আমার কথার উত্তরে তিনি তাঁহার প্রকৃত পরিচয় আমাকে প্রদান করিলেন, এবং যে স্থানে তাহার বাসস্থান তাহাও আমাকে বলিলেন। আমি কিন্তু তাহার নাম ও পরিচয় পাঠকগণের নিকট সবিশেষ কোন কারণ বশতঃ প্রকাশ করিতে পারিলাম না।
আমি। কিরূপ অবস্থায় আপনি আপনার শিশুসন্তানটীকে হারাইয়াছেন, তাহার আদ্যোপান্ত বৃত্তান্ত আমার নিকট সবিশেষ করিয়া বলুন দেখি।
বড়লোক। আমি পূৰ্বেই বলিয়াছি, আমার বাসস্থান এই কলিকাতায়; কিন্তু আমার শ্বশুরালয় কলিকাতায় নহে। মেদিনী পুর জেলার মধ্যে একখানি ক্ষুদ্র গ্রামে আমার শ্বশুরালয়। সেই স্থানে গমন করিতে হইলে, ষ্টীমারে তমলুক পৰ্য্যন্ত গমন করিতে হয়। তমলুক হইতে আমার শ্বশুরালয় কয়েকখানি গ্রাম ব্যবধান। তমলুক হইতে সেই স্থানে গমন করিতে হইলে পাল্কী বা শকট ভিন্ন গমন করিবার আর কোন উপায় নাই। আমার বিবাহের পর আমার স্ত্রী কেবলমাত্র একবার তাহার পিত্রালয়ে গমন করিয়া ছিলেন; তাহা বহুদিবসের কথা। আমার শ্বশুরের অবস্থা ভাল নহে বলিয়া, আমি আমার স্ত্রীকে সেই স্থানে যাইতে দেই না। আমার শ্বশুর মহাশয় আসিয়া মধ্যে মধ্যে, তাহাক আবাকে দেখিয়া যান। কিন্তু পাড়াগাঁয়ের নিয়ম-অনুসারে আমার শ্বাশুড়ীঠাকুরাণী আমাদিগের বাটীতে আসিতে পারেন না। সুতরাং তাহার কন্যার সহিত প্রায় একরূপ দেখা-সাক্ষাৎ নাই। আমার স্ত্রী বহুদিবস হইতে তাহার মাতাকে দেখিতে না পাইয়া, বড়ই দুঃখিতা থাকিতেন, এবং সেই স্থানে গমন করিয়া একবার তাহার মাতার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আসিবেন, এই ইচ্ছা মধ্যে মধ্যে প্রকাশ করিতেন। সুযোগ মত আমি তাহাকে সঙ্গে করিয়া তাহার মাতার সহিত সাক্ষাৎ করা ইয়া আনিব, এই কথা মধ্যে মধ্যে বলিয়া তাহাকে সান্ত্বনা করিতাম।
ক্রমে আমার সেই পুত্ৰটী জন্মগ্রহণ করিল। সেই পুত্র জন্মাইবার পর হইতে আমার স্ত্রী তাহার পিত্রালয়ে অভাবপক্ষে দুই একদিবসের নিমিত্তও গমন করিবার জন্য আমাকে সবিশেষরূপে অনুরোধ করিতে লাগিল। আমি প্রথমতঃ তাহার প্রস্তাবে অসম্মত হইলাম; কিন্তু কোনরূপেই তাহাকে শান্ত করিতে পারিলাম না। অনোপায় হইয়া ক্রমে তাহার মতে আমাকে মত দিতে হইল, এবং শ্বশুরালয়ে গমন করিবার দিন স্থির করিয়া শ্বশুর মহাশয়কে পত্র লিখিলাম। সেই স্থানে গমন করিতে হইলে, যে স্থানে যেরূপ করিবার প্রয়োজন, তাহার সমস্তই ঠিক হইল। প্রায় এক সপ্তাহ হুইল, আমি আমার স্ত্রী ও পুত্রের সহিত আমার শ্বশুর বাড়ী গমন করিবার নিমিত্ত কলি কাতা পরিত্যাগ করিলাম। আমাদিগের সঙ্গে আমার দুইজন বন্ধু, একজন পাচক ব্রাহ্মণ, দুইটী দ্বারবান, চারিজন পরিচারক এবং দুইজন পরিচারিকামাত্র গমন করিল। আমার শ্বশুরের অবস্থা ভাল নহে, এ কথা আমি পূর্ব্বেই বলিয়াছি; সুতরাং সেই স্থানে গমন করিয়া, সেই নে অনহিতি করিবার ও সেই স্থান হইতে প্রত্যা বৰ্তন করিবার কে সকল ব্যর এবং যেরূপ বন্দোবস্তের প্রয়োজন, তাহা সমস্ত আমিই নির্ব্বাহ করিলাম।
কলিকাতার আরমানিঘাট হইতে জাহাজে আরোহণ করিয়া আমরা তমলুকে গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেই স্থানে পাল্কীর বন্দোবস্ত ছিল। সুতরাং শশুরবাড়ী পৌঁছিতে আমার বা আমার সমভিব্যাহার সমস্ত লোকের কোনরূপ কষ্ট হইল না। সেই স্থানে। কয়েকদিবসকাল অতিবাহিত করিয়া গত পরশু তারিখে আমরা তমলুকে আসিয়া উপস্থিত হই। সেই স্থানে রাত্রিযাপন করিয়া, পরদিবস জাহাজে আমোহণ করি। আমাদিগের ইচ্ছা ছিল, তমলুক হইতে আমরা একবারে কলিকাতায় আগমন করিব না; উলুবেড়িয়ার কয়েকখানি গ্রাম ব্যবধানে আমার স্ত্রীর এক ভগিনীর শ্বশুরবাড়ী আছে। ইচ্ছা ছিল, উলুবেড়িয়ায় নামিয়া, আমরা সেই স্থানে গমন করিব; সেই স্থানে দুই একদিবস থাকিয়া, আমরা কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিব। মনে মনে আমরা যেরূপ স্থির করিয়াছিলাম, কাৰ্যেও আমরা সেইরূপ বন্দোবস্ত করিয়াছিলাম। সেই স্থানে গমন করিবার সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক ছিল, জাহাজ উলুবেড়িয়ায় আসিয়া উপস্থিত হইলে, আমরা সকলে সেই স্থানে অবতরণ করিলাম। জাহাজ জেটিতে থাকিয়া নিয়মিত সময়ে কলিকাতা অভিমুখে প্রস্থান করিল।
জাহাজ ছাড়িয়া যাইবার পর দেখিলাম, আমার সমভি বাহারী লোজন ও দ্রব্যসামগ্রী সমস্তই জাহাজ হইতে নামাইয়া আনা হইয়াছে, কেবল আমায় শিশুসন্তানটীকে দেখিতে পাইলাম না। তাহাকে দেখিতে না পাইয়া, প্রথমত আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলাম; তিনি কহিলেন, আমার নিকটে তামার সন্তান নাই, কোন না কোন চাকর-চাকরাণীর কাছে থাকিবে। তখন এক এক করিয়া চাকর-চাকরাণী, দ্বারা ব্ৰাহ্মণ প্রতি যে সফল ব্যক্তি আমাদিগের সঙ্গে ছিল; তাহাদিগের প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসা করি লাম। সকলেই কহিল, তাঁহারা কেহই জাহাজ হইতে বালককে নামাইয়া আনে নাই। অধিকন্তু প্রত্যেকে প্রত্যেকের সহিত বিবাদ আরম্ভ করিল, পরিচারিকাদ্বয়ের মধ্যে মহাগোলযোগ উপস্থিত হইল।
একজন কহিল, বালক তোর জিম্মায় ছিল, তুই আনিস নাই কেন? অপর আর একজন কহিল, জাহাজের ভিতর তুই বালককে ক্রোড়ে করিয়া রাখিয়াছিলি, তোরই নিকট সেই বালক ছি, তুই তাহাকে কিরূপে পরিত্যাগ করিয়া আসিলি! চাকর গণের মধ্যে পরস্পর হাতাহাতি আরম্ভ হইল। একজন কহিল, তোর দোষ। আর একজন কহিল, তোর দোষ। একজন কহিল, জাহাজ হইতে নামিবার সময় তোক বলিয়াছিলাম, কোন স্ত্রব্য ভুল ক্রমে ফেলিয়া আসিয়াছি কি না, দেখিয়া আয়। অপর ন্যূক্তি কহিল, এ কার্যের ভার তোর উপর ছিল, তুই আপন কাৰ্য্য করিস্ নাই বলিয়াই ত এই সর্বনাশ ঘটিল। আমার সমভিব্যাহারে অপর যাহারা ছিলেন, তাঁহারা চুপ করিয়া এদিক ওদিক অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন, আমার স্ত্রী উচ্চৈঃস্বরে কাদিতে আরম্ভ করিল। এই সকল ব্যাপার দেখিয়া আমি যে কি করিব, তাহার কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিলাম না। ওদিকে দেখিলাম, জাহাজখানি আর ঘাটে নাই, কলিকাতা অভিমুখে প্রস্থান করিতেছে; আর এত দূরবর্তী হইয়া পড়িয়াছে যে, জাহাজের কোন লোক আমাদিগের উচ্চরবও শুনিতে পায় না।
