৬ষ্ঠ। চাকর-চাকরাণী কয়েকজন সেই কামরার বাহিরে ছিল।
৭ম। বাবুরা সকলে প্রথম শ্রেণীর খোলা জায়গায় এক এক খানি চেয়ার ও মোড়া লইয়া বসিয়াছিলেন।
৮ম। তাঁহারা কে, কোথা হইতে আসিতেছেন, তাহা কেহই অবগত নহে। কেবল এইমাত্র জানিতে পারা গেল যে, উঁহারা তমলুকে জাহাজে উঠিয়াছিলেন।
৯ম। তাঁহারা সকলে উলুবেড়িয়ার ঘাটে অবতরণ করেন।
১০ম। সেই সময় তাঁহারা অলঙ্কার-ভূষিত বালকটীকে লইয়া জাহাজ হইতে অবতরণ করিয়াছিলেন কি না, কেহ বলিতে পারেনা।
জাহাজের সারেংয়ের সাহায্যে এই কয়েকটামাত্র বিষয় অবগত হইয়া, ক্ষুণ্ণ মনে আমি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম; এবং আদেশমত আমার সর্বপ্রধান কৰ্মচারীর নিকট গমন করিয়া, যতদূর অবগত হইতে পারিয়াছিলাম, তাহা তাহার নিকট আদ্যোপান্ত বর্ণন করিলাম। আমার কথা শুনিয়া তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, সেই বালকের কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারি নাই, এবং যেরূপ অবস্থা, তাহাতে সহজে যে উহার কোনরূপ অনুসন্ধান হইবে, তাহার সম্ভাবনাও নিতান্ত অল্প। তথাপি যাহাতে আমি সেই বালকের কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারি, এবং তাহার পরি হিত বহুমূল্য অলঙ্কারগুলির কোনরূপ উদ্ধার করিতে যাহাতে আমি সমর্থ হই, তাহার নিমিত্ত আমার উপর আদেশ প্রদান করিলেন। আমিও তাহার আদেশ শিরোধার্য্য করিয়া, সেই স্থান হইতে নিজ স্থানে প্রত্যাবর্তন করিলাম। আসিবার সময় তাহাকে কেবলমাত্র ইহাই বলিয়া আসিয়াছিলাম যে, টেলিগ্রাম পাঠে যেরূপ বুঝিতে পারা যাইতেছে, তাহাতে বোধ হয়, যাহার পুত্র পাওয়া যাইতেছে না, তিনি যতশীঘ্র পারেন, কলিকাতায় আসিয়া উপস্থিত হইবেন। প্রথমতঃ, তিনি যদি আপনার নিকটে আসিয়া উপস্থিত হন, তাহা হইলে অনুগ্রহ পূর্বক তাঁহাকে যেন আমার নিকট প্রেরণ করা হয়। প্রধান কর্ম্মচারী মহাশয় আমার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন ও কহিলেন, আসিবামাত্রই তাঁহাকে আমি তোমার নিকট পাঠাইয়া দিব। তিনি আরও কহিলেন, কেহ যে আপনার শিশুসন্তানকে কখন ভুলক্রমে পরিত্যাগ করিতে পারে, তাহা কিন্তু আমি ইতিপূৰ্বে আর কখনও দেখি নাই, বা শুনিও নাই। না জানি, ইনি কিরূপ পিতা?
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
সে রাত্রিতে আর কোনরূপ অনুসন্ধান হইল না। পরদিবস প্রত্যূষে আমি সেই বালকের অনুসন্ধান করিবার মানসে খানা হইতে বাহির হইতেছি, এমন সময় একখানি পত্র-সহ এক ব্যক্তি একথানি জুড়ি গাড়িতে আমার থানায় আসিয়া উপস্থিত হইলেন। গাড়ি হইতে নামিয়াই তিনি আমার অনুসন্ধান করিলেন। সম্মুখে আমি উপস্থিত ছিলাম, একজন প্রহরী আমাকে দেখাইয়া দিল। আমাকে দেখিয়া তিনি আমার নিকট আগমন করিলেন, এবং পত্রখানি বাহির করিয়া আমার হস্তে প্রদান করিলেন। আমি পত্রখানি খুলিলাম; দেখিলাম, উহা আমার সেই সৰ্ব্বপ্রধান কর্ম্মচারীর স্বহস্তলিখিত। লেখাও অধিক নহে, দুইটী ছত্র মাত্র। উহাতে লেখা ছিল,-আপনি যে বালকের অনুসন্ধান করিতেছেন, এই পত্রবাহক সেই বালকের পিতা।
তাঁহার পোষাক-পরিচ্ছদ, গাড়ি-ঘোড়া দেখিয়া এবং তাহার কথাবার্তা শুনিয়া বেশ বুঝিতে পারিলাম, তিনি একজন বড় মানুষ। পাশ্চাত্য-শিক্ষায় ইনি উত্তমরূপে শিক্ষিত। ইনি আসিয়া হঠাৎ উপস্থিত হওয়ায়, সেই সময় আর আমাকে বাহিরে যাইতে হইল না। তাঁহার সমভিব্যাহারে আমি আমার আফিস গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলাম, এবং সেই স্থানে নির্জনে উভয়ে উপবেশন করিয়া আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, আপনিই কি একখানি টেলি গ্রাম করিয়াছিলেন?
বড়লোক। হাঁ মহাশয়।
আমি। দেখুন দেখি, এই টেলিগ্রাম কি?
বড়লোক। হাঁ মহাশয়। আমিই এই টেলিগ্রাম পঠাইয়াছিলাম।
আমি। এই টেলিগ্রামে যে বালকের কথা উল্লেখ আছে, সে কি আপনার পুত্র?
বড়লোক। হুঁ, সেই শিশু আমার সন্তান। আপনার সাহেবের নিকট হইতে অবগত হইলাম, আপনিই সেই শিশুর অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইয়াছেন; ইহা কি প্রকৃত?
আমি। উহার অনুসন্ধানের ভার আমারই উপর ন্যস্ত হইয়াছে।
বড়লোক। উহার কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারিয়া ছেন কি?
আমি। না, এ পর্যন্ত আমি উহার কোনরূপ সন্ধান করিয়া উঠিতে পারি নাই। আজ উহার সন্ধানে গমন করিতেছিলাম, এমন সময় আপনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
বড়লোক। উহার সন্ধান পাইবার কোনরূপ আশা আছে কি?
আমি। আশা না থাকিলে কি কখনও এই জগতের অস্তিত্ব থাকিত? আশা নাই, এ কথা আমি বলিতে পারি না। ৪
বড়লোক। আপনি অনুসন্ধান করিবার নিমিত্ত গমন করিতে ছিলেন; চলুন, আমিও আপনার সহিত গমন করি।
আমি। আমার সহিত আপনার গমন করিবার প্রয়োজন এখন নাই। যখন প্রয়োজন হইবে, তখন আপনি আমার সহিত গমন করিবেন। এখন কতকগুলি কথা আপনার নিকট আমার জিজ্ঞাস্য আছে, সেইগুলির যথাযথ উত্তর প্রদান করুন; তাহা হইলে কিরূপ ভাবে কোথায় ইহার অনুসন্ধান করিতে হইবে, তাহা বুঝিতে পারিব।
বড়লোক। আমাকে কি জিজ্ঞাসা করিতে চাহেন?
আমি। টেলিগ্রামে যে নাম আছে, সেই নামই বোধ হয়, আপনার নাম? :
বড়লোক। হাঁ উহাই আমার নাম।
আমি। আপনার বাসস্থান কোথায়?
বড়লোক। এই শহরেই আমার বাসস্থান।
আমি। আপনি যে কলিকাতাবাসী, তাহা আমি পূর্বেই বুঝিতে পারিয়াছি; কিন্তু কলিকাতার কোন্ স্থানে আপনার বাসস্থান, তাহা আমাকে বলিয়া দিবেন কি? কারণ, যখন আপনাকে আবশ্যক হইবে, তখন আমি আপনাকে কোথায় পাইব?
