ন আর কোন গহনা দেখিতে পায় নাই।

হারছড়া পরে একমনে ঐ সকল বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলাম। ভাবিলাম, সন্ন্যাসীর কথা কোনরূপেই অবিশ্বাস করা যায় না। তিনি শোভন সিং সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন, তাহাও সত্য বলিয়া বোধ হইল। লোকটা তাহাকে উৎপীড়ন করিতে প্ৰাণপণে চেষ্টা করিয়াছে এবং এখনও যে করিবে, তাহাতে আর আশ্চৰ্য্য কি? কিন্তু এই হারছড়া কোথা হইতে আসিল? গত রাত্রে আমি স্বয়ং অন্বেষণ করিয়াছিলাম। কিন্তু কই, তখন ত কিছুই দেখিতে পাই নাই। অতি সামান্য সময়ের মধ্যেই যখন হারছড়া খুঁজিয়া পাইয়াছে, তখন ইহা বিশেষ লুকান ছিল এমন বোধ হয় না। একি রহস্য? তবে কি সত্যসত্যই সন্ন্যাসী হইয়া বালিকা হত্যা করিল?

কিছুক্ষণ এইরূপ চিন্তা করিয়া স্থির করিলাম, সন্ন্যাসী নিশ্চয়ই সত্য বলিয়াছেন। শোভন সিং লাল সিংএর সহিত যেমন ব্যবহার করিয়াছে, তাহাতে তাহাকেই শঠ ও প্রতারক বলিয়া বোধ হইতেছে। এরূপ অনেক দেখা গিয়াছে যে, প্ৰকৃত দোষী অপরের স্কন্ধে দোষারোপ করিবার জন্য অনেক প্রকার উপায় অবলম্বন করিয়াছে। শোভন সিং যেরূপ প্রকৃতির লোক, তাহাতে তাহার পক্ষে উহা নিতান্ত অসম্ভব নহে।

এইরূপ চিন্তা করিতেছি, এমন সময়ে লাল সিং সেখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। আমি তাহাকে সমস্ত কথা প্ৰকাশ করিলাম। তিনি শুনিয়া অত্যন্ত আশ্চৰ্য্যান্বিত হইলেন। বলিলেন,–আপনি যাহা অনুমান করিয়াছেন, তাহাই সম্পূর্ণ সত্য। শোভন সিং অত্যন্ত চতুর—তিনি না পারেন এমন কাজ অতি অল্প। সেই গত রাত্রে আপনার ফিরিয়া আসিবার পর কোনরূপে ঐ হারছাড়াটী সেখানে রাখিয়া আসিয়াছে। যদি তাহা না হইবে, তাহা হইলে আপনি কালই রাত্রে ঐ হার পাইতেন।

আ। যদিও আমি ভালরূপ অন্বেষণ করিবার অবকাশ পাই নাই, তত্রাপি যখন দুই ব্যক্তি এত অল্প সময়ের মধ্যে এই হার বাহির করিতে পারিল, তখন আমি যে একেবারেই উহা দেখিতে পাইলাম না, ইহাও বিশ্বাসযোগ্য নহে। হারছড়া নিশ্চয়ই তখন সেখানে ছিল না, পরে রক্ষিত হইয়াছিল।

লা। ঠিক বলিয়াছেন–আমার বিশ্বাস রূপসী এখনও জীবিত আছে। কেবল আমাকে ফাঁকি দিবার জন্যই ঐ মিথ্যা কথা রাষ্ট্র করিয়াছে। বিবাহ না দিলে পাছে আমার টাকা ফেরৎ দিতে হয়, এই ভয়ে আপনার কন্যার মৃত্যু সংবাদ রাষ্ট্র করিয়াছে।

আ। আমারও সেইরূপ মনে হয়। কিন্তু যে বৃদ্ধ গৌরী ও রূপসীকে ভুলাইয়া লইয়া গিয়াছিল, সে কে? তাহাকে ধরিতে না পারিলে এ রহস্য ভেদ করা অতীব দুরূহ হইবে। আপনি সে বুড়ীকে চেনেন? কোন প্রকার অনুমান করিতে পারেন?

লাল সিং কিছুকাল কোন উত্তর করিলেন না; একমনে কি চিন্তা করিতে লাগিলেন। পরে ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন,–রূপবতী পত্নী সত্ত্বেও, শুনিয়াছি, শোভন সিং অপর এক বেশ্যার প্রেমে মুগ্ধ হইয়াছিল। সে তাহারই সমবয়স্ক, দেখিতে নিতান্ত মন্দ নহে, কিন্তু তাঁহার স্ত্রীর সহিত কোন বিষয়েই তাহার তুলনা হয় না। এ ছাড়া, আমি আর কোন রমণীর সহিত শোভন সিংএর ঘনিষ্টতা আছে কি না জানি না। একে বেশ্য, তাহাতে বয়স হইয়াছে, তাহার উপর তাহার অবস্থাও এখন হীন হইয়া পড়িয়াছে। সুতরাং তাহাকে যে বুড়ীর মত দেখাইবে, আশ্চর্য্য কি? কিম্বা সে হয় ত বৃদ্ধার ছদ্মবেশ করিয়া থাকিবে। কেন না, গোপনে বালিকা ভুলাইয়া লইয়া যাওয়া বড় সহজ ব্যাপার নহে। যে সে লোকের উপর এমন কাজের ভার দেওয়া যায় না। আমার বোধ হয়, সেই মাগীরই এই কাজ।

অ্যা। আপনি তাহার বাড়ী জানেন?

লা। চেষ্টা করিয়া বাহির করিব। শুনিয়াছিলাম, মেছুয়া বাজারে তাহার বাসা। তাহার নাম কামিনী।

আমি সন্তুষ্ট হইলাম। তাঁহাকে কামিনীর সন্ধান করিতে বলিলাম। লাল সিং তখনই বিদায় লইলেন।

 

সপ্তম পরিচ্ছেদ

বেলা প্ৰায় চারিটার সময় লাল সিং পুনরায় আমার নিকট আগমন করিলেন। তাঁহার মুখ দেখিয়াই আমি বুঝতে পারিলাম যে, তিনি কাৰ্য্যে সফল হইয়াছেন।

লাল সিং আমার নিকটে বসিয়া বলিলেন, তিনি কামিনীর সন্ধান পাইয়াছেন। বয়স অধিক না হইলেও বাতে তাহাকে বৃদ্ধা করিয়াছে। আমি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তিনি কামিনীর পরিচিত কি না? লাল সিং বলিলেন, বহুদিন পূর্বে একবার মাত্র তিনি কামিনীর বাড়ীতে গিয়াছিলেন। সেই অবধি আর তাহাদের সাক্ষাৎ হয় নাই।

লাল সিংএর কথা শুনিয়া আমি তখনই ছদ্মবেশ পরিধান করিলাম এবং তাঁহাকে লইয়া একখানি ভাড়াটীয়া গাড়ীতে আহোরণ করিয়া, কামিনীর বাসা হইতে কিছুদূরে আমরা গাড়ী হইতে অবতরণ করিলাম এবং ধীরে ধীরে সেইদিকে যাইতে লাগিলাম।

যখন বাড়ীর নিকট উপস্থিত হইলাম, তখন প্রায় সন্ধ্যা। সেদিন শনিবার। আমি বেশ বাবু সাজিয়া গিয়াছিলাম। একে শনিবার সন্ধ্যাকাল, তাহার উপর আমি একজন নব্য বাবু, তাহাতে আবার আমি অতি ধীরে ধীরে একটী বাড়ীর বারান্দার দিকে দেখিতে দেখিতে যাইতেছি। এতগুলি কারণ যখন একত্রিত হইল, তখন কাৰ্য্য না হইয়া আর যায় কোথায়? একজন আধা বাবুগোচ লোক তখনই আমাদের নিকট আগমন করিয়া বলিল,–বাবু! ঐ বাড়ীতে যাবেন? আমি নিয়ে যাচ্ছি, আসুন, আমার সঙ্গে আসুন।

আন্তরিক সন্তুষ্ট হইয়া আমি হাসিয়া বলিলাম,–ও বাড়ীতে মানুষের মত কে আছে? ঐ ত সব বসে আছে?

আগন্তক ঠকিবার পাত্র নয়। সেও হাসিয়া বলিল,–আপনি রসিক বটে। কিন্তু এই সাঁঝের আঁধারে এতদূর থেকে কি ভাল দেখা যায়? বাড়ীর ভিতর চলুন।

আমি বুঝিলাম, আগন্তুক দালাল। কিছু পাইবার প্রত্যাশায় আমাকে লইয়া যাইতে চায়। বাড়ীর ভিতর যাওয়া যুক্তিসিদ্ধ নহে মনে করিয়া আমি বাহিরেই কামিনী সহ দেখা করিতে ইচ্ছা করিলাম। লোকটাকে বলিলাম,–বাপু, তুমি আমাকে যা মনে ক’রেছ, আমি তা নয়। তবে যখন আমার কাছে এসেছ, তখন যদি আমার একটা কাজ করা, আমি তোমায় সন্তুষ্ট করিব।

শশব্যস্তে সে বলিয়া উঠিল,–কি কাজ বলুন?

আমি বলিলাম, ঐ বাড়ীতে কামিনী নামে একটা মেয়েমানুষ আছে জান?

সে যেন মুখ বিকৃত করিল। কিন্তু তখনই আত্মসংবরণ করিয়া বলিল, আজ্ঞে হাঁ, জানি বই কি। আগে ছিল ভাল—এখন বাতে পক্ষু।

আমি বলিলাম, কামিনীকে কোনরূপে আমার কাছে আনিতে পার? আমি বাড়ীর ভিতর গিয়া তাহার সঙ্গে দেখা করিতে পারিব না।

লোকটা কিছু কালা, আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। পরে বলিল, কি বলিয়া ডাকিয়া আনিব? আপনাকে সে কি চেনে?

আ। আমাকে সে চেনে না, কোন রকম কৌশল করিয়া তাহাকে আনিতে হইবে।

লো। কোথা দেখা করিবেন? এই রাস্তায়?

আ। না, তাহারও উপায় তোমায় করিতে হইবে।

লো। কি উপায় করি?

আ। তোমাদের কোন ঘর এখানে নাই?

লো। আছে, কিন্তু সেখানে নিয়ে গেলে সকলকে অংশ দিতে হইবে। আমরা চারিজনে ঘরটী ভাড়া লইয়াছি।

আ। ভাল, আমি তাহাদিগকেও স্বতন্ত্র দিব, তুমি কামিনীকে সেইখানে লইয়া যাইও। আপাততঃ সেই ঘরটা আমাদিগকে দেখাইয়া দাও।

তাহাদের আড্ডা নিকটেই ছিল। লাল সিংকে লইয়া আমি সেই ঘরের ভিতর বসিলাম। যাহার সহিত আমার দেখা হইয়াছিল, তাঁহাকেই কৰ্ত্তা বলিয়া বোধ হইল। সে সকলকে চুপি চুপি আমাদের সেখানে যাইবার কারণ বুঝাইয়া দিল–পুরষ্কারের কথাও ভুলিল না। লাভের আশা পাইয়া সকলেই আনন্দিত হইল এবং আমাদিগকে যথেষ্ট সম্মান প্ৰদৰ্শন করিতে লাগিল।

অৰ্দ্ধ ঘণ্টা মধ্যেই কামিনীকে লইয়া পূৰ্ব্বোক্ত ব্যক্তি ফিরিয়া আসিল। তখন অপরাপর লোক সকল এক একটী অছিল করিয়া সেখান হইতে বিদায় লইল। অবশেষে যে কামিনীকে আনিয়াছিল, সেও তামাক আনিবার নাম করিয়া সরিয়া পড়িল।

আমি দেখিলাম, কামিনীর বয়স প্ৰায় চল্লিস বৎসর হইলে ও তাহাকে বৃদ্ধ বলা যায়। যে কারণেই হউক, সে সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারে না। কোমর বঁকিয়া শরীরের উপরদ্ধি নত কারিয়াছে। তাহার মাথার চুল অধিকাংশ কটা। শরীরের মাংস শিথিল হইয়া পড়িয়াছে, চক্ষু কোটরে প্রবেশ করিয়াছে।

অনেক কষ্টে আমার দিকে মুখ তুলিয়া কামিনী জিজ্ঞাসা করিল, কি বাবা, তুমিই ডেকে পাঠিয়েছিলে?

আমি বলিলাম, ছেলে মেয়ে ধরা ব্যবসা কবে থেকে আরম্ভ করেছ?

কামিনী চমকিয়া উঠিল। অনেক কষ্টে আত্ম সম্বরণ করিয়া চীৎকার করতঃ বলিল, কি বলছে বাবা! আমি কানে একটু কম শুনি বাবা!

আমি চীৎকার করিয়া পূনর্ব্বার ঐ কথা বলিলাম। এবার সে তখনই কাঁদকাঁদ সুরে উত্তর করিল, কোন ভালখাকি আমার নামে লাগিয়েছে? তার সর্বনাশ হ’ক।

অনেক কষ্টে হাস্য সম্বরণ করিয়া আমি বলিলাম আমি স্বচক্ষে দেখেছি! কেহই আমাকে তোমার নামে কোন কথা বলে নাই। কেন বৃথা গালাগালি দিতেছ বাছা!

কামিনী আমার কথায় যেন সিহরিয়া উঠিল। কিন্তু সেবারও আত্ম সম্বরণ করিয়া হাসিতে হাসিতে আমার দিকে চাহিয়া বলিল, ও সকল কথা নিয়া কি তামাসা ভাল দেখায়? তুমি না হয় ভাল মানুষের ছেলে, কোন কথা বলিবে না, কিন্তু কথায় কথায় পাঁচ কাণ হইলে ত সৰ্ব্বনাশ! কার মনে কি আছে কেমন করিয়া জানিব। ও সকল কথা ছেড়ে দাও—এখন যে জন্য ডেকেছ বল?

আমি কমিনীকে নিকটে ডাকিয়া চুপি চুপি বলিলাম, আমাকে বড় সহজ লোক মনে করো না। আমাকে এখনো কি চিনতে পার নাই? যদি বাঁচবার ইচ্ছা থাকে, সকল কথা প্ৰকাশ কর। তা না হলে তোমাকে জেলে দিব। মেয়েমানুষ বলে ছেড়ে দিব না।

কামিনীর মুখ শুকাইয়া গেল। ভয়ে তাহার সর্বশরীর কাঁপিতে লাগিল, কিছুক্ষণ তাহার মুখ দিয়া কোন কথা বাহির হইল না। তাহার মাথা ঘুরিতে লাগিল। সে আর দাঁড়াইতে না পারিয়া আমার পদতলে বসিয়া পড়িল।

আমি তখন বলিলাম, যখন কাজটা করেছিলে, তখন কি এ সকল কথা ভেবেছিলে? জান না কি, ইংরেজ রাজত্বে দোষ করিলে শাস্তি পাইতেই হইবে, কিছুতেই নিষ্কৃতি পাইবে না।

আমার কথায় কামিনী কাঁদিয়া উঠিল। পরে হাত জোড় করিয়া বলিল, দোহাই বাবা! আমার বেশী দোষ নয় বাবা। পেটের দায়ে একটা হতভাগা সন্ন্যাসীর কথায় আমি মেয়ে দুটীকে তার কাছে নিয়ে গিয়েছিলুম। কে জানে এমন হবে?

আমি ধমক দিয়া বলিলাম, এখন কান্না রাখ, আমি যাহা বলি, তাহার উত্তর দাও। দুটী বালিকাকে নিয়ে গিয়েছিলে বটে, কিন্তু একটী ত ফিরে এসেছে। অপরটা কি হ’লো?

কা। কেমন করে বলি? আমি মেয়ে দুটীকে তার কাছে দিয়ে চলে এসেছিলেম।

আ। কত টাকা পেয়েছিলে?

কা। দশ টাকা।

আ। কে দিল?

কা। সন্ন্যাসী।

আ। তাহাকে চিনতে পারবে?

কা। দেখলেই চিনতে পারবো।

আ। সকল কথা গোড়া থেকে খুলে বল। কিন্তু সাবধান, মিথা বলিও না। যদি জানিতে পারি যে, মিছা বলছে, তাহলেই তোমায় জেল দিব।

কা। না বাবা, আমি মিছা বলবো না। সন্ন্যাসীর কথায় রাজী হয়ে আমি মেয়ে দুটিকে ধরিবার চেষ্টা করি। দুই দিন তাদের বাড়ীর কাছে কাছে ঘুরেও ধরতে পারি নাই। শেষে একদিন ভোরে দুজনে মিলে বাড়ী থেকে বাহির হয়। আমি পাছু নিই। যখন তাহারা পদ্মপুকুরের ধারে গেল, তখন আমি কৌশলে আরক মিশান দুটী জবাফুল তাদের নাকের কাছে ধরি। ফুলের গন্ধে তারা এক রকম পাগল হয়ে যায়। আমি যা বলি, তারাও তাই করে। এই সুবিধা পেয়ে দ্বিরুক্তি না করে, আমি তাহাদিগকে এক গাড়ীতে করে সন্ন্যাসীর কাছে নিয়ে যাই। তার পর সন্ন্যাসীর নিকট থেকে টাকা নিয়ে ঘরে ফিরে আসি। মেয়ে দুটীর কি হলো জানি না।

আ। দুটি মেয়েকেই কি ধরিবার কথা ছিল?

কা। না—কেবল একজনকে। কিন্তু যখন দুজনে এক সঙ্গে ছিল, তখন দুজনকেই ধরে নিয়ে গেলাম।

আ। মেয়ে দুটী সন্ন্যাসীর কি দরকারে লেগেছিল?

কা। জানি না। তবে শুনেছি, সেই সন্ন্যাসী না কি কাপালিক, অনেক নরহত্যা করেছে।

আ। জেনে শুনে তুমি মেয়ে দুটিকে স্বচ্ছন্দে তার হাতে দিলে?

কা। নিজের পেট কাঁদলে জ্ঞান থাকে না।

আ। আচ্ছা—শোভন সিংকে চেন?

কামিনী চমকিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, কে শোভন সিং? আমি তাকে চিনি না।

আমি লালসিংএর দিকে চাহিলাম। তিনি আমার অভিপ্ৰায় বুঝিয়া কামিনীর দিকে চাহিয়া বলিলেন, দেখ, কামিনী, ইনি তোমার পূর্ব কথা সমস্তই জানেন। তুমি যে এক সময়ে শোভন সিংএর রক্ষিতা ছিলে, ইনি তাহাও শুনিয়াছেন। এখনঈ মিথ্যা বলিতেছ?

কামিনী আমার মুখের দিকে চাহিয়া কি বলিতে চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। আমারও তাহা শুনিবার ইচ্ছা ছিল না। আমি বলিলাম, কামিনীকে এখনই আমার সহিত থানায় যাইতে হইবে।

আমার কথায় কামিনীর ভয় হইল। সে রোদন করিতে লাগিল। আমি মিষ্ট কথায় কামিনীকে সান্ত্বনা করিয়া বলিলাম, তোমার কোন ভয় নাই। যদি দোষ না থাকে, এখনই মুক্তি পাইবে।

কামিনী আমার শ্লেষ বাক্য বুঝিতে পারিল না। আমার কথায় বিশ্বাস করিয়া লালসিং কর্তৃক আনীত একখানি ভাড়াটীয়া গাড়ীতে আমরা সকলেই আরোহণ করিলাম। আড্ডার সকল লোককে পুরষ্কার দিয়া সন্তুষ্ট করত কোচমানকে আমাদের থানায় যাইতে আদেশ করিলাম।

থানায় আসিয়া কামিনী ভজনসিংকে সনাক্ত করিল। সে বলিল, তাঁহারই পরামর্শ মত সে দুই জন বালিকাকে ভুলাইয়া তাঁহার নিকট লইয়া যায়; এবং এই কার্য্যের জন্য সন্ন্যাসী তাহাকে দশটী টাকা দিয়াছেন।

সৌভাগ্যক্রমে সন্ন্যাসীত্রয় তখন ধ্যানে নিমগ্ন—কেহই কামিনীর কথা শুনিতে বা বুঝিতে পারিলেন না।

বালিকাদ্বয়কে ভুলাইয়া লইয়া যাইবার জন্য কামিনীকে গ্রেপ্তার করা হইল। যতদিন না বিচার শেষ হয়, ততদিন তাহাকে হাজতে রাখিবার ব্যবস্থা হইল। কামিনী অনেক কান্নাকাটি করিল, অনেক কাকুতি মিনতি করিল, অনেক গালি বর্ষণ করিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না।

 

অষ্টম পরিচ্ছেদ

পূৰ্বোক্ত পরিচ্ছেদে বর্ণিত কাৰ্য্যগুলি শেষ করিতে সন্ধ্যা হইয়া গেল। আমি নির্জনে বসিয়া এই অদ্ভুত রহস্তের বিষয় চিন্তা করিতে লাগিলাম। ভাবিলাম, তবে কি সত্য সত্যই সন্ন্যাসীগণ রূপসীকে হত্যা করিয়াছে? কামিনী যখন ঐ সন্ন্যাসীকে সনাক্ত করিল, যে ভাবে কামিনী তাহার কথা ব্যক্ত করিল, তাহাতে তাহার কথা মিথ্যা বলা যায় না। অথচ সন্ন্যাসী আমাকে যাহা বলিলেন, তাহাতে তাঁহার কথাতেও অবিশ্বাস হয় না। তবে একজন সাধু সচ্চরিত্ৰ সদাশয় ব্যক্তি, অপর বেশ্যাতিপস্বিনী। কামিনীর কথা মিথ্যা হইতে পারে, কিন্তু সে পুলিসের লোকএর নিকট এমন সাজান কথা বলিয়া পরিত্রাণ পাইবে, তাহা বোধ হয় না। সন্ন্যাসী মিথ্যা বলিবে কেন? সন্ন্যাসীর মৃত্যুরই বা ভয় কি? যাঁহার সংসার-বন্ধন শিথিল হইয়া গিয়াছে, এ জগতে যাঁহার আপন বলিতে কেহ নাই, তিনি সামান্য প্রাণের জন্য, তুচ্ছ জীবনের জন্য পারত্রিক সুখ নষ্ট করিবেন কেন? সন্ন্যাসী নিশ্চয়ই নির্দ্দোষী।

কিন্তু কেমন করিয়া তাঁহাকে নির্দ্দোষী বলিয়া প্রমাণ করিব। শেষে প্রমাণাভাবে কি একজন নিরপরাধ ব্রাহ্মণ-সন্তানকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাইয়া দিব। কামিনী নিশ্চয়ই মিথ্যা বলিতেছে। সে যখন শোভন সিংএর রক্ষিতা বেশ্যা ছিল, সে যখন এক-সময়ে শোভন সিংএর পয়সা খাইয়াছে, তখন সে কখনো শোভন সিংএর অনিষ্ট করিতে পারে না। রূপসী শোভনের কন্যা—বাল্যকালে সে যে কামিনীর বাড়ীতে যাইত, তাহা স্পষ্টই জানা যায়। সুতরাং কামিনী যে রূপসীকে ভালবাসিবে, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। সে যে রূপসীকে চুরি করিবে, বিশেষতঃ একজন সামান্য সন্ন্যাসীর কথায় রূপসীকে হত্যা করিবার জন্য তাহার হন্তে অৰ্পণ করিবে, ইহা সম্পূর্ণ অসম্ভব। রমণীর প্রতিহিংসা–বৃত্তি ভয়ানক প্রবল। রমণী যদি কাহারও উপর রাগান্বিত হয়, তাহা হইলে সে যে কোন রূপেই হউক, যতদিন পরেই হউক, তাহার উপায় প্ৰতিশোধ লইবেই লইবে। কিন্তু কামিনীর কোন কারণ ঘটে নাই। লাল সিংএর মুখে শুনিলাম কামিনী এখনও শোভনের নিকট হইতে কিছু কিছু পাইয়া থাকে।

এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে হঠাৎ একটা উপায় মনে পড়িল। লাল সিং তখনও থানায় ছিলেন। আমি তাহাকে নিকটে ডাকিলাম। তিনি আসিলে জিজ্ঞাসা করিলাম, শোভনের ভগ্নী ছাড়া ছাড়া আর কোন আত্মীয় আছে কি না? কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া লাল সিং উত্তর করিলেন,–আজ্ঞে না—শোভনের দুইটী ভগ্নী ছিল। একটী ছোট বেলায় মারা পড়ে, অপরটী এখনও বিদ্যমান।

আ। শোভনের এই ভগ্নীর স্বভাব কেমন?

লা। অতি কুৎসিত। তাহার মত খল আর নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। সেই ভগ্নীই যত অনিষ্টের মূল। শোভনের ইচ্ছা থাকিলেও কেবল ঐ ভগ্নীর কথায় সে রূপসীর সহিত আমার বিবাহ দিতে নারাজ ছিলেন।

আ। ভগ্নীর পুত্ৰাদি আছে?

লা। একটী কন্যা ছাড়া আর কোন সন্তান হয় নাই।

আ। বাড়ী কোথায়?

লা। সিয়ালদহের নিকট, আমি সে বাড়ী জানি।

আ। শোভনের ভগ্নী ত এখন তাঁহারই বাড়ীতে আছেন। শুনিয়াছি, রূপসীর বিবাহ উপলক্ষে তিনি ভ্রাতার বাড়ীতে গিয়াছিলেন, সম্ভবতঃ এখনও ফিরিয়া আইসেন নাই।

লাল সিং আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়া বলিলেন,–কে বলিল, শোভনের ভগ্নী তাঁহারই বাড়ীতে আছে? আমার বিশ্বাস, তিনি বিবাহের দিন প্ৰাতেই নিজ বাড়ীতে গিয়াছেন।

আমিও বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম,–সে কি! রাত্রে ভাইঝির বিবাহ–আর প্রাতে তিনি নিজ বাড়ীতে ফিরিয়া গেলেন? এ কি নূতন রহস্যের কথা বলিতেছেন?

লা। আজ্ঞে—রহস্যই বটে। তিনি রূপসীর বিবাহ দেখিতে আসিলেন—অথচ বিবাহের দিন প্ৰাতেই নিজ বাড়ীতে ফিরিয়া গেলেন কেন? তাহা বুঝিতে পারিলাম না।

আ। শোভন সিংএর মুখে ত সে কথা শুনিলাম না। তাঁহার ভগ্নী যে সেইদিন প্রাতেই নিজ বাড়ীতে গিয়াছেন, এ কথা ত তিনি বলিলেন না। বরং এমন কথা বলিয়াছিলেন, যাহাতে আমি বুঝিয়াছিলাম যে, তিনি তখনও সেই বাড়ীতে বাস করিতেছেন, এমন কি, তিনি তাহার ভগ্নীপতিকে পৰ্যন্ত দেখাইয়াছিলেন।

লা। তাঁহার ভগ্নীপতি এখনও আছেন বটে কিন্তু ভগ্নী নাই।

আ। কেন তিনি নিজ বাড়ীতে গিয়াছেন, বলিতে পারেন?

লা। আজ্ঞে না। সে কথা বলিতে পরিলাম না।

কিছুক্ষণ চিন্তার পর আমি লাল সিংকে বলিলাম,–আপনাকে এখন একটা কাজ করিতে হইবে। আমি একবার শোভনের ভগ্নীর বাড়ী যাইতে চাই। আপনাকে দূর হইতে বাড়ীখানি দেখাইয়া দিতে হইবে।

লাল সিং সন্মত হইলেন। আমি পুনরায় ছদ্মবেশ পরিধান করিয়া লাল সিংএর সঙ্গে সঙ্গে সিয়ালদহ অভিমুখে গমন করিলাম। রাত্রি আটটার পর লাল সিং একখানি বাড়ী দেখাইয়া দিলেন। আমি তাহাকে থানায় ফিরিয়া যাইতে আদেশ করিয়া অতি ধীরে ধীরে সেই বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করিলাম।

বাড়ীখানি ক্ষুদ্র হইলেও দ্বিতল। বহির্ব্বাটী বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সদর দরজা পার হইয়া উভয়দিকে দুইটী ঘর দেখিতে পাইলাম। কিন্তু দুইখানি ঘরের দরজাতেই চাবি দেওয়া।

সদর দরজা অতিক্রম করিয়া কিছুদূর গমন ক্রইবার পর আর একটী দরজা দেখিতে পাইলাম। কিন্তু সেটীর ভিতর দিক হইতে আবদ্ধ। ভিতরে প্রবেশ করিতে না পারিয়া আমি সেই দরজার নিকটে দাঁড়াইয়া কড়া নাড়িতে লাগিলাম।

অনেকক্ষণ কেহ কোন সাড়া দিল না, আমি প্ৰায় অৰ্দ্ধঘণ্টা ধরিয়া সেই কড়া নাড়িতে লাগিলাম। অবশেষে বিরক্ত হইয়া চীৎকার করিলাম। কিছুক্ষণ এই প্রকার চীৎকার করিবার পর ভিতর হইতে একজন স্ত্রীলোক উত্তর দিল, কে গো, দরজা যে ভেঙ্গে গেল।

আমার বড় রাগ হইল। আমি বলিলাম, সে কি আমার দোষ—এক ঘণ্টা ডাকাডাকি করেও সাড়া পাই নাই কেন?

আমার কথা শেষ হইতে না হইতে দরজাটী ভিতর হইতে খুলিয়া গেল। একটা বুড়ী দাসী একটা আলোক হস্তে লইয়া আমার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আপনি কি চান?

কোন প্ৰকার গৌরচন্দ্ৰিক না করিয়া আমি একেবারে বলিয়া উঠিলাম, রূপসীকে শীঘ্ৰ আমার কাছে এনে দাও। এখানে রাখা ঠিক নয়, পুলিসের লোকে জানতে পারলে বাড়ী শুদ্ধ সকলকে এখনই বেঁধে নিয়ে যাবে। শুনেছি তিনজন সন্ন্যাসী গ্রেপ্তার হয়েছে। যতদিন না বিচার হয়, ততদিন রূপসীকে সাবধানে রাখতে হবে।

আমার কথা শুনিয়া দাসী আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, কোন উত্তর করিল না। রূপালী আছে, কি না, সে বিষয়েও কোন কথা বলিল না। তাহার মুখের ভাব দেখিয়া বোধ হইল, রূপসী সেখানেই আছে, কিন্তু সে কথা সাহস করিয়া বলিতে পারিতেছে না। আমি নিশ্চয় জানিতাম না যে, রূপসী সেখানেই আছে, আন্দাজ করিয়াছিলাম মাত্র। বিশেষতঃ যখন লাল সিংএর মুখে শুনিলাম যে, বিবাহের দিন প্রাতে শোভন সিংএর ভগ্নী তাহার বাড়ীতে প্রস্থান করিয়াছেন, তখন তিনি রূপসীকে লইয়াই আসিয়াছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। সেই জন্যই আমি রূপসী সেখানে আছে কিনা, জিজ্ঞাসা না করিয়া তাহাকে আমার নিকট অনিয়া দিবার কথা বলিলাম।

দাসীর মনোগত অভিপ্ৰায় বুঝিতে পারিলাম, সে যে আমার উপর অবিশ্বাস করিতেছে, তাহাও জানিতে পারিলাম, আমি যখন তাহার সম্পূর্ণ অপরিচিত, তখন তাহার এরূপ অবিশ্বাস জন্মিতে পারে বিবেচনা করিয়া, পূর্ব হইতেই প্ৰস্তুত ছিলাম। তখনই পকেট হইতে একখানি পত্র বাহির করিয়া বলিলাম, আমার কথায় বিশ্বাস না হয়, এই পত্র লও। শোভন সিং আমাকে এই পত্র দিয়াছেন। যাও, আর বিলম্ব করিও না।

এই বলিয়া পত্ৰখানি দ্বাসীর হন্তে প্ৰদান করিলাম। দাসী উহা গ্ৰহণ করিয়া বলিল, না মহাশয়, আপনাকে আমাদের অবিশ্বাস নাই। তবে কি, এ কাজ খুব গোপনে করাই ভাল। আমি পূর্বে আপনাকে আর কখনও দেখি নাই। সেই জন্যই চিনিতে পারিতেছি না। একজন পরিচিত লোক পাঠান শোভনের উচিত ছিল।

আমি ঈষৎ হাসিয়া বলিলাম, আজ রাত্রেই রূপসীকে কোন গোপনীয় স্থানে সরাইয়া ফেলিতে হইবে। এত তাড়াতাড়ি পরিাচিত বিশ্বাসী লোক কোথায় পাইবেন? আমি যদিও তোমাদের পরিচিত নই বটে কিন্তু শোভন সিং আমাকে বাল্যকাল হইতেই চেনে। আমার মত বিশ্বাসী লোক এত শীঘ্ৰ পাইবেন না বলিয়াই কোন পরিচিত লোককে পাঠাইতে পারেন নাই। সে যাহা হউক, তুমি পত্রখানি ভিতরে লইয়া যাও, ও শোভন সিংএর ভগ্নীর হস্তে প্ৰদান কর। তাঁহার পাঠ হইলে তিনি যেরূপ হুকুম দিবেন, সেই–মত কাৰ্য্য করিব।

দাসী হাসিয়া বলিল, পাঠ করিবেন কেমন করিয়া—তিনি লেখাপড়া জানেন না।

আ। তা আমি জানি। কিন্তু শোভন বলিলেন,–তাঁহার ভগ্নীর চাকর পড়াশুনা জানে এবং সেই তাঁহার ভগ্নীপতির অবৰ্ত্তমানে এ বাড়ীর অনেক চিঠি পত্ৰ পড়িয়া থাকে।

দা। সে চাকরিটা ত তাঁহাদের বাড়ীতেই আছে।

আমি বিষম ফাঁপরে পড়িলাম। মনে হইল, এইবার বুঝি বা ধরা পড়িলাম। কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছায় সে যাত্রা পরিত্রাণ পাইলাম। তখনই আশ্চৰ্য্যান্বিত হইয়া বলিলাম, সে কি! শোভন সিং যে আমার সাক্ষাতে তাহাকে এখানে আসিতে বলিলেন। সে কি এখনও সেখান হইতে ফিরিয়া আইছে নাই?

দা। কই, এখনও ত আসে নাই।

আ। শীঘ্রই আসিবে বটে কিন্তু আমি ত ততক্ষণ বিলম্ব করিতে পারিব না। কে জানে, হয় তা ইহার মধ্যেই পুলিসের লোক এখানে অসিতে পারে।

দ। এখানে আসিলে কিছু করিতে পরিবে না, তবে যদি—

দাসী আর কোন কথা বলিতে সাহস করিল না দেখিয়া আমি বলিলাম, তবে যদি কি? আমার নিকট কোন কথা বলিতে ভয় করিও না। আমার দ্বারা উপকার ভিন্ন কোন প্ৰকার অপকারের সম্ভাবনা নাই।

দাসী বলিল, আপনাকে কোন অবিশ্বাস নাই, আপনাকে সকল কথাই বলিতে পারি, কিন্তু কি জানি, যদি আর কোন লোক আমাদের এ সকল কথা শোনে, সেই জন্যই সাবধান হইতেছি।

আ। এখানে আপাততঃ আর কোন লোক নাই, তুমি স্বচ্ছন্দে সকল কথাই বলিতে পার। এখন কি বলিতেছিলে বল?

দা। বলছিলাম, যদি রূপসী কোন প্রকার চীৎকার করিয়া পাঁচজনকে জানাইয়া দেয়, তাহা হইলেই সৰ্ব্বনাশ! মেয়েটা বড় দুষ্টু।

আ। কেন?

দা। সে না কি সেই বুড়োকে বিবাহ করতে পাগল হয়েছে।

আ। বুড়ো কে?

দা। কেন—যার সঙ্গে তার বিয়ের কথা।

আ। সে বুড়ো না কি? আমি ত একবার মাত্র তাকে দেখেছিলাম।

দা। দেখতে বুড়ো না হলেও তার বয়স হয়েছে। তাহার প্রথম পক্ষের ছেলেটী থাকলে এতদিন দশ বছরের হত। যার ছেলের বয়স দশ বছর, তার আবার বিয়ে করা কেন?

আ। তাঁহার ছেলেটী এখন কোথায়?

দা। মারা গেছে।

আ। রূপসীয় তবে এ বিবাহে অমত নাই?

দা। না—এত বয়স হ’লো, এখনও বিয়ে হয় না—বাপের চেষ্টাও নাই। কাজেই এখন যার তার সঙ্গে বিয়ে হ’লেই হ’ল।

আন্তরিক সন্তুষ্ট হইয়া আমি বলিলাম, সে কথা পরে হইবে, এখন রূপসীকে নিয়ে এস। আমি তাকে এখান থেকে নিয়ে যাব। আজই কোন দূরদেশে রওনা না হইলে শোভনের রক্ষা নাই। শুনিয়াছি, সে ভাবী জামাইয়ের নিকট হইতে আট শত টাকা আদায় করিয়াছে।

দাসী আর দ্বিরুক্তি না করিয়া বাড়ীর ভিতর গেল এবং কিছুক্ষণ পরে রূপসীকে লইয়া পুনরায় সেখানে ফিরিয়া আসিল।

পূৰ্বে আমি রূপসীকে দেখি নাই। মনে করিয়াছিলাম, সে বালিকা মাত্র। কিন্তু এখন যাহা দেখিলাম, তাহাতে স্তম্ভিত হইলাম। রূপসীর বয়স প্ৰায় পনের বৎসর বলিয়া বোধ হইল। তাহার শরীরে যৌবনের সমস্ত চিহ্নগুলি পরিস্ফুট হইয়াছে। সে আমার মুখের দিকে সাহস করিয়া চাহিতে পারিল না।

রূপসী সুন্দরী ও যুবতী। তাহার জন্য লাল সিং যে অনায়াসে আটশত টাকা দিবে তাহাতে আর আশ্চর্য্য কি?

দাসীর সহিত রূপসীকে দেখিয়া আমি বলিলাম, মা! তোমার বাপের ইচ্ছা নয় যে, তুমি আর এখানে থাক। তোমাকে এখনই আমার সঙ্গে যাইতে হইবে।

ভিতর হইতে আর একজন রমণী উত্তর করিলেন, দাদার যেমন বুদ্ধি। আমাদের এখানে থাকিলে কোন প্ৰকার গোলযোগের সম্ভাবনা নাই। কেন তিনি রূপসীকে এখন হইতে সরাইতেছেন বলিতে পারি না। যাহাই হউক, দাদার কথামত রূপসীকে আপনার সঙ্গে পাঠাইলাম। দেখিবেন, যেন কোন প্রকার বিপদে পড়িতে না হয়।

আমিও উদ্দেশে উত্তর করিলাম, আপনি সে ভয় করিবেন না। বিশেষ না জানিয়া শুনিয়া শোভন সিং আমার উপর এ কার্য্যের ভার দেন নাই, বরং রূপসী এখানে থাকিলে আপনাদের বিপদের সম্ভাবনা হইতে পারে, আমার সহিত যাইলে সেরূপ কোন ভয়ের কারণ নাই। আপনি পত্রখানি রাখিয়া দিন। উহাতে আমার নাম ধাম সমস্তই আছে। প্রয়োজন হইলে আমায় সংবাদ দিতে পারিবেন। তবে এই পর্য্যন্ত জানিয়া রাখুন যে, আমি আজই রাত্রি সাড়ে দশটার সময় কলিকাতা ত্যাগ করিব।

রাত্রি নয়টা বাজিয়া গেল। আমি আর বিলম্ব করিতে পারিলাম না। রূপসীকে লইয়া একখানি গাড়ীতে উঠিলাম এবং আধঘণ্টার মধ্যেই থানায় ফিরিয়া আসিলাম।

 

নবম পরিচ্ছেদ

থানায় আসিয়া রূপসীকে একটী ঘরে রাখিলাম। পরে তখনই একজন কনস্টেবলকে শোভন সিংএর বাড়ীতে পাঠাইয়া দিলাম। বলিয়া দিলাম, সে যেন অবিলম্বে তাহাকে ডাকিয়া আনে।

এক ঘণ্টার মধ্যেই কনষ্টেবল শোভনকে লইয়া ফিরিয়া আসিল। কোন  কথা না বলিয়া তখনই তাহাকে বন্দী করিতে আদেশ করিলাম।

শোভন সিং আমার আদেশ শুনিয়া স্তম্ভিত হইলেন। অত্যন্ত আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া বলিলেন, এ কিরূপ বিচার হইল? একেত আমি ধনে প্রাণে মারা পড়িয়াছি, তাহার উপর আবার আমাকেই বন্দী করিলেন? আমার অপরাধ কি?

আমি গম্ভীরভাবে উত্তর করিলাম, আজ অনেক রাত্রি হইয়াছে, সকল কথা কালই জানিতে পারিবেন।

শো। আমার অপরাধ?

আ। যথেষ্ট—আপনি লালসিংএর নিকট হইতে আটশত টাকা প্রবঞ্চনা করিয়া লইয়াছেন; একজন নিরীহ সন্ন্যাসীর উপর আপনার কন্যার হত্যাপরাধ চাপাইবার মানস করিয়াছেন।

শো। সে কি! আমার কন্যা কোথায়?

আ। আপনি কি বিবেচনা করেন?

শো। সেই সন্ন্যাসী–আমার ঘোর শত্রু ভজন সিং তাহাকে হত্যা করিয়াছে, আমি এই জানি।

আ। এই দেখুন—এখনও মিথ্যা বলিতেছেন। রূপসীকে যে কেহ খুন করে নাই, এ কথা আপনিও অবগত আছে। কিন্তু বলুন দেখি, পরশু রাত্রি হইতে আপনি কি কাণ্ড করিয়াছেন? আপনার রোদন দেখিয়া আমি ভাবিয়াছিলাম, আপনার কন্যা সত্য সত্যই খুন হইয়াছে, কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছায় এখন সমস্ত রহস্য ভেদ করিয়াছি। আপনি যে কি ভয়ানক লোক, একজন নিরীহ লোকের প্রাণবিনাশ করিবার জন্য কি ভয়ানক ষড়যন্ত্র করিয়াছেন, তাহা কাল প্রাতেই জানিতে পরিবেন। আজ অনেক রাত্রি হইয়া পড়িয়াছে, বিশেষতঃ সমস্ত দিন কঠোর পরিশ্রম করিয়া ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছি, আজ এই রাত্ৰে আর। সে সকল কথার প্রয়োজন নাই।

এই বলিয়া আমি একজন কনষ্টেবলকে ইঙ্গিত করিলাম। সে আমার সঙ্কেত বুঝিতে পারিল এবং তখনই শোভন সিংকে আমার সম্মুখ হইতে স্থানান্তরিত করিল। শোভন সিং অতি বিমৰ্ষভাবে হাজতে গেল।

পরদিন প্রাতঃকালে লালসিং থানায় আসিলে আমি তখন তাঁহাকে কোন কথা না বলিয়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিতে বলিলাম। তিনি আমার মুখ দেখিয়া কি বুঝিয়েছিলেন বলিতে পারি না, কিন্তু তাঁহাকে পূর্ব্বাপেক্ষা যেন অধিক আনন্দিত বলিয়া বোধ হইল।

অন্যান্য কাজ শেষ করিয়া আমি শোভন সিং, লাল সিং, কামিনী ও সন্ন্যাসী তিনজনকে একটী ঘরের মধ্যে আনয়ন করিতে বলিলাম। মুহূৰ্ত্ত মধ্যে আমার আদেশমত কাৰ্য্য হইল। আমি তখন সেই ঘরে প্রবেশ করিয়া শোভন সিংএর দিকে চাহিয়া বলিলাম, আপনার সমস্ত চাতুরী ধরা পড়িয়াছে। রূপসীকে কেহ হত্যা করে নাই, তাহাকে আপনিই কৌশলে আপনার ভগ্নীর বাড়ীতে সরাইয়াছিলেন। রূপসী যখন গৌরীর সহিত পদ্মপুকুরের নিকট দিয়া যাইতেছিল, তখন কামিনী কৌশলে উহাদের উভয়কে ভুলাইয়া গাড়ীতে তুলিয়াছিল এবং অনতিবিলম্বে সন্ন্যাসীগণের নির্জন আশ্রম–সেই ভগ্ন অট্টালিকায় লইয়া গিয়াছিল। সন্ন্যাসীগণ নিশ্চয়ই ধ্যানমগ্ন ছিলেন। তাঁহারা এ বিষয়ের কিছুই জানিতেন না—এমন কি, সন্দেহও করেন নাই। এই স্থান হইতে রূপসীকে কৌশলে বাহির করিয়া দেওয়া হইয়াছিল; এবং গৌরীকে নানা প্ৰকার ভয় দেখাইয়া কামিনী স্বয়ং বাহির করিয়া আনিয়াছিল। গৌরী স্বচক্ষে রূপসীকে হত্যা করিতে দেখে নাই। সে কামিনীর মুখে শুনিয়াছিল মাত্র এবং সেই শোনা কথা এমন ভাবে রাষ্ট্র করিয়াছিল, যেন সে উহা স্বচক্ষে দেখিয়াছে। আপনি লোক নিযুক্ত করিয়া রাখিয়াছিলেন, তাহারাই রূপসীকে অন্য পথ দিয়া বাহির করিয়া আপনার ভগ্নীর বাড়ীতে লইয়া যায়। এদিকে আপনার ভগ্নীও সেইদিন প্ৰাতঃকালে আপনার বাড়ী ছাড়িয়া নিজ বাড়ীতে গিয়াছিলেন। বিবাহোপলক্ষে তাঁহার আগমন। অথচ বিবাহের দিন প্রাতঃকাল নিজ বাড়ীতে ফিরিয়া যাওয়া বড়ই আশ্চর্য্যের কথা। এখন বলুন, আপনি কি জন্য কন্যার মিথ্যা মৃত্যুর সংবাদ রাষ্ট্র করিতেছেন? কেনই বা নিরপরাধী এই সন্ন্যাসীগণের উপর খুনের দাবী দিয়াছিলেন? আর কেনই বা এই লাল সিংকে প্ৰবঞ্চনা করিতে উদ্ভূত হইয়াছিলেন? আমার প্রত্যেক কথার প্রমাণ আছে। বলেন ত সমক্ষেই তাহারা সাক্ষ্য দিতে প্ৰস্তুত। আমার কথায় অস্বীকার করা বাতুলের কাৰ্য্য।

আমার কথায় শোভন সিংএর মুখ পাংশুবৰ্ণ ধারণ করিল। তিনি আমার কথার ভাবেই বুঝিয়াছিলেন যে, আমি মুখে যাহা বলতেছি, কাজেও তাহা করিব। এই ভাবিয়া তিনি বলিলেন, না—যাহা করিয়াছি এবং যখন ধরা পড়িয়াছি, তখন অস্বীকার করিব কেন? আপনার সমস্ত কথাই ঠিক। আপনি সব করিতে পারেন। নিতান্ত কষ্টে পড়িয়াই লাল সিংএর টাকা নষ্ট করিয়া ফেলিলাম।

আমি বলিলাম, আর আপনার টাকার দরকার নাই। যখন আপনার কাছে রূপসী জীবিত, তখন তাহার সহিত লাল সিংএর বিবাহ দিন। যে প্ৰতিজ্ঞা করিয়া টাকা লইয়াছেন, সেই প্ৰতিজ্ঞা পূর্ণ করুন। আপনার কন্যা এখানেই আছে, আর সে লাল সিংকে বিবাহ করিতে সম্পূর্ণ ইচ্ছুক। আপনি অন্যায় করিয়া মিথ্যা এই বিপদ ঘটাইয়াছেন। কেন না, নিরীহ সন্ন্যাসীগণের উপর মিথ্যা কন্যার খুনের দাবী দিয়া আপনাকে বিষম বিপদে ফেলিয়াছেন। যথেষ্ট অর্থদণ্ড না দিলে নিষ্কৃতি নাই।

শোভন সিং বিবাহের কথা শুনিয়া আন্তরিক রাগান্বিত হইলেন। কিন্তু সাহস করিয়া সে সম্বন্ধে কোন কথা বলিতে পারিলেন না। কিছুক্ষণ কি ভাবিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি কেমন করিয়া জানিলেন, রূপসী এ বিবাহে ইচ্ছুক? সে আমার দুধের মেয়ে, এই বুড়ো বরকে বিবাহ করিতে ইচ্ছা করিবে কেন?

আ। কেন তাহা জানি না। কিন্তু আপনার কন্যা আমার বাড়ীতে ঐ রূপই বলিয়াছে।

শো। আমার মেয়ে—বালিকা নয়, সে এখন যুবতী। বিশেষ তাহার কোন অপরাধ নাই, কেবল, সাক্ষ্য স্বরূপ তাহাকে এখানে আনা হইয়াছে, সেই জন্য তাহাকে বাহিরে পুলিসের অন্যান্য কর্ম্মচারিদিগের সহিত একত্র রাখিলাম না;–আমার অন্দরেই স্থান দিয়াছি। রূপসী বড় ভাল মেয়ে। তাহার মন বড় সরল।

শোভন সিং আর কোন কথা কহিলেন না। সন্ন্যাসীগণকে তখনই মুক্ত করিয়া দেওয়া হইল। তাঁহারা, বিশেষতঃ ভজন লাল আমায় আশীৰ্বাদ করিতে করিতে প্ৰস্থান করিলেন।

লাল সিং আমার কথায় অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন। আপাততঃ রূপসী তাঁহারই বাড়ীতে গেল। শোভন সিং বিবাহে সন্মতি দিয়াছিলেন। সুতরাং রূপসীকে লাল সিংএর সহিত যাইতে নিষেধ করিলেন না।

কামিনী হাজতেই রহিল। কোন লোক তাহার জামিন হইল না। সৌভাগ্য বশতঃ অধিককাল তাহাকে হাজতে থাকিতে হইল না। সৌভাগ্য বশতঃ অধিককাল তাহাকে হাজতে থাকিলে হইল না। শীঘ্রই বিচার হইয়া গেল। বিচারে শোভন সিংহের পাঁচ শত মুদ্রা এবং কামিনীর দুইশত মুদ্রা অর্থদণ্ড হইল। অর্থ দিতে না পারিলে শোভন সিংকে ছয় মাস এবং কামিনীকে একমাস কাল সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করিতে হইবে।

রূপসীকে লাভ করিয়া লাল সিং এত সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন, বিশেষ রূপসী তাঁহাকে বিবাহ করিতে অভিলাষিণী শুনিয়া তিনি এত আনন্দিত হইয়াছিলেন যে, শোভন সিংএর মুক্তির সমস্ত টাকা নিজেই প্ৰদান করিলেন। শোভন মুক্ত হইলেন। কামিনীও দুই শত টাকা দিয়া মুক্তি লাভ করিল।

বাড়ী ফিরিয়াই শোভন সিং কন্যার বিবাহের আয়োজন ক্রিতে লাগিলেন। বিনা বাক্যব্যয়ে লাল সিংকে পাঁচ শত মুদ্রা দিতে দেখিয়া তিনি লাল সিংএর পক্ষপাতী হইয়াছিলেন। রূপসীকে নিজ বাড়ীতে আনিয়া মহা সমারোহে বিবাহ দিলেন। নব দম্পতীকে শোভন প্রাণ খুলিয়া আশীর্ব্বাদ করিলেন।

সমাপ্ত।

 ঘর-পোড়া লোক – ১ম অংশ

ঘর-পোড়া লোক
(দারোগার দপ্তর ৭৪ম সংখ্যা)
ঘর-পোড়া লোক  (অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত!)
শ্রী প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত। All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। জ্যৈষ্ঠ।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.

ঘর-পোড়া লোক।
(প্রথম অংশ)
প্রথম পরিচ্ছেদ।

অদ্য যে বিষয় আমি পাঠকগণকে উপহার দিতে প্রস্তুত হইয়াছি, তাহা অতি ভয়ানক ও লোমহর্ষণ-জনক ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনার সহিত আমার নিজের কোনরূপ সংস্রব নাই, অর্থাৎ আমি নিজে এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান করি নাই; কিন্তু এই মোকদ্দমার সহিত যে পুলিস কর্ম্মচারীর সংস্রব ছিল, তিনি আমার পরিচিত। এই ঘটনার মধ্যে যেরূপ অস্বাভাবিক দুবুদ্ধির পরিচয় আছে, তাহা পাঠ করিয়া অনেক পাঠকেই মনে করিতে পারেন যে, এরূপ দুঃসাহসিক কাৰ্য মনুষ্য-বুদ্ধির অগোচর। কিন্তু যখন আমি এই ঘটনার আনুপূর্বিক সমস্ত ব্যাপার জানি, এবং অনুসন্ধানকারী পুলিস কর্ম্মচারীও, আমার পরিচিত, তখন এই ঘটনার সত্যাসত্য সম্বন্ধে আমার কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। পাঠকগণও ইহা সম্পূর্ণ। রূপ সত্য ঘটনা বলিয়া অনায়াসে বিশ্বাস করিতে পারেন।

এই ঘটনা আমাদিগের এই প্রদেশীয় ঘটনা নহে, পশ্চিম দেশীয় ঘটনা। হিন্দু পাঠকগণের মধ্যে সকলেই অবগত আছেন যে, নৈমিষারণ্য নামে একটা স্থান আছে, উহা আমাদিগের একটা প্রধান তীর্থ স্থান। পশ্চিমদেশবাসীগণ সেই স্থানকে নিমরণ কহিয়া থাকে।

কথিত আছে, ভগবান্ বেদব্যাস এই স্থানে বসিয়া ভগবদবাক্য সৰ্ব্বপ্রথমে মর্ত্যলোকে প্রকাশ করেন। যে বেদীর উপর উপবেশন করিয়া তিনি ভগবাক্য পাঠ করিয়াছিলেন, নিবিড় ও নিস্তব্ধ আয় কাননের ভিতর সেই বেদী এখন পর্যন্ত বর্তমান। সেই বেদীর কিছু দূর অন্তরে চক্রপাণি নামক প্রসিদ্ধ স্থান। প্রসিদ্ধি আছে যে, যে সময় ভগবান্ বেদব্যাস ভগব প্রকাশ করিতেন, সেই সময় দেবতাগণ ও ঋষি গণের আবির্ভাব হইত। সেই স্থানে তখন একটা সামান্য স্রোতস্বতী থাকা স্বত্বেও সেই স্থানে যাহারা আগমন করিতেন, তাঁহাদিগের প্রত্যেককেই অত্যাধিক জল-কষ্ট সহ করিতে হইত। ভগবান্ বিষ্ণু এই ব্যাপার দেখিয়া জল-কষ্ট নিবারণ করিবার মানসে আপনার চক্র দ্বারা পৃথিবী ভেদ করিয়া দেন, সেই স্থান হইতে সতেজে অনবরত জল উখিত হইয়া সকলের জল-কষ্ট নিবারণ করে। সেই সময় পৃথিবী ভেদ করিয়া যে স্থান হইতে জল উঠিয়াছিল, এবং এখন পর্যন্ত যে স্থান হইতে অনবরত জল উখিত হইয়া সন্নিকটবর্তী সেই ক্ষুদ্র স্রোতস্বতীতে গিয়া মিলিতেছে, সেই স্থানকে চক্রপাণি। কহে। নৈমিষারণ্য তীর্থে যাহারা গমন করিয়া থাকেন, তাহাদিগকে চক্রপাণি জলে স্নান করিতে হয়।

দশ বার বৎসর পূর্বে কোন সরকারী কাৰ্য্য উপলক্ষে আমাকে সেই নৈমিষারণ্যে গমন করিতে হইয়াছিল। যে কাৰ্য্যে আমি গমন করিয়াছিলাম, সেই কাৰ্য শেষ হইবার পর, একদিবস আমি সেই চক্রপাণি জলে স্নান করিতে যাই। সেই স্থানে আমি স্নান করিতেছি, এরূপ সময় একজন লোক আসিয়া স্নান করিবার মানসে সেই চক্রপাণি জলে অবতরণ করেন। কথায় কথায় তাহার সহিত আমার পরিচয় হয়। ইহার নাম আমি পূৰ্ব্ব হইতেই জানিতাম। কিন্তু ইহার সহিত আমার কখন চাক্ষুষ আলাপ পরিচয় ছিল না। ইহার নাম শুনিয়াই আমি কহিলাম, আপনি এই প্রদেশীয় পুলিস বিভাগে কর্ম্ম করিতেন না?

উত্তরে তিনি কহিলেন, হাঁ মহাশয়!

তখন আমি তাহার সম্বন্ধে যাহা যাহা অবগত ছিলাম, তাই তাহাকে কহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কেমন মহাশয়! এই অপ রাধের জন্য পুলিস বিভাগ হইতে আপনার চাকরী গিয়াছে না?

উত্তরে তিনি কহিলেন, আপনি এ সকল বিষয় কিরূপে অবগত হইতে পারিলেন?

আমি। আমি যেরূপেই অবগত হইতে পারি না কেন; কিন্তু ইহা প্রকৃত কি না?

যখন অনুসন্ধান করিয়া আমার দোষ সাব্যস্ত হইয়াছিল, এবং সেই দোষের উপর নির্ভর করিয়া সরকারী চাকরী হইতে আমাকে তাড়িত করা হইয়াছে, তখন উহা যে সম্পূর্ণরূপ মিথ্যা কথা, তাহাই বা আমি বলি কি প্রকারে?

আমি। সত্য হউক, আর মিথ্যা হউক, যে অপরাধের নিমিত্ত আপনার চাকরী গিয়াছে, সেই অপরাধ সম্বন্ধে আপনার কোন্ উর্দ্ধতন কর্ম্মচারী অনুসন্ধান করিছিলেন?

যে ইনস্পেক্টারের দ্বারা তাহার অপরাধের অনুসন্ধান করা হইয়াছিল, সেই ইম্পেক্টারের নাম তিনি আমার প্রশ্নের উত্তরে বলিয়া দিলেন, এবং তিনি আজ কাল যে স্থানে আছেন, তাহাও আমাকে জানাইয়া দিলেন। আমি দেখিলাম, যে সরকারী কার্যের নিমিত্ত আমি সেই প্রদেশে গমন করিয়াছি, তাহার কোন কোন বিষয়ের অনুসন্ধানের নিমিত্ত আমাকে তাঁহার নিকট গমন করিতেই হইবে। সুতরাং এই ঘটনার সমস্ত অবস্থা তাঁহার নিকট হইতে অনায়াসেই জানিয়া লইতে পারিব। যে ভূত-পূৰ্ব পুলিস-কর্ম্মচারীর সহিত আমার চক্রপাণিতে সাক্ষাৎ হইল, তিনিও আমার পরিচয় গ্রহণ করিলেন, এবং পরিশেষে তাহার বাসায় গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করি বার নিমিত্ত আমাকে বার বার অনুরোধ করিলেন। আমিও তাঁহার অনুরোধ রক্ষা করিলাম; সেই দিবস সন্ধ্যার পূর্বে তাঁহার বাসায় গিয়া আমি তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। সেই রাত্রি তাহার বাসায় অতিবাহিত করিবার নিমিত্ত তিনি আমাকে বার বার অনুরোধ করিলেন; কিন্তু জাতিভেদের প্রতিবন্ধকতা হেতু আমি কোনরূপেই তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইতে পারিলাম না। তথাপি অনেক রাত্রি পর্যন্ত তাঁহার বাসায় বসিয়া নানারূপ প্রসঙ্গে সময় অতিবাহিত করিলাম। ইহার মধ্যে যতদূর সম্ভব, তাঁহার নিকট হইতে তাহার মোকদ্দমার বিষয় সকল উত্তমরূপে জানিয়া লইলাম।

ইনি অসৎ উপায়ে যে সকল অর্থ উপার্জন করিয়া ছিলেন, তাহার অধিকাংশই প্রায় ব্যয়িত হইয়া গিয়াছে। এই স্থানে বসিয়া এখন তিনি জমিদার-সরকারে যদি কোনরূপ একটী চাকরীর সংগ্রহ করিয়া উঠিতে পারেন, তাহারই চেষ্টা দেখিতেছেন।

নৈমিষারণ্যে আমার যে সকল অনুসন্ধানকার্য ছিল, তাহা শেষ করিয়া আমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। দুর্গম ভয়ানক পথ অতিক্রম করিয়া, ও হত্যা-হরণ প্রভৃতি স্থান দর্শন করিয়া, ক্রমে আমি গিয়া সাণ্ডিল। ষ্টেশনে উপস্থিত হইলাম। পরে কয়েকটা ষ্টেশন অতিক্রম করিয়া যে স্থানে সেই মোকদ্দমার অনুসন্ধানকারী ইনস্পেক্টার থাকিতেন, সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। তাঁহার নিকট আমি আমার পরিচয় প্রদান করিলাম, এবং যে সরকারী কার্যের নিমিত্ত আমি তাহার নিকট গমন করিয়াছিলাম, তাহার সমস্ত ব্যাপার আমি তাঁহার নিকট কহিলাম। তিনি তাঁহার সাধ্যমত আমাকে সাহায্য করিয়া, সেই স্থানের আমার আবশ্যক কাৰ্য্য সকল সম্পন্ন করিয়া দিলেন।

যে সময় তিনি আমার সাহায্যের নিমিত্ত আমার সহিত কার্যে নিযুক্ত ছিলেন, সেই সময় একদিবস কথায় কথায় এই মোকদ্দমার বিষয় তাহার নিকট উত্থাপিত করিলাম। তিনিও সবিশেষ যত্নের সহিত ইহার সমস্ত ব্যাপার আমাকে বলিয়া দিলেন, এবং এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানের যে সকল কাগজ, পত্র ছিল, তাহাও আমাকে দেখাইতে চাহিলেন। সময়মত আফিস হইতে সমস্ত নথি-পত্ৰ আনিয়া, দেখিবার নিমিত্ত আমার হস্তে প্রদান করিলেন; কিন্তু উহার সমস্তই উর্দ্দূ ভাষায় লিখিত বলিয়া, আমি নিজে তাহা পড়িয়া উঠিতে পারিলাম না। উর্দু ভাষাবিদ একজন মুসির সাহায্যে সেই সকল কাগজপত্রে যাহা লিখিত ছিল, তাহা জানিয়া লইলাম, এবং আবশ্যকমত কতক কৃতক লিখিয়াও লইলাম। এইরূপে

যে সকল বিষয় আমি জানিতে পারিয়াছিলাম, তাহাই অবলম্বন করিয়া এই বিবরণ লিখিত হইতেছে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

যে গ্রামে রামসেবকের বাড়ী, সেই গ্রামের জমিদার গোফুর খাঁ। গোফুর খাঁ যে একজন খুব বড় জমিদার, তাহা নহে; কিন্তু নিতান্ত ক্ষুদ্র জমিদার ও নহেন। ইহার জমি দারীর আয়, সালিয়ানা পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা হইবে। গোফুর খাঁ জমিদার, কিন্তু জমিদার-পুত্র নহেন। তাঁহার পিতা একজন মধ্যবিত্ত গৃহস্থ ছিলেন। তিনি যাহা কিছু উপার্জন করিতেন, তাহার দ্বারা কোন গতিতে পরিবার প্রতিপালন করিতেন মাত্র; কিন্তু তাহা হইতে একটা কপর্দকও সঞ্চয় করিয়া রাখিতে পারিতেন না। গোফুর খাঁ তাঁহার পিতার প্রথম বা একমাত্র পুত্র। যে সময় তাঁহার পিতা পরলোক গমন করেন, সেই সময় গোফুরের বয়ঃক্রম পনর বৎসরের অধিক ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর অনন্যোপায় হইয়া গোফুর সামান্য চাকরীর উমেদারীতে প্রবৃত্ত হন, এবং আপন দেশ ছাড়িয়া কানপুরে গমন করেন। সেই সময় কানপুরে একজন মুসলমান বাস করিতেন। চামড়ার দালালী করিয়া তিনি শটাকার সংস্থান করিয়াছিলেন, এবং দেশের মধ্যে মান-সম ও একটু সবিশেষ প্রতিপত্তি স্থাপন করিতে পারিয়াছিলেন। গোফুর খাঁ কানপুরে জাসিয়া প্রথমে তাহারই আশ্রয় গ্রহণ করেন, এবং তাহারই নিকট অতি সামান্য বেতনে একটা চাকরী সংগ্রহ করিয়া লন। গোফুর খাঁ অতিশয় বুদ্ধিমান ও সবিশেষ কার্যক্ষম ছিলেন। সুতরাং অতি অল্পদিবসের মধ্যেই তিনি আপন মনিবের প্রিয়পাত্র হইয়া পড়েন, এবং ক্রমে তিনি তাঁহার মনিবের কাৰ্য্যে সবিশেষরূপে সাহায্য করিতে সমর্থ হন্। দিন দিন যেমন তিনি তাঁহার মনিবের প্রিয়পাত্র হইতে ছিলেন, সেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার বেতনও ক্রমে বর্ধিত হইতেছিল।

সে যাহা হউক, যে সকল কাৰ্য্য করিয়া তাহার মনিব সেই দেশের মধ্যে প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিলেন, পরিশেষে সেই সমস্ত কাৰ্য গোফুর খাঁ নিজে সম্পাদন করিতে লাগিলেন। ইদানীং তাঁহার মনিবকে আর কোন কাৰ্যই দেখিতে হইত না, সকল কাৰ্য গোফুরের উপরেই নির্ভর করিত। গোফুরও প্রাণপণে এরূপ ভাবে কার্য সম্পন্ন করিয়া আসিতে লাগি লেন যে, তাহার মনিবের কার্য পূর্ব অপেক্ষা আরও অতি উত্তমরূপে চলিতে লাগিল। সৰ্বসাধারণে গোফুয়ের মনিবকে যেরূপ ভাবে বিশ্বাস করিতেন, গোফুরকে তাহা অপেক্ষা আরও অধিক বিশ্বাস করিতে লাগিলেন। এমন কি, সেই সময় গোফুরের মনিবকে পরিত্যাগ করিয়া ব্যবসায়ী মাত্রেই গোফুরকে চাহিতে লাগিলেন, ও গোফুরের হস্ত হইতে সমস্ত দ্রব্যাদি ক্রয় করিতে লাগিল। এই ব্যাপার দেখিয়া গোফুরের মনিব নিজে আর কোন কার্যে হস্তক্ষেপ না করিয়া সমস্ত কার্যভারই গোফুরের উপর অর্পণ করিলেন, এবং পরিশেষে গোফুরকে একজন অংশীদার করিয়া লইলেন। গোরও সবিশেষ পারদর্শিতার সহিত কাৰ্য্য করিয়া ক্রমে যথেষ্ট উপার্জন করিতে আরম্ভ করিলেন।

এইরূপে কয়েক বৎসর অতিবাহিত হইবার পর গোফুলের মনিব বা অংশীদার ইহলীলা সম্বরণ করিলেন; সুতরাং এখন সেই কার্যের সমস্ত অংশই গোফুরের হইল। গোফুরও সবিশেষ মনোযোগের সহিত আপন কাৰ্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়া যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করিতে লাগিলেন। এইরূপে দুই একখানি করিয়া ক্রমে জমিদারী ক্রয় করিতে লাগিলেন। এইরূপে তিনি যে সকল জমিদারী ক্রমে ক্রয় করিয়াছিলেন, সেই সকল জমিদারীর আয় পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকায় দাঁড়াইল। সেই সময় গোফুর খাঁও ক্রমে বৃদ্ধ হইয়া পড়ায় আপনার ব্যবসা পরিত্যাগ করিলেন, এবং কেবলমাত্র তাহার জমিদারীতেই আপনার মন নিয়োগ করিবার মানস করিলেন।

গোফুর খাঁর কেবল একটামাত্র পুত্র জন্মিয়াছিল, তাহার নাম তিনি ওসমান রাখিয়াছিলেন। আপন পুত্র ওসমানকে প্রথমতঃ তিনি আপনার ব্যবসা কার্য শিখাইবার নিমিত্ত সবিশেষরূপ চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনরূপে আপন মনস্কামনা পূর্ণ করিতে পারেন নাই। বাল্যকালে গোফুর খাঁর যেরূপ প্রকৃতি ছিল, তাঁহার পুত্র ওসমানের প্রকৃতি বাল্যকাল হইতেই তাহার বিপরীত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। গোফুর খাঁ সৰ্ব্বদা আপন কার্যে মন নিয়োগ করিতেন, ওসমান কেবল অপরের সহিত মিলিয়া আমোদ-আহলাদ করিয়া দিন অতি বাহিত করিতে লাগিল।

গোফুরের চেষ্টা ছিল, কিরূপে আপনার কাৰ্য্যে তিনি সবিশেষরূপে উন্নীত হইতে পারেন।

ওসমান ভাবিতেন, অসৎ উপায় অবলম্বনে কিরূপে তিনি তাঁহার পিতার উপার্জিত অর্থ ব্যয় করিতে সমর্থ হন।

গোফুর সর্বদা সৎকার্যের দিকে দৃষ্টি রাখিতেন। কিরূপে দশজন প্রতিপালিত হয়, কিরূপে দশজনের উপকার করিতে পারেন, তাহার দিকে সর্বদা তিনি লক্ষ্য রাখিতেন।

ওমানের লক্ষ্য হইয়াছিল, কেবল অসৎ কার্যের দিকে। আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্রগণের প্রতিপালনের পরিবর্তে কতকগুলি নীচজাতীয় বার-বনিতা তাহার দ্বারা প্রতিপালিত হইত।

ওসমানের এইরূপ অবস্থা সত্বেও একমাত্র সন্তান বলিয়া তাঁহার পিতা গোফুর খা তাহাকে কিছু বলিতেন না। সুতরাং ওসমারের অত্যাচার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস হইবার পরিবর্তে ক্রমে আরও বর্ধিত হইতে লাগিল।

গোফুর খাঁ নিতান্ত বৃদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলেন বলিয়া, তিনি মনে করিয়াছিলেন, ব্যবসা কার্যের ভার তিনি তাহার পুত্র ওসমান খাঁর হস্তে প্রদান করিবেন; কিন্তু তাহার চরিত্র দেখিয়া আপনার ইচ্ছাপূর্ণ করিতে পারিলেন না। অথচ ব্যবসায়ীগণের অনুরোধ রক্ষা করিতে গিয়া, তিনি আপন কাৰ্য্য পরিত্যাগ পূর্বক আপন বাড়ীতে বসিয়া তাহার বৃদ্ধাবস্থায় যে কিছু দিবস বিশ্রাম করিবেন, তাহাতেও তিনি সমর্থ হইলেন না। তাহাকে সৰ্ব্বদা কানপুরেই থাকিতে হইত। এদিকে অবসর পাইয়া ওসমান জমিদারীর ভিতর যথেচ্ছ ব্যবহার করিত। তাহার অত্যাচারে প্রজাগণের মধ্যে কেহই শান্তিলাভ করিতে পারিত না। কিরূপে ওমানের হক হইতে আপনাপন স্ত্রী-কন্যার ধৰ্ম্ম রক্ষা করিতে সমর্থ হইবে, কেবল তাহার চিন্তাতেই তাহাদিগকে সর্বদা দিন অতিবাহিত করিতে হইত।

ওমানের এই সকল অত্যাচারের কথা ক্রমে তাহার পিতা গোফুর ধার কর্ণগোচর হইতে লাগিল; কিন্তু গোফুর খ তাহার প্রতিকারের কোনরূপ চেষ্টাও করিলেন না।

এইরূপ নানা কারণে, প্রজাগণ ক্রমে তাহাদিগের অবাধ্য হইয়া পড়িতে লাগিল। জমিদারীর খাজনা প্রায়ই তাঁহারা বাকী ফেলিতে লাগিল, বিনা-নালিশে খাজনা আদায় প্রায় একরূপ বন্ধ হইয়া গেল।

এই সকল অবস্থা দেখিয়াও ওসমানের অত্যাচারের কিছু মাত্র নিবৃত্তি হইল না। তাহার কতকগুলি অশিক্ষিত ও দুষ্টমতি পরিষদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই সকল অত্যাচার ক্রমে বৃদ্ধিই হইতে লাগিল। তাহাদিগের অত্যাচারে অনেককেই তাহার জমিদারী পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিতে হইল। বিশেষতঃ যাহাদিগের গৃহে সু যুবতী স্ত্রীলোক আছে, তাহাদিগের সেই স্থানে বাস করা একবারেই অসম্ভব হইয়া পড়িতে লাগিল।

এরূপ পাপে কতদিবস প্রজাগণ সন্তুষ্ট থাকে। বা ঈশ্বরই আর কতদিবস এ পাপ মার্জনা করেন। ওসমান একজন মধ্যবিদ জমিদারের পুত্র বইত নয়? এরূপ অত্যাচার করিয়া যখন নবাব সিরাজদ্দৌল্লা প্রভৃতিও নিষ্কৃতি পান নাই, তখন এই সামান্য জমিদার-পুত্র যে অনায়াসেই নিষ্কৃতি পাইবেন, তাহা কিছুতেই হইতে পারে না। সমস্ত কার্যেরই সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করিলে যে অবস্থা ঘটিয়া থাকে, ওসমানের অদৃষ্টে যে সেই অবস্থা না ঘটিবে, তাহা কে বলিতে পারে?

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

যে গ্রামে গোর খাঁর বাড়ী, সেই গ্রামের নিকটবর্তী একখানি গ্রামে পুলিসের থানা আছে; সেই থানার ভার প্রাপ্ত কর্ম্মচারী একজন মুসলমান দারোগা। দারোগা সাহেব একজন খুব উপযুক্ত কর্ম্মচারী। জেলার ভিতর তাঁহার খুব নাম আছে, সরকারের ঘরেও তাঁহার বেশ খাতির আছে। কিন্তু তাহার নিজের চরিত্র সাধারণত দারোগা-চরিত্রের বহিত নহে।

দারোগা সাহেবের বয়ঃক্রম চল্লিশ বৎসরের কম নহে, বরং দুই এক বৎসর অধিক হইবারই সম্ভাবনা। পুলিশ বিভাগে প্রথম প্রবৃত্ত হইবার পূর্বে তাঁহার যেরূপ চরিত্ৰ-দোষ ছিল, এখন তাহা অপেক্ষা অনেক বর্ধিত হইয়া পড়িয়াছে, এবং দিন দিন বর্ষিত হইয়াই চলিয়া যাইতেছে।

কোন গ্রামে কোন একটী মোকদ্দমার অনুসন্ধান করিতে গিয়া, একটা রূপবতী যুবতী তাঁহার মজয়ে পতিত হয়। পরিশেষে কোন-না-কোন উপায় অবলম্বন করিয়া, ক্রমে দারোগা সাহেব তাহাকে গৃহের বাহির করেন, এবং থানার সন্নিকটবর্তী কোন এক স্থানে একখানি বাড়ী প্রস্তুত করিয়া দিয়া, তাহাকে সেই স্থানে রাখিয়া দেন। সেই স্ত্রীলোকটা দুই বৎসরকাল সেই স্থানে বাস করিয়া দারোগা সাহেবের মনস্তুষ্টি সম্পাদিত করে।

সেই যুবতী যে সবিশেষ রূপবতী, এ কথা শোক-মুখে ক্রমে প্রকাশিত হইয়া পড়ে, এবং ক্রমে ওসমানের জনৈক পারিষদ এ কথা জানিতে পারিয়া, ওসমানের কর্ণগোচর করিয়া দেয়। যুবতী-রূপবতীর কথা শুনিয়া ওসমান আর তাহার মন স্থির করিতে পারিল না; কোন উপায় অবলম্বন করিলে, সে সেই যুবতীকে হস্তগত করিতে পারিবে, তাহারই চিন্তায় অতিশয় ব্যগ্র হইয়া পড়িল, ও ক্রমে আপন মনোভাব প্রকাশ করিয়া সেই যুবতীর নিকট তোক প্রেরণ করিল।

যুবতী তাহার প্রস্তাবে প্রথমে স্বীকৃত হইল না; কিন্তু ওসমানও তাহার আশা পরিত্যাগ করিল না। যে কোন উপায়েই হউক, তাহাকে আয়ত্ত করিবার নিমিত্ত সবিশেষ রূপ চেষ্টা করিতে লাগিল।

যে স্ত্রীলোক একবার তাহার কুলে জলাঞ্জলি দিয়া পর পুরুষের সহিত চলিয়া আসিয়াছে, এবং এতদিবস পর্যন্ত পরপুরুষেয় সহিত অনায়াসে কালযাপন করিতেছে, সেই স্ত্রীলোককে প্রলোভনে ভুলাইতে আর কতদিন অতিবাহিত হয়? দারোগা সাহেবের বয়ঃক্রম অধিক, ওসমানের বয়ঃক্রম তাহ অপেক্ষা অনেক অর। দারোগা সাহেব পরাধীন, ওসমান স্বাধীন। দারোগা সাহেবকে চাকরীর উপর নির্ভর করিয়া সমস্ত খরচ-পত্ৰ নিৰ্বাহ করিতে হয়, আর ওসমান জমিদার-পুত্র, গোফুর খাঁর মৃত্যুর পর সেই অগাধ জমিদারীর তিনি একমাত্র অধিকারী। যেস্থলে দারোগা সাহেবকে শত মুদ্রা খরচ করিতে হইলে তাহাকে অন্ধকার দেখিতে হয়, সেই স্থলে ওসমান সহস্র মুদ্রা অকাতরে ব্যয় করিতে সমর্থ। এরূপ অবস্থায় সেই স্ত্রীলোকটীকে ওসমানের করায়ত্ব করা নিতান্ত দুরূহ কাৰ্য্য নহে। বলা বাহুল্য, ক্রমে যুবতী ওমানের হস্তগত হইয়া পড়িল; দারোগা সাহেবকে পরি ঊ্যাগ করিয়া সে ওসমানের অনুবর্তিনী হইল। ওসমান তাহাকে সেই স্থান হইতে স্থানান্তরিত করিয়া, কোন লুকা য়িত স্থানে তাহাকে রাখিয়া দিল।

সুন্দরী যে কাহার সহিত কোথায় গমন করিল, এ কথা দারোগা সাহেব প্রথমত জানিতে পারিলেন না; কিন্তু ক্রমে এ সংবাদ জানিতে তাহার বাকী রহিল না। যখন তিনি জানিতে পারিলেন যে, ওসমান তাঁহার মুখের পথে কণ্টক হইয়া তাঁহার যকের ধন অপহরণ করিয়া লইয়া গিয়াছে, তখন তিনি তাহার উপর যেরূপ ক্রোধান্বিত হইয়া পড়িলেন, তাহা বর্ণন করা এ লেখনীর কাৰ্য্য নহে। দারোগা সাহেব প্রথমত সেই সুন্দরীকে পুনরায় আপনার নিকট আনয়ন কয়বার নিমিত্ত সবিশেরূপ চেষ্টা করিলেন। কিন্তু কোনরূপেই কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। এমন কি, দারোগা সাহেব এই কথা জমে ওসমানের পিতার কর্ণ গোচর পর্যন্ত করাইলেন। তাহাতেও কোনরূপ সুফল ফলিল না। ওসমানের পিতা এ বিষয়ে কোনরূপে দারোগা সাহেবকে সাহায্য নিলেন না।

এই সকল কারণে দারোগা সাহেবের প্রচণ্ড ক্রোধের সামান্যমাত্রও উপশম হইল না। কিরূপে তিনি ওসমান ও তাহার পিতাকে ইহার প্রতিশোধ দিতে পারিবেন, তাহার চেষ্টাতেই দিনরাত্রি অতিবাহিত করিতে লাগিলেন, এবং অনবরত প্রতিশোধের সুযোগ অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন।

এইরূপে ক্ৰমে এক বৎসর অতিবাহিত হইয়া গেল। এই এক বৎসরের মধ্যে দারোগা সাহেব সেই সুন্দরীর আশা পরিত্যাগ করিতে পারিলেন না, বা প্রতিহিংসার প্রবল চিন্তাকেও হৃদয় হইতে তাড়িত করিতে সমর্থ হইলেন না।

এইরূপে আরও কিছু দিন অতিবাহিত হইয়া গেল। একদিবস প্রাতঃকালে দারোগা সাহেব থানায় বসিয়া আছেন, এরূপ সময়ে একটা লোক গিয়া থানায় উপস্থিত হইল, ও কাঁদিতে দিতে আমোগার সম্মুখীন হইয়া কহিল, বর্ষাবতার। আপনি আমাকে এই বিপদ হইতে রক্ষা করুন। আপনি রক্ষা না করিলে, আর কেই আমাকে রক্ষা করিতে পারিবে না।

দারোগা। কি হইছে?

আগন্তুক। ওসমান আমার সর্বনাশ করিয়াছে।

দারোগা। ওসমান! কোন ওসমান, গোর ধীর পুত্র ওসমান?

আগন্তুক। মহাশয়!

দারোগা। সে তোমার কি করিয়াছে?

আগন্তুক। সে আমার একমাত্র কন্যাকে জোর করিয়া আমার ঘর হইতে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে।

দারোগা। কেন সে তাহাকে ধরিয়া লইয়া গেল?

আগন্তুক। কু-অভিপ্রায়ে সে তাহাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে।

দারোগা। তোমার কন্যার বয়ঃক্রম কত?

আগন্তুক। সে বালিকা, তাহার বয়ঃক্রম এখনও আঠার বৎসরের অধিক হয় নাই।

দারোগা। তাহার বিবাহ হয় নাই?

আগন্তুক। বিবাহ হইয়াছে বৈ কি। তাহার স্বামী এখনও বর্তমান আছে।

দারোগা। এ সংবাদ তাহার স্বামী শুনিয়াছে?

আগন্তুক। এ সংবাদ তাহার স্বামীকে আমরা দেই নাই। তাহার স্বামী বিদেশে থাকেন। সুতরাং এ সংবাদ তিনি এখনও জানিতে পারেন নাই। তিনি না জানিতে জানিতে যদি আমার কন্যাকে উদ্ধার করিয়া আনিতে পারি, তাহা হইলে এ লজ্জার কথা আমি তাহাকে আর জানিতে দিব না।

দারোগা। তোমার কন্যা ইচ্ছা করিয়া ওসমানের সহিত গমন করে নাই ত?

আগন্তুক। মা মহাশয়! তাহাকে জোর করিয়া ওসমান। ধরিয়া লইয়া গিয়াছে।

দারোগা। তুমি ইহার প্রমাণ করিতে পারিবে।

আগন্তুক। খুব পারিব, গ্রামশুদ্ধ সব লোক দেখিয়াছে। তাঁহারা সকলেই সত্য কথা কহিবে। আপনি সেই স্থানে গমন করিলেই, দেখিতে পাইবেন, আমার কথা প্রকৃত কি না?

দারোগা। কতক্ষণ হইল, ওসমান তোমার কন্যাকে জোর করিয়া ধরিয়া লইয়া গিয়াছে।

আগন্তুক। মহাশয় আজ ছয় দিবস হইল।

দারোগা। ছয় দিবস। মিথ্যা কথা। ছয় দিবস হইল, তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, আর আজ তুমি থানায় সংবাদ দিতে আসিলে; তোমার এ কথা কে বিশ্বাস করিবে?

আগন্তুক। মহাশয়! আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন, আর না করুন, আমি কিন্তু প্রকৃত কথা কহিতেছি। আমার অনুপস্থিতিতে এই কাৰ্য্য হইয়াছে। আমার বাড়ীতে আমার সেই একমাত্র কন্যা ব্যতীত আর কেহই ছিল না; সুতরাং সুযোগ পাইয়া দুবৃত্ত এই কাৰ্য্য করিয়াছে। তাহার ভয়ে পাড়ার লোক আমাকে পর্যন্ত সংবাদ দিতে সমর্থ হয় নাই। অঙ্গ আমি বাড়ীতে আসিয়া যেমন এই সকল ব্যাপার জানিতে পারিলাম, অমনি আপনার নিকট আগমন করিয়াছি। এখন আপনি রক্ষা না করিলে, আমার আর উপায় নাই।

দারোগা। তোমার বাড়ী যে গ্রামে, সেই গ্রাম হইতে ওসমানের বাড়ী কতদুর?

আগন্তুক। খুব নিকটে, পার্শ্ববর্তী গ্রামে।

দারোগা। তোমার জমিদার কে।

আগন্তুক। সেই হতভাগাই আমার জমিদার।

দারোগা। জমিদারীর খাজানা তোমার কিছু বাকী আছে।

আগন্তুক। বাকী আছে। মিথ্যা কথা কহিব না, আমি আজ তিন বৎসর খাজানা দিতে পারি নাই।

দারোগা। ফি বৎসর তোমাকে কত টাকা করিয়া খাজান দিতে হয়?

আগন্তুক। সালিয়ানা আমাকে পনর টাকা করিয়া খাজানা দিতে হয়। পঁয়তাল্লিশ টাকা খাজানা আমার বাকী পড়িয়াছে।

দারোগা। সেই খাজানার নিমিত্ত তাঁহারা তাগাদা করে না?

আগন্তুক। তাগাদা কমে বৈ কি, কিন্তু দিয়া উঠিতে পারি না।

দারোগা। যখন তোমার কন্যাকে ওসমান ধরিয়া লইয়া গিয়াছিল, সেই সময় তাহার সতে আর কোন লোক ছিল?

আগন্তুক। তাহার সহিত আরও চারি পাঁচজন লোক ছিল।

দারোগা। ওসমানের পিতা গোয় খ সেই সঙ্গে ছিলেন?

আগন্তুক। না মহাশয়। তিনি ছিলেন না।

দারোগা। তুমি জান না; তিনি না থাকিলে, কখনও এইরূপ কাৰ্য্য হইতে পারে না। গ্রামের যে সকল ব্যক্তি এই ঘটনা দেখিয়াছে, তাহাদিগকে তুমি ভাল করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছ কি?

আগন্তুক। জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। কিন্তু কেই সে কথা কহে না। আরও ভাবিয়া দেখুন না কেন, পুল বদি কোন যুবতী রমণীর সতীত্ব নষ্ট করিবার চেষ্টা করে, পিতা কি কখনও তাহার সহায়তা করিয়া থাকেন?

দারোগা। ওসমান শেষে উহার সতীত্ব নষ্ট করিতে পারে; কিন্তু প্রথমতঃ সেই কাৰ্যের নিমিত্ত যে তাহাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, তাহা তোমাকে কে বলিল? অপর কোন কারণে সে কি তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া যাইতে পারে না?

আগন্তুক। আর তা কোন কারণ দেখিতে পাইতেছি না, বা শুনিতেও পাইতেছি না।

দারোগা। ওমানের পিতা গোফুর খাঁ এখন কোথায় আছেন, বলিতে পার?

আগন্তুক। তিনি এখন বাড়ীতেই আছেন।

দারোগা। কানপুর হইতে তিনি কবে আসিয়াছেন।

আগন্তুক। পাঁচ ছয় দিবস হইবে।

দারোগা। তাহা হইলে যে দিবস ওসমান তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, সেই দিবস গোয় কান পুর হইতে বাড়ীতে আসিয়াছেন।

আগন্তুক। হাঁ মহাশয়! হয় সেই দিবসই আসিয়াছেন, না হয়, তাহার পরদিন আগমন করিয়াছেন।

দারোগা। তাহা হইলে ঠিক হইয়াছে। তোমার কন্যার ধর্ম নষ্ট করিবার নিমিত্ত ওসমান তোমার দুহিতাকে ধরিয়া লইয়া যায় নাই। গত তিন বৎসর পর্যন্ত তোমার নিকট হইতে খাজনা আদায় না হওয়ায়, সেই খাজনা আদায় করিবার মানসে ওমানের পিতা গোফুর খাঁ আপন পুত্র ওসমান ও তার কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্ম্মচারীকে সঙ্গে করিয়া তোমার বাড়ীতে আগমন করেন। তুমি বাড়ীতে ছিলে না; সুতরাং তাঁহারা তোমাকে বাড়ীতে দেখিতে পান নাই। কিন্তু তুমি যে এতই বাড়ীতে নাই, ইহা না ভাবিয়া, খাজানা দিবার জয়ে তুমি লুকায়িত পাই, এই ভাবিয়া তোমাকে ভয় দেখাইয়া খাজনা আদায় করিয়া লইবার মানসে তোমার একমাত্র কন্যাকে ধরিয়া লইয়া যাইবার নিমিত্ত গোফুর খাঁ তাঁহার পুত্রকে আদেশ প্রদান করিয়াছিলেন। পিতার আদেশ পাইয়া ওসমান কয়েকজন লোকের সাহায্যে তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে। খাঁ সাহেবও তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিয়াছেন। কেমন, ইহাই প্রকৃত কথা কি না?

আগন্তুক। না মহাশয়। ইহা এত কথা নহে। ওসমানের পিতা সেই স্থানে উপস্থিত ছিলেন না, বা তিনি আদেশ প্রদান করেন নাই। আমার বাকী থানায় নিমিত্তও এটনা ঘটে নাই।

দারোগা। যা ব্যাটা, তবে তোর মোক গ্রহণ করিব। তুই বাড়ীতে হিলি নি, এত কথা যে কি, তাহার তুই কি জানি? আমরা ইতিপূর্বে সকল কথা জানিতে পারিয়াছি, কেবল কোন ব্যক্তি আমার নিকট আসিয়া নালিশ করে নাই বলিয়া, আমি এ পর্যন্ত অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হই নাই। আমি যেরূপ কহিলাম, সেইপের সাক্ষী সকল সংগ্রহ করিয়া রাখ গিয়া। আমি একজন মাদারকে সঙ্গে দিতেছি, যাহা তুই বুঝতে না পাবি, তিনি তাহা হতাকে বুঝাইয়া দিবেন। তাঁহারা আমি গিন্ধ আসন্ধানে প্রবৃত্ত হইব।

আগন্তুক। দোহাই ধৰ্মবতায়! যাহাতে আমি আমার কাটীকে পাই, আপনাকে সেই উপায় করতে হবে।

দারোগা। তাহাই হইবে। এখন তুই আমার জমা দারের সহিত গমন করিয়া সাক্ষী-সাবুদের সংগ্রহ করিয়া দে। তুই লেখা-পড়া জানিস্ কি?  আগন্তুক। আমরা চাষার ছেলে, লেখাপড়া শিখি নাই।

দারোগা। নিজের নাম লিখিতে পারি?

আগন্তুক। না মহাশয়! আমি আমার নাম পর্যন্ত লিখিতে পারি না।

দারোগা। তোর নাম কি?

আগন্তুক। আমার নাম শেখ হেদায়েৎ।

দারোগা। আচ্ছা হেদায়েৎ, তুমি আমার জমাদারের সহিত তোমার গ্রামে গমন কর। আহারান্তে আমি নিজে গিয়া এই অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইব। সাক্ষীগণ যেন উপস্থিত থাকে।

হেদায়েৎকে এই কথা বলিয়া, দারোগা সাহেব তাহার একজন সবিশেষ বিশ্বাসী জমাদারকে ডাকিলেন, এবং নির্জনে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাহার সহিত কি পরামর্শ করিয়া পরি শেষে তাহাকে কহিলেন, এই মোকদ্দমায় বিশেষরূপে তোমাকে আমার সাহায্য করিতে হইবে। যে সুযোগ পাইয়াছি, সে সুযোগ কিছুতেই পরিত্যাগ করিতে পারিব না। আমার কোন ক্ষমতা কাছে কি না, এবং আমার ঘর ওসমান ও তার পিতার কোনরূপ অনিষ্ট ঘটতে পারে কি না, তা তাহা তাহাদিগকে উত্তমরূপে দেখাইতে হইবে। যেরূপ উপায়েই হউক, উঁহাদিগের উভয়কেই জেলে দিয়া আমার এতদিসের মনের যন্ত্রণা নিবারণ করিতে হইবে।

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া জমাদার কহিল, আপনি যত শীঘ্র হয়, আগমন করুন। আমি সেই স্থানে গমন করি মাত্রই সমস্ত ঠিক করিয়া ফেলিব। তাহার নিমিত্ত আপনাকে ভাবিতে হইবে না

এই বলিয়া হেদায়েৎকে সঙ্গে লইয়া জমাদার তৎক্ষণাৎ সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

জমাদার ও হেদায়েৎ সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবার পর, দারোগা সাহেব প্রথমে এতেলা পুস্তক নিজ হস্তে গ্রহণ করিয়া, নিম্নলিখিতরূপে প্রথম এতেল ফরিয়াদীর অসাক্ষাতেই লিখিলেন।

আমার নাম সেখ হেদায়েৎ। আমার বাসস্থান * * * গ্রাম। গত আটদিবস হইতে আমি আমার বাড়ীতে ছিলাম না, * * * গ্রামে আমার কুটুম্ব * * *-র নিকট আমি আমার কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে গমন করিয়াছিলাম। আমার বাড়ীতে অপর কেহ নাই; কেবলমাত্র আমার যুবতী কন্যা * * *-কে আমি বাড়ীতে রাখিয়া গিয়াছিলাম। অন্য প্রাতঃকালে আমি বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়া, আমার কন্যাকে আমার বাড়ীতে দেখিতে পাইলাম না। পাড়া-প্রতিবাসীগণের নিকট অনুসন্ধান করিয়া আনিতে পারিলাম যে, আমাদিগের গ্রামের জমিদার গোফুর খাঁ তাহার পুত্র ওসমান এবং কয়েকজন কর্ম্মচারীকে সঙ্গে লইয়া খাজনা আদায় করিবার নিমিত্ত আমাদিগের গ্রামে আগমন করেন, এবং গ্রামের এক স্থানে বসিয়া প্রজাগণকে ডাকাইয়া খাজানার তহবিল করিতে থাকেন। শুনিলাম, আমাকেও ডাকিবার নিমিত্ত তিনি একজন পাইক পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। আমি বাড়ী ছিলাম না। সুতরাং পাইক আমাকে দেখিতে পায় নাই। মে গিয়া জমিদার মহাশয়কে কহে, হেদায়েৎ বাড়ীতে নাই, কেবল তাহার কন্যা বাড়ীতে আছে। সে কহিল, তাহার পিতা অদ্য দুই দিবস হইল, কুটুম্ব বাড়ীতে গমন করিয়াছে। এই কথা শুনিয়া জমিদার মহাশয় অতিশয় ক্রোধাবিত হইলেন ও কহিলেন, হেদায়েৎ কোন স্থানে যায় নাই। অনেক টাকা খাজানা বাকী পড়িয়াছে, আমার নিকট আসিলে খাজনা দিতে হইবে, এই ভয়ে সে লুক্কায়িত আছে। যা হক তাহার কন্যাকে ধরিয়া আন, তাহা হইলে সে এখনই আসিয়া খাজনা মিটাইয়া দিবে। এই আদেশ পাইয়া জমিদারের পুত্র ওসমান কয়েকজন কর্ম্মচারীর সাহায্যে আমার কন্যাকে আমার বাড়ী হইতে তার অনিচ্ছা-স্বত্বে জোর করিয়া তাহাকে ধরিয়া জমিদার মহাশয়ে নিকট লইয়া যায়। জমিদার মহাশ প্রায় দুই ঘণ্টা তাহাকে সেই স্থানে বসাইয়া রাখেন। যুবতী স্ত্রীলোকের এইরূপ অবমাননা দেখিয়া, গ্রামস্থ সমস্ত লোক আমার কন্যাকে ছাড়িয়া দিবার নিমিত্ত জমির মহাশয়কে বার বার অনুরোধ করেন; কিন্তু তিনি কাহারও কথায় কর্ণপাত না করিয়া, সেই স্থান হইতে গমন করিবার সময় তাঁর পুত্র ওসমান ও অপরাপর কৰ্ম্ম চারীর সাহায্যে আমার কন্যাকে বাঁধিয়া তাহাদিগের সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগের বাড়ী পর্যন্ত লইয়া যান। বাড়ীর ভিতর লইয়া গিয়া, তাঁহারা যে আমার কন্যার কি অবস্থা করিয়াছেন, তাহা আমি অবগত নহি। সেই পর্যন্ত আমার কন্যা আর প্রত্যাগমন করে নাই, বা গ্রামের কোন ব্যক্তি আর তাহাকে দেখে নাই। আমার অনুমান ও বিশ্বাস যে, জমিদার মহাশয় এবং তাহার পুত ওসমান আমার কন্যাকে তাহার বিনা-ইচ্ছায় তাহাদিগেয় বাড়ীর ভিতর অন্যায়রূপে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন, বা তাহাকে হত্যা করিয়াছে। আমি আপন ইচ্ছায় আমার কন্যাকে পাইবার মানসে এই এজাহার দিতেছি। ইহাতে যেরূপ অনুসন্ধানের প্রয়োজন, সেইরূপ ভাবে অনুসন্ধান করিয়া আমার কন্যাকে বাহির করিতে, আজ্ঞা হয়। আমি যে এজাহার দিতেছি, গ্রামশুদ্ধ সমস্ত লোক তাহার সাক্ষী আছে। সেই স্থানে গমন করিলেই, আপনি জানিতে পারিবেন যে, আমার কথা সম্পূর্ণরূপ সত্য কি না আমি লেখা-পড়া জানি না, আমার এজাহার যায় আপনি লিখিয়া লইলেন, তাহা পাঠ করিয়া পুনরায় আমাকে আপনি শুনাইয়া দিলেন; আমি যেরূপ বলিয়াছি, ঠিক সেই রূপই লেখা হইয়াছে। আমি আমার এজাহার শুনিয়া, আমি এই স্থানে নিশানসহি করিলাম। ইতি–

নিশানসহি-সেখ হেদায়েৎ।

দারোগা সাহেব প্রথম এতো পুস্তকে এইরূপ এজাহার লিখিয়া উপযুক্তরূপ লোকজন সমভিব্যাহারে এই অনুসন্ধানে গমন করিবার নিমিত্ত প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। তাহার সহিত গমন করিবার নিমিত্ত যে সকল লোকজনের উপর আদেশ হইল, তাঁহারাও আহারাদি করিয়া ক্ৰমে প্রস্তুত হইতে লাগিলেন।

সন্ধ্যায় একটু পূর্বে দারোগা সাহেব তাহার লোকজন সমভিব্যাহারে হেদায়েতের গ্রামে গিয়া উপস্থিত হইলেন। হেদায়েতের সমভিব্যাহারে জমাদার সাহেব পূর্বেই সেই স্থানে গমন করিয়াছিলেন। সুতরাং দারোগা সাহেব সেই স্থানে গমন করিলে তাহার যে সকল বিষয়ের প্রয়োজন হইবার সম্ভাবনা, তাহার সমস্তই তিনি সেই স্থানে ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন; অর্থাৎ বসিবার স্থান, লোকজন, রাত্রিকালের আহারাদির বন্দোবস্ত সমস্তই ঠিক ছিল। তাহার উপর গ্রামস্থ প্রায় সমস্ত লোকই সেই স্থানে উপস্থিত ছিলেন।

দারোগা সাহেব সেই রাত্রি সেই গ্রামে আহারাদি করিয়া রাত্রিযাপন করিলেন মাত্র; কিন্তু যে বিষয় অনুসন্ধানের নিমিত্ত তিনি সেই স্থানে গমন করিয়াছিলেন, সে সম্বন্ধে কোনরূপ অনুসন্ধান করা দূরে থাকুক, গ্রামস্থ কোন ব্যক্তিকে সে বিষয়ের কোন একটা কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না। আহারাদি করিয়া রাত্রিকালে যখন দারোগা সাহেব শয়ন করিলেন, সেই সময় তাঁহার আদেশ গ্রহণ করিয়া, গ্রামস্থ সমস্ত লোক প্রস্থান করিলেন; কিন্তু গমন করিবার সময় দারোগা সাহেব তাহাদিগকে পরদিবস অতি প্রত্যুষে পুনরায় সেই স্থানে আসিতে কহিলেন। সমস্ত লোক গমন করিবার পর দারোগা সাহেব জমাদারের সহিত অনেকক্ষণ পর্যন্ত পরামর্শ করিয়া উভয়েই নিদ্রিত হইয়া পড়িলেন।

পরদিবস অতি প্রত্যুষেই দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালিত হইল। সকলে আগমন করিবার পর একে একে তিনি সমস্ত লোককেই দুই চারি কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাদিগের কোন কথা এখন তিনি কাগজ-কলমে করিলেন না; তবে দেখা গেল, সেই সকল লোক যাহা কহিল, তাহার ছত্রে ছত্রে প্রথম এতেলার সহিত মিলিয়া গেল। দারোগা সাহেব নিজের ইচ্ছামত যেরূপ ভাবে প্রথম এতেলা লিখিয়াছিলেন, গ্রামস্থ সমস্ত লোকেই যখন সেইরূপ ভাবে তাহাদের এজাহার প্রদান করিল, তখন তিনি সেই সকল বিষয় কাগজপত্রে না লিখিয়া আর স্থির থাকিতে পারিলেন না।

গ্রামের প্রধান প্রধান চারি পাঁচজনের এজাহার দারোগা সাহেব লিখিয়া লইলেন। গ্রামের কোন লোক ওমানের উপর সন্তুষ্ট ছিল না। সুতরাং সকলেই ওসমান ও তাহার পিতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করিল। সকলেই কহিল যে, হেদায়েতের নিকট হইতে খাজনা আদায় করিবার নিমিত্তই এই গোলযোগ। হোয়েতের কন্যাকে লাইক করিয়া রাখিলেই খাজনা আদায় হইবে, এই ভাবিয়া গোরখা তাহাকে ধরিয়া আনিবার নিমিত্ত আদেশ প্রদান করেন। তাঁহার পুত্র ওসমান অপর কয়েকজন লোকের সাহায্যে এই আদেশ প্রতিপালন করে। পরিশেবে উহার কন্যাকে ধরিয়া তাঁহা দিগের বাড়ীতে লইয়া যায়।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

ওসমান ও তাহার পিতাকে বিপদাপন্ন করিবার মানসে দারোগা সাহেব যাহা মনে মনে স্থির করিয়াছিলেন, কাৰ্য্যেও তাহা পরিণত হইতেছে দেখিয়া, মনে মনে অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন।

সেই স্থানে অনুসন্ধান আপাততঃ স্থগিত রাখিয়া হেদায়েৎ ও গ্রামের দুই চারিজন লোককে সঙ্গে লইয়া গোফুর খাঁন বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলেন।

গোফুর খাঁ সেই সময় বাড়ীতেই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ওসমান সেই সময় বাড়ীতে ছিল না। গোফুর খাঁর সহিত দারোগা সাহেবের কিয়ৎক্ষণ কথাবার্তা হইলে পর, ওসমান আসিয়া সেই স্থানে কোথা হইতে উপস্থিত হইল। তাহাকে দেখিয়া দারোগা সাহেব কহিলেন, আপনার উপর একটা ভয়ানক নালিশ হইয়াছে। যে পর্যন্ত আমি অনুমতি প্রদান না করি, সেই পৰ্যন্ত আপনি আমার সম্মুখ হইতে গমন করিবেন না।–

ওসমান। আর যদি আমি চলিয়া যাই?

দারোগা। তাহা হইলে আপনার সহিত ভদ্রোচিত ব্যবহার করিতে আমি কোনরূপেই সমর্থ হইব না। সামান্য লোককে যেরূপ ভাবে আমরা রাখিয়া থাকি, বাধ্য হইয়া আপনাকেও সেইরূপ ভাবে আমাকে রাখিতে হইবে।

গোফুর। আমার উপর অভিযোগ কি?

দারোগা। আপনার আদেশ অনুযায়ী আপনার গ্রামবাসী আপনারই প্ৰজা হেদায়েতের যুবতী কন্যাকে অন্যায়রূপে আজ কয়েকদিবস হইতে আপনার বাটীতে আনিয়া আবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে।

গোফুর। আমার আদেশ অনুযায়ী?

দারোগা। প্রমাণে সেইরূপ অবগত হইতে পারিতেছি।

গোফুর। আমি তাহাকে আবদ্ধ করিতে আদেশ প্রদান করিব কেন?

দারোগা। বাকী খাজানা আদায় করিবার অভিপ্রায়ে।

গোফুর। মিথ্যা কথা।

দারোগা। সত্য মিথ্যা আমি অবগত নহি; প্রমাণে যাহা পাইতেছি, তাহাই আমি আপনাকে বলিতেছি। আর সেই প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া আমাকে ইহার প্রতিবিধান করিতে হইবে।

গোফুর। আপনি প্রমাণ পাইতেছেন, আমার আদেশে এই কাৰ্য্য হইয়াছে?

দারোগা। হাঁ।

গোফুর। আমার আদেশ প্রতিপালন করিল কে? অর্থাৎ কে তাহাকে ধরিয়া আনিল?

দারোগা। আপনার পুত্র, এবং আর তিন চারিজন নোক।

গোফুর। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আপনি এখন কি করিতে চাহেন?

দারোগা। আপনি যদি সহজে সেই স্ত্রীলোকটীকে বাহির করিয়া না দেন, তাহা হইলে প্রথমতঃ আপনার বাড়ী আমি উত্তমরূপে খানাতল্লাসি করিয়া দেখিব। দেখিব, উহার ভিতর সেই স্ত্রীলোকটা পাওয়া যায়, কি না।

গোফুর। আর যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে কি হইবে?

দারোগা। সে পরের কথা; যাহা হয়, পরে দেখিতে পাইবেন।

ওসমান। কার হুকুম মত আপনি আমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে চাহেন? বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করি বার কোন ওয়ারেন্ট আছে কি?

দারোগা। কাহার হুকুম মত আমি তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে চাই, তাহা তুমি বালক, জানিবে কি প্রকারে? আমি আমার নিজের হুকুমে তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিব।

ওসমান। যদি প্রবেশ করিতে না দি?

দারোগা। তোমার কথা শোনে কে?, আমি জোর করিয়া প্রবেশ করিব। তাহাতে যদি তুমি কোনরূপ প্রতি বন্ধকতা জন্মাও, তাহা হইলে তোমায় অপর আর এক মোকদ্দমায় আসামী হইতে হইবে।

ওসমান। যাহার অনুসন্ধানের নিমিত্ত আপনার বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবেন, তাহাকে যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে জবাবদিহি কে করিবে? আপনি করিবেন কি?

দারোগা। যাহাকে জবাবদিহিতে আনিতে পারিবে, সে-ই জবাবদিহি করিবে।

ওসমান। আর যদি সে আপন ইচ্ছায় আমাদিগের বাড়ীতে আসিয়া থাকে?

দারোগা। সে উত্তম কথা; সে আসিয়া আমাদিগের সম্মুখে সেই কথাই বলুক। তাহা হইলেই সকল গোলযোগ মিটিয়া যাইবে।

গোফুর। তবে কি স্ত্রীলোকটা আমাদের বাড়ীতে আছে?

ওসমান। না, সে আমাদের এখানে আসেও নাই, বা আমাদিগের এখানে নাইও।

দারোগা। মহাশয়! আমি আর অধিক বিলম্ব করিতে পারিতেছি না। এখন কি করিতে চাহেন, বলুন। স্ত্রীলোকটাকে কি আমার সম্মুখে আনিয়া দিবেন, না আমি বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়া থানাতল্লাসি করিতে আরম্ভ করিব?

গোফুর। আমি ত বলিতেছি, সেই স্ত্রীলোকটা আমা দিগের বাড়ীতে নাই। আমার কথায় আপনি বিশ্বাস না করেন, আপনার যাহা অভিরুচি হয়, তাহা আপনি করিতে পারেন। কিন্তু, আমি পূর্বেই আপনাকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, যাহা করিবেন, ভবিষ্যৎ ভাবিয়া করিবেন।

দারোগা। আমার কাৰ্য আমি বুঝি, তাহার নিমিত্ত আমি আপনার নিকট উপদেশ গ্রহণ করিতে আসি নাই। আমি লোকজনের সহিত আপনার বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতেছি, ইচ্ছা করেন যদি, তাহা হইলে আপনার বাড়ীর স্ত্রীলোকদিগকে কোন একটা গৃহের ভিতর গমন করিবার নিমিত্ত বলিতে পারেন। আর ইচ্ছা না করেন, তাহাতে আমার কোনরূপ ক্ষতি-বৃদ্ধি নাই।

এই বলিয়া দারোগা সাহেব আপনার সমভিব্যাহারী লোকজনের সহিত বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবার অভিপ্রায়ে উথিত হইলেন। তখন অনন্যোপায় হইয়া গোফুর খাঁ, ওসমান, এবং সেই সময় সেই স্থানে গোফুরের বন্ধু-বান্ধব গণের মধ্যে যাহারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁহারাও সকলে দারোগা সাহেবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিবার নিমিত্ত উথিত হইলেন।

দারোগা সাহেব প্রথমেই অন্দরমহলের মধ্যে প্রবেশ করিলেন না। সদর বাড়ীর ভিতর যে সকল গৃহ ছিল, প্রথমেই সেই সকল গৃহের মধ্যে অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এক একখানি করিয়া সৰ্ব্বপ্রথমে সমস্ত খোলা ঘরগুলি দেখিলেন। তাহার ভিতর কিছু দেখিতে না পাইয়া, পরি শেষে যে ঘরগুলিতে চাবি বদ্ধ ছিল, চাবি খুলিয়া সেই ঘর গুলিও একে একে দেখিতে লাগিলেন।

গোফুর খাঁর প্রকাণ্ড বাড়ী; সুতরাং সদরে ও অন্দরে অনেক ঘর। বাহিরের ঘরগুলি দেখিতে প্রায় দুই ঘণ্টা কাল অতিবাহিত হইয়া গেল। এইরূপে তালাবদ্ধ কতকগুলি ঘর দেখিবার পর এক পার্শ্বের এক নির্জন গৃহের তালা খুলিলেন। সেই গৃহের ভিতর অপর দ্রব্য-সামগ্রী কিছুই ছিল না, কেবল গৃহের মধ্যে একখানি পালঙ্কের উপর একটা বিছানা আছে মাত্র।

সেই বিছানার সন্নিকটে গিয়া বা দেখিলেন, তাহাতে সমস্ত লোকেই একবারে বিস্মিত হইয়া পড়িলেন। ইতি পূর্বে দারোগা সাহেব যাহা স্বপ্নেও একবার মনে ভাবেন নাই, তিনি তাহা দেখিয়াই যেন হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণের নিমিত্ত যেন তাহার সংজ্ঞাও বিলুপ্ত হইল। একটু পরেই দারোগা সাহেব কহিলেন, কি মহাশয়। এ কি দেখিতেছি?

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া আর কাহারও মুখে কোন কথা বাহির হইল না। পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে দেখিতে লাগিলেন। কেবল হেদায়েৎ সেই বিছানার সঙ্গিক বৰ্ত্তী হইয়া কহিল, মহাশয়! এই আমার কন্যা।

এই বলিয়া হেদায়েৎ তাহার কন্যার গাত্রে হস্তাপণ করিয়া বার বার তাহাকে ডাকিতে লাগিল; কিন্তু সে নড়িল না, যা তাহার কথার কোনরূপ উত্তর প্রদান করিল না। তখন সকলেই জানিতে পারিল যে, সে আর জীবিত নাই।

দারোগা। প্রথমতঃ বড় লম্বা লম্বা কথা কহিতেছিলে যে, এখন আর মুখ দিয়া কথা বাহির হইতেছে না কেন?

গোফুর। ইহার ব্যাপার আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

দারোগা। এখন ত কিছুই বুঝিতে পারিবেন না। এই স্ত্রীলোকের মৃতদেহ এই তালাবন্ধ গৃহের ভিতর কিরূপে আসিল?

গোফুর। আমি ইহার কিছুই অবগত নহি।

দারোগা। (ওসমানের প্রতি) কিগো ওসমান মিঞা, আপনিও বোধ হয়, ইহার কিছুই জানেন না?

ওসমান। না মহাশয়! আমিও ইহার কিছুই অবগত নহি।

দারোগা। সদর বাড়ীর ভিতর তালাবদ্ধ গৃহে, পালঙ্কের। উপর মৃত স্ত্রীলোকের লাস রহিয়াছে। আর আপনারা বলিতেছেন যে, আপনারা কিছুই জানেন না। দ্বারে যে দ্বারবান বসিয়া আছে, সেও বলিবে, আমি কিছুই জানি না। কিন্তু কিরূপে এই স্থানে লাস আসিল, ইহার যদি সন্তোষ জনক প্রমাণ আমাকে আপনারা প্রদান করিতে না পারেন, তাহা হইলে জানিবেন, আপনাদিগের উভয়কেই আমি ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলাই।

দারোগার কথা শুনিয়া গোফুর খাঁ চতুর্দিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন, এবং এই অবস্থায় কি করিবেন, তাহার কিছুই স্থির করতে না পারিয়া সেই স্থানে বসিয়া পড়িলেন।

দারোগা। কি মহাশয়। আপনি চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন যে? এই লাস কিরূপে আপনার বাড়ীর ভিতর আসিল, সে সম্বন্ধে কোন কথা বলিতেছেন না কেন?

গোফুর। আপনার কথায় আমি যে কি উত্তর প্রদান করিব, তাহা কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। যখন ইহার কিছুই আমি অবগত নহি, তখন আমি আপনাকে আর কি বলিব?

দারোগা। কিগো দ্বারবান্ সাহেব! এ সম্বন্ধে তুমি কি বলিতে চাই?

দ্বারবান্। দোহাই ধর্মাবতার! আমি ইহার কিছুই জানি না।

দারোগা। তুমি দ্বারবান, সর্বদা তুমি দরজায় বসিয়া থাক, অথচ তুমি বলিতেছ, তুমি ইহার কিছুই জান না। এ কথা কি কেহ সহজে বিশ্বাস করিতে পারে?

দ্বারবান্। আপনি বিশ্বাস করুন, আর না করুন, আমি প্রকৃত কথাই বলিতেছি। আমি প্রকৃতই জানি না যে, এই মৃতদেহ কিরূপে বা কাহা কর্তৃক এই বাড়ীর ভিতর আসিল।

গোফুর খাঁ, ওসমান ও দ্বারা যখন কোন কথা বলিল না, তখন সেই সময় দারোগা সাহেব তাহাদিগকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া, নিজের ইচ্ছামত অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন।

লাশের সুরতহাল করিয়া পরীক্ষার্থ উহ জেলার ডাক্তার সাহেবের নিকট প্রেরণপূর্বক ঘটনাস্থলে বসিয়া দারোগা সাহেব কয়েকদিবস পর্যন্ত অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এখনকার অনুসন্ধান আসামীগণকে লইয়া নহে; এখনকার অনুসন্ধান, ফরিয়াদী ও সেই স্থানের প্রজাগণের সাহায্যে এবং জমাদার সাহেবের আন্তরিক যত্নের উপর নির্ভর করিয়াই হইতে লাগিল। অর্থাৎ গোফুর খাঁ ও তাঁহার পুত্রের বিপক্ষে এই হত্যা সম্বন্ধে যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইতে পারে, এখন সেই অনুসন্ধানই চলিতে লাগিল।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

পাঠকগণ পূর্ব হইতেই অবগত আছেন যে, গোফুর খাঁ একজন নিতান্ত সামান্য লোক নহেন। দেশের মধ্যে তাঁহার মান-সন্ত্রম যেরূপ থাকা আবশ্যক, তাহার কিছুরই অভাব নাই। অর্থও যথেষ্ট আছে। কিন্তু এই সকল থাকা স্বত্বেও প্রজাগণ কেহই তাহার উপর সন্তুষ্ট নহে; সকলেই তাঁহার বিপক্ষ। প্রজাগণ গোর খার বিপক্ষে দণ্ডায়মান হইবার একমাত্র কারণ, তাঁহার পুত্র ওসমান। ওসমানের অত্যাচারে সকলেই সবিশেষরূপ জ্বালাতন হইয়া পড়িয়াছে। যখন ওমামের অত্যাচার তাঁহারা সময় সময় সহ করিয়া উঠিতে সমর্থ হয় নাই, তখন তাঁহারা তাহার পিতা গোফুর খাঁর নিকট পর্যন্ত গমন করিয়া, ওসমানের অআচারের সমস্ত কথা তাহার নিকট বিবৃত করিয়াছে। তথাপি গোফুর তাহাদিগের কথায় কোনরূপ কর্ণপাত করেন নাই, বা তাহার প্রতিবিধানের কোনরূপ চেষ্টাও করেন নাই। এই সকল কারণে প্ৰজামাত্রেই পিতা-পুত্রের উপর অস। সুতরাং আজ তাঁহারা যে সুযোগ পাইয়াছে, সেই সুযোগ পরিত্যাগ করিবে কেন? তাহার উপর দারোগা সাহেব সহায়।

প্রজাগণ এক বাক্যে গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্র ওসমানের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিতে লাগিল। অনুসন্ধান সমাপ্ত হইলে, দারোগা সাহেব দেখিলেন, নিম্নলিখিত বিষয় সম্বন্ধে উপস্থিত মোকদ্দমায় উত্তমরূপে প্রমাণ হইয়াছে।

১ম। সেখ হেদায়েতের যে গ্রামে বাড়ী, সেই গ্রামের প্রজাগণের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, গোফুর খাঁ ও ওসমান বকেয়া খাজানা আদায় করিতে সেই গ্রামে গমন করেন। হেদা য়েতের নিকট কয়েক বৎসরের খাজানা বাকী পড়ায়, এবং হেদায়েৎ সেই সময় সেই স্থানে উপস্থিত না থাকায়, ওসমান গোফুর খাঁর আদেশমত কয়েকজন পাইকের সাহায্যে, হেদা যেতের একমাত্র যুবতী কন্যাকে বলপূর্বক তাহার বাড়ী হইতে সৰ্ব্বসমক্ষে ধরিয়া আনে, এবং তাহার নিকট হইতে খাজানা আদায় করিবার মানসে গোফুর খাঁর আদেশমত সৰ্ব্ব সমক্ষে তাহাকে সবিশেষরূপে অবমানিত করে। কিন্তু তাহার নিকট হইতে খাজনা আদায় না হওয়ায়, গোয় খ ও ওসমান অপরাপর লোকের সাহায্যে তাহাকে সেই স্থান হইতে বলপূর্বক ধরিয়া আপন গৃহাভিমুখে লইয়া যান।

২য়। অপরাপর গ্রামের কতকগুলি প্ৰজার দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, হেদায়েতের কন্যাকে হেদায়েতের গ্রাম হইতে ধৃত অবস্থায় গোফুর খাঁর গ্রামে গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্র কর্তৃক লইয়া যাইতে অনেকেই দেখিয়াছে।

৩য়। গোফুর খাঁর গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজাবর্গের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, হেদায়েতের কন্যাকে গোয় খা ও ওসমান তাঁহাদিগের বাড়ীর ভিতর লইয়া গিয়াছে।

৪র্থ। গোফুর খাঁর কয়েকজন ভৃত্য ও তাহার সেই পূর্ব বর্ণিত দ্বারবানের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, গোফুর খাঁর আদেশমত ওসমান হেদায়েতের সেই কন্যাকে আপনাদের গৃহের ভিতর আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে, এবং যে পর্যন্ত সে জীবিত ছিল, তাহার মধ্যে ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় সে নিতান্ত অস্থির হইলেও, তাহাকে একমুষ্টি অন্ন বা এক গণ্ডুষ জল প্রদান করিতে বারণ করিয়াছিল। এমন কি, সাক্ষিগণের মধ্যে কেহ দয়াপরবশ হইয়া উহাকে এক গণ্ডষ পানীয় প্রদান করিতে উদ্যত হইলে, গোফুর ও তাঁহার পুত্র ওসমান খ। তাহাকেও উহা প্রদান করিতে দেন নাই।

এতদ্ব্যতীত আরও প্রমাণিত হইল যে, যে দিবস পুলিস কর্তৃক লাস বাহির হইয়া পড়ে, তাহার দুই কি তিন দিবস পূর্বে একজন ভৃত্য কোনরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া, ওসমান খার নিকট হইতে সেই গৃহের চাবি অপহরণ করে, এবং ওসমান ও গোফুর খাঁর অসাক্ষাতে সেই গৃহের চাবি খুলিয়া দেখিতে পায় যে, ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় সেই স্ত্রীলোকটীর অবস্থা এরূপ হইয়া পড়িয়াছে যে, তাহার আর বাঁচিবার কিছুমাত্র আশা নাই। এই ব্যাপার দেখিয়া সেই সামান্য ভৃত্যেরও অন্তরে দয়ার উদ্রেক হইল, এবং দ্বারধানের সহিত পরামর্শ করিয়া, সে ইহা স্থির করিল যে, তাহার অদৃষ্টে যাহাই হউক, সে আজ সেই হতভাগিনীকে কিছু আহারীয় ও পানীয় প্রদান করিবে। মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া সে কিছু আহারীয় ও পানীয় আনয়ন করিবার নিমিত্ত গমন করে। কিন্তু উহা সংগ্রহ করিয়া পুনরায় সেই স্থানে আসিয়া দেখিতে পায় যে, ওসমান খাঁ সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। ভূতের অভি সন্ধির কথা জানিতে পারিয়া, ওসমান তাহার উপর সবিশেষ রূপ অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহার হস্ত হইতে আহাৰীয় ও পানীয় কাড়িয়া লইয়া দূরে নিক্ষেপ করেন। তৎপরে, সেই স্ত্রীলোকটী আহারীয় ও পানীয় প্রার্থনা করিয়াছে, এই ভাবিয়া ওসমান সেই গৃহের ভিতর প্রবেশ করেন, ও সেই মহা অপরাধের জন্য সেই সময় সেই স্থানে যে সকল ভৃত্যাদি উপস্থিত ছিল, তাহাদিগের সম্মুখে সেই মৃত্যুশয্যা-শায়িত স্ত্রীলোকটীকে পদাঘাত করেন। সেই সময় সেই স্ত্রীলোকটীর অবস্থা এরূপ হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহার কথা কহিবার বা রোদন করিবার কিছুমাত্র ক্ষমতা ছিল না; সুতরাং সেই পদাঘাত সে বিনা-বাক্যব্যয়ে অনায়াসেই সহ করে। পরিশেষে ওসমান সেইরূপ অবস্থাতেই সেই স্ত্রীলোকটীকে সেই গৃহের ভিতর রাখিয়া, পুনরায় সেই গৃহের দরজা তালাবদ্ধ করিয়া দৈন, এবং চাবি লইয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করেন। ভৃত্য গোয় খার নিকট গমন করিয়া তাহার নিকট এই সমস্ত ঘটনা বর্ণন করে। গোর খ ইহার প্রতিবিধানের পরিবর্তে, সেই ভৃত্যের উপরই বরং অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহাদিগের বিনা-অনুমতিতে সেই স্ত্রী লোকটীকে আহারীয় ও পানীয় দিতে উদ্যত হইয়াছিল বলিয়া, তাহাকে কটুক্তি করিয়া গালি প্রদান করেন, ও চাকরী হইতে তাহাকে বিতাড়িত করেন।

৫ম। পুলিসের সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, তালাবদ্ধ গৃহের ভিতর সেই যুবতী কন্যার মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে। আরও প্রমাণিত হইল যে, যে গৃহে মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, সেই গৃহের তালার চাবি গোফুর খাঁর নিদর্শনমত ওসমান খাঁর নিকট হইতে পাওয়া গিয়াছে।

৬ষ্ঠ। একজন পাইক,যে গোর খার পাইক বলিয়া পরিচয় প্রদান করিল,—তাহার দ্বারা এই ঘটনার আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা প্রমাণিত হইল; অর্থাৎ খাজানা আদায় করি বার নিমিত্ত হেদায়েতের বাড়ী হইতে সেই স্ত্রীলোককে আনয়ন হইতে, গোফুর খাঁন বাড়ীর ভিতর লাস পাওয়া পর্যন্ত যে সকল ঘটনা অপরাপর সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হইল, তাহার সমস্ত অংশেই এই পাইক সৰ্ব্বতোভাবে পোষকতা করিল।

৭ম। লাস পরীক্ষাকারী ডাক্তার সাহেবের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, অনাহারই সেই স্ত্রীলোকটীর মৃত্যুর কারণ।

৮ম। এই সকল প্রমাণ ব্যতীত অপর আর কোনরূপ প্রমাণের যাহা আবশ্যক হইল, তাহাও প্রজাগণের দ্বারা প্রমাণিত হইতে বাকী রহিল না।

এই মোকদ্দমায় গোফুর খা ও তাঁহার পুত্রের উপর যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইল, তাহা দেখিয়া গোফুর খাঁ বেশ বুঝিতে পারিলেন যে, এই বৃদ্ধ বয়সে কোনরূপেই তাঁহার আর নিষ্কৃতি নাই। আরও বুঝিতে পারিলেন যে, দারোগা সাহেবের পূর্বোক্ত স্ত্রীলোকটীকে তাঁহার পুত্র বাহির করিয়া জানায়, এবং দারোগা সাহেব তাহার নিকট তাহার পুত্রের বিপক্ষে নালিশ করিলেও, তিনি তাহার কোনরূপ প্রতিবিধানের চেষ্টা করেন না বলিয়াই, দারোগা সাহেবের সাহায্যে তাঁহার এই সর্বনাশ উপস্থিত হইল। কিন্তু তিনি বড়ই আশ্চর্যান্বিত হইলেন যে, হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ তাঁহার বাড়ীর তালাবদ্ধ গৃহের ভিতর কিরূপে আসিয়া উপস্থিত হইল। যখন প্ৰজামাত্রই বলিতেছে যে, গোফুর খাঁ তাহার পুত্রের ন্যায়, সকলই অবগত আছেন, তখন গোফুর খাঁ এ সম্বন্ধে কিছুই অবগত নহেন, বা তাহার জ্ঞাতসারে এ কাৰ্য ঘটে নাই, এ কথা বলিলেই বা কোন বিচারক তাহা বিশ্বাস করিবেন?

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

গোফুর খাঁর একজন অতি বিশ্বাসী কর্ম্মচারী ছিলেন, তাহার নাম হোসেন। পুলিস যখন প্রথম অনুসন্ধান করিতে আরম্ভ করেন, বা যে সময় গোফুরের গৃহে হেদায়েতের কন্যার মৃত দেহ পাওয়া যায়, সেই সময় হোসেন সেই স্থানে উপস্থিত ছিল না; জমিদারীর কাৰ্য্য পৰ্যবেক্ষণ করিবার নিমিত্ত তিনি স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলেন। তাঁহার মনিবের এইরূপ বিপদ উপস্থিত হইয়াছে জানিতে পারিয়া, জমিদারী হইতে তিনি আপনার মনিবের বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, মনিব ও মনিব-পুত্র উভয়েই হত্যাপরাধে ধৃত হইয়া ছেন। তাহাদিগের উপর যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইয়াছে, তাহা জানিতে পারিয়া, তিনি অতিশয় ভাবিত হইলেন। তখন এই বিপদ হইতে তাহার মনিবকে কোনরূপে উদ্ধার করিবার উপায় দেখিতে না পাইয়া, নির্জনে গিয়া তিনি একদিবস রাত্রি কালে দারোগা সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন।

দারোগা সাহেব তাহাকে পূর্ব হইতেই চিনিতেন। তাহাকে দেখিবামাত্রই কহিলেন, কি হে হোসেনজি! কি মনে করিয়া?

হোসেন। আর মহাশয়! কি মনে করিয়া! কি মনে করিয়া আমি আপনার নিকট আসিয়াছি, তাহা আর আপনি বুঝিতে পারিতেছেন না কি?

দারোগা। আপনি কি মনে করিয়া আসিয়াছেন, তাহা আমি কিরূপে বুঝিতে পারিব? আপনার অন্তরের কথা আমি কিরূপে জানিব?

হোসেন। সে যাহা হউক, যাহা হইবার তাহা হইয়াছে, এখন আপনি কোনরূপে উঁহাদিগকে না বাঁচাইলে, আর বাঁচিবার উপায় নাই।

দারোগা। কাহাদিগকে বাঁচাইতে হইবে? তোমার মনিব ও মনিক-পুত্রকে?

হোসেন। তদ্ভিন্ন আমি এই সময় আর কাহার জন্য আপনার নিকট আসিব?

দারোগা। আগে যদি আপনি আসিতেন, তাহা হইলে উঁহাদিগকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিতে পারিতাম, কিন্তু এখন সে চেষ্টা বৃথা। এখন আমার ক্ষমতার অতীত হইয়া পড়িয়াছে।, হোসেন। যে পর্যন্ত মোকমার চুড়ান্ত বিচার শেষ হইয়া না যায়, সে পর্যন্ত আপনার ক্ষমতার সীমা এড়াইতে পারে না। এখন আমাকে কি করিতে হইবে বলুন। আপনি যাহা বলিবেন, আমি তাহাই করিতে, বা যাহা চাহিবেন, তাহাই প্রদান করিতে প্রস্তুত। এখন যেরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া হউক, উঁহাদিগের প্রাণ আপনাকে রক্ষা করিতেই হইবে।

দারোগা। দেখুন হোসেন সাহেব, এ পর্যন্তু ওসমান যেরূপ অত্যাচার করিয়া আসিতেছে, তাহাতে উহার প্রতি কাহার দয়া হইতে পারে? আপনি ত অনেক দিবস হইতে গোফুর খাঁর নিকট কৰ্ম্ম করিয়া আসিতেছেন; বলুন দেখি, তাঁহার প্রজাগণের মধ্যে কোন ব্যক্তি ওসমানের অত্যাচারে প্রপীড়িত হইতে বাকী আছে। বলুন দেখি, কয়জন লোক আপনার জাতি-ধৰ্ম্ম বজায় রাখিয়া, তাহার জমিদারীর মধ্যে বাস করিতে সমর্থ হইয়াছে। বলুন দেখি, কতগুলি স্ত্রীলোক তাহার জমিদারীর মধ্যে বাস করিয়া তাহাদিগের সর্বপ্রধান-ধৰ্ম্ম সতীত্ব রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছে। যাহার এই সকল কাৰ্য, তাহাকে আপনি এই বিপদ হইতে রক্ষা করিতে চাহেন। স্ত্রীলোকের ধর্ম নষ্ট করা ব্যতীত যাহার অপর আর কোন চিন্তা নাই, সুন্দরী স্ত্রীলোককে কোন গতিতে তাহার পিতা, মাতা, ভ্রাতা বা স্বামীর নিকট হইতে অপহরণ করিবার যাহার সর্বদা মানস, আপনার পাশব বৃত্তি চরিতার্থ করিবার নিমিত্ত যে ব্যক্তি সকল কাৰ্য্যই অনায়াসে করিতে পারে, আপনি তাহার প্রাণ রক্ষার নিমিত্ত আমাকে অনুরোধ করিবেন না। তাহাকে এই মোকদ্দমা হইতে বাচাই বার কথা দুরে থাকুক, তাহাকে সাহায্য করিবার নিমিত্ত অতি সামান্য মাত্র চেষ্টা করিলেও, তাহাতে মহাপাতক হয়। তাই বলি, আপনি আমাকে এরূপ অনুরোধ করিবেন না। সহস্র সহস্র মুদ্রা প্রদান করিলেও, এ কাৰ্য্য আমার দ্বারা কোনরূপেই হইবে না।

হোসেন। আচ্ছা মহাশয়! ওসমানই যেন মহাপাতকী, কিন্তু তাহার বৃদ্ধ পিতার অপরাধ কি? পুত্রের অপরাধে পিতাকে দণ্ড দিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন কেন?

দারোগা। বৃদ্ধ পাপী নহে? আমার বিবেচনায় ওসমান অপেক্ষা বৃদ্ধ শতগুণ অধিক পাপ। যে পিতা পুত্রের দুস্কাৰ্য্য সকল জানিতে পারি, তাহার প্রতিবিধানের চেষ্টা না করেন, যাহার নিকট তাহার পুত্রের বিপক্ষে শত সহস্র নালিশ উপ স্থিত হইলেও, তিনি তাহার প্রতি কর্ণপাতও করেন না, সেরূপ পিতাকে সেই অত্যাচারকারী পুত্র অপেক্ষা শতগুণ অধিক পাপী বলিয়া আমার বিশ্বাস। এরূপ অবস্থায় যুবক বালকের বরং মাফ আছে, কিন্তু বৃদ্ধ পিতা কোনরূপেই ক্ষমার্হ নহে।

হোসেন। ওসমান যে অত্যাচারী, সে বিষয়ে আর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু তাহার অত্যাচারের সকল কথা যে গোফুর খাঁর কর্ণগোচর হয়, তাহা আমার বোধ হয় না। পুত্রের অত্যাচারের কথা শুনিতে পাইলে, তাহার নিবারণের চেষ্টা না করিবেন, সেরূপ পিতা গোফুর খাঁ নহেন। আমার বিশ্বাস যে, এই সকল অত্যাচারের কথা কখনই তাহার কর্ণগোচর হয় নাই। তিনি জানিতে পারিলে, ওসমান এতদুর অত্যাচার করিতে কখনই সমর্থ হইত না।

দারোগা। মিথ্যা কথা, বৃদ্ধ সমস্ত কথা অবগত আছে। জানিয়া শুনিয়া, সে তাহার পুত্রকে কোন কথা বলে না; বরং তাহার অত্যাচারের সাহায্য করে। ওসমান কর্তৃক এমন কোন ঘটনা ঘটিয়াছিল, যাহার সহিত আমার নিজের কোনরূপ সংস্রব ছিল। তাহার প্রতিবিধানের নিমিত্ত আমি নিজে কানপুর পর্যন্ত গমন করিয়া, সমস্ত কথা বৃদ্ধের কর্ণগোচর করি। কিন্তু কৈ, তিনি তাহার কি প্রতিবিধান করিয়াছিলেন?

হোসেন। আমি বুঝিতে পারিতেছি, যে কার্যের সহিত আপনার নিজের সংস্রব ছিল, সেই কাৰ্য্য তাহার কর্ণগোচর হইলেও, তিনি তাহার প্রতিবিধানের কোন চেষ্টা করেন নাই বলিয়া, আপনি অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া পড়িয়াছেন। কিন্তু আমার অনুরোধে এখন আপনাকে সেই ক্রোধ পরিত্যাগ করিতে হইবে। আপনার যে কাৰ্য্য তখন ওসমান বা তাঁহার পিতার দ্বারা সম্পন্ন হয় নাই, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি, সেই কাৰ্য এখন আমি সম্পন্ন করিয়া দিব। তদ্ব্যতীত আপনি আর যাহা প্রার্থনা করেন, তাহাও আমি প্রদান করিতে প্রস্তুত আছি। এখন আপনি একটু অনুগ্রহ করিলেই, আমাদিগের অনেক মঙ্গল হইতে পারিবে।

দারোগা। যে কাৰ্য্যের সহিত আমার সংশ্রব আছে, সে কাৰ্য্য আপনি সম্পন্ন করিয়া দিবেন কি প্রকারে? আপনি কি সেই ঘটনার বিষয় কিছু অবগত আছেন?

হোসেন। সেই সময় ছিলাম না; কিন্তু এখন সমস্তই জানিতে পারিয়াছি, এবং ওসমান তাহাকে কোথায় রাখিয়াছে, তাহাও আমি অনুসন্ধানে অবগত হইতে পারিয়াছি। ইচ্ছা করিলে, এখন তাহাকে অনায়াসেই আপনি পাইতে পারেন।

দারোগা। এই মোকদ্দমা সাক্ষি-সাবুদের দ্বারা যেরূপ প্রমাণ হইয়া গিয়াছে, তাহা বোধ হয়, আপনি জানিতে পারিয়া ছেন। সমস্তই এখন কাগজ-পত্র হইয়া গিয়াছে। উর্দ্ধতন কর্ম্ম চারীগণ পৰ্য্যন্ত সকলেই এখন ইহার সমস্ত ব্যাপার জানিতে পারিয়াছেন। এখন আর আমার দ্বারা আপনাদিগের কি উপকার হইতে পারে?

হোসেন। প্রথম অবস্থায় আমি এখানে থাকিলে এই মোকদ্দমার অবস্থা কখনই এতদূর হইতে পারি না। কিন্তু এখন যাহা হইয়া গিয়াছে, তাহার আর উপায় নাই। যাহা হইবার তাহা হইয়াছে, এখন ইহা অপেক্ষা আর যেন অধিক না ঘটে; আর সাক্ষি-সাবুদের যেন সংগ্রহ না হয়। আমি আপাততঃ আপনার নজর রূপ এই সহস্র মুদ্রা প্রদান করিতেছি। ঈশ্বর যদি অনুগ্রহ করেন, মোক হইয়া গেলে পুনরায় আপনার সহিত নির্জনে সাক্ষাৎ করিব। আর যাহার নিমিত্ত আপনি এতদুর ক্রোধান্বিত হইয়াছেন, আমার সহিত আপনি যখন গমন করিবেন, তখনই আমি তাহার নিকট আপনাকে লইয়া যাইব। তাহার পরে আপনি আপনার ইচ্ছানুযায়ী কর্ম্ম করিবেন। এখন আমাকে বিদায় দিন, আমাকে অনেক কাৰ্য্য সম্পন্ন করিতে হইবে। এখন আপনি আমাদিগের উপর প্রসন্ন হইলেন, কি না, বলুন।

দারোগা। প্রসঙ্গ না হইলেও, যখন আপনি এতদুর বলিতেছেন, তখন কাজেই আমাকে প্রসন্ন হইতেই হইবে। আমি ক্রোধের বশবর্তী হইয়া যতদূর করিবার, তাহা করিয়া ফেলিয়াছি। যাহা করিয়াছি, তাহার আর উপায় নাই। এখন আর অধিক কিছু করিব না।

হোসেন। ওসমান সহ দোষে দোষী, তাহার আর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই। গোরও পুত্র-মেহ বশতঃ সেই সকল দোষের প্রতিবিধান করিয়া উঠিতে পারেন নাই সত্য। কিন্তু

মহাশয়! এখন যেরূপ ভাবের মোকদম উপস্থিত হইয়াছে, সাক্ষি-সাবুদের দ্বারা যেরূপ প্রমাণিত হইয়াছে, তাহার কণা মাত্রও প্রকৃত নহে। ইহা আপনি মুখে না বলুন, কিন্তু অন্তরে তাহ আপনাকে স্বীকার করিতে হইবে।

দারোগা। তোমার কথা যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে গোফুর খাঁর তালাবদ্ধ গৃহের ভিতর হেদায়েতের কন্যার মৃত দেহ কিরূপে আসিল?

হোসেন। উহার প্রকৃত ব্যাপার আমি সমস্তই শুনিয়াছি। যদি জানিতে চাহেন, তাহা হইলে আমি গোপনে আপনাকে সকল কথা বলিতে পারি।

দারোগা। গোপনে বলিতে চাহেন কেন?

হোসেন। মোকদ্দমার সময় আমরা সেই কথা স্বীকার করিব কি না, তাহা উপযুক্ত উকীল কৌলির পরামর্শ ব্যতীত বলিতে পারি না। সুতরাং আপনার নিকট গোপনে সেই সকল কথা না বলিলে যে কিরূপ দোষ ঘটিতে পারে, তাহা আপনিই কেন বিবেচনা করিয়া দেখুন না।

দারোগা। আমি ত কোন দোষ দেখিতেছি না।

হোসেন। মনে করুন, যে সকল কথা আমি প্রকৃত বলিয়া এখন বিশ্বাস করিতেছি, ও আপনি জানিতে চাহেন বলিয়া, আপনাকে যাহা বলিতে প্রবৃত্ত হইতেছি, সে সকল কথা আবশ্যকমত অস্বীকার করিলেও, আমি নিষ্কৃতি পাইব না।

দারোগা। আপনার নিষ্কৃতি না পাইবার কারণ কি?

হোসেন। আমি যদি অস্বীকার করি, তাহা হইলে যে সকল লোকের সম্মুখে আমি এখন সেই সকল কথা বলিতেছি, আবশ্যক হইলে সেই সকল লোকের দ্বারা আপনি উহা অনায়াসেই প্রমাণ করিতে সমর্থ হইবেন।

দারোগা। সেই সকল কথা আইনমত, ওরূপে প্রমাণ হইতে পারে না।

হোসেন। প্রমাণ হউক, বা না হউক, যদি আপনি নিতান্তই অবগত হইতে চাহেন, তাহা হইলে কাহারও সম্মুখে আমি সেই সকল কথা কহিব না। একাকী শুনিতে চাহেন, ত আমি বলিতে প্রস্তুত আছি।

দারোগা। আর যদি আমি আবশ্যকমত আপনাকে সাক্ষী স্থির করি, তাহা হইলে আপনি কি করবেন? আপনি এখন আমাকে যাহা বলিবেন, তখনও আপনাকে তাহাই বলিতে হইবে।

হোসেন। তাহা বলিব কেন? আবশ্যক হয়, সমস্ত কথা আমি অনায়াসেই অস্বীকার করিতে পারিব।

সম্পূর্ণ।

(অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত!)
শ্রী প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত। All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। জ্যৈষ্ঠ।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.

ঘর-পোড়া লোক।

(প্রথম অংশ)

প্রথম পরিচ্ছেদ।

অদ্য যে বিষয় আমি পাঠকগণকে উপহার দিতে প্রস্তুত হইয়াছি, তাহা অতি ভয়ানক ও লোমহর্ষণ-জনক ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনার সহিত আমার নিজের কোনরূপ সংস্রব নাই, অর্থাৎ আমি নিজে এই মোকদ্দমার অনুসন্ধান করি নাই; কিন্তু এই মোকদ্দমার সহিত যে পুলিস কর্ম্মচারীর সংস্রব ছিল, তিনি আমার পরিচিত। এই ঘটনার মধ্যে যেরূপ অস্বাভাবিক দুবুদ্ধির পরিচয় আছে, তাহা পাঠ করিয়া অনেক পাঠকেই মনে করিতে পারেন যে, এরূপ দুঃসাহসিক কাৰ্য মনুষ্য-বুদ্ধির অগোচর। কিন্তু যখন আমি এই ঘটনার আনুপূর্বিক সমস্ত ব্যাপার জানি, এবং অনুসন্ধানকারী পুলিস কর্ম্মচারীও, আমার পরিচিত, তখন এই ঘটনার সত্যাসত্য সম্বন্ধে আমার কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। পাঠকগণও ইহা সম্পূর্ণ। রূপ সত্য ঘটনা বলিয়া অনায়াসে বিশ্বাস করিতে পারেন।

এই ঘটনা আমাদিগের এই প্রদেশীয় ঘটনা নহে, পশ্চিম দেশীয় ঘটনা। হিন্দু পাঠকগণের মধ্যে সকলেই অবগত আছেন যে, নৈমিষারণ্য নামে একটা স্থান আছে, উহা আমাদিগের একটা প্রধান তীর্থ স্থান। পশ্চিমদেশবাসীগণ সেই স্থানকে নিমরণ কহিয়া থাকে।

কথিত আছে, ভগবান্ বেদব্যাস এই স্থানে বসিয়া ভগবদবাক্য সৰ্ব্বপ্রথমে মর্ত্যলোকে প্রকাশ করেন। যে বেদীর উপর উপবেশন করিয়া তিনি ভগবাক্য পাঠ করিয়াছিলেন, নিবিড় ও নিস্তব্ধ আয় কাননের ভিতর সেই বেদী এখন পর্যন্ত বর্তমান। সেই বেদীর কিছু দূর অন্তরে চক্রপাণি নামক প্রসিদ্ধ স্থান। প্রসিদ্ধি আছে যে, যে সময় ভগবান্ বেদব্যাস ভগব প্রকাশ করিতেন, সেই সময় দেবতাগণ ও ঋষি গণের আবির্ভাব হইত। সেই স্থানে তখন একটা সামান্য স্রোতস্বতী থাকা স্বত্বেও সেই স্থানে যাহারা আগমন করিতেন, তাঁহাদিগের প্রত্যেককেই অত্যাধিক জল-কষ্ট সহ করিতে হইত। ভগবান্ বিষ্ণু এই ব্যাপার দেখিয়া জল-কষ্ট নিবারণ করিবার মানসে আপনার চক্র দ্বারা পৃথিবী ভেদ করিয়া দেন, সেই স্থান হইতে সতেজে অনবরত জল উখিত হইয়া সকলের জল-কষ্ট নিবারণ করে। সেই সময় পৃথিবী ভেদ করিয়া যে স্থান হইতে জল উঠিয়াছিল, এবং এখন পর্যন্ত যে স্থান হইতে অনবরত জল উখিত হইয়া সন্নিকটবর্তী সেই ক্ষুদ্র স্রোতস্বতীতে গিয়া মিলিতেছে, সেই স্থানকে চক্রপাণি। কহে। নৈমিষারণ্য তীর্থে যাহারা গমন করিয়া থাকেন, তাহাদিগকে চক্রপাণি জলে স্নান করিতে হয়।

দশ বার বৎসর পূর্বে কোন সরকারী কাৰ্য্য উপলক্ষে আমাকে সেই নৈমিষারণ্যে গমন করিতে হইয়াছিল। যে কাৰ্য্যে আমি গমন করিয়াছিলাম, সেই কাৰ্য শেষ হইবার পর, একদিবস আমি সেই চক্রপাণি জলে স্নান করিতে যাই। সেই স্থানে আমি স্নান করিতেছি, এরূপ সময় একজন লোক আসিয়া স্নান করিবার মানসে সেই চক্রপাণি জলে অবতরণ করেন। কথায় কথায় তাহার সহিত আমার পরিচয় হয়। ইহার নাম আমি পূৰ্ব্ব হইতেই জানিতাম। কিন্তু ইহার সহিত আমার কখন চাক্ষুষ আলাপ পরিচয় ছিল না। ইহার নাম শুনিয়াই আমি কহিলাম, আপনি এই প্রদেশীয় পুলিস বিভাগে কর্ম্ম করিতেন না?

উত্তরে তিনি কহিলেন, হাঁ মহাশয়!

তখন আমি তাহার সম্বন্ধে যাহা যাহা অবগত ছিলাম, তাই তাহাকে কহিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, কেমন মহাশয়! এই অপ রাধের জন্য পুলিস বিভাগ হইতে আপনার চাকরী গিয়াছে না?

উত্তরে তিনি কহিলেন, আপনি এ সকল বিষয় কিরূপে অবগত হইতে পারিলেন?

আমি। আমি যেরূপেই অবগত হইতে পারি না কেন; কিন্তু ইহা প্রকৃত কি না?

যখন অনুসন্ধান করিয়া আমার দোষ সাব্যস্ত হইয়াছিল, এবং সেই দোষের উপর নির্ভর করিয়া সরকারী চাকরী হইতে আমাকে তাড়িত করা হইয়াছে, তখন উহা যে সম্পূর্ণরূপ মিথ্যা কথা, তাহাই বা আমি বলি কি প্রকারে?

আমি। সত্য হউক, আর মিথ্যা হউক, যে অপরাধের নিমিত্ত আপনার চাকরী গিয়াছে, সেই অপরাধ সম্বন্ধে আপনার কোন্ উর্দ্ধতন কর্ম্মচারী অনুসন্ধান করিছিলেন?

যে ইনস্পেক্টারের দ্বারা তাহার অপরাধের অনুসন্ধান করা হইয়াছিল, সেই ইম্পেক্টারের নাম তিনি আমার প্রশ্নের উত্তরে বলিয়া দিলেন, এবং তিনি আজ কাল যে স্থানে আছেন, তাহাও আমাকে জানাইয়া দিলেন। আমি দেখিলাম, যে সরকারী কার্যের নিমিত্ত আমি সেই প্রদেশে গমন করিয়াছি, তাহার কোন কোন বিষয়ের অনুসন্ধানের নিমিত্ত আমাকে তাঁহার নিকট গমন করিতেই হইবে। সুতরাং এই ঘটনার সমস্ত অবস্থা তাঁহার নিকট হইতে অনায়াসেই জানিয়া লইতে পারিব। যে ভূত-পূৰ্ব পুলিস-কর্ম্মচারীর সহিত আমার চক্রপাণিতে সাক্ষাৎ হইল, তিনিও আমার পরিচয় গ্রহণ করিলেন, এবং পরিশেষে তাহার বাসায় গিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করি বার নিমিত্ত আমাকে বার বার অনুরোধ করিলেন। আমিও তাঁহার অনুরোধ রক্ষা করিলাম; সেই দিবস সন্ধ্যার পূর্বে তাঁহার বাসায় গিয়া আমি তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। সেই রাত্রি তাহার বাসায় অতিবাহিত করিবার নিমিত্ত তিনি আমাকে বার বার অনুরোধ করিলেন; কিন্তু জাতিভেদের প্রতিবন্ধকতা হেতু আমি কোনরূপেই তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইতে পারিলাম না। তথাপি অনেক রাত্রি পর্যন্ত তাঁহার বাসায় বসিয়া নানারূপ প্রসঙ্গে সময় অতিবাহিত করিলাম। ইহার মধ্যে যতদূর সম্ভব, তাঁহার নিকট হইতে তাহার মোকদ্দমার বিষয় সকল উত্তমরূপে জানিয়া লইলাম।

ইনি অসৎ উপায়ে যে সকল অর্থ উপার্জন করিয়া ছিলেন, তাহার অধিকাংশই প্রায় ব্যয়িত হইয়া গিয়াছে। এই স্থানে বসিয়া এখন তিনি জমিদার-সরকারে যদি কোনরূপ একটী চাকরীর সংগ্রহ করিয়া উঠিতে পারেন, তাহারই চেষ্টা দেখিতেছেন।

নৈমিষারণ্যে আমার যে সকল অনুসন্ধানকার্য ছিল, তাহা শেষ করিয়া আমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। দুর্গম ভয়ানক পথ অতিক্রম করিয়া, ও হত্যা-হরণ প্রভৃতি স্থান দর্শন করিয়া, ক্রমে আমি গিয়া সাণ্ডিল। ষ্টেশনে উপস্থিত হইলাম। পরে কয়েকটা ষ্টেশন অতিক্রম করিয়া যে স্থানে সেই মোকদ্দমার অনুসন্ধানকারী ইনস্পেক্টার থাকিতেন, সেই স্থানে গিয়া উপস্থিত হইয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। তাঁহার নিকট আমি আমার পরিচয় প্রদান করিলাম, এবং যে সরকারী কার্যের নিমিত্ত আমি তাহার নিকট গমন করিয়াছিলাম, তাহার সমস্ত ব্যাপার আমি তাঁহার নিকট কহিলাম। তিনি তাঁহার সাধ্যমত আমাকে সাহায্য করিয়া, সেই স্থানের আমার আবশ্যক কাৰ্য্য সকল সম্পন্ন করিয়া দিলেন।

যে সময় তিনি আমার সাহায্যের নিমিত্ত আমার সহিত কার্যে নিযুক্ত ছিলেন, সেই সময় একদিবস কথায় কথায় এই মোকদ্দমার বিষয় তাহার নিকট উত্থাপিত করিলাম। তিনিও সবিশেষ যত্নের সহিত ইহার সমস্ত ব্যাপার আমাকে বলিয়া দিলেন, এবং এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানের যে সকল কাগজ, পত্র ছিল, তাহাও আমাকে দেখাইতে চাহিলেন। সময়মত আফিস হইতে সমস্ত নথি-পত্ৰ আনিয়া, দেখিবার নিমিত্ত আমার হস্তে প্রদান করিলেন; কিন্তু উহার সমস্তই উর্দ্দূ ভাষায় লিখিত বলিয়া, আমি নিজে তাহা পড়িয়া উঠিতে পারিলাম না। উর্দু ভাষাবিদ একজন মুসির সাহায্যে সেই সকল কাগজপত্রে যাহা লিখিত ছিল, তাহা জানিয়া লইলাম, এবং আবশ্যকমত কতক কৃতক লিখিয়াও লইলাম। এইরূপে

যে সকল বিষয় আমি জানিতে পারিয়াছিলাম, তাহাই অবলম্বন করিয়া এই বিবরণ লিখিত হইতেছে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

যে গ্রামে রামসেবকের বাড়ী, সেই গ্রামের জমিদার গোফুর খাঁ। গোফুর খাঁ যে একজন খুব বড় জমিদার, তাহা নহে; কিন্তু নিতান্ত ক্ষুদ্র জমিদার ও নহেন। ইহার জমি দারীর আয়, সালিয়ানা পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা হইবে। গোফুর খাঁ জমিদার, কিন্তু জমিদার-পুত্র নহেন। তাঁহার পিতা একজন মধ্যবিত্ত গৃহস্থ ছিলেন। তিনি যাহা কিছু উপার্জন করিতেন, তাহার দ্বারা কোন গতিতে পরিবার প্রতিপালন করিতেন মাত্র; কিন্তু তাহা হইতে একটা কপর্দকও সঞ্চয় করিয়া রাখিতে পারিতেন না। গোফুর খাঁ তাঁহার পিতার প্রথম বা একমাত্র পুত্র। যে সময় তাঁহার পিতা পরলোক গমন করেন, সেই সময় গোফুরের বয়ঃক্রম পনর বৎসরের অধিক ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর অনন্যোপায় হইয়া গোফুর সামান্য চাকরীর উমেদারীতে প্রবৃত্ত হন, এবং আপন দেশ ছাড়িয়া কানপুরে গমন করেন। সেই সময় কানপুরে একজন মুসলমান বাস করিতেন। চামড়ার দালালী করিয়া তিনি শটাকার সংস্থান করিয়াছিলেন, এবং দেশের মধ্যে মান-সম ও একটু সবিশেষ প্রতিপত্তি স্থাপন করিতে পারিয়াছিলেন। গোফুর খাঁ কানপুরে জাসিয়া প্রথমে তাহারই আশ্রয় গ্রহণ করেন, এবং তাহারই নিকট অতি সামান্য বেতনে একটা চাকরী সংগ্রহ করিয়া লন। গোফুর খাঁ অতিশয় বুদ্ধিমান ও সবিশেষ কার্যক্ষম ছিলেন। সুতরাং অতি অল্পদিবসের মধ্যেই তিনি আপন মনিবের প্রিয়পাত্র হইয়া পড়েন, এবং ক্রমে তিনি তাঁহার মনিবের কাৰ্য্যে সবিশেষরূপে সাহায্য করিতে সমর্থ হন্। দিন দিন যেমন তিনি তাঁহার মনিবের প্রিয়পাত্র হইতে ছিলেন, সেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার বেতনও ক্রমে বর্ধিত হইতেছিল।

সে যাহা হউক, যে সকল কাৰ্য্য করিয়া তাহার মনিব সেই দেশের মধ্যে প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিলেন, পরিশেষে সেই সমস্ত কাৰ্য গোফুর খাঁ নিজে সম্পাদন করিতে লাগিলেন। ইদানীং তাঁহার মনিবকে আর কোন কাৰ্যই দেখিতে হইত না, সকল কাৰ্য গোফুরের উপরেই নির্ভর করিত। গোফুরও প্রাণপণে এরূপ ভাবে কার্য সম্পন্ন করিয়া আসিতে লাগি লেন যে, তাহার মনিবের কার্য পূর্ব অপেক্ষা আরও অতি উত্তমরূপে চলিতে লাগিল। সৰ্বসাধারণে গোফুয়ের মনিবকে যেরূপ ভাবে বিশ্বাস করিতেন, গোফুরকে তাহা অপেক্ষা আরও অধিক বিশ্বাস করিতে লাগিলেন। এমন কি, সেই সময় গোফুরের মনিবকে পরিত্যাগ করিয়া ব্যবসায়ী মাত্রেই গোফুরকে চাহিতে লাগিলেন, ও গোফুরের হস্ত হইতে সমস্ত দ্রব্যাদি ক্রয় করিতে লাগিল। এই ব্যাপার দেখিয়া গোফুরের মনিব নিজে আর কোন কার্যে হস্তক্ষেপ না করিয়া সমস্ত কার্যভারই গোফুরের উপর অর্পণ করিলেন, এবং পরিশেষে গোফুরকে একজন অংশীদার করিয়া লইলেন। গোরও সবিশেষ পারদর্শিতার সহিত কাৰ্য্য করিয়া ক্রমে যথেষ্ট উপার্জন করিতে আরম্ভ করিলেন।

এইরূপে কয়েক বৎসর অতিবাহিত হইবার পর গোফুলের মনিব বা অংশীদার ইহলীলা সম্বরণ করিলেন; সুতরাং এখন সেই কার্যের সমস্ত অংশই গোফুরের হইল। গোফুরও সবিশেষ মনোযোগের সহিত আপন কাৰ্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়া যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করিতে লাগিলেন। এইরূপে দুই একখানি করিয়া ক্রমে জমিদারী ক্রয় করিতে লাগিলেন। এইরূপে তিনি যে সকল জমিদারী ক্রমে ক্রয় করিয়াছিলেন, সেই সকল জমিদারীর আয় পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকায় দাঁড়াইল। সেই সময় গোফুর খাঁও ক্রমে বৃদ্ধ হইয়া পড়ায় আপনার ব্যবসা পরিত্যাগ করিলেন, এবং কেবলমাত্র তাহার জমিদারীতেই আপনার মন নিয়োগ করিবার মানস করিলেন।

গোফুর খাঁর কেবল একটামাত্র পুত্র জন্মিয়াছিল, তাহার নাম তিনি ওসমান রাখিয়াছিলেন। আপন পুত্র ওসমানকে প্রথমতঃ তিনি আপনার ব্যবসা কার্য শিখাইবার নিমিত্ত সবিশেষরূপ চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনরূপে আপন মনস্কামনা পূর্ণ করিতে পারেন নাই। বাল্যকালে গোফুর খাঁর যেরূপ প্রকৃতি ছিল, তাঁহার পুত্র ওসমানের প্রকৃতি বাল্যকাল হইতেই তাহার বিপরীত হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। গোফুর খাঁ সৰ্ব্বদা আপন কার্যে মন নিয়োগ করিতেন, ওসমান কেবল অপরের সহিত মিলিয়া আমোদ-আহলাদ করিয়া দিন অতি বাহিত করিতে লাগিল।

গোফুরের চেষ্টা ছিল, কিরূপে আপনার কাৰ্য্যে তিনি সবিশেষরূপে উন্নীত হইতে পারেন।

ওসমান ভাবিতেন, অসৎ উপায় অবলম্বনে কিরূপে তিনি তাঁহার পিতার উপার্জিত অর্থ ব্যয় করিতে সমর্থ হন।

গোফুর সর্বদা সৎকার্যের দিকে দৃষ্টি রাখিতেন। কিরূপে দশজন প্রতিপালিত হয়, কিরূপে দশজনের উপকার করিতে পারেন, তাহার দিকে সর্বদা তিনি লক্ষ্য রাখিতেন।

ওমানের লক্ষ্য হইয়াছিল, কেবল অসৎ কার্যের দিকে। আত্মীয়-স্বজন ও দরিদ্রগণের প্রতিপালনের পরিবর্তে কতকগুলি নীচজাতীয় বার-বনিতা তাহার দ্বারা প্রতিপালিত হইত।

ওসমানের এইরূপ অবস্থা সত্বেও একমাত্র সন্তান বলিয়া তাঁহার পিতা গোফুর খা তাহাকে কিছু বলিতেন না। সুতরাং ওসমারের অত্যাচার বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস হইবার পরিবর্তে ক্রমে আরও বর্ধিত হইতে লাগিল।

গোফুর খাঁ নিতান্ত বৃদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিলেন বলিয়া, তিনি মনে করিয়াছিলেন, ব্যবসা কার্যের ভার তিনি তাহার পুত্র ওসমান খাঁর হস্তে প্রদান করিবেন; কিন্তু তাহার চরিত্র দেখিয়া আপনার ইচ্ছাপূর্ণ করিতে পারিলেন না। অথচ ব্যবসায়ীগণের অনুরোধ রক্ষা করিতে গিয়া, তিনি আপন কাৰ্য্য পরিত্যাগ পূর্বক আপন বাড়ীতে বসিয়া তাহার বৃদ্ধাবস্থায় যে কিছু দিবস বিশ্রাম করিবেন, তাহাতেও তিনি সমর্থ হইলেন না। তাহাকে সৰ্ব্বদা কানপুরেই থাকিতে হইত। এদিকে অবসর পাইয়া ওসমান জমিদারীর ভিতর যথেচ্ছ ব্যবহার করিত। তাহার অত্যাচারে প্রজাগণের মধ্যে কেহই শান্তিলাভ করিতে পারিত না। কিরূপে ওমানের হক হইতে আপনাপন স্ত্রী-কন্যার ধৰ্ম্ম রক্ষা করিতে সমর্থ হইবে, কেবল তাহার চিন্তাতেই তাহাদিগকে সর্বদা দিন অতিবাহিত করিতে হইত।

ওমানের এই সকল অত্যাচারের কথা ক্রমে তাহার পিতা গোফুর ধার কর্ণগোচর হইতে লাগিল; কিন্তু গোফুর খ তাহার প্রতিকারের কোনরূপ চেষ্টাও করিলেন না।

এইরূপ নানা কারণে, প্রজাগণ ক্রমে তাহাদিগের অবাধ্য হইয়া পড়িতে লাগিল। জমিদারীর খাজনা প্রায়ই তাঁহারা বাকী ফেলিতে লাগিল, বিনা-নালিশে খাজনা আদায় প্রায় একরূপ বন্ধ হইয়া গেল।

এই সকল অবস্থা দেখিয়াও ওসমানের অত্যাচারের কিছু মাত্র নিবৃত্তি হইল না। তাহার কতকগুলি অশিক্ষিত ও দুষ্টমতি পরিষদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই সকল অত্যাচার ক্রমে বৃদ্ধিই হইতে লাগিল। তাহাদিগের অত্যাচারে অনেককেই তাহার জমিদারী পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিতে হইল। বিশেষতঃ যাহাদিগের গৃহে সু যুবতী স্ত্রীলোক আছে, তাহাদিগের সেই স্থানে বাস করা একবারেই অসম্ভব হইয়া পড়িতে লাগিল।

এরূপ পাপে কতদিবস প্রজাগণ সন্তুষ্ট থাকে। বা ঈশ্বরই আর কতদিবস এ পাপ মার্জনা করেন। ওসমান একজন মধ্যবিদ জমিদারের পুত্র বইত নয়? এরূপ অত্যাচার করিয়া যখন নবাব সিরাজদ্দৌল্লা প্রভৃতিও নিষ্কৃতি পান নাই, তখন এই সামান্য জমিদার-পুত্র যে অনায়াসেই নিষ্কৃতি পাইবেন, তাহা কিছুতেই হইতে পারে না। সমস্ত কার্যেরই সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করিলে যে অবস্থা ঘটিয়া থাকে, ওসমানের অদৃষ্টে যে সেই অবস্থা না ঘটিবে, তাহা কে বলিতে পারে?

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

যে গ্রামে গোর খাঁর বাড়ী, সেই গ্রামের নিকটবর্তী একখানি গ্রামে পুলিসের থানা আছে; সেই থানার ভার প্রাপ্ত কর্ম্মচারী একজন মুসলমান দারোগা। দারোগা সাহেব একজন খুব উপযুক্ত কর্ম্মচারী। জেলার ভিতর তাঁহার খুব নাম আছে, সরকারের ঘরেও তাঁহার বেশ খাতির আছে। কিন্তু তাহার নিজের চরিত্র সাধারণত দারোগা-চরিত্রের বহিত নহে।

দারোগা সাহেবের বয়ঃক্রম চল্লিশ বৎসরের কম নহে, বরং দুই এক বৎসর অধিক হইবারই সম্ভাবনা। পুলিশ বিভাগে প্রথম প্রবৃত্ত হইবার পূর্বে তাঁহার যেরূপ চরিত্ৰ-দোষ ছিল, এখন তাহা অপেক্ষা অনেক বর্ধিত হইয়া পড়িয়াছে, এবং দিন দিন বর্ষিত হইয়াই চলিয়া যাইতেছে।

কোন গ্রামে কোন একটী মোকদ্দমার অনুসন্ধান করিতে গিয়া, একটা রূপবতী যুবতী তাঁহার মজয়ে পতিত হয়। পরিশেষে কোন-না-কোন উপায় অবলম্বন করিয়া, ক্রমে দারোগা সাহেব তাহাকে গৃহের বাহির করেন, এবং থানার সন্নিকটবর্তী কোন এক স্থানে একখানি বাড়ী প্রস্তুত করিয়া দিয়া, তাহাকে সেই স্থানে রাখিয়া দেন। সেই স্ত্রীলোকটা দুই বৎসরকাল সেই স্থানে বাস করিয়া দারোগা সাহেবের মনস্তুষ্টি সম্পাদিত করে।

সেই যুবতী যে সবিশেষ রূপবতী, এ কথা শোক-মুখে ক্রমে প্রকাশিত হইয়া পড়ে, এবং ক্রমে ওসমানের জনৈক পারিষদ এ কথা জানিতে পারিয়া, ওসমানের কর্ণগোচর করিয়া দেয়। যুবতী-রূপবতীর কথা শুনিয়া ওসমান আর তাহার মন স্থির করিতে পারিল না; কোন উপায় অবলম্বন করিলে, সে সেই যুবতীকে হস্তগত করিতে পারিবে, তাহারই চিন্তায় অতিশয় ব্যগ্র হইয়া পড়িল, ও ক্রমে আপন মনোভাব প্রকাশ করিয়া সেই যুবতীর নিকট তোক প্রেরণ করিল।

যুবতী তাহার প্রস্তাবে প্রথমে স্বীকৃত হইল না; কিন্তু ওসমানও তাহার আশা পরিত্যাগ করিল না। যে কোন উপায়েই হউক, তাহাকে আয়ত্ত করিবার নিমিত্ত সবিশেষ রূপ চেষ্টা করিতে লাগিল।

যে স্ত্রীলোক একবার তাহার কুলে জলাঞ্জলি দিয়া পর পুরুষের সহিত চলিয়া আসিয়াছে, এবং এতদিবস পর্যন্ত পরপুরুষেয় সহিত অনায়াসে কালযাপন করিতেছে, সেই স্ত্রীলোককে প্রলোভনে ভুলাইতে আর কতদিন অতিবাহিত হয়? দারোগা সাহেবের বয়ঃক্রম অধিক, ওসমানের বয়ঃক্রম তাহ অপেক্ষা অনেক অর। দারোগা সাহেব পরাধীন, ওসমান স্বাধীন। দারোগা সাহেবকে চাকরীর উপর নির্ভর করিয়া সমস্ত খরচ-পত্ৰ নিৰ্বাহ করিতে হয়, আর ওসমান জমিদার-পুত্র, গোফুর খাঁর মৃত্যুর পর সেই অগাধ জমিদারীর তিনি একমাত্র অধিকারী। যেস্থলে দারোগা সাহেবকে শত মুদ্রা খরচ করিতে হইলে তাহাকে অন্ধকার দেখিতে হয়, সেই স্থলে ওসমান সহস্র মুদ্রা অকাতরে ব্যয় করিতে সমর্থ। এরূপ অবস্থায় সেই স্ত্রীলোকটীকে ওসমানের করায়ত্ব করা নিতান্ত দুরূহ কাৰ্য্য নহে। বলা বাহুল্য, ক্রমে যুবতী ওমানের হস্তগত হইয়া পড়িল; দারোগা সাহেবকে পরি ঊ্যাগ করিয়া সে ওসমানের অনুবর্তিনী হইল। ওসমান তাহাকে সেই স্থান হইতে স্থানান্তরিত করিয়া, কোন লুকা য়িত স্থানে তাহাকে রাখিয়া দিল।

সুন্দরী যে কাহার সহিত কোথায় গমন করিল, এ কথা দারোগা সাহেব প্রথমত জানিতে পারিলেন না; কিন্তু ক্রমে এ সংবাদ জানিতে তাহার বাকী রহিল না। যখন তিনি জানিতে পারিলেন যে, ওসমান তাঁহার মুখের পথে কণ্টক হইয়া তাঁহার যকের ধন অপহরণ করিয়া লইয়া গিয়াছে, তখন তিনি তাহার উপর যেরূপ ক্রোধান্বিত হইয়া পড়িলেন, তাহা বর্ণন করা এ লেখনীর কাৰ্য্য নহে। দারোগা সাহেব প্রথমত সেই সুন্দরীকে পুনরায় আপনার নিকট আনয়ন কয়বার নিমিত্ত সবিশেরূপ চেষ্টা করিলেন। কিন্তু কোনরূপেই কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। এমন কি, দারোগা সাহেব এই কথা জমে ওসমানের পিতার কর্ণ গোচর পর্যন্ত করাইলেন। তাহাতেও কোনরূপ সুফল ফলিল না। ওসমানের পিতা এ বিষয়ে কোনরূপে দারোগা সাহেবকে সাহায্য নিলেন না।

এই সকল কারণে দারোগা সাহেবের প্রচণ্ড ক্রোধের সামান্যমাত্রও উপশম হইল না। কিরূপে তিনি ওসমান ও তাহার পিতাকে ইহার প্রতিশোধ দিতে পারিবেন, তাহার চেষ্টাতেই দিনরাত্রি অতিবাহিত করিতে লাগিলেন, এবং অনবরত প্রতিশোধের সুযোগ অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন।

এইরূপে ক্ৰমে এক বৎসর অতিবাহিত হইয়া গেল। এই এক বৎসরের মধ্যে দারোগা সাহেব সেই সুন্দরীর আশা পরিত্যাগ করিতে পারিলেন না, বা প্রতিহিংসার প্রবল চিন্তাকেও হৃদয় হইতে তাড়িত করিতে সমর্থ হইলেন না।

এইরূপে আরও কিছু দিন অতিবাহিত হইয়া গেল। একদিবস প্রাতঃকালে দারোগা সাহেব থানায় বসিয়া আছেন, এরূপ সময়ে একটা লোক গিয়া থানায় উপস্থিত হইল, ও কাঁদিতে দিতে আমোগার সম্মুখীন হইয়া কহিল, বর্ষাবতার। আপনি আমাকে এই বিপদ হইতে রক্ষা করুন। আপনি রক্ষা না করিলে, আর কেই আমাকে রক্ষা করিতে পারিবে না।

দারোগা। কি হইছে?

আগন্তুক। ওসমান আমার সর্বনাশ করিয়াছে।

দারোগা। ওসমান! কোন ওসমান, গোর ধীর পুত্র ওসমান?

আগন্তুক। মহাশয়!

দারোগা। সে তোমার কি করিয়াছে?

আগন্তুক। সে আমার একমাত্র কন্যাকে জোর করিয়া আমার ঘর হইতে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে।

দারোগা। কেন সে তাহাকে ধরিয়া লইয়া গেল?

আগন্তুক। কু-অভিপ্রায়ে সে তাহাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে।

দারোগা। তোমার কন্যার বয়ঃক্রম কত?

আগন্তুক। সে বালিকা, তাহার বয়ঃক্রম এখনও আঠার বৎসরের অধিক হয় নাই।

দারোগা। তাহার বিবাহ হয় নাই?

আগন্তুক। বিবাহ হইয়াছে বৈ কি। তাহার স্বামী এখনও বর্তমান আছে।

দারোগা। এ সংবাদ তাহার স্বামী শুনিয়াছে?

আগন্তুক। এ সংবাদ তাহার স্বামীকে আমরা দেই নাই। তাহার স্বামী বিদেশে থাকেন। সুতরাং এ সংবাদ তিনি এখনও জানিতে পারেন নাই। তিনি না জানিতে জানিতে যদি আমার কন্যাকে উদ্ধার করিয়া আনিতে পারি, তাহা হইলে এ লজ্জার কথা আমি তাহাকে আর জানিতে দিব না।

দারোগা। তোমার কন্যা ইচ্ছা করিয়া ওসমানের সহিত গমন করে নাই ত?

আগন্তুক। মা মহাশয়! তাহাকে জোর করিয়া ওসমান। ধরিয়া লইয়া গিয়াছে।

দারোগা। তুমি ইহার প্রমাণ করিতে পারিবে।

আগন্তুক। খুব পারিব, গ্রামশুদ্ধ সব লোক দেখিয়াছে। তাঁহারা সকলেই সত্য কথা কহিবে। আপনি সেই স্থানে গমন করিলেই, দেখিতে পাইবেন, আমার কথা প্রকৃত কি না?

দারোগা। কতক্ষণ হইল, ওসমান তোমার কন্যাকে জোর করিয়া ধরিয়া লইয়া গিয়াছে।

আগন্তুক। মহাশয় আজ ছয় দিবস হইল।

দারোগা। ছয় দিবস। মিথ্যা কথা। ছয় দিবস হইল, তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, আর আজ তুমি থানায় সংবাদ দিতে আসিলে; তোমার এ কথা কে বিশ্বাস করিবে?

আগন্তুক। মহাশয়! আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করুন, আর না করুন, আমি কিন্তু প্রকৃত কথা কহিতেছি। আমার অনুপস্থিতিতে এই কাৰ্য্য হইয়াছে। আমার বাড়ীতে আমার সেই একমাত্র কন্যা ব্যতীত আর কেহই ছিল না; সুতরাং সুযোগ পাইয়া দুবৃত্ত এই কাৰ্য্য করিয়াছে। তাহার ভয়ে পাড়ার লোক আমাকে পর্যন্ত সংবাদ দিতে সমর্থ হয় নাই। অঙ্গ আমি বাড়ীতে আসিয়া যেমন এই সকল ব্যাপার জানিতে পারিলাম, অমনি আপনার নিকট আগমন করিয়াছি। এখন আপনি রক্ষা না করিলে, আমার আর উপায় নাই।

দারোগা। তোমার বাড়ী যে গ্রামে, সেই গ্রাম হইতে ওসমানের বাড়ী কতদুর?

আগন্তুক। খুব নিকটে, পার্শ্ববর্তী গ্রামে।

দারোগা। তোমার জমিদার কে।

আগন্তুক। সেই হতভাগাই আমার জমিদার।

দারোগা। জমিদারীর খাজানা তোমার কিছু বাকী আছে।

আগন্তুক। বাকী আছে। মিথ্যা কথা কহিব না, আমি আজ তিন বৎসর খাজানা দিতে পারি নাই।

দারোগা। ফি বৎসর তোমাকে কত টাকা করিয়া খাজান দিতে হয়?

আগন্তুক। সালিয়ানা আমাকে পনর টাকা করিয়া খাজানা দিতে হয়। পঁয়তাল্লিশ টাকা খাজানা আমার বাকী পড়িয়াছে।

দারোগা। সেই খাজানার নিমিত্ত তাঁহারা তাগাদা করে না?

আগন্তুক। তাগাদা কমে বৈ কি, কিন্তু দিয়া উঠিতে পারি না।

দারোগা। যখন তোমার কন্যাকে ওসমান ধরিয়া লইয়া গিয়াছিল, সেই সময় তাহার সতে আর কোন লোক ছিল?

আগন্তুক। তাহার সহিত আরও চারি পাঁচজন লোক ছিল।

দারোগা। ওসমানের পিতা গোয় খ সেই সঙ্গে ছিলেন?

আগন্তুক। না মহাশয়। তিনি ছিলেন না।

দারোগা। তুমি জান না; তিনি না থাকিলে, কখনও এইরূপ কাৰ্য্য হইতে পারে না। গ্রামের যে সকল ব্যক্তি এই ঘটনা দেখিয়াছে, তাহাদিগকে তুমি ভাল করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছ কি?

আগন্তুক। জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। কিন্তু কেই সে কথা কহে না। আরও ভাবিয়া দেখুন না কেন, পুল বদি কোন যুবতী রমণীর সতীত্ব নষ্ট করিবার চেষ্টা করে, পিতা কি কখনও তাহার সহায়তা করিয়া থাকেন?

দারোগা। ওসমান শেষে উহার সতীত্ব নষ্ট করিতে পারে; কিন্তু প্রথমতঃ সেই কাৰ্যের নিমিত্ত যে তাহাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, তাহা তোমাকে কে বলিল? অপর কোন কারণে সে কি তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া যাইতে পারে না?

আগন্তুক। আর তা কোন কারণ দেখিতে পাইতেছি না, বা শুনিতেও পাইতেছি না।

দারোগা। ওমানের পিতা গোফুর খাঁ এখন কোথায় আছেন, বলিতে পার?

আগন্তুক। তিনি এখন বাড়ীতেই আছেন।

দারোগা। কানপুর হইতে তিনি কবে আসিয়াছেন।

আগন্তুক। পাঁচ ছয় দিবস হইবে।

দারোগা। তাহা হইলে যে দিবস ওসমান তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, সেই দিবস গোয় কান পুর হইতে বাড়ীতে আসিয়াছেন।

আগন্তুক। হাঁ মহাশয়! হয় সেই দিবসই আসিয়াছেন, না হয়, তাহার পরদিন আগমন করিয়াছেন।

দারোগা। তাহা হইলে ঠিক হইয়াছে। তোমার কন্যার ধর্ম নষ্ট করিবার নিমিত্ত ওসমান তোমার দুহিতাকে ধরিয়া লইয়া যায় নাই। গত তিন বৎসর পর্যন্ত তোমার নিকট হইতে খাজনা আদায় না হওয়ায়, সেই খাজনা আদায় করিবার মানসে ওমানের পিতা গোফুর খাঁ আপন পুত্র ওসমান ও তার কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্ম্মচারীকে সঙ্গে করিয়া তোমার বাড়ীতে আগমন করেন। তুমি বাড়ীতে ছিলে না; সুতরাং তাঁহারা তোমাকে বাড়ীতে দেখিতে পান নাই। কিন্তু তুমি যে এতই বাড়ীতে নাই, ইহা না ভাবিয়া, খাজানা দিবার জয়ে তুমি লুকায়িত পাই, এই ভাবিয়া তোমাকে ভয় দেখাইয়া খাজনা আদায় করিয়া লইবার মানসে তোমার একমাত্র কন্যাকে ধরিয়া লইয়া যাইবার নিমিত্ত গোফুর খাঁ তাঁহার পুত্রকে আদেশ প্রদান করিয়াছিলেন। পিতার আদেশ পাইয়া ওসমান কয়েকজন লোকের সাহায্যে তোমার কন্যাকে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে। খাঁ সাহেবও তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিয়াছেন। কেমন, ইহাই প্রকৃত কথা কি না?

আগন্তুক। না মহাশয়। ইহা এত কথা নহে। ওসমানের পিতা সেই স্থানে উপস্থিত ছিলেন না, বা তিনি আদেশ প্রদান করেন নাই। আমার বাকী থানায় নিমিত্তও এটনা ঘটে নাই।

দারোগা। যা ব্যাটা, তবে তোর মোক গ্রহণ করিব। তুই বাড়ীতে হিলি নি, এত কথা যে কি, তাহার তুই কি জানি? আমরা ইতিপূর্বে সকল কথা জানিতে পারিয়াছি, কেবল কোন ব্যক্তি আমার নিকট আসিয়া নালিশ করে নাই বলিয়া, আমি এ পর্যন্ত অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হই নাই। আমি যেরূপ কহিলাম, সেইপের সাক্ষী সকল সংগ্রহ করিয়া রাখ গিয়া। আমি একজন মাদারকে সঙ্গে দিতেছি, যাহা তুই বুঝতে না পাবি, তিনি তাহা হতাকে বুঝাইয়া দিবেন। তাঁহারা আমি গিন্ধ আসন্ধানে প্রবৃত্ত হইব।

আগন্তুক। দোহাই ধৰ্মবতায়! যাহাতে আমি আমার কাটীকে পাই, আপনাকে সেই উপায় করতে হবে।

দারোগা। তাহাই হইবে। এখন তুই আমার জমা দারের সহিত গমন করিয়া সাক্ষী-সাবুদের সংগ্রহ করিয়া দে। তুই লেখা-পড়া জানিস্ কি?  আগন্তুক। আমরা চাষার ছেলে, লেখাপড়া শিখি নাই।

দারোগা। নিজের নাম লিখিতে পারি?

আগন্তুক। না মহাশয়! আমি আমার নাম পর্যন্ত লিখিতে পারি না।

দারোগা। তোর নাম কি?

আগন্তুক। আমার নাম শেখ হেদায়েৎ।

দারোগা। আচ্ছা হেদায়েৎ, তুমি আমার জমাদারের সহিত তোমার গ্রামে গমন কর। আহারান্তে আমি নিজে গিয়া এই অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইব। সাক্ষীগণ যেন উপস্থিত থাকে।

হেদায়েৎকে এই কথা বলিয়া, দারোগা সাহেব তাহার একজন সবিশেষ বিশ্বাসী জমাদারকে ডাকিলেন, এবং নির্জনে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাহার সহিত কি পরামর্শ করিয়া পরি শেষে তাহাকে কহিলেন, এই মোকদ্দমায় বিশেষরূপে তোমাকে আমার সাহায্য করিতে হইবে। যে সুযোগ পাইয়াছি, সে সুযোগ কিছুতেই পরিত্যাগ করিতে পারিব না। আমার কোন ক্ষমতা কাছে কি না, এবং আমার ঘর ওসমান ও তার পিতার কোনরূপ অনিষ্ট ঘটতে পারে কি না, তা তাহা তাহাদিগকে উত্তমরূপে দেখাইতে হইবে। যেরূপ উপায়েই হউক, উঁহাদিগের উভয়কেই জেলে দিয়া আমার এতদিসের মনের যন্ত্রণা নিবারণ করিতে হইবে।

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া জমাদার কহিল, আপনি যত শীঘ্র হয়, আগমন করুন। আমি সেই স্থানে গমন করি মাত্রই সমস্ত ঠিক করিয়া ফেলিব। তাহার নিমিত্ত আপনাকে ভাবিতে হইবে না

এই বলিয়া হেদায়েৎকে সঙ্গে লইয়া জমাদার তৎক্ষণাৎ সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

জমাদার ও হেদায়েৎ সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবার পর, দারোগা সাহেব প্রথমে এতেলা পুস্তক নিজ হস্তে গ্রহণ করিয়া, নিম্নলিখিতরূপে প্রথম এতেল ফরিয়াদীর অসাক্ষাতেই লিখিলেন।

আমার নাম সেখ হেদায়েৎ। আমার বাসস্থান * * * গ্রাম। গত আটদিবস হইতে আমি আমার বাড়ীতে ছিলাম না, * * * গ্রামে আমার কুটুম্ব * * *-র নিকট আমি আমার কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে গমন করিয়াছিলাম। আমার বাড়ীতে অপর কেহ নাই; কেবলমাত্র আমার যুবতী কন্যা * * *-কে আমি বাড়ীতে রাখিয়া গিয়াছিলাম। অন্য প্রাতঃকালে আমি বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়া, আমার কন্যাকে আমার বাড়ীতে দেখিতে পাইলাম না। পাড়া-প্রতিবাসীগণের নিকট অনুসন্ধান করিয়া আনিতে পারিলাম যে, আমাদিগের গ্রামের জমিদার গোফুর খাঁ তাহার পুত্র ওসমান এবং কয়েকজন কর্ম্মচারীকে সঙ্গে লইয়া খাজনা আদায় করিবার নিমিত্ত আমাদিগের গ্রামে আগমন করেন, এবং গ্রামের এক স্থানে বসিয়া প্রজাগণকে ডাকাইয়া খাজানার তহবিল করিতে থাকেন। শুনিলাম, আমাকেও ডাকিবার নিমিত্ত তিনি একজন পাইক পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। আমি বাড়ী ছিলাম না। সুতরাং পাইক আমাকে দেখিতে পায় নাই। মে গিয়া জমিদার মহাশয়কে কহে, হেদায়েৎ বাড়ীতে নাই, কেবল তাহার কন্যা বাড়ীতে আছে। সে কহিল, তাহার পিতা অদ্য দুই দিবস হইল, কুটুম্ব বাড়ীতে গমন করিয়াছে। এই কথা শুনিয়া জমিদার মহাশয় অতিশয় ক্রোধাবিত হইলেন ও কহিলেন, হেদায়েৎ কোন স্থানে যায় নাই। অনেক টাকা খাজানা বাকী পড়িয়াছে, আমার নিকট আসিলে খাজনা দিতে হইবে, এই ভয়ে সে লুক্কায়িত আছে। যা হক তাহার কন্যাকে ধরিয়া আন, তাহা হইলে সে এখনই আসিয়া খাজনা মিটাইয়া দিবে। এই আদেশ পাইয়া জমিদারের পুত্র ওসমান কয়েকজন কর্ম্মচারীর সাহায্যে আমার কন্যাকে আমার বাড়ী হইতে তার অনিচ্ছা-স্বত্বে জোর করিয়া তাহাকে ধরিয়া জমিদার মহাশয়ে নিকট লইয়া যায়। জমিদার মহাশ প্রায় দুই ঘণ্টা তাহাকে সেই স্থানে বসাইয়া রাখেন। যুবতী স্ত্রীলোকের এইরূপ অবমাননা দেখিয়া, গ্রামস্থ সমস্ত লোক আমার কন্যাকে ছাড়িয়া দিবার নিমিত্ত জমির মহাশয়কে বার বার অনুরোধ করেন; কিন্তু তিনি কাহারও কথায় কর্ণপাত না করিয়া, সেই স্থান হইতে গমন করিবার সময় তাঁর পুত্র ওসমান ও অপরাপর কৰ্ম্ম চারীর সাহায্যে আমার কন্যাকে বাঁধিয়া তাহাদিগের সঙ্গে সঙ্গে তাহাদিগের বাড়ী পর্যন্ত লইয়া যান। বাড়ীর ভিতর লইয়া গিয়া, তাঁহারা যে আমার কন্যার কি অবস্থা করিয়াছেন, তাহা আমি অবগত নহি। সেই পর্যন্ত আমার কন্যা আর প্রত্যাগমন করে নাই, বা গ্রামের কোন ব্যক্তি আর তাহাকে দেখে নাই। আমার অনুমান ও বিশ্বাস যে, জমিদার মহাশয় এবং তাহার পুত ওসমান আমার কন্যাকে তাহার বিনা-ইচ্ছায় তাহাদিগেয় বাড়ীর ভিতর অন্যায়রূপে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছেন, বা তাহাকে হত্যা করিয়াছে। আমি আপন ইচ্ছায় আমার কন্যাকে পাইবার মানসে এই এজাহার দিতেছি। ইহাতে যেরূপ অনুসন্ধানের প্রয়োজন, সেইরূপ ভাবে অনুসন্ধান করিয়া আমার কন্যাকে বাহির করিতে, আজ্ঞা হয়। আমি যে এজাহার দিতেছি, গ্রামশুদ্ধ সমস্ত লোক তাহার সাক্ষী আছে। সেই স্থানে গমন করিলেই, আপনি জানিতে পারিবেন যে, আমার কথা সম্পূর্ণরূপ সত্য কি না আমি লেখা-পড়া জানি না, আমার এজাহার যায় আপনি লিখিয়া লইলেন, তাহা পাঠ করিয়া পুনরায় আমাকে আপনি শুনাইয়া দিলেন; আমি যেরূপ বলিয়াছি, ঠিক সেই রূপই লেখা হইয়াছে। আমি আমার এজাহার শুনিয়া, আমি এই স্থানে নিশানসহি করিলাম। ইতি–

নিশানসহি-সেখ হেদায়েৎ।

দারোগা সাহেব প্রথম এতো পুস্তকে এইরূপ এজাহার লিখিয়া উপযুক্তরূপ লোকজন সমভিব্যাহারে এই অনুসন্ধানে গমন করিবার নিমিত্ত প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। তাহার সহিত গমন করিবার নিমিত্ত যে সকল লোকজনের উপর আদেশ হইল, তাঁহারাও আহারাদি করিয়া ক্ৰমে প্রস্তুত হইতে লাগিলেন।

সন্ধ্যায় একটু পূর্বে দারোগা সাহেব তাহার লোকজন সমভিব্যাহারে হেদায়েতের গ্রামে গিয়া উপস্থিত হইলেন। হেদায়েতের সমভিব্যাহারে জমাদার সাহেব পূর্বেই সেই স্থানে গমন করিয়াছিলেন। সুতরাং দারোগা সাহেব সেই স্থানে গমন করিলে তাহার যে সকল বিষয়ের প্রয়োজন হইবার সম্ভাবনা, তাহার সমস্তই তিনি সেই স্থানে ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন; অর্থাৎ বসিবার স্থান, লোকজন, রাত্রিকালের আহারাদির বন্দোবস্ত সমস্তই ঠিক ছিল। তাহার উপর গ্রামস্থ প্রায় সমস্ত লোকই সেই স্থানে উপস্থিত ছিলেন।

দারোগা সাহেব সেই রাত্রি সেই গ্রামে আহারাদি করিয়া রাত্রিযাপন করিলেন মাত্র; কিন্তু যে বিষয় অনুসন্ধানের নিমিত্ত তিনি সেই স্থানে গমন করিয়াছিলেন, সে সম্বন্ধে কোনরূপ অনুসন্ধান করা দূরে থাকুক, গ্রামস্থ কোন ব্যক্তিকে সে বিষয়ের কোন একটা কথা জিজ্ঞাসা করিলেন না। আহারাদি করিয়া রাত্রিকালে যখন দারোগা সাহেব শয়ন করিলেন, সেই সময় তাঁহার আদেশ গ্রহণ করিয়া, গ্রামস্থ সমস্ত লোক প্রস্থান করিলেন; কিন্তু গমন করিবার সময় দারোগা সাহেব তাহাদিগকে পরদিবস অতি প্রত্যুষে পুনরায় সেই স্থানে আসিতে কহিলেন। সমস্ত লোক গমন করিবার পর দারোগা সাহেব জমাদারের সহিত অনেকক্ষণ পর্যন্ত পরামর্শ করিয়া উভয়েই নিদ্রিত হইয়া পড়িলেন।

পরদিবস অতি প্রত্যুষেই দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালিত হইল। সকলে আগমন করিবার পর একে একে তিনি সমস্ত লোককেই দুই চারি কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাদিগের কোন কথা এখন তিনি কাগজ-কলমে করিলেন না; তবে দেখা গেল, সেই সকল লোক যাহা কহিল, তাহার ছত্রে ছত্রে প্রথম এতেলার সহিত মিলিয়া গেল। দারোগা সাহেব নিজের ইচ্ছামত যেরূপ ভাবে প্রথম এতেলা লিখিয়াছিলেন, গ্রামস্থ সমস্ত লোকেই যখন সেইরূপ ভাবে তাহাদের এজাহার প্রদান করিল, তখন তিনি সেই সকল বিষয় কাগজপত্রে না লিখিয়া আর স্থির থাকিতে পারিলেন না।

গ্রামের প্রধান প্রধান চারি পাঁচজনের এজাহার দারোগা সাহেব লিখিয়া লইলেন। গ্রামের কোন লোক ওমানের উপর সন্তুষ্ট ছিল না। সুতরাং সকলেই ওসমান ও তাহার পিতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করিল। সকলেই কহিল যে, হেদায়েতের নিকট হইতে খাজনা আদায় করিবার নিমিত্তই এই গোলযোগ। হোয়েতের কন্যাকে লাইক করিয়া রাখিলেই খাজনা আদায় হইবে, এই ভাবিয়া গোরখা তাহাকে ধরিয়া আনিবার নিমিত্ত আদেশ প্রদান করেন। তাঁহার পুত্র ওসমান অপর কয়েকজন লোকের সাহায্যে এই আদেশ প্রতিপালন করে। পরিশেবে উহার কন্যাকে ধরিয়া তাঁহা দিগের বাড়ীতে লইয়া যায়।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

ওসমান ও তাহার পিতাকে বিপদাপন্ন করিবার মানসে দারোগা সাহেব যাহা মনে মনে স্থির করিয়াছিলেন, কাৰ্য্যেও তাহা পরিণত হইতেছে দেখিয়া, মনে মনে অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন।

সেই স্থানে অনুসন্ধান আপাততঃ স্থগিত রাখিয়া হেদায়েৎ ও গ্রামের দুই চারিজন লোককে সঙ্গে লইয়া গোফুর খাঁন বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলেন।

গোফুর খাঁ সেই সময় বাড়ীতেই উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ওসমান সেই সময় বাড়ীতে ছিল না। গোফুর খাঁর সহিত দারোগা সাহেবের কিয়ৎক্ষণ কথাবার্তা হইলে পর, ওসমান আসিয়া সেই স্থানে কোথা হইতে উপস্থিত হইল। তাহাকে দেখিয়া দারোগা সাহেব কহিলেন, আপনার উপর একটা ভয়ানক নালিশ হইয়াছে। যে পর্যন্ত আমি অনুমতি প্রদান না করি, সেই পৰ্যন্ত আপনি আমার সম্মুখ হইতে গমন করিবেন না।–

ওসমান। আর যদি আমি চলিয়া যাই?

দারোগা। তাহা হইলে আপনার সহিত ভদ্রোচিত ব্যবহার করিতে আমি কোনরূপেই সমর্থ হইব না। সামান্য লোককে যেরূপ ভাবে আমরা রাখিয়া থাকি, বাধ্য হইয়া আপনাকেও সেইরূপ ভাবে আমাকে রাখিতে হইবে।

গোফুর। আমার উপর অভিযোগ কি?

দারোগা। আপনার আদেশ অনুযায়ী আপনার গ্রামবাসী আপনারই প্ৰজা হেদায়েতের যুবতী কন্যাকে অন্যায়রূপে আজ কয়েকদিবস হইতে আপনার বাটীতে আনিয়া আবদ্ধ করিয়া রাখা হইয়াছে।

গোফুর। আমার আদেশ অনুযায়ী?

দারোগা। প্রমাণে সেইরূপ অবগত হইতে পারিতেছি।

গোফুর। আমি তাহাকে আবদ্ধ করিতে আদেশ প্রদান করিব কেন?

দারোগা। বাকী খাজানা আদায় করিবার অভিপ্রায়ে।

গোফুর। মিথ্যা কথা।

দারোগা। সত্য মিথ্যা আমি অবগত নহি; প্রমাণে যাহা পাইতেছি, তাহাই আমি আপনাকে বলিতেছি। আর সেই প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া আমাকে ইহার প্রতিবিধান করিতে হইবে।

গোফুর। আপনি প্রমাণ পাইতেছেন, আমার আদেশে এই কাৰ্য্য হইয়াছে?

দারোগা। হাঁ।

গোফুর। আমার আদেশ প্রতিপালন করিল কে? অর্থাৎ কে তাহাকে ধরিয়া আনিল?

দারোগা। আপনার পুত্র, এবং আর তিন চারিজন নোক।

গোফুর। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আপনি এখন কি করিতে চাহেন?

দারোগা। আপনি যদি সহজে সেই স্ত্রীলোকটীকে বাহির করিয়া না দেন, তাহা হইলে প্রথমতঃ আপনার বাড়ী আমি উত্তমরূপে খানাতল্লাসি করিয়া দেখিব। দেখিব, উহার ভিতর সেই স্ত্রীলোকটা পাওয়া যায়, কি না।

গোফুর। আর যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে কি হইবে?

দারোগা। সে পরের কথা; যাহা হয়, পরে দেখিতে পাইবেন।

ওসমান। কার হুকুম মত আপনি আমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে চাহেন? বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করি বার কোন ওয়ারেন্ট আছে কি?

দারোগা। কাহার হুকুম মত আমি তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে চাই, তাহা তুমি বালক, জানিবে কি প্রকারে? আমি আমার নিজের হুকুমে তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিব।

ওসমান। যদি প্রবেশ করিতে না দি?

দারোগা। তোমার কথা শোনে কে?, আমি জোর করিয়া প্রবেশ করিব। তাহাতে যদি তুমি কোনরূপ প্রতি বন্ধকতা জন্মাও, তাহা হইলে তোমায় অপর আর এক মোকদ্দমায় আসামী হইতে হইবে।

ওসমান। যাহার অনুসন্ধানের নিমিত্ত আপনার বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবেন, তাহাকে যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে জবাবদিহি কে করিবে? আপনি করিবেন কি?

দারোগা। যাহাকে জবাবদিহিতে আনিতে পারিবে, সে-ই জবাবদিহি করিবে।

ওসমান। আর যদি সে আপন ইচ্ছায় আমাদিগের বাড়ীতে আসিয়া থাকে?

দারোগা। সে উত্তম কথা; সে আসিয়া আমাদিগের সম্মুখে সেই কথাই বলুক। তাহা হইলেই সকল গোলযোগ মিটিয়া যাইবে।

গোফুর। তবে কি স্ত্রীলোকটা আমাদের বাড়ীতে আছে?

ওসমান। না, সে আমাদের এখানে আসেও নাই, বা আমাদিগের এখানে নাইও।

দারোগা। মহাশয়! আমি আর অধিক বিলম্ব করিতে পারিতেছি না। এখন কি করিতে চাহেন, বলুন। স্ত্রীলোকটাকে কি আমার সম্মুখে আনিয়া দিবেন, না আমি বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়া থানাতল্লাসি করিতে আরম্ভ করিব?

গোফুর। আমি ত বলিতেছি, সেই স্ত্রীলোকটা আমা দিগের বাড়ীতে নাই। আমার কথায় আপনি বিশ্বাস না করেন, আপনার যাহা অভিরুচি হয়, তাহা আপনি করিতে পারেন। কিন্তু, আমি পূর্বেই আপনাকে সতর্ক করিয়া দিতেছি, যাহা করিবেন, ভবিষ্যৎ ভাবিয়া করিবেন।

দারোগা। আমার কাৰ্য আমি বুঝি, তাহার নিমিত্ত আমি আপনার নিকট উপদেশ গ্রহণ করিতে আসি নাই। আমি লোকজনের সহিত আপনার বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতেছি, ইচ্ছা করেন যদি, তাহা হইলে আপনার বাড়ীর স্ত্রীলোকদিগকে কোন একটা গৃহের ভিতর গমন করিবার নিমিত্ত বলিতে পারেন। আর ইচ্ছা না করেন, তাহাতে আমার কোনরূপ ক্ষতি-বৃদ্ধি নাই।

এই বলিয়া দারোগা সাহেব আপনার সমভিব্যাহারী লোকজনের সহিত বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিবার অভিপ্রায়ে উথিত হইলেন। তখন অনন্যোপায় হইয়া গোফুর খাঁ, ওসমান, এবং সেই সময় সেই স্থানে গোফুরের বন্ধু-বান্ধব গণের মধ্যে যাহারা উপস্থিত ছিলেন, তাঁহারাও সকলে দারোগা সাহেবের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিবার নিমিত্ত উথিত হইলেন।

দারোগা সাহেব প্রথমেই অন্দরমহলের মধ্যে প্রবেশ করিলেন না। সদর বাড়ীর ভিতর যে সকল গৃহ ছিল, প্রথমেই সেই সকল গৃহের মধ্যে অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এক একখানি করিয়া সৰ্ব্বপ্রথমে সমস্ত খোলা ঘরগুলি দেখিলেন। তাহার ভিতর কিছু দেখিতে না পাইয়া, পরি শেষে যে ঘরগুলিতে চাবি বদ্ধ ছিল, চাবি খুলিয়া সেই ঘর গুলিও একে একে দেখিতে লাগিলেন।

গোফুর খাঁর প্রকাণ্ড বাড়ী; সুতরাং সদরে ও অন্দরে অনেক ঘর। বাহিরের ঘরগুলি দেখিতে প্রায় দুই ঘণ্টা কাল অতিবাহিত হইয়া গেল। এইরূপে তালাবদ্ধ কতকগুলি ঘর দেখিবার পর এক পার্শ্বের এক নির্জন গৃহের তালা খুলিলেন। সেই গৃহের ভিতর অপর দ্রব্য-সামগ্রী কিছুই ছিল না, কেবল গৃহের মধ্যে একখানি পালঙ্কের উপর একটা বিছানা আছে মাত্র।

সেই বিছানার সন্নিকটে গিয়া বা দেখিলেন, তাহাতে সমস্ত লোকেই একবারে বিস্মিত হইয়া পড়িলেন। ইতি পূর্বে দারোগা সাহেব যাহা স্বপ্নেও একবার মনে ভাবেন নাই, তিনি তাহা দেখিয়াই যেন হতবুদ্ধি হইয়া পড়িলেন। কিছুক্ষণের নিমিত্ত যেন তাহার সংজ্ঞাও বিলুপ্ত হইল। একটু পরেই দারোগা সাহেব কহিলেন, কি মহাশয়। এ কি দেখিতেছি?

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া আর কাহারও মুখে কোন কথা বাহির হইল না। পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে দেখিতে লাগিলেন। কেবল হেদায়েৎ সেই বিছানার সঙ্গিক বৰ্ত্তী হইয়া কহিল, মহাশয়! এই আমার কন্যা।

এই বলিয়া হেদায়েৎ তাহার কন্যার গাত্রে হস্তাপণ করিয়া বার বার তাহাকে ডাকিতে লাগিল; কিন্তু সে নড়িল না, যা তাহার কথার কোনরূপ উত্তর প্রদান করিল না। তখন সকলেই জানিতে পারিল যে, সে আর জীবিত নাই।

দারোগা। প্রথমতঃ বড় লম্বা লম্বা কথা কহিতেছিলে যে, এখন আর মুখ দিয়া কথা বাহির হইতেছে না কেন?

গোফুর। ইহার ব্যাপার আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

দারোগা। এখন ত কিছুই বুঝিতে পারিবেন না। এই স্ত্রীলোকের মৃতদেহ এই তালাবন্ধ গৃহের ভিতর কিরূপে আসিল?

গোফুর। আমি ইহার কিছুই অবগত নহি।

দারোগা। (ওসমানের প্রতি) কিগো ওসমান মিঞা, আপনিও বোধ হয়, ইহার কিছুই জানেন না?

ওসমান। না মহাশয়! আমিও ইহার কিছুই অবগত নহি।

দারোগা। সদর বাড়ীর ভিতর তালাবদ্ধ গৃহে, পালঙ্কের। উপর মৃত স্ত্রীলোকের লাস রহিয়াছে। আর আপনারা বলিতেছেন যে, আপনারা কিছুই জানেন না। দ্বারে যে দ্বারবান বসিয়া আছে, সেও বলিবে, আমি কিছুই জানি না। কিন্তু কিরূপে এই স্থানে লাস আসিল, ইহার যদি সন্তোষ জনক প্রমাণ আমাকে আপনারা প্রদান করিতে না পারেন, তাহা হইলে জানিবেন, আপনাদিগের উভয়কেই আমি ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলাই।

দারোগার কথা শুনিয়া গোফুর খাঁ চতুর্দিক অন্ধকার দেখিতে লাগিলেন, এবং এই অবস্থায় কি করিবেন, তাহার কিছুই স্থির করতে না পারিয়া সেই স্থানে বসিয়া পড়িলেন।

দারোগা। কি মহাশয়। আপনি চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন যে? এই লাস কিরূপে আপনার বাড়ীর ভিতর আসিল, সে সম্বন্ধে কোন কথা বলিতেছেন না কেন?

গোফুর। আপনার কথায় আমি যে কি উত্তর প্রদান করিব, তাহা কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। যখন ইহার কিছুই আমি অবগত নহি, তখন আমি আপনাকে আর কি বলিব?

দারোগা। কিগো দ্বারবান্ সাহেব! এ সম্বন্ধে তুমি কি বলিতে চাই?

দ্বারবান্। দোহাই ধর্মাবতার! আমি ইহার কিছুই জানি না।

দারোগা। তুমি দ্বারবান, সর্বদা তুমি দরজায় বসিয়া থাক, অথচ তুমি বলিতেছ, তুমি ইহার কিছুই জান না। এ কথা কি কেহ সহজে বিশ্বাস করিতে পারে?

দ্বারবান্। আপনি বিশ্বাস করুন, আর না করুন, আমি প্রকৃত কথাই বলিতেছি। আমি প্রকৃতই জানি না যে, এই মৃতদেহ কিরূপে বা কাহা কর্তৃক এই বাড়ীর ভিতর আসিল।

গোফুর খাঁ, ওসমান ও দ্বারা যখন কোন কথা বলিল না, তখন সেই সময় দারোগা সাহেব তাহাদিগকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া, নিজের ইচ্ছামত অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইলেন।

লাশের সুরতহাল করিয়া পরীক্ষার্থ উহ জেলার ডাক্তার সাহেবের নিকট প্রেরণপূর্বক ঘটনাস্থলে বসিয়া দারোগা সাহেব কয়েকদিবস পর্যন্ত অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন। এখনকার অনুসন্ধান আসামীগণকে লইয়া নহে; এখনকার অনুসন্ধান, ফরিয়াদী ও সেই স্থানের প্রজাগণের সাহায্যে এবং জমাদার সাহেবের আন্তরিক যত্নের উপর নির্ভর করিয়াই হইতে লাগিল। অর্থাৎ গোফুর খাঁ ও তাঁহার পুত্রের বিপক্ষে এই হত্যা সম্বন্ধে যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইতে পারে, এখন সেই অনুসন্ধানই চলিতে লাগিল।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

পাঠকগণ পূর্ব হইতেই অবগত আছেন যে, গোফুর খাঁ একজন নিতান্ত সামান্য লোক নহেন। দেশের মধ্যে তাঁহার মান-সন্ত্রম যেরূপ থাকা আবশ্যক, তাহার কিছুরই অভাব নাই। অর্থও যথেষ্ট আছে। কিন্তু এই সকল থাকা স্বত্বেও প্রজাগণ কেহই তাহার উপর সন্তুষ্ট নহে; সকলেই তাঁহার বিপক্ষ। প্রজাগণ গোর খার বিপক্ষে দণ্ডায়মান হইবার একমাত্র কারণ, তাঁহার পুত্র ওসমান। ওসমানের অত্যাচারে সকলেই সবিশেষরূপ জ্বালাতন হইয়া পড়িয়াছে। যখন ওমামের অত্যাচার তাঁহারা সময় সময় সহ করিয়া উঠিতে সমর্থ হয় নাই, তখন তাঁহারা তাহার পিতা গোফুর খাঁর নিকট পর্যন্ত গমন করিয়া, ওসমানের অআচারের সমস্ত কথা তাহার নিকট বিবৃত করিয়াছে। তথাপি গোফুর তাহাদিগের কথায় কোনরূপ কর্ণপাত করেন নাই, বা তাহার প্রতিবিধানের কোনরূপ চেষ্টাও করেন নাই। এই সকল কারণে প্ৰজামাত্রেই পিতা-পুত্রের উপর অস। সুতরাং আজ তাঁহারা যে সুযোগ পাইয়াছে, সেই সুযোগ পরিত্যাগ করিবে কেন? তাহার উপর দারোগা সাহেব সহায়।

প্রজাগণ এক বাক্যে গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্র ওসমানের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিতে লাগিল। অনুসন্ধান সমাপ্ত হইলে, দারোগা সাহেব দেখিলেন, নিম্নলিখিত বিষয় সম্বন্ধে উপস্থিত মোকদ্দমায় উত্তমরূপে প্রমাণ হইয়াছে।

১ম। সেখ হেদায়েতের যে গ্রামে বাড়ী, সেই গ্রামের প্রজাগণের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, গোফুর খাঁ ও ওসমান বকেয়া খাজানা আদায় করিতে সেই গ্রামে গমন করেন। হেদা য়েতের নিকট কয়েক বৎসরের খাজানা বাকী পড়ায়, এবং হেদায়েৎ সেই সময় সেই স্থানে উপস্থিত না থাকায়, ওসমান গোফুর খাঁর আদেশমত কয়েকজন পাইকের সাহায্যে, হেদা যেতের একমাত্র যুবতী কন্যাকে বলপূর্বক তাহার বাড়ী হইতে সৰ্ব্বসমক্ষে ধরিয়া আনে, এবং তাহার নিকট হইতে খাজানা আদায় করিবার মানসে গোফুর খাঁর আদেশমত সৰ্ব্ব সমক্ষে তাহাকে সবিশেষরূপে অবমানিত করে। কিন্তু তাহার নিকট হইতে খাজনা আদায় না হওয়ায়, গোয় খ ও ওসমান অপরাপর লোকের সাহায্যে তাহাকে সেই স্থান হইতে বলপূর্বক ধরিয়া আপন গৃহাভিমুখে লইয়া যান।

২য়। অপরাপর গ্রামের কতকগুলি প্ৰজার দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, হেদায়েতের কন্যাকে হেদায়েতের গ্রাম হইতে ধৃত অবস্থায় গোফুর খাঁর গ্রামে গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্র কর্তৃক লইয়া যাইতে অনেকেই দেখিয়াছে।

৩য়। গোফুর খাঁর গ্রামের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজাবর্গের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, হেদায়েতের কন্যাকে গোয় খা ও ওসমান তাঁহাদিগের বাড়ীর ভিতর লইয়া গিয়াছে।

৪র্থ। গোফুর খাঁর কয়েকজন ভৃত্য ও তাহার সেই পূর্ব বর্ণিত দ্বারবানের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, গোফুর খাঁর আদেশমত ওসমান হেদায়েতের সেই কন্যাকে আপনাদের গৃহের ভিতর আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে, এবং যে পর্যন্ত সে জীবিত ছিল, তাহার মধ্যে ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় সে নিতান্ত অস্থির হইলেও, তাহাকে একমুষ্টি অন্ন বা এক গণ্ডুষ জল প্রদান করিতে বারণ করিয়াছিল। এমন কি, সাক্ষিগণের মধ্যে কেহ দয়াপরবশ হইয়া উহাকে এক গণ্ডষ পানীয় প্রদান করিতে উদ্যত হইলে, গোফুর ও তাঁহার পুত্র ওসমান খ। তাহাকেও উহা প্রদান করিতে দেন নাই।

এতদ্ব্যতীত আরও প্রমাণিত হইল যে, যে দিবস পুলিস কর্তৃক লাস বাহির হইয়া পড়ে, তাহার দুই কি তিন দিবস পূর্বে একজন ভৃত্য কোনরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া, ওসমান খার নিকট হইতে সেই গৃহের চাবি অপহরণ করে, এবং ওসমান ও গোফুর খাঁর অসাক্ষাতে সেই গৃহের চাবি খুলিয়া দেখিতে পায় যে, ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় সেই স্ত্রীলোকটীর অবস্থা এরূপ হইয়া পড়িয়াছে যে, তাহার আর বাঁচিবার কিছুমাত্র আশা নাই। এই ব্যাপার দেখিয়া সেই সামান্য ভৃত্যেরও অন্তরে দয়ার উদ্রেক হইল, এবং দ্বারধানের সহিত পরামর্শ করিয়া, সে ইহা স্থির করিল যে, তাহার অদৃষ্টে যাহাই হউক, সে আজ সেই হতভাগিনীকে কিছু আহারীয় ও পানীয় প্রদান করিবে। মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া সে কিছু আহারীয় ও পানীয় আনয়ন করিবার নিমিত্ত গমন করে। কিন্তু উহা সংগ্রহ করিয়া পুনরায় সেই স্থানে আসিয়া দেখিতে পায় যে, ওসমান খাঁ সেই স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। ভূতের অভি সন্ধির কথা জানিতে পারিয়া, ওসমান তাহার উপর সবিশেষ রূপ অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহার হস্ত হইতে আহাৰীয় ও পানীয় কাড়িয়া লইয়া দূরে নিক্ষেপ করেন। তৎপরে, সেই স্ত্রীলোকটী আহারীয় ও পানীয় প্রার্থনা করিয়াছে, এই ভাবিয়া ওসমান সেই গৃহের ভিতর প্রবেশ করেন, ও সেই মহা অপরাধের জন্য সেই সময় সেই স্থানে যে সকল ভৃত্যাদি উপস্থিত ছিল, তাহাদিগের সম্মুখে সেই মৃত্যুশয্যা-শায়িত স্ত্রীলোকটীকে পদাঘাত করেন। সেই সময় সেই স্ত্রীলোকটীর অবস্থা এরূপ হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহার কথা কহিবার বা রোদন করিবার কিছুমাত্র ক্ষমতা ছিল না; সুতরাং সেই পদাঘাত সে বিনা-বাক্যব্যয়ে অনায়াসেই সহ করে। পরিশেষে ওসমান সেইরূপ অবস্থাতেই সেই স্ত্রীলোকটীকে সেই গৃহের ভিতর রাখিয়া, পুনরায় সেই গৃহের দরজা তালাবদ্ধ করিয়া দৈন, এবং চাবি লইয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করেন। ভৃত্য গোয় খার নিকট গমন করিয়া তাহার নিকট এই সমস্ত ঘটনা বর্ণন করে। গোর খ ইহার প্রতিবিধানের পরিবর্তে, সেই ভৃত্যের উপরই বরং অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহাদিগের বিনা-অনুমতিতে সেই স্ত্রী লোকটীকে আহারীয় ও পানীয় দিতে উদ্যত হইয়াছিল বলিয়া, তাহাকে কটুক্তি করিয়া গালি প্রদান করেন, ও চাকরী হইতে তাহাকে বিতাড়িত করেন।

৫ম। পুলিসের সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, তালাবদ্ধ গৃহের ভিতর সেই যুবতী কন্যার মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে। আরও প্রমাণিত হইল যে, যে গৃহে মৃতদেহ পাওয়া গিয়াছে, সেই গৃহের তালার চাবি গোফুর খাঁর নিদর্শনমত ওসমান খাঁর নিকট হইতে পাওয়া গিয়াছে।

৬ষ্ঠ। একজন পাইক,যে গোর খার পাইক বলিয়া পরিচয় প্রদান করিল,—তাহার দ্বারা এই ঘটনার আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা প্রমাণিত হইল; অর্থাৎ খাজানা আদায় করি বার নিমিত্ত হেদায়েতের বাড়ী হইতে সেই স্ত্রীলোককে আনয়ন হইতে, গোফুর খাঁন বাড়ীর ভিতর লাস পাওয়া পর্যন্ত যে সকল ঘটনা অপরাপর সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হইল, তাহার সমস্ত অংশেই এই পাইক সৰ্ব্বতোভাবে পোষকতা করিল।

৭ম। লাস পরীক্ষাকারী ডাক্তার সাহেবের দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, অনাহারই সেই স্ত্রীলোকটীর মৃত্যুর কারণ।

৮ম। এই সকল প্রমাণ ব্যতীত অপর আর কোনরূপ প্রমাণের যাহা আবশ্যক হইল, তাহাও প্রজাগণের দ্বারা প্রমাণিত হইতে বাকী রহিল না।

এই মোকদ্দমায় গোফুর খা ও তাঁহার পুত্রের উপর যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইল, তাহা দেখিয়া গোফুর খাঁ বেশ বুঝিতে পারিলেন যে, এই বৃদ্ধ বয়সে কোনরূপেই তাঁহার আর নিষ্কৃতি নাই। আরও বুঝিতে পারিলেন যে, দারোগা সাহেবের পূর্বোক্ত স্ত্রীলোকটীকে তাঁহার পুত্র বাহির করিয়া জানায়, এবং দারোগা সাহেব তাহার নিকট তাহার পুত্রের বিপক্ষে নালিশ করিলেও, তিনি তাহার কোনরূপ প্রতিবিধানের চেষ্টা করেন না বলিয়াই, দারোগা সাহেবের সাহায্যে তাঁহার এই সর্বনাশ উপস্থিত হইল। কিন্তু তিনি বড়ই আশ্চর্যান্বিত হইলেন যে, হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ তাঁহার বাড়ীর তালাবদ্ধ গৃহের ভিতর কিরূপে আসিয়া উপস্থিত হইল। যখন প্ৰজামাত্রই বলিতেছে যে, গোফুর খাঁ তাহার পুত্রের ন্যায়, সকলই অবগত আছেন, তখন গোফুর খাঁ এ সম্বন্ধে কিছুই অবগত নহেন, বা তাহার জ্ঞাতসারে এ কাৰ্য ঘটে নাই, এ কথা বলিলেই বা কোন বিচারক তাহা বিশ্বাস করিবেন?

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

গোফুর খাঁর একজন অতি বিশ্বাসী কর্ম্মচারী ছিলেন, তাহার নাম হোসেন। পুলিস যখন প্রথম অনুসন্ধান করিতে আরম্ভ করেন, বা যে সময় গোফুরের গৃহে হেদায়েতের কন্যার মৃত দেহ পাওয়া যায়, সেই সময় হোসেন সেই স্থানে উপস্থিত ছিল না; জমিদারীর কাৰ্য্য পৰ্যবেক্ষণ করিবার নিমিত্ত তিনি স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলেন। তাঁহার মনিবের এইরূপ বিপদ উপস্থিত হইয়াছে জানিতে পারিয়া, জমিদারী হইতে তিনি আপনার মনিবের বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, মনিব ও মনিব-পুত্র উভয়েই হত্যাপরাধে ধৃত হইয়া ছেন। তাহাদিগের উপর যে সকল প্রমাণ সংগৃহীত হইয়াছে, তাহা জানিতে পারিয়া, তিনি অতিশয় ভাবিত হইলেন। তখন এই বিপদ হইতে তাহার মনিবকে কোনরূপে উদ্ধার করিবার উপায় দেখিতে না পাইয়া, নির্জনে গিয়া তিনি একদিবস রাত্রি কালে দারোগা সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন।

দারোগা সাহেব তাহাকে পূর্ব হইতেই চিনিতেন। তাহাকে দেখিবামাত্রই কহিলেন, কি হে হোসেনজি! কি মনে করিয়া?

হোসেন। আর মহাশয়! কি মনে করিয়া! কি মনে করিয়া আমি আপনার নিকট আসিয়াছি, তাহা আর আপনি বুঝিতে পারিতেছেন না কি?

দারোগা। আপনি কি মনে করিয়া আসিয়াছেন, তাহা আমি কিরূপে বুঝিতে পারিব? আপনার অন্তরের কথা আমি কিরূপে জানিব?

হোসেন। সে যাহা হউক, যাহা হইবার তাহা হইয়াছে, এখন আপনি কোনরূপে উঁহাদিগকে না বাঁচাইলে, আর বাঁচিবার উপায় নাই।

দারোগা। কাহাদিগকে বাঁচাইতে হইবে? তোমার মনিব ও মনিক-পুত্রকে?

হোসেন। তদ্ভিন্ন আমি এই সময় আর কাহার জন্য আপনার নিকট আসিব?

দারোগা। আগে যদি আপনি আসিতেন, তাহা হইলে উঁহাদিগকে বাঁচাইবার চেষ্টা করিতে পারিতাম, কিন্তু এখন সে চেষ্টা বৃথা। এখন আমার ক্ষমতার অতীত হইয়া পড়িয়াছে।, হোসেন। যে পর্যন্ত মোকমার চুড়ান্ত বিচার শেষ হইয়া না যায়, সে পর্যন্ত আপনার ক্ষমতার সীমা এড়াইতে পারে না। এখন আমাকে কি করিতে হইবে বলুন। আপনি যাহা বলিবেন, আমি তাহাই করিতে, বা যাহা চাহিবেন, তাহাই প্রদান করিতে প্রস্তুত। এখন যেরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া হউক, উঁহাদিগের প্রাণ আপনাকে রক্ষা করিতেই হইবে।

দারোগা। দেখুন হোসেন সাহেব, এ পর্যন্তু ওসমান যেরূপ অত্যাচার করিয়া আসিতেছে, তাহাতে উহার প্রতি কাহার দয়া হইতে পারে? আপনি ত অনেক দিবস হইতে গোফুর খাঁর নিকট কৰ্ম্ম করিয়া আসিতেছেন; বলুন দেখি, তাঁহার প্রজাগণের মধ্যে কোন ব্যক্তি ওসমানের অত্যাচারে প্রপীড়িত হইতে বাকী আছে। বলুন দেখি, কয়জন লোক আপনার জাতি-ধৰ্ম্ম বজায় রাখিয়া, তাহার জমিদারীর মধ্যে বাস করিতে সমর্থ হইয়াছে। বলুন দেখি, কতগুলি স্ত্রীলোক তাহার জমিদারীর মধ্যে বাস করিয়া তাহাদিগের সর্বপ্রধান-ধৰ্ম্ম সতীত্ব রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছে। যাহার এই সকল কাৰ্য, তাহাকে আপনি এই বিপদ হইতে রক্ষা করিতে চাহেন। স্ত্রীলোকের ধর্ম নষ্ট করা ব্যতীত যাহার অপর আর কোন চিন্তা নাই, সুন্দরী স্ত্রীলোককে কোন গতিতে তাহার পিতা, মাতা, ভ্রাতা বা স্বামীর নিকট হইতে অপহরণ করিবার যাহার সর্বদা মানস, আপনার পাশব বৃত্তি চরিতার্থ করিবার নিমিত্ত যে ব্যক্তি সকল কাৰ্য্যই অনায়াসে করিতে পারে, আপনি তাহার প্রাণ রক্ষার নিমিত্ত আমাকে অনুরোধ করিবেন না। তাহাকে এই মোকদ্দমা হইতে বাচাই বার কথা দুরে থাকুক, তাহাকে সাহায্য করিবার নিমিত্ত অতি সামান্য মাত্র চেষ্টা করিলেও, তাহাতে মহাপাতক হয়। তাই বলি, আপনি আমাকে এরূপ অনুরোধ করিবেন না। সহস্র সহস্র মুদ্রা প্রদান করিলেও, এ কাৰ্য্য আমার দ্বারা কোনরূপেই হইবে না।

হোসেন। আচ্ছা মহাশয়! ওসমানই যেন মহাপাতকী, কিন্তু তাহার বৃদ্ধ পিতার অপরাধ কি? পুত্রের অপরাধে পিতাকে দণ্ড দিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন কেন?

দারোগা। বৃদ্ধ পাপী নহে? আমার বিবেচনায় ওসমান অপেক্ষা বৃদ্ধ শতগুণ অধিক পাপ। যে পিতা পুত্রের দুস্কাৰ্য্য সকল জানিতে পারি, তাহার প্রতিবিধানের চেষ্টা না করেন, যাহার নিকট তাহার পুত্রের বিপক্ষে শত সহস্র নালিশ উপ স্থিত হইলেও, তিনি তাহার প্রতি কর্ণপাতও করেন না, সেরূপ পিতাকে সেই অত্যাচারকারী পুত্র অপেক্ষা শতগুণ অধিক পাপী বলিয়া আমার বিশ্বাস। এরূপ অবস্থায় যুবক বালকের বরং মাফ আছে, কিন্তু বৃদ্ধ পিতা কোনরূপেই ক্ষমার্হ নহে।

হোসেন। ওসমান যে অত্যাচারী, সে বিষয়ে আর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু তাহার অত্যাচারের সকল কথা যে গোফুর খাঁর কর্ণগোচর হয়, তাহা আমার বোধ হয় না। পুত্রের অত্যাচারের কথা শুনিতে পাইলে, তাহার নিবারণের চেষ্টা না করিবেন, সেরূপ পিতা গোফুর খাঁ নহেন। আমার বিশ্বাস যে, এই সকল অত্যাচারের কথা কখনই তাহার কর্ণগোচর হয় নাই। তিনি জানিতে পারিলে, ওসমান এতদুর অত্যাচার করিতে কখনই সমর্থ হইত না।

দারোগা। মিথ্যা কথা, বৃদ্ধ সমস্ত কথা অবগত আছে। জানিয়া শুনিয়া, সে তাহার পুত্রকে কোন কথা বলে না; বরং তাহার অত্যাচারের সাহায্য করে। ওসমান কর্তৃক এমন কোন ঘটনা ঘটিয়াছিল, যাহার সহিত আমার নিজের কোনরূপ সংস্রব ছিল। তাহার প্রতিবিধানের নিমিত্ত আমি নিজে কানপুর পর্যন্ত গমন করিয়া, সমস্ত কথা বৃদ্ধের কর্ণগোচর করি। কিন্তু কৈ, তিনি তাহার কি প্রতিবিধান করিয়াছিলেন?

হোসেন। আমি বুঝিতে পারিতেছি, যে কার্যের সহিত আপনার নিজের সংস্রব ছিল, সেই কাৰ্য্য তাহার কর্ণগোচর হইলেও, তিনি তাহার প্রতিবিধানের কোন চেষ্টা করেন নাই বলিয়া, আপনি অতিশয় ক্রুদ্ধ হইয়া পড়িয়াছেন। কিন্তু আমার অনুরোধে এখন আপনাকে সেই ক্রোধ পরিত্যাগ করিতে হইবে। আপনার যে কাৰ্য্য তখন ওসমান বা তাঁহার পিতার দ্বারা সম্পন্ন হয় নাই, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি, সেই কাৰ্য এখন আমি সম্পন্ন করিয়া দিব। তদ্ব্যতীত আপনি আর যাহা প্রার্থনা করেন, তাহাও আমি প্রদান করিতে প্রস্তুত আছি। এখন আপনি একটু অনুগ্রহ করিলেই, আমাদিগের অনেক মঙ্গল হইতে পারিবে।

দারোগা। যে কাৰ্য্যের সহিত আমার সংশ্রব আছে, সে কাৰ্য্য আপনি সম্পন্ন করিয়া দিবেন কি প্রকারে? আপনি কি সেই ঘটনার বিষয় কিছু অবগত আছেন?

হোসেন। সেই সময় ছিলাম না; কিন্তু এখন সমস্তই জানিতে পারিয়াছি, এবং ওসমান তাহাকে কোথায় রাখিয়াছে, তাহাও আমি অনুসন্ধানে অবগত হইতে পারিয়াছি। ইচ্ছা করিলে, এখন তাহাকে অনায়াসেই আপনি পাইতে পারেন।

দারোগা। এই মোকদ্দমা সাক্ষি-সাবুদের দ্বারা যেরূপ প্রমাণ হইয়া গিয়াছে, তাহা বোধ হয়, আপনি জানিতে পারিয়া ছেন। সমস্তই এখন কাগজ-পত্র হইয়া গিয়াছে। উর্দ্ধতন কর্ম্ম চারীগণ পৰ্য্যন্ত সকলেই এখন ইহার সমস্ত ব্যাপার জানিতে পারিয়াছেন। এখন আর আমার দ্বারা আপনাদিগের কি উপকার হইতে পারে?

হোসেন। প্রথম অবস্থায় আমি এখানে থাকিলে এই মোকদ্দমার অবস্থা কখনই এতদূর হইতে পারি না। কিন্তু এখন যাহা হইয়া গিয়াছে, তাহার আর উপায় নাই। যাহা হইবার তাহা হইয়াছে, এখন ইহা অপেক্ষা আর যেন অধিক না ঘটে; আর সাক্ষি-সাবুদের যেন সংগ্রহ না হয়। আমি আপাততঃ আপনার নজর রূপ এই সহস্র মুদ্রা প্রদান করিতেছি। ঈশ্বর যদি অনুগ্রহ করেন, মোক হইয়া গেলে পুনরায় আপনার সহিত নির্জনে সাক্ষাৎ করিব। আর যাহার নিমিত্ত আপনি এতদুর ক্রোধান্বিত হইয়াছেন, আমার সহিত আপনি যখন গমন করিবেন, তখনই আমি তাহার নিকট আপনাকে লইয়া যাইব। তাহার পরে আপনি আপনার ইচ্ছানুযায়ী কর্ম্ম করিবেন। এখন আমাকে বিদায় দিন, আমাকে অনেক কাৰ্য্য সম্পন্ন করিতে হইবে। এখন আপনি আমাদিগের উপর প্রসন্ন হইলেন, কি না, বলুন।

দারোগা। প্রসঙ্গ না হইলেও, যখন আপনি এতদুর বলিতেছেন, তখন কাজেই আমাকে প্রসন্ন হইতেই হইবে। আমি ক্রোধের বশবর্তী হইয়া যতদূর করিবার, তাহা করিয়া ফেলিয়াছি। যাহা করিয়াছি, তাহার আর উপায় নাই। এখন আর অধিক কিছু করিব না।

হোসেন। ওসমান সহ দোষে দোষী, তাহার আর কিছু মাত্র সন্দেহ নাই। গোরও পুত্র-মেহ বশতঃ সেই সকল দোষের প্রতিবিধান করিয়া উঠিতে পারেন নাই সত্য। কিন্তু

মহাশয়! এখন যেরূপ ভাবের মোকদম উপস্থিত হইয়াছে, সাক্ষি-সাবুদের দ্বারা যেরূপ প্রমাণিত হইয়াছে, তাহার কণা মাত্রও প্রকৃত নহে। ইহা আপনি মুখে না বলুন, কিন্তু অন্তরে তাহ আপনাকে স্বীকার করিতে হইবে।

দারোগা। তোমার কথা যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে গোফুর খাঁর তালাবদ্ধ গৃহের ভিতর হেদায়েতের কন্যার মৃত দেহ কিরূপে আসিল?

হোসেন। উহার প্রকৃত ব্যাপার আমি সমস্তই শুনিয়াছি। যদি জানিতে চাহেন, তাহা হইলে আমি গোপনে আপনাকে সকল কথা বলিতে পারি।

দারোগা। গোপনে বলিতে চাহেন কেন?

হোসেন। মোকদ্দমার সময় আমরা সেই কথা স্বীকার করিব কি না, তাহা উপযুক্ত উকীল কৌলির পরামর্শ ব্যতীত বলিতে পারি না। সুতরাং আপনার নিকট গোপনে সেই সকল কথা না বলিলে যে কিরূপ দোষ ঘটিতে পারে, তাহা আপনিই কেন বিবেচনা করিয়া দেখুন না।

দারোগা। আমি ত কোন দোষ দেখিতেছি না।

হোসেন। মনে করুন, যে সকল কথা আমি প্রকৃত বলিয়া এখন বিশ্বাস করিতেছি, ও আপনি জানিতে চাহেন বলিয়া, আপনাকে যাহা বলিতে প্রবৃত্ত হইতেছি, সে সকল কথা আবশ্যকমত অস্বীকার করিলেও, আমি নিষ্কৃতি পাইব না।

দারোগা। আপনার নিষ্কৃতি না পাইবার কারণ কি?

হোসেন। আমি যদি অস্বীকার করি, তাহা হইলে যে সকল লোকের সম্মুখে আমি এখন সেই সকল কথা বলিতেছি, আবশ্যক হইলে সেই সকল লোকের দ্বারা আপনি উহা অনায়াসেই প্রমাণ করিতে সমর্থ হইবেন।

দারোগা। সেই সকল কথা আইনমত, ওরূপে প্রমাণ হইতে পারে না।

হোসেন। প্রমাণ হউক, বা না হউক, যদি আপনি নিতান্তই অবগত হইতে চাহেন, তাহা হইলে কাহারও সম্মুখে আমি সেই সকল কথা কহিব না। একাকী শুনিতে চাহেন, ত আমি বলিতে প্রস্তুত আছি।

দারোগা। আর যদি আমি আবশ্যকমত আপনাকে সাক্ষী স্থির করি, তাহা হইলে আপনি কি করবেন? আপনি এখন আমাকে যাহা বলিবেন, তখনও আপনাকে তাহাই বলিতে হইবে।

হোসেন। তাহা বলিব কেন? আবশ্যক হয়, সমস্ত কথা আমি অনায়াসেই অস্বীকার করিতে পারিব।

সম্পূর্ণ।

» ঘর-পোড়া লোক – ২য় বা মধ্যম অংশ

ঘর-পোড়া লোক (মধ্যম অংশ) (দারোগার দপ্তর ৭৫ম সংখ্যা)
(অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত!)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। আষাঢ়।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.

ঘর-পোড়া লোক।
 (মধ্যম অংশ)
প্রথম পরিচ্ছেদ।

হোসেনের কথা শুনিয়া দারোগা সাহেব কহিলেন, আপনি কি অবস্থা শুনিয়াছেন বলুন দেখি, আমিও শ্রবণ করি।

বোগা সাহেবের কথার উত্তরে হোসেন কহিল, ওসমানের চরিত্র আপনি উত্তমরূপেই অবগত আছেন, এবং তাহার চরিত্র সম্বন্ধে আপনি যাহা কহিলেন, তাহার একবিন্দুও মিথ্যা নহে। যে মৃতদেহ গোফুর খাঁর বাড়ীতে পাওয়া গিয়াছে, তাহা যে হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ, সে সম্বন্ধে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। শুনিয়াছি, সেই কন্যাটা বেশ রূপবতী ছিল। তাহার রূপের কথা জমে ওসমানের কর্ণগোচর হইল। যুবতী রূপবতী স্ত্রীলোকের কথা শুনিয়া তিনি আর কোনরূপে স্থির থাকিতে পারিলেন না, তাহার নিকট ক্রমে লোকের উপর লোক পাঠাইয়া, তাহাকে কুপথগামিনী করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ওসমানের প্রস্তাবে সে কোনরূপেই প্রথমে স্বীকৃত হয় নাই; কিন্তু অনেক চেষ্টার পর অর্থের লোভে ক্রমে সে আপন ধৰ্ম্ম বিক্রীত করিতে সম্মত হইল। যে সময় হেদায়েৎ কাৰ্যোপলক্ষে স্থানান্তরে গমন করিয়া

ছিলেন, সেই সময় একরাত্রিতে ওসমান একখানি পাকী পাঠাইয়া তাহাকে আপন বাড়ীতে আনয়ন করেন। প্রায় সমস্ত রাত্রি তাহাকে আপনার বৈঠকখানায় মাখিয়া, অতি অলমাত্র রাত্রি অবশিষ্ট থাকিতে, সেই পাল্কী করিয়া তাহাকে পুনরায় আপন বাড়ীতে পাঠাইয়া দেন। পরদিবস রাত্রিতে পুনরায় পাল্কী করিয়া

তাহাকে আপন বৈঠকখানায় আনয়ন করেন। সেই সময় গোফুর খাঁ বাড়ীতে ছিলেন না, কানপুরে ছিলেন। যে সময় ওসমান সেই স্ত্রীলোকটাকে লইয়া আপন বৈঠকখানায় আমোদ প্রমোদে উন্মত্ত ছিলেন, সেই সময় হঠাৎ গোফুর খাঁ বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হন। পাছে পিতা তাঁহার এই সকল বিষয় জানিতে পারেন, এই ভয়ে ওসমান তাঁহার বৈঠকখানার সম্মুখে একটা কুঠারীর ভিতর উহাকে লুকায়িত ভাবে রাখিয়া দিয়া সেই গৃহের তালাবদ্ধ করিয়া দেন। তৎপরে তাহার একজন অনুচরকে কহেন যে, তাঁহার পিতা যেমন এদিক ওদিক করিবেন, বা বাড়ীর ভিতর গিয়া শয়ন করিবেন, সেই সময় সেই স্ত্রী লোকটীকে সেই গৃহ হইতে বাহিরে আনিয়া, পাক্কী করিয়া তাহার বাড়ীতে যেন পাঠাইয়া দেওয়া হয়, এবং পাঠাইবার সময় সেই স্ত্রীলোকটাকে যেন বলিয়াও দেওয়া হয় যে, বৃদ্ধ কানপুরে গমন করিলে পুনরায় তাহাকে আনয়ন করা বাইবে।

অনুচর ওসমানের প্রস্তাবে সম্মত হন, এবং কহেন যে, একটু অবকাশ পাইলেই তিনি তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিবেন। অনুচর ওসমানের প্রস্তাবে সম্মত হইলেন বটে, কিন্তু কাৰ্যে তাহা করিয়া উঠিলেন না। পরদিবস প্রাতঃকালে ওসমান তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি মিথ্যা কথা কহিলেন।

তিনি যে তাহাকে পাঠাইতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন, এ কথা না। ধলিয়া, কহিলেন যে, গত রাত্রিতেই তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে। অনুচর যে তাহার কোনরূপ অভিসন্ধি বশতঃ এইরূপ মিথ্যা কথা কহিলেন, তাহা নহে; মনে করিলেন, উহাকে পাঠাইয়া দেওয়া হয় নাই, এই কথা জানিতে পারিলে, পাছে ওসমান তাহার উপর অসন্তুষ্ট হন। এই ভয়ে তিনি মিথ্যা কথা কহিলেন। তখন তিনি মনে মনে স্থির করিলেন যে, যেরূপ উপায়ে হউক, এখনই তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিবেন। সেই সময় ওসমান অপর একটী কাৰ্য্যোপলক্ষে তাহাকে স্থানান্তরে প্রেরণ করেন। তিনিও সেই কাৰ্যোপলক্ষে এ দিকের কাৰ্য একবারে ভুলিয়া যান। অথচ ওসমানের বিশ্বাস যে, সেই স্ত্রীলোকটী তাহার বাড়ীতে গমন করিয়াছে; সুতরাং সেই স্ত্রীলোকটী গৃহের ভিতর যে বদ্ধ আছে, এ কথা আর কাহারও মনে হয় নাই, বা সেই ঘর খুলিবারও কোন প্রয়োজন উপস্থিত হয় নাই। এইরূপে অনাহারে এবং তৃষ্ণায় উহার মৃত্যু ঘটে। পরিশেষে আপনি বাড়ীর সমস্ত স্থান অনুসন্ধান করিতে করিতে, যখন সেই ঘরের দরজা খোলেন, তখন সেই মৃতদেহ বাহির হইয়া পড়ে। এই ব্যাপার দেখিয়া তখন ওমানের সমস্ত কথা স্মরণ হয়, এবং বুঝিতে পারেন যে, তাহার অনুচরের মিথ্যা কথার নিমিত্ত তাহার কি সর্বনাশ ঘটিল! গোফুর খাঁ ইহার ভাল মন্দ কিছুই জানেন না; সুতরাং এই অবস্থা দেখিয়া তিনি একবারে হতজ্ঞান হইয়া পড়েন। আমি যতদুর শুনিয়াছি, ইহাই প্রকৃত ঘটনা। আমি অকপটে আপনার নিকট যাহা বলিলাম, তাহা কিন্তু এখন অন্যরূপ ঘটনা হইয়া পড়িয়াছে।

দারোগা। ইহাই যদি প্রকৃত ঘটনা হয়, তাহা হইলে এখন যেরূপ ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে, তাহা কি?

হোসেন। তাহা যে কি, তাহা আপনি আপন মনে বেশ অবগত আছেন, আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন কেন?

দারোগা। এই মোকদ্দমার যেরূপ প্রমাণ হইয়াছে, তাহা আপনি সমস্ত অবগত হইতে পারিয়াছেন কি?

হোসেন। তাহা সমস্তই জানিতে না পারিলে, আর আপনার নিকট আসিব কেন?

দারোগা। আপনি আমাকে যে সহস্র মুদ্রা প্রদান করিলেন, তাহার পরিবর্তে আমি এখন যে কোন উপকার করিতে পারি, তাহা বোধ হয় না।

হোসেন। মনে করিলে এখনও বিস্তর উপকার করিতে পারেন।

দারোগা। এরূপ অবস্থায় আমার দ্বারা আর কি উপকার হইবার সম্ভাবনা আছে, বলুন। আমি বিবেচনা করিয়া দেখি, সেই উপকার করিতে আমি কত দুর সমর্থ।

হোসেন। সময় মত বলিব। তখন আপনার যতদূর সাধ্য, সেইরূপ উপকার করিবেন; কিন্তু এখন যাহাতে অন্য কোন সাক্ষীর যোগাড় না হয়, তাহা করিলেই যথেষ্ট হইবে। আরও একটা বিষয়ের অনুরোধের নিমিত্ত আমি আপনার নিকট আসিয়াছি। যে সমস্ত ব্যক্তি আমাদিগের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে, তাঁহারা ওসমানের জ্বালায় সবিশেষ জ্বালাতন হইয়া, এইরূপে আমাদিগের সর্বনাশ করিতে বসিয়াছে। তাঁহারা যে কথা বলিয়াছে, পুনরায় যে তাহার অন্যথাচরণ করিবে, তাহা আমার বোধ হয় না। তথাপি অর্থ প্রলোভনে আমরা একবার চেষ্টা করিয়া দেখিব, যদি কোনরূপে কৃতকার্য হইতে পারি। আপনি তাহাতে প্রতিবন্ধকতাচরণ করিবেন না, ইহা আমার একটা প্রধান অনুরোধ।

দারোগা। তাহা কিরূপে হইবে? সাক্ষিগণ একবার যেরূপ কথা বলিয়াছে, এখন যদি তাহার অন্যথাচরণ করে, তাহা হইলে তাহাদিগকে সম্পূর্ণরূপে বিপদে পড়িতে হইবে, তাহা কি তাঁহারা জানে না? বিশেষতঃ একথা যদি তাঁহারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তাহা হইলে আমি কখনই বলিতে পারিব না যে, তোমরা পূর্বে যেরূপ বলিয়াছ, এখন অনায়াসেই তাহার বিপরীত বলিতে পার। আর সাক্ষীগণ যদি এখন অন্যরূপ বলে, তাহা হইলে তাহাদিগের ত বিপদ হইবেই; তদ্ব্যতীত আমাদিগের উপরও নানারূপ সন্দেহ উপস্থিত হইবে, আর হয় ত আমাকেও বিপদাপন্ন হইতে হইবে।

হোসেন। যাহাতে আপনাকে বিপদাপন্ন হইতে হইবে, এরূপ কাৰ্যে আমি কখনই হস্তক্ষেপ করিব না। আর যাহা কিছু করিতে হইবে, আপনার সহিত পরামর্শ করিয়া, এবং সেই বিষয়ে আপনার মত লইয়া সেই কাৰ্য্য করিব। আপনার অমতে কোন কাৰ্য্য করিব না।

এই বলিয়া হোসেন, সেই দিবস দারোগা সাহেবের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন।

হোসেন চলিয়া গেলে, দয়োগা সাহেব মনে মনে স্থির করিলেন, যাহা কিছু পাইয়াছি, তাহা গ্রহণ করিয়াছি। আরও যদি কিছু পাই, তাহাও লইব। অধিকন্তু হোসেনের সাহায্যে সেই স্ত্রীলোকটীকেও পুনরায় আনাইয়া লইব। কিন্তু আসল কাৰ্য কোনরূপেই ছাড়িব না; যাহাতে গোফুর এবং ওসমানকে ফঁসি কাষ্ঠে ঝুলাইতে পারি, বিধিমতে তাহার চেষ্টা করিব।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

হেদায়েতের কন্যাকে হত্যার অপরাধে, গোফুর খাঁ এবং তাহার পুত্র ওসমান খাঁ মাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরিত হইলেন। দারোগা সাহেবও প্রাণপণে সেই মোকদ্দমার আয়োজন করিতে লাগিলেন। পিতা পুত্র উভয়েই হাজতে রহিলেন। পুলিসের নিকট যে সকল সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছিল, যাহাতে তাঁহারা মাজিস্ট্রেটের নিকট অন্যরূপ সাক্ষ্য প্রদান করে, তাহার নিমিত্ত হোসেন অনেক অর্থ ব্যয় করিয়া, অনেক চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। বরং পুলিসের নিকট তাঁহারা যেরূপ বলিয়াছিল, মাজিষ্ট্রেটের নিকট তাহা অপেক্ষা আরও অনেক অধিক কথা কহিল।

সমস্ত সাক্ষীর এজাহার হইয়া যাইবার পর, মাজিষ্ট্রেট সাহেব দেখিলেন যে, আসামীদ্বয়ের বিরুদ্ধে হত্যাকরা অপরাধ উত্তমরূপে প্রমাণিত হইয়াছে। সুতরাং চুড়ান্ত বিচারের নিমিত্ত তিনি এই মোকদ্দমা দায়রায় প্রেরণ করিলেন।

এই মোকদ্দমার বিচারের নিমিত্ত যখন দায়রায় দিন স্থির হইল, সেই সময় বিচারক মফঃস্বল পরিভ্রমণ উপলক্ষে, জেলা হইতে সুদূর মফঃস্থলে অবস্থান করিতেছিলেন। যখন যে গ্রামে বিচারক উপস্থিত হইতেছিলেন, সেই সময় সেই গ্রামেই আপন কাছারি করিয়া মোকদ্দমার বিচারও করিয়া আসিতেছিলেন।

যে দিবস গফুর খাঁ এবং তাঁহার পুত্র ওসমানের এই হত্যাপরাধ-বিচার আরম্ভ হইল, সে দিবস একটা নিতান্ত ক্ষুদ্র পলিগ্রামের ভিতর জজসাহেবের তাম্বু পড়িয়াছিল। সুতরাং সেই স্থানেই এই মোকদ্দমার বিচার আরম্ভ হইল।

এলাহাবাদ হাইকোর্ট হইতে উকীল কৌন্সলি আনাইয়া এই মোকদ্দমায় দোষ-ক্ষালনের যতদূর উপায় হইতে পারে, হোসেন প্রাণপণে তাহার চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে সমর্থ হইলেন না। সরকারী উকীল মোকর্দমার অবস্থা জজসাহেবকে উত্তমরূপে সর্বপ্রথম বুঝাইয়া দিবার পর হইতেই, জজসাহেবের মনে কেমন এক বিশ্বাস হইয়া গেল যে, আসামী পক্ষীয় উকীল কৌশলি অনেক চেষ্টা করিলেও, তাহার মন হইতে সেই বিশ্বাস অপনোদন করিতে পারিলেন না। তিন দিবস পৰ্য্যন্ত এই মোকদ্দমার সাক্ষিগণের এজাহার গৃহীত হইল। তাহাদিগের উপর যথেষ্ট জেরা হইল। উভয় পক্ষীয় উকীল কৌন্সলিগণ স্বপক্ষে সাধ্যমত বক্তৃতাদি করিতে ক্রটি করিলেন না; কিন্তু কিছুতেই আসামীদ্বয়ের পক্ষে কোনরূপ উদ্ধারের উপায় লক্ষিত হইল না।

জজসাহেব এই মোকদ্দমার রায় প্রদান করিবার কালীন কহিলেন, আসামীগণ! তিন দিবস পর্যন্ত বিশেষ যত্ন ও মনো–যোগের সহিত, এই মোকদ্দমার সমস্ত ব্যাপার আমি উত্তম রূপে শ্রবণ করিয়াছি, এবং তোমাদিগের পক্ষীয়, সুশিক্ষিত উকীল কৌন্সলিগন সবিশেষ যত্নের সহিত তোমাদিগের পক্ষসমর্থন করিয়া, তোমাদিগের স্বপক্ষে যাহা কিছু বলিবার আছে, তাহা অপেক্ষাও অনেক কথা বলিয়াছেন; কিন্তু উভয় পক্ষের সমস্ত ব্যাপার শ্রবণ করিয়া এবং সাক্ষিগণের সাক্ষ্য দিবার কালীন, তাহাদিগের ভাব-ভঙ্গি দেখিয়া আমার স্পষ্টই প্রতীতি জন্মিয়াছে যে, তোমাদিগের বিপক্ষে তাঁহারা বিন্দুমাত্রও মিথ্যা কথা কহে নাই। অবশ্য, অনেক সাক্ষ্যের অনেক স্থান অপর সাক্ষিগণের সাক্ষ্যের সহিত এক মিল হয় নাই। কিন্তু তাহা বলিয়া তাঁহারা যে, একবারে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে, এ কথা আমি কখনই স্বীকার করিতে পারিব না। তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর তালা বন্ধ গৃহের মধ্যে হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ যে পাওয়া গিয়াছে, সে সম্বন্ধে কোন আপত্তি উত্থাপিত হয় নাই। বিশেষতঃ তোমাদিগের বিরুদ্ধে যে সকল ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে, তাঁহারা সকলেই তোমাদিগের জমিদারীর প্রজা। প্রজাগণ তাহা দিগের জমিদারের বিপক্ষে কখনই মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করিতে সম্মত হয় না। আর নিতান্ত সত্যের অনুরোধে যদি কোন প্রজাকে তাহার জমিদারের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিতে হয়, তাহা হইলেও সেই প্রজা যতদূর সম্ভব, তাহার জমিদারকে বাঁচাইয়া যাইতে চেষ্টা করে, ইহাই এদেশীয় নিয়ম। তোমাদের প্রজাগণ তোমাদিগের বিপক্ষে যে সকল সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে, আমার বিশ্বাস, তাঁহারা তাহা অপেক্ষাও অনেক অধিক কথা অবগত আছে। কোনরূপে যদি আপনাদের জমিদারের উপকার করিতে পারে, এই ভাবিয়া সকল কথা তাঁহারা বলে নাই। সেই সকল সাক্ষী ওসমানের অত্যাচারে অত্যাচারিত হইয়া, তোমাদিগকে বিপদাপন্ন করিবার মানসে মিথ্যা কথা কহিতেছে, এ কথা সময় সময় মোদিগের কৌন্সলি উখাপিত করিলেও, তাঁহারা সেই সকল কথা একবারে অস্বীকার করে। অথচ তোমরাও তাহার সত্যাসত্য প্রমাণ করতে সমর্থ হও নাই, বা তাহার চেষ্টাও কর নাই। এইরূপ নানা কারণে আমি সাক্ষিগণের সাক্ষ্য কোনরূপেই একবারে অবিশ্বাস করিতে পারি না।

সাক্ষিগণের দ্বারায় বেশ প্রমাণিত হইয়াছে যে, হেদায়েতের নিকট হইতে খাজানা আদায় করিবার মানসে, তাহার অবর্ত মানে তাহার যুবতী কন্যাকে তোমরা বলপূৰ্ব্বক তাহার পরদার বাহিরে আনিয়া সৰ্ব্বসমক্ষে তাহাকে যেরূপ অবমাননা করিয়াছ, সেরূপ কাৰ্য ভদ্রবংশীয় কোন লোকের দ্বারা কোনরূপেই সম্ভব না। কেবল মাত্র সামান্য খাজানা আদায় করিবার অভিপ্রায়ে তোমরা সেই যুবতীর উপর কেবল যে এইরূপ ভয়ানক অত্যাচার করিয়াছ, তাহা নহে। আমার অনুমান হয় যে, তোমাদিগের এরূপ কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিবার অপর কোন বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। এইরূপে যুবতীর উপর ভয়ানক অত্যাচার করিয়াই যে, তোমরা তাহাকে নিষ্কৃতি দিয়াছ, তাহা নহে। সৰ্বসমক্ষে সেই অবলাকে বিনাদোয়ে ধৃত করিয়া, বিশেষরূপে অবমাননার সহিত কয়েক খানি গ্রামের মধ্য দিয়া তোমরা তোমাদিগের বাটী পৰ্যন্ত তাহাকে লইয়া গিয়াছ। এ কথা গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিত সকলেই একবাক্যে কহিতেছে। অবলা স্ত্রীলোকের উপর বিনা দোষে এরূপ অত্যাচার করা নিতান্ত পিশাচের কাৰ্য ভিন্ন আর কিছুই বলিতে পারা যায় না। এইরূপ অত্যাচার করিয়াই কি তোমরা তাহাকে নিষ্কৃতি লিয়াছ? তোমাদিগের নিজের অনুচর এবং ভৃত্যরর্গের দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে যে, সেই হতভাগিনীকে অনশনে রাখিয়া হত্যা করিবার অভিপ্রায়ে তাহাকে তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর একটা নির্জন গৃহের মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়া দিয়াছিলে। অনশনে যে লোকের মৃত্যু ঘটে, তাহা কি তোমরা জান না? ক্ষুৎপিপাসা সন্থ করিতে কোন্ ব্যক্তি কয়দিবস সমর্থ হয়, তাহা কি তোমাদিগের মনে একবারের নিমিত্তও উদয় হয় নাই? কেবল তাহাই নহে, তোমাদিগের নিজের পরিচারক কি বলিতেছে, তাহা একবার শোন। এক দিবস কোন গতিতে আমি সেই গৃহের চাবি সংগ্রহ করিয়া ঘর খুলিয়া দেখিলাম যে, ক্ষুধায় এবং তৃষ্ণায় যুবতী মৃত্যুশয্যায় শায়িতা। এই অবস্থা দেখিয়া আমার কঠিন হৃদয়েও দয়ার উদ্রেক হইল। ঘরবানের সহিত পরামর্শ করিয়া আমি কিছু আহারীয় এবং পানীয় আনিয়া উহাকে দিবার উদ্যোগ করিতেছি, এরূপ সময়ে ওসমান সাহেব তাহা জানিতে পারিয়া, সেই সকল দ্রব্য আমার হস্ত হইতে কাড়িয়া লইয়া দূরে নিক্ষেপ করিলেন, ও আমাকে যৎপয়োনান্তি গালি দিয়া পুনরায় সেই গৃহের তালা বন্ধ করিয়া দিলেন। এই ব্যাপার দেখিয়া আমার মনে নিতান্ত কষ্ট হইল। আমি গিয়া গোফুর মিঞার নিকট এই কথা বলিলে, কোথায় তিনি তাহার প্রতিবিধানের চেষ্টা করিবেন, না তাঁহার পরিবর্তে আমাকে সহস্র গালি প্রদান করিয়া, তাঁহাদিগের বিনা, অনুমতিতে আমি সেই গৃহের দরজা খুলিয়াছিলাম বলিয়া আমাকে চাকরী হইতে জবাব দিলেন, এবং তদখেই আমাকে তাঁহা, লিগের বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিলেন।

কি ভয়ানক! কি পৈশাচিক ব্যবহার! এই ব্যক্তি ও তাহার পোষকতাকারী ঘরবানের সাক্ষ্য যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে সেই যুবতীকে অনশনে রাখিয়া, ইচ্ছা-পূৰ্ব্বক তাহাকে যে হত্যা করিয়াছ, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। যাহাদিগের দ্বারা এরূপ কাৰ্য্য হইতে পারে, তাঁহারা কোনরূপেই দয়ার পাত্র নহে। আমার বিবেচনায় এরূপ প্রকৃতি-বিশিষ্ট লোকের উপর দয়া প্রকাশ করিলে ঈশ্বর তাহার উপর অসন্তুষ্ট হন। গোফুর খাঁ! তোমার বৃদ্ধ বয়স দেখিয়া, এবং তোমার পূর্ব-চরিত্র শ্রবণ করিয়া আমি পূর্বে মনে করিয়াছিলাম, এরূপ মোকদ্দমায় যদি কেহ দয়ার পাত্র হয়, তাহা তুমি। কিন্তু এখন আমি দেখিতেছি, দস্যু তস্করকে দয়া করা যাইতে পারে, মনুষ্য হত্যাই যাহাদিগের জীবিকা, তাহাদিগকেও দয়া করা যাইতে পারে, তথাপি তোমার উপর সে দয়া প্রকাশ করিতে নাই। তোময়া ইচ্ছা করিয়া যেরূপ ভয়ানক অপরাধ করিয়াছ, তাহার প্রকৃত দণ্ড আমাদিগের আইনে নাই। তোমাদিগের জাতীয় রাজার রাজত্বকালে যেরূপ কুকুর দিয়া খাওয়াইয়া ও ক্ষতস্থানে লবণ নিক্ষিপ্ত করিয়া মারিয়া ফেলিবার নিয়ম ছিল, আমার বিবেচনায় তোমরা সেইরূপ দণ্ডের উপযুক্ত। কিন্তু সেরূপ দণ্ড যখন আমাদিগের আইনে নাই, তখন আমাদিগের আইনের চরম দণ্ড আমি তোমাদিগের উপর বিধান করিলাম। যে পর্যন্ত তোমরা না মরিবে, সেই পৰ্য্যন্ত তোমাদিগের উভয়কেই ফাঁসিকাষ্ঠে লটুকাইয়া রাখা হইবে।

জজসাহেবের মুখে বিষম দণ্ডের কথা শুনিয়া গোফুর খাঁ আর দাড়াইয়া থাকিতে পারিলেন না, মূর্হিত অবস্থায় সেই স্থানে পড়িয় গেলেন। প্রহরীগণ তাঁহার মুখে জল সিঞ্চন করাতে তাঁহার সংজ্ঞা হইলে, তাঁহারা তাঁহাকে সেই স্থান হইতে বাহির করিয়া লইয়া গেল। ওসমান স্থিরভাবে এই দণ্ডাজ্ঞা সহ করিলেন, কোন কথা কহিলেন না; কেবল দারোগা সাহেবের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেন মাত্র।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

এই ভয়ানক দণ্ডাজ্ঞা শুনিয়া হোসেনের মুখ দিয়া আর কোন কথা বাহির হইল না। অপূর্ণ-লোচনে তিনি আদালতের বাহিরে আসিলেন। যে সময় এই মোকদ্দমার বিচার শেষ হইয়া গেল, তখন অপরাহ চারিটা। জজসাহেবের সঙ্গে একজন কোর্ট-ইনস্পেক্টার ছিলেন; যে আসামীদ্বয়ের উপর প্রাণদণ্ডের আদেশ হইয়াছে, তাহাদিগকে লইয়া তিনি বিষম বিপদে পড়িলেন। কিরূপে সেই আসামীদ্বয়কে তিনি জেলায় পাঠাইয়া দিবেন, তাহার কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলেন না। সেই স্থান হইতে পদব্রজে আসামীগণকে পাঠাইয়া দিলে, তিন চারিদিবসের কম তাঁহারা সরে গিয়া উপস্থিত হইতে পারিবে না। বিশেষতঃ গোফুর খাঁর আর চলিবার ক্ষমতা নাই; তাহার উপর পয়ে বিপদের সম্ভাবনাও আছে।

কোর্ট-ইন্‌স্পক্টার সাহেব এইরূপ গোলযোগে পড়িয়া হোসেনকে তাকাইয়া পাঠাইলেন ও কহিলেন, আপনার মনিবদ্বয়ের অদৃষ্ট্রে যাহা ছিল, তাহা ঘটিয়াছে; কিন্তু যে পর্যন্ত তাহাদিগের জীবন শেষ না হয়, সে পর্যন্ত তাহাদিগকে কষ্ট দেওয়া কোনরূপেই কৰ্তব্য নহে। এখন, ইহাদিগকে অনেকদূর পর্যন্ত হাঁটিয়া যাইতে হইবে; কিন্তু আমি দেখিতেছি যে, হটিবার শক্তি ওসমানের থাকিলেও থাকিতে পারে, কিন্তু গোফুর খাঁর সে শক্তি নাই। আর উঁহাদিগকে কোন যানে আরোহণ করাইয়া লইয়া যাইবার খরচার ব্যবস্থাও সরকার হইতে নাই। এরূপ অবস্থায় যদি আপনি কিছু অর্থ প্রদান করেন, তাহা হইলে যাহাতে উঁহারা কষ্ট না পান, কোনরূপে আমি সেইরূপ বন্দোবস্ত করিয়া উহা দিগকে এই স্থান হইতে পাঠাইতে পারি।

হোসেন। আমাকে কিরূপ অর্থ সাহায্য করিতে হইবে?

ইনস্পেক্টার। অধিক অর্থের সাহায্য করিতে হইবে না। ইহারা দুইজন, এবং ইহাদিগের সহিত যে কয়জন প্রহরী গমন করিবে, তাহাদিগকে সদর পর্যন্ত লইয়া যাইতে হইলে গাড়ি প্রভৃতির যাহা কিছু খরচ পড়িবে, তাহাই কেবল তোমাকে দিতে হইবে।

হোসেন। তাহা আমি দিতে সম্মত আছি, যদি আমাকেও উঁহাদিগের সহিত গমন করিতে দেন।

ইনস্পেক্টার। আপনিও উঁহাদিগের সহিত গমন করিতে পারেন। কিন্তু একত্র নহে। উঁহারা যে গাড়িতে গমন করি বেন, আপনি সেই গাড়িতে গমন করিতে পারিবেন না। অপর গাড়ি লইয়া উঁহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিলে, কেহ আপত্তি করিবে না। কিন্তু কেন আপনি উঁহাদিগের সহিত গমন করিতে চাহেন?

হোসেন। আমি যে কয়দিবস উঁহাদিগের সহিত থাকিতে পারিব, সেই কয়দিবস যাহাতে উঁহাদিগের কোনরূপ আহারাদিন কষ্ট না হয়, তাহা আমি দেখিতে পারিব তথ্যতীত যখন উভয়েই ফঁসি খাইতেছেন, তখন ইহাদিগের এই অগাধ জমিদারীর কিরূপ বন্দোবস্ত করিব, বা তাঁহারা ইহা কাহাকে প্রদান করিয়া যাইবেন, এবং পরিবারবর্গেরই বা কিরূপ বন্দোবস্ত হইতে পারে, প্রভৃতি আবশ্যক বিষয় সকল সম্বন্ধে যতদূর সম্ভব, তাহাদিগের নিকট হইতে জানিয়া বা লিখাইয়া লইব।

ইনস্পেক্টার। আপনি উঁহাদিগের সহিত এখন গমন করিতে পারেন, আর তাহাদিগের আহারাদি সম্বন্ধীয় বন্দোবস্ত করিতেও কিছুমাত্র নিষেধ নাই। কিন্তু বিষয়-আদি-সম্বন্ধীয় বন্দোবস্ত করিবার সময় এখন নহে। জেলায় গমন করিবার পর জেলের মধ্যে উঁহারা যে কয়দিবস পাকিবেন, তাহার মধ্যে জেল কর্ম্মচারীর সম্মুখে সে সমস্ত বন্দোবস্ত আপনারা করিয়া লইতে পারিবেন।

হোসেন। জেলায় গমন করিতে উঁহাদিগের কয়দিবস লাগিবে?

ইনস্পেক্টার। তাহা আমি এখন বলিতে পারিতেছি না। ইহাদিগের সহিত যে সকল প্রহরী গমন করিবে, তাঁহারা যে কয়দিবসে সুবিধা বিবেচনা করিবে, সেই কয়দিবসে তাঁহারা উঁহাদিগকে লইয়া যাইবে।

হোসেন। মহাশয়! আর একটা কথা। রাত্রিকালে উহার যে যে স্থানে অবস্থিতি করিবে, সেই সেই স্থানে রাত্রিযাপন উপযোগী কোনরূপ বন্দোবস্ত করিতে হইবে কি?

ইনস্পেক্টার। না, রাত্রিযাপন সম্বন্ধে কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার প্রয়াজন নাই। কারণ, থানা ভিন্ন অপর কোন স্থানে উঁহারা রাত্রিযাপন করিবেন না। সমস্ত দিবস গমন করিয়া সন্ধ্যার পূর্বে যে থানায় গিয়া উপস্থিত হইতে পারিবেন, সেই থানাতেই রাত্রিযাপন করিবেন, ও পরদিন প্রত্যুষে সেই থানা হইতে প্রস্থান করিবেন। এইরূপে গমন করিয়া যে কয়দিবসে সম্ভব, সদরে গিয়া উপস্থিত হইবেন।

কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেবের সহিত এই সকল কথাবার্তা হইবার পর, তাহাদিগকে লইয়া যাইবার নিমিত্ত যে কিছু ব্যয় হইবে, তাহার সমস্ত ভার হোসেন গ্রহণ করিলেন। সেই দিবস অপরাহ হইয়া আসিয়াছিল বলিয়া, ইনস্পেক্টার সবিশেষরূপ পাহারার বন্দোবস্ত করিয়া আসামীদ্বয়কে সেই স্থানেই রাখিয়া দিলেন। আর ইহাই সাব্যস্ত হইল যে, পরদিবস অতি প্রত্যুষে আসামী দ্বয়কে সেই স্থান হইতে পাঠাইয়া দিবেন। আসামীদ্বয় এবং প্রহরীগণকে লইয়া যাইবার নিমিত্ত যে কয়েকখানি, একার প্রয়োজন হইল, তাহাও সেই রাত্রিতে বন্দোবস্ত করিয়া রাখা হইল। হোসেন এবং তাহার দুইজনমাত্র ভৃত্যও সেই সঙ্গে গমন করিতে প্রস্তুত হইল। তাঁহারাও নিজের গমনোপোযোগী একা বন্দোবস্ত করিয়া রাখিলেন।

পরদিবস অতি প্রত্যুষে প্রহরীগণ আসামীদ্বয়কে লইয়া একারােহণে সেই স্থান হইতে বহির্গত হইলেন। হোসেনও তাঁহার অনুচরদ্বয়ের সহিত অপর এক্কায় আরোহণ করিয়া তাহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। প্রহরী গণের মধ্যে যে ব্যক্তি সর্ব প্রধান ছিল, সেই স্থান হইতে বহির্গত হইবার পূর্বে কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেব তাহাকে হোসেনের সহিত পরিচয় করিয়া দিয়াছিলেন ও বলিয়া দিয়াছিলেন, হোসেন তাহাদিগের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিবে। যে স্থানে যে কোন খরচের প্রয়োজন হইবে, তাহা হোসেনই দিবেন। আসামীদ্বয়কে আহারাদি করাইবার নিমিত্ত যে কোন সাহায্যের প্রয়োজন হইবে, হোসেন তৎক্ষণাৎ সেই সকল সাহায্য করিবেন। একা প্রভৃতির যখন যেরূপ ভাড়া লাগিবে, হোসেনকে বলিলে তৎক্ষণাৎ তিনি তাহা প্রদান করিবেন।

কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেবের আদেশ পাইয়া, প্রহরী আর কোন কথা কহিল না। কারণ, সে উত্তমরূপে অবগত ছিল যে, যদি হোসেন বা অপর কোন ব্যক্তি এক্কা প্রভৃতির ভাড়া প্রদান না করে, তাহা হইলে যে কয়দিবসে হউক, তত পথ তাহা দিগকে পদব্রজে গমন করিতে হইবে।

প্রহরী-সর্দারের মনে মনে একটু দুরভিসন্ধি ছিল। কোর্ট ইনস্পেক্টারের সম্মুখে কিন্তু সে তাহা প্রকাশ করিল না। তখন তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইয়া আসামীদ্বয় ও হোসেনের সমভিব্যাহারে সেই স্থান হইতে বহির্গত হইল।

কিয়দ্দূর গমন করিবার পর, পথের এক স্থানে একটা জলাশয় দৃষ্টিগোচর হইল। প্রহরী-সর্দ্দার সেই স্থানে একা থামাইতে আদেশ প্রদান করিলেন। আদেশ প্রতিপালিত হইল। একা হইতে অবতরণ করিয়া সকলে সেই স্থানে একটু বিশ্রাম করি লেন, এবং প্রহরীগণ একে একে আপনাপন হস্তমুখাদি প্রক্ষালন করিয়া লইলেন। তাঁহাদিগের সকলের হস্তমুখাদি প্ৰক্ষালিত হইলে, প্রহরী-সর্দ্দার হোসেনকে কহিলেন, মহাশয়! আসামী স্বয়কে লইয়া সদরে উপস্থিত হইতে এক্কা-ভাড়া প্রভৃতি যে সকল খরচ পড়িরে, তাহা আমাদিগকে মিটাইয়া দিন।

হোসেন। একা-ভাড়া প্রভৃতির জন্য আপনার ব্যস্ত হইবার কোন প্রয়োজন নাই। যখন আমি আপনাদিগের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিতেছি, তখন সমস্তই আমি প্রদান করিব।

সর্দ্দার-প্রহরী। আপনি যে উহা প্রদান করিবেন, তাহা কোর্ট ইনস্পেক্টার সাহেব বলিয়াই দিয়াছেন; কিন্তু বারে বারে আপনার নিকট চাহিয়া লওয়া অপেক্ষা একবারেই উহা আমাদিগকে প্রদান করা উচিত নহে কি?

হোসেন। যখন আমাকে দিতে হইবে, তখন আপনি একবারেই লউন, বা বারে বারেই লউন, তাহাতে আমার কিছুমাত্র ক্ষতি নাই।

সঃ প্রহরী। তাহা হইলে উহা আমাকে অগ্ৰেই প্রদান করুন।

হোসেন। কত খরচ পড়িবে, তাহা আমি এখন পর্যন্ত জানিতে পারিতেছি না; সুতরাং অগ্রে আমি আপনাকে উহা কি প্রকারে প্রদান করিতে পারি? আপনাদিগের সহিত যে সকল একা আছে, উঁহারা কি একবারে সদর পর্যন্ত গমন করিতে পারিবে?

সঃ প্রহরী। উঁহারা এতদূর কিরূপে গমন করিবে? এক এক থানায় গমন করিবার পর উঁহাদিগকে ছাড়িয়া দিব ও সেই স্থান হইতে অন্য এক্কা গ্রহণ করিব।

হোসেন। তাহা হইলে আপনাদিগকে কত টাকা গাড়িভাড়া দিতে হইবে, তাহা আমি এখন কিরূপে জানিতে পারিব? যেমন যে একা ছাড়িয়া দিবেন, অমনি তাহার ভাড়া মিটাইয়া দিলে চলিবে না?

সঃ প্রহরী। তাহা কিরূপে হইবে? সে সময় যদি আপনি উপস্থিত না থাকেন, তাহা হইলে কিরূপে ভাড়া প্রদান করিবেন?

হোসেন। আমি ত আপনাদিগের সহিত উপস্থিত আছি। যখন যাহা বলিবেন, তখনই তাহা প্রদান করিব।

সর্দ্দার-প্রহরী। এখন ত উপস্থিত আছেন দেখিতেছি; কিন্তু রাস্তা হইতে যদি আপনি চলিয়া যান, তাহা হইলে তখন আমি কি করিব? ও সকল গোলযোগেরই এখন প্রয়োজন নাই। আমার নিকট কিছু অর্থ আপনি প্রদান করুন, তাহা হইতে আমি ভাড়া প্রদান করিব। খরচ-পত্র বাদে যাহা অবশিষ্ট থাকিবে, তাহা পরিশেষে আমি আপনাকে ফিরাইয়া দিব।

হোসেন। আচ্ছা মহাশয়, তাহাই হউক। যদি আপনারা আমাকে অবিশ্বাস করেন, তাহা হইলে এই কুড়িটী টাকা আপনার নিকট রাখিয়া দিন।

সঃ প্রহরী। আমি আপনার নিকট ভিক্ষা করিতে বসি নাই! এখন যদি আপনি পঞ্চাশ টাকা প্রদান করেন, তাহা হইলে আমি উহা গ্রহণ করিব; নতুবা আমি আসামীদ্বয়কে হাঁটাইয়া লইয়া যাইব।

হোসেন। হাঁটাইয়া লইয়া যাইবার প্রয়োজন নাই। আমি পঞ্চাশ টাকাই আপনাকে প্রদান করিতেছি, তাহা হইতে আপাততঃ যে সকল খরচ-পত্রের প্রয়োজন হয়, আপনি করুন। পরে যদি আরও কিছু আবশ্যক হয়, তাহাও আমি প্রদান করিব।

এই বলিয়া হোসেন পঞ্চাশটী টাকা বাহির করিয়া সেই সর্দ্দার প্রহরীর হস্তে প্রদান করিলেন। তিনি উহা গ্রহণ করিয়া আপনার নিকট রাখিয়া দিলেন, ও অপর প্রহরীগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, চল ভাই! আর দেরী করিবার প্রয়োজন নাই।

সর্দ্দার-প্রহরীর এই কথা শুনিয়া হোসেন কহিলেন, মহাশয়। আপনারা হস্ত মুখ প্রক্ষালনাদি সকল কার্য শেষ করিয়া লইলেন; কিন্তু ইহারা হস্ত মুখাদি ধুইবে কি না, তাহা ত কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন।

সর্দ্দার-প্রহরী। সে কথা জিজ্ঞাসা করিবার আমাদিগের কোন প্রয়োজন নাই। কোন বিষয়ের আবশ্যক হইলে ইহারা আপনারাই আমাদিগকে বলিবেন। তখন বিবেচনা করিয়া দেখা যাইবে যে, উঁহাদিগের প্রার্থনা শ্রবণ-যোগ্য কি না।

হোসেন। আপনারা যদি কোন কথা তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা না করেন, তাহা হইলে আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি।

সঃ প্রহরী। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার তোমার কোন অধিকার নাই। হত্যাপরাধে যাহাদিগের প্রাদণ্ডের আদেশ হইয়াছে, তাহাদিগের সহিত কথা কহিয়া, তুমি আমাদিগের চাকরী লইতে চাও?

হোসেন। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিলে, আপনাদিগের চাকরী যাইবে কি প্রকারে, তাহা আমি বুঝিতে পারিতেছি না।

সঃ প্রহরী। চাকরী যাউক, আর না যাউক, উঁহাদিগের সহিত আমি কোনরূপে তোমাকে কথা কহিতে দিব না।

হোসেন। আপনার অনভিমতেই আমি কথা কহিব কেন? কিন্তু আমি ইহাদিগকে যদি কোন কথাই বলি, তাহা মন্দ কথা নহে। তাহাতে আপনাদিগের কোনরূপ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা নাই।

সঃ প্রহরী। আমাদিগের কোনরূপ অনিষ্ট হউক, বা না হউক, তাহা দেখিবার তোমার কিছুমাত্র আবক নাই। মূল কথা, তুমি উঁহাদিগের সহিত কোন কথা কহিতে পারিবে না।

হোসেন। যদি আমি ইহাদিগের সহিত কোন কথা কহিতেই না পারিব, তাহা হইলে আপনাদিগের সহিত আমার আসিবার কি প্রয়োজন ছিল?

সর্দ্দার-প্রহরী। প্রয়োজন ত আমি কিছুই দেখি না। না আসিলেই পারিতে।

হোসেন। আমি না আসিলে, আপনাদিগকে কে গাড়ির ভাড়া প্রদান করিত?

সঃ প্রহরী। গাড়ি ভাড়া কিছু আমাদিগের উপকারের নিমিত্ত দেও নাই। তোমারই মনিবদ্বয় হাঁটিয়া যাইতে অপারক, তাই তাঁহাদিগের নিমিত্ত গাড়ির ভাড়া প্রদান করিয়াছ। গাড়ি ভাড়া প্রদান না করিলে, আমরা অনায়াসেই উঁহাদিগকে আঁটাইয়া লইয়া যাইতে পারিতাম।

হোসেন। বলি, জমাদার সাহেব! ও সকল কথা থাক, এখন আপনাদিগের মনের কথা কি বলুন দেখি। আপনারা যাহা বলিবেন, আমি তাহাতেই প্রস্তুত আছি।

সঃ প্রহরী। খুনী আসামীর সহিত কথা কহিতে দেওয়া যে কতদুর ঝুঁকির কাৰ্য, তাহা ত আপনারা জানেন না। যদি আমাদের কোনরূপ সাধ্য না থাকে, তাহা হইলে আমরা সেই ঝুকি কেন গ্রহণ করিব? আপনি বুদ্ধিমান, আপনাকে অধিক আর কি বলিব?

হোসেন। আমাকে আর বলিতে হইবে না, এ কথা আমাকে পূর্বে বলিলেই পারিতেন। আপনারা কিছু প্রার্থনা করেন, বুঝিয়াছি। বলুন, এখন আমাকে কি দিতে হইবে।

সঃ প্রহরী। আপনি বড় মানুষ, আপনাকে আমরা আর কি বলিব? আপনি আপনার বিবেচনামত কাৰ্য্য করিলেই চলিবে।

হোসেন। এখন আর আমার বুদ্ধি-মুদ্ধি কিছুই নাই, ভাল মন্দ বুঝিবার ক্ষমতা এখন দুর হইয়া গিয়াছে। এই সামান্য কাৰ্য্যের নিমিত্ত আমাকে কয়টা টাকা দিতে হইবে, তাহা স্পষ্ট করিয়া আমাকে বলুন। আমার সাধ্য হয়, আমি প্রদান করি। আর আমার ক্ষমতার অতীত হয়, তাহা হইলে এই স্থান হইতেই আমি ধীরে ধীরে প্রস্থান করি।

সর্দ্দারপ্রহরী। আপনাকে কিছু অধিক প্রদান করিতে হইবে। আমরা পাঁচজন বই আর নয়। আমাকে কুড়ি টাকা ও অপর চারিজনকে দশ টাকা করিয়া চল্লিশ টাকা প্রদান করিলেই হইবে। আপনার পক্ষে ইহা অতি সামান্য টাকা, কেবল ষাট টাকা বৈত নয়!

হোসেন। আপনার পক্ষে ইহা অতি সামান্য টাকা; কিন্তু আমার পক্ষে ইহা খুব অধিক হইতেছে। আমি অত টাকা দিতে পারি না। আমি আপনাদিগের সম্মান রক্ষার নিমিত্ত ত্রিশ টাকা প্রদান করিতেছি।

সঃ প্রহরী। এ কাৰ্য ত্রিশ টাকায় হইতে পারে না। আপনার ইচ্ছা হয়, ষাট টাকা দিন, ইচ্ছা না হয়, এক টাকা দিবারও প্রয়োজন নাই। আমি অধিক করিয়া বলি নাই, আমি যেরূপ:এক কথার লোক, সেইরূপ এক কথাই বলিয়াছি।

হোসেন। আচ্ছা মহাশয়! আমি ষাট টাকাই প্রদান করিতেছি। ইহার পর আমাকে ত আর কিছু প্রদান করিতে হইবে না?

সঃ প্রহরী। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার নিমিত্ত আপ নাকে আর কিছু প্রদান করিতে হইবে না। কিন্তু আমাদিগের কাহারও সম্মুখে ব্যতীত নির্জনে আপনি উঁহাদিগের সহিত কোন রূপ কথা বলিতে পারিবেন না।

এইরূপ কথাবার্তার পর হোসেন ষাট টাকা প্রদান করিয়া তাঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার আদেশ পাইলেন। কিন্তু সেই সময় সবিশেষ কোনরূপ কথা কহিবার অবকাশ পাইলেন না। তাহাদিগকে তৎক্ষণাৎ এক্কার উপর আরোহণ করিতে হইল। হোসেনও আপন একায় গিয়া আরোহণ করিলেন। এক্কায় আরোহণ করিবার সময় হোসেন কেবলমাত্র তাহাদিগকে কহিলেন, জজসাহেব আপনাদিগের প্রাণদণ্ডের আদেশ প্রদান করিয়াছেন বলিয়া যে, আপনাদিগের প্রাণদণ্ড হইবেই, তাহা আপনারা মনে করিবেন না। আপনার উপার্জিত বিষয়ের এক পয়সামাত্র অবশিষ্ট থাকিতে, কোনরূপেই আমি আপনাদিগের প্রাণদণ্ড হইতে দিব না। টাকাব যথেষ্ট সংগ্রহ করিয়া আমি সঙ্গেই রাখিয়াছি। হাইকোর্ট হইতে যেরূপ উপায়ে হউক, এই হুকুম রদ করাইবু। ঈশ্বর যদি একান্তই বিমুখ হন, হাইকোর্ট হইতে যদি কিছু করিয়া উঠিতে না পারি, তাহা হইলে ছোট লাটকে ধরিয়া হউক, বড় লাটকে ধরিয়া হউক, বিলাত পর্যন্ত গড়িয়া হউক, কোন না কোনরূপে আপনাদিগকে অব্যাহতি প্রদান করাইব।

হোসেনের কথা শুনিয়া গোফুর ও ওসমান কেবল এইমাত্র কহিলেন, দেখুন, ভরসার মধ্যে ঈশ্বর?

ইহার পরেই এক্কা সকল সেই স্থান হইতে চলিল। একা, চালক অশ্বগণকে সবলে কষাঘাত করিতে লাগিল। প্রহারের ভয়ে অশ্বগণ দ্রুতবেগে গমন করিতে লাগিল। দুই ঘণ্টার পথ একঘণ্টায় চলিতে লাগিল।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

দিবা দ্বিপ্রহরের সময়, এক্কা সকল একটী সরাইয়ের নিকট গিয়া উপস্থিত হইলে, আসামীদ্বয়ের সহিত প্রহরীগণ সেই স্থানে অবতরণ করিয়া সেই সরাইয়ের ভিতর প্রবেশ করিল। সেই স্থানে কোন দ্রব্যেরই অভাব ছিল না। সরাইয়ের মধ্যেই শীতল জল-পূর্ণ একটা প্রকাণ্ড ইদারা। সরাইয়ের মধ্যস্থিত একখানি ঘরের মধ্যেই বেনিয়ার দোকান; উহাতে আটা, চাউল, ধৃত ও তরকারি প্রভৃতি আবশ্যক আহারীয় দ্রব্য এবং হড়ী, কাষ্ট, কঁচা সালপাতা প্রভৃতি সমস্তই পাওয়া যায়। প্রহরীগণ সরাইয়ের ভিতর প্রবেশ করিয়াই তাহার মধ্যে যে সকল সারি সারি ঘর ছিল, তাহার একখানির মধ্যে আসামীদ্বয়কে রাখিয়া দিল। সেই ঘরের কেবলমাত্র একটী দরজা ভিন্ন অপর জানালা দরজা আর কিছুই ছিল না; সুতরাং সেই ঘরকে একরূপ হাজত-গৃহ বলিলেও চলে। সেই ঘরের সম্মুখে দৌড় বারান্দার উপর সারি সারি পাচ খানি চারিপায়া আসিয়া পড়িল। প্রহরীগণ সেই স্থানে আপনাপন পোষাক পরিচ্ছদাদি রাখিয়া, সেই চারিপায়ার উপর উপবেশন করিল; কেহ বা লম্বা হইয়া শয়ন করিল। প্রহরীগণকে শয়ন করিতে দেখিয়া, দুই জন নাপিত (নাউ) আসিয়া তাহাদিগের পদসেবায় প্রবৃত্ত হইল, এবং দুইজন বারকনিতা আসিয়া সেই স্থানে দণ্ডায়মান হইল। উঁহারা এইরূপ সমাগত পথিকগণের সেবা-সুশ্রুষা করিয়া আপনাপন উদরান্নের সংস্থান করিয়া থাকে। নাপিতগণের থাকিবার স্থান সেই সরাইয়ের ভিতর না থাকিলেও, দিনরাত্রি তাঁহারা সকলেই প্রায় সেই স্থানে অবস্থিতি করে; কিন্তু বার-বনিতাগণ সেই সরাইয়ের ভিতরেই একটা একটা ঘর লইয়া, তাহাতেই অবস্থিতি করিয়া থাকে।

আসামীদ্বয়ের সহিত প্রহরীগণ যেস্থানে অবস্থান করিল, তাহার পার্শ্ববর্তী অপর আর একটা কামরাতে হোসেন এবং তাহার ভৃত্যদ্বয় স্থান করিয়া লইলেন।

হোসেন একজন প্রহরীকে কহিলেন, আসামীদ্বয়কে যদি দুইখানি চারিপায়া আনাইয়া দেওয়া হয়, তাহাতে আপনাদিগের কোনরূপ আপত্তি আছে কি?

প্রহরী। আসামী! তাহাতে খুনী মোকদ্দমার আসামী। তাঁহারা চারিপায়ার উপর উপবেশন বা শয়ন করিবে! একথা ইতিপূর্বে আমরা আর কাহারও নিকট শ্রবণ করি নাই, দর্শন করা ত দূরের কথা!

হোসেন। আসামীদ্বয়কে চারিপায়ার উপর বসিতে দিবার নিয়ম নাই বলিতেছেন; কিন্তু যদি চারিপায়া দেওয়া যায়, তাহাতে কোনরূপ ক্ষতি আছে কি?

প্রহরী। ক্ষতি থাক বা না থাক, যদি ইহাদিগকে চারি পায়া দেওয়া যায়, তাহার ভাড়া কে দিবে?

হোসেন। চারিপায়ার ভাড়া যাহা লাগিবে, তাহা আমি দিব।

প্রহরী। আর আমাদিগকে?

হোসেন। ইহার নিমিত্ত আপনাদিগকে কিছু দিতে হইবে কি?

প্রহরী। না দিলে চারিপায়া দিতে দিব কেন?

হোসেন। আচ্ছা তাহাই হইবে। এই অনুগ্রহের নিমিত্ত আমি আপনাদিগকে একটা টাকা প্রদান করিতেছি।

প্রহরী। এক টাকায় হইবে না, যদি আমাদিগের প্রত্যেক কেই একটী করিয়া টাকা দেন, তাহা হইলে উঁহাদিগকে চারি পায়ার উপর বসিতে অনুমতি দিতে পারি।

হোসেন। আচ্ছা, তাহাই দিতেছি।

গোফুর। হোসেন! তুমি এরূপ ভাবে অনর্থক অর্থ ব্যয় করিতেছ কেন?

হোসেন। এ ব্যয় অনর্থক নহে। বলুন দেখি, ইতিপূর্বে আর কখনও আপনার মৃত্তিকায় বসিয়াছেন কি?

গোফুর। এখন আর আমি সেই জমিদার গোফুর খাঁ নহি যে, চারিপায় ভিন্ন বসিতে পারি না।

হোসেন। আপনি এখনও সেই গোফুর খাঁ আছেন, ইহা বেশ জানিবেন।

গোফুর। তাহা হইলে আমাদিগকে এই মিথ্যা মোকদ্দমায় আর ফাঁসি যাইতে হইত না।

হোসেন। আপনি ভাবিবেন না। উপরে কি ভগবান নাই? আপনাদিগকে কখনই ফাঁসি যাইতে হইবে না। আপনার মনকে স্থির করুন, দেখুন, আপনাদিগকে বাঁচাইয়া লইয়া যাইতে পারি কি না। দুই তিন দিবস আপনাদিগের স্নান হয় নাই, আজ স্নান করিবেন কি?

গোঁফুর। আর স্নান করিয়াই বা কি হইবে?

হোসেন। স্নান করিয়া অনেক ফল হইবে। স্নান করিলে শরীরের অনেক গ্লানি দূর হইবে, মস্তিষ্ক শীতল হইবে, তখন একমনে ঈশ্বরকে ডাকিতে সমর্থ হইবেন। এক মনে ঈশ্বরকে ডাকিতে পারিলে কোন বিপদ হয় কি?

গোফুর। প্রহরীরা আমাদিগকে স্নান করিতে দিবে কি?

হোসেন। সে ভার আমার উপর। মেরূপে হয়, আমি তাহার বন্দোবস্ত করিয়া লইতেছি। কেমন গো প্রহরীসাহেব। আপনা দিগের আসামীদ্বয় যদি স্নান করেন, তাহাতে আপনাদিগের, বোধ হয়, কোনরূপ আপত্তি নাই।

প্রহরী। আসামীদ্বয় স্নান করিবে! তাহা কি কখনও হইতে পারে?

হোসেন। কেন হইতে পারিবে না? এখানে আর কে তাহা দেখিতে পাইবে বা কেই বা তাহা শুনিতে পাইবে? ইহার জন্য আপনাদিগের প্রত্যেককে আট আনা এবং স্নানের পরে কিছু জল খাইরার নিমিত্ত, আট আনা করিয়া আমি প্রদান করিতেছি। ইহাতে, এখন বোধ হয়, আপনাদিগের আর কোনরূপ আপত্তি হইবে না।

প্রহরী। কোথায় স্নান করিবে? ইদারার নিকট ইহাদিগকে লইয়া যাইতে দিব না। কারণ, কি জানি যদি ইহার ইদারার ভিতর আত্ম-বিসর্জন করে, তাহা হইলে আমাদিগকে কয়েদ হইতে হইবে।

হোসেন। না, ইহাদিগকে ইদারার নিকট লইয়া যাইব না। যে স্থানে বলিবেন, সেই স্থানে বসিয়াই উঁহারা গান করিবেন।

প্রহরী। জল কোথায় পাইকেন, বা কে আনিয়া দিবে?

হোসেন। আমার সহিত দুইজন পরিচালক রহিয়াছে, এবং আমি নিজে আছি। তদ্ব্যতীত দুই চারি পয়সা দিলেই জল আনিয়া দেওয়ার লোকও পাওয়া যায়। এরূপ অবস্থায় যেস্থানে বলিবেন, সেই স্থানে জল আনাইয়া দিয়া, উঁহাদিগকে স্নান করাইয়া দিব।

প্রহরী। আর আমাদিগকে যাহা দিতে চাহিলেন, তাহা কখন দিবেন?

তাহা আমি এখনই দিতেছি, হোসেন এই বলিয়া চারিপায়া পাইবার, স্নান করিবার এবং কিছু জল খাবার খাইতে পাইবার অনুমতির নিমিত্ত প্রহরীর হস্তে দশ টাকা প্রদান করিলেন। বলা বাহুল্য, ইহার পর উক্ত কয়েকটা বিষয়ের নিমিত্ত প্রহরীগণ আর কোনরূপ আপত্তি করিল না। ভৃত্যগণ ইদারা হইতে জল উঠাইয়া আনিয়া প্রহরীগণের সম্মুখে তাহাদিগকে স্নান করাইয়া দিল। স্নান করিবার পর হোসেন কিছু জল খাবার আনাইলেন; কিন্তু প্রহরীগণ সে জল খাবার উঁহাদিগকে খাইতে না দিয়া কহিল, ইহার ভিতর আপনারা কোনরূপ বিষ প্রদান করিয়াছেন কি না, আমরা তাহা জানি না। সুতরাং আপনাদিগের আনীত জল খাবার ইহাদিগকে কখনই আহার করিতে দিব না। যাহা আনিতে হইবে, তাহা আমাদিগকে বলিয়া দিন এবং তাহার মূল্য আমাদিগকে প্রদান করুন। আমরা নিজে তাহা খরিদ করিয়া আনিয়া, আসামীদ্বয়কে প্রদান করিব।

প্রহরীগণের প্রস্তাবে হোসেন সম্মত হইলেন, এবং জল খাবার আনিবার নিমিত্ত, উঁহাদিগের একজনের হস্তে একটী টাকা প্রদান করিলেন। তাহাতে যে কিছু আহারীয় দ্রব্য আনিয়া আসামীদ্বয়কে প্রদান করা হইল, আসামীদ্বয় তাহা হইতে অতি অল্পই আহার করিলেন। অবশিষ্ট আহারীয় ও পূর্ব-আনীত আহারয় সমুদায়ই প্রহরীদিগের হইল। সেই সকল দ্রব্য আহার করিবার সময়, বিষের কথা আর প্রহরীদিগের মনে উদিত হইল না।

আমি পূর্বেই বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি যে, যে পাঁচজন প্রহরী আসামীদ্বয়কে লইয়া যাইতেছিল, তাঁহারা সকলেই মুসলমান।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

প্রহরীগণ যেরূপ ভাবে সেই সরাইতে বিশ্রাম করিতে লাগিল, তাহাতে তাঁহারা যে শীঘ্র সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবে, এরূপ অনুমান হইল না। একা-চালকগণ তাহাদিগের একার ঘোড়া একা হইতে খুলিয়া দিয়া ঘাস-দানার বন্দোবস্ত করিতে লাগিল।

এই ব্যাপার দেখিয়া হোসেন সেই সর্দ্দার-প্রহরীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আজ কি আপনারা এই স্থানে অবস্থান করিবেন?

প্রহরী। রাত্রিযাপন আমরা এই স্থানে করিব না। এই স্থান হইতে দুই ক্রোশ ব্যবধানে একটা খানা আছে, রাত্রিকালে সেই স্থানেই অবস্থিতি করিতে হইবে।

হোসেন। এক-চালকগণ যেরূপ ভাবে একা চালাইয়া আসি তেছে, তাহাতে দুই ক্রোশ পথ গমন করিতে অতি অল্প সময়েরই প্রয়োজন হইবে।

প্রহরী। এই স্থান হইতে বাহির হইলে, একঘণ্টার মধ্যেই আমরা সেই থানায় গিয়া অনায়াসেই উপস্থিত হইতে পারি।

হোসেন। আপনারা এই স্থান হইতে কখন রওনা হইতে চাহেন?

প্রহরী। একটু বিশ্রাম করিবার পরই, আমরা এই স্থান হইতে প্রস্থান করিব।

হোসেন। আপনাদিগের আহারাদির বন্দোবস্ত কোথায় হইবে?

প্রহরী। থানায় গিয়া উপস্থিত হইবার পর, সেই স্থানেই আহারাদি করিব, এরূপ বিবেচনা করিতেছি।

হোসেন। এই স্থানে দেখিতেছি, সমস্ত দ্রব্যই পাওয়া যায়। এই স্থান হইতে আহারাদি করিয়া, থানায় গমন করিলে হইত না কি?

প্রহরী। তাহা হইলে আমরা কখন থানায় গিয়া উপস্থিত হইতে পারি?

হোসেন। আহারাদির পর একটু বিশ্রাম করিয়া যদি আমরা এই স্থান হইতে রওনা হই, তাহা হইলে সন্ধ্যার পূৰ্বেই দুই ক্রোশ পথ অনায়াসেই অতিক্রম করিতে পারি। সন্ধ্যার পূর্বেই যদি আপনারা আসামীর সহিত থানায় গিয়া উপস্থিত হইতে পারেন, তাহা হইলে বোধ হয়, কোনরূপ ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা নাই।

প্রহরী। ক্ষতি কিছুই নাই; কিন্তু এখানে থাকিয়া আমা দিগের লাভ কি?

হোসেন। লাভ আর কিছুই নহে, কেবল সময় মত আহার করিয়া লইতে পারিবেন।

প্রহরী। এখানে আহারাদি করিবার কি সুবিধা হইবে?

হোসেন। না হইবে কেন? এখানে দেখিতেছি, সমস্ত দ্রব্যই পাওয়া যায়।

প্রহরী। এখানে আহারাদি প্রস্তুত করার পক্ষে নিতান্ত অসুবিধা হইবে।

হোসেন। কিসে?

প্রহরী। মোটে আমরা পাঁচজন বই প্রহরী নই। আমরা সকলেই এখন পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছি। ইহার মধ্যে আসামী দ্বয়কে পাহারাই বা কে দিবে, আহারাদির আয়োজনই বা কে করিবে?

হোসেন। আপনি যদি অনুমতি করেন, তাহা হইলে আমরাই সমস্ত আয়োজন করিয়া দিতে প্রস্তুত আছি।

প্রহরী। কে রন্ধন করিবে?

হোসেন। আমি আছি, আমার দুইজন পরিচারকও রহি আছে। অনুমতি পাইলে আহারীয় প্রস্তুত করিতে আর কত বিলম্ব হইবে?

প্রহরী। তোমাদিগের প্রস্তুত করা আহারীয় দ্রব্য আমরা কিরূপে আহার করিতে পারি?

হোসেন। কেন?

প্রহরী। আমি শুনিয়াছি, বহুদিবস হইল, এইরূপ একটী ঘটনা ঘটিয়াছিল। একজন কয়েদী-আসামীকে লইয়া দুইজন প্রহরী গমন করিতেছিল। যাইতে যাইতে পথে অপর আর একজন লোক আসিয়া তাহাদিগের সহিত মিলিত হয়। সেই ব্যক্তি সেই আসামীর দলস্থিত একজন; কিন্তু এ পরিচয় সে পূর্বে সেই প্রহরীদ্বয়ের নিকট প্রদান করে নাই। ক্রমে তাঁহারা এইরূপ একটী সরাইতে আসিয়া উপস্থিত হয়, এবং সেই ব্যক্তিই সকলের আহারীয় প্রস্তুত করে। প্রথমে আসামীকে আহার করান হয়, কিন্তু তাহাতে তাহার কোনরূপ অসুখ হয় না। পরিশেষে প্রহরীদ্বয় আহার করিতে বসে, কিন্তু আহার করা শেষ হইতে না হইতেই উভয়েই হতজ্ঞান হইয়া পড়ে। পরে সরাইয়ের লোজন যখন জানিতে পারে যে, দুইজন প্রহরী অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে, তখন তাঁহারা সেই স্থানে গমন করে; কিন্তু সেই কয়েদী-আসামী এবং আহার-প্রস্তুতকারীকে আর তাঁহারা দেখিতে পায় না। এই সংবাদ ক্ৰমে থানায় গিয়া উপ স্থিত হয়। প্রহরীদ্বয়কে হাসপাতালে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। থানাদার নিজে আসিয়া এই ঘটনার সবিশেষ অনুসন্ধান করেন। কিন্তু অনুসন্ধানে কোন ফলই পাওয়া যায় না। উভয় ব্যক্তির মধ্যে কেহই ধৃত হয় না। অধিকন্তু প্রহরীগণ চৈতন্য লাভ করিলে জানিতে পারা যায় যে, তাহাদিগের নিকট যে সকল টাকা-পয়সা ছিল, তাহার সমস্তই অপহৃত হইয়াছে। ইহা যখন প্রকৃত ঘটনা বলিয়া সকলেই অবগত আছেন, তখন বলুন দেখি, আমরা কিরূপে আপনাদিগকে বিশ্বাস করিয়া আপনাদিগকে রন্ধন করিতে অনুমতি প্রদান করিতে পারি?

হোসেন। আপনি যাহা বলিতেছেন, তাহা প্রকৃত। কিন্তু আপনারা আমাকে পূর্ব হইতে জানেন কি না, বলিতে পারি না। যদি আমাকে পূর্ব হইতে জানিতেন, তাহা হইলে আপ

আমাকে বোধ হয়, এতদূর অবিশ্বাস করিতে পারিতেন না। সে যাহা হউক, আপনারা যদি আমাকে বিশ্বাস করিতেই

পারেন, তাহা হইলে অপর আর কোনরূপ বন্দোবস্ত হইতে পারে না কি? অপর যেরূপ বন্দোবস্ত করিতে বলেন, আমরা সেইরূপ করিতেই প্রস্তুত আছি।

প্রহরী। আর কি বন্দোবস্ত হইতে পারে?

হোসেন। আমরা আর সমস্ত ঠিক করিয়া দিতেছি, আপনা দিগের এক ব্যক্তি অনায়াসেই পাক করিয়া লইতে পারেন।

প্রহরী। আমরা সকলেই অতিশয় ক্লান্ত। সুতরাং আমা দিগের মধ্যে কাহারও দ্বারা সেই কাৰ্য যে সম্পন্ন হইতে পারিবে, তাহা আমি বোধ করি না।

হোসেন। যদি এ কাৰ্য্য আপনাদিগের দ্বারা না হয়, তাহা হইলে আপনাদিগের মধ্যে একজন যদি রন্ধনশালার নিকট উপস্থিত থাকিতে পারেন, তাহা হইলে আমার সমভিব্যাহারী একজন লোকের দ্বারা আমি কাৰ্য্য করাইয়া লইতে পারি। আপনাদিগের সম্মুখে যদি আহারীয় প্রস্তুত হয়, তাহা হইলে আমরা উহাতে কিরূপে বিষ মিশ্রিত করিতে পারিব?

প্রহরী। অত গোলযোগে কায নাই। আমরা একরূপ জলযোগ করিয়াছি, এখন আর আহার করিবার ইচ্ছা নাই। সুতরাং আহারীয় প্রস্তুত করিবার আর প্রয়োজন কি? আপ নারা ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে আহারাদি প্ৰস্তুত করিয়া অনায়াসেই আহার করিতে পারেন।

হোসেন। আমি আমাদিগের আহারের নিমিত্ত বলিতেছি না। আপনারা যে আসামীদ্বয়ের সহিত আসিয়াছেন, তাঁহাদিগের আজ কয়েকদিবস হইতে আহার হয় নাই; কোন দিন অনাহারে, কোন দিন জলাহারে, দিন অতিবাহিত করিয়া আসিতেছেন। ইহাদিগের অদৃষ্টে যাহা আছে, তাহা পরে হইবে; কিন্তু এখন আমাদিগের ইচ্ছ, উঁহাদিগকে কিছু আহার করাই। এই নিমিত্ত আপনাদিগকে এত অনুরোধ করিতেছি।

প্রহরী। উঁহারা ত এখনই আহার করিলেন?

হোসেন। বাজারের মিষ্ট দ্রব্যাদি ভোজন করিয়া কোন্ ব্যক্তি কয় দিবস জীবনধারণ করিতে পারে?

প্রহরী। যখন আপনারা আহারাদি প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত এতই ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, তখন আমার সম্মুখে আপনারা আমা দিগের সকলের আহারীয় প্রস্তুত করুন। আহারীয় প্রস্তুত করি বার সময় আমি অনায়াসেই বুঝিতে পারি যে, ইহাতে আপনা দিগের কোনরূপ দুরভিসন্ধি আছে কি না।

হোসেন। এ উত্তম কথা।

উভয়ের মধ্যে এইরূপ কথাবার্তা হইবার পর, হোসেন নিজের অর্থ ব্যয় করিয়া সকলের আহারাদির উদ্যোগ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

একজন প্রহরীর তত্ত্বাবধানে সময়মত আহারীয় দ্রব্য সকল প্রস্তুত হইল। তখন হোসেন কহিলেন, এখন আহারীয় প্রস্তুত হইয়াছে, অনুমতি হইলে সকলেই ভোজন করিয়া লইতে পারেন।

প্রহরী। সকলের ভোজন একবারে হইতে পারে না। প্রথমে তোমরা ভোজন কর, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।

হোসেন। আমরা অগ্রে ভোজন করিব কেন? আপনাদিগের আহারাদি হইয়া গেলে, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।

প্রহরী। তাহা হইতে পারিবে না। তোমরা অগ্রে ভোজন করিলে, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।

হোসেন। যদি আপনারা নিতান্তই অগ্রে ভোজন না করেন, তাহা হইলে সকলেই এক সময় ভোজন করা যাউক। আপনারা থাকিতে আমরা কিরূপে অগ্রে খাইতে পাক্সি?

প্রহরী। তাহাও হইতে পারে না।

হোসেন। কেন?

প্রহরী। তোমরা ভোজন করিলে, তাহার পর তোমাদিগের কিরূপ অবস্থা হয়, তাহা অগ্রে দেখিয়া, পরিশেষে আমরা ভোজন করিব।

হোসেন। আপনার এ কথার অর্থ ত আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না।

প্রহরী। বুঝিতে না পারিয়া থাকেন, আমি বুঝাইয়া দিতেছি। আমাদিগের তত্ত্বাবধানে আপনারা আহারীয় দ্রব্য প্রস্তুত করিয়াছেন সত্য; কিন্তু আমাদিগের অলক্ষিতে আপনারা উহার সহিত অনায়াসেই বিষ মিশ্রিত করিয়া দিতে পারেন। প্রথমে আপনারা আহার করিলেই, আমরা জানিতে পারি যে, সেই সকল আহারীয় দ্রব্যের সহিত কোনরূপ বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত আছে কি না। আহারান্তে যদি আপনাদিগের কোনরূপ বৈলক্ষণ না ঘটে, তাহা হইলে আমরা সহজেই অনুমান করিতে পারিব যে, উহার সহিত কোনরূপ বিষাক্ত ব্য মিশ্রিত নাই। ইহার পর আর আপনাদিগকে আহারীয় দ্রব্যের নিকট গমন করিতে দিব না। আমরা নিজ হস্তে সেই সকল দ্রব্য পরিবেশন করিয়া আহার করিব।

হোসেন। আপনার এ কথায় আমাদিগের কোন উত্তর নাই। আমরা আহারীয় দ্রব্যর নিকট আর গমনই করিব না। আপনারা উহা হইতে কিছু কিছু আমাদিগকে প্রদান করুন, আমরা দূরে বসিয়া আহার করি। আমরা আপনাদিগের আদেশ প্রতিপালন করিব মাত্র। কিন্তু আপনাদিগকে এবং মনিবদ্বয়কে পরিত্যাগ করিয়া, পরিতুষ্টির সহিত কখনই আহার করিয়া উঠিতে পারিব না।

ইহার পর হোসেনের প্রস্তাব-মতই কাৰ্য্য হইল। হোসেন ও তাহার পরিচারকদ্বয় দূরে আহার করিতে বসিলেন; একজন প্রহরী তাহাদিগকে পরিবেশন করিলেন। প্রহরীগণ যখন দেখিল, হোসেন বা তাহার পরিচারকদ্বয় সেই সকল দ্রব্য আহার করিয়া সুস্থ শরীরে রহিলেন, তখন তাঁহারা তাহাদিগের নিজের আহারের উদ্যোগ করিতে লাগিল। কিন্তু আসামীদ্বয় আহার করিবে কি না, সে সম্বন্ধে কোন কথাই কহিল না। তখন হোসেন কহিলেন, আপনাদিগের আহারের উদ্যোগ হইতেছে; কিন্তু আসামীদ্বয় কখন আহার করিবেন?

প্রহরী। আসামীদ্বয়েরও কি আহারীয় প্রস্তুত করিয়াছেন?

হোসেন। উঁহারাই আহার করিবেন বলিয়া, সকলের নিমিত্ত আহারীয় আমরা প্রস্তুত করিয়াছি। নতুবা আমাদিগের আহারীয় প্রস্তুত করিবার কোনরূপ প্রয়োজনই ছিল না।

প্রহরী। উহার ফাঁসি যাইবার আসামী। উঁহাদিগকে আমরা কিরূপে আহার করিতে অনুমতি দিতে পারি?

হোসেন। যাহাদিগকে ফাঁসি দিবার হুকুম হয়, ফাঁসির পূর্বে যে কয় দিবস তাঁহারা বাঁচিয়া থাকে, সে কয় দিবস কি তাহাদিগকে আহার করিতে দেওয়া হয় না। যদি সরকারের এরূপ কোন নিয়ম থাকে, তাহা আমি অবগত নহি। বরং লোক-পরম্পরায় শুনিতে পাওয়া যায়, ফঁসি যাইবার পূর্বে ফাঁসির আসামী যাহা খাইতে চাহে, সরকার হইতে তাহাই তাহাকে খাইতে দেওয়া হয়। সে যাহা হউক, এত পরিশ্রম করিয়া যখন আমরা আহারীয় প্রস্তুত করিয়াছি, তখন উঁহাদিগকে কিছু আহার করিতে দিয়া আমাকে সবিশেষরূপ অনুগৃহীত করুন।

প্রহরী। উঁহারা আহার করুন, বা না করুন, তাহাতে আপনার ক্ষতি-বৃদ্ধি কি?

হোসেন। ক্ষতি নাই? খুব ক্ষতি আছে। যিনি আমার অন্নদাতা, তিনি আহার করিতে পাইবেন না, আর আমরা আহার করিয়া বসিয়া আছি! ইহা অপেক্ষা দুঃখের বিষয় আর কি হইতে পারে? আমি আপনাদিগকে সবিশেষরূপ অনুবোধ করি তেছি, উঁহাদিগের আহার করিতে দিবার পক্ষে কোনরূপ প্রতি। বন্ধক হইবেন না। উঁহারা যেরূপ মনঃকষ্টে আছেন, তাহাতে যে আহার করিতে পারিবেন, সে ভরসা আমার নাই; তবে আহার করিতে বসিয়াছেন, ইহা দেখিলেই আমার মনটা একটু সন্তুষ্ট হইবে, এই মাত্র। এই অনুগ্রহের নিমিত্ত যদি আপনাদিগের আরও কিছু লইবার প্রত্যাশা থাকে, তাহাও আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারেন।

প্রহরী। যখন আপনি এরূপ ভাবে অনুরোধ করিতেছেন, তখন আপনার অনুবোধই বা রক্ষা না করি কি প্রকারে? তবে জানেন কি, আমরা পেটের দায়ে চাকুরী করিতে আসিয়াছি, তাই আপনাকে বলিতেছি।

হোসেন। ইহার জন্য এত গোলযোগ করিবার প্রয়োজন কি? আপনারা যখন যাহা চাহিতেছেন, আমি তখনই তাহা আপনা দিগকে প্রদান করিতেছি। প্রথমেই এ কথা আমাকে বলিতে পারিতেন! আপনাদিগের প্রস্তাবে যদি আমি সম্মত হইতে পারি তাম, তাহা হইলে উঁহাদিগের নিমিত্ত আহারীয় প্রস্তুত করিতাম, আর যদি সেই প্রস্তাব আমার সাধ্যাতীত হইত, তাহা হইলে আপনাদিগকে সেলাম করিয়া আমি ধীরে ধীরে প্রস্থান করিতাম। আচ্ছা, এখন বলুন দেখি, উঁহাদিগকে আহার করিবার অনুমতি দিবার নিমিত্ত আপনারা কি প্রার্থনা করেন?

প্রহরী। পঁচিশ টাকা।

হোসেন। আপনারা পাচজন আছেন, আপনাদিগের প্রত্যেক কেই পঁচিশ টাকা করিয়া আমাকে প্রদান করিতে হইবে?

প্রহরী। না, মোট পচিশ টাকা প্রদান করিলেই হইবে।

হোসেন। পঁচিশ টাকা আমি প্রদান করিতে পারিব না। আপনারা পাঁচজন আছেন, প্রত্যেককে দুই টাকা হিসাবে মোট আপনাদিগকে আমি দশ টাকা প্রদান করিতেছি। ইহাতে আপ নারা সম্মত হইয়া আসামীদ্বয়কে আহার করিবার নিমিত্ত অনুমতি প্রদান করেন ভালই, নতুবা আমি এ স্থান হইতে প্রস্থান করি তেছি, আপনাদিগের মনে যাহা উদয় হয়, তাহা করিবেন।

প্রহরী। আপনাকে আর প্রস্থান করিতে হইবে না। দশ টাকা নিতান্ত অল্প হইতেছে, আর পাঁচটী টাকা বাড়াইয়া দিন।

হোসেন। পাঁচ টাকা ত দূরের কথা, দশ টাকার উপর আমি আর পাঁচটা পয়সাও, বাড়াইয়া দিতে পারিব না। ইহাতে আপনা দিগের যাহা অভিরুচি হয়, তাহা করিতে পারেন।

প্রহরী। যে কাৰ্যে আপনারা অসন্তুষ্ট হন, সে কাৰ্য্য আমা দিগের কোনরূপেই কৰ্তব্য নহে। আচ্ছা, আপনার প্রস্তাবেই আমরা সম্মত হইলাম। টাকা দশটী কথন প্রদান করিবেন?

হোসেন। যখন আপনাদিগের আবশ্যক হইবে, তখনই আপনারা লইতে পারেন। এখনই চাহেন, তাহাও আমাকে বলুন, এখনই আমি উহা আপনাদিগের হস্তে প্রদান করিতেছি।

প্রহরী। সেই ভাল। আমি একাকী নহি, পাঁচজনের কাৰ্য্য, অগ্রে দেওয়াই ভাল।

প্রহরীর কথা শুনিয়া হোসেন আর কোন কথা কহিলেন, দশটী টাকা বাহির করিয়া তৎক্ষণাৎ সেই প্রহরীর হস্তে প্রদান করিলেন।

হোসেন টাকা প্রদান করিলেন সত্য; কিন্তু মনে মনে বড়ই অসন্তুষ্ট হইলেন। মনে করিলেন, এরূপ অত্যাচার করিয়া টাকা লওয়া নিতান্ত অন্যায়। আসামীর সহিত কথা কহিবার প্রয়োজন হইলে টাকা ভিন্ন হইতে পারিবে না! স্নানের নিমিত্ত টাকা, জলপানের নিমিত্ত টাকা, আহারের নিমিত্ত টাকা, এবং বিশ্রাম করিবার নিমিত্ত একখানি চারিপায়া প্রদান করিতে হইলেও টাকা! কি ভয়ানক অত্যাচার! এই সকল অত্যাচারের নিমিত্তই পুলিসের এত দুর্নাম।

হোসেন মনে মনে এইরূপ ভাবিতে লাগিলেন সত্য; কিন্তু প্রকাশ্যে কোন কথা কহিতে পারিলেন না।

গোফুর খাঁ ও ওসমান, প্রথমতঃ কিছুতেই আহার করিতে সম্মত হইলেন না। কিন্তু কোন প্রকারেই হোসেনের অনুরোধ লম্বন করতে না পারিয়া, আহার করিবার নিমিত্ত একবার বসিলেন মাত্র; ফলতঃ আহার করিতে পারিলেন না, চক্ষু-জলে আহারীয় ভাসিয়া যাইতে লাগিল।

আহারান্তে প্রহরীগণ আপনাপন চারিপায়ার উপর শয়ন করিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিল। কেবল একজন মাত্র প্রহরী আসামীদ্বয়কে পাহারা দিতে লাগিল। আসামীদ্বয় সেই গৃহের ভিতর কয়েদী অবস্থায় বিষন্ন মনে বসিয়া রহিলেন।

এইরূপে প্রায় সমস্ত দিবস সেই স্থানে অতিবাহিত হইয়া গেল। সন্ধ্যা হইতে অতি অল্পমাত্র বাকী আছে, সেই সময় একজন প্রহরী এক্কা-চালকগণকে ডাকিল ও কহিল, বেলা প্রায় অবসন্ন হইয়া আসিয়াছে। এখনও অনেকদূর আমাদিগকে গমন করিতে হইবে, আর বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই। একা সকল শীঘ্র প্রস্তুত করিয়া আন, আমরা এখনই এই স্থান হইতে প্রস্থান করিব।

প্রহরীর কথা শুনিয়া এক্কা-চালকগণ তখনই এ প্রস্তুত করিয়া আনিল। প্রহরীগণ আসামীদ্বয়ের সহিত উহাতে আরোহণ করিল, হোসেনও আপনার দুইজন পরিচারকের সহিত আপন একায় আরোহণ করিয়া তাহাদিগের এক্কার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। এক্কা-চালকগণ অখে কষাঘাত করিতে করিতে বেগে একা চালাইতে আরম্ভ করিল।

সন্ধ্যার অল্প পরেই সকলে একটী থানায় গিয়া উপস্থিত হইল। সেই স্থানে সকলে একা হইতে অবতরণ করিয়া থানার ভিতর প্রবেশ করিলেন। থানায় সেই সময় দারোগা উপস্থিত ছিলেন না, কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে তিনি স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলেন। অনুসন্ধানে হোসেন জানিতে পারিলেন যে, সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্ম্মচারী অর্থাৎ দারোগাও একজন মুসলমান বংশ-সম্ভূত।

যে সকল এক্কায় আরোহণ করিয়া আমাশয়, প্রহরীগণ ও হোসেন প্রভৃতি গমন করিয়াছিলেন, এখন সেই সকল এক বিদায় করিয়া দিবার প্রয়োজন হইল। কারণ, তাঁহারা অনেকদূর আগমন করায়, তাহাদিগের অশ্বগণ সবিশেষরূপ ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে। তদ্ব্যতীত সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবার সময় সেই স্থানে যতগুলি একার প্রয়োজন হইবে, ততগুলিই অনায়াসে পাওয়া যাইবে।

এইরূপ বন্দোবস্ত দেখিয়া, যে এক্কায় হোসেন তাহার ভৃত্য দ্বয়ের সহিত আগমন করিয়াছিলেন, তাহাকে ভাড়া দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন। সেই এক্কা-চালককে যে পরিমিত ভাড়া দিবার নিমিত্ত প্রহরীগণ বলিয়া দিল, হোসেন তাহাতে দ্বিরুক্তি না করিয়া তাহাই দিয়া দিলেন। একা-চালক আপনার ভাড়া পাইয়া থানার বাহিরে গিয়া উপবেশন করিল।

কেবলমাত্র একখানি এক্কার ভাড়া দিতে দেখিয়া একজন প্রহরী কহিল, আপনি কেবলমাত্র একখানি একার ভাড়া দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন দেখিতেছি। আর অপর এক্কা তিনখানি, যাহাতে আপনার মনিবদ্বয় এবং আমরা আসিয়াছি, তাহার ভাড়াও ওই সঙ্গে দিলেন না কেন?

হোসেন। আপনাদিগের একা-ভাড়া প্রভৃতি যাহা কিছু ব্যয় হইবে, তাহার নিমিত্ত আমি এককালীন আপনাদিগকে পঞ্চাশ টাকা প্রদান করিয়াছি। তাহা হইতে একা-ভাড়া প্রদান করিতে আপনাদিগের কোনরূপ আপত্তি আছে কি?

প্রহরী। আপত্তি আর কিছুই নাই, তবে এখন আপনি দিয়া দিলেও কোন ক্ষতি নাই।

হোসেন। আমি একবার প্রদান করিয়াছি। বলেন না হয়, আর একবার প্রদান করি। যখন আমরা সম্পূর্ণরূপে আপনাদিগের হাতে পড়িয়াছি, তখন যাহা বলিবেন, তাহাই করিতে হইবে।

প্রহরী। আপনি অসন্তুষ্ট হইবেন না। একা-ভাড়া এখন আপনি প্রদান করুন, বা আমরা প্রদান করি, তাহাতে কোনরূপ ক্ষতি নাই। কারণ, আমাদিগের নিকট আপনার যে পঞ্চাশ টাকা আছে, খরচ-পত্ৰ বাদে তাহা হইতে যাহা অবশিষ্ট থাকিবে, তাহা আপনারই। আর যদি উহাতে সমস্ত খরচের সঙ্কুলান না হয়, তাহা হইলে আর যাহা লাগিবে, তাহা আপনাকে দিতে হইবে। এরূপ অবস্থায় সামান্য একা-ভাড়ার নিমিত্ত এত গোলযোগ করিতেছেন কেন?

হোসেন। আমি কোনরূপ গোলযোগই করিতেছি না। যে টাকা আপনাদিগের নিকট আছে, তাহা হইতে এক্কা-ভাড়া প্রদান করিতে যদি আপনাদিগের কোনরূপ অসুবিধা হয়, তাহা হইলে এখনই আমি উহা প্রদান করিতেছি।

প্রহরী। অসুবিধা আর কিছুই নয়। তবে টাকাগুলি যেরূপ ভাবে বাঁধিয়া রাখা আছে, তাহা হইতে কিছু টাকা বাহির করিয়া লইতে হইলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। তাই যাহাতে এক্কা ওয়ালাগণের আর বিলম্ব না হয়, সেই নিমিত্ত ভাড়াটা এখন আপ, নাকে দিতে বলিয়াছিলাম। ইহাতে আমাদিগের কোনরূপ দুরভিসন্ধি নাই।

হোসেন। সামান্য টাকার নিমিত্ত আর অধিক কথার প্রয়ো জন নাই। আমি এখন উহা প্রদান করিতেছি, যেরূপ ভাল বিবেচনা হয়, পরিশেষে আপনারা তাহা করিবেন।

এই বলিয়া হোসেন আর তিনখানি একার ভাড়াও আপনার নিকট হইতে উঁহাদিগকে দিয়া দিলেন।

আপনাপন ন্যায্য মজুরি বুঝিয়া লইয়া একাওয়ালাগণ সেই স্থান হইতে তখনই প্রস্থান করিল।

প্রহরীগণের ব্যবহার দেখিয়া হোসেন মনে মনে ভাবিলেন, উঁহাদিগের খরচের নিমিত্ত যে পঞ্চাশ টাকা দেওয়া হইয়াছে, তাহা পাইবার আর কোনরূপ উপায় নাই। অথচ আরও যাহা কিছু খরচ হইবে, তাহার সমস্তই তাঁহাকে বহন করিতে হইবে।

এই সময় গোফুর খাঁ হোসেনকে তাহার নিকট ডাকিলেন। হোসেন তাহার নিকট গমন করিলে তিনি কহিলেন, হোসেন। আমি দেখিতেছি, তুমি নিরর্থক অনেক অর্থ নষ্ট করিতেছ।

হোসেন। আপনাদিগের জীবন অপেক্ষা কি অর্থের মূল্য অধিক? যে আপনাদিগের নিমিত্ত আমি সেই অর্থ ব্যয় করিব না?

গোফুর। আমাদিগের জীবন রক্ষার নিমিত্ত অর্থ ব্যয় করিতে আমাদিগের কিছুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু এইরূপ নিরর্থক অর্থ ব্যয় করিয়া কি আমাদিগের জীবন রক্ষা করিতে পারিবে?

হোসেন। এরূপ ভাবে অর্থ ব্যয় করিয়া, আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে পারি না সত্য; কিন্তু আপাততঃ আপনাদিগের কষ্টের অনেক লাঘব করিতে সমর্থ হইব।

গোফুর। যাহাদিগের জীবনের আর কিছুমাত্র আশা নাই, দুই চারিদিবসের নিমিত্ত তাহাদিগের শারীরিক কষ্ট নিবারণ করিয়া ফল কি? মানসিক কষ্টের নিকট শারীরিক কষ্ট কিছুই নহে। যে ব্যক্তি সর্বদা মানসিক কষ্ট ভোগ করিতেছে, তাহার যতই কেন শারীরিক কষ্ট হউক না, তাহার দিকে তাহার লক্ষ্যই হয় না।

হোসেন। আপনি যাহা বলিতেছেন, তাহা প্রকৃত। কিন্তু আমাদিগের সম্মুখে আপনি শারীরিক কষ্ট ভোগ করিবেন, অর্থ থাকিতে আমরা কিরূপে উহা দেখিতে সমর্থ হইব? আর আপনাদিগের জীবনের আশা নাই, এ কথাই বা আপনারা কিরূপে অনুমান করিলেন?

গোফুর। যাহার ফাঁসির হুকুম হইয়াছে, তাহার আর জীবনের আশা কি?

হোসেন। এখনও অনেক আশা আছে। যে বিচারালয় হইতে আপনাদিগের ফাঁসির হুকুম হইয়াছে, তাহার উপর বিচারালয় আছে। সেখানে আপীল করিব, যেরূপ ভাবে ও যত অর্থ ব্যয় করিয়া চেষ্টা করিতে হয়, তাহা করিব। ইহাতে কি কোনরূপ ফল প্রাপ্ত হইব না? ঈশ্বর না করুন, যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে ছোট লাটকে ধরিব; আবশ্যক হইলে বড় লাটের নিকট পর্যন্ত গমন করিব। পরিশেষে বিলাত পর্যন্ত চেষ্টা করিব। ইহাতেও কি সুবিচার হইবার সম্ভাবনা নাই? যদি ইহাতেও না পারি, তাহ হইলে অর্থ ব্যয় করিয়া, আপনাদিগের জীবনের নিমিত্ত অসৎ উপায় অবলম্বন করিতে ক্রটি করিব না। আপনি আপনার মনকে স্থির করিয়া রাখুন। দেখিবেন, যেরূপ উপায়েই হউক, কখনই আপনাদিগকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিতে দিব না।

গোফুর। তুমি যাহা মনে করিতেছ, তাহা সম্পূর্ণরূপ অসম্ভব। ইহা কখনই হইতে পারে না।

হোসেন। জগতে অসম্ভব কিছুই নাই; অর্থে না হইতে পারে, এরূপ কোন কাৰ্য্যই নাই। দেখিবেন, যাহা মুখে বলিতেছি, কাৰ্যে তাহা পরিণত করিতে পারি কি না!

গোফুর। আমার বিবেচনায় তুমি আর নিরর্থক অর্থ ব্যয় করিও না। আমাদিগের নিমিত্ত এইরূপ ভাবে যে অর্থ ব্যয় করিবে, তাহা আমাদিগের নামে দরিদ্র ব্যক্তিকে দান করিও। তাহা হইলে আমাদিগের পরকালের অনেক উপকার করা হইবে। ইহকালে যাহা হইবার, তাহা হইল।

হোসেন। গরিব-দুঃখীকে আপনারা যেরূপ ভাবে অর্থ দান করিতে কহিবেন, তাহা আমরা করিব। তদ্ব্যতীত আপনাদিগের জীবন-রক্ষা করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে চেষ্টা করিতে ক্রটি করিব না। বিশেষ–

গোফুর। বিশেষ কি?

হোসেন। এরূপ ভাবে অর্থ আমি যে নিজের ইচ্ছামত ব্যয় করিতেছি, তাহা নহে। আপনার বাড়ীর স্ত্রীলোকগণ সকলেই আপনাদিগের জীবনের নিমিত্ত তাহাদিগের সঞ্চিত সমস্ত অর্থ ও তাঁহাদিগের সমস্ত অলঙ্কার-পত্র পর্যন্ত আমার হস্তে প্রদান করিতে উদ্যত হইয়াছেন, এবং বলিতেছেন, যদি কোনরূপে আমি আপনা দিগের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ না হই, তাহা হইলে তাঁহারা সকলেই বিষপান করিয়া আপনাপন জীবন নষ্ট করিবেন। আমি যদিচ এখন তাঁহাদিগের নিকট হইতে কোন অর্থ গ্রহণ করি নাই, তথাপি যদি আমি এইরূপ ব্যয় করিয়া আপনাদিগের জীবন রক্ষার কোনরূপ উপায় না করি, তাহা হইলে কি সর্বনাশ ঘটিবে, একবার মনে করিয়া দেখুন দেখি? : গোফুর। বাড়ীর স্ত্রীলোকগণ যখন আমাদিগের জীবনের নিমিত্ত এত উৎসুক, তাঁহাদিগের নিমিত্ত কিরূপ বন্দোবস্ত করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন?

হোসেন। সে সম্বন্ধে আমি এ পর্যন্ত কিছুই মনে ভাবি নাই। কারণ, আমার বিশ্বাস, এ সম্বন্ধে আমার কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার প্রয়োজন হইবে না!

গোফুর। কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার প্রয়োজন হইবে না কেন?

হোসেন। যখন আমার বিশ্বাস যে, যেরূপে পারি, আপনা দিগের জীবন রক্ষা করিব, তখন আমার সেই সকল দিকে এখন দৃষ্টি করিবার কোনরূপ প্রয়োজন নাই। যেরূপ ভাবে এ পর্যন্ত চলিয়া আসিতেছে, এখন সেইরূপ ভাবেই চলুক। পরিশেষে আপনারা নিষ্কৃতি লাভ করিয়া যখন বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করিবেন, সেই সময় আপনার যেরূপ অভিরুচি হয়, সেইরূপ করিবেন।

গোফুর। সে বহুদূরের কথা।

হোসেন। আমি দিব্য চক্ষে দেখিতে পাইতেছি, উহা দূরের কথা নহে।

গোফুর। সে পরের কথা। আমাদিগকে বাঁচাইতে পারিবে, এরূপ লুব্ধ আশ্বাসের উপর একবারে নির্ভর করিয়া থাকিও না। আমাদিগকে খালাস করিবার যতদূর চেষ্টা করিতে হয়, কর; অথচ অপরাপর বন্দোবস্তের দিকেও সবিশেষরূপ দৃষ্টি রাখিও। কারণ, যদি আমাদিগের জীবন রক্ষাই না হয়, তাহা হইলে আমি বাঁচিয়া থাকিতে থাকিতে আমার ইচ্ছামত বিষয়-আদির বন্দোবস্ত করার আবশ্যক। জমিদারী সম্বন্ধে কিরূপ বন্দোবস্ত করিতে ইচ্ছা করিতেছ?

হোসেন। এখনও কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার চেষ্টা করি নাই। যেরূপ আদেশ করিবেন, সেইরূপ ভাবেই বন্দোস্ত করিব।

গোফুর। মোকদ্দমা খরচের নিমিত্ত যে টাকা সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছ, সেই টাকার নিমিত্ত জমিদারীর কোন অংশ নষ্ট করিতে হইয়াছে কি?

হোসেন। টাকার নিমিত্ত জমিদারীর কোন অংশ আমি নষ্ট করি নাই, বা উহা বন্ধক দিতেও হয় নাই। সরকারী তহবিলের যে যে স্থানে যে যে টাকা মজুত ছিল, তাহাই সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছি মাত্র। যদি কিছু দেনা হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার নিমিত্ত বিষয়-আদি কিছুই বন্ধক দিতে হইবে না। সমস্ত জমিদারী এ পর্যন্ত যেরূপ ভাবে ছিল, এখনও সেইরূপ ভাবেই আছে।

হোসেন ও গোফুর খাঁর সহিত এইরূপ কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময়ে একজন প্রহরী আসিয়া আসামীদ্বয়কে হাজতের ভিতর বদ্ধ করিয়া দিল। সুতরাং উভয়ের কথাবার্তা সেই সময়ের নিমিত্ত শেষ হইয়া গেল। আসামীদ্বয় সবিশেষ দুঃখিত অন্তঃকরণে হাজতের ভিতর প্রবেশ করিলেন।

সম্পূর্ণ।

(দারোগার দপ্তর ৭৫ম সংখ্যা)
(অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত!)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। আষাঢ়।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.

ঘর-পোড়া লোক।
 (মধ্যম অংশ)
প্রথম পরিচ্ছেদ।

হোসেনের কথা শুনিয়া দারোগা সাহেব কহিলেন, আপনি কি অবস্থা শুনিয়াছেন বলুন দেখি, আমিও শ্রবণ করি।

বোগা সাহেবের কথার উত্তরে হোসেন কহিল, ওসমানের চরিত্র আপনি উত্তমরূপেই অবগত আছেন, এবং তাহার চরিত্র সম্বন্ধে আপনি যাহা কহিলেন, তাহার একবিন্দুও মিথ্যা নহে। যে মৃতদেহ গোফুর খাঁর বাড়ীতে পাওয়া গিয়াছে, তাহা যে হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ, সে সম্বন্ধে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। শুনিয়াছি, সেই কন্যাটা বেশ রূপবতী ছিল। তাহার রূপের কথা জমে ওসমানের কর্ণগোচর হইল। যুবতী রূপবতী স্ত্রীলোকের কথা শুনিয়া তিনি আর কোনরূপে স্থির থাকিতে পারিলেন না, তাহার নিকট ক্রমে লোকের উপর লোক পাঠাইয়া, তাহাকে কুপথগামিনী করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ওসমানের প্রস্তাবে সে কোনরূপেই প্রথমে স্বীকৃত হয় নাই; কিন্তু অনেক চেষ্টার পর অর্থের লোভে ক্রমে সে আপন ধৰ্ম্ম বিক্রীত করিতে সম্মত হইল। যে সময় হেদায়েৎ কাৰ্যোপলক্ষে স্থানান্তরে গমন করিয়া

ছিলেন, সেই সময় একরাত্রিতে ওসমান একখানি পাকী পাঠাইয়া তাহাকে আপন বাড়ীতে আনয়ন করেন। প্রায় সমস্ত রাত্রি তাহাকে আপনার বৈঠকখানায় মাখিয়া, অতি অলমাত্র রাত্রি অবশিষ্ট থাকিতে, সেই পাল্কী করিয়া তাহাকে পুনরায় আপন বাড়ীতে পাঠাইয়া দেন। পরদিবস রাত্রিতে পুনরায় পাল্কী করিয়া

তাহাকে আপন বৈঠকখানায় আনয়ন করেন। সেই সময় গোফুর খাঁ বাড়ীতে ছিলেন না, কানপুরে ছিলেন। যে সময় ওসমান সেই স্ত্রীলোকটাকে লইয়া আপন বৈঠকখানায় আমোদ প্রমোদে উন্মত্ত ছিলেন, সেই সময় হঠাৎ গোফুর খাঁ বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হন। পাছে পিতা তাঁহার এই সকল বিষয় জানিতে পারেন, এই ভয়ে ওসমান তাঁহার বৈঠকখানার সম্মুখে একটা কুঠারীর ভিতর উহাকে লুকায়িত ভাবে রাখিয়া দিয়া সেই গৃহের তালাবদ্ধ করিয়া দেন। তৎপরে তাহার একজন অনুচরকে কহেন যে, তাঁহার পিতা যেমন এদিক ওদিক করিবেন, বা বাড়ীর ভিতর গিয়া শয়ন করিবেন, সেই সময় সেই স্ত্রী লোকটীকে সেই গৃহ হইতে বাহিরে আনিয়া, পাক্কী করিয়া তাহার বাড়ীতে যেন পাঠাইয়া দেওয়া হয়, এবং পাঠাইবার সময় সেই স্ত্রীলোকটাকে যেন বলিয়াও দেওয়া হয় যে, বৃদ্ধ কানপুরে গমন করিলে পুনরায় তাহাকে আনয়ন করা বাইবে।

অনুচর ওসমানের প্রস্তাবে সম্মত হন, এবং কহেন যে, একটু অবকাশ পাইলেই তিনি তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিবেন। অনুচর ওসমানের প্রস্তাবে সম্মত হইলেন বটে, কিন্তু কাৰ্যে তাহা করিয়া উঠিলেন না। পরদিবস প্রাতঃকালে ওসমান তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি মিথ্যা কথা কহিলেন।

তিনি যে তাহাকে পাঠাইতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন, এ কথা না। ধলিয়া, কহিলেন যে, গত রাত্রিতেই তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে। অনুচর যে তাহার কোনরূপ অভিসন্ধি বশতঃ এইরূপ মিথ্যা কথা কহিলেন, তাহা নহে; মনে করিলেন, উহাকে পাঠাইয়া দেওয়া হয় নাই, এই কথা জানিতে পারিলে, পাছে ওসমান তাহার উপর অসন্তুষ্ট হন। এই ভয়ে তিনি মিথ্যা কথা কহিলেন। তখন তিনি মনে মনে স্থির করিলেন যে, যেরূপ উপায়ে হউক, এখনই তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিবেন। সেই সময় ওসমান অপর একটী কাৰ্য্যোপলক্ষে তাহাকে স্থানান্তরে প্রেরণ করেন। তিনিও সেই কাৰ্যোপলক্ষে এ দিকের কাৰ্য একবারে ভুলিয়া যান। অথচ ওসমানের বিশ্বাস যে, সেই স্ত্রীলোকটী তাহার বাড়ীতে গমন করিয়াছে; সুতরাং সেই স্ত্রীলোকটী গৃহের ভিতর যে বদ্ধ আছে, এ কথা আর কাহারও মনে হয় নাই, বা সেই ঘর খুলিবারও কোন প্রয়োজন উপস্থিত হয় নাই। এইরূপে অনাহারে এবং তৃষ্ণায় উহার মৃত্যু ঘটে। পরিশেষে আপনি বাড়ীর সমস্ত স্থান অনুসন্ধান করিতে করিতে, যখন সেই ঘরের দরজা খোলেন, তখন সেই মৃতদেহ বাহির হইয়া পড়ে। এই ব্যাপার দেখিয়া তখন ওমানের সমস্ত কথা স্মরণ হয়, এবং বুঝিতে পারেন যে, তাহার অনুচরের মিথ্যা কথার নিমিত্ত তাহার কি সর্বনাশ ঘটিল! গোফুর খাঁ ইহার ভাল মন্দ কিছুই জানেন না; সুতরাং এই অবস্থা দেখিয়া তিনি একবারে হতজ্ঞান হইয়া পড়েন। আমি যতদুর শুনিয়াছি, ইহাই প্রকৃত ঘটনা। আমি অকপটে আপনার নিকট যাহা বলিলাম, তাহা কিন্তু এখন অন্যরূপ ঘটনা হইয়া পড়িয়াছে।

দারোগা। ইহাই যদি প্রকৃত ঘটনা হয়, তাহা হইলে এখন যেরূপ ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে, তাহা কি?

হোসেন। তাহা যে কি, তাহা আপনি আপন মনে বেশ অবগত আছেন, আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন কেন?

দারোগা। এই মোকদ্দমার যেরূপ প্রমাণ হইয়াছে, তাহা আপনি সমস্ত অবগত হইতে পারিয়াছেন কি?

হোসেন। তাহা সমস্তই জানিতে না পারিলে, আর আপনার নিকট আসিব কেন?

দারোগা। আপনি আমাকে যে সহস্র মুদ্রা প্রদান করিলেন, তাহার পরিবর্তে আমি এখন যে কোন উপকার করিতে পারি, তাহা বোধ হয় না।

হোসেন। মনে করিলে এখনও বিস্তর উপকার করিতে পারেন।

দারোগা। এরূপ অবস্থায় আমার দ্বারা আর কি উপকার হইবার সম্ভাবনা আছে, বলুন। আমি বিবেচনা করিয়া দেখি, সেই উপকার করিতে আমি কত দুর সমর্থ।

হোসেন। সময় মত বলিব। তখন আপনার যতদূর সাধ্য, সেইরূপ উপকার করিবেন; কিন্তু এখন যাহাতে অন্য কোন সাক্ষীর যোগাড় না হয়, তাহা করিলেই যথেষ্ট হইবে। আরও একটা বিষয়ের অনুরোধের নিমিত্ত আমি আপনার নিকট আসিয়াছি। যে সমস্ত ব্যক্তি আমাদিগের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে, তাঁহারা ওসমানের জ্বালায় সবিশেষ জ্বালাতন হইয়া, এইরূপে আমাদিগের সর্বনাশ করিতে বসিয়াছে। তাঁহারা যে কথা বলিয়াছে, পুনরায় যে তাহার অন্যথাচরণ করিবে, তাহা আমার বোধ হয় না। তথাপি অর্থ প্রলোভনে আমরা একবার চেষ্টা করিয়া দেখিব, যদি কোনরূপে কৃতকার্য হইতে পারি। আপনি তাহাতে প্রতিবন্ধকতাচরণ করিবেন না, ইহা আমার একটা প্রধান অনুরোধ।

দারোগা। তাহা কিরূপে হইবে? সাক্ষিগণ একবার যেরূপ কথা বলিয়াছে, এখন যদি তাহার অন্যথাচরণ করে, তাহা হইলে তাহাদিগকে সম্পূর্ণরূপে বিপদে পড়িতে হইবে, তাহা কি তাঁহারা জানে না? বিশেষতঃ একথা যদি তাঁহারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তাহা হইলে আমি কখনই বলিতে পারিব না যে, তোমরা পূর্বে যেরূপ বলিয়াছ, এখন অনায়াসেই তাহার বিপরীত বলিতে পার। আর সাক্ষীগণ যদি এখন অন্যরূপ বলে, তাহা হইলে তাহাদিগের ত বিপদ হইবেই; তদ্ব্যতীত আমাদিগের উপরও নানারূপ সন্দেহ উপস্থিত হইবে, আর হয় ত আমাকেও বিপদাপন্ন হইতে হইবে।

হোসেন। যাহাতে আপনাকে বিপদাপন্ন হইতে হইবে, এরূপ কাৰ্যে আমি কখনই হস্তক্ষেপ করিব না। আর যাহা কিছু করিতে হইবে, আপনার সহিত পরামর্শ করিয়া, এবং সেই বিষয়ে আপনার মত লইয়া সেই কাৰ্য্য করিব। আপনার অমতে কোন কাৰ্য্য করিব না।

এই বলিয়া হোসেন, সেই দিবস দারোগা সাহেবের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন।

হোসেন চলিয়া গেলে, দয়োগা সাহেব মনে মনে স্থির করিলেন, যাহা কিছু পাইয়াছি, তাহা গ্রহণ করিয়াছি। আরও যদি কিছু পাই, তাহাও লইব। অধিকন্তু হোসেনের সাহায্যে সেই স্ত্রীলোকটীকেও পুনরায় আনাইয়া লইব। কিন্তু আসল কাৰ্য কোনরূপেই ছাড়িব না; যাহাতে গোফুর এবং ওসমানকে ফঁসি কাষ্ঠে ঝুলাইতে পারি, বিধিমতে তাহার চেষ্টা করিব।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

হেদায়েতের কন্যাকে হত্যার অপরাধে, গোফুর খাঁ এবং তাহার পুত্র ওসমান খাঁ মাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরিত হইলেন। দারোগা সাহেবও প্রাণপণে সেই মোকদ্দমার আয়োজন করিতে লাগিলেন। পিতা পুত্র উভয়েই হাজতে রহিলেন। পুলিসের নিকট যে সকল সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছিল, যাহাতে তাঁহারা মাজিস্ট্রেটের নিকট অন্যরূপ সাক্ষ্য প্রদান করে, তাহার নিমিত্ত হোসেন অনেক অর্থ ব্যয় করিয়া, অনেক চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। বরং পুলিসের নিকট তাঁহারা যেরূপ বলিয়াছিল, মাজিষ্ট্রেটের নিকট তাহা অপেক্ষা আরও অনেক অধিক কথা কহিল।

সমস্ত সাক্ষীর এজাহার হইয়া যাইবার পর, মাজিষ্ট্রেট সাহেব দেখিলেন যে, আসামীদ্বয়ের বিরুদ্ধে হত্যাকরা অপরাধ উত্তমরূপে প্রমাণিত হইয়াছে। সুতরাং চুড়ান্ত বিচারের নিমিত্ত তিনি এই মোকদ্দমা দায়রায় প্রেরণ করিলেন।

এই মোকদ্দমার বিচারের নিমিত্ত যখন দায়রায় দিন স্থির হইল, সেই সময় বিচারক মফঃস্বল পরিভ্রমণ উপলক্ষে, জেলা হইতে সুদূর মফঃস্থলে অবস্থান করিতেছিলেন। যখন যে গ্রামে বিচারক উপস্থিত হইতেছিলেন, সেই সময় সেই গ্রামেই আপন কাছারি করিয়া মোকদ্দমার বিচারও করিয়া আসিতেছিলেন।

যে দিবস গফুর খাঁ এবং তাঁহার পুত্র ওসমানের এই হত্যাপরাধ-বিচার আরম্ভ হইল, সে দিবস একটা নিতান্ত ক্ষুদ্র পলিগ্রামের ভিতর জজসাহেবের তাম্বু পড়িয়াছিল। সুতরাং সেই স্থানেই এই মোকদ্দমার বিচার আরম্ভ হইল।

এলাহাবাদ হাইকোর্ট হইতে উকীল কৌন্সলি আনাইয়া এই মোকদ্দমায় দোষ-ক্ষালনের যতদূর উপায় হইতে পারে, হোসেন প্রাণপণে তাহার চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে সমর্থ হইলেন না। সরকারী উকীল মোকর্দমার অবস্থা জজসাহেবকে উত্তমরূপে সর্বপ্রথম বুঝাইয়া দিবার পর হইতেই, জজসাহেবের মনে কেমন এক বিশ্বাস হইয়া গেল যে, আসামী পক্ষীয় উকীল কৌশলি অনেক চেষ্টা করিলেও, তাহার মন হইতে সেই বিশ্বাস অপনোদন করিতে পারিলেন না। তিন দিবস পৰ্য্যন্ত এই মোকদ্দমার সাক্ষিগণের এজাহার গৃহীত হইল। তাহাদিগের উপর যথেষ্ট জেরা হইল। উভয় পক্ষীয় উকীল কৌন্সলিগণ স্বপক্ষে সাধ্যমত বক্তৃতাদি করিতে ক্রটি করিলেন না; কিন্তু কিছুতেই আসামীদ্বয়ের পক্ষে কোনরূপ উদ্ধারের উপায় লক্ষিত হইল না।

জজসাহেব এই মোকদ্দমার রায় প্রদান করিবার কালীন কহিলেন, আসামীগণ! তিন দিবস পর্যন্ত বিশেষ যত্ন ও মনো–যোগের সহিত, এই মোকদ্দমার সমস্ত ব্যাপার আমি উত্তম রূপে শ্রবণ করিয়াছি, এবং তোমাদিগের পক্ষীয়, সুশিক্ষিত উকীল কৌন্সলিগন সবিশেষ যত্নের সহিত তোমাদিগের পক্ষসমর্থন করিয়া, তোমাদিগের স্বপক্ষে যাহা কিছু বলিবার আছে, তাহা অপেক্ষাও অনেক কথা বলিয়াছেন; কিন্তু উভয় পক্ষের সমস্ত ব্যাপার শ্রবণ করিয়া এবং সাক্ষিগণের সাক্ষ্য দিবার কালীন, তাহাদিগের ভাব-ভঙ্গি দেখিয়া আমার স্পষ্টই প্রতীতি জন্মিয়াছে যে, তোমাদিগের বিপক্ষে তাঁহারা বিন্দুমাত্রও মিথ্যা কথা কহে নাই। অবশ্য, অনেক সাক্ষ্যের অনেক স্থান অপর সাক্ষিগণের সাক্ষ্যের সহিত এক মিল হয় নাই। কিন্তু তাহা বলিয়া তাঁহারা যে, একবারে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে, এ কথা আমি কখনই স্বীকার করিতে পারিব না। তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর তালা বন্ধ গৃহের মধ্যে হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ যে পাওয়া গিয়াছে, সে সম্বন্ধে কোন আপত্তি উত্থাপিত হয় নাই। বিশেষতঃ তোমাদিগের বিরুদ্ধে যে সকল ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে, তাঁহারা সকলেই তোমাদিগের জমিদারীর প্রজা। প্রজাগণ তাহা দিগের জমিদারের বিপক্ষে কখনই মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করিতে সম্মত হয় না। আর নিতান্ত সত্যের অনুরোধে যদি কোন প্রজাকে তাহার জমিদারের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিতে হয়, তাহা হইলেও সেই প্রজা যতদূর সম্ভব, তাহার জমিদারকে বাঁচাইয়া যাইতে চেষ্টা করে, ইহাই এদেশীয় নিয়ম। তোমাদের প্রজাগণ তোমাদিগের বিপক্ষে যে সকল সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে, আমার বিশ্বাস, তাঁহারা তাহা অপেক্ষাও অনেক অধিক কথা অবগত আছে। কোনরূপে যদি আপনাদের জমিদারের উপকার করিতে পারে, এই ভাবিয়া সকল কথা তাঁহারা বলে নাই। সেই সকল সাক্ষী ওসমানের অত্যাচারে অত্যাচারিত হইয়া, তোমাদিগকে বিপদাপন্ন করিবার মানসে মিথ্যা কথা কহিতেছে, এ কথা সময় সময় মোদিগের কৌন্সলি উখাপিত করিলেও, তাঁহারা সেই সকল কথা একবারে অস্বীকার করে। অথচ তোমরাও তাহার সত্যাসত্য প্রমাণ করতে সমর্থ হও নাই, বা তাহার চেষ্টাও কর নাই। এইরূপ নানা কারণে আমি সাক্ষিগণের সাক্ষ্য কোনরূপেই একবারে অবিশ্বাস করিতে পারি না।

সাক্ষিগণের দ্বারায় বেশ প্রমাণিত হইয়াছে যে, হেদায়েতের নিকট হইতে খাজানা আদায় করিবার মানসে, তাহার অবর্ত মানে তাহার যুবতী কন্যাকে তোমরা বলপূৰ্ব্বক তাহার পরদার বাহিরে আনিয়া সৰ্ব্বসমক্ষে তাহাকে যেরূপ অবমাননা করিয়াছ, সেরূপ কাৰ্য ভদ্রবংশীয় কোন লোকের দ্বারা কোনরূপেই সম্ভব না। কেবল মাত্র সামান্য খাজানা আদায় করিবার অভিপ্রায়ে তোমরা সেই যুবতীর উপর কেবল যে এইরূপ ভয়ানক অত্যাচার করিয়াছ, তাহা নহে। আমার অনুমান হয় যে, তোমাদিগের এরূপ কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিবার অপর কোন বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। এইরূপে যুবতীর উপর ভয়ানক অত্যাচার করিয়াই যে, তোমরা তাহাকে নিষ্কৃতি দিয়াছ, তাহা নহে। সৰ্বসমক্ষে সেই অবলাকে বিনাদোয়ে ধৃত করিয়া, বিশেষরূপে অবমাননার সহিত কয়েক খানি গ্রামের মধ্য দিয়া তোমরা তোমাদিগের বাটী পৰ্যন্ত তাহাকে লইয়া গিয়াছ। এ কথা গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিত সকলেই একবাক্যে কহিতেছে। অবলা স্ত্রীলোকের উপর বিনা দোষে এরূপ অত্যাচার করা নিতান্ত পিশাচের কাৰ্য ভিন্ন আর কিছুই বলিতে পারা যায় না। এইরূপ অত্যাচার করিয়াই কি তোমরা তাহাকে নিষ্কৃতি লিয়াছ? তোমাদিগের নিজের অনুচর এবং ভৃত্যরর্গের দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে যে, সেই হতভাগিনীকে অনশনে রাখিয়া হত্যা করিবার অভিপ্রায়ে তাহাকে তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর একটা নির্জন গৃহের মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়া দিয়াছিলে। অনশনে যে লোকের মৃত্যু ঘটে, তাহা কি তোমরা জান না? ক্ষুৎপিপাসা সন্থ করিতে কোন্ ব্যক্তি কয়দিবস সমর্থ হয়, তাহা কি তোমাদিগের মনে একবারের নিমিত্তও উদয় হয় নাই? কেবল তাহাই নহে, তোমাদিগের নিজের পরিচারক কি বলিতেছে, তাহা একবার শোন। এক দিবস কোন গতিতে আমি সেই গৃহের চাবি সংগ্রহ করিয়া ঘর খুলিয়া দেখিলাম যে, ক্ষুধায় এবং তৃষ্ণায় যুবতী মৃত্যুশয্যায় শায়িতা। এই অবস্থা দেখিয়া আমার কঠিন হৃদয়েও দয়ার উদ্রেক হইল। ঘরবানের সহিত পরামর্শ করিয়া আমি কিছু আহারীয় এবং পানীয় আনিয়া উহাকে দিবার উদ্যোগ করিতেছি, এরূপ সময়ে ওসমান সাহেব তাহা জানিতে পারিয়া, সেই সকল দ্রব্য আমার হস্ত হইতে কাড়িয়া লইয়া দূরে নিক্ষেপ করিলেন, ও আমাকে যৎপয়োনান্তি গালি দিয়া পুনরায় সেই গৃহের তালা বন্ধ করিয়া দিলেন। এই ব্যাপার দেখিয়া আমার মনে নিতান্ত কষ্ট হইল। আমি গিয়া গোফুর মিঞার নিকট এই কথা বলিলে, কোথায় তিনি তাহার প্রতিবিধানের চেষ্টা করিবেন, না তাঁহার পরিবর্তে আমাকে সহস্র গালি প্রদান করিয়া, তাঁহাদিগের বিনা, অনুমতিতে আমি সেই গৃহের দরজা খুলিয়াছিলাম বলিয়া আমাকে চাকরী হইতে জবাব দিলেন, এবং তদখেই আমাকে তাঁহা, লিগের বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিলেন।

কি ভয়ানক! কি পৈশাচিক ব্যবহার! এই ব্যক্তি ও তাহার পোষকতাকারী ঘরবানের সাক্ষ্য যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে সেই যুবতীকে অনশনে রাখিয়া, ইচ্ছা-পূৰ্ব্বক তাহাকে যে হত্যা করিয়াছ, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। যাহাদিগের দ্বারা এরূপ কাৰ্য্য হইতে পারে, তাঁহারা কোনরূপেই দয়ার পাত্র নহে। আমার বিবেচনায় এরূপ প্রকৃতি-বিশিষ্ট লোকের উপর দয়া প্রকাশ করিলে ঈশ্বর তাহার উপর অসন্তুষ্ট হন। গোফুর খাঁ! তোমার বৃদ্ধ বয়স দেখিয়া, এবং তোমার পূর্ব-চরিত্র শ্রবণ করিয়া আমি পূর্বে মনে করিয়াছিলাম, এরূপ মোকদ্দমায় যদি কেহ দয়ার পাত্র হয়, তাহা তুমি। কিন্তু এখন আমি দেখিতেছি, দস্যু তস্করকে দয়া করা যাইতে পারে, মনুষ্য হত্যাই যাহাদিগের জীবিকা, তাহাদিগকেও দয়া করা যাইতে পারে, তথাপি তোমার উপর সে দয়া প্রকাশ করিতে নাই। তোময়া ইচ্ছা করিয়া যেরূপ ভয়ানক অপরাধ করিয়াছ, তাহার প্রকৃত দণ্ড আমাদিগের আইনে নাই। তোমাদিগের জাতীয় রাজার রাজত্বকালে যেরূপ কুকুর দিয়া খাওয়াইয়া ও ক্ষতস্থানে লবণ নিক্ষিপ্ত করিয়া মারিয়া ফেলিবার নিয়ম ছিল, আমার বিবেচনায় তোমরা সেইরূপ দণ্ডের উপযুক্ত। কিন্তু সেরূপ দণ্ড যখন আমাদিগের আইনে নাই, তখন আমাদিগের আইনের চরম দণ্ড আমি তোমাদিগের উপর বিধান করিলাম। যে পর্যন্ত তোমরা না মরিবে, সেই পৰ্য্যন্ত তোমাদিগের উভয়কেই ফাঁসিকাষ্ঠে লটুকাইয়া রাখা হইবে।

জজসাহেবের মুখে বিষম দণ্ডের কথা শুনিয়া গোফুর খাঁ আর দাড়াইয়া থাকিতে পারিলেন না, মূর্হিত অবস্থায় সেই স্থানে পড়িয় গেলেন। প্রহরীগণ তাঁহার মুখে জল সিঞ্চন করাতে তাঁহার সংজ্ঞা হইলে, তাঁহারা তাঁহাকে সেই স্থান হইতে বাহির করিয়া লইয়া গেল। ওসমান স্থিরভাবে এই দণ্ডাজ্ঞা সহ করিলেন, কোন কথা কহিলেন না; কেবল দারোগা সাহেবের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলেন মাত্র।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

এই ভয়ানক দণ্ডাজ্ঞা শুনিয়া হোসেনের মুখ দিয়া আর কোন কথা বাহির হইল না। অপূর্ণ-লোচনে তিনি আদালতের বাহিরে আসিলেন। যে সময় এই মোকদ্দমার বিচার শেষ হইয়া গেল, তখন অপরাহ চারিটা। জজসাহেবের সঙ্গে একজন কোর্ট-ইনস্পেক্টার ছিলেন; যে আসামীদ্বয়ের উপর প্রাণদণ্ডের আদেশ হইয়াছে, তাহাদিগকে লইয়া তিনি বিষম বিপদে পড়িলেন। কিরূপে সেই আসামীদ্বয়কে তিনি জেলায় পাঠাইয়া দিবেন, তাহার কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলেন না। সেই স্থান হইতে পদব্রজে আসামীগণকে পাঠাইয়া দিলে, তিন চারিদিবসের কম তাঁহারা সরে গিয়া উপস্থিত হইতে পারিবে না। বিশেষতঃ গোফুর খাঁর আর চলিবার ক্ষমতা নাই; তাহার উপর পয়ে বিপদের সম্ভাবনাও আছে।

কোর্ট-ইন্‌স্পক্টার সাহেব এইরূপ গোলযোগে পড়িয়া হোসেনকে তাকাইয়া পাঠাইলেন ও কহিলেন, আপনার মনিবদ্বয়ের অদৃষ্ট্রে যাহা ছিল, তাহা ঘটিয়াছে; কিন্তু যে পর্যন্ত তাহাদিগের জীবন শেষ না হয়, সে পর্যন্ত তাহাদিগকে কষ্ট দেওয়া কোনরূপেই কৰ্তব্য নহে। এখন, ইহাদিগকে অনেকদূর পর্যন্ত হাঁটিয়া যাইতে হইবে; কিন্তু আমি দেখিতেছি যে, হটিবার শক্তি ওসমানের থাকিলেও থাকিতে পারে, কিন্তু গোফুর খাঁর সে শক্তি নাই। আর উঁহাদিগকে কোন যানে আরোহণ করাইয়া লইয়া যাইবার খরচার ব্যবস্থাও সরকার হইতে নাই। এরূপ অবস্থায় যদি আপনি কিছু অর্থ প্রদান করেন, তাহা হইলে যাহাতে উঁহারা কষ্ট না পান, কোনরূপে আমি সেইরূপ বন্দোবস্ত করিয়া উহা দিগকে এই স্থান হইতে পাঠাইতে পারি।

হোসেন। আমাকে কিরূপ অর্থ সাহায্য করিতে হইবে?

ইনস্পেক্টার। অধিক অর্থের সাহায্য করিতে হইবে না। ইহারা দুইজন, এবং ইহাদিগের সহিত যে কয়জন প্রহরী গমন করিবে, তাহাদিগকে সদর পর্যন্ত লইয়া যাইতে হইলে গাড়ি প্রভৃতির যাহা কিছু খরচ পড়িবে, তাহাই কেবল তোমাকে দিতে হইবে।

হোসেন। তাহা আমি দিতে সম্মত আছি, যদি আমাকেও উঁহাদিগের সহিত গমন করিতে দেন।

ইনস্পেক্টার। আপনিও উঁহাদিগের সহিত গমন করিতে পারেন। কিন্তু একত্র নহে। উঁহারা যে গাড়িতে গমন করি বেন, আপনি সেই গাড়িতে গমন করিতে পারিবেন না। অপর গাড়ি লইয়া উঁহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিলে, কেহ আপত্তি করিবে না। কিন্তু কেন আপনি উঁহাদিগের সহিত গমন করিতে চাহেন?

হোসেন। আমি যে কয়দিবস উঁহাদিগের সহিত থাকিতে পারিব, সেই কয়দিবস যাহাতে উঁহাদিগের কোনরূপ আহারাদিন কষ্ট না হয়, তাহা আমি দেখিতে পারিব তথ্যতীত যখন উভয়েই ফঁসি খাইতেছেন, তখন ইহাদিগের এই অগাধ জমিদারীর কিরূপ বন্দোবস্ত করিব, বা তাঁহারা ইহা কাহাকে প্রদান করিয়া যাইবেন, এবং পরিবারবর্গেরই বা কিরূপ বন্দোবস্ত হইতে পারে, প্রভৃতি আবশ্যক বিষয় সকল সম্বন্ধে যতদূর সম্ভব, তাহাদিগের নিকট হইতে জানিয়া বা লিখাইয়া লইব।

ইনস্পেক্টার। আপনি উঁহাদিগের সহিত এখন গমন করিতে পারেন, আর তাহাদিগের আহারাদি সম্বন্ধীয় বন্দোবস্ত করিতেও কিছুমাত্র নিষেধ নাই। কিন্তু বিষয়-আদি-সম্বন্ধীয় বন্দোবস্ত করিবার সময় এখন নহে। জেলায় গমন করিবার পর জেলের মধ্যে উঁহারা যে কয়দিবস পাকিবেন, তাহার মধ্যে জেল কর্ম্মচারীর সম্মুখে সে সমস্ত বন্দোবস্ত আপনারা করিয়া লইতে পারিবেন।

হোসেন। জেলায় গমন করিতে উঁহাদিগের কয়দিবস লাগিবে?

ইনস্পেক্টার। তাহা আমি এখন বলিতে পারিতেছি না। ইহাদিগের সহিত যে সকল প্রহরী গমন করিবে, তাঁহারা যে কয়দিবসে সুবিধা বিবেচনা করিবে, সেই কয়দিবসে তাঁহারা উঁহাদিগকে লইয়া যাইবে।

হোসেন। মহাশয়! আর একটা কথা। রাত্রিকালে উহার যে যে স্থানে অবস্থিতি করিবে, সেই সেই স্থানে রাত্রিযাপন উপযোগী কোনরূপ বন্দোবস্ত করিতে হইবে কি?

ইনস্পেক্টার। না, রাত্রিযাপন সম্বন্ধে কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার প্রয়াজন নাই। কারণ, থানা ভিন্ন অপর কোন স্থানে উঁহারা রাত্রিযাপন করিবেন না। সমস্ত দিবস গমন করিয়া সন্ধ্যার পূর্বে যে থানায় গিয়া উপস্থিত হইতে পারিবেন, সেই থানাতেই রাত্রিযাপন করিবেন, ও পরদিন প্রত্যুষে সেই থানা হইতে প্রস্থান করিবেন। এইরূপে গমন করিয়া যে কয়দিবসে সম্ভব, সদরে গিয়া উপস্থিত হইবেন।

কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেবের সহিত এই সকল কথাবার্তা হইবার পর, তাহাদিগকে লইয়া যাইবার নিমিত্ত যে কিছু ব্যয় হইবে, তাহার সমস্ত ভার হোসেন গ্রহণ করিলেন। সেই দিবস অপরাহ হইয়া আসিয়াছিল বলিয়া, ইনস্পেক্টার সবিশেষরূপ পাহারার বন্দোবস্ত করিয়া আসামীদ্বয়কে সেই স্থানেই রাখিয়া দিলেন। আর ইহাই সাব্যস্ত হইল যে, পরদিবস অতি প্রত্যুষে আসামী দ্বয়কে সেই স্থান হইতে পাঠাইয়া দিবেন। আসামীদ্বয় এবং প্রহরীগণকে লইয়া যাইবার নিমিত্ত যে কয়েকখানি, একার প্রয়োজন হইল, তাহাও সেই রাত্রিতে বন্দোবস্ত করিয়া রাখা হইল। হোসেন এবং তাহার দুইজনমাত্র ভৃত্যও সেই সঙ্গে গমন করিতে প্রস্তুত হইল। তাঁহারাও নিজের গমনোপোযোগী একা বন্দোবস্ত করিয়া রাখিলেন।

পরদিবস অতি প্রত্যুষে প্রহরীগণ আসামীদ্বয়কে লইয়া একারােহণে সেই স্থান হইতে বহির্গত হইলেন। হোসেনও তাঁহার অনুচরদ্বয়ের সহিত অপর এক্কায় আরোহণ করিয়া তাহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। প্রহরী গণের মধ্যে যে ব্যক্তি সর্ব প্রধান ছিল, সেই স্থান হইতে বহির্গত হইবার পূর্বে কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেব তাহাকে হোসেনের সহিত পরিচয় করিয়া দিয়াছিলেন ও বলিয়া দিয়াছিলেন, হোসেন তাহাদিগের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিবে। যে স্থানে যে কোন খরচের প্রয়োজন হইবে, তাহা হোসেনই দিবেন। আসামীদ্বয়কে আহারাদি করাইবার নিমিত্ত যে কোন সাহায্যের প্রয়োজন হইবে, হোসেন তৎক্ষণাৎ সেই সকল সাহায্য করিবেন। একা প্রভৃতির যখন যেরূপ ভাড়া লাগিবে, হোসেনকে বলিলে তৎক্ষণাৎ তিনি তাহা প্রদান করিবেন।

কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেবের আদেশ পাইয়া, প্রহরী আর কোন কথা কহিল না। কারণ, সে উত্তমরূপে অবগত ছিল যে, যদি হোসেন বা অপর কোন ব্যক্তি এক্কা প্রভৃতির ভাড়া প্রদান না করে, তাহা হইলে যে কয়দিবসে হউক, তত পথ তাহা দিগকে পদব্রজে গমন করিতে হইবে।

প্রহরী-সর্দারের মনে মনে একটু দুরভিসন্ধি ছিল। কোর্ট ইনস্পেক্টারের সম্মুখে কিন্তু সে তাহা প্রকাশ করিল না। তখন তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইয়া আসামীদ্বয় ও হোসেনের সমভিব্যাহারে সেই স্থান হইতে বহির্গত হইল।

কিয়দ্দূর গমন করিবার পর, পথের এক স্থানে একটা জলাশয় দৃষ্টিগোচর হইল। প্রহরী-সর্দ্দার সেই স্থানে একা থামাইতে আদেশ প্রদান করিলেন। আদেশ প্রতিপালিত হইল। একা হইতে অবতরণ করিয়া সকলে সেই স্থানে একটু বিশ্রাম করি লেন, এবং প্রহরীগণ একে একে আপনাপন হস্তমুখাদি প্রক্ষালন করিয়া লইলেন। তাঁহাদিগের সকলের হস্তমুখাদি প্ৰক্ষালিত হইলে, প্রহরী-সর্দ্দার হোসেনকে কহিলেন, মহাশয়! আসামী স্বয়কে লইয়া সদরে উপস্থিত হইতে এক্কা-ভাড়া প্রভৃতি যে সকল খরচ পড়িরে, তাহা আমাদিগকে মিটাইয়া দিন।

হোসেন। একা-ভাড়া প্রভৃতির জন্য আপনার ব্যস্ত হইবার কোন প্রয়োজন নাই। যখন আমি আপনাদিগের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিতেছি, তখন সমস্তই আমি প্রদান করিব।

সর্দ্দার-প্রহরী। আপনি যে উহা প্রদান করিবেন, তাহা কোর্ট ইনস্পেক্টার সাহেব বলিয়াই দিয়াছেন; কিন্তু বারে বারে আপনার নিকট চাহিয়া লওয়া অপেক্ষা একবারেই উহা আমাদিগকে প্রদান করা উচিত নহে কি?

হোসেন। যখন আমাকে দিতে হইবে, তখন আপনি একবারেই লউন, বা বারে বারেই লউন, তাহাতে আমার কিছুমাত্র ক্ষতি নাই।

সঃ প্রহরী। তাহা হইলে উহা আমাকে অগ্ৰেই প্রদান করুন।

হোসেন। কত খরচ পড়িবে, তাহা আমি এখন পর্যন্ত জানিতে পারিতেছি না; সুতরাং অগ্রে আমি আপনাকে উহা কি প্রকারে প্রদান করিতে পারি? আপনাদিগের সহিত যে সকল একা আছে, উঁহারা কি একবারে সদর পর্যন্ত গমন করিতে পারিবে?

সঃ প্রহরী। উঁহারা এতদূর কিরূপে গমন করিবে? এক এক থানায় গমন করিবার পর উঁহাদিগকে ছাড়িয়া দিব ও সেই স্থান হইতে অন্য এক্কা গ্রহণ করিব।

হোসেন। তাহা হইলে আপনাদিগকে কত টাকা গাড়িভাড়া দিতে হইবে, তাহা আমি এখন কিরূপে জানিতে পারিব? যেমন যে একা ছাড়িয়া দিবেন, অমনি তাহার ভাড়া মিটাইয়া দিলে চলিবে না?

সঃ প্রহরী। তাহা কিরূপে হইবে? সে সময় যদি আপনি উপস্থিত না থাকেন, তাহা হইলে কিরূপে ভাড়া প্রদান করিবেন?

হোসেন। আমি ত আপনাদিগের সহিত উপস্থিত আছি। যখন যাহা বলিবেন, তখনই তাহা প্রদান করিব।

সর্দ্দার-প্রহরী। এখন ত উপস্থিত আছেন দেখিতেছি; কিন্তু রাস্তা হইতে যদি আপনি চলিয়া যান, তাহা হইলে তখন আমি কি করিব? ও সকল গোলযোগেরই এখন প্রয়োজন নাই। আমার নিকট কিছু অর্থ আপনি প্রদান করুন, তাহা হইতে আমি ভাড়া প্রদান করিব। খরচ-পত্র বাদে যাহা অবশিষ্ট থাকিবে, তাহা পরিশেষে আমি আপনাকে ফিরাইয়া দিব।

হোসেন। আচ্ছা মহাশয়, তাহাই হউক। যদি আপনারা আমাকে অবিশ্বাস করেন, তাহা হইলে এই কুড়িটী টাকা আপনার নিকট রাখিয়া দিন।

সঃ প্রহরী। আমি আপনার নিকট ভিক্ষা করিতে বসি নাই! এখন যদি আপনি পঞ্চাশ টাকা প্রদান করেন, তাহা হইলে আমি উহা গ্রহণ করিব; নতুবা আমি আসামীদ্বয়কে হাঁটাইয়া লইয়া যাইব।

হোসেন। হাঁটাইয়া লইয়া যাইবার প্রয়োজন নাই। আমি পঞ্চাশ টাকাই আপনাকে প্রদান করিতেছি, তাহা হইতে আপাততঃ যে সকল খরচ-পত্রের প্রয়োজন হয়, আপনি করুন। পরে যদি আরও কিছু আবশ্যক হয়, তাহাও আমি প্রদান করিব।

এই বলিয়া হোসেন পঞ্চাশটী টাকা বাহির করিয়া সেই সর্দ্দার প্রহরীর হস্তে প্রদান করিলেন। তিনি উহা গ্রহণ করিয়া আপনার নিকট রাখিয়া দিলেন, ও অপর প্রহরীগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, চল ভাই! আর দেরী করিবার প্রয়োজন নাই।

সর্দ্দার-প্রহরীর এই কথা শুনিয়া হোসেন কহিলেন, মহাশয়। আপনারা হস্ত মুখ প্রক্ষালনাদি সকল কার্য শেষ করিয়া লইলেন; কিন্তু ইহারা হস্ত মুখাদি ধুইবে কি না, তাহা ত কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন।

সর্দ্দার-প্রহরী। সে কথা জিজ্ঞাসা করিবার আমাদিগের কোন প্রয়োজন নাই। কোন বিষয়ের আবশ্যক হইলে ইহারা আপনারাই আমাদিগকে বলিবেন। তখন বিবেচনা করিয়া দেখা যাইবে যে, উঁহাদিগের প্রার্থনা শ্রবণ-যোগ্য কি না।

হোসেন। আপনারা যদি কোন কথা তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা না করেন, তাহা হইলে আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি।

সঃ প্রহরী। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার তোমার কোন অধিকার নাই। হত্যাপরাধে যাহাদিগের প্রাদণ্ডের আদেশ হইয়াছে, তাহাদিগের সহিত কথা কহিয়া, তুমি আমাদিগের চাকরী লইতে চাও?

হোসেন। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিলে, আপনাদিগের চাকরী যাইবে কি প্রকারে, তাহা আমি বুঝিতে পারিতেছি না।

সঃ প্রহরী। চাকরী যাউক, আর না যাউক, উঁহাদিগের সহিত আমি কোনরূপে তোমাকে কথা কহিতে দিব না।

হোসেন। আপনার অনভিমতেই আমি কথা কহিব কেন? কিন্তু আমি ইহাদিগকে যদি কোন কথাই বলি, তাহা মন্দ কথা নহে। তাহাতে আপনাদিগের কোনরূপ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা নাই।

সঃ প্রহরী। আমাদিগের কোনরূপ অনিষ্ট হউক, বা না হউক, তাহা দেখিবার তোমার কিছুমাত্র আবক নাই। মূল কথা, তুমি উঁহাদিগের সহিত কোন কথা কহিতে পারিবে না।

হোসেন। যদি আমি ইহাদিগের সহিত কোন কথা কহিতেই না পারিব, তাহা হইলে আপনাদিগের সহিত আমার আসিবার কি প্রয়োজন ছিল?

সর্দ্দার-প্রহরী। প্রয়োজন ত আমি কিছুই দেখি না। না আসিলেই পারিতে।

হোসেন। আমি না আসিলে, আপনাদিগকে কে গাড়ির ভাড়া প্রদান করিত?

সঃ প্রহরী। গাড়ি ভাড়া কিছু আমাদিগের উপকারের নিমিত্ত দেও নাই। তোমারই মনিবদ্বয় হাঁটিয়া যাইতে অপারক, তাই তাঁহাদিগের নিমিত্ত গাড়ির ভাড়া প্রদান করিয়াছ। গাড়ি ভাড়া প্রদান না করিলে, আমরা অনায়াসেই উঁহাদিগকে আঁটাইয়া লইয়া যাইতে পারিতাম।

হোসেন। বলি, জমাদার সাহেব! ও সকল কথা থাক, এখন আপনাদিগের মনের কথা কি বলুন দেখি। আপনারা যাহা বলিবেন, আমি তাহাতেই প্রস্তুত আছি।

সঃ প্রহরী। খুনী আসামীর সহিত কথা কহিতে দেওয়া যে কতদুর ঝুঁকির কাৰ্য, তাহা ত আপনারা জানেন না। যদি আমাদের কোনরূপ সাধ্য না থাকে, তাহা হইলে আমরা সেই ঝুকি কেন গ্রহণ করিব? আপনি বুদ্ধিমান, আপনাকে অধিক আর কি বলিব?

হোসেন। আমাকে আর বলিতে হইবে না, এ কথা আমাকে পূর্বে বলিলেই পারিতেন। আপনারা কিছু প্রার্থনা করেন, বুঝিয়াছি। বলুন, এখন আমাকে কি দিতে হইবে।

সঃ প্রহরী। আপনি বড় মানুষ, আপনাকে আমরা আর কি বলিব? আপনি আপনার বিবেচনামত কাৰ্য্য করিলেই চলিবে।

হোসেন। এখন আর আমার বুদ্ধি-মুদ্ধি কিছুই নাই, ভাল মন্দ বুঝিবার ক্ষমতা এখন দুর হইয়া গিয়াছে। এই সামান্য কাৰ্য্যের নিমিত্ত আমাকে কয়টা টাকা দিতে হইবে, তাহা স্পষ্ট করিয়া আমাকে বলুন। আমার সাধ্য হয়, আমি প্রদান করি। আর আমার ক্ষমতার অতীত হয়, তাহা হইলে এই স্থান হইতেই আমি ধীরে ধীরে প্রস্থান করি।

সর্দ্দারপ্রহরী। আপনাকে কিছু অধিক প্রদান করিতে হইবে। আমরা পাঁচজন বই আর নয়। আমাকে কুড়ি টাকা ও অপর চারিজনকে দশ টাকা করিয়া চল্লিশ টাকা প্রদান করিলেই হইবে। আপনার পক্ষে ইহা অতি সামান্য টাকা, কেবল ষাট টাকা বৈত নয়!

হোসেন। আপনার পক্ষে ইহা অতি সামান্য টাকা; কিন্তু আমার পক্ষে ইহা খুব অধিক হইতেছে। আমি অত টাকা দিতে পারি না। আমি আপনাদিগের সম্মান রক্ষার নিমিত্ত ত্রিশ টাকা প্রদান করিতেছি।

সঃ প্রহরী। এ কাৰ্য ত্রিশ টাকায় হইতে পারে না। আপনার ইচ্ছা হয়, ষাট টাকা দিন, ইচ্ছা না হয়, এক টাকা দিবারও প্রয়োজন নাই। আমি অধিক করিয়া বলি নাই, আমি যেরূপ:এক কথার লোক, সেইরূপ এক কথাই বলিয়াছি।

হোসেন। আচ্ছা মহাশয়! আমি ষাট টাকাই প্রদান করিতেছি। ইহার পর আমাকে ত আর কিছু প্রদান করিতে হইবে না?

সঃ প্রহরী। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার নিমিত্ত আপ নাকে আর কিছু প্রদান করিতে হইবে না। কিন্তু আমাদিগের কাহারও সম্মুখে ব্যতীত নির্জনে আপনি উঁহাদিগের সহিত কোন রূপ কথা বলিতে পারিবেন না।

এইরূপ কথাবার্তার পর হোসেন ষাট টাকা প্রদান করিয়া তাঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার আদেশ পাইলেন। কিন্তু সেই সময় সবিশেষ কোনরূপ কথা কহিবার অবকাশ পাইলেন না। তাহাদিগকে তৎক্ষণাৎ এক্কার উপর আরোহণ করিতে হইল। হোসেনও আপন একায় গিয়া আরোহণ করিলেন। এক্কায় আরোহণ করিবার সময় হোসেন কেবলমাত্র তাহাদিগকে কহিলেন, জজসাহেব আপনাদিগের প্রাণদণ্ডের আদেশ প্রদান করিয়াছেন বলিয়া যে, আপনাদিগের প্রাণদণ্ড হইবেই, তাহা আপনারা মনে করিবেন না। আপনার উপার্জিত বিষয়ের এক পয়সামাত্র অবশিষ্ট থাকিতে, কোনরূপেই আমি আপনাদিগের প্রাণদণ্ড হইতে দিব না। টাকাব যথেষ্ট সংগ্রহ করিয়া আমি সঙ্গেই রাখিয়াছি। হাইকোর্ট হইতে যেরূপ উপায়ে হউক, এই হুকুম রদ করাইবু। ঈশ্বর যদি একান্তই বিমুখ হন, হাইকোর্ট হইতে যদি কিছু করিয়া উঠিতে না পারি, তাহা হইলে ছোট লাটকে ধরিয়া হউক, বড় লাটকে ধরিয়া হউক, বিলাত পর্যন্ত গড়িয়া হউক, কোন না কোনরূপে আপনাদিগকে অব্যাহতি প্রদান করাইব।

হোসেনের কথা শুনিয়া গোফুর ও ওসমান কেবল এইমাত্র কহিলেন, দেখুন, ভরসার মধ্যে ঈশ্বর?

ইহার পরেই এক্কা সকল সেই স্থান হইতে চলিল। একা, চালক অশ্বগণকে সবলে কষাঘাত করিতে লাগিল। প্রহারের ভয়ে অশ্বগণ দ্রুতবেগে গমন করিতে লাগিল। দুই ঘণ্টার পথ একঘণ্টায় চলিতে লাগিল।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

দিবা দ্বিপ্রহরের সময়, এক্কা সকল একটী সরাইয়ের নিকট গিয়া উপস্থিত হইলে, আসামীদ্বয়ের সহিত প্রহরীগণ সেই স্থানে অবতরণ করিয়া সেই সরাইয়ের ভিতর প্রবেশ করিল। সেই স্থানে কোন দ্রব্যেরই অভাব ছিল না। সরাইয়ের মধ্যেই শীতল জল-পূর্ণ একটা প্রকাণ্ড ইদারা। সরাইয়ের মধ্যস্থিত একখানি ঘরের মধ্যেই বেনিয়ার দোকান; উহাতে আটা, চাউল, ধৃত ও তরকারি প্রভৃতি আবশ্যক আহারীয় দ্রব্য এবং হড়ী, কাষ্ট, কঁচা সালপাতা প্রভৃতি সমস্তই পাওয়া যায়। প্রহরীগণ সরাইয়ের ভিতর প্রবেশ করিয়াই তাহার মধ্যে যে সকল সারি সারি ঘর ছিল, তাহার একখানির মধ্যে আসামীদ্বয়কে রাখিয়া দিল। সেই ঘরের কেবলমাত্র একটী দরজা ভিন্ন অপর জানালা দরজা আর কিছুই ছিল না; সুতরাং সেই ঘরকে একরূপ হাজত-গৃহ বলিলেও চলে। সেই ঘরের সম্মুখে দৌড় বারান্দার উপর সারি সারি পাচ খানি চারিপায়া আসিয়া পড়িল। প্রহরীগণ সেই স্থানে আপনাপন পোষাক পরিচ্ছদাদি রাখিয়া, সেই চারিপায়ার উপর উপবেশন করিল; কেহ বা লম্বা হইয়া শয়ন করিল। প্রহরীগণকে শয়ন করিতে দেখিয়া, দুই জন নাপিত (নাউ) আসিয়া তাহাদিগের পদসেবায় প্রবৃত্ত হইল, এবং দুইজন বারকনিতা আসিয়া সেই স্থানে দণ্ডায়মান হইল। উঁহারা এইরূপ সমাগত পথিকগণের সেবা-সুশ্রুষা করিয়া আপনাপন উদরান্নের সংস্থান করিয়া থাকে। নাপিতগণের থাকিবার স্থান সেই সরাইয়ের ভিতর না থাকিলেও, দিনরাত্রি তাঁহারা সকলেই প্রায় সেই স্থানে অবস্থিতি করে; কিন্তু বার-বনিতাগণ সেই সরাইয়ের ভিতরেই একটা একটা ঘর লইয়া, তাহাতেই অবস্থিতি করিয়া থাকে।

আসামীদ্বয়ের সহিত প্রহরীগণ যেস্থানে অবস্থান করিল, তাহার পার্শ্ববর্তী অপর আর একটা কামরাতে হোসেন এবং তাহার ভৃত্যদ্বয় স্থান করিয়া লইলেন।

হোসেন একজন প্রহরীকে কহিলেন, আসামীদ্বয়কে যদি দুইখানি চারিপায়া আনাইয়া দেওয়া হয়, তাহাতে আপনাদিগের কোনরূপ আপত্তি আছে কি?

প্রহরী। আসামী! তাহাতে খুনী মোকদ্দমার আসামী। তাঁহারা চারিপায়ার উপর উপবেশন বা শয়ন করিবে! একথা ইতিপূর্বে আমরা আর কাহারও নিকট শ্রবণ করি নাই, দর্শন করা ত দূরের কথা!

হোসেন। আসামীদ্বয়কে চারিপায়ার উপর বসিতে দিবার নিয়ম নাই বলিতেছেন; কিন্তু যদি চারিপায়া দেওয়া যায়, তাহাতে কোনরূপ ক্ষতি আছে কি?

প্রহরী। ক্ষতি থাক বা না থাক, যদি ইহাদিগকে চারি পায়া দেওয়া যায়, তাহার ভাড়া কে দিবে?

হোসেন। চারিপায়ার ভাড়া যাহা লাগিবে, তাহা আমি দিব।

প্রহরী। আর আমাদিগকে?

হোসেন। ইহার নিমিত্ত আপনাদিগকে কিছু দিতে হইবে কি?

প্রহরী। না দিলে চারিপায়া দিতে দিব কেন?

হোসেন। আচ্ছা তাহাই হইবে। এই অনুগ্রহের নিমিত্ত আমি আপনাদিগকে একটা টাকা প্রদান করিতেছি।

প্রহরী। এক টাকায় হইবে না, যদি আমাদিগের প্রত্যেক কেই একটী করিয়া টাকা দেন, তাহা হইলে উঁহাদিগকে চারি পায়ার উপর বসিতে অনুমতি দিতে পারি।

হোসেন। আচ্ছা, তাহাই দিতেছি।

গোফুর। হোসেন! তুমি এরূপ ভাবে অনর্থক অর্থ ব্যয় করিতেছ কেন?

হোসেন। এ ব্যয় অনর্থক নহে। বলুন দেখি, ইতিপূর্বে আর কখনও আপনার মৃত্তিকায় বসিয়াছেন কি?

গোফুর। এখন আর আমি সেই জমিদার গোফুর খাঁ নহি যে, চারিপায় ভিন্ন বসিতে পারি না।

হোসেন। আপনি এখনও সেই গোফুর খাঁ আছেন, ইহা বেশ জানিবেন।

গোফুর। তাহা হইলে আমাদিগকে এই মিথ্যা মোকদ্দমায় আর ফাঁসি যাইতে হইত না।

হোসেন। আপনি ভাবিবেন না। উপরে কি ভগবান নাই? আপনাদিগকে কখনই ফাঁসি যাইতে হইবে না। আপনার মনকে স্থির করুন, দেখুন, আপনাদিগকে বাঁচাইয়া লইয়া যাইতে পারি কি না। দুই তিন দিবস আপনাদিগের স্নান হয় নাই, আজ স্নান করিবেন কি?

গোঁফুর। আর স্নান করিয়াই বা কি হইবে?

হোসেন। স্নান করিয়া অনেক ফল হইবে। স্নান করিলে শরীরের অনেক গ্লানি দূর হইবে, মস্তিষ্ক শীতল হইবে, তখন একমনে ঈশ্বরকে ডাকিতে সমর্থ হইবেন। এক মনে ঈশ্বরকে ডাকিতে পারিলে কোন বিপদ হয় কি?

গোফুর। প্রহরীরা আমাদিগকে স্নান করিতে দিবে কি?

হোসেন। সে ভার আমার উপর। মেরূপে হয়, আমি তাহার বন্দোবস্ত করিয়া লইতেছি। কেমন গো প্রহরীসাহেব। আপনা দিগের আসামীদ্বয় যদি স্নান করেন, তাহাতে আপনাদিগের, বোধ হয়, কোনরূপ আপত্তি নাই।

প্রহরী। আসামীদ্বয় স্নান করিবে! তাহা কি কখনও হইতে পারে?

হোসেন। কেন হইতে পারিবে না? এখানে আর কে তাহা দেখিতে পাইবে বা কেই বা তাহা শুনিতে পাইবে? ইহার জন্য আপনাদিগের প্রত্যেককে আট আনা এবং স্নানের পরে কিছু জল খাইরার নিমিত্ত, আট আনা করিয়া আমি প্রদান করিতেছি। ইহাতে, এখন বোধ হয়, আপনাদিগের আর কোনরূপ আপত্তি হইবে না।

প্রহরী। কোথায় স্নান করিবে? ইদারার নিকট ইহাদিগকে লইয়া যাইতে দিব না। কারণ, কি জানি যদি ইহার ইদারার ভিতর আত্ম-বিসর্জন করে, তাহা হইলে আমাদিগকে কয়েদ হইতে হইবে।

হোসেন। না, ইহাদিগকে ইদারার নিকট লইয়া যাইব না। যে স্থানে বলিবেন, সেই স্থানে বসিয়াই উঁহারা গান করিবেন।

প্রহরী। জল কোথায় পাইকেন, বা কে আনিয়া দিবে?

হোসেন। আমার সহিত দুইজন পরিচালক রহিয়াছে, এবং আমি নিজে আছি। তদ্ব্যতীত দুই চারি পয়সা দিলেই জল আনিয়া দেওয়ার লোকও পাওয়া যায়। এরূপ অবস্থায় যেস্থানে বলিবেন, সেই স্থানে জল আনাইয়া দিয়া, উঁহাদিগকে স্নান করাইয়া দিব।

প্রহরী। আর আমাদিগকে যাহা দিতে চাহিলেন, তাহা কখন দিবেন?

তাহা আমি এখনই দিতেছি, হোসেন এই বলিয়া চারিপায়া পাইবার, স্নান করিবার এবং কিছু জল খাবার খাইতে পাইবার অনুমতির নিমিত্ত প্রহরীর হস্তে দশ টাকা প্রদান করিলেন। বলা বাহুল্য, ইহার পর উক্ত কয়েকটা বিষয়ের নিমিত্ত প্রহরীগণ আর কোনরূপ আপত্তি করিল না। ভৃত্যগণ ইদারা হইতে জল উঠাইয়া আনিয়া প্রহরীগণের সম্মুখে তাহাদিগকে স্নান করাইয়া দিল। স্নান করিবার পর হোসেন কিছু জল খাবার আনাইলেন; কিন্তু প্রহরীগণ সে জল খাবার উঁহাদিগকে খাইতে না দিয়া কহিল, ইহার ভিতর আপনারা কোনরূপ বিষ প্রদান করিয়াছেন কি না, আমরা তাহা জানি না। সুতরাং আপনাদিগের আনীত জল খাবার ইহাদিগকে কখনই আহার করিতে দিব না। যাহা আনিতে হইবে, তাহা আমাদিগকে বলিয়া দিন এবং তাহার মূল্য আমাদিগকে প্রদান করুন। আমরা নিজে তাহা খরিদ করিয়া আনিয়া, আসামীদ্বয়কে প্রদান করিব।

প্রহরীগণের প্রস্তাবে হোসেন সম্মত হইলেন, এবং জল খাবার আনিবার নিমিত্ত, উঁহাদিগের একজনের হস্তে একটী টাকা প্রদান করিলেন। তাহাতে যে কিছু আহারীয় দ্রব্য আনিয়া আসামীদ্বয়কে প্রদান করা হইল, আসামীদ্বয় তাহা হইতে অতি অল্পই আহার করিলেন। অবশিষ্ট আহারীয় ও পূর্ব-আনীত আহারয় সমুদায়ই প্রহরীদিগের হইল। সেই সকল দ্রব্য আহার করিবার সময়, বিষের কথা আর প্রহরীদিগের মনে উদিত হইল না।

আমি পূর্বেই বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি যে, যে পাঁচজন প্রহরী আসামীদ্বয়কে লইয়া যাইতেছিল, তাঁহারা সকলেই মুসলমান।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

প্রহরীগণ যেরূপ ভাবে সেই সরাইতে বিশ্রাম করিতে লাগিল, তাহাতে তাঁহারা যে শীঘ্র সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবে, এরূপ অনুমান হইল না। একা-চালকগণ তাহাদিগের একার ঘোড়া একা হইতে খুলিয়া দিয়া ঘাস-দানার বন্দোবস্ত করিতে লাগিল।

এই ব্যাপার দেখিয়া হোসেন সেই সর্দ্দার-প্রহরীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আজ কি আপনারা এই স্থানে অবস্থান করিবেন?

প্রহরী। রাত্রিযাপন আমরা এই স্থানে করিব না। এই স্থান হইতে দুই ক্রোশ ব্যবধানে একটা খানা আছে, রাত্রিকালে সেই স্থানেই অবস্থিতি করিতে হইবে।

হোসেন। এক-চালকগণ যেরূপ ভাবে একা চালাইয়া আসি তেছে, তাহাতে দুই ক্রোশ পথ গমন করিতে অতি অল্প সময়েরই প্রয়োজন হইবে।

প্রহরী। এই স্থান হইতে বাহির হইলে, একঘণ্টার মধ্যেই আমরা সেই থানায় গিয়া অনায়াসেই উপস্থিত হইতে পারি।

হোসেন। আপনারা এই স্থান হইতে কখন রওনা হইতে চাহেন?

প্রহরী। একটু বিশ্রাম করিবার পরই, আমরা এই স্থান হইতে প্রস্থান করিব।

হোসেন। আপনাদিগের আহারাদির বন্দোবস্ত কোথায় হইবে?

প্রহরী। থানায় গিয়া উপস্থিত হইবার পর, সেই স্থানেই আহারাদি করিব, এরূপ বিবেচনা করিতেছি।

হোসেন। এই স্থানে দেখিতেছি, সমস্ত দ্রব্যই পাওয়া যায়। এই স্থান হইতে আহারাদি করিয়া, থানায় গমন করিলে হইত না কি?

প্রহরী। তাহা হইলে আমরা কখন থানায় গিয়া উপস্থিত হইতে পারি?

হোসেন। আহারাদির পর একটু বিশ্রাম করিয়া যদি আমরা এই স্থান হইতে রওনা হই, তাহা হইলে সন্ধ্যার পূৰ্বেই দুই ক্রোশ পথ অনায়াসেই অতিক্রম করিতে পারি। সন্ধ্যার পূর্বেই যদি আপনারা আসামীর সহিত থানায় গিয়া উপস্থিত হইতে পারেন, তাহা হইলে বোধ হয়, কোনরূপ ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা নাই।

প্রহরী। ক্ষতি কিছুই নাই; কিন্তু এখানে থাকিয়া আমা দিগের লাভ কি?

হোসেন। লাভ আর কিছুই নহে, কেবল সময় মত আহার করিয়া লইতে পারিবেন।

প্রহরী। এখানে আহারাদি করিবার কি সুবিধা হইবে?

হোসেন। না হইবে কেন? এখানে দেখিতেছি, সমস্ত দ্রব্যই পাওয়া যায়।

প্রহরী। এখানে আহারাদি প্রস্তুত করার পক্ষে নিতান্ত অসুবিধা হইবে।

হোসেন। কিসে?

প্রহরী। মোটে আমরা পাঁচজন বই প্রহরী নই। আমরা সকলেই এখন পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছি। ইহার মধ্যে আসামী দ্বয়কে পাহারাই বা কে দিবে, আহারাদির আয়োজনই বা কে করিবে?

হোসেন। আপনি যদি অনুমতি করেন, তাহা হইলে আমরাই সমস্ত আয়োজন করিয়া দিতে প্রস্তুত আছি।

প্রহরী। কে রন্ধন করিবে?

হোসেন। আমি আছি, আমার দুইজন পরিচারকও রহি আছে। অনুমতি পাইলে আহারীয় প্রস্তুত করিতে আর কত বিলম্ব হইবে?

প্রহরী। তোমাদিগের প্রস্তুত করা আহারীয় দ্রব্য আমরা কিরূপে আহার করিতে পারি?

হোসেন। কেন?

প্রহরী। আমি শুনিয়াছি, বহুদিবস হইল, এইরূপ একটী ঘটনা ঘটিয়াছিল। একজন কয়েদী-আসামীকে লইয়া দুইজন প্রহরী গমন করিতেছিল। যাইতে যাইতে পথে অপর আর একজন লোক আসিয়া তাহাদিগের সহিত মিলিত হয়। সেই ব্যক্তি সেই আসামীর দলস্থিত একজন; কিন্তু এ পরিচয় সে পূর্বে সেই প্রহরীদ্বয়ের নিকট প্রদান করে নাই। ক্রমে তাঁহারা এইরূপ একটী সরাইতে আসিয়া উপস্থিত হয়, এবং সেই ব্যক্তিই সকলের আহারীয় প্রস্তুত করে। প্রথমে আসামীকে আহার করান হয়, কিন্তু তাহাতে তাহার কোনরূপ অসুখ হয় না। পরিশেষে প্রহরীদ্বয় আহার করিতে বসে, কিন্তু আহার করা শেষ হইতে না হইতেই উভয়েই হতজ্ঞান হইয়া পড়ে। পরে সরাইয়ের লোজন যখন জানিতে পারে যে, দুইজন প্রহরী অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে, তখন তাঁহারা সেই স্থানে গমন করে; কিন্তু সেই কয়েদী-আসামী এবং আহার-প্রস্তুতকারীকে আর তাঁহারা দেখিতে পায় না। এই সংবাদ ক্ৰমে থানায় গিয়া উপ স্থিত হয়। প্রহরীদ্বয়কে হাসপাতালে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। থানাদার নিজে আসিয়া এই ঘটনার সবিশেষ অনুসন্ধান করেন। কিন্তু অনুসন্ধানে কোন ফলই পাওয়া যায় না। উভয় ব্যক্তির মধ্যে কেহই ধৃত হয় না। অধিকন্তু প্রহরীগণ চৈতন্য লাভ করিলে জানিতে পারা যায় যে, তাহাদিগের নিকট যে সকল টাকা-পয়সা ছিল, তাহার সমস্তই অপহৃত হইয়াছে। ইহা যখন প্রকৃত ঘটনা বলিয়া সকলেই অবগত আছেন, তখন বলুন দেখি, আমরা কিরূপে আপনাদিগকে বিশ্বাস করিয়া আপনাদিগকে রন্ধন করিতে অনুমতি প্রদান করিতে পারি?

হোসেন। আপনি যাহা বলিতেছেন, তাহা প্রকৃত। কিন্তু আপনারা আমাকে পূর্ব হইতে জানেন কি না, বলিতে পারি না। যদি আমাকে পূর্ব হইতে জানিতেন, তাহা হইলে আপ

আমাকে বোধ হয়, এতদূর অবিশ্বাস করিতে পারিতেন না। সে যাহা হউক, আপনারা যদি আমাকে বিশ্বাস করিতেই

পারেন, তাহা হইলে অপর আর কোনরূপ বন্দোবস্ত হইতে পারে না কি? অপর যেরূপ বন্দোবস্ত করিতে বলেন, আমরা সেইরূপ করিতেই প্রস্তুত আছি।

প্রহরী। আর কি বন্দোবস্ত হইতে পারে?

হোসেন। আমরা আর সমস্ত ঠিক করিয়া দিতেছি, আপনা দিগের এক ব্যক্তি অনায়াসেই পাক করিয়া লইতে পারেন।

প্রহরী। আমরা সকলেই অতিশয় ক্লান্ত। সুতরাং আমা দিগের মধ্যে কাহারও দ্বারা সেই কাৰ্য যে সম্পন্ন হইতে পারিবে, তাহা আমি বোধ করি না।

হোসেন। যদি এ কাৰ্য্য আপনাদিগের দ্বারা না হয়, তাহা হইলে আপনাদিগের মধ্যে একজন যদি রন্ধনশালার নিকট উপস্থিত থাকিতে পারেন, তাহা হইলে আমার সমভিব্যাহারী একজন লোকের দ্বারা আমি কাৰ্য্য করাইয়া লইতে পারি। আপনাদিগের সম্মুখে যদি আহারীয় প্রস্তুত হয়, তাহা হইলে আমরা উহাতে কিরূপে বিষ মিশ্রিত করিতে পারিব?

প্রহরী। অত গোলযোগে কায নাই। আমরা একরূপ জলযোগ করিয়াছি, এখন আর আহার করিবার ইচ্ছা নাই। সুতরাং আহারীয় প্রস্তুত করিবার আর প্রয়োজন কি? আপ নারা ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে আহারাদি প্ৰস্তুত করিয়া অনায়াসেই আহার করিতে পারেন।

হোসেন। আমি আমাদিগের আহারের নিমিত্ত বলিতেছি না। আপনারা যে আসামীদ্বয়ের সহিত আসিয়াছেন, তাঁহাদিগের আজ কয়েকদিবস হইতে আহার হয় নাই; কোন দিন অনাহারে, কোন দিন জলাহারে, দিন অতিবাহিত করিয়া আসিতেছেন। ইহাদিগের অদৃষ্টে যাহা আছে, তাহা পরে হইবে; কিন্তু এখন আমাদিগের ইচ্ছ, উঁহাদিগকে কিছু আহার করাই। এই নিমিত্ত আপনাদিগকে এত অনুরোধ করিতেছি।

প্রহরী। উঁহারা ত এখনই আহার করিলেন?

হোসেন। বাজারের মিষ্ট দ্রব্যাদি ভোজন করিয়া কোন্ ব্যক্তি কয় দিবস জীবনধারণ করিতে পারে?

প্রহরী। যখন আপনারা আহারাদি প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত এতই ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, তখন আমার সম্মুখে আপনারা আমা দিগের সকলের আহারীয় প্রস্তুত করুন। আহারীয় প্রস্তুত করি বার সময় আমি অনায়াসেই বুঝিতে পারি যে, ইহাতে আপনা দিগের কোনরূপ দুরভিসন্ধি আছে কি না।

হোসেন। এ উত্তম কথা।

উভয়ের মধ্যে এইরূপ কথাবার্তা হইবার পর, হোসেন নিজের অর্থ ব্যয় করিয়া সকলের আহারাদির উদ্যোগ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

একজন প্রহরীর তত্ত্বাবধানে সময়মত আহারীয় দ্রব্য সকল প্রস্তুত হইল। তখন হোসেন কহিলেন, এখন আহারীয় প্রস্তুত হইয়াছে, অনুমতি হইলে সকলেই ভোজন করিয়া লইতে পারেন।

প্রহরী। সকলের ভোজন একবারে হইতে পারে না। প্রথমে তোমরা ভোজন কর, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।

হোসেন। আমরা অগ্রে ভোজন করিব কেন? আপনাদিগের আহারাদি হইয়া গেলে, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।

প্রহরী। তাহা হইতে পারিবে না। তোমরা অগ্রে ভোজন করিলে, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।

হোসেন। যদি আপনারা নিতান্তই অগ্রে ভোজন না করেন, তাহা হইলে সকলেই এক সময় ভোজন করা যাউক। আপনারা থাকিতে আমরা কিরূপে অগ্রে খাইতে পাক্সি?

প্রহরী। তাহাও হইতে পারে না।

হোসেন। কেন?

প্রহরী। তোমরা ভোজন করিলে, তাহার পর তোমাদিগের কিরূপ অবস্থা হয়, তাহা অগ্রে দেখিয়া, পরিশেষে আমরা ভোজন করিব।

হোসেন। আপনার এ কথার অর্থ ত আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না।

প্রহরী। বুঝিতে না পারিয়া থাকেন, আমি বুঝাইয়া দিতেছি। আমাদিগের তত্ত্বাবধানে আপনারা আহারীয় দ্রব্য প্রস্তুত করিয়াছেন সত্য; কিন্তু আমাদিগের অলক্ষিতে আপনারা উহার সহিত অনায়াসেই বিষ মিশ্রিত করিয়া দিতে পারেন। প্রথমে আপনারা আহার করিলেই, আমরা জানিতে পারি যে, সেই সকল আহারীয় দ্রব্যের সহিত কোনরূপ বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত আছে কি না। আহারান্তে যদি আপনাদিগের কোনরূপ বৈলক্ষণ না ঘটে, তাহা হইলে আমরা সহজেই অনুমান করিতে পারিব যে, উহার সহিত কোনরূপ বিষাক্ত ব্য মিশ্রিত নাই। ইহার পর আর আপনাদিগকে আহারীয় দ্রব্যের নিকট গমন করিতে দিব না। আমরা নিজ হস্তে সেই সকল দ্রব্য পরিবেশন করিয়া আহার করিব।

হোসেন। আপনার এ কথায় আমাদিগের কোন উত্তর নাই। আমরা আহারীয় দ্রব্যর নিকট আর গমনই করিব না। আপনারা উহা হইতে কিছু কিছু আমাদিগকে প্রদান করুন, আমরা দূরে বসিয়া আহার করি। আমরা আপনাদিগের আদেশ প্রতিপালন করিব মাত্র। কিন্তু আপনাদিগকে এবং মনিবদ্বয়কে পরিত্যাগ করিয়া, পরিতুষ্টির সহিত কখনই আহার করিয়া উঠিতে পারিব না।

ইহার পর হোসেনের প্রস্তাব-মতই কাৰ্য্য হইল। হোসেন ও তাহার পরিচারকদ্বয় দূরে আহার করিতে বসিলেন; একজন প্রহরী তাহাদিগকে পরিবেশন করিলেন। প্রহরীগণ যখন দেখিল, হোসেন বা তাহার পরিচারকদ্বয় সেই সকল দ্রব্য আহার করিয়া সুস্থ শরীরে রহিলেন, তখন তাঁহারা তাহাদিগের নিজের আহারের উদ্যোগ করিতে লাগিল। কিন্তু আসামীদ্বয় আহার করিবে কি না, সে সম্বন্ধে কোন কথাই কহিল না। তখন হোসেন কহিলেন, আপনাদিগের আহারের উদ্যোগ হইতেছে; কিন্তু আসামীদ্বয় কখন আহার করিবেন?

প্রহরী। আসামীদ্বয়েরও কি আহারীয় প্রস্তুত করিয়াছেন?

হোসেন। উঁহারাই আহার করিবেন বলিয়া, সকলের নিমিত্ত আহারীয় আমরা প্রস্তুত করিয়াছি। নতুবা আমাদিগের আহারীয় প্রস্তুত করিবার কোনরূপ প্রয়োজনই ছিল না।

প্রহরী। উহার ফাঁসি যাইবার আসামী। উঁহাদিগকে আমরা কিরূপে আহার করিতে অনুমতি দিতে পারি?

হোসেন। যাহাদিগকে ফাঁসি দিবার হুকুম হয়, ফাঁসির পূর্বে যে কয় দিবস তাঁহারা বাঁচিয়া থাকে, সে কয় দিবস কি তাহাদিগকে আহার করিতে দেওয়া হয় না। যদি সরকারের এরূপ কোন নিয়ম থাকে, তাহা আমি অবগত নহি। বরং লোক-পরম্পরায় শুনিতে পাওয়া যায়, ফঁসি যাইবার পূর্বে ফাঁসির আসামী যাহা খাইতে চাহে, সরকার হইতে তাহাই তাহাকে খাইতে দেওয়া হয়। সে যাহা হউক, এত পরিশ্রম করিয়া যখন আমরা আহারীয় প্রস্তুত করিয়াছি, তখন উঁহাদিগকে কিছু আহার করিতে দিয়া আমাকে সবিশেষরূপ অনুগৃহীত করুন।

প্রহরী। উঁহারা আহার করুন, বা না করুন, তাহাতে আপনার ক্ষতি-বৃদ্ধি কি?

হোসেন। ক্ষতি নাই? খুব ক্ষতি আছে। যিনি আমার অন্নদাতা, তিনি আহার করিতে পাইবেন না, আর আমরা আহার করিয়া বসিয়া আছি! ইহা অপেক্ষা দুঃখের বিষয় আর কি হইতে পারে? আমি আপনাদিগকে সবিশেষরূপ অনুবোধ করি তেছি, উঁহাদিগের আহার করিতে দিবার পক্ষে কোনরূপ প্রতি। বন্ধক হইবেন না। উঁহারা যেরূপ মনঃকষ্টে আছেন, তাহাতে যে আহার করিতে পারিবেন, সে ভরসা আমার নাই; তবে আহার করিতে বসিয়াছেন, ইহা দেখিলেই আমার মনটা একটু সন্তুষ্ট হইবে, এই মাত্র। এই অনুগ্রহের নিমিত্ত যদি আপনাদিগের আরও কিছু লইবার প্রত্যাশা থাকে, তাহাও আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারেন।

প্রহরী। যখন আপনি এরূপ ভাবে অনুরোধ করিতেছেন, তখন আপনার অনুবোধই বা রক্ষা না করি কি প্রকারে? তবে জানেন কি, আমরা পেটের দায়ে চাকুরী করিতে আসিয়াছি, তাই আপনাকে বলিতেছি।

হোসেন। ইহার জন্য এত গোলযোগ করিবার প্রয়োজন কি? আপনারা যখন যাহা চাহিতেছেন, আমি তখনই তাহা আপনা দিগকে প্রদান করিতেছি। প্রথমেই এ কথা আমাকে বলিতে পারিতেন! আপনাদিগের প্রস্তাবে যদি আমি সম্মত হইতে পারি তাম, তাহা হইলে উঁহাদিগের নিমিত্ত আহারীয় প্রস্তুত করিতাম, আর যদি সেই প্রস্তাব আমার সাধ্যাতীত হইত, তাহা হইলে আপনাদিগকে সেলাম করিয়া আমি ধীরে ধীরে প্রস্থান করিতাম। আচ্ছা, এখন বলুন দেখি, উঁহাদিগকে আহার করিবার অনুমতি দিবার নিমিত্ত আপনারা কি প্রার্থনা করেন?

প্রহরী। পঁচিশ টাকা।

হোসেন। আপনারা পাচজন আছেন, আপনাদিগের প্রত্যেক কেই পঁচিশ টাকা করিয়া আমাকে প্রদান করিতে হইবে?

প্রহরী। না, মোট পচিশ টাকা প্রদান করিলেই হইবে।

হোসেন। পঁচিশ টাকা আমি প্রদান করিতে পারিব না। আপনারা পাঁচজন আছেন, প্রত্যেককে দুই টাকা হিসাবে মোট আপনাদিগকে আমি দশ টাকা প্রদান করিতেছি। ইহাতে আপ নারা সম্মত হইয়া আসামীদ্বয়কে আহার করিবার নিমিত্ত অনুমতি প্রদান করেন ভালই, নতুবা আমি এ স্থান হইতে প্রস্থান করি তেছি, আপনাদিগের মনে যাহা উদয় হয়, তাহা করিবেন।

প্রহরী। আপনাকে আর প্রস্থান করিতে হইবে না। দশ টাকা নিতান্ত অল্প হইতেছে, আর পাঁচটী টাকা বাড়াইয়া দিন।

হোসেন। পাঁচ টাকা ত দূরের কথা, দশ টাকার উপর আমি আর পাঁচটা পয়সাও, বাড়াইয়া দিতে পারিব না। ইহাতে আপনা দিগের যাহা অভিরুচি হয়, তাহা করিতে পারেন।

প্রহরী। যে কাৰ্যে আপনারা অসন্তুষ্ট হন, সে কাৰ্য্য আমা দিগের কোনরূপেই কৰ্তব্য নহে। আচ্ছা, আপনার প্রস্তাবেই আমরা সম্মত হইলাম। টাকা দশটী কথন প্রদান করিবেন?

হোসেন। যখন আপনাদিগের আবশ্যক হইবে, তখনই আপনারা লইতে পারেন। এখনই চাহেন, তাহাও আমাকে বলুন, এখনই আমি উহা আপনাদিগের হস্তে প্রদান করিতেছি।

প্রহরী। সেই ভাল। আমি একাকী নহি, পাঁচজনের কাৰ্য্য, অগ্রে দেওয়াই ভাল।

প্রহরীর কথা শুনিয়া হোসেন আর কোন কথা কহিলেন, দশটী টাকা বাহির করিয়া তৎক্ষণাৎ সেই প্রহরীর হস্তে প্রদান করিলেন।

হোসেন টাকা প্রদান করিলেন সত্য; কিন্তু মনে মনে বড়ই অসন্তুষ্ট হইলেন। মনে করিলেন, এরূপ অত্যাচার করিয়া টাকা লওয়া নিতান্ত অন্যায়। আসামীর সহিত কথা কহিবার প্রয়োজন হইলে টাকা ভিন্ন হইতে পারিবে না! স্নানের নিমিত্ত টাকা, জলপানের নিমিত্ত টাকা, আহারের নিমিত্ত টাকা, এবং বিশ্রাম করিবার নিমিত্ত একখানি চারিপায়া প্রদান করিতে হইলেও টাকা! কি ভয়ানক অত্যাচার! এই সকল অত্যাচারের নিমিত্তই পুলিসের এত দুর্নাম।

হোসেন মনে মনে এইরূপ ভাবিতে লাগিলেন সত্য; কিন্তু প্রকাশ্যে কোন কথা কহিতে পারিলেন না।

গোফুর খাঁ ও ওসমান, প্রথমতঃ কিছুতেই আহার করিতে সম্মত হইলেন না। কিন্তু কোন প্রকারেই হোসেনের অনুরোধ লম্বন করতে না পারিয়া, আহার করিবার নিমিত্ত একবার বসিলেন মাত্র; ফলতঃ আহার করিতে পারিলেন না, চক্ষু-জলে আহারীয় ভাসিয়া যাইতে লাগিল।

আহারান্তে প্রহরীগণ আপনাপন চারিপায়ার উপর শয়ন করিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিল। কেবল একজন মাত্র প্রহরী আসামীদ্বয়কে পাহারা দিতে লাগিল। আসামীদ্বয় সেই গৃহের ভিতর কয়েদী অবস্থায় বিষন্ন মনে বসিয়া রহিলেন।

এইরূপে প্রায় সমস্ত দিবস সেই স্থানে অতিবাহিত হইয়া গেল। সন্ধ্যা হইতে অতি অল্পমাত্র বাকী আছে, সেই সময় একজন প্রহরী এক্কা-চালকগণকে ডাকিল ও কহিল, বেলা প্রায় অবসন্ন হইয়া আসিয়াছে। এখনও অনেকদূর আমাদিগকে গমন করিতে হইবে, আর বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই। একা সকল শীঘ্র প্রস্তুত করিয়া আন, আমরা এখনই এই স্থান হইতে প্রস্থান করিব।

প্রহরীর কথা শুনিয়া এক্কা-চালকগণ তখনই এ প্রস্তুত করিয়া আনিল। প্রহরীগণ আসামীদ্বয়ের সহিত উহাতে আরোহণ করিল, হোসেনও আপনার দুইজন পরিচারকের সহিত আপন একায় আরোহণ করিয়া তাহাদিগের এক্কার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। এক্কা-চালকগণ অখে কষাঘাত করিতে করিতে বেগে একা চালাইতে আরম্ভ করিল।

সন্ধ্যার অল্প পরেই সকলে একটী থানায় গিয়া উপস্থিত হইল। সেই স্থানে সকলে একা হইতে অবতরণ করিয়া থানার ভিতর প্রবেশ করিলেন। থানায় সেই সময় দারোগা উপস্থিত ছিলেন না, কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে তিনি স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলেন। অনুসন্ধানে হোসেন জানিতে পারিলেন যে, সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্ম্মচারী অর্থাৎ দারোগাও একজন মুসলমান বংশ-সম্ভূত।

যে সকল এক্কায় আরোহণ করিয়া আমাশয়, প্রহরীগণ ও হোসেন প্রভৃতি গমন করিয়াছিলেন, এখন সেই সকল এক বিদায় করিয়া দিবার প্রয়োজন হইল। কারণ, তাঁহারা অনেকদূর আগমন করায়, তাহাদিগের অশ্বগণ সবিশেষরূপ ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে। তদ্ব্যতীত সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবার সময় সেই স্থানে যতগুলি একার প্রয়োজন হইবে, ততগুলিই অনায়াসে পাওয়া যাইবে।

এইরূপ বন্দোবস্ত দেখিয়া, যে এক্কায় হোসেন তাহার ভৃত্য দ্বয়ের সহিত আগমন করিয়াছিলেন, তাহাকে ভাড়া দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন। সেই এক্কা-চালককে যে পরিমিত ভাড়া দিবার নিমিত্ত প্রহরীগণ বলিয়া দিল, হোসেন তাহাতে দ্বিরুক্তি না করিয়া তাহাই দিয়া দিলেন। একা-চালক আপনার ভাড়া পাইয়া থানার বাহিরে গিয়া উপবেশন করিল।

কেবলমাত্র একখানি এক্কার ভাড়া দিতে দেখিয়া একজন প্রহরী কহিল, আপনি কেবলমাত্র একখানি একার ভাড়া দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন দেখিতেছি। আর অপর এক্কা তিনখানি, যাহাতে আপনার মনিবদ্বয় এবং আমরা আসিয়াছি, তাহার ভাড়াও ওই সঙ্গে দিলেন না কেন?

হোসেন। আপনাদিগের একা-ভাড়া প্রভৃতি যাহা কিছু ব্যয় হইবে, তাহার নিমিত্ত আমি এককালীন আপনাদিগকে পঞ্চাশ টাকা প্রদান করিয়াছি। তাহা হইতে একা-ভাড়া প্রদান করিতে আপনাদিগের কোনরূপ আপত্তি আছে কি?

প্রহরী। আপত্তি আর কিছুই নাই, তবে এখন আপনি দিয়া দিলেও কোন ক্ষতি নাই।

হোসেন। আমি একবার প্রদান করিয়াছি। বলেন না হয়, আর একবার প্রদান করি। যখন আমরা সম্পূর্ণরূপে আপনাদিগের হাতে পড়িয়াছি, তখন যাহা বলিবেন, তাহাই করিতে হইবে।

প্রহরী। আপনি অসন্তুষ্ট হইবেন না। একা-ভাড়া এখন আপনি প্রদান করুন, বা আমরা প্রদান করি, তাহাতে কোনরূপ ক্ষতি নাই। কারণ, আমাদিগের নিকট আপনার যে পঞ্চাশ টাকা আছে, খরচ-পত্ৰ বাদে তাহা হইতে যাহা অবশিষ্ট থাকিবে, তাহা আপনারই। আর যদি উহাতে সমস্ত খরচের সঙ্কুলান না হয়, তাহা হইলে আর যাহা লাগিবে, তাহা আপনাকে দিতে হইবে। এরূপ অবস্থায় সামান্য একা-ভাড়ার নিমিত্ত এত গোলযোগ করিতেছেন কেন?

হোসেন। আমি কোনরূপ গোলযোগই করিতেছি না। যে টাকা আপনাদিগের নিকট আছে, তাহা হইতে এক্কা-ভাড়া প্রদান করিতে যদি আপনাদিগের কোনরূপ অসুবিধা হয়, তাহা হইলে এখনই আমি উহা প্রদান করিতেছি।

প্রহরী। অসুবিধা আর কিছুই নয়। তবে টাকাগুলি যেরূপ ভাবে বাঁধিয়া রাখা আছে, তাহা হইতে কিছু টাকা বাহির করিয়া লইতে হইলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। তাই যাহাতে এক্কা ওয়ালাগণের আর বিলম্ব না হয়, সেই নিমিত্ত ভাড়াটা এখন আপ, নাকে দিতে বলিয়াছিলাম। ইহাতে আমাদিগের কোনরূপ দুরভিসন্ধি নাই।

হোসেন। সামান্য টাকার নিমিত্ত আর অধিক কথার প্রয়ো জন নাই। আমি এখন উহা প্রদান করিতেছি, যেরূপ ভাল বিবেচনা হয়, পরিশেষে আপনারা তাহা করিবেন।

এই বলিয়া হোসেন আর তিনখানি একার ভাড়াও আপনার নিকট হইতে উঁহাদিগকে দিয়া দিলেন।

আপনাপন ন্যায্য মজুরি বুঝিয়া লইয়া একাওয়ালাগণ সেই স্থান হইতে তখনই প্রস্থান করিল।

প্রহরীগণের ব্যবহার দেখিয়া হোসেন মনে মনে ভাবিলেন, উঁহাদিগের খরচের নিমিত্ত যে পঞ্চাশ টাকা দেওয়া হইয়াছে, তাহা পাইবার আর কোনরূপ উপায় নাই। অথচ আরও যাহা কিছু খরচ হইবে, তাহার সমস্তই তাঁহাকে বহন করিতে হইবে।

এই সময় গোফুর খাঁ হোসেনকে তাহার নিকট ডাকিলেন। হোসেন তাহার নিকট গমন করিলে তিনি কহিলেন, হোসেন। আমি দেখিতেছি, তুমি নিরর্থক অনেক অর্থ নষ্ট করিতেছ।

হোসেন। আপনাদিগের জীবন অপেক্ষা কি অর্থের মূল্য অধিক? যে আপনাদিগের নিমিত্ত আমি সেই অর্থ ব্যয় করিব না?

গোফুর। আমাদিগের জীবন রক্ষার নিমিত্ত অর্থ ব্যয় করিতে আমাদিগের কিছুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু এইরূপ নিরর্থক অর্থ ব্যয় করিয়া কি আমাদিগের জীবন রক্ষা করিতে পারিবে?

হোসেন। এরূপ ভাবে অর্থ ব্যয় করিয়া, আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে পারি না সত্য; কিন্তু আপাততঃ আপনাদিগের কষ্টের অনেক লাঘব করিতে সমর্থ হইব।

গোফুর। যাহাদিগের জীবনের আর কিছুমাত্র আশা নাই, দুই চারিদিবসের নিমিত্ত তাহাদিগের শারীরিক কষ্ট নিবারণ করিয়া ফল কি? মানসিক কষ্টের নিকট শারীরিক কষ্ট কিছুই নহে। যে ব্যক্তি সর্বদা মানসিক কষ্ট ভোগ করিতেছে, তাহার যতই কেন শারীরিক কষ্ট হউক না, তাহার দিকে তাহার লক্ষ্যই হয় না।

হোসেন। আপনি যাহা বলিতেছেন, তাহা প্রকৃত। কিন্তু আমাদিগের সম্মুখে আপনি শারীরিক কষ্ট ভোগ করিবেন, অর্থ থাকিতে আমরা কিরূপে উহা দেখিতে সমর্থ হইব? আর আপনাদিগের জীবনের আশা নাই, এ কথাই বা আপনারা কিরূপে অনুমান করিলেন?

গোফুর। যাহার ফাঁসির হুকুম হইয়াছে, তাহার আর জীবনের আশা কি?

হোসেন। এখনও অনেক আশা আছে। যে বিচারালয় হইতে আপনাদিগের ফাঁসির হুকুম হইয়াছে, তাহার উপর বিচারালয় আছে। সেখানে আপীল করিব, যেরূপ ভাবে ও যত অর্থ ব্যয় করিয়া চেষ্টা করিতে হয়, তাহা করিব। ইহাতে কি কোনরূপ ফল প্রাপ্ত হইব না? ঈশ্বর না করুন, যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে ছোট লাটকে ধরিব; আবশ্যক হইলে বড় লাটের নিকট পর্যন্ত গমন করিব। পরিশেষে বিলাত পর্যন্ত চেষ্টা করিব। ইহাতেও কি সুবিচার হইবার সম্ভাবনা নাই? যদি ইহাতেও না পারি, তাহ হইলে অর্থ ব্যয় করিয়া, আপনাদিগের জীবনের নিমিত্ত অসৎ উপায় অবলম্বন করিতে ক্রটি করিব না। আপনি আপনার মনকে স্থির করিয়া রাখুন। দেখিবেন, যেরূপ উপায়েই হউক, কখনই আপনাদিগকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিতে দিব না।

গোফুর। তুমি যাহা মনে করিতেছ, তাহা সম্পূর্ণরূপ অসম্ভব। ইহা কখনই হইতে পারে না।

হোসেন। জগতে অসম্ভব কিছুই নাই; অর্থে না হইতে পারে, এরূপ কোন কাৰ্য্যই নাই। দেখিবেন, যাহা মুখে বলিতেছি, কাৰ্যে তাহা পরিণত করিতে পারি কি না!

গোফুর। আমার বিবেচনায় তুমি আর নিরর্থক অর্থ ব্যয় করিও না। আমাদিগের নিমিত্ত এইরূপ ভাবে যে অর্থ ব্যয় করিবে, তাহা আমাদিগের নামে দরিদ্র ব্যক্তিকে দান করিও। তাহা হইলে আমাদিগের পরকালের অনেক উপকার করা হইবে। ইহকালে যাহা হইবার, তাহা হইল।

হোসেন। গরিব-দুঃখীকে আপনারা যেরূপ ভাবে অর্থ দান করিতে কহিবেন, তাহা আমরা করিব। তদ্ব্যতীত আপনাদিগের জীবন-রক্ষা করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে চেষ্টা করিতে ক্রটি করিব না। বিশেষ–

গোফুর। বিশেষ কি?

হোসেন। এরূপ ভাবে অর্থ আমি যে নিজের ইচ্ছামত ব্যয় করিতেছি, তাহা নহে। আপনার বাড়ীর স্ত্রীলোকগণ সকলেই আপনাদিগের জীবনের নিমিত্ত তাহাদিগের সঞ্চিত সমস্ত অর্থ ও তাঁহাদিগের সমস্ত অলঙ্কার-পত্র পর্যন্ত আমার হস্তে প্রদান করিতে উদ্যত হইয়াছেন, এবং বলিতেছেন, যদি কোনরূপে আমি আপনা দিগের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ না হই, তাহা হইলে তাঁহারা সকলেই বিষপান করিয়া আপনাপন জীবন নষ্ট করিবেন। আমি যদিচ এখন তাঁহাদিগের নিকট হইতে কোন অর্থ গ্রহণ করি নাই, তথাপি যদি আমি এইরূপ ব্যয় করিয়া আপনাদিগের জীবন রক্ষার কোনরূপ উপায় না করি, তাহা হইলে কি সর্বনাশ ঘটিবে, একবার মনে করিয়া দেখুন দেখি? : গোফুর। বাড়ীর স্ত্রীলোকগণ যখন আমাদিগের জীবনের নিমিত্ত এত উৎসুক, তাঁহাদিগের নিমিত্ত কিরূপ বন্দোবস্ত করিতে ইচ্ছা করিয়াছেন?

হোসেন। সে সম্বন্ধে আমি এ পর্যন্ত কিছুই মনে ভাবি নাই। কারণ, আমার বিশ্বাস, এ সম্বন্ধে আমার কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার প্রয়োজন হইবে না!

গোফুর। কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার প্রয়োজন হইবে না কেন?

হোসেন। যখন আমার বিশ্বাস যে, যেরূপে পারি, আপনা দিগের জীবন রক্ষা করিব, তখন আমার সেই সকল দিকে এখন দৃষ্টি করিবার কোনরূপ প্রয়োজন নাই। যেরূপ ভাবে এ পর্যন্ত চলিয়া আসিতেছে, এখন সেইরূপ ভাবেই চলুক। পরিশেষে আপনারা নিষ্কৃতি লাভ করিয়া যখন বাড়ীতে প্রত্যাবর্তন করিবেন, সেই সময় আপনার যেরূপ অভিরুচি হয়, সেইরূপ করিবেন।

গোফুর। সে বহুদূরের কথা।

হোসেন। আমি দিব্য চক্ষে দেখিতে পাইতেছি, উহা দূরের কথা নহে।

গোফুর। সে পরের কথা। আমাদিগকে বাঁচাইতে পারিবে, এরূপ লুব্ধ আশ্বাসের উপর একবারে নির্ভর করিয়া থাকিও না। আমাদিগকে খালাস করিবার যতদূর চেষ্টা করিতে হয়, কর; অথচ অপরাপর বন্দোবস্তের দিকেও সবিশেষরূপ দৃষ্টি রাখিও। কারণ, যদি আমাদিগের জীবন রক্ষাই না হয়, তাহা হইলে আমি বাঁচিয়া থাকিতে থাকিতে আমার ইচ্ছামত বিষয়-আদির বন্দোবস্ত করার আবশ্যক। জমিদারী সম্বন্ধে কিরূপ বন্দোবস্ত করিতে ইচ্ছা করিতেছ?

হোসেন। এখনও কোনরূপ বন্দোবস্ত করিবার চেষ্টা করি নাই। যেরূপ আদেশ করিবেন, সেইরূপ ভাবেই বন্দোস্ত করিব।

গোফুর। মোকদ্দমা খরচের নিমিত্ত যে টাকা সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছ, সেই টাকার নিমিত্ত জমিদারীর কোন অংশ নষ্ট করিতে হইয়াছে কি?

হোসেন। টাকার নিমিত্ত জমিদারীর কোন অংশ আমি নষ্ট করি নাই, বা উহা বন্ধক দিতেও হয় নাই। সরকারী তহবিলের যে যে স্থানে যে যে টাকা মজুত ছিল, তাহাই সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছি মাত্র। যদি কিছু দেনা হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার নিমিত্ত বিষয়-আদি কিছুই বন্ধক দিতে হইবে না। সমস্ত জমিদারী এ পর্যন্ত যেরূপ ভাবে ছিল, এখনও সেইরূপ ভাবেই আছে।

হোসেন ও গোফুর খাঁর সহিত এইরূপ কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময়ে একজন প্রহরী আসিয়া আসামীদ্বয়কে হাজতের ভিতর বদ্ধ করিয়া দিল। সুতরাং উভয়ের কথাবার্তা সেই সময়ের নিমিত্ত শেষ হইয়া গেল। আসামীদ্বয় সবিশেষ দুঃখিত অন্তঃকরণে হাজতের ভিতর প্রবেশ করিলেন।

সম্পূর্ণ।

 ঘর-পোড়া লোক – ৩য় বা শেষ অংশ

ঘর-পোড়া লোক  (শেষ অংশ) (দারোগার হয় ৭৬ম সংখ্যা)
(অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত।)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে শ্রী বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
Al Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। শ্রাবণ
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.

ঘর-পোড়া লোক।
(শেষ অংশ)
প্রথম পরিচ্ছেদ।

আসামীদ্বয় থানায় উপস্থিত হইলে পর, সেই সময় থানায় যে কর্ম্মচারী উপস্থিত ছিলেন, তিনি আসামীদ্বয়কে হাজত গৃহে বন্ধ করিয়া রাখিলেন।

থানায় হাজত-গৃহ কিরূপ, তাহা পাঠকগণ অবগত আছেন কি? থানার ভিতর থানার কর্ম্মচারীগণ যে স্থানে বসিয়া সৰ্ব্বদা কাষ-কৰ্ম্ম বা লেখা-পড়া করিয়া থাকেন, তাহার দুই পার্শ্বে বা তাহার সন্নিকটে ছোট ছোট দুইটী গৃহ প্রায়ই দেখিতে পাওয়া যায়; উহাই থানার হাজত-গৃহ। উহার একটা পুরুষ-কয়েদী এবং অপরটা স্ত্রী-কয়েদীর নিমিত্ত প্রায়ই ব্যবহৃত হইয়া থাকে। সেই সকল গৃহে কেবল একটামাত্র দরজা ভিন্ন অপর জানালা দরজা প্রায়ই থাকে না। চোর বলুন, মাতাল বলুন, হত্যাকারী বলুন, বা যে কোন অপরাধের আসামী বলুন, সমস্ত দিনরাত্রির মধ্যে যাহারা ধৃত হইয়া থানায় আইসে, তাহাদিগের সকলকেই একত্র সেই গৃহের ভিতর থাকিতে হয়। বিছানার নিমিত্ত উহার মধ্যে একখানি কম্বল থাকে মাত্র।

গোফুর খাঁ ও ওসমান সেইরূপ একটী হাজত-গৃহের ভিতর আবদ্ধ হইলেন। সেই সময় হোসেন আঁহাদিগের সহিত কথাবার্তা কহিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে, তাহার সমভিব্যাহারী সেই প্রহরী কহিল, যে পর্যন্ত আসামী থানার ভিতর থাকিবে, সেই পৰ্য্যন্ত আসামী সম্বন্ধে কোন কথা বলা আমাদিগের ক্ষমতার অতীত। এখন যদি আপনি আসামীদ্বয়কে কিছু বলিতে চাহেন, বা উঁহারা আপনাকে কিছু বলিতে চাহেন, তাহা হইলে এখন এই থানায় কে কর্ম্মচারী উপস্থিত আছেন, ভাহার আদেশ লইবার প্রয়োজন। কারণ, যে পর্যন্ত আসামী দ্বয় থানার ভিতর থাকিবেন, সেই পৰ্যন্ত সেই আসামীদ্বয়ের সহিত আমাদিগের কোনরূপ সংস্রক নাই। এখন সেই আসামীদ্বয় সম্বন্ধে যাহা কিছু জবাবদিহি, তাহা এই থানার উপস্থিত কর্ম্মচারীকে করিতে হইবে।

প্রহরীর নিকট হইতে এই কথা শুনিয়া হোসেন ভাবি লেন, এ বড় মন্দ কথা নহে। আসামীদ্বয়ের সহিত কথা কহিবার নিমিত্ত আমি একবার উঁহাদিগকে অর্থ প্রদান করিয়াছি; কিন্তু এখন দেখিতেছি, আমি সেই অর্থ বৃথা নষ্ট করিয়াছি। ইহাদিগের সহিত যদি আবার কথা কহিবার ইচ্ছা প্রকাশ করি, তাহা হইলে এই থানায় এখন যে কর্ম্মচারী উপস্থিত আছেন, তিনি যে আবার কত অর্থ প্রার্থনা করিবেন, তাহাই বা এখন কে বলিতে পারে? এরূপ ভাবে নিরর্থক কতবার অর্থ নষ্ট করা যাইতে পারে? ইহাদিগের সহিত এখন আর কোন কথাই কহিব না।

কল্য প্রাতঃকালে প্রহরীগণ যখন উঁহাদিগকে থানা ইতে ঘর-পোড়া লোক।

বাহির করিয়া লইয়া যাইবে, সেই সময় সুযোগমত পথের মধ্যে উঁহাদিগের সহিত কথা কহিলেই হইতে পারিবে।

মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া হোসেন আপনার ভৃত্যদ্বয়ের সহিত সেই থানার ভিতর এক স্থানে শয়ন করিলেন।

সেই সময় থানায় যে কর্ম্মচারী উপস্থিত ছিলেন, তাহার হাতের কার্য সম্পন্ন করিয়া, একবার তিনি তাহার আফিস হইতে বাহির হইয়া আসামীদ্বয়কে দেখিবার নিমিত্ত সেই হাজত-গৃহের নিকট গমন করিলেন। সেই হাজত-গৃহের চাবি যে প্রহরীর নিকট ছিল, কর্ম্মচারীর আদেশমত সে সেই হাজত-গৃহ খুলিয়া দিল। কর্ম্মচারী হাজত-গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলেন। আসামীদ্বয়ের একটু শুভদৃষ্ট বলিতে হইবে যে, সেই দিবস সেই হাজত-গৃহের ভিতর সেই দুইটী আসামী ভিন্ন আর কোন আসামী ছিল না।

কর্ম্মচারী হাজত-গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমার নাম কি?

গোফুর। আমার নাম গোফুর খাঁ।

কর্ম্মচারী। তোমার কত দিবসের নিমিত্ত কারাদণ্ডের হুকুম হইয়াছে?

গোফুর। আমার কারাদণ্ডের আদেশ হয় নাই, জীবন দণ্ডের আদেশ হইয়াছে।

কর্ম্মচারী। (ওসমানের প্রতি) আর তোমার?

ওসমান। আমারও তাহাই।

কর্ম্মচারী। তোমরা কি করিয়াছিলে, হত্যা করিয়াছিলে কি?

ওসমান। হত্যা না করিলে আর আমাদের জীবনদণ্ডের আদেশ হইবে কেন?

কর্ম্মচারী। তোমাদিগকে এই স্থানে রাত্রিযাপন করিতে হইবে। ওই কম্বল লইয়া তোমরা অনায়াসে তাহার উপর শয়ন করিতে পার।

এই বলিয়া কর্ম্মচারী সেই হাজত-গৃহ হইতে বাহির হইলেন। প্রহরী সেই গৃহ পুনরায় তালাবদ্ধ করিয়া দিল।

বাহিরে আসিয়াই কর্ম্মচারী দেখিতে পাইলেন, একটু দুরে তিনজন লোক শয়ন করিয়া আছে। উঁহাদিগকে দেখিয়া তিনি তাহাদিগের নিকট গমন করিলেন ও কহিলেন, তোমরা কে এখানে শয়ন করিয়া আছ?

হোসেন। আমরা।

কর্ম্মচারী। আমরা কে?

হোসেন। আমি ও আমার দুইজন পরিচারক।

কর্ম্মচারী। তুমি কে?

হোসেন। আমার নাম হোসেন।

কৰ্ম্মচারী। তোমরা কোথায় থাক?

হোসেন। আমাদিগের বাসস্থান এখানে নহে।

কর্ম্মচারী। তবে তোমরা এখানে কি নিমিত্ত আসিয়াছ?

হোসেন। আমরা ওই আসামীদিগের সহিত আসিয়াছি।

কর্ম্মচারী। কোন্ আসামী?

হোসেন। যাঁহারা হাজতে আছেন।

কর্ম্মচারী। তাই বল না কেন, তোমরা প্রহরী; সেই আসামীদ্বয়কে এখানে আনিয়াছ।

হোসেন। না মহাশয়! আমরা প্রহরী নহি। প্রহরীগণ। আসামীদ্বয়কে লইয়া আসিয়াছে, আমরা তাহাদিগের সঙ্গে আসিয়াছি মাত্র।

কর্ম্মচারী। তোমাদিগের সঙ্গে আসিবার প্রয়োজন?

হোসেন। সঙ্গে আসিবার প্রয়োজন আছে বলিয়াই আসিয়াছি। উঁহারা আমাদিগের মনিব।

কর্ম্মচারী। কি! আসামীদ্বয় তোমাদিগের মনিব?

হোসেন। হাঁ মহাশয়!

কর্ম্মচারী। তোমার মনিবদ্বয় চরমদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছে, এরূপ অবস্থায় তাহাদিগের সহিত তোমাদিগকে একত্র গমন করিতে কে আদেশ প্রদান করিয়াছে? কাহার হুকুমে তোমরা তাহাদের সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছ?

হোসেন। কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেবের আদেশমত আমরা ইহাদিগের সহিত গমন করিতেছি।

কর্ম্মচারী। কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেব আসামীদ্বয়ের সমভি ব্যাহারে তোমাদিগকে গমন করিতে যে আদেশ করিয়াছেন, তাহা আসামীদ্বয়ের সমভিব্যাহারী প্রহরীগণ অবগত আছে কি?

হোসেন। তাঁহারা অবগত আছে। তদ্ব্যতীত ইহাদিগকে লইয়া যাইবার নিমিত্ত যে কোন অর্থের প্রয়োজন হইতেছে, তাহা আমাকে প্রদান করিতে বলিয়া দিয়াছেন, আমিও তাহা দিয়া আসিতেছি।

কর্ম্মচারী। কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেব আসামীদ্বয়ের সহিত গমন করিবার আদেশ দিয়াছেন সত্য; কিন্তু থানার ভিতর রাত্রিকালে শুইয়া থাকিবার নিমিত্ত আদেশ দিয়াছেন কি?

হোসেন। এরূপ কথা কিছু বিশেষ করিয়া বলেন নাই।

কর্ম্মচারী। এরূপ অবস্থায় আমি আপনাদিগকে এই স্থানে শয়ন করিয়া থাকিবার নিমিত্ত কোন প্রকারেই আদেশ

প্রদান করিতে পারি না।

হোসেন। আমাদিগের অপরাধ?

কর্ম্মচারী। তোমাদিগের অপরাধ না থাকিলেও তোমরা যখন খুনী আসামীর সঙ্গের লোক, তখন তোমরা এক রূপ অপরাধী।

হোসেন। স্বীকার করিলাম আমরা অপরাধী। তাহাতেই বা ক্ষতি কি?

কর্ম্মচারী। তোমাদিগের মনে কি আছে, তাহা তোমরাই বলিতে পার। রাত্রিকালে সকলে শয়ন করিলে যদি কোনরূপে তোমর আসামীদ্বয়কে পলাইবার উপায় করিয়া দেও, তাহা হইলে কি হইবে বল দেখি?

হোসেন। না মহাশয়! আমরা সেরূপ চেষ্টা কখনই করিব না। এরূপ কথা আমাদিগের মনে এ পর্যন্ত উদয় হয় নাই। আর যদি এখন আমাদিগের সেইরূপ ইচ্ছাই হয়, তাহা হইলে আমাদিগের সে ক্ষমতা কোথায়?

কর্ম্মচারী। সে যাহা হউক, রাত্রিকালে তোমাদিগকে আমি কোনরূপেই থানার ভিতর থাকিতে দিব না।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

হোসেনের সহিত থানার সেই উপস্থিত কর্ম্মচারীর এইরূপ কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময়ে থানার দারোগা, যিনি অপর কাৰ্য্য উপলক্ষে স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলেন, তিনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও কর্ম্মচারীকে কহিলেন, কি হে। কিসের গোলযোগ?

কর্ম্মচারী। গোলযোগ অপর কিছুই নহে। খুনী মোক দমায় প্রাণদণ্ডের আদেশ হইয়াছে, এইরূপ দুইটী আসামী এখানে আসিয়াছে। আমি তাহাদিগকে হাজত-গৃহে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছি। আসামীদ্বয়ের সমভিব্যাহারে প্রহরীগণ ব্যতীত অপর আরও তিনজন লোক আসিয়াছে। তাঁহারা কে, এবং কি চরিত্রের লোক, তাহা আমরা অবগত নহি। কিন্তু তাহার এই থানার ভিতর রাত্রিবাস করিতে চাহে। তাই আমি তাহাদিগকে এখান হইতে তাড়াইয়া দিতেছি। অপর গোলযোগ আর কিছুই নহে।

দারোগা। অপর যে সকল লোক আসিয়াছে, তাঁহারা কোথায়?

কর্ম্মচারী। তাঁহারা এই শয়ন করিয়া আছে।

দারোগা। উঁহাদিগকে আমার নিকট ডাক দেখি।

দারোগা সাহেবের এই কথা শুনিবামাত্র হোসেন এবং তাহার সমভিব্যাহারী দুই ব্যক্তি আসিয়া দারোগা সাহেবের সম্মুখে দণ্ডায়মান হইল। তাহাদিগকে দেখিয়াই দারোগা সাহেব কহিলেন, আপনি হোসেন মিঞা মহেন?

হোসেন। আজ্ঞা, আমি হোসেন।

দারোগা। আপনি এখানে কেন?

হোসেন। মনিবদিগের সঙ্গে।

দারোগা। মনিবদিগের সঙ্গে? আপনার মনিব ত একজন ছিলেন, আপনি গোফুর খাঁর নিকট কৰ্ম্ম করিতেন না?

হোসেন। আজ্ঞা হাঁ, এখনও আমি তাহার কর্ম্ম করিতেছি।

দারোগা। তবে মনিবগণ পাইলেন কোথায়?

হোসেন। গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্র।

দারোগা। তাহার কোথায়?

হোসেন। তাঁহারা আপনার হাজতেই আছেন।

দারোগা। তাঁহারা একটী মোকদ্দমায় পড়িয়াছেন, এ কথা আমি পূর্বেই শুনিয়াছিলাম। তাহাদিগের সেই মোক দ্দমার বিচার কি শেষ হইয়া গিয়াছে?

হোসেন। আজ্ঞা হাঁ, জজসাহেবের বিচার শেষ হইয়া গিয়াছে।

দারোগা। বিচারে কি হইয়াছে?

হোসেন। তা আমাদিগের সর্বনাশ হইয়াছে। বিচারে জজসাহেব উভয়কেই চরমদণ্ডে দণ্ডিত হইবার আদেশ প্রদান করিয়াছেন।

দারোগা। কি সর্বনাশ! উভয়কেই ফাঁসির আদেশ দিয়া ছেন?তাঁহারাই কি এখন আমার এই থানার হাজতে আছেন?

হোসেন। হাঁ মহাশয়! তাহাদিগের সহিতই আমরা আসিয়াছি।

দারোগা। আচ্ছা, আপনারা থানাতেই থাকুন, আপনা, দিগের এখান হইতে গমন করিবার প্রয়োজন নাই।

হোসেন। মহাশয়! আমাকে মাপ করিবেন। আপনি দেখিতেছি, আমাদিগের সমস্ত অবস্থা অবগত আছেন; কিন্তু জামি এ পর্যন্ত চিনিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

দারোগা। আমি আমার পোষাক-আদি পরিবর্তন করিয়া এখনই আসিতেছি, আমাকে ভাল করিয়া দেখিলেই চিনিতে পারিবেন। আপনাদিগের জমিদারীর ভিতর গাজিনগর নামক একখানি গ্রাম আছে না?

হোসেন। আছে।

দারোগা। সেই গ্রামের কতকগুলি জমী লইয়া অপর একজন জমিদারের যে সময় বিবাদ হয়, সেই সময় আমাকে দেখিয়াছেন।

এই বলিয়া দারোগা সাহেব আপনার পোষাক পরিচ্ছদ পরিবর্তন করিবার মানসে আপনার গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলেন।

দারোগা সাহেব সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলে পর, দারোগা সাহেব সম্বন্ধীয় সমস্ত কথা হোসেনের মনে হইল। তখন মনে হইল, যে সময় গাজিনগর লইয়া গোফুর খাঁর সহিত অপর একজন জমিদারের বিবাদ উপস্থিত হয়, এবং পরিশেষে উভয় পক্ষে ভয়ানক দাঙ্গা হইয়া যায়, সেই সময় ইনিই সেই স্থানের দারোগা ছিলেন। দাঙ্গার সংবাদ ইঁহার নিকট প্রেরিত হইলে, ইনিই আসিয়া তাহার অনুসন্ধান করেন। সেই সময় ইনি গোফুর খাঁর বাড়ীতে গিয়াও কয় দিবসকাল অতিবাহিত করেন। ইনি সেই সময় গোফুর খাঁর নিকট হইতে সহস্র মুদ্রা গ্রহণ করিয়াছিলেন। সে সময় ইহারই সাহায্যে সেই মোকদ্দমায় গোফুর খাঁ জয়লাভ করেন, ও গাজিনগর গ্রাম সেই সময় হইতে সুচারুরূপে শাসন করিতে প্রবৃত্ত হন। তাহার পর হইতে এ পর্যন্ত সেই গ্রাম লইয়া আর কোনরূপ গোলযোগ ঘটে নাই। এই সময় হইতে দারোগা সাহেব সর্বদা গোফুরের নিকট গমন করি তেন, এবং আবশ্যক হইলে দুই একদিবস তথায় অবস্থানও করিতেন। কিন্তু যে পর্যন্ত তিনি সেই থানা হইতে বদলি হইয়া গিয়াছেন, সেই পর্যন্ত তিনি আর গোফুর খাঁর নিকট গমন করেন নাই, বা তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে সমর্থ হন নাই। গাজিনগর উপলক্ষে যে সময় দারোগা সাহেবের সহিত গোফুর খাঁর আলাপ পরিচয় হয়, হোসেনও সেই সময় ইতে তাঁহার নিকট পরিচিত। ইহার পর অনেক দিবস পর্যন্ত হোসেনের সহিত তাহার সাক্ষাৎ না হওয়ায়, প্রথমেই হোসেন দারোগা সাহেবকে চিনিয়া উঠিতে পারেন নাই। সেই কারণে তিনি মনে মনে একটু লজ্জিত হইলেন। যাহা হউক, তখন তিনি মনে করিলেন, থানার বাহিরে গিয়া আর তাহাকে রাত্রিযাপন করিতে হইবে না।

হোসেন সেই স্থানে বসিয়া বসিয়া দারোগা সাহেব সম্বন্ধীয় পুরাতন কথা সকল মনে করিতেছেন, এমন সময়ে একজন প্রহরী আসিয়া কহিল, দারোগা সাহেব আপনাকে সেলাম দিয়াছেন।

হোসেন। দারোগা সাহেব কোথায়?

প্রহরী। তিনি তাঁহার বাসায়।

হোসেন। তাহা হইলে আমাকে এখন কোথায় যাইতে হইবে? কোথায় গমন করিলে তাহার সহিত সাক্ষাৎ হইবে?

প্রহরী। তাঁহার বাসায় আপনাকে ডাকিয়াছেন, সেই স্থানে গমন করিলেই, তাহার সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইবে।

হোসেন। কোন্ সময় আমাকে সেই স্থানে গমন করিতে হইবে?

প্রহরী। এখনই। আপনি আমার সহিত আসুন, তিনি হায় বাহিরের গৃহে আপনার প্রতীক্ষায় বসিয়া আছেন।

হোসেন। চল।

এই বলিয়া : হোসেন সেই স্থান হইতে গাত্রোখান করিয়া সেই প্রহরীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। যাইবার সময় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি এই থানায় কতদিবস পর্যন্ত আছ?

প্রহরী। প্রায় আট নয় বৎসর।

হোসেন। দারোগা সাহেব এখানে কতদিবস আসিয়াছেন? প্রহরী। এক বৎসরের কম হইবে না, বরং কিছু বেশী হইবে।

হোসেন। তোমাদিগের দারোগা সাহেব কেমন লোক?

প্রহরী। খুব ভাল লোক; গরিবের মা-রাপ। আমরা সবিশেষ সুখ-সচ্ছনে তাহার নিকট কৰ্ম্ম করিতেছি।

হোসেন। দারোগা সাহেবের বাসায় তাহার পরিবারগণ কেহ আছেন, কি তিনি একাকীই এই স্থানে বাস করিতেছেন?

প্রহরী। তাঁহার পরিবার ও পুত্র কন্যাগণ এই স্থানেই ছিলেন; অদ্য আন্দাজ একমাস হইল, কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে তিনি তাঁহাদিগকে আপনার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিয়াছেন। এখন কেহই এখানে নাই, কেবল দারোগা সাহেব একাকী এখানে আছেন।

প্রহরীর সহিত এইরূপ নানাপ্রকার কথা কহিতে কহিতে হোসেন দারোগা সাহেবের বাসায় গিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, দারোগা সাহেব একাকী হোসেনের অপেক্ষায় তাঁহার বাহিরের গৃহে বসিয়া রহিয়াছেন।

এইরূপ অবস্থায় দারোগা সাহেবকে একাকী বসিয়া থাকিতে দেখিয়া, হোসেন একটু বিস্মিত হইলেন। কারণ, ইতিপূর্বে অনেকবার তিনি দারোগা সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন, কিন্তু কখনই তাঁহাকে একাকী দেখিতে পান নাই। অপর কেহ উপস্থিত না থাকিলেও, অভাবপক্ষে দুই চারিজন পরিচারকও সর্বদা তাহার নিকট থাকি।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

দারোগা সাহেবের নিকট হোসেন গমন করিলে, তিনি হোসেনকে সেই স্থানে বসিতে বলিলেন। হোসেন তাহার সন্নিকটবর্তী এক স্থানে উপবেশন করিলে, তিনি কহিলেন,

আপনি আমাকে চিনিতে পারেন নাই?

হোসেন। আপনাকে আর চিনিতে পারি না, খুব চিনিতে পারিয়াছি। কিন্তু প্রথমতঃ আপনাকে চিনিতে পারি নাই বলিয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি, মাফ করিবেন।

দামোগা। আপনার মনিব ও মনিব-পুত্র যে একটা মোক জমায় পড়িয়াছেন, এ কথা আমি পূৰ্বে শুনিয়াছিলাম; কিন্তু তাঁহাদিগের যে এই অবস্থা ঘটিবে, তাহা আমি একবারের নিমিত্তও মনে করি নাই।

হোসেন। মনে না করিবারই কথা। ইহারা যে একবারে চরমদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন, তাহা আমরা একবারের নিমিত্তও মনে করি নাই, বা আমাদিগের উকীল কৌশলীগণও কখন এরূপ ভাবেন নাই।

দারোগা। আপনি বহুদর্শী ও একজন পুরাতন কর্ম্মচারী। জমিদারী-বুদ্ধি আপনার যথেষ্ট আছে। প্রথমতঃ এই মোক দমার নিমিত্ত যদি একটু চেষ্টা করিতেন, তাহা হইলে বোধ হয়, এরূপ অবস্থা কখনই ঘটিত না।

হোসেন। আমার সাধ্যমত চেষ্টা করিতে কিছুমাত্র ত্রুটি করি নাই; কিন্তু সেই সকল চেষ্টাতেও কোন ফলই দর্শিল না।

দারোগা। প্রথমে কি চেষ্টা করিয়াছিলেন। অনুসন্ধান কারী দারোগার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন কি?

হোসেন। এই মোক প্রথমে যে সময় রুজু হয়, সেই সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না; জমিদারীর কাৰ্য্য উপলক্ষে মফঃস্বলে গমন করিয়াছিলাম। মোকমার সংবাদ যেমন আমি শুনিতে পাইলাম, অমনি আমি চলিয়া আসিলাম।

আসিয়াই অনুসন্ধানকারী দারোগাকে কিঞ্চিৎ প্রণামী দিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। সেই সাক্ষাতের ফল আপনি এই দেখিতেই পাইতেছেন।

দারোগা। প্রণামীর পরিমাণটা, বোধ হয়, কম হইয়াছিল; তাই তাহার দ্বারা সবিশেষরূপ উপকার প্রাপ্ত হন নাই।

হোসেন। তাহার পক্ষে সামান্য হইতে পারে, কিন্তু আমার পক্ষে কম নহে। আমি তাঁহাকে সহস্র মুদ্রা প্রদান করিয়াছিলাম।

দারোগা। তাহা হইলে তিনি কোনরূপ তোমাদিগের সাহায্য করিলেন না কেন?

হোসেন। সে অনেক কথা। এই মোকদ্দমা যেরূপ ভাবে সাজান হইয়াছিল, প্রকৃত পক্ষে তাহার কিছুই ঘটে নাই, সমস্তই মিথ্যা।

দারোগা। দারোগা তোমাদিগের নিকট হইতে সহস্র মুদ্রা গ্রহণ করিলেন, এবং তোমাদিগের উপরই মিথ্যা মোকদ্দমা সাজাইলেন, এ কথা শুনিতে কেমন কেমন বোধ হয়।

হোসেন। তাহার কারণ আছে।

দারোগা। এমন কি কারণ হইতে পারে?

হোসেন। লজ্জার কথা বলিব কি! দারোগা সাহেব কোথা হইতে একটী সুরূপা স্ত্রীলোককে বাহির করিয়া আনিয়াছিলেন, এবং তাহার সমস্ত খরচ-পত্ৰ দিয়া একখানি বাড়ীতে তাহাকে রাখিয়াছিলেন। আমার মনিব-পুত্র ওসমানের চরিত্র নিতান্ত মন্দ হইয়া পড়ে। এমন কি, কোন সুশ্রী রমণীর প্রতি লোভ হইলে তাহাকে তাহা হইতে নিবৃত্ত করিবার ক্ষমতা কাহারও ছিল না। এই নিমিত্তই প্রজাদের মধ্যে সকলেই তাহার শক্ত হইয়া পড়ে। যে রমণীকে দারোগা সাহেব রাখিয়াছিলেন, সেই রমণীর কথা ওসমান কিরূপে জানিতে পারে। পরিশেষে কোনরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া তাহাকে আয়ত্ব করে। দারোগা সাহেব এই কথা জানিতে পারিয়া, প্রথমতঃ ওমানের নিকট সংবাদ পাঠাইয়া সেই রমণীকে যথাস্থানে পুনরায় রাখিয়া আসিতে কহেন; কিন্তু ওসমান তাহার এই অনুরোধে কর্ণপাতও করেন না। তখন দারোগা সাহেব তাহার উপর সবিশেষরূপ অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহার চরিত্রের কথা তাহার পিতা গোফুর খাঁর নিকট গিয়া বলেন। গোফুর খাঁও পুত্র-স্নেহ বশতঃ তাহার প্রতিবিধানের কোনরূপ চেষ্টাও করেন না। কাজেই দারোগা সাহেব উভয়ের প্রতি অন্তরের সহিত চটিয়া যান, এবং কিরূপে উভয়কেই সবিশেষরূপে বিপদাপন্ন করিতে সমর্থ হইবেন, কেবল তাহারই ছিদ্র অনুসন্ধান করিতে থাকেন। সেই সময় একটা সুযোেগ উপস্থিত হয়। হেদায়েৎ নামক এক ব্যক্তি আসিয়া নালিশ করে যে, সে তাহার যুবতী কন্যাকে পাইতেছে না, এবং শুনিতেছে যে, ওসমান তাহার কন্যাকে লইয়া গিয়াছে। এই সংবাদ পাইয়া দারোগা সাহেব তিলকে তাল করিয়া ফেলি লেন। পিতা-পুত্র উভয়কেই জড়াইয়া তাহার নিকট হইতে এজাহার লইলেন, ও যেরূপ ভাবে সাক্ষি-সাবুদের সংগ্রহ করিবার প্রয়োজন, তাহার সমস্তই ঠিক করিয়া আপনার প্রতিহিংসা সাধুন পূর্বক মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিলেন। লাভের মধ্যে আমাদিগের আরও সহস্র মুদ্রা নিরর্থক নষ্ট হইল।

দারোগা। এতদুর ঘটিয়াছিল, এ কথা আমাকে পূর্বে বলেন নাই কেন? অনুসন্ধানকারী দারোগা সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া কোন না কোনরূপে আমি ইহার প্রতিবিধানের চেষ্টা করিতাম। আপনার কি মনে নাই যে, অনেক সময় গোফুর খাঁর নিকট আমি অনেক উপকার প্রাপ্ত হইয়াছি।

হোসেন। আপনার কথা সেই সময় আমাদিগের মনে এক বারেই পড়ে নাই। বিশেষতঃ মনে পড়িলেই বা কি হইত? আপনি যে এই থানায় আছেন, তাহা আমরা কেহ অবগত ছিলাম না। আপনি গোফুর খাঁর নিকট অনেক সময় উপকার পাইয়াছেন বলিতেছেন বটে; কিন্তু এখন আপনার নিকটেই বা কিরূপে উপকারের প্রত্যাশা করা যাইতে পারে?

দারোগা। আপনার এ কথার অর্থ কি?

হোসেন। অর্থ যে কি, তাহা আর আপনি বুঝিতে পারিতেছেন না? আজ কালকার যেরূপ নিয়ম হইয়া পড়ি তেছে, তাহা ত আপনি বেশ জানেন। আপনি যাহার উপকার করিবেন, সে কিসে সেই উপকারকারীর অনিষ্ট করিতে সমর্থ হইবে, তাহারই চেষ্টা সর্বদা করিয়া থাকে।

দারোগা। আপনার কি বিশ্বাস যে, জগতের সকলেই সেই চরিত্রের লোক?

হোসেন। সকলে না হইতে পারেন; কিন্তু পনর আনা লোকের চরিত্র যে সেইরূপ, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

দারোগা। আমি যদি পূৰ্ব্বে ইহার অণুমাত্রও জানিতে পারিতাম, তাহা হইলে বোধ হয়, আমি সবিশেষরূপে আপনাদিগের উপকার করিতে পারিতাম।

হোসেন। যাহার সময় উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে, তাহার আর উপায় নাই! এখন বলুন দেখি, আপীলে কোনরূপ ফল পাইবার উপায় আছে কি?

দারোগা। আমার বোধ হয়, আপীলে এ মোকদ্দমার কিছু হইবে না।

হোসেন। এই মোকদ্দমার কাগজ-পত্ৰ ত আপনি কিছুই দেখেন নাই, তবে আপনি কিরূপে বলিতেছেন যে, আপীলে কোনরূপ ফল পাওয়া যাইবে না?

দারোগা। কাগজ-পত্র না দেখিলেও আমার জানিবার বিশেষ কারণ আছে। যে জজসাহেব এই মোক দমার বিচার করিয়াছেন, তাঁহাকে আমি অনেক দিবস হইতে উত্তমরূপে অবগত আছি। তাঁহার মত বুদ্ধিমান কর্ম্মচারী অতি অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়। তাহার উপর মোকদ্দমার রায় লিখিবার ক্ষমতা তাঁহার যেরূপ আছে, সেরূপ ক্ষমত। এই প্রদেশীয় বর্তমান কর্ম্মচারীগণের মধ্যে আর কাহারও আছে কি না সন্দেহ। এ পর্যন্ত তাহার বিচারিত যত মোকদ্দমার আপীল হইয়াছে, হাইকোর্ট হইতে তাহার একটীও মোকদ্দমার রায় পরিবর্তিত হয় নাই। বরং তাহার রায় দেখিয়া, সকলেই তাহার প্রশংসা করিয়াছেন।

হোসেন। যে আশায় আমি উঁহাদিগকে এতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত রাখিয়াছি, তবে কি আমাদিগের সে আশা নাই?

দারোগা। আপীলের আশা ছাড়িয়া দিয়া যদি আর কোনরূপ উপায় থাকে, তাহার চেষ্টা দেখুন। আপীলে কিছু হইবে না।

হোসেন। আর উপায় কি দেখিব? এমন উপায় আর কি হইতে পারে, যাহাতে উঁহাদিগের উভয়ের প্রাণরক্ষা হয়?

দারোগা। কোনরূপ যোগাড়যন্ত্র করিয়া যদি লাটসাহেবের নিকট হইতে উঁহাদিগের জীবন-ভিক্ষা লইতে পারেন, তাহা হইলেই হইতে পারে।

হোসেন। সেরূপ যোগাড় কিরূপে হইতে পারে? সে ক্ষমতা আমাদিগের নাই।

দারোগা। কেন থাকিবে না, যাহার প্রচুর অর্থ আছে, তাহার সমস্ত ক্ষমতাই আছে। তবে যোগাড় চাই, পরিশ্রম চাই, তাহার উপর অর্থ ব্যয় করিবার ইচ্ছা চাই।

হোসেন। আমাদিগের যতদূর সম্ভব, অর্থ সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছি; কিন্তু যোগাড় করিবার ক্ষমতা আমাদিগের নাই। গোফুর খাঁর উপর যদি আপনার এতদূর দয়া হইয়াছে, তাহা হইলে অনুগ্ৰহ করিয়া বলিয়া দিন, কিরূপ ভাবে যোগাড় করিলে, বা কাহার সাহায্য গ্রহণ করিলে, আমার মনিবদ্বয়ের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ হইব।

দারোগা। এখন আপনি উঁহাদিগের জীবনের নিমিত্ত কত অর্থ ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন?

হোসেন। আমাদিগের যতদুর সাধ্য, তাহা অপেক্ষা আরও অধিক অর্থ ব্যয় করিতে আমি প্রস্তুত আছি।

দারোগা। আপনাদিগের কি ক্ষমতা আছে, তাহা আমি জানি না। কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করিতে পারিবেন, তাহা আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলুন, তাহা হইলে আমি বুঝিতে পারি যে, উঁহাদিগের জীবন রক্ষা হইতে পারিবে কি মা! তাহা হইলে আমার যেরূপ বুদ্ধি, সেইরূপ একটা সামান্য উপায় বলিয়া দিব, বা আবশ্যক হয়, আমি নিজে উহাতে হস্তক্ষেপ করিব।

হোসেন। দেখুন দারোগা সাহেব! জীবনের অপেক্ষা অর্থ কিছু অধিক মুল্যবান্ নহে। যদি ইহারা জীবন প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে আমার বিশ্বাস, উঁহাদিগের নিকট যাহা কিছু সঞ্চিত অর্থ আছে, এবং চেষ্টা করিয়া আরও যতদূর অর্থের সাহায্য হইতে পারে, তাহার সমস্তই উঁহারা ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন।

দারোগা। ওরূপ গোলযোগের কথা আমি বুঝি না। আমাকে পরিষ্কার করিয়া বলুন দেখি, পাঁচ লক্ষ টাকা উঁহারা ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন কি?

হোসেন। পাঁচ লক্ষ টাকা। এখন ব্যয় করিবার ক্ষমতা উঁহাদিগের নাই।

দারোগা। তবে কয় লক্ষ টাকা ব্যয় করিবার ক্ষমতা উঁহাদিগের আছে?

হোসেন। উঁহাদিগের সহিত পরামর্শ না করিয়া, আমি এ কথার ঠিক উত্তর দিতে পারিতেছি না। আমার বোধ হয়, যদি উঁহাদিলের জীবন রক্ষা করিতে পারেন, তাহা হইলে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত উঁহারা ব্যয় করিতে সমর্থ হইবেন। তাহার অধিক যে পারিবেন, তাহা আমার বোধ হয় না।  দারোগা। আচ্ছা, আপনি গমন করুন, এবং হাজত গৃহের বাহির হইতে উঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া আসুন; দেখুন, উঁহারা কি বলেন। দুই লক্ষ মুদ্রার কম এ কাৰ্য্য কখনই সম্পন্ন হইতে পারে না। যদি উঁহারা আমার প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহা হইলে আপনি সময় নষ্ট না করিয়া, শী আমার নিকট আগমন করিবেন। আমি আপনার অপেক্ষায় এই স্থানে বসিয়া রহিলাম।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া হোসেন সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় মনে মনে ভাবিতে লাগি লেন, অর্থ ব্যয় করিয়া দারোগা সাহেব কিরূপে ইহাদিগের প্রাণ রক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন? আপীল করিলে যখন বলিতেছেন, কিছুই হইবে না, লাট সাহেবের নিকট কোন রূপ চেষ্টা করিবার ক্ষমতা যখন আমাদিগের বা দারোগা সাহেবের নাই, তখন কিরূপে ইনি ইহাদিগের জীবন বাঁচাইতে সমর্থ হইবেন? তবে কি ইহারও ইচ্ছা, অনুসন্ধানকারী দারোগা সাহেবের সদৃশ আমাদিগের নিকট হইতে ফঁাকি দিয়া কিছু অর্থ গ্রহণ করা? অনুসন্ধানকারী দারোগা সাহেব কেবলমাত্র সহস্র মুদ্রা গ্রহণ করিয়াছিলেন। কিন্তু ইদার, দেখিতেছি, আশা অতিরিক্ত। ইতিপূর্বে ইনি আমাদিগকে অনেক মোকদ্দমায় সাহায্য করিয়াছেন ও আমাদিগের নিকট হইতে সময় সময় অনেক অর্থ গ্রহণ করিয়াছেন; কিন্তু এ পর্যন্তু কখনও বিশ্বাসঘাতকের কার্য করেন নাই। যখন যাহা করিবেন বলিয়াছেন, কার্যে ঠিক তাহাই করিয়াছেন। এরূপ অবস্থায় ইহার কথায় একবারে অবিশ্বাসও করিতে পারি না। আর অনেক টাকা দিয়া একবারেই বা বিশ্বাস করি কি প্রকারে? এতদিবস সভাবে কাৰ্য্য করিয়াছেন বলিয়াই যে, এখন অসভাবে কাৰ্য্য না করিবেন, তাহারই বা প্রমাণ কি? গোফুর ও ওসমান উভয়েই জীবন পরিত্যাগ করিতে বসিয়াছেন, তাহাদিগের নিকট হইতে শেষ অবস্থায় এইরূপ অর্থ গ্রহণ করিলে, উহার প্রতিবিধানের আর কোন উপায়ও থাকিবে না। উঁহাদিগের উভয়েরই জীবন শেষ হইলে উঁহাদিগের পরিবারবর্গ যে অর্থ সাহায্যে অনায়াসেই জীবনযাপন করিতে সমর্থ হইতেন, সেই অর্থও কি অতঃপর এইরূপে নষ্ট করিব? বড়ই গোলযোগের কথা।

মনে মনে এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে যে স্থানে গোফুর খাঁ ও ওসমান খ আবদ্ধ অবস্থায় ছিলেন, সেই স্থানে গমন করিলেন; কিন্তু সেই হাজত-গৃহের আসামীদ্বয়কে যে ব্যক্তি পাহারা দিতেছিল, সে তাহাকে উঁহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে, বা কথা কহিতে দিল না। তখন হোসেন অনন্যোপায় হইয়া পুনরায় দারোগা সাহেবের নিকট আগমন করিলেন ও তাঁহাকে কহিলেন, যাহার পাহারা আছে, সেই প্রহরী আমার মনিবদ্বয়ের সহিত আমাকে কোনরূপে কথা কহিতে, বা তাহাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে কোনরূপে দিল না।

হোসেনের এই কথা শুনিয়া দারোগা সাহেব সেই প্রহরীকে জাকাইলেন ও তাহাকে বলিয়া দিলেন, আসামীদ্বয়ের সহিত এই ব্যক্তিকে সাক্ষাৎ করিতে দেও, এবং বাহির হইতে যদি কোন কথা উঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিতে চাহে, তাহাও করিতে দেও; কিন্তু ইহাকে ফটকের ভিতর প্রবেশ করিতে দিও না।

প্রহরী দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালন করিল। হোসেন হাজতের নিকট গমন করিলে, সে হাজতের দরজা খুলিয়া দিল; কিন্তু হোসেনকে তাহার ভিতর প্রবেশ করিতে দিল না। নিজেও সেই স্থানে দণ্ডায়মান রহিল।

উভয়কেই সম্বোধন করিয়া হোসেন কহিল, আমি এখন একটা কোন সবিশেষ প্রয়োজনের নিমিত্ত আপনাদিগের নিকট আগমন করিয়াছি, সবিশেষরূপে মনঃস্থির করিয়া কথাগুলি শুনিতে হইবে।

পূর্বে যে একটী মুসলমান দারোগা অনেক সময় আমা দিগের উপকার করিয়াছিলেন, এবং অনেক সময় যিনি আমাদিগের বাড়ীতে গমন করিয়া সময় সময় দুই তিনদিবস পর্যন্ত অতিবাহিত করিতেন, তাহাকে এখন আপনাদের মনে হয় কি?

গোফুর। তাহাকে বেশ মনে হয়। তিনি অতি ভদ্র লোক। যখন যাহা করিবেন বলিয়াছেন, তখনই ঠিক তাহাই করিয়াছেন। তাহার কথা এ সময়ে জিজ্ঞাসা করিতেছ কেন?

হোসেন। যে থানায় এখন আপনারা আবদ্ধ, তিনি সেই থানার দারোগা।

গোফুর। তিনি এই থানার দারোগা! তাহার সহিত এই শেষ সময় একবার সাক্ষাৎ হয় না কি?

হোসেন। আমার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হইয়াছে। আপনাদিগের সম্বন্ধে অনেক কথা তিনি নিজেই উল্লেখ করিয়া, অনেক দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন, এবং অনেক কথা আমাকে বলিয়াছেন। তাহারই কথা মত এখন আমি আপনাদিগের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছি।

গোফুর। তিনি কি বলেন?

হোসেন। তিনি বলেন, উপযুক্ত পরিমিত অর্থ ব্যয় করিতে পারিলে, তিনি আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে পারেন।

গোফুর। কিরূপে? আপীল করিয়া?

হোসেন। না। তিনি বলেন, আপীলে কিছু হইবে না। তবে লাট সাহেবের নিকট কোনরূপ চেষ্টা করিতে পারিলে, যদি তিনি দয়া করেন, তাহা হইলেই জীবনের পুনরায় আশা করা যাইতে পারে।

গোফুর। টাকায় লাট সাহেবের নিকট কোনরূপ চেষ্টা হইবে না, অপর কোন উপায়ও আমাদিগের নাই।

হোসেন। সে কথা আমি পূৰ্বেই তাহাকে বলিয়াছি। তাহা শুনিয়াও তিনি বলেন, যদি অধিক পরিমাণে টাকা ব্যয় করিতে সমর্থ হন, তাহা হইলে তিনি জীবনদানের উপায় করিবার চেষ্টা করেন।

গোফুর। কত টাকার আবশ্যক, তাহা তিনি কিছু বলিয়াছেন কি?

হোসেন। প্রথম বলিয়াছিলেন, পাঁচ লক্ষ টাকার আবশ্যক; কিন্তু আমি যখন তাঁহাকে কহিলাম, এত টাকা কোনরূপেই সংগ্রহ হইবার সম্ভাবনা নাই। তখন তিনি কহিলেন, দুই লক্ষ টাকার কম এ কাৰ্য কোনরূপেই হইতে পারে না।

গোফুর। কিরূপ উপায়ে তিনি আমাদিগের প্রাণ বাঁচা ইতে সমর্থ হইবেন, তাহা কিছু বলিয়াছেন কি?

হোসেন। কি উপায়ে বাঁচাইবেন, তাহার কোন কথা বলেন নাই। কেবল বলিয়াছেন, টাকার যোগাড় করিতে পারিবে কি না দেখ।

গোফুর। দেখ হোসেন! আমার জীবনের আশা নাই, বাঁচিবারও আর সাধ নাই। তবে যদি ওসমানকে কোন রূপে বাঁচাইতে পার, তাহার চেষ্টা কর। আমার জন্য কোনরূপ চেষ্টা করিবার প্রয়োজন নাই।

হোসেন। তবে আমি দুই লক্ষ টাকা দিতে স্বীকার করিব?

গোফুর। পুল-স্নেহ যে কি, তাহা তুমি যে না জান, তাহা নহে। আমার পুত্রের জীবনের নিকট দুই লক্ষ টাকা অতি অল্প।

হোসেন। এত টাকা এখন আমি সংগ্রহ করি কি প্রকারে? এ পর্যন্ত যোগাড় করিয়া অনেক কষ্টে প্রায় দুই লক্ষ টাকা সংগ্রহ করিয়াছিলাম, মোকদ্দমায় এ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় হইয়া গিয়াছে, অবশিষ্ট এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা আমার নিকট আছে। ভাবিয়াছিলাম বে, এই মোকদ্দমায় আপনাদিগের যতই অর্থদণ্ড হউক না কেন, সেই টাকা হইতে তাহা প্রদান করিয়া আপনাদিগকে বাড়ীতে লইয়া যাইব। কিন্তু যাহা ভাবিয়াছিলাম তাহা হইল না।

গোফুর। দুইটা জীবনের জন্য যখন তিনি দুই লক্ষ টাকা চাহিতেছেন, তখন একটা জীবনের জন্য যে টাকা তোমার নিকট আছে, তাহা তাহাকে প্রদান কর, তাহাতে যদি তিনি সম্মত না হন, তাহা হইলে অবশিষ্ট টাকা পরে সংগ্রহ করিয়া তাহাকে প্রদান করিও।

হোসেন। এই সময় এত টাকা উহার হস্তে প্রদান করিব, আর উনি যদি কিছু না বলিয়া, কেবলমাত্র টাকাগুলি হস্তগত করেন, তাহা হইলে উপায়?

গোফুর। উপায় কিছুই নাই। আমার পুত্রের জীবনের সঙ্গে মা হয়, সেই টাকাও নষ্ট হইবে। দারোগা যেরূপ চরিত্রের লোকই হউক না কেন, আমাদিগের এরূপ অবস্থায় প্রতারিত করিয়া, এইরূপ ভাবে আমাদিগের জীবনের সহিত এত অর্থ গ্রহণ করিতে পারে, এরূপ বিশ্বাসঘাতক বোধ হয়, আজও জন্মগ্রহণ করে নাই। বিশেষতঃ যে দারোগার কথা তুমি বলিতেছ, সেই দারোগা আমার সহিত কখনও অবিশ্বাসের কাৰ্য করেন নাই।

হোসেন। আচ্ছা, তাহার কথায় বিশ্বাস করিয়া দেখি, ইহাতে আমাদিগের অদৃষ্টে যাহাই কেন হউক না।

এই বলিয়া হোসেন সেই স্থান হইতে উঠিয়া পুনরায় দারোগা সাহেবের নিকট গমন করিলেন। প্রহরী হাজতের দরজা পুনরায় বন্ধ করিয়া দিল।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

হোসেন দারোগা সাহেবের নিকট প্রত্যাবর্তন করিলে, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, গোফুর খাঁর সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইয়াছিল কি?

হোসেন। হাঁ মহাশয়। সাক্ষাৎ হইয়াছিল।

দারোগা। তিনি কি বলিলেন?

হোসেন। তিনি আপনার প্রস্তাবে সাত আছেন, কিন্তু অত টাকা এখন দিয়া উঠিতে পারিবেন না।

দারোগা। কত টাকা এখন তিনি প্রদান করিতে সমর্থ হইবেন?

হোসেন। এখন এক লক্ষ টাকা তিনি প্রদান করিতে সমর্থ আছেন।

দারোগা। এত অল্প টাকায় ত আমি এই কাৰ্য শেষ করিতে পারিব না।

হোসেন। দুই লক্ষ টাকা এখন আমাদিগের হস্তে নাই। এখন আমি এক লক্ষ টাকা প্রদান করিতেছি, আসামীদ্বয় মুক্তিলাভ করিবার একমাস পরে বক্রী এক লক্ষ টাকা যেরূপে পারি, সেইরূপে সংগ্রহ করিয়া আপনাকে নিশ্চয়ই প্রদান করিব। তাহার কোন অস্থা হইবে না।

দারোগা। এখন কি এক লক্ষ টাকার অধিক আর কিছুই দিতে পারিবেন না?

হোসেন। নিতান্ত আবশ্যক হয়, আরও কিছু দিতে পারি। আপনার নিকট আমি কোন কথা গোপন করিতেছি না, আমার নিকট এখন এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা আছে, ইহার মধ্যে আপাততঃ আবশ্যক উপযোগী যে কয় হাজার টাকার প্রয়োজন, তাহা রাখিয়া অবশিষ্ট সমস্তই আমি আপনাকে প্রদান করিতে প্রস্তুত আছি। কাৰ্য শেষ হইয়া গেলে, অবশিষ্ট টাকাগুলি আপনাকে আমি প্রদান করিয়া যাইব।

দারোগা। আবশ্যক খরচ-পত্রের নিমিত্ত আপাততঃ আপনি পাঁচ হাজার টাকা আপনার নিকট রাখিয়া দিন। অবশিষ্ট এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা আমাকে প্রদান করুন। আমি আপনার মনিবদ্বয়ের জীবন রক্ষা করিতেছি। অবশিষ্ট টাকা আমাকে সময় মত দিয়া যাইবেন।

হোসেন। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকিবেন। আপনি কি উপায়ে উঁহাদিগের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন, তাহা আমরা এখন জানিতে পারিব কি?

দারোগা। জানিতে পারিবেন বৈ কি। আমি উহা দিগের জীবন রক্ষা করিব বটে; কিন্তু কিছুদিবস উঁহাদিগকে সবিশেষ কষ্ট সহ্ করিতে হইবে।

হোসেন। কিরূপ কষ্ট সহ করিতে হইবে, তাহা আমাকে বলিয়া. দিন।

দারোগা। কেবলমাত্র আপনাকে বলিলে চলিবে না। গোফুর ও ওসমামকে আমি এই স্থানে আনাইতে পাঠাইতেছি; তাঁহারা আসিলে তাহাদিগকে আমি আমার মনের কথা বলিব, তাহাতে যদি উঁহারা সম্মত হন, তাহা হইলে আমি এই কার্যে হস্তক্ষেপ করিব, এবং আমাকে যে অর্থ প্রদান করিতে চাহিতেছেন, তাহা গ্রহণ করিব। নতুবা সেই অর্থে আমি হস্তক্ষেপ করিব না।

হোসেনকে এই কথা বলিয়া দারোগা সাহেব একজন প্রহরীকে ডাকিলেন ও তাহাকে কহিলেন, হাজতের ভিতর যে দুইজন আসামী আছে, তাহাদিগকে আমার নিকট লইয়া আইস।

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া প্রহরী সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল, এবং অবিলম্বেই গোফুর খাঁ ও তাহার পুত্রকে আনিয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। দারোগা সাহেব তাহা দিগকে সেই স্থানে বসিতে বলিলে, অশ্রুপূর্ণ-লোচনে উভয়েই সেই স্থানে উপবেশন করিলেন।

দারোগা। এখন আর রোদন করিবার সময় নাই। আমি আপনাদিগকে যে সকল কথা বলিতেছি, তাহা সবিশেষ মনোযোগের সহিত শ্রবণ করুন। পরে সবিশেষ বিবেচনা করিয়া তাহার উত্তর প্রদান করুন। আমি আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে চাহি। ইহাতে আপনাদিগের অভিমত কি?

গোফুর। ইহাতে আমাদিগের আর অভিমত কি হইতে পারে? যখন মৃত্যু নিশ্চয় হইবেই, তখন বাঁচিতে পারিলে আর কে না বাঁচিতে চাহে! আপীলে কিছু হইবে কি?

দারোগা। আপীলে আপনাদিগের জীবন রক্ষা কিছুতেই হইবে না।

গোফুর। তবে কি কোনরূপ যোগাড়যন্ত্র করিয়া লাট সাহেবকে ধরিবেন?

দারোগা। সেরূপ যোগাড়যন্ত্র করিবার ক্ষমতা আমার নাই। করিলেও তাহার নিকট হইতে ক্ষমা পাইবার আশা নাই।

গোফুর। তবে কি আপনি বিলাত আপীলে কিছু করিতে পারিবেন?

দারোগা। সে স্বপ্নেও ভাবিবার কথা নহে। বিলাতের আপীলে কিছু হইবে না, তাহার চেষ্টাও করিব না।

গোফুর। তবে কিরূপে আমাদিগকে বাঁচাইবেন?

দারোগা। উপায় অপর আর কিছুই নহে, উপায়ের মধ্যে কেবল এই আছে যে, যদি আমি আপনাদিগকে ছাড়িয়া দি, তাহা হইলেই আপনাদিগের জীবন রক্ষা হইতে পারে; নতুবা জীবন রক্ষার আর কোন উপায় নাই। যাহা দিগকে ফাঁসি দিবার হুকুম হইয়াছে, তাহাদিগকে অনুসন্ধান করিয়া যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে আর ফাঁসি হইবে কাহার?

গোফুর। আমাদিগকে যদি ছাড়িয়া দেন, তাহা হইলে আমাদিগকে ধরিয়া আনিয়া ফাঁসি দিবে। তাহা হইলে আমা দিগের জীবন রক্ষা হইল কি প্রকারে?

দারোগা। সেই নিমিত্তই আমি আপনাদিগকে এখানে আনিয়াছি। আপনাদিগকে ছাড়িয়া দিলে, আপনাদিগকে একবারে দেশ পরিত্যাগ করিয়া গমন করিতে হইবে। যে স্থানে আপনাদিগের পরিচিত কোন লোক আছে, সে স্থানে, আপনারা থাকিতে পারিবেন না; বহু দূরবর্তী কোন স্থানে গমন করিয়া আপনাপন নাম পরিবর্তন করিয়া সেই স্থানে আপনাদিগকে বাস করিতে হইবে। আপনার জীবিত আছেন, এ কথা জানিতে পারিলে, আপনাদিগের বড়ই অমঙ্গল হইবে। তাহা হইলে গবর্নমেন্ট পুনরায় আপনাদিগকে ধরিয়া আনিয়া ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলাইয়া দিবে। এইরূপে স্বদেশ পরিত্যাগ করিয়া কোন স্থানে আপনাপন পরিবারবর্গ লইয়া গিয়া বাস করুন, তাহাতে কিছুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু যত দিবস আপনারা বাঁচিবেন, ততদিবস না হউক, কিছু দিবস পর্যন্ত আপনাদিগকে লুক্কায়িত অবস্থায় থাকিতে হইবে। বিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখুন, এরূপ প্রস্তাবে যদি আপ নারা সম্মত হইতে চাহেন, তাহা হইলে আমাকে বলুন, আমি আপনাদিগকে মুক্তি প্রদান করি।

গোফুর। এ বিষম কথা। এরূপ অবস্থায় আমরা কিরূপে জীবনধারণ করিতে সমর্থ হইব?

হোসেন। অপর কোন উপায়ে যখন আপনাদিগের বাঁচিবার সম্ভাবনা নাই, তখন এই উপায় অবলম্বন না করিলে, আর উপায় কি? আপনি বৃদ্ধ হইয়াছেন, আপনার নিজের জীবনের মায়া তত না থাকিলেও থাকিতে পারে; কিন্তু ইহা ভিন্ন ওসমানের জীবন আর কিরূপে রক্ষা হইতে পারে। যে সকল দেশে এতদিবস বাস করিয়াছেন, সেই সকল দেশে না হয়, আর নাই থাকিলেন। অপর স্থানে গমন করিয়া সেই স্থানে পরিবারগণের সহিত বাস করুন। আমি নিজে পারি, বা অপর কোন লোক রাখিয়া পারি, জমিদারীর বন্দোবস্ত করিব। আবশ্যক হইলে সময় সময় আপনার নিকট গমন করিয়া পরামর্শ গ্রহণ করিব। আপনারা সেই স্থানে বসিয়া বসিয়া জমিদারীর উপসহ ভোগ করিতে থাকিবেন।

গোফুর। এরূপ স্থান আমরা কোথায় পাইব?

হোসেন। এরূপ স্থানের অভাব নাই। অনুসন্ধান করিয়া এত বড় পৃথিবীর ভিতর ওরূপ স্থান আর বাহির করিতে পারিব না?

দারোগা। যদি আপনারা এরূপ প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহা হইলে ওরূপ স্থান অনেক পাওয়া যাইবে। আপাততঃ আপনারা কোন প্রধান সহরে গমন করিয়া তথায় বাস করুন। পরিশেষে উপযুক্তরূপ স্থান ঠিক হইলে সেই স্থানে গমন করিবেন।

গোফুর। এমন কোন্ সহর আছে যে, সেই স্থানে আমরা অপরের অজ্ঞাত ভাবে বাস করিতে পারিব?

দারোগা। হয় কলিকাতায় গমন করুন, না হয় বোম্বাই সহরে গিয়া একটা বাড়ী ভাড়া লইয়া আপনাপন নামের ও বাসস্থানের পরিবর্তন করিয়া বাস করুন। কোন কাৰ্য্যের নিমিত্ত আপনারা বাড়ীর বাহিরে গমন করিবেন না, বা পরিচিত কোন লোকের সহিত সাক্ষাৎ করিবেন না। তাহা হইলে আপনাদিগকে কেহই জানিতে পারিবে না। ইচ্ছা করিলে পরিবারবর্গের সহিতও সেই স্থানে বাস করিতে পারেন। কৈবল দেশ হইতে চাকর-চাকরাণী সঙ্গে গ্রহণ করিবেন না। নূতন স্থানে গমন কর য়। সেই প্রদেশীয় নুতন, চাকর-চাকরাণী নিযুক্ত করিবেন। তাহা হইলে তাঁহারা আপনা দিগের প্রকৃত পরিচয় জানিতে পারিবে না। এইরূপে দুই পাঁচ বৎসর অতিবাহিত করিতে পারিলে, আর সবিশেষ কোনরূপ ভয়ের কারণ থাকিবে না।

গোফুর। তাহা ত হইল, আমরা যেন এইরূপ উপায়ে জীবন রক্ষা করিলাম! কিন্তু দুই দুইটা প্রাণদণ্ডের আসামী ছাড়িয়া দেওয়া অপরাধে আপনার কি হইবে? অবশ্যই তাহার জন্য আপনাকে দণ্ড গ্রহণ করিতে হইবে?

দারোগা। রাজদণ্ডে আমি দণ্ডিত হইতে পারি। এই অপরাধে আমার কারাদণ্ড হইবে, কিন্তু আমার প্রাণদণ্ড হইবে না। আমি কারাবাসে গমন করিয়া যদি দুইজনের জীবন রক্ষা করিতে পারি, তাহা হইলে আমার হাতে কোনরূপ কষ্ট হইবে না। আপনার নিকট হইতে আমি যে অর্থ গ্রহণ করিতেছি, তাহা হইতে আমাকে কুড়ি পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করিতে হইবে। অবশিষ্ট যাহা থাকিবে, আমার জেল হইলে, তাহার দ্বারা আমার স্ত্রী-পুত্র সকলে জীবনধারণ করিতে পারিবে। অথচ আপনাদিগের কিরূপ উপকার করিতে সমর্থ হইব, একবার তাহা মনে করিয়া দেখুন দেখি।

গোফুর। আমাদিগের জীবন রক্ষা করিবার নিমিত্ত আপ নাকে কারাদণ্ড ভোগ করিতে হইবে, এরূপ উপকার আমি প্রার্থনা করি না। কিন্তু আপনার পরোপকারিতার নিমিত আমি আপনাকে ধন্যবাদ না দিয়া থাকিতে পারিলাম না, ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি, আপনার মঙ্গল হউক।

দারোগা। আমার নিমিত্ত আপনাকে ভাবিতে হইবে না। সহজে আমাকে কেহ জেলে দিতে পারিবে না। তবে ঈশ্বর

করুন, যদি আমি কোনরূপ গোযোগে পতিত হই, তাহা হইলে হোসেনকে বলিয়া দিন, তিনি যেন আমাকে সবিশেষরূপ সাহায্য করেন, লোকের দ্বারাই হউক, বা অর্থের দ্বারাই হউক।

হোসেন। হোসেন এরূপ নীচ-প্রকৃতিবিশিষ্ট লোক নহে যে, আপনাকে এইরূপ সাহায্য করিবার প্রয়োজন হইলে, মনিবের আদেশ গ্রহণ করিতে হইবে।

দারোগা। এখন আপনাদিগের এখানে আর অধিক বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই। শীঘ্র আপনারা এখান হইতে প্রস্থান করুন। রাত্রির ভিতরেই আপনাদিগকে এতদূরে গিয়া উপস্থিত হইতে হইবে যে, অনুসন্ধান করিয়াও পুনরায় যেন আপনাদিগকে আর পাওয়া না যায়।

হোসেন। আমরা এখন কিরূপ উপায়ে এই স্থান হইতে গমন করিব?

দারোগা। আমি তাহারও বন্দোবস্ত করিয়া দিতেছি।

এই বলিয়া দারোগা সাহেব তাঁহার বিশ্বাসী দুইজন এক্কাওয়ালাকে ডাকাইতে কহিলেন। একজন প্রহরী গিয়া তাহাদিগকে ডাকিয়া আনিলে, দারোগা সাহেব তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদিগের খুব দ্রুতগামী ঘোড় আছে?

এক্কাচালক। আছে।

দারোগা। সমস্ত রাত্রিতে কত ক্লোশ পথ অতিবাহিত করিতে পারিবে?

এক্কাচালক। ত্রিশ ক্রোশের কম নহে। চল্লিশ ক্রোশ যাইলেও যাইতে পারি।

দারোগা। এখান হইতে * * * রেলওয়ে ষ্টেশন পঁয়তাল্লিশ ক্রোশ হইবে, বেলা নয়টার ভিতর সেই ষ্টেশনে ইহাদিগকে পৌছিয়া দিতে হইবে।

এক্কাচালক। ভাড়া কত দিবেন?

দারোগা। কত চাহ?

এক্কাচালক। দুইখানি এক্কায় পনর টাকা করিয়া ত্রিশ টাকা লই।

দারোগা। তাহাই হইবে। তদ্ব্যতীত তোমরা যে কোথায় গিয়াছিলে, কাহাকে লইয়া গিয়াছিলে, এবং কাহার আদেশে গিয়াছিলে, এ কথা কিছুতেই কাহাকেও বলিবে না। ইহার নিমিত্ত তোমাদিগের প্রত্যেককে পঞ্চাশ টাকা করিয়া আরও এক শত টাকা প্রদান করিতেছি। তোমরা তোমাদিগের এক্কা এখনই লইয়া আইস।

দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া একাওয়ালাগণ তাহা দিগের একা আনিবার নিমিত্ত আপন স্থানে গমন করিল। হোসেন এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা দারোগা সাহেবের হন্তে প্রদান করিলেন। দেখিতে দেখিতে এক্কা-চালকগণ আপনাপন একা আনিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল। দারোগা সাহেবের আদেশমত হোসেন তাহাদিগের হতে এক শত ত্রিশ টাকা প্রদান করিয়া গোফুর খাঁ, ও ওসমান খাঁ এবং দুইজন পরিচারকের সহিত সেই এক্কায় আরোহণ করিয়া দ্রুতগতি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় ভোগা সাহেব উভয়ের হস্ত হইতে হাতকড়ি খুলিয়া লইয়া হোসেনকে বলিয়া দিলেন, ইহাদিগকে কোন স্থানে রাখিয়া দিয়া, দুই চারিদিবস পরে একবার এখানে আসিয়া এদিকের কিরূপ অবস্থা ঘটে, তাহার সংবাদ লইয়া যাইবেন।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

গোর খাঁ প্রভৃতি সকলে সেই স্থান হইতে গমন করিলে পর, যে পাঁচজন প্রহরী আসামীদ্বয়কে আনয়ন করিয়াছিল, দারোগা সাহেব তাহাদিগকে ডাকাইলেন। তাঁহারা তাহার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলে, তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরা যে খুনী মোকদ্দমার আসামীদ্বয়কে আমার থানায়, আনিয়াছ, তাঁহারা কি সমস্ত রাত্রি এই থানায় থাকিবে?

প্রহরী। হাঁ। কল্য প্রত্যুষে আমরা উঁহাদিগকে লইয়া যাইব। দারোগা। তোমরা আসামীদ্বয়কে নিজ জিম্মায় হাজতে রাখিয়াছ, কি আমাদিগের জিম্ম করিয়া দিয়াছ?

প্রহরী। আপনাদিগের জিম্ম করিয়া দিয়াছি। বাবোগা। যে সময় তোময়া আসামীদ্বয়কে এখানে আনিয়াছিলে, সেই সময় আমি থানায় উপস্থিত ছিলাম না; জমাদার সাহেব ছিলেন। তিনি আসামীদ্বয়কে থানার ডায়েরী ভুক্ত করিয়া লইয়াছেন কি?

প্রহরী। বোধ হয়, লইয়া থাকিবেন।

দারোগা। আসামীদ্বয়কে ভালো যে আমাদিগের জিম্মা করিয়া দিয়াছ, তাহার নিমিত্ত তোমরা রসিদ পাইয়াছ কি?

প্রহরী। না।

প্রহরীর এই কথা শুনিয়া জানোপা সাহেব জমাদার সাহেবকে ডাকাইলেন, এবং তাহাকে কহিলেন, খুনী মোকদ্দমার আসামীদ্বয়কে ডায়েরীভূক্ত করিয়া লইয়াছ কি?

জমাদার। লইয়াছি।

দারোগা। তবে সেই আসামীদ্বয়ের নিমিত্ত উঁহাদিগকে রসিদ দাও নাই কেন?

জমাদার সাহেব এখনই রসিদ দিতেছি। এই বলিয়া দারোগা সাহেবের সম্মুখেই একখানি রসিদ লিখিয়া প্রহরী গণকে প্রদান করিলেন।

রসিদ প্রদান করিবার পর দারোগা সাহেব প্রহরীগণকে কহিলেন, তোমরা এখন আসামীর রসিদ পাইয়াছ, আসামী দ্বয়ের নিমিত্ত এখন আর তোমাদিগের জবাবদিহি নাই। এখন তোমরা সন্নিকটবর্তী বাজারে বা সরাইয়ে গমন করিয়া অনায়াসেই সেই স্থানে আহারাদি ও বিশ্রাম লাভ করিতে পার। কল্য প্রাতঃকালে আগমন করিয়া এই রসিদ মামাকে প্রত্যর্পণ পূর্বক তোমাদিগের আসামীদ্বয়কে লইয়া যাইও।

প্রহরী। থানার ভিতর আমাদিগের থাকিতে কোন আপত্তি আছে কি?

দারোগা। আপত্তি কিছুই নাই। তবে আমার থানায় স্থান অতি সঙ্কীর্ণ, নিরর্থক কষ্ট সহ্ করিয়া এই স্থানে থাকি বার কোন প্রয়োজন নাই। বাজারে থাকিবার উত্তম স্থান আছে। এই থানায় একজন প্রহরীকে সঙ্গে লইয়া যাও। সে তোমাদিগকে উৎকৃষ্ট স্থানে রাখিয়া আসিবে। ইহাতে তোমাদিগের কোনরূপ ব্যয় হইবে না, অথচ সুখে থাকিতে পারিবে।

এই বলিয়া নোগা সাহেব তাহার থানার একজন প্রহরীকে ডাকিলেন, এবং তাহার সমভিব্যাহারে সেই প্রহরী পাঁচজনকে বাজারে পাঠাইয়া দিলেন ও বলিয়া দিলেন, ইহাদিগের আহারাদি করিতে যাহা কিছু ব্যয় হইবে, তাহা যেন দোকানদার প্রহরীগণের নিকট হইতে গ্রহণ না করিয়া আমার নিকট হইতে লইয়া যায়।

প্রহরীগণ সেই স্থান হইতে গমন করিলে পর, দারোগা সাহেব জমাদার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমাদিগের এই থানায় প্রহরীর সংখ্যা দশজন, তাঁহারা সকলেই থানায় উপস্থিত আছে কি?

জমাদার। না; তিনজন আজ দুইদিবস হইল, দুইজন আসামী লইয়া সদরে গমন করিয়াছে।

দারোগা। তাহাদিগের ফিরিয়া আসিতে কয় দিবস হইবে?

জমাদার। চারি পাঁচদিবসের কম তাঁহারা ফিরিয়া আসিতে পারিবে না।

দারোগা। আর সাতজন? : জমায়। তাহাদিগের মধ্যে তিনজন উপস্থিত আছে। একজন আপনার সহিত গমন করিয়াছিল, সেও এখন থানায় উপস্থিত আছে; কিন্তু উপস্থিত বলিতে পারিতেছি না।

কারণ, আপনি বা আপনার সঙ্গিবাহারী সেই প্রহরী ফিরিয়া আসিয়াছেন, তা এখনও জায়েরীভূক্ত হয় নাই।

দারোগা। আমি প্রহরীর সহিত সফল হইতে ফিরি আসিয়াছি, ইহা ডায়েরীভূক্ত করিয়া লও, এবং তোমার নিকট থানার চার্জ ছিল, তাহা আমাকে দেওয়া হইল, ইহাও চায়েরীতে লিখিয়া লও।আরও লিখি ক্লখ যে, থানায় যে দুইজন খুনী মোকদ্দমার আসামী আছে, তাহাও থানার চার্জের সহিত আমার জিম্মায় দেওয়া হইল।

জাবোগা সাহেবের কথা শুনিয়া জমাদার সাহেব তাহাই লিখিয়া ডায়েরী পুস্তক আনিয়া তাহাকে দেখাইলেন। তিনিও দেখিয়া আসামীর সহিত খাবার চার্জ পুনঃ প্রাপ্তিস্বীকার লিখিয়া দিলেন; এবং জমাদার সাহেবকে কহিলেন, তিন জন কনষ্টেবলের সহিত তুমি রোদগন্তে গক্ষন কর। ইহা ষ্টেশন ডায়েরীতে লিখিয়া রাখিয়া তোমরা এখনই খানা হইতে বহির্গত হইয়া যাও। অবশিষ্ট চারিজন প্রহরী কেবল মাত্র পানায় আমার সহিত অবস্থিতি করুক।

দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালিত হইল। জমাদার সাহে তিনজন কনষ্টেবলের সহিত আপনাকে ষ্টেশন ডায়েরীতে খরচ লিখিয়া থানা হইতে বহির্গত হইয়া গেলেন।

জমাদার সাহেব থানা হইতে কহির্গত হইয়া যাইব কিয়ৎক্ষণ পরেই, আমোগা সাহেব, যে প্রহরী চারিজন থানায় উপস্থিত ছিল, তাহাদিগকে তাকাইলেন, তাহাদিগের মধ্যে যে অল্পদিবসের চাকর, তাহাকে কহিলেন,  তোমার কয় বৎসর চাকরী হইয়াছে?

১ম প্রহরী। বার বৎসর হইবে।

দারোগা। তোমার বয়ঃক্রম এখন কত হইয়াছে?

১ম প্রহরী। চলিশ বৎসর হইবে।

দারোগা। তবে তুমি আরও পনর বৎসর চাকরী করিবে।

১ম প্রহরী। যদি শরীর ভাল থাকে, বা আপনারা যদি অনুগ্রহ করেন।

দারোগা। তোমার বেতন এখন কত?

১ম প্রহরী। সাত টাকা।

দারোগা। আর কত বাড়িতে পারে, আশা কর? ১ম প্রহরী। আর কতই বাড়িবে, জোর আট টাকা হইবে।

দারোগা। আট টাকার হিসাবে, তোমার এক বৎসরের বেতন হইতেছে-ছিয়ানব্বই টাকা।

১ম প্রহরী। যাহা হয়।

দারোগা। তাহা হইলে তোমার পনর বৎসরের বেতন হইতেছে, এক হাজার চারি শত চল্লিশ টাকা।

১ম প্রহরী। হিসাবে যাহা হয়।

দারোগা। আর পনর বৎসর পরে যদি তুমি পে নাও, এবং সেই সময় যদি তোমার বেতন আট টাকা হয়, তাহা হইলে তুমি মাসিক চারি টাকা হিসাবে পেন্‌সন পাইতে পারিবে।

১ম প্রহরী। তাহাই হইবে।

দারোগা। তাহা হইলে বৎসরে তোমার পেন্ন্ হইবে আটচল্লিশ টাকা কেমন?

১ম প্রহরী। হ মহাশয়!

দারোগা। যখন তোমার বয়স পঞ্চান্ন বৎসর হইবে, সেই সময় তোমার পেন্‌সন হইবে। পেন্‌সন হইবার পর, তুমি আর কতদিবস বাঁচিবে।

১ম প্রহরী। তাহা কে বলিতে পারে। দশ বৎসরও বচিতে পারি।

দারোগা। দশ বৎসর কেন, যদি তুমি পনের বৎসরও বাঁচ, তাহা হইলে পেন্‌সন-বাবুদ তুমি সাত শত কুড়ি টাকা পাইতে পার। কেমন না?

১ম প্রহরী। হাঁ মহাশয়।

দারোগা। তাহা হইলে আজ হইতে তুমি যে পর্যন্ত বাঁচিবে, তাহাতে তুমি দুই হাজার এক শত ষাট টাকা বেতন বা পেন্‌সন পাইবে।

১ম প্রহরী।

দারোগা। এখন তোমাদিগকে একটা কাৰ্য্য করিতে হইবে। সেই কাৰ্য্য করিলে হয় ত তোমাদিগের চাকরী যাইলেও যাইতে পারে; কিন্তু আমি যেরূপ ভাবে কাৰ্য্য করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি, তাহাতে চাকরী না যাইবারই সম্ভাবনা। তথাপি তাহা অগ্ৰেই ধরিয়া লও। ধরিয়া লও, এই কাৰ্যে তোমাদিগের চাকরী গেলে, তোমাদিগের প্রত্যেকের দুই হাজার এক শত ষাট টাকার অধিক ক্ষতি হইবে না, কেমন?

সকল প্রহরী। উহার অধিক আর কি করিয়া ক্ষতি হইবে?

দারোগা। সেই টাকা আমি তোমাদিগকে এখনই এক বারে প্রদান করিতেছি, গ্রহণ কর। তদ্ব্যতীত আমার কাৰ্য্যের নিমিত্ত তোমাদিগকে আরও কিছু আমি প্রদান করিতেছি, অর্থাৎ তোমাদিগের প্রত্যেককে আমি তিন হাজার করিয়া টাকা প্রদান করিতেছি, গ্রহণ করিয়া আমার কাৰ্য্যে হত্যার্পণ কর।

এই বলিয়া দারোগা সাহেব প্রত্যেককে তিন হাজার করিয়া চারিজনকে মোট বার হাজার টাকা প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, কেমন, এখন তোমরা আমার কাৰ্য্য করিতে প্রস্তুত আছ?

প্রহরীগণ। আমরা সকল সময়েই আপনার কাৰ্য্য করিতে প্রস্তুত। এখন আমাদিগকে কি করিতে হইবে বলুন।

দারোগা। আর কিছুই করিতে হইবে না। এখন তোমরা গোরস্থানে গমন করিয়া আজ যে সকল মৃতদেহ মাটি দেওয়া হইয়াছে, তাহার মধ্য হইতে দুইটী দেহ উঠাইয়া আন। কেমন পারিবে ত?

প্রহরীগণ। এই সামান্য কাৰ্য্য আর পারিব না?

দারোগা। এ কাৰ্য্য সামান্য নহে। কারণ, এই কার্যের নিমিত্ত তোমরা অপর কাহারও সাহায্য গ্রহণ করিতে পারিবে না। নিজ হন্তে খনন করিয়া তোমাদিগকে সেই স্থান হইতে মৃতদেহ উঠাইতে হইবে, এবং নিজেই উহা বহন করিয়া আনিতে হইবে।

প্রহরীগণ। আমরা চারিজন আছি। সুতরাং এ কার্যের নিমিত্ত আমাদিগকে আর কাহারও সাহায্য গ্রহণ করিতে হইকেনা; অনায়াসেই এ কাৰ্য আমরা সম্পন্ন করিতে পারি। স্ত্রীলোকের মৃতদেহ না, পুরুষের মৃতদেহ আবশ্যক?

দারোগা। স্ত্রীলোকের মৃতদেহ আবশ্যক নহে, পুরুষের মৃতদেহের প্রয়োজন।

প্রহরী। ইহার জন্য আর ভাবনা নাই। আজ দিবা ভাগে আমি একবার গোরস্থানে গিয়াছিলাম, আমার সম্মুখ চারিটী পুরুষের মৃতদেহ মাটি দেওয়া হইয়াছে। উহা হইতে অনায়াসেই আমরা দুইটা উঠাইয়া আনিতে পারি।

দারোগা। যে কবর হইতে মৃতদেহ উঠাইয়া লইবে, মৃত্তিকা দিয়া সেই কবর পুনরায় পূর্ণ করিয়া দেওয়া আবশ্যক।

৩য় প্রহরী। এ কথা কি আর আমাদিগকে আপনার বলিয়া দিতে হইবে?

দারোগা। তোমরা বুদ্ধিমান, তাহা আমি জানি। তথাপি যদি ভুলিয়া যাও, এই নিমিত্ত পূর্ব হইতেই তোমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিতেছি।

৪র্থ প্রহরী। সেই মৃতদেই আমরা কোথায় আনিব?

দারোগা। এই স্থানেই আনিবে, এই থানার ভিতরেই আনিবে।

এই কথা শুনিয়া সকলে টাকাগুলি আপন আপন বাক্সে বন্ধ করিয়া দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালনার্থ গমন করিল। যাইবার সময় দারোগা সাহেব কহিলেন, তোমরা তোমাদিগের যে সকল টাকা আপনাপন বাক্সে বন্ধ করিয়া রাখিলে, মৃতদেহ আনিবার পর সেই টাকা সেই স্থানে রাখিও না; বাক্স হইতে বাহির করিয়া আপনাদিগের সঙ্গেই রাখিও। রাখিবার সুবিধা হইবে বলিয়াই, নগদ টাকার পরিবর্তে আমি তোমাদিগকে নোট প্রদান করিয়াছি।

প্রহরীগণ থানা হইতে প্রস্থান করিলে পর, অনেকক্ষণ পৰ্য্যন্ত দারোগা সাহেব বসিয়া বসিয়া; নানারূপ ভাবিতে লাগিলেন। পরিশেষে নিজেও থানা হইতে বহির্গত হইয়া সেই গোন অভিমুখে গমন করিলেন।

সেই স্থানে গমন করিয়া দেখিলেন, তাঁহার প্রেরিত প্রহরীগণ প্রায় কাৰ্য শেষ করিয়া আনিয়াছে। একটা মৃতদেহ কবর হইতে বাহির করিয়া উপরে রাখিয়াছে, অপরটী কয়ে ভিতরেই আছে। কিন্তু তাহার মৃত্তিকা খনন করা হইয়াছে।

এই অবস্থা দেখিয়া ফারোগা সাহেব পুনরায় থানায় প্রত্যা বৰ্তন করিলেন। তাঁর আসিবার কিয়ৎক্ষণ পরেই প্রহরীগণ দুইট মৃতদেহের সহিত উপস্থিত হইল। আসিয়া দারোগা সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিল, এই মৃতদেহ কোথায় রাখিয়া দিব?

উত্তরে দারোগা সাহেব কহিলেন, উভয় মৃতদেহই হাজতের ভিতর রাখিয়া দেও! প্রহরীগণ তাহাই করিল। তখন তিনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কবর হইতে মৃতদেহ উঠাইবার সময় বা উহা বহন করিয়া থানায় আনিবার সময়, অপর আর কেহ দেখিয়াছে কি?

উত্তরে প্রহরীগণ কহিল, না মহাশয়! কেহই দেখে নাই। দেখিলেও, যেরূপ ভাবে আমরা উঁহাদিগকে আনিয়াছি, তাহাতে কেহই কোনরূপ সন্দেহ করিতে পারিবে না।

দারোগা। যাহা হউক, আমরা পাঁচজন ব্যতীত এই মৃতদেহের কথা আর কেহই অবগত নহে। সাবধান! এ কথা কোনরূপে যেন কেহই জানিতে না পারে। অপরে জানিতে পারিলে, আমারও চাকরী থাকিবে না, তোমাদিগেরও চাকরী থাকিবে না। অধিকন্তু জেলে যাইতে হইবে।

প্রহরীগণ। না মহাশয়। এ কথা কেহই জানিতে পারিবে না। আমাদিগের বুকে বাঁশ দিয়া ডলিলেও আমরা এ কথা কিছুতেই প্রকাশ করি না।

ইহার পর দারোগা সাহেব গোফুর খাঁ ও ওসমানের হস্তে যে হাতকড়ি ছিল, এবং উহা প্রস্থান করিবার সময় তিনি যে হাতকড়ি খুলিয়া রাখিয়াছিলেন, সেই হাতকড়ি লইয়া হাজত-গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলেন, এবং মৃতদেহদ্বয়ের দুই হতে সেই হাতকড়ি লাগাইয়া দিলেন। পরিশেষে হাজতের বাহিরে আসিয়া হাজত-গৃহের তালা বাহির হইতে বন্ধ করিয়া দিলেন। আসামীদ্বয় হাজিত-গৃহে থাকিবার সময় সেই হাজত গৃহের বাহিরে যেরূপ ভাবে প্রহরীর পাহারা ছিল, সেই চারিজন প্রহরীকেই সেইরূপ ভাবে পাহারায় নিধুক্ত করিয়া রাখিলেন। এই সকল কাৰ্য শেষ করিতে রাত্রি বারটা বাজিয়া গেল।

রাত্রি আন্দাজ তিনটার সময়, থানার বাটীর দুই তিন স্থানে একবারে ধু ধু করিয়া আগুন জ্বলিয়া উঠিল, হাজত গৃহ জ্বলিতে লাগিল। তিনজন প্রহরী সেই সময় থানার ভিতর শয়ন করিয়াছিল, কেবলমাত্র একজন প্রহরী হাজতের সম্মুখে পাহারায় নিযুক্ত ছিল। কিরূপে থানার চতুর্দিকে এক বারে অগ্নিময় হইল, তাহা সেই প্রহরী কিছুমাত্র জানিতে না পারিয়া যেমন চীৎকার করিয়া উঠিল, অমনি সম্মুখে দারোগা সাহেবকে দেখিতে পাইল।

দারোগা তাহাকে কহিলেন, চুপ কর। অপর প্রহরী গণকে শীঘ্র উঠাইয়া দেও, এবং আফিসের কাগজপত্র যদি কি বাহির করিতে পার, তাহার চেষ্টা কর। হাজত-গৃহের চাবি আমাকে প্রদান কর। ইহার পর চাবি-সম্বন্ধে যদি কোন কথা উঠে, তাহা হইলে এইমাত্র বলিও, থানায় আগুন লাগিতে দেখিয়াই আমি দ্রুতপদে দারোগা সাহেবকে সংবাদ দিতে গিয়াছিলাম, সেই সময় হাজতের চাবু আমার হস্ত হইতে সে কোথায় পড়িয়া যায়, তাহার কিছুই স্থির করিতে পারি নাই। পরিশেষে আমি ও দারোগা সাহেব হাজতের দরজা ভাঙ্গিয়া আসামীদ্বয়কে বাহির করিবার নিমিত্ত অনেক চেষ্টা করিলাম; কিন্তু কোনরূপেই সেই দরজা ভাঙ্গিয়া উঠিতে পারিলাম না। দেখিতে দেখিতে থানার সহিত হাজত গৃহ ভষ্মে পরিণত হইয়া গেল। অপর প্রহরীগণ তাহাদিগের সাধ্যমত সরকারী কাগজ-পত্র অনেকগুলি বাহির করিয়াছিল, কিন্তু সমস্ত বাহির করিয়া উঠিতে পারে নাই।

থানা গ্রামের বাহিরে। গ্রাম হইতে লোকজন আসিতে আসিতে হাজত-গৃহের সহিত সেই থানা ভস্মে পরিণত হইয়া গেল। দশ পনর মিনিটের মধ্যে সেই থানার আর কিছু মাত্র চিহ্নও রহিল না।

থানায় হঠাৎ আগুন লাগিয়া, দুইজন আসামীর সহিত উহা ভস্মে পরিণত হইয়াছে এই সংবাদ উর্ধতন কর্ম্মচারী গণের কর্ণগোচর হওয়ায়, তাঁহারা আসিয়া ইহার অনুসন্ধান করিলেন। কিরুপে থানায় অগ্নি লাগিল, তাহার কোন প্রমাণ পাওয়া গেল না। কিন্তু ইহা সাব্যস্ত হইল যে, কোন ব্যক্তি উহাতে অগ্নি প্রদান করিয়াছে। তাঁহারা সেই দগ্ধাবশিষ্ট মৃতদেহদ্বয়কে হাতকড়ির দ্বারা আবদ্ধ দেখিয়া, ইহাই স্থির করিলেন যে, গোফুর খাঁ ও তাঁহার পুত্র ওসমান অগ্নিদাহে প্রাণত্যাগ করিছে। প্রমাণে আসল কথা কিছু বাহির হইল না। কেবল দারোগা সাহেব এবং সেই সময় যে সকল প্রহরী থানীয় উপস্থিত ছিল, তাহাদিগের অসাবধানতা বশতঃ থানায় আগুন লাগিয়াছে, এই অপরাধে তাঁহারা কৰ্ম্মচ্যুত হইল মাত্র। এদিকে গোফুর খাঁ ও ওসমান দূরদেশে লুক্কায়িত অবস্থায় কালযাপন করিতে শাগিলেন। কিন্তু কিছু দিবস পরে লোকমুখে প্রকাশ হইয়া পড়িল যে, তাঁহারা পুড়িয়া মরেন নাই, এখনও জীবিত আছেন। অনুসন্ধানে তাহার কতক প্রমাণও হইল, কিন্তু কর্ম্মচারীগণ জেলে যাইতে পারে, এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া গেল না।

 ছেলে-ভুল

ছেলে-ভুল (অর্থাৎ অপহৃত বালক উদ্ধারের অদ্ভুত রহস্য!)
DETECTIVE STORIES No. 79. দারোগার দপ্তর ৭৯ম সংখ্যা।
ছেলে-ভুল
(অর্থাৎ অপহৃত বালক উদ্ধারের অদ্ভুত রহস্য!)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে শ্রী বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। কার্তিক।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta,

ছেলে-ভুল।
প্রথম পরিচ্ছেদ।

ছেলে-ভুল, এই কথা শুনিয়া পাঠকগণ ত একবারেই চমকাইয়া উঠিবেন, পাঠিকাগণের ত কথাই নাই। ছেলে কুল, কি ভয়ানক কথা! যাহার পুত্র আছে, যাহার হৃদয়ে পুত্রস্নেহ একদিবসের নিমিত্তও প্রবেশ লাভ করিয়াছে, তাহাকেই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতে হইবে, ছেলেকে কি কখন ভুল হইতে পারে? আপন পুত্রকে পিতামাতা কি কখনও ভুল করিতে পারেন। তবে এক কথা এই হইতে পারে যে, কোন পিতামাতার পুত্র নিতান্ত শৈশবকালে যদি কাহারও দ্বারা অপহৃত হয়, বা সংসারচক্রের দুষ্পরিহার্য ঘটনাবলীর মধ্যে পড়িয়া, যদি কেহ আপনার প্রাণের রত্নকে হারান, এবং বহু বৎসর পরে যদি সেই পুত্রকে হঠাৎ দেখিতে পান, তাহা হইলে হয় ত পিতামাতা আপনার সেই প্রাণধনকে সহজে চিনিয়া উঠিতে পারেন না। কিন্তু একবারেই যে চিনিয়া উঠিতে পারেন না, তাহাও আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতে সাহসী হই না। যে ছেলে-ভুলের বৃত্তান্ত আজ আমি পাঠকগণের সম্মুখে উপস্থিত করিতেছি, উহা কি তবে সেই প্রকারের ছেলে-ভুল? না, তাহা নহে। এ ছেলে-ভুলের অবস্থা যেরূপ, তাহা পাঠক-পাঠিকাগণ সহজে বিশ্বাস করিতে চাহিবেন না, টিটকারী দিয়া আমার কথা উড়াইয়া দিবেন, এবং আপনা দিগের মধ্যে পরস্পর বলাবলি করিবেন, ইহা কখনই হইতে পারে না; সম্পূর্ণরূপে ইহা অসম্ভব।

ইহা সম্ভবপর হউক, বা না হউক, পাঠক-পাঠিকাগণ আমার কথায় বিশ্বাস করুন, বা না করুন, যাহা ঘটিয়াছে, যাহা দেখিয়াছি, যাহা অনুসন্ধান করিয়াছি, তাহাই আজ সকলের সম্মুখে বলিতেছি। যাহার ইচ্ছা হয়, বিশ্বাস করিবেন, যাহার ইচ্ছা না হয়, তিনি বিশ্বাস না করিতে পারেন; কিন্তু যাহারা এই ঘটনা বিশ্বাস না করিবেন, তাঁহাদিগের নিকট আমার একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে। তিনি বাল্যকাল হইতে এ পর্যন্তু বর্তমান মানব-চরিত্র অধ্যয়ন করি। আসিতেছেন কি? বিশেষতঃ এতদঞ্চলের মানবগণের আচার কবহার, কাৰ্য-কলাপ প্রভৃতি আপনি বাল্যকালে যেরূপ দেখিয়া আসিয়াছিলেন, এখন আপনি তাহার কিছুমাত্র পরিবর্তন বুঝিয়া উঠিতে পারিয়াছেন কি? বলুন দেখি, পূর্বকালে সন্তান প্রতিপালনের ভার কাহার উপর ছিল? সন্তান জন্ম গ্রহণের পর হইতে তাহার মনুষ্যত্ব প্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত, কাহার দ্বারা সে লালিত-পালিত হইত? কাহার যত্নে বর্জিত হইত? যতদিবস পৰ্য্যন্ত বালক স্তনদুগ্ধ পান করিত, ততদিবস পৰ্য্যন্ত মাতা কি তাহাকে আপন ক্রোড়ের বহির্ভাগে গমন করিতে দিতেন? অপরের স্তনদুগ্ধ কোন্ মাতা শিগুগণের উদরে সহজে প্রবেশ করাইতে সম্মত হইতেন? সে সময়ের জননীমাত্রেই অশিক্ষিত ছিলেন, পাশ্চাত্য-শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহাদিগের হৃদয়ে পাশ্চাত্যভাব তখন প্রবেশ করিয়াছিল না। সুতং তাঁহারা অশিক্ষিতা ছিলেন, তাহাদিগের বুদ্ধির লেশমাত্রও ছিল না, তাই তাঁহারা সামান্য ধাত্রীর কাৰ্য করিয়া, আপন আপন পুত্রকে প্রতিপালন করিতেন; তাই তাঁহারা আপন সন্তানকে ক্রোড়ের বাহির হইতে দিতেন না; তাই তাঁহারা দাসদাসীগণের উপর বিশ্বাস করিয়া, তাহাদিগের হস্তে আপন আপন বহুমূল্য রত্ন কখনই প্রদান করিতে সাহসী হইতেন না। সুতরাং ছেলে-ভুল এ কথা কখনও শুনিতে পাওয়া যাইত না।

আর এখন পাশ্চাত্য-সভ্যতা আমাদিগের অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছে। স্ত্রীগণ শিক্ষিত (?) হইয়া, বা শিক্ষিত হইয়াছেন এই ভান করিয়া দেশের মুখোজ্জল করিতেছেন! তাই মধ্যে মধ্যে এখন ছেলে-ভুল হইয়া থাকে। তাহাদিগের বিবেচনায় এখন গর্ভধারণের অন্যরূপ ব্যবস্থা হইলেই ভাল হইত; কিন্তু স্বভাবের নিয়ম একবারে পরিবর্তিত হইবার সম্ভাবনা নাই বলিয়াই, এই ভয়ানক যন্ত্রণা হা দিগকে সহ্য করিতে হইতেছে! তবে সন্তান প্রসুত হইবার পর, আর তাঁহাদিগের কোনরূপ কষ্ট থাকে না। সন্তান ভূমিষ্ট হইল, তিনিও তাহাকে চাকর-চাকরাণীর হস্তে সৰ্পণ করিয়া, যাহাতে নিজের মনকে সন্তুষ্ট রাখিতে পারেন, তাহার চেষ্টায় নিযুক্ত হইলেন। ভৃত্যগণই সন্তানের লালনপালনে নিযুক্ত হইল। মাতৃ-স্তনদুগ্ধের পরিবর্তে গর্দভীদুগ্ধে তাহাদের জীবন রক্ষা হইতে লাগিল। মাতৃ স্নেহের পরিবর্তে নীচ-বংশোদ্ভাবা অসচ্চরিত্রা পরিচারিকার স্নেহের সন্তান পরিবর্ধিত হইতে লাগিল। এরূপ অবস্থায় স্নেহময়ী জননী, তাঁহার স্নেহময় পুত্রকে ভুল না করিবেন ত কাহাকে ভুল করিবেন? অবশ্য এরূপ অবস্থা এখন পর্যন্ত সকলের গৃহে প্রবেশ করে নাই। পূৰ্বে নিয়মানুসারে এখনও কোন কোন প্রসূতি আপন আপন সন্তান প্রতিপালন করিয়া থাকেন সত্য; কিন্তু আরও কিছুদিবস পরে, বা তাহাদের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরও যে কি হইবে, তাহা ভাবিয়া উঠিতে পারি না। এখন যাঁহাদের অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে, যাহারা পাশ্চাত্য-শিক্ষার অভিমানে অভিমানী হইয়াছেন, কমলা যাহার উপর কৃপানেত্রে দৃষ্টি করিয়াছেন, এক কথায় আজকাল যাঁহারা সভ্য এবং বড়মানুষ, তাহাদিগের মধ্যে অধিকাংশের গৃহেই এইরূপ ঘটনা ঘটিতেছে। তাহাদিগের ছেলে যদি ভুল না হইবে, তবে আর কাহাদিগের হইবে?

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

একদিবস বৈকালে আমাদিগের পুলিসের সর্বপ্রধান কর্ম্মচারীর স্বহস্তলিখিত একখানি পত্ৰ আসিয়া আমার হস্তে পতিত হইল। তাঁহারই একজন চাপরাশী সেই পত্রখানি আনিয়া, আমার হস্তে প্রদান করিয়া চলিয়া গেল। খামখানি খুলিয়া দেখিলাম, উহার ভিতর একখানি টেলিগ্রাম। সেই টেলিগ্রামের উপর সর্বপ্রধান কর্ম্মচারীর আদেশ,—ইহা পাঠমাত্র কলিকাতার যে ঘাটে তমলুকের জাহাজ আসিয়া উপস্থিত হয়, সেই ঘাটে, গমন করিয়া, টেলিগ্রামে লিখিত বালকের অনুসন্ধান কর, এবং কোনরূপ সন্ধান পাওয়া যায় কি না, তাহা সন্ধ্যার পর আমাকে রিপোর্ট করিও।

টেলিগ্রামের উপর সর্বপ্রধান কর্ম্মচারীর আদেশ পাঠ করিয়া, তাহার পরে টেলিগ্রামখানি পাঠ করিলাম। দেখিলাম, কলিকাতার একজন সম্রান্ত লোক মফঃসল হইতে এই টেলিগ্রাম পুলিসের সর্ব প্রধান কর্ম্মচারীর নিকট প্রেরণ করিয়াছেন। সেই টেলিগ্রামের মৰ্ম্ম এইরূপ —আমরা সপরিবারে একখানি জাহাজে তমলুক হইতে উলুবেড়িয়ায় আসিয়া উপস্থিত হই। জাহাজ হইতে নামিবার পর দেখিলাম, আমার এক বৎসর বয়স্ক পুত্রকে জাহাজে ভ্ৰম ক্রমে ফেলিয়া আসিয়াছি। সেই সময় জাহাজও উলুবেড়িয়া হইতে ছাড়িয়া দিয়াছিল। সুতরাং সেই জাহাজ ধরিয়া আমরা আমার পুত্রকে কোনরূপে আনিতে সমর্থ হইলাম না। আমার পুত্রটীর অঙ্গে প্রায় দুই সহস্র মূল্যের অলঙ্কার আছে। কোনরূপ সুযোগ করিয়া আমি এই টেলিগ্রামখানি আপনার নিকট পাঠাইতেছি, জাহাজে অনুসন্ধান করিলেই, আমার বালকটীর অনুসন্ধান হইবার সম্ভাবনা। আমরাও যতশীঘ্র পারি, কলিকাতায় গিয়া উপস্থিত হইয়া আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিব।

টেলিগ্রামের মর্ম অবগত হইয়া আমি আর কিছুমাত্র বিলম্ব করিতে পারিলাম না। একখানি গাড়ি আনাইয়া তৎক্ষণাৎ আর মানি ঘাটাভিমুখে প্রস্থান করিলাম। ঘাটে উপস্থিত হইয়া জানিতে পারিলাম, এখন পর্যন্ত তমলুকের জাহাজ আসিয়া কলিকাতায় উপস্থিত হয় নাই।

আমি আরও কয়েকজন লোক সংগ্রহ করিয়া আরমানিঘাটে অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। জাহাজ সম্বন্ধীয় কর্ম্মচারীগণ যাহারা সেই সময় সেই ঘাটে উপস্থিত ছিল, তাঁহারাও আমার সাহায্য করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।

ক্রমে জাহাজ আসিয়া উপস্থিত হইল। জেটিতে জাহাজ ভিড়া ইয়া নঙ্গর করা হইলে, আমরা সর্বাগ্রে গিয়া জাহাজে উঠিলাম। জাহাজে যে সকল আরোহী ছিল, তাঁহারাও ক্রমে জাহাজ হইতে অব তরণ করিতে আরম্ভ করিল। যে সকল আরোহীর সহিত ছোট ছোট বালক ছিল, তাহাদিগকে প্রথমে আমরা জাহাজ হইতে অবতরণ করিতে দিলাম না। যাহাদিগের সহিত কোন শিশুসন্তান ছিল না, তাঁহারাই প্রথমে জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়া গেল। উঁহাদিগকে যতদূর সম্ভব অলঙ্কার-ভূষিত সেই বালকের কথা জিজ্ঞাসা করিলাম; কিন্তু কেহই কোনরূপ সন্তোষজনক উত্তর প্রদান করিতে পারিল না। এইরূপে যাহাদিগের নিকট শিশুসন্তান ছিল না, তাহার জাহাজ হইতে প্রস্থান করিলে পর, যাহাদিগের সহিত শিশুসন্তান ছিল, তাহাদিগকে এক এক করিয়া যাইতে দেওয়া হইল। তাহাদের গমন করিবার সময় তাহাদিগের সমভিব্যাহারে যে সকল শিশুসন্তান ছিল, তাহাদিগের সম্বন্ধে যতদূর জানিয়া লইবার সম্ভাবনা, তাহা জানিয়া লইয়া, এবং উঁহারা উঁহাদিগের যে সকল থাকিবার ঠিকানা প্রদান করিল, তাহা লিখিয়া লইয়া উঁহাদিগকেও যাইতে দিলাম। এক এক করিয়া তাঁহারা সকলেই প্রস্থান করিল। কিন্তু যে বালকের অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত আমি সেই স্থানে গমন করিয়া ছিলাম, সেই বালক সম্বন্ধে কোন ব্যক্তিই কোন কথা বলিতে পারিল না, বা যে সকল বালককে লইয়া তাহাদিগের পিতামাতা আমাদিগের সম্মুখে জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়া চলিয়া গেল, তাহাদিগের কোন শিশুর অঙ্গে কোনরূপ মূল্যবান্ অলঙ্কারও দেখিতে পাইলাম না।

এইরূপে সমস্ত আরোহী জাহাজ হইতে প্রস্থান করিলে পর, আমরা জাহাজের সমস্ত স্থান উত্তমরূপে অনুসন্ধান করিলাম। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরার ভিতর খুঁজিয়া দেখিলাম, যে সকল স্থানে জাহাজের খালাসিদিগের জিনিষপত্র থাকে, বা জাহাজের যে সকল স্থানে তাহাদিগের যাতায়াত আছে, সেইসকল স্থানওউত্তমরূপে অ সন্ধান করিলাম; কিন্তু কোন স্থানে সেই এক বৎসর বয়স্ক বালকের বা তাহার পরিহিত অলঙ্কারের কোনরূপ সন্ধান পাইলাম না। তখন আর কি করি, তাহার কিছুমাত্র স্থির করিয়া উঠিতে না পারিয়া, জাহাজের সারেংকে ডাকাইলাম। সে আমাদিগের নিকট আগমন করিলে, তাহাকে সেই টেলিগ্রাম দেখাইলাম, এবং তাহাকে সমস্ত কথা বুঝাইয়া বলিলাম। বৃদ্ধ সারেং জাতিতে মুসলমান হইলেও, তাহাকে বেশ ভদ্রলোক বলিয়া অনুমান হইল। সে তাহার অধীনস্থ সমস্ত খাসি বা জাহাজের অপরাপর ভৃত্যগণকে একত্র করিয়া আমাদিগের সম্মুখেই অনুসন্ধান আরম্ভ করিল। তাহার অনুসন্ধানে আমরা নিম্নলিখিত বিষয়গুলি অবগত হইতে পারিলাম।

১ম। দাসদাসী ও পরিবারবর্গ লইয়া দুই তিনটী ভদ্রলোক তমলুকে এই জাহাজে আরোহণ করেন।

২য়। তাঁহাদিগের সহিত একটী পরিচারিকার ক্রোড়ে একটা এক বৎসর বয়স্ক বালক ছিল।

৩য়। উহার অঙ্গে অনেকগুলি অলঙ্কার ছিল।

৪র্থ। তাঁহারা প্রথম শ্রেণীর একখানি কামরা ভাড়া করেন।

৫ম। সেই কামরার ভিতর স্ত্রীলোকগণ ছিলেন।

৬ষ্ঠ। চাকর-চাকরাণী কয়েকজন সেই কামরার বাহিরে ছিল।

৭ম। বাবুরা সকলে প্রথম শ্রেণীর খোলা জায়গায় এক এক খানি চেয়ার ও মোড়া লইয়া বসিয়াছিলেন।

৮ম। তাঁহারা কে, কোথা হইতে আসিতেছেন, তাহা কেহই অবগত নহে। কেবল এইমাত্র জানিতে পারা গেল যে, উঁহারা তমলুকে জাহাজে উঠিয়াছিলেন।

৯ম। তাঁহারা সকলে উলুবেড়িয়ার ঘাটে অবতরণ করেন।

১০ম। সেই সময় তাঁহারা অলঙ্কার-ভূষিত বালকটীকে লইয়া জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়াছিলেন কি না, কেহ বলিতে পারেনা।

জাহাজের সারেংয়ের সাহায্যে এই কয়েকটামাত্র বিষয় অবগত হইয়া, ক্ষুণ্ণ মনে আমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম; এবং আদেশমত আমার সর্বপ্রধান কৰ্মচারীর নিকট গমন করিয়া, যতদূর অবগত হইতে পারিয়াছিলাম, তাহা তাহার নিকট আদ্যোপান্ত বর্ণন করিলাম। আমার কথা শুনিয়া তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, সেই বালকের কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারি নাই, এবং যেরূপ অবস্থা, তাহাতে সহজে যে উহার কোনরূপ অনুসন্ধান হইবে, তাহার সম্ভাবনাও নিতান্ত অল্প। তথাপি যাহাতে আমি সেই বালকের কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারি, এবং তাহার পরি হিত বহুমূল্য অলঙ্কারগুলির কোনরূপ উদ্ধার করিতে যাহাতে আমি সমর্থ হই, তাহার নিমিত্ত আমার উপর আদেশ প্রদান করিলেন। আমিও তাহার আদেশ শিরোধার্য্য করিয়া, সেই স্থান হইতে নিজ স্থানে প্রত্যাবর্তন করিলাম। আসিবার সময় তাহাকে কেবলমাত্র ইহাই বলিয়া আসিয়াছিলাম যে, টেলিগ্রাম পাঠে যেরূপ বুঝিতে পারা যাইতেছে, তাহাতে বোধ হয়, যাহার পুত্র পাওয়া যাইতেছে  না, তিনি যতশীঘ্র পারেন, কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইবেন। প্রথমতঃ, তিনি যদি আপনার নিকটে আসিয়া উপস্থিত হন, তাহা হইলে অনুগ্রহ পূর্বক তাঁহাকে যেন আমার নিকট প্রেরণ করা হয়। প্রধান কর্ম্মচারী মহাশয় আমার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন ও কহিলেন, আসিবামাত্রই তাঁহাকে আমি তোমার নিকট পাঠাইয়া দিব। তিনি আরও কহিলেন, কেহ যে আপনার শিশুসন্তানকে কখন ভুলক্রমে পরিত্যাগ করিতে পারে, তাহা কিন্তু আমি ইতিপূৰ্বে আর কখনও দেখি নাই, বা শুনিও নাই। না জানি, ইনি কিরূপ পিতা?

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

সে রাত্রিতে আর কোনরূপ অনুসন্ধান হইল না। পরদিবস প্রত্যূষে আমি সেই বালকের অনুসন্ধান করিবার মানসে খানা হইতে বাহির হইতেছি, এমন সময় একখানি পত্র-সহ এক ব্যক্তি একথানি জুড়ি গাড়িতে আমার থানায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। গাড়ি হইতে নামিয়াই তিনি আমার অনুসন্ধান করিলেন। সম্মুখে আমি উপস্থিত ছিলাম, একজন প্রহরী আমাকে দেখাইয়া দিল। আমাকে দেখিয়া তিনি আমার নিকট আগমন করিলেন, এবং পত্রখানি বাহির করিয়া আমার হস্তে প্রদান করিলেন। আমি পত্রখানি খুলিলাম; দেখিলাম, উহা আমার সেই সৰ্ব্বপ্রধান কর্ম্মচারীর স্বহস্তলিখিত। লেখাও অধিক নহে, দুইটী ছত্র মাত্র। উহাতে লেখা ছিল,-আপনি যে বালকের অনুসন্ধান করিতেছেন, এই পত্রবাহক সেই বালকের পিতা।

তাঁহার পোষাক-পরিচ্ছদ, গাড়ি-ঘোড়া দেখিয়া এবং তাহার কথাবার্তা শুনিয়া বেশ বুঝিতে পারিলাম, তিনি একজন বড় মানুষ। পাশ্চাত্য-শিক্ষায় ইনি উত্তমরূপে শিক্ষিত। ইনি আসিয়া হঠাৎ উপস্থিত হওয়ায়, সেই সময় আর আমাকে বাহিরে যাইতে হইল না। তাঁহার সমভিব্যাহারে আমি আমার আফিস গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলাম, এবং সেই স্থানে নির্জনে উভয়ে উপবেশন করিয়া আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনিই কি একখানি টেলি গ্রাম করিয়াছিলেন?

বড়লোক। হাঁ মহাশয়।

আমি। দেখুন দেখি, এই টেলিগ্রাম কি?

বড়লোক। হাঁ মহাশয়। আমিই এই টেলিগ্রাম পঠাইয়াছিলাম।

আমি। এই টেলিগ্রামে যে বালকের কথা উল্লেখ আছে, সে কি আপনার পুত্র?

বড়লোক। হুঁ, সেই শিশু আমার সন্তান। আপনার সাহেবের নিকট হইতে অবগত হইলাম, আপনিই সেই শিশুর অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইয়াছেন; ইহা কি প্রকৃত?

আমি। উহার অনুসন্ধানের ভার আমারই উপর ন্যস্ত হইয়াছে।

বড়লোক। উহার কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারিয়া ছেন কি?

আমি। না, এ পর্যন্ত আমি উহার কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারি নাই। আজ উহার সন্ধানে গমন করিতেছিলাম, এমন সময় আপনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন।

বড়লোক। উহার সন্ধান পাইবার কোনরূপ আশা আছে কি?

আমি। আশা না থাকিলে কি কখনও এই জগতের অস্তিত্ব থাকিত? আশা নাই, এ কথা আমি বলিতে পারি না। ৪

বড়লোক। আপনি অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত গমন করিতে ছিলেন; চলুন, আমিও আপনার সহিত গমন করি।

আমি। আমার সহিত আপনার গমন করিবার প্রয়োজন এখন নাই। যখন প্রয়োজন হইবে, তখন আপনি আমার সহিত গমন করিবেন। এখন কতকগুলি কথা আপনার নিকট আমার জিজ্ঞাস্য আছে, সেইগুলির যথাযথ উত্তর প্রদান করুন; তাহা হইলে কিরূপ ভাবে কোথায় ইহার অনুসন্ধান করিতে হইবে, তাহা বুঝিতে পারিব।

বড়লোক। আমাকে কি জিজ্ঞাসা করিতে চাহেন?

আমি। টেলিগ্রামে যে নাম আছে, সেই নামই বোধ হয়, আপনার নাম? :

বড়লোক। হাঁ উহাই আমার নাম।

আমি। আপনার বাসস্থান কোথায়?

বড়লোক। এই শহরেই আমার বাসস্থান।

আমি। আপনি যে কলিকাতাবাসী, তাহা আমি পূর্বেই বুঝিতে পারিয়াছি; কিন্তু কলিকাতার কোন্ স্থানে আপনার বাসস্থান, তাহা আমাকে বলিয়া দিবেন কি? কারণ, যখন আপনাকে আবশ্যক হইবে, তখন আমি আপনাকে কোথায় পাইব?

আমার কথার উত্তরে তিনি তাঁহার প্রকৃত পরিচয় আমাকে প্রদান করিলেন, এবং যে স্থানে তাহার বাসস্থান তাহাও আমাকে বলিলেন। আমি কিন্তু তাহার নাম ও পরিচয় পাঠকগণের নিকট সবিশেষ কোন কারণ বশতঃ প্রকাশ করিতে পারিলাম না।

আমি। কিরূপ অবস্থায় আপনি আপনার শিশুসন্তানটীকে হারাইয়াছেন, তাহার আদ্যোপান্ত বৃত্তান্ত আমার নিকট সবিশেষ করিয়া বলুন দেখি।

বড়লোক। আমি পূৰ্বেই বলিয়াছি, আমার বাসস্থান এই কলিকাতায়; কিন্তু আমার শ্বশুরালয় কলিকাতায় নহে। মেদিনী পুর জেলার মধ্যে একখানি ক্ষুদ্র গ্রামে আমার শ্বশুরালয়। সেই স্থানে গমন করিতে হইলে, ষ্টীমারে তমলুক পৰ্য্যন্ত গমন করিতে হয়। তমলুক হইতে আমার শ্বশুরালয় কয়েকখানি গ্রাম ব্যবধান। তমলুক হইতে সেই স্থানে গমন করিতে হইলে পাল্কী বা শকট ভিন্ন গমন করিবার আর কোন উপায় নাই। আমার বিবাহের পর আমার স্ত্রী কেবলমাত্র একবার তাহার পিত্রালয়ে গমন করিয়া ছিলেন; তাহা বহুদিবসের কথা। আমার শ্বশুরের অবস্থা ভাল নহে বলিয়া, আমি আমার স্ত্রীকে সেই স্থানে যাইতে দেই না। আমার শ্বশুর মহাশয় আসিয়া মধ্যে মধ্যে, তাহাক আবাকে দেখিয়া যান। কিন্তু পাড়াগাঁয়ের নিয়ম-অনুসারে আমার শ্বাশুড়ীঠাকুরাণী আমাদিগের বাটীতে আসিতে পারেন না। সুতরাং তাহার কন্যার সহিত প্রায় একরূপ দেখা-সাক্ষাৎ নাই। আমার স্ত্রী বহুদিবস হইতে তাহার মাতাকে দেখিতে না পাইয়া, বড়ই দুঃখিতা থাকিতেন, এবং সেই স্থানে গমন করিয়া একবার তাহার মাতার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আসিবেন, এই ইচ্ছা মধ্যে মধ্যে প্রকাশ করিতেন। সুযোগ মত আমি তাহাকে সঙ্গে করিয়া তাহার মাতার সহিত সাক্ষাৎ করা ইয়া আনিব, এই কথা মধ্যে মধ্যে বলিয়া তাহাকে সান্ত্বনা করিতাম।

ক্রমে আমার সেই পুত্ৰটী জন্মগ্রহণ করিল। সেই পুত্র জন্মাইবার পর হইতে আমার স্ত্রী তাহার পিত্রালয়ে অভাবপক্ষে দুই একদিবসের নিমিত্তও গমন করিবার জন্য আমাকে সবিশেষরূপে অনুরোধ করিতে লাগিল। আমি প্রথমতঃ তাহার প্রস্তাবে অসম্মত হইলাম; কিন্তু কোনরূপেই তাহাকে শান্ত করিতে পারিলাম না। অনোপায় হইয়া ক্রমে তাহার মতে আমাকে মত দিতে হইল, এবং শ্বশুরালয়ে গমন করিবার দিন স্থির করিয়া শ্বশুর মহাশয়কে পত্র লিখিলাম। সেই স্থানে গমন করিতে হইলে, যে স্থানে যেরূপ করিবার প্রয়োজন, তাহার সমস্তই ঠিক হইল। প্রায় এক সপ্তাহ হুইল, আমি আমার স্ত্রী ও পুত্রের সহিত আমার শ্বশুর বাড়ী গমন করিবার নিমিত্ত কলি কাতা পরিত্যাগ করিলাম। আমাদিগের সঙ্গে আমার দুইজন বন্ধু, একজন পাচক ব্রাহ্মণ, দুইটী দ্বারবান, চারিজন পরিচারক এবং দুইজন পরিচারিকামাত্র গমন করিল। আমার শ্বশুরের অবস্থা ভাল নহে, এ কথা আমি পূর্ব্বেই বলিয়াছি; সুতরাং সেই স্থানে গমন করিয়া, সেই নে অনহিতি করিবার ও সেই স্থান হইতে প্রত্যা বৰ্তন করিবার কে সকল ব্যর এবং যেরূপ বন্দোবস্তের প্রয়োজন, তাহা সমস্ত আমিই নির্ব্বাহ করিলাম।

কলিকাতার আরমানিঘাট হইতে জাহাজে আরোহণ করিয়া আমরা তমলুকে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই স্থানে পাল্কীর বন্দোবস্ত ছিল। সুতরাং শশুরবাড়ী পৌঁছিতে আমার বা আমার সমভিব্যাহার সমস্ত লোকের কোনরূপ কষ্ট হইল না। সেই স্থানে। কয়েকদিবসকাল অতিবাহিত করিয়া গত পরশু তারিখে আমরা তমলুকে আসিয়া উপস্থিত হই। সেই স্থানে রাত্রিযাপন করিয়া, পরদিবস জাহাজে আমোহণ করি। আমাদিগের ইচ্ছা ছিল, তমলুক হইতে আমরা একবারে কলিকাতায় আগমন করিব না; উলুবেড়িয়ার কয়েকখানি গ্রাম ব্যবধানে আমার স্ত্রীর এক ভগিনীর শ্বশুরবাড়ী আছে। ইচ্ছা ছিল, উলুবেড়িয়ায় নামিয়া, আমরা সেই স্থানে গমন করিব; সেই স্থানে দুই একদিবস থাকিয়া, আমরা কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিব। মনে মনে আমরা যেরূপ স্থির করিয়াছিলাম, কাৰ্যেও আমরা সেইরূপ বন্দোবস্ত করিয়াছিলাম। সেই স্থানে গমন করিবার সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক ছিল, জাহাজ উলুবেড়িয়ায় আসিয়া উপস্থিত হইলে, আমরা সকলে সেই স্থানে অবতরণ করিলাম। জাহাজ জেটিতে থাকিয়া নিয়মিত সময়ে কলিকাতা অভিমুখে প্রস্থান করিল।

জাহাজ ছাড়িয়া যাইবার পর দেখিলাম, আমার সমভি বাহারী লোজন ও দ্রব্যসামগ্রী সমস্তই জাহাজ হইতে নামাইয়া আনা হইয়াছে, কেবল আমায় শিশুসন্তানটীকে দেখিতে পাইলাম না। তাহাকে দেখিতে না পাইয়া, প্রথমত আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলাম; তিনি কহিলেন, আমার নিকটে তামার সন্তান নাই, কোন না কোন চাকর-চাকরাণীর কাছে থাকিবে। তখন এক এক করিয়া চাকর-চাকরাণী, দ্বারা ব্ৰাহ্মণ প্রতি যে সফল ব্যক্তি আমাদিগের সঙ্গে ছিল; তাহাদিগের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসা করি লাম। সকলেই কহিল, তাঁহারা কেহই জাহাজ হইতে বালককে নামাইয়া আনে নাই। অধিকন্তু প্রত্যেকে প্রত্যেকের সহিত বিবাদ আরম্ভ করিল, পরিচারিকাদ্বয়ের মধ্যে মহাগোলযোগ উপস্থিত হইল।

একজন কহিল, বালক তোর জিম্মায় ছিল, তুই আনিস নাই কেন? অপর আর একজন কহিল, জাহাজের ভিতর তুই বালককে ক্রোড়ে করিয়া রাখিয়াছিলি, তোরই নিকট সেই বালক ছি, তুই তাহাকে কিরূপে পরিত্যাগ করিয়া আসিলি! চাকর গণের মধ্যে পরস্পর হাতাহাতি আরম্ভ হইল। একজন কহিল, তোর দোষ। আর একজন কহিল, তোর দোষ। একজন কহিল, জাহাজ হইতে নামিবার সময় তোক বলিয়াছিলাম, কোন স্ত্রব্য ভুল ক্রমে ফেলিয়া আসিয়াছি কি না, দেখিয়া আয়। অপর ন্যূক্তি কহিল, এ কার্যের ভার তোর উপর ছিল, তুই আপন কাৰ্য্য করিস্ নাই বলিয়াই ত এই সর্বনাশ ঘটিল। আমার সমভিব্যাহারে অপর যাহারা ছিলেন, তাঁহারা চুপ করিয়া এদিক ওদিক অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন, আমার স্ত্রী উচ্চৈঃস্বরে কাদিতে আরম্ভ করিল। এই সকল ব্যাপার দেখিয়া আমি যে কি করিব, তাহার কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলাম না। ওদিকে দেখিলাম, জাহাজখানি আর ঘাটে নাই, কলিকাতা অভিমুখে প্রস্থান করিতেছে; আর এত দূরবর্তী হইয়া পড়িয়াছে যে, জাহাজের কোন লোক আমাদিগের উচ্চরবও শুনিতে পায় না।

তখন অনন্যোপায় হইয়া, কি করিব, তাহার কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া, আপনাদিগের সাহেবের নিকট টেলিগ্রাম করিলাম, এবং অপর যে সকল স্থানে সেই জাহাজ পড়াইবার সম্ভাবনা আছে, সেইসকল স্থানে অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত লোজন সমভিব্যাহারে আমি নিজেই রওনা হইলাম। স্থানীয় পুলিসকেও সেই সময় সংবাদ দেওয়া হইয়াছিল, তাঁহারাও আমাদিগকে সবিশেষরূপ সাহায্য করিলেন; কিন্তু কোন স্থানেই তাহার কোনরূপ সন্ধান করিতে পারিলাম না।

আমি। যখন আপনারা তমলুক হইতে জাহাজে আরোহণ করেন, সেই সময় বালকটীকে জাহাজে আনা হইয়াছিল ত?

বড়লোক। সে সময় ভুল হয় নাই।

আমি। জাহাজের উপর আপনি আপনার পুত্রটীকে নিজ চক্ষে দেখিয়াছিলেন কি?

বড়লোক। জাহাজের মধ্যে আমি যে তাহাকে নিজ চক্ষে দেখিয়াছি ইহা কিন্তু আমার ঠিক স্মরণ হয় না; কিন্তু বালকটীকে যে জাহাজে আনা হইয়াছিল, সে বিষয়ে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।

আমি। আপনি কিরূপে বলিতেছেন যে, জাহাজে তাহাকে আনা হইয়াছিল? কারণ, আপনি নিজে ত তাহাকে দেখেন নাই।

বড়লোক। আমি নিজে দেখি নাই সত্য। কিন্তু পরিশেষে এ বিষয়ে আমি অনুসন্ধান করিয়াছিলাম। যে চাকরাণী ক্রোড়ে করিয়া তাহাকে জাহাজে উঠাইয়াছিল, সে-ই আমাকে বলিয়াছে। তদ্ব্যতীত আমার স্ত্রীও তাহাকে জাহাজের ভিতর দেখিয়াছেন।

আমি। যে সময় উলুবেড়িয়ায় আপনারা সকলে জাহাজ হইতে অবতরণ করেন, সেই সময় সেই বালক কাহার নিকট ছিল, তাহার কিছু অনুসন্ধান করিয়াছেন কি?

বড়লোক। করিয়াছি, সেই সময় সেই বালক কাহারও ক্রোড়ে ছিল না। জাহাজ হইতে অবতরণ করিবার কিছু পূর্বেই সে নিদ্রিত হইয়া পড়ে, কামরার মধ্যে একখানি বেঞ্চের উপর তাহাকে শোয়াইয়া রাখা হয়। পরিশেষে নামিবার সময় ভুলক্রমে আর কেহই তাহাকে লইয়া নাবেন নাই। নিদ্রিত অবস্থায় বালক আমার সেই স্থানেই রহিয়া যায়।

আমি। আমি বিস্তর বিস্তর ভুল দেখিয়াছি; কিন্তু এরূপ মহা ভুল আমি কখনও দেখি নাই; দেখা ত দূরের কথা, কখনও শুনি নাই।

বড়লোক। নিদ্রিত অবস্থায় বালক আমার এই কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হয় নাই ত?

আমি। জাহাজ ঘাটে আসিয়া উপস্থিত হইবার পূর্বেই আমি সেই স্থানে গমন করিয়াছিলাম। আমার সম্মুখেই জাহাজ আসিয়া ঘাটে উপস্থিত হয়। জাহাজের ভিতর ও আরোহীগণের মধ্যে আমি নিজে উত্তমরূপে অনুসন্ধান করিয়া দেখিয়াছি। বালক কলি কাতা পর্যন্ত আসিয়া উপস্থিত হয় নাই।

বড়লোক। জাহাজের কোন লোক সেই বালক সম্বন্ধে কোন কথা বলিতে পারে নাই?

আমি। তাহাও আমি প্রায় প্রত্যেকেকে জিজ্ঞাসা করিয়াছি; কিন্তু সেই বালক যে কোথায় গেল, বা কে তাহাকে লইয়া গেল, এ সংবাদ আমাকে কেহই প্রদান করিতে পারিল না। কেবল জাহাজের খালাসিগণের নিকট হইতে এইমাত্র অবগত হইতে পারি লাম যে, আপনারা তমলুকে উঠিয়াছিলেন, এবং উলুবেড়িয়ায় নামিয়া গিয়াছেন।

বড়লোক। মহাশয়। এখন উপায় কি বলুন দেখি?

আমি। উপায় ঈশ্বরের হস্ত। আমরা বালকের সন্ধান করিবার নিমিত্ত সাধ্যমত চেষ্টা করি মাত্র। সেই বালকের অঙ্গে কি কি অলঙ্কার ছিল বলিতে পারেন কি?

বড়লোক। কি কি অলঙ্কার ছিল, ঠিক তাহা আমি বলিতে পারি না। কেবল এইমাত্র বলিতে পারি যে, বালকের অঙ্গে সোণার যে সকল অলঙ্কার থাকিতে পারে, তাহার সমস্তই ছিল। আবশ্যক হয়, তাহার একটা বিস্তারিত তালিকা আমি পরে পাঠাইয়া দিব।

আমি। আমি একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞাসা করি,–যে সকল চাকর-চাকরাণী বা লোজন আপনার সহিত ছিল, তাহা দিগের মধ্যে কাহাকেও কোনরূপে আপনার সন্দেহ হয় কি?

বড়লোক। সকলেই পুরাতন চাকর। তাহাদিগের কাহারও দ্বারা যে কোনরূপ অনিষ্ট হইবে, কিন্তু আমার মনে স্থান পায় না; তবে বলিতে পারি না। কিন্তু তাঁহারা সকলেই ত আমাদিগের সহিত ছিল, কাহাকেই সেই সময় অনুপস্থিত পাই নাই।

আমি। অলঙ্কারের লোভ, ভয়ানক লোভ। এ লোভ সম্বরণ করা সামান্য লোকের পক্ষে বড়ই কঠিন।

বড়লোক। উঁহাদিগের মধ্যে কেহ যদি অলঙ্কারগুলি অপহরণ করিত, তাহা হইলে অলঙ্কার-শূন্য বালকটাকে ত কোন প্রকারে পাওয়া যাইত?

আমি। পাওয়া ত উচিত ছিল; কিন্তু যদি অলঙ্কারগুলি অপ হরণ করিয়া বালককে গঙ্গাজলে নিক্ষেপ করিয়া থাকে, তাহা হইলে কিরূপে বালককে পাওয়া যাইতে পারে।

বড়লোক। যখন আমরা সকলেই সেই স্থানে উপস্থিত, তখন চাকর-চাকরাণীগণের মধ্যে কাহারও কি এতদুর সাধ্য হইতে পারে? যদি তাহাই হইয়া থাকে, তাহা হইলে আপনার বিবেচনায় বালককে কি হত্যা করিয়া তাহার অলঙ্কারগুলি অপহরণ করিয়াছে বুলিয়া, আপনার অনুমান হয়?

আমি। অনুমান হয় না। চাকর-চাকরাণীগণ কর্তৃক শিশু হত্যা না হইবারই খুব সম্ভাবনা। এ কথা আমি তচ্ছলে বলিতেছি মাত্র। আমি আপনাকে আরও দুই একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করি।

বড়লোক। কি?

আমি। যে কামরার ভিতর আপনার স্ত্রী ও আপনার শিশু সন্তান ছিল, আপনিও কি সেই কামরার ভিতর ছিলেন?

বড়লোক। না মহাশয়! আমি সেই স্থানে ছিলাম না, অপর স্থানে ছিলাম।

আমি। সেই কামরার ভিতর আপনার স্ত্রী ব্যতীত অপর আর কে ছিল?

বড়লোক। দুইজন পরিচারিকা ছিল।

আমি। তাঁহারা এখন কোথায়?

বড়লোক। তাঁহারা এখন আমার বাড়ীতেই আছে।

আমি। আমি তাহাদিগকে দুই চারিটী কথা জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করি।

বড়লোক। উত্তম, আপনি আমার সহিত আমাদিগের বাড়ীতে চলুন। সেই স্থানে চাকর-চাকরাণীগণ যাহারা আমাদিগের সহিত ছিল, সকলেই উপস্থিত আছে, আপনি যাহাকে যাহা ইচ্ছা হয়, তাহা জিজ্ঞাসা করিয়া লইতে পারেন।

আমি। সে-ই ভাল, চলুন আমি আপনার সহিত গমন করি তেছি। আপনাকে আরও একটা কথা জিজ্ঞাসা করিতে চাই।

বড়লোক। কি?

আমি। আপনার অবস্থা দেখিয়া ও আপনার কথাবার্তা শুনিয়া আমার বেশ অনুমান হইতেছে, আপনি বড়লোক, এবং আপনার বিষয়-আশয় যথেষ্ট আছে।

বড়লোক। আপনি যাহা বলিতেছেন, সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমার এই মহৎ কাৰ্য্য যদি আপনার দ্বারা সাধিত হয়, তাহা হইলে আপনার খরচপত্র ত দূরের কথা, যাহাতে আপনি সন্তুষ্ট হন, এরূপ পুরস্কার আমি আপনাকে প্রদান করিব।

আমি। আমি পুরস্কার বা খরচপত্রের কথা বলিতেছি না। আমি যাহা বলিতেছি, তাহা অগ্ৰে শুনিয়া তাহার উত্তর প্রদান করুন। আমি যাহা অনুমান করিতেছি, তাহা ত প্রকৃত? আপনার যথেষ্ট বিষয় আছে কি? আমার এ জিজ্ঞাসার উদ্দেশ্য, আপনাকে পরে বলিতেছি।

বড়লোক। হাঁ, কিছু আছে।

আমি। আপনার পুত্রের জীবনের উপর আপনার বিষয় উপ লক্ষে কাহারও শুভাশুভ কিছু নির্ভর করে কি?

বড়লোক। আমি আপনার এ কথার ঠিক প্রকৃত অর্থ বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না।

আমি। আপনার যদি সেই পুত্র জন্মগ্রহণ না করিত, বা সেই পুত্রের কোনরূপে যদি মৃত্যু হয়, তাহা হইলে আপনার মৃত্যুর পর আপনার অগাধ বিষয়ের স্বত্বাধিকারী অপর কেহ হইতে পারে কি?

বড়লোক। না, আমি সেরূপ দেখিতেছি না। আমার এই পুত্রের মৃত্যুতে আমার এই বিষয়ের কোনরূপ ক্ষতি-বৃদ্ধি হইবে না। কারণ, এই বিষয় এখন আমার নহে, আমার পিতার। তিনি এখনও বর্তমান; তদ্ব্যতীত আমিই কেবল তাহার একমাত্র পুত্র নহি।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

সেই বড়লোকের সহিত আমার এই সকল কথাবার্তা হইবার পর, আমি তাহার সহিত তাহার গাড়িতেই আরোহণ করিয়া তাহার বাড়ীতে গমন করিলাম। তাঁহার বাড়ীতে উপস্থিত হইয়া যে পরিচারিকাদ্বয় তাহার স্ত্রীর সহিত গমন করিয়াছিল, তাহাদিগকে ডাকাইলাম; ডাকিবামাত্রই তাঁহারা আমার সম্মুখে আসিল। তাহা দিগের মধ্যে প্রথমে যে আমার নিকট আগমন করিল, আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, তমলুক হইতে যখন তোমরা জাহাজে উঠিয়াছিলে, তখন বালকটীকে তোমরা ক্রোড়ে করিয়া আনিয়াছিলে ত?

১ম পরিচারিকা। আমি তাহাকে ক্রোড়ে করিয়া জাহাজে উঠিয়াছিলাম।

আমি। এ কথা তোমার বেশ মনে আছে?

১ম পরিচারিকা। বেশ মনে আছে। তদ্ব্যতীত জাহাজে উঠিয়া আমি সেই বালককে একবার তাহার মাতার ক্রোড়ে দিয়াছিলাম। তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেই আপনি জানিতে পারিবেন যে, আমার কথা প্রকৃত কি না।

আমি। উলুবেড়িয়ায় নামিবার সময় বালকটীকে নামাইতে ভুল হইল কি প্রকারে?

১ম পরিচারিকা। তাহার মাতার ক্রোড় হইতে অপর ওই চাকরাণী সেই বালককে গ্রহণ করে, এবং তাহার ক্রোড়েই ক্রমে সেই বালক নিদ্রিত হইয়া পড়ে। নিদ্রিত হইবার পর সেই কামরার মধ্যে একখানি বেঞ্চের উপর একটা ছোট বিছানা করিয়া বালকটীকে সেই বিছানার উপর শয়ন করাইয়া রাখে। পরিশেষে উলুবেড়িয়ার ঘাটে জাহাজ আসিয়া উপস্থিত হইলে, আমি প্রথমেই আমার কর্তৃঠাকুরাণীর সঙ্গে জাহাজ হইতে অবতরণ করি। কারণ, তাঁহার সহিত আমাদিগের মধ্যে কোন পরিচারিকা না থাকিলে তিনি জাহাজ হইতে একাকী অবতরণ করিতে কখনই সমর্থ হইতেন না বলিয়াই, আমি তাঁহার সহিত গমন করি। যে সময় আমি ও আমার কর্তৃ ঠাকুরাণী জাহাজ হইতে নামিয়া আসি, সেই সময় অপর চাকরাণী জাহাজের উপরেই ছিল। আমরা ভাবিয়াছিলাম, সে জাহাজ হইতে অবতরণ করিবার সময় বালকটীকে ক্রোড়ে করিয়া আনিবে; কিন্তু পরে দেখিতে পাইলাম, সে তাহা করে নাই, ভুল করিয়া বালকটীকে জাহাজেই পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছে।

তখন আমি দ্বিতীয় পরিচারিকাকে সম্বোধন করিয়া বলিলাম, এ বড় বিষম ভুল! তুমি বালকটীকে জাহাজে পরিত্যাগ করিয়া আসিলে কেন?

২য় পরিচারিকা। কঠাকুরাণীর গহনা ও অপরাপর জিনিষ পত্র আমি পূর্বেই গুছাইয়া রাখিয়াছিলাম। অপর চাকরাণীর সহিত কর্তৃঠাকুরাণীকে জাহাজ হইতে বহির্গত হইতে দেখিয়া সেই সকল দ্রব্যাদি লইয়া আমিও তাহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ জাহাজ হইতে অবতরণ করি। আমি ভাবিয়াছিলাম, কর্তৃঠাকুরাণী বা অপর পরিচারিকা বালকটীকে নিশ্চয় ক্রোড়ে করিয়া লইয়া গিয়াছেন। কারণ, আমি সেই সময় ভাবিয়াছিলাম, যখন গহনা ও জিনিষপত্র নামাইবার ভার আমার উপর পড়িয়াছে, তখন নিশ্চয়ই তাঁহারা বালকটাকে লইয়া গিয়াছেন। আমার কেবলমাত্র দোষ যে, দ্রব্যাদির সহিত দ্রুতপদে জাহাজ হইতে বাহির হইবার সময় আমি সবিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখি নাই যে, বালকটীকে লইয়া গিয়াছে, কি তখন পর্যন্ত সে সেই স্থানেই শয়ন করিয়া আছে।

আমি। তোমরা জাহাজ হইতে বাহিরে আসিলে পর, সেই কামরার ভিতর কোন দ্রব্য পরিত্যক্ত হইয়াছে কি না, তাহা দেখি বার নিমিত্ত তোমাদিগের কোন লোক সেই কামরার ভিতর প্রবেশ করিয়াছিল কি?

২য় পরিচারিকা। তাহা আমি বলিতে পারি না। আমার বোধ হয়, কেহই যায় নাই। কারণ, কেহ যদি উহার ভিতর গমন করিত, তাহা হইলে নিশ্চয়ই সে সেই বালকটীকে বেঞ্চের উপর নিদ্রিত অবস্থায় দেখিতে পাইত।

আমি। তোমরা যে কামরার ভিতর ছিলে, তাহার ভিতর অপর আর কোন লোক ছিল?

২য় পরিচারিকা। আমরা দুইজন পরিচারিকা ও আমাদিগের কর্তৃঠাকুরাণী ভিন্ন অপর আর কেহই সেই কামরার ভিতর ছিল না।

আমি। যে সময় তোমরা জাহাজ হইতে অবতরণ কর, সেই সময় তোমাদিগের সেই কামরার সম্মুখে আর কোন ব্যক্তি বসিয়াছিল?

২য় পরিচারিকা। না, অপর কোন ব্যক্তিকে সেই স্থানে বসিতে দেখি নাই। তবে দুই একজন লোক সেই স্থান দিয়া যাতায়াত করিতেছিল, তাহা আমি দেখিয়াছি।

আমি। সেই লোক কে? ২য় পরিচারিকা। তাহা আমি জানি না।

আমি। উঁহারা জাহাজের খালাসি প্রভৃতি, কি আবোহী? ২য় পরিচারিকা। দুই একজন খালাসিকেও দেখিয়াছি, এবং অপর আরোহীগণের মধ্যেও দুই একজন সেই স্থান দিয়া যাতায়াত করিয়াছে।

আমি। তুমি তাহাদিগকে দেখিলে চিনিতে পারিবে? ২য় পরিচারিকা। না।

আমি। কেন?

২য় পরিচারিকা। তাহাদিগকে কেবল একবার দেখিয়াছি মাত্র, তাহাও সবিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখি নাই।

আমি। যে কামরায় তোমরা ছিলে, তাহার পার্শ্ববর্তী কামরায় আর কোন আরোহী ছিল কি?

২য় পরিচারিকা। ছিল, আমাদিগের কামরার ঠিক পার্শ্বের কামরায় কয়েকটী স্ত্রীলোক ছিল দেখিয়াছি।

আমি। সেই স্ত্রীলোকদিগকে দেখিয়া কি মনে হয়? উঁহারা কি কোন গৃহস্থের পরিবার?

২য় পরিচারিকা। উঁহাদিগকে দেখিয়া কোন ভদ্র-বংশীয় স্ত্রীলোক বলিয়াই বোধ হয়।

আমি। উঁহাদিগের সহিত অপর আর কোন পুরুষ মানুষ ছিল কি?

২য় পরিচারিকা। সেই কামরার ভিতর কোন পুরুষ মানুষকে দেখি নাই; কিন্তু কয়েকজন পুরুষ মানুষ আসিয়া মধ্যে মধ্যে উহা দিগের খোজ-তল্লাস লইয়া গিয়াছে, তাহা আমি দেখিয়াছি।

আমি। তুমি জান, উঁহারা কাহারা?

২য় পরিচারিকা। না, তাহা আমরা জানি না।

আমি। উঁহারা কোথায় নামিয়া গিয়াছে?

২য় পরিচারিকা। তাহা বলিতে পারি না। কারণ, যখন আমরা জাহাজ হইতে উলুবেড়িয়ায় অবতরণ করি, সেই সময় তাঁহারা জাহাজেই ছিলেন। পরে কোথায় নামিয়াছেন, তাহা আমি জানি না।

আমি। তাহাদিগকে দেখিলে তুমি চিনিতে পারিবে?

২য় পরিচারিকা। তাহা আমি এখন ঠিক বলিতে পারিতেছি না। দেখিলে বুঝিতে পারি, চিনিতে পারি কি না।

আমি। তোমাদিগের সহিত পরিচারক ও দ্বারবান্ প্রভৃতি যাহারা ছিল, তাঁহারা তোমাদিগের কামরার ভিতর কখনও কোন কাৰ্য্যের নিমিত্ত প্রবেশ করিয়াছিল কি?

২য় পরিচারিকা। অপর কেহই আমাদিগের কামরায় প্রবেশ করে নাই। এমন কি, বাবু নিজেও সেই কামরার ভিতর প্রবেশ করেন নাই।

আমি। তুমি জাহাজ হইতে অবতরণ করিবার পূৰ্ব্বে, তোমা দিগের সমভিব্যাহারী কোন্ কোন্ ব্যক্তি জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়াছিল?

২য় পরিচারিকা। তাহা আমি সবিশেষ লক্ষ্য করিয়া দেখি নাই।

আমি। তুমি নামিবার পর কে নামিয়াছিল, তাহা বলিতে পার?

২য় পরিচারিকা। তাহাও আমি বলিতে পারি না। সেই গোলযোগের ভিতর কে অগ্রে নামিল, কে পশ্চাৎ নামিল, তাহা আমি লক্ষ্য করিয়া দেখি নাই।

পরিচারিকাদ্বয়ের নিকট হইতে এই কয়টী কথা জিজ্ঞাসা করিয়া লইবার পর, আমি সেই বাবুটীকে কহিলাম, আপনি আপনার স্ত্রীকে একবার জিজ্ঞাসা করিয়া আসুন, আপনার পরিচারিকাদ্বয় যাহা কহিল, তাহা প্রকৃত কি না। যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে সেই পরিচারিকাদ্বয়ের মধ্যে কেহ বালকটীকে লইয়া কোনও সময় জাহাজের বাহিরে আসিয়াছিল কি না? যদি আসিয়া থাকে, তাহা হইলে জিজ্ঞাসা করিবেন, কোন্ চাকরাণী বাহিরে আসিয়াছিল, এবং কেনই বা আসিয়াছিল।

আমার কথা শুনিয়া বাবুটী অন্তঃপুরের ভিতর প্রবেশ করিলেন, ও কিয়ৎক্ষণ পরে বাহিরে আসিয়া কহিলেন, চাকরাণীদ্বয় যাহা বলিয়াছে, তাহা প্রকৃত। উঁহারা যে পর্যন্ত জাহাজে ছিল, সেই পর্যন্ত কেহই কামরার বাহিরে যায় নাই।

এই সকল কথা অবগত হইয়া আমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম। যাইবার সময় বাবুকে বলিয়া গেলাম, অনুসন্ধান করিয়া আমি যাহা যাহা অবগত হইতে পারিব, পরে তাহার সমস্ত ব্যাপার আপনাকে বলিব।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

সেই স্থান হইতে বহির্গত হইয়া গমন করিবার পর দুইটা বিষয় আমার মনে উদিত হইল।

১ম। বালকটীকে পরিত্যাগ করিয়া তাহার পিতামাতা গমন করিলে পর, যদি সেই বালক জাহাজের কোন দুশ্চরিত্র খালাসি বা আরোহীগণের মধ্যে কোন অসচ্চরিত্র লোকের নয়নগোচর হইয়া থাকে, তাহা হইলে অর্থলোভে তাহাকে বিনষ্ট করিয়া অনায়াসেই তাহার দেহ সে গঙ্গার্গর্ভে নিক্ষেপ করিতে পারে। যদি আমার এই অনুমান সত্য হয়, তাহা হইলে বালকের অনু সন্ধান ত দূরের কথা, অলঙ্কার গুলিরও অনুসন্ধান হওয়া নিতান্ত সহজ হইবে না।

২য়। উলুবেড়িয়া ও কলিকাতার মধ্যবর্তী কোন স্থানে কোন আবোহী যদি সেই বালকটীকে লইয়া জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়া চলিয়া গিয়া থাকে, তাহা হইলে বালক ও তাহার অলঙ্কারের কিছু না কিছু সন্ধান হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা আছে। এরূপ অবস্থায় সেই পন্থাই অবলম্বন করিয়া অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হওয়া এক্ষণে আমার কর্তব্য।

মনে মনে এইরূপ অনুমান করিয়া, আমি চাদপালঘাটে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই স্থানে একখানি ডিঙ্গি ভাড়া করিয়া প্রথমে মেটিয়াব্রুজে এবং পরিশেষে বজবজে গিয়া সেই বালক সম্বন্ধে সবিশেষরূপ অনুসন্ধান করিলাম। কিন্তু সেই দুই স্থানে সেই বালকের কোনরূপ অনুসন্ধান না পাইয়া, রাজগঞ্জ ও অপরাপর কয়েকস্থানে গমন করিলাম। সেই সকল স্থানেও বালকের কোন রূপ অনুসন্ধান না পাইয়া, তিন চারিদিবস পরে নিতান্ত ক্ষুণ্ণ মনে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিলাম। আমার উর্দ্ধতন কর্ম্মচারী ও বালকের পিতামাতা প্রভৃতি সকলেই জানিতে পারিলেন যে, আমার দ্বারা সেই বালকের অনুসন্ধান হইবার আর কোনরূপ সম্ভাবনা নাই। তথাপি আমি যে সেই বালকের অনুসন্ধান একবারে পরিত্যাগ করিলাম, তাহাও নহে।

যে কামরার ভিতর বালকটীকে ভ্ৰম-ক্রমে পরিত্যাগ করিয়া আসা হইয়াছিল, তাহার পার্শ্ববর্তী কামরার ভিতরে আরও একজন ভদ্রলোক তাঁহার পরিবারকে লইয়া আসিয়াছিলেন, এ কথার একটু আভাস পাঠকগণ ইতিপূৰ্ব্বে পাইয়াছেন। আর ইহাও জানিতে পারিয়াছেন যে, তাঁহারা কলিকাতা পৰ্যন্ত আগমন করেন নাই। কলিকাতার বন্দরে জাহাজ আসিবার পূর্বেই অপর কোন স্থানে তাঁহারা অবতরণ করিয়া চলিয়া গিয়াছেন। সবিশেষ কষ্ট ও পরিশ্রম স্বীকার করিয়া এক সপ্তাহকাল পরে আমি সেই ভদ্র পরিবারের অনুসন্ধান পাইলাম, এবং তাহাদিগের গ্রাম পর্যন্ত গমন করিয়া জানিতে পারিলাম, তাঁহারা সেই বালক সম্বন্ধে কোন কথা অবগত নহেন, বা তাঁহারা সেই বালককে তাহাদিগের সঙ্গে আনেন নাই। সুতরাং নিতান্ত নিরাশ হইয়া আমাকে সেই স্থান হইতে প্রত্যাবর্তন করিতে হইল। ক্রমে সেই অনুসন্ধান পরিত্যাগ করিয়া আমি অন্য কার্যে নিযুক্ত হইলাম। বালকের পিতামাতাও ক্রমে আপনাপন হৃদয় হইতে তাঁহাদিগের সেই সন্তানের মায়া পরিত্যাগ করিতে লাগিলেন।

এই ঘটনার প্রায় একমাস পরে একখানি নোটের অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত আমাকে রাজগঞ্জে গমন করিতে হয়। যে মোক জমা সম্বন্ধে আমি নোটের অনুসন্ধান করিতে গিয়াছিলাম, সেই মোকদ্দমার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই স্থানে প্রদান করা আমি তত আবশ্যক মনে করি না। কারণ, এরূপ মোকদ্দমা সম্বন্ধে একটী ঘটনা ডিটেকটিভ পুলিস দ্বিতীয় কাও পুস্তকে আমি প্রকাশ করি, ইহাও ঠিক সেইরূপ ঘটনা। সেইরূপ উপায়ে জুয়াচেরগণ জুয়াচুরি করিয়া কুমারটুলির জনৈক দোকানদারের নিকট হইতে একখানি পাঁচশত টাকার নোট গ্রহণ করে; কিন্তু সেই দিবস করেসি আফিস খোলা না থাকায়, তাঁহারা সেই নোট করেনসি আফিসে বদলাইয়া লইবার অবকাশ পায় নাই। পরদিবস প্রাতঃকালেই প্রতারিত ব্যক্তি জানিতে পারে যে, সে জুয়াচোরগণ কর্তৃক প্রতারিত হইয়াছে। সুতরাং প্রথমেই সে করেসি আফিসে গিয়া সেই নোটের নম্বর প্রদান করে, এবং সেই স্থানে এইরূপ লিখাইয়া আইসে যে, তাহার গৃহ হইতে একখানি পাঁচশত টাকার নোট চুরি গিয়াছে।

এদিকে জুয়াচারগণ যখন জানিতে পারে যে, করেসি অফিসে সেই নোট ভাঙ্গাইতে গেলে তাঁহারা ধৃত হইবে, তখন তাঁহারা করেসি আফিসে নোট ভাঙ্গাইবার আশা পরিত্যাগ করিয়া অপর আর এক উপায় অবলম্বন করে। শালিখার কোন ধান্তের আড়তে গমন করিয়া তাঁহারা পাঁচশত টাকা মূল্যের ধান্য খরিদ করে, ও তাহার মূল্যস্বরূপ উঁহারা সেই পাঁচশত টাকার নোট প্রদান করে। ধান্যের মহাজন সেই নোট অপরকে প্রদান করেন, সে পুনরায় উহা আর এক ব্যক্তিকে প্রদান করেন। এইরূপে ক্রমে সেই নোট বেঙ্গল ব্যাঙ্কে আসিয়া উপস্থিত হয়। বেঙ্গল ব্যাঙ্ক হইতে সেই নোট করেসি আফিসে পাঠাইয়া দেওয়া হয়। করেসি অফিসের হস্তে সেই নোট গিয়া উপস্থিত হইলে, তাঁহারা জানিতে পারেন, সেই নোট পূৰ্বে অপহৃত হইয়াছিল। সুতরাং তাঁহারা পুলিসে এই সংবাদ প্রদান করেন, এবং সেই সময় হইতে ইহার অনুসন্ধান আরম্ভ হয়। অনুসন্ধানের ভার আমার হস্তে পতিত হইলে, আমি ইহার সমস্ত ব্যাপার অবগত হইতে পারি; কিন্তু কোন্ কোন্ ব্যক্তি যে ধান্য খরিদ করিয়া লইয়া গিযাছে, তাহার কিছুমাত্র স্থির করিতে না পারিয়া, অত টাকার ধান্য যে কোথায় গেল, তাহারই অনুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হই। পরে জানিতে পারিলাম, পূৰ্ব্ব-কথিত আড়তদারের আড়ত হইতে ধান্য সকল প্রথমতঃ বাহির করিয়া একখানি নৌকা মেটিয়াব্রুজের নিকট লইয়া গিয়া, অপর দুইখানি পাসিতে সেই সকল ধান্য পাল্টাইয়া লওয়া হয়, এবং সেই স্থান হইতে বড় নৌকাখানিকে বিদায় করিয়া দেওয়া হয়। জুয়াচোরগণ সেই ধান্য গুলি সেই ছোট নৌকা দুইখানিতে করিয়া রাজগঞ্জের বাজারে লইয়া যায়। সেই স্থানে সেই সকল ধান্য অল্প মূল্যে বিক্রয় পূৰ্ব্বক যতদূর সম্ভব অর্থ সংগ্রহ করিয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করে।

আমিও সন্ধানে সন্ধানে ক্রমে রাজগঞ্জের বাজারে গিয়া উপ স্থিত হই, এবং সেই স্থানে অনুসন্ধান করিয়া, এই সমস্ত বিষয় অবগত হইতে পারি। যে সকল ব্যক্তি সেই ধান্য ক্রয় করিয়াছিল, তাহাদিগের অনেককে খুঁজিয়া বাহির করিয়া, পরিশেষে জুয়াচোর গণের অনুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হই। এই অনুসন্ধান উপলক্ষে পাঁচ সাতদিবস আমাকে রাজগঞ্জের বাজারে অবস্থিতি করিতে হয়।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

রাজগঞ্জের বাজারের মধ্যে একটা দোকানে আমার বাসা। অবশ্য সেই সময়ে অনেকেই অবগত নহেন যে, আমি পুলিস কর্ম্মচারী। কারণ, সেই সময় পুলিসের পরিচ্ছদাদি কিছুই আমার সহিত ছিল না, বা আমিও পুলিসকর্ম্মচারী বলিয়া কাহারও নিকট আমার পরিচয় প্রদান করিয়াছিলাম না।

একদিবস সন্ধ্যার সময় আমি সেই দোকানে বসিয়া আছি, এমন সময় একটী স্ত্রীলোক আসিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল, এবং সেই দোকান হইতে কিছু দ্রব্যাদি খরিদ করিবার মানসে সেই স্থানে উপবেশন করিল। কিয়ৎক্ষণ পরে আর একটী স্ত্রীলোক আসিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল ও পূৰ্ব্ব-কথিত স্ত্রীলোকটীকে দেখিয়া তাহার নিকট আসিয়া উপবেশন করিল, এবং উভয়ে নানারূপ গল্প করিতে আরম্ভ করিল। তাহাদিগের কথাবার্তার ভাবে অনুমান হইল, উঁহারা উভয়েই নিকটবর্তী কোন গ্রামে বাস করে, এবং দ্রব্যাদি খরিদ করিবার নিমিত্ত উভয়েই, সেই বাজারে আগমন করিয়াছে।

উভয়ের মধ্যে সেই স্থানে নানারূপ গল্প আরম্ভ হইল। নিজের কথা, সংসারের কথা, গ্রামের কথা প্রভৃতি কত কথার যে অব তারণা ও আলোচনা হইল, তাহার সংখ্যা নাই। সেই সকল কথা বাৰ্তার বিবরণ এই স্থানে লিপিবদ্ধ করা নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু আমার আবশ্যক যে দুই চারিটী কথা আমি জানিতে পারিলাম, তাহারই সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই স্থানে প্রদত্ত হইতেছে মাত্র।

১ম স্ত্রীলোক। কেমন ভাই উহার মা বাপ, তাহার কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। এরূপ শিশুসন্তানের নিমিত্ত কেহ এক বার অনুসন্ধান ও করিল না!

২য় স্ত্রীলোক। আমিও তাই দেখিতেছি; কিন্তু ভাই বালকটীর চেহারা দেখিয়া বোধ হয়, সে যেন কোন বড় ঘরের সন্তান।

১ম স্ত্রীলোক। চেহারা সেইরূপই বটে।

২য় স্ত্রীলোক। আচ্ছা ভাই! ও কিরূপে সেই বালকটা পাইল?

১ম স্ত্রীলোক। তাহা ঠিক করিয়া সে কিছু বলে না। কখন বলে, সে রাস্তায় পড়িয়াছিল, সেইখানে উহাকে পাইয়াছে; কখন বলে, উহার মা বাপ নিতান্ত দরিদ্র বলিয়া, তাহাকে প্রতিপালন করিতে অসমর্থ, তাই তাঁহারা উহাকে অর্পণ করিয়া উহার নিকট হইতে কিছু অর্থ গ্রহণ করিয়াছে; কখন বলে, সে তাহার কোন আত্মীয়ের পুল, উহাকে প্রতিপালন করিবার নিমিত্ত সেই আত্মীয় তাহাকে প্রদান করিয়াছে। এইরূপে উহার মনে যখন যেরূপ কথার উদয় হইতেছে, তখনই সে সেইরূপ বলিতেছে। প্রকৃত কথা যে কি, তাহা কিন্তু কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারা যাইতেছে না।

২য় স্ত্রীলোক। আমরা যতদূর অবগত আছি, তাহাতে জানি যে, উহার এরূপ কোন আত্মীয় নাই যে, সে তাহার পুত্রের প্রতি পালনের ভার উহার উপর ন্যস্ত করিতে পারে, বা উহার এরূপ সঙ্গতিও নাই যে, তাহার দ্বারা সে এই বালকটীকে ক্রয় করিয়া লইয়া নিজে উহাকে প্রতিপালন করিতে সমর্থ হয়।

১ম স্ত্রীলোক। আমারও বিশ্বাস তাহাই। আমিও ভাই ইহার কিছু বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না।

স্ত্রীলোকদ্বয়ের কথাগুলি শ্রবণ করিয়া আমার মনে জাহাজে পরিত্যক্ত সেই বালকের কথা উদয় হইল। আমি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলাম, হ্যাঁ গা! তোমরা কোন্ বালকের কথা বলিতেছ?

১ম স্ত্রীলোক। আমাদিগের গ্রামের একটী স্ত্রীলোক একটা বালক পাইয়াছে, তাহারই কথা বলিতেছি।

আমি। যে বালকটী পাইয়াছে, তাহার নাম কি গা?

১ম স্ত্রীলোক। তাহার নাম সোনা।

আমি। সোনা সেই বালকটীকে কোথায় পাইয়াছে, তাহা কিছু বলিতে পার কি?

১ম স্ত্রীলোক। না মহাশয়! আপনি সেই বালকটীর কথা জিজ্ঞাসা করিতেছেন কেন?

আমি। আমার একটী বালক হারাইয়া গিয়াছে, তাই আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি।

১ম স্ত্রীলোক। আপনার ব্রলকটী কোথা হইতে হারাইয়া গিয়াছে?

আমি। সে আমার সহিত এই স্থানেই আসিয়াছিল, সেই সময় গোলমালে যে কোথায় চলিয়া গিয়াছে, তাহার কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারি নাই। অনেক স্থানে আমি তাহার অনু সন্ধান করিয়াছি, কিন্তু এ পর্যন্ত তাহার সন্ধান করিয়া উঠিতে পারি নাই। এখন তোমাদের কথা শুনিয়া মনে আশা হইতেছে। তোমাদিগের সন্ধান মতে আমি যদি সেই বালকটীকে পাইতে পারি, তাহা হইলে আমি তোমাদিগকে একশত টাকা পারি তোষিক দিতে প্রস্তুত আছি।

২য় স্ত্রীলোক। সেই বালকটাকে যদি আমরা দেখাইয়া দিতে পারি, তাহা হইলে আমাদিগকে একশত টাকা আপনি প্রদান করিবেন?

আমি। সেই বালকটী যদি তোমরা আমাকে দেখাইয়া দেও, তাহা হইলেই যে আমি একশত টাকা প্রদান করিব, তা নয়। সেই বালকটা যদি আমার হয়, তাহা হইলে তৎক্ষ ২ জাম তোমাদিগকে একশত টাকা প্রদান করিব।

১ম স্ত্রীলোক। আর যদি সেই বালকটী আপনার ন, তাহা হইলে আমরা কি কিছুই পাইব না?

আমি। তোম যে একবারেই কিছু পাইবে না, তাহা আমি বলিতে পারি না। যদি সেই বালকটী আমার হয়, তাহা হইলে তোমাদিগকে একশত টাকা নিশ্চয়ই প্রান করিব। আর যদি সেই বালকটা আমার না-ও হয়, তাহা হইলেও সেই বালকটাকে দেখাইয়া দিবার নিমিত্ত আমি তোমাদিগকে পাঁচ টাকা করিয়া প্রদান করিতেছি।

এই বলিয়া আমি উভয় স্ত্রীলোকের হস্তে পাঁচ টাকা প্রদান করিলাম। বিনা-পরিশ্রমে পাঁচ টাকা পাইয়া তাঁহারা অতিশয় সন্তুষ্ট হইল ও কহিল, আপনি সেই বালকটীকে দেখিবার নিমিত্ত কোন্ সময় গমন করিবেন?

আমি। যখন বলিবে, আমি সেই সময়ই গমন করিব। এখনই আমি তোমাদিগের সহিত গমন করিতে প্রস্তুত আছি।

স্ত্রীলোকদ্বয়। সে-ই উত্তম; আপনি এখনই আমাদিগের সহিত আগমন করুন। আমরা এখনই সেই বালকটীকে, এবং যে সেই বালকটীকে আনিয়াছে, তাহাকে, দেখাইয়া দিতেছি।

স্ত্রীলোকদ্বয়ের কথা শুনিয়া আমি আর কোনরূপ দ্বিরুক্তি করিলাম না। কেবলমাত্র একটী লোক সমভিব্যাহারে তাহা দিগের সহিত তখনই প্রস্থান করিলাম।

বাজার হইতে বহির্গত হইয়া একটী ময়দান দেখিলাম। সেই ময়দানের মধ্য দিয়া এক ক্রোশ পথ গমন করিবার পর, একখানি গ্রাম দেখিতে পাইলাম। সেই গ্রাম অতিক্রম করিয়া অপর আর একখানি গ্রামে উপস্থিত হইলে সেই স্ত্রীলোক আমাকে কহিল, এই গ্রামেই সেই স্ত্রীলোকের বাস। আরও কহিল, আপনারা এই স্থানে একটু অপেক্ষা করুন। আমরা গিয়া দেখিয়া আসি, সেই স্ত্রীলোকটা এখন বাড়ীতে আছে কি না, এবং সেই বালকটীই বা এখন কোথায়। তাহাদিগের প্রস্তাবে আমি সম্মত হইলাম, উঁহারা উভয়েই সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল। অতি অল্প ক্ষণ পরেই উঁহাদিগের একজন প্রত্যাবর্তন করিয়া কহিল, আসুন মহাশয়! আমার সহিত আসুন, সেই স্ত্রীলোকটী এবং বালকটী এখন বাড়ীতেই আছে। আমি তাহাদিগকে স্বচক্ষে দেখিয়া আসিয়াছি, ও আমার সমভিব্যাহারী সেই স্ত্রীলোকটীকে আমি সেই স্থানে রাখিয়া আসিয়াছি।

আমি তাহার কথায় বিশ্বাস করিয়া, তাহার নির্দেশমত তাহার সহিত গমন করিলাম। কিয়দ্দূর গিয়া সে আমাকে একখানি সামান্য খড়ের ঘর দেখাইয়া দিয়া কহিল, ইহাই সেই স্ত্রীলোকটীর বাড়ী, এবং এই বাড়ীতে সেই বালকটীও আছে। আপনি এখন এই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলেই সেই বালকটীকে দেখিতে পা ইবেন। তখন আপনি জানিতে পারিবেন যে, সেই বালকটী আপনার কি না।

সেই স্ত্রীলোকটীর কথা শুনিয়া আমি আস্তে আস্তে সেই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম, একটী স্ত্রীলোক একটী বালককে ক্রোড়ে করিয়া তাহার ঘরের দাওয়ায় বসিয়া আছে। তাহার সম্মুখে, আমার সহিত যে স্ত্রীলোকদ্বয় গমন করিয়াছিল, তাহাদিগের মধ্যে অপর স্ত্রীলোকটী বসিয়া তাহার সহিত গল্প করিতেছে।

আমি ও আমার সমভিব্যাহারী লোকটী একবারে সেই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলে, আমাদিগকে দেখিয়া সেই স্ত্রীলোকটী যেন একটু ভীত হইল।

আমি দেখিলাম, যে বালকটী উহার নিকট রহিয়াছে, তাহার আকৃতি প্রকৃতি সমস্তই সেই জাহাজে-ভুল-ক্রমে পরিত্যক্ত বালকের সদৃশ। এক কথায় আমি বেশ বুঝিতে পারিলাম, এই বালকটাই কলিকাতার সেই বড়লোকটীর পুত্র।

সেই স্ত্রীলোক কোন কথা বলিতে না বলিতেই আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এ বালকটীকে তুমি কোথায় পাইলে?

স্ত্রীলোক। ইটি আমার পুত্র।

আমি। তোমার নিজের সন্তান?

স্ত্রীলোক। না, আমার নিজের সন্তান নহে; আমার ভগিনীর সন্তান। কিন্তু যখন আমি উহাকে প্রতিপালন করিতেছি, তখন আমারই সন্তান নয় ত কি?

আমি। আমি ওসকল মিথ্যা কথা শুনিতে চাহি না। তুমি জান আমি কে? তোমাকে আমি পূৰ্বেই সতর্ক করিয়া দিতেছি, তুমি মিথ্যা কথা কহিও না। মিথ্যা বলিলে তোমার সবিশেষরূপ অনিষ্ট ভিন্ন কখনই ইষ্ট হইবার সম্ভাবনা নাই। আমি পুর্বে সকল কথা জানিতে পারিয়াছি, তাঁহার পর তোমার নিকট আগমন করিয়াছি। প্রকৃত কথা না বলিলে, আমি তোমাকে ধরিয়া লইয়া যাইব।

স্ত্রীলোক। আপনি কে?

আমি। আমি পুলিস-কর্ম্মচারী। তুমি এই বালকটীকে অপ হরণ করিয়া লইয়া আসিয়াছ। তোমার নামে বালক-চুরির নালিশ হইয়াছে, তাই আমি তাহার অনুসন্ধান করিতে আসিয়াছি, এবং মাল, আসামী, উভয়ই পাইয়াছি। এখন তুমি আমার নিকট প্রকৃত কথা বলিবে কি?

স্ত্রীলোক। আমি প্রকৃতই বলিতেছি, আমি এই বালককে চুরি করিয়া আনি নাই।

আমি। যদি চুরি করিয়া না আনিলে, তাহা হইলে তুমি ইহাকে পাইলে কোথায়?

স্ত্রীলোক। কোন স্থানে পড়িয়াছিল, দেথিয়া আমি উহাকে উঠাইয়া আনিয়া যত্নে প্রতিপালন করিতেছি। আমি চুরি করিয়া আনিব কেন?

আমি। যদি তুমি ইহাকে অপহরণ করিয়া আন নাই, তাহা হইলে ইহার পিতামাতার নিকট তুমি ইহাকে লইয়া যাও নাই কেন?

স্ত্রীলোক। আমি জানি না উহার পিতামাতা কে?

আমি। থানায় গিয়া ইহাকে জমা দেও নাই কেন?

স্ত্রীলোক। বালক পাইলে যে থানায় গিয়া জমা দিতে হয়, তাহা আমি জানি না। আমি মনে করিয়াছিলাম, যাহার বালক, সে আসিয়া লইয়া যাইবে।

আমি। এই বালকটী পড়িয়াছিল, আর তুমি যে ইহাকে পাইয়াছ, এই কথা কাহাকেও বলিয়াছ?

স্ত্রীলোক। না।

আমি। কেন বল নাই?

স্ত্রীলোক। ভয়ে বলি নাই।

আমি। তুমি এই বালকটীকে কোথায় পাইয়াছিলে?

স্ত্রীলোক। যে স্থানে পাইয়াছিলাম, সেই স্থানের নাম আমি অবগত নহি। আমার সহিত চলুন, আমি দেখাইয়া দিব।

আমি। কোন্ স্থানে পড়িয়াছিল?

স্ত্রীলোক। একটী ময়দানের মধ্যে।

আমি। মিথ্যা কথা। তুমি ইহাকে ময়দানের মধ্যে পাইয়াছ, তাহা আর কে অবগত আছে?

স্ত্রীলোক। আর কেহই জানে না।

আমি। এখন আর মিথ্যা কথা বলিও না। কোন একখানি জাহাজের মধ্য হইতে তুমি ইহাকে উঠাইয়া আনিয়াছ, আর এখন মিথ্যা করিয়া বলিতেছ, একটী ময়দানে এ পড়িয়াছিল।

স্ত্রীলোক। না, আমি জাহাজ হইতে আনি নাই। আমি জাহাজে কি করিতে যাইব?

আমি। ইহার অঙ্গে যে সকল অলঙ্কার ছিল, সেই সকল অলঙ্কার কোথায়?

স্ত্রীলোক। ইহার অঙ্গে কোন অলঙ্কার ছিল না।

আমি। আমি তোমাকে এখনও সতর্ক করিয়া দিতেছি যে, তুমি এখনও প্রকৃত কথা বল। অলঙ্কারের সহিত তুমি ইয়াকে জাহাজ হইতে আনিয়াছ কি না?

স্ত্রীলোক। না মহাশয়! আমি ইহাকে জাহাজ হইতে আনি নাই।

আমি। আমি এখনই তোমার ঘর উত্তমরূপে অনুসন্ধান করিব। তোমার ঘর হইতে যদি কোন অলঙ্কার বাহির হয়, তাহা হইলে তুমি জানি যে, কোনরূপেই তোমার নিষ্কৃতি নাই।

স্ত্রীলোক। অনায়াসেই আপনি আমার ঘর অনুসন্ধান করিয়া দেখিতে পারেন।

স্ত্রীলোকের শেষ কথাটী শুনিয়া আমার মনে একটু সন্দেহ হইল। একবার ভাবিলাম, হয় ত প্রকৃতই এ অলঙ্কারের সহিত জাহাজ হইতে এই বালকটীকে আনয়ন করে নাই। অপর কোন ব্যক্তি জাহাজ হইতে ইহাকে আনিয়া উহার অঙ্গ হইতে অলঙ্কার গুলি অপহরণ করিয়া ইহাকে কোন স্থানে নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া গিয়াছিল। পরিশেষে এই স্ত্রীলোকটী ইহাকে সেই অবস্থায় দেখিতে পাইয়া উঠাইয়া আনিয়াছে।

মনে মনে এইরূপ একবার ভাবিলাম সত্য; কিন্তু উহার কথায় আমি একবারে বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। উহার ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া উহার ঘর অনুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হইলাম।

সেই স্ত্রীলোকটী যখন দেখিল যে, আমি উহার ঘর অনু সন্ধান করিতে কোনরূপেই নিবৃত্ত হইলাম না, তখন সে আমার দুইখানি পা জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে কহিল, আমি প্রকৃত কথা বলিতেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আর মিথ্যা কথা বলিব না, আমি জাহাজ হইতে ইহাকে আনয়ন করিয়াছি।

আমি। অলঙ্কারগুলি?

স্ত্রীলোক। আমার ঘরে আছে।

আমি। বাহির করিয়া আন।

আমার কথা শুনিয়া সেই স্ত্রীলোকটী আপন ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল ও মৃত্তিকা নির্মিত একটী পুরাতন হাঁড়ির মধ্য হইতে কতকগুলি মূল্যবান্ অলঙ্কার বাহির করিয়া আনিয়া আমার হস্তে প্রদান করিল। সেই বালকের অঙ্গে যে সকল অলঙ্কার ছিল, তাহার একটা তালিকা তাহার পিতা পূৰ্বেই আমাকে প্রদান করিয়াছিলেন, এবং তালিকার নকল আমার পকেট বহিতে লেখা ছিল। তাহার সহিত আমি গহনাগুলি মিলাইয়া দেখিলাম। দেখিলাম, কেবলমাত্র একখানি ছোট গহনা ব্যতীত আর সমস্ত গুলিই উহাতে আছে। সেই গহনাখানির কথা জিজ্ঞাসা করায়, সে কহিল, ওই গহনাখানি উহার অঙ্গে ছিল না, আমি উহা পাই নাই। যখন আমি সমস্ত গহনাই বাহির করিয়া দিতে পারিলাম, তখন সেই সামান্য গহনাখানি লইয়া আমি কি করিব?

সেই স্ত্রীলোকের এ কথা কিন্তু আমি বিশ্বাস করিলাম না। আমার মনে সন্দেহ হইল, সেই ছোট গহনাখানি সে কোথায় বিক্রয় করিয়া তাহার দ্বারা নিজের ও বালকের আহারের খরচের সংস্থান করিতেছে। সুতরাং সেই সামান্য একখানি গহনার নিমিত্ত আমি তাহাকে লইয়া আর সবিশেষ পীড়াপীড়ি করিলাম না। গহনা গুলি ও বালকটীকে সঙ্গে লইয়া আমি পূর্ব-কথিত সেই বাজারে গিয়া উপস্থিত হইলাম। যে দুইটী স্ত্রীলোকের নিকট হইতে আমি এই সন্ধান প্রাপ্ত হইয়াছিলাম, যাইবার সময় তাহাদিগকে বলিয়া গেলাম যে, তৎপরদিবস বৈকালে তাঁহারা যেন আমার সহিত সেই বাজারে সাক্ষাৎ করে। সেই সময় তাহাদিগের প্রাপ্য পারিতোষিকের টাকা তাহাদিগকে প্রদান করিব। উঁহারা আমার কথায় বিশ্বাস করিয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল। আমিও সেই স্থান হইতে বালক, অলঙ্কার প্রভৃতি লইয়া বাজারে গিয়া উপস্থিত হইলাম। বাজারে পৌঁহুছিয়া সেই বালকের পিতা সেই বড় মানুষটীকে তথায় আনিবার নিমিত্ত দ্রুতগতি একটী লোক পাঠাইয়া দিলাম।

পরদিবস অতি প্রত্যূষেই বালকের পিতা লোকজনের সহিত তোয় আসিয়া উপস্থিত হইলেন, এবং বালকটীকে দেখিয়াই ক্ৰন্দন করিয়া ফেলিলেন। পূৰ্ব্ব-কথিত স্ত্রীলোকদ্বয়কে আমি যে পারিতোষক প্রদান করিতে স্বীকার করিয়াছিল, তাহা তাঁহার নিকট বলিবা মাত্র তিনি সেই টাকা আমার হস্তে প্রদান করিলেন। পূর্বদিনের কথামত বৈকালে সেই স্ত্রীলোকদ্বয় আগমন করিলে, আমি সেই অর্থ তাহাদিগকে প্রদান করিলাম। বালকের পিতা উভয়কে আরও পঞ্চাশ টাকা প্রদান করিলেন, এবং বে স্ত্রীলোকটীর নিকট হইতে বালকটী ও গহনাগুলি পাওয়া গিয়াছিল, তাহার পারিতোধিক স্বরূপ তিনি দুইশত টাকা আমার হস্তে প্রদান করিলেন। কিন্তু আমি কহিলাম, এই স্ত্রীলোকটী যে অপরাধ করিয়াছে, তাহার নিমিত্ত ইহার দণ্ড হইবে, কি ইহাকে পারি তোযিক প্রদান করা যাইবে? উত্তরে তিনি কহিলেন, ও যে অপরাধ করিয়াছে, আইনে তাহার দও থাকিলে, উহার দণ্ড হওয়া উচিত; কিন্তু আমার পুত্রীকে যে জীবিত অবস্থায় রাখিয়া এ পর্যন্ত উহাকে খাওয়াইয়াছে, পরাইয়াছে, তাহার নিমিত্ত উহাকে দুইশত টাকা পারিতোষিক প্রদান করিতেছি।

তাঁহার নিকট হইতে আমি সেই দুইশত টাকা গ্রহণ করি লাম সত্য; কিন্তু এরূপ অবস্থায় আমার সর্বপ্রধান কর্ম্মচারীর আদেশ ব্যতীত আমি তাহাকে অব্যাহতি প্রদান করিতে সাহসী হইলাম না।

যে একখানি সামান্য অলঙ্কার পাওয়া গেল না, বালকের পিতামাতা, চাকর-চাকরাণী প্রভৃতি কেহই স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারিল না, যে সময় ভুল-ক্রমে বালকটীকে পরিত্যাগ করা হইয়া ছিল, সেই সময় সেই অলঙ্কারখানি তাহার অঙ্গে ছিল কি না?

কিরূপে সেই স্ত্রীলোকটী বালককে পাইল, তাহা তাহাকে জিজ্ঞাসা করা