প্রহরীগণ। আমরা চারিজন আছি। সুতরাং এ কার্যের নিমিত্ত আমাদিগকে আর কাহারও সাহায্য গ্রহণ করিতে হইকেনা; অনায়াসেই এ কাৰ্য আমরা সম্পন্ন করিতে পারি। স্ত্রীলোকের মৃতদেহ না, পুরুষের মৃতদেহ আবশ্যক?
দারোগা। স্ত্রীলোকের মৃতদেহ আবশ্যক নহে, পুরুষের মৃতদেহের প্রয়োজন।
প্রহরী। ইহার জন্য আর ভাবনা নাই। আজ দিবা ভাগে আমি একবার গোরস্থানে গিয়াছিলাম, আমার সম্মুখ চারিটী পুরুষের মৃতদেহ মাটি দেওয়া হইয়াছে। উহা হইতে অনায়াসেই আমরা দুইটা উঠাইয়া আনিতে পারি।
দারোগা। যে কবর হইতে মৃতদেহ উঠাইয়া লইবে, মৃত্তিকা দিয়া সেই কবর পুনরায় পূর্ণ করিয়া দেওয়া আবশ্যক।
৩য় প্রহরী। এ কথা কি আর আমাদিগকে আপনার বলিয়া দিতে হইবে?
দারোগা। তোমরা বুদ্ধিমান, তাহা আমি জানি। তথাপি যদি ভুলিয়া যাও, এই নিমিত্ত পূর্ব হইতেই তোমাদিগকে সতর্ক করিয়া দিতেছি।
৪র্থ প্রহরী। সেই মৃতদেই আমরা কোথায় আনিব?
দারোগা। এই স্থানেই আনিবে, এই থানার ভিতরেই আনিবে।
এই কথা শুনিয়া সকলে টাকাগুলি আপন আপন বাক্সে বন্ধ করিয়া দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালনার্থ গমন করিল। যাইবার সময় দারোগা সাহেব কহিলেন, তোমরা তোমাদিগের যে সকল টাকা আপনাপন বাক্সে বন্ধ করিয়া রাখিলে, মৃতদেহ আনিবার পর সেই টাকা সেই স্থানে রাখিও না; বাক্স হইতে বাহির করিয়া আপনাদিগের সঙ্গেই রাখিও। রাখিবার সুবিধা হইবে বলিয়াই, নগদ টাকার পরিবর্তে আমি তোমাদিগকে নোট প্রদান করিয়াছি।
প্রহরীগণ থানা হইতে প্রস্থান করিলে পর, অনেকক্ষণ পৰ্য্যন্ত দারোগা সাহেব বসিয়া বসিয়া; নানারূপ ভাবিতে লাগিলেন। পরিশেষে নিজেও থানা হইতে বহির্গত হইয়া সেই গোন অভিমুখে গমন করিলেন।
সেই স্থানে গমন করিয়া দেখিলেন, তাঁহার প্রেরিত প্রহরীগণ প্রায় কাৰ্য শেষ করিয়া আনিয়াছে। একটা মৃতদেহ কবর হইতে বাহির করিয়া উপরে রাখিয়াছে, অপরটী কয়ে ভিতরেই আছে। কিন্তু তাহার মৃত্তিকা খনন করা হইয়াছে।
এই অবস্থা দেখিয়া ফারোগা সাহেব পুনরায় থানায় প্রত্যা বৰ্তন করিলেন। তাঁর আসিবার কিয়ৎক্ষণ পরেই প্রহরীগণ দুইট মৃতদেহের সহিত উপস্থিত হইল। আসিয়া দারোগা সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিল, এই মৃতদেহ কোথায় রাখিয়া দিব?
উত্তরে দারোগা সাহেব কহিলেন, উভয় মৃতদেহই হাজতের ভিতর রাখিয়া দেও! প্রহরীগণ তাহাই করিল। তখন তিনি তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, কবর হইতে মৃতদেহ উঠাইবার সময় বা উহা বহন করিয়া থানায় আনিবার সময়, অপর আর কেহ দেখিয়াছে কি?
উত্তরে প্রহরীগণ কহিল, না মহাশয়! কেহই দেখে নাই। দেখিলেও, যেরূপ ভাবে আমরা উঁহাদিগকে আনিয়াছি, তাহাতে কেহই কোনরূপ সন্দেহ করিতে পারিবে না।
দারোগা। যাহা হউক, আমরা পাঁচজন ব্যতীত এই মৃতদেহের কথা আর কেহই অবগত নহে। সাবধান! এ কথা কোনরূপে যেন কেহই জানিতে না পারে। অপরে জানিতে পারিলে, আমারও চাকরী থাকিবে না, তোমাদিগেরও চাকরী থাকিবে না। অধিকন্তু জেলে যাইতে হইবে।
প্রহরীগণ। না মহাশয়। এ কথা কেহই জানিতে পারিবে না। আমাদিগের বুকে বাঁশ দিয়া ডলিলেও আমরা এ কথা কিছুতেই প্রকাশ করি না।
ইহার পর দারোগা সাহেব গোফুর খাঁ ও ওসমানের হস্তে যে হাতকড়ি ছিল, এবং উহা প্রস্থান করিবার সময় তিনি যে হাতকড়ি খুলিয়া রাখিয়াছিলেন, সেই হাতকড়ি লইয়া হাজত-গৃহের ভিতর প্রবেশ করিলেন, এবং মৃতদেহদ্বয়ের দুই হতে সেই হাতকড়ি লাগাইয়া দিলেন। পরিশেষে হাজতের বাহিরে আসিয়া হাজত-গৃহের তালা বাহির হইতে বন্ধ করিয়া দিলেন। আসামীদ্বয় হাজিত-গৃহে থাকিবার সময় সেই হাজত গৃহের বাহিরে যেরূপ ভাবে প্রহরীর পাহারা ছিল, সেই চারিজন প্রহরীকেই সেইরূপ ভাবে পাহারায় নিধুক্ত করিয়া রাখিলেন। এই সকল কাৰ্য শেষ করিতে রাত্রি বারটা বাজিয়া গেল।
রাত্রি আন্দাজ তিনটার সময়, থানার বাটীর দুই তিন স্থানে একবারে ধু ধু করিয়া আগুন জ্বলিয়া উঠিল, হাজত গৃহ জ্বলিতে লাগিল। তিনজন প্রহরী সেই সময় থানার ভিতর শয়ন করিয়াছিল, কেবলমাত্র একজন প্রহরী হাজতের সম্মুখে পাহারায় নিযুক্ত ছিল। কিরূপে থানার চতুর্দিকে এক বারে অগ্নিময় হইল, তাহা সেই প্রহরী কিছুমাত্র জানিতে না পারিয়া যেমন চীৎকার করিয়া উঠিল, অমনি সম্মুখে দারোগা সাহেবকে দেখিতে পাইল।
দারোগা তাহাকে কহিলেন, চুপ কর। অপর প্রহরী গণকে শীঘ্র উঠাইয়া দেও, এবং আফিসের কাগজপত্র যদি কি বাহির করিতে পার, তাহার চেষ্টা কর। হাজত-গৃহের চাবি আমাকে প্রদান কর। ইহার পর চাবি-সম্বন্ধে যদি কোন কথা উঠে, তাহা হইলে এইমাত্র বলিও, থানায় আগুন লাগিতে দেখিয়াই আমি দ্রুতপদে দারোগা সাহেবকে সংবাদ দিতে গিয়াছিলাম, সেই সময় হাজতের চাবু আমার হস্ত হইতে সে কোথায় পড়িয়া যায়, তাহার কিছুই স্থির করিতে পারি নাই। পরিশেষে আমি ও দারোগা সাহেব হাজতের দরজা ভাঙ্গিয়া আসামীদ্বয়কে বাহির করিবার নিমিত্ত অনেক চেষ্টা করিলাম; কিন্তু কোনরূপেই সেই দরজা ভাঙ্গিয়া উঠিতে পারিলাম না। দেখিতে দেখিতে থানার সহিত হাজত গৃহ ভষ্মে পরিণত হইয়া গেল। অপর প্রহরীগণ তাহাদিগের সাধ্যমত সরকারী কাগজ-পত্র অনেকগুলি বাহির করিয়াছিল, কিন্তু সমস্ত বাহির করিয়া উঠিতে পারে নাই।
