মাণিক। না, বেতনের টাকা পাইলেন, তাহার আর রসিদ কি? দেখি, আপনি কি কাগজ-পত্ৰ আনিয়াছেন।
মাণিকচাঁদের এই কথা শুনিয়া আমার নিয়োগ-পত্ৰখানি ও একখানি চিঠি যাহা আমি বোম্বাই হইতে কয়েকদিবসমাত্র অগ্রে প্রাপ্ত হইয়াছিলাম, তাহা তাহার হস্তে প্রদান করিলাম।
মাণিকচাঁদ নিয়োগ-পত্রখানি ও চিঠিখানি একবার পড়িয়া দেখিলেন ও পরিশেষে কহিলেন, আপনি এই পত্রের উত্তর লিখিয়াছেন কি?
আমি। না।
মাণিক। নিয়োগ-পত্রখানি পাইবার পর, কোন পত্র লিখিয়াছেন?
আমি। না, সর্বপ্রথমে আমি যে একখানি দরখাস্ত করিয়া ছিলাম, তদ্ব্যতীত আমি আর কোন পত্রাদি সেই স্থানে লিখি নাই।
মাণিক। এখন এই পত্রের উত্তর আপনাকে প্রদান করা। কৰ্ত্তব্য।
আমি। উত্তর আর কি লিখিব?
মাণিক। কেন, আপনি সেই চাকরী গ্রহণ করিতে ইচ্ছুক নহেন, একথা লিখিয়া দেওয়া উচিত নয় কি?
আমি। না লিখিলেই বা ক্ষতি কি? আমি সেই স্থানে গমন না করিলেই, তাঁহারা জানিতে পারিবেন যে, আমি সেই কাৰ্য করিতে প্রস্তুত নহি। তখন তাঁহারা অপর লোকের বন্দোবস্ত করিয়া লইতে পারিবেন।
মাণিক। না, উহা কৰ্তব্য বা ভদ্রোচিত ব্যবহার নহে। কাগজ, কলম প্রভৃতি সমস্তই আপনার সম্মুখে পড়িয়া রহিয়াছে, এখনই একখানি পত্র লিখিয়া ডাকে ফেলিয়া দিন। আপনার পত্র পাইয়া যখন তাঁহারা জানিতে পারিবেন যে, আপনি তাহাদিগের চাকরী করিতে অভিলাষী নহেন, তখন তাঁহারা অপর লোকের বন্দোবস্ত করিতে সমর্থ হইবেন। নতুবা তাহাদিগের কার্যের সবিশেষ ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা।
মাণিকচাঁদের কথা শুনিয়া ভাবিলাম, তিনি যাহা বলিতে ছেন, তাহা নিতান্ত যুক্তিসঙ্গত। সুতরাং এ সম্বন্ধে তাহাকে আর কিছু না বলিয়া, তাহারই টেবিলের উপর হইতে একখানি কাগজ লইয়া, সেই স্থানেই বসিয়া আমি একখানি পত্র লিখিলাম। সেই পত্রে অধিক কোন কথা লিখিলাম না, কেবল এইমাত্র লিখিলাম, আপনারা অনুগ্ৰহ করিয়া আপনাদিগের ফারমে যে একটী চাকরী প্রদান করিয়াছিলেন, আমি আপাততঃ সেই চাকরীতে প্রবৃত্ত হইতে পারিতেছি না। আপনারা আমাকে যে বেতন প্রদানে সম্মত আছেন, তাহায় দ্বিগুণ বেতনে আমি এই স্থানেই একটা চাকরী প্রাপ্ত হইয়াছি। সুতরাং আপনা দিগের প্রদত্ত চাকরী গ্রহণ করিতে পারিলাম না বলিয়া, আমার অপরাধ মার্জনা করিবেন।
পত্র লেখা সমাপ্ত হইলে মাণিকষ্টাদ একখানি অর্ধ আনা মূল্যের খাম আমার হস্তে প্রদান করিলেন। সেই খামের ভিতর আমার লিখিত পত্রখানি পূরিয়া উহাতে শিরোনাম লিখিয়া সেই টেবিলের উপর রাখিলাম। টেবিলের উপর একটা পাত্রে একটু জল রাখাছিল, মাণিকচাঁদ নিজে তাঁহার অঙ্গুলিতে একটু জল লইয়া আমার সম্মুখে উহা বন্ধ করিয়া দিলেন, এবং আমাকে কিছু না বলিয়া তাহার দ্বারকে ডাকিলেন। সে পূর্ব্ব হইতে সেই ঘরের বাহিরে বসিয়াছিল, ডাকিবামাত্র সে সেই ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল। মাণিকচাঁদ বাবু আমাকে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া সেই পত্রখানি সেই দ্বারবানের হস্তে প্রদান করিলেন ও কহিলেন, এই পত্রখানি এখনই তুমি ডাকঘরে দিয়া আইস।
দ্বারবান্ দ্বিরুক্তি না করিয়া, সেই পত্র হস্তে দ্রুতপদে সেই ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। সে দিবস আর যতক্ষণ আমি সেই স্থানে ছিলাম, তাহার মধ্যে সেই দ্বারবানকে আমি আর দেখিতে পাইলাম না।
দ্বারবান্ প্রস্থান করিলে পর, মাণিকচঁদ বাবু আমার প্রদত্ত সেই নিয়োগ-পত্র ও বোম্বাইয়ের যে পত্রখানি আমি তাহার হস্তে প্রদান করিয়াছিলাম, তাহা তিনি তাঁহার টেবিলের দেরাজের ভিতর বন্ধ করিয়া রাখিলেন, এবং আমাকে কহিলেন, এগুলি এখন আমার নিকট রহিল।
মাণিকচাঁদ বাবুর এই কথার কোনরূপ উত্তর দিবার পূর্বেই তিনি কহিলেন, এখন আমি অতিশয় ব্যস্ত; আপনি এখন আপনার বাসায় গমন করিতে পারেন। আপনাকে আমি একটা কাৰ্য্য প্রদান করিতেছি, যে কয়দিবসে পারেন, সেই কাৰ্য্যটা আপনি সম্পন্ন করুন। চারিদিবস পরে একবার আপনি এই স্থানে আসিয়া আমাকে বলিয়া যাইবেন যে, সেই কাৰ্য কতদূর পর্যন্ত আপনি সম্পন্ন করিতে পারগ হইয়াছেন। সবিশেষ তাড়াতাড়ি করিবার প্রয়োজন নাই।
আমি। কি কাৰ্য্য করিতে হইবে?
মাণিক। বঙ্গদেশের মধ্যে কোন্ কোন্ নগরে আমাদিগের শাখা-কাৰ্য্যস্থান করিবার প্রয়োজন, তাহারই একটা তালিকা প্রস্তুত করুন। তাহার পর আর যাহা যাহা করিতে হইবে, তাহা আমি পরে বলিব।
আমি। আমি কিরূপে সেইরূপ তালিকা প্রস্তুত করিতে সমর্থ হইব?
মাণিক। কেন, আপনি বহুদিবস পৰ্য্যন্ত কলিকাতায় থাকিয়া। একটী ভাল ফারমেই কৰ্ম্ম করিয়া আসিতেছিলেন। সেই ফারমের সহিত বঙ্গদেশের যে যে স্থানের ফারমের কাৰ্য্য ছিল, তাহা আপনি উত্তমরূপেই অবগত আছেন। সুতরাং একটু চিন্তা করিয়া, আপনি সেই সকল স্থানের একটা তালিকা অনায়াসেই প্রস্তুত করিতে সমর্থ হইবেন। তদ্ব্যতীত এই কলিকাতায় আরও অনেক ফারমের কর্ম্মচারীগণের সহিত যে আপনার সবিশেষরূপ আলাপ পরিচয় আছে, সে সম্বন্ধে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। আবশ্যক হইলে আপনি তাহাদিগকেও জিজ্ঞাসা করিয়া লইতে পারেন।
আমি। আচ্ছা তাহাই হইবে। আপনার আদেশানুযায়ী একটা তালিকা প্রস্তুত করিয়া, চারিদিবস পরে আমি আপনার সহিত সাক্ষাৎ করিব।
মাণিক। আমি আপনার উপর যে কাৰ্য করিবার ভার অর্পণ করিলাম, তাহা শুনিতে যেরূপ সহজ বোধ হইতেছে, কার্যে কিন্তু ততদূর সহজ নহে। চারিদিবসের মধ্যেই যে আপনি সেই কাৰ্য্য শেষ করিতে পারিবেন, তাহা আমার বোধ হয় না। তথাপি যতদূর সম্ভব, সেই কাৰ্য্য করিয়া, চারিদিবস পরে পুনরায় আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবেন। অপর আর কোন্ কোন্ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিবার আপাততঃ প্রয়োজন হইবে, তাহাও আমি সেইদিবস আপনাকে বলিয়া দিব।
