প্রহরীগণ সেই স্থান হইতে গমন করিলে পর, দারোগা সাহেব জমাদার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমাদিগের এই থানায় প্রহরীর সংখ্যা দশজন, তাঁহারা সকলেই থানায় উপস্থিত আছে কি?
জমাদার। না; তিনজন আজ দুইদিবস হইল, দুইজন আসামী লইয়া সদরে গমন করিয়াছে।
দারোগা। তাহাদিগের ফিরিয়া আসিতে কয় দিবস হইবে?
জমাদার। চারি পাঁচদিবসের কম তাঁহারা ফিরিয়া আসিতে পারিবে না।
দারোগা। আর সাতজন? : জমায়। তাহাদিগের মধ্যে তিনজন উপস্থিত আছে। একজন আপনার সহিত গমন করিয়াছিল, সেও এখন থানায় উপস্থিত আছে; কিন্তু উপস্থিত বলিতে পারিতেছি না।
কারণ, আপনি বা আপনার সঙ্গিবাহারী সেই প্রহরী ফিরিয়া আসিয়াছেন, তা এখনও জায়েরীভূক্ত হয় নাই।
দারোগা। আমি প্রহরীর সহিত সফল হইতে ফিরি আসিয়াছি, ইহা ডায়েরীভূক্ত করিয়া লও, এবং তোমার নিকট থানার চার্জ ছিল, তাহা আমাকে দেওয়া হইল, ইহাও চায়েরীতে লিখিয়া লও।আরও লিখি ক্লখ যে, থানায় যে দুইজন খুনী মোকদ্দমার আসামী আছে, তাহাও থানার চার্জের সহিত আমার জিম্মায় দেওয়া হইল।
জাবোগা সাহেবের কথা শুনিয়া জমাদার সাহেব তাহাই লিখিয়া ডায়েরী পুস্তক আনিয়া তাহাকে দেখাইলেন। তিনিও দেখিয়া আসামীর সহিত খাবার চার্জ পুনঃ প্রাপ্তিস্বীকার লিখিয়া দিলেন; এবং জমাদার সাহেবকে কহিলেন, তিন জন কনষ্টেবলের সহিত তুমি রোদগন্তে গক্ষন কর। ইহা ষ্টেশন ডায়েরীতে লিখিয়া রাখিয়া তোমরা এখনই খানা হইতে বহির্গত হইয়া যাও। অবশিষ্ট চারিজন প্রহরী কেবল মাত্র পানায় আমার সহিত অবস্থিতি করুক।
দারোগা সাহেবের আদেশ প্রতিপালিত হইল। জমাদার সাহে তিনজন কনষ্টেবলের সহিত আপনাকে ষ্টেশন ডায়েরীতে খরচ লিখিয়া থানা হইতে বহির্গত হইয়া গেলেন।
জমাদার সাহেব থানা হইতে কহির্গত হইয়া যাইব কিয়ৎক্ষণ পরেই, আমোগা সাহেব, যে প্রহরী চারিজন থানায় উপস্থিত ছিল, তাহাদিগকে তাকাইলেন, তাহাদিগের মধ্যে যে অল্পদিবসের চাকর, তাহাকে কহিলেন, তোমার কয় বৎসর চাকরী হইয়াছে?
১ম প্রহরী। বার বৎসর হইবে।
দারোগা। তোমার বয়ঃক্রম এখন কত হইয়াছে?
১ম প্রহরী। চলিশ বৎসর হইবে।
দারোগা। তবে তুমি আরও পনর বৎসর চাকরী করিবে।
১ম প্রহরী। যদি শরীর ভাল থাকে, বা আপনারা যদি অনুগ্রহ করেন।
দারোগা। তোমার বেতন এখন কত?
১ম প্রহরী। সাত টাকা।
দারোগা। আর কত বাড়িতে পারে, আশা কর? ১ম প্রহরী। আর কতই বাড়িবে, জোর আট টাকা হইবে।
দারোগা। আট টাকার হিসাবে, তোমার এক বৎসরের বেতন হইতেছে-ছিয়ানব্বই টাকা।
১ম প্রহরী। যাহা হয়।
দারোগা। তাহা হইলে তোমার পনর বৎসরের বেতন হইতেছে, এক হাজার চারি শত চল্লিশ টাকা।
১ম প্রহরী। হিসাবে যাহা হয়।
দারোগা। আর পনর বৎসর পরে যদি তুমি পে নাও, এবং সেই সময় যদি তোমার বেতন আট টাকা হয়, তাহা হইলে তুমি মাসিক চারি টাকা হিসাবে পেন্সন পাইতে পারিবে।
১ম প্রহরী। তাহাই হইবে।
দারোগা। তাহা হইলে বৎসরে তোমার পেন্ন্ হইবে আটচল্লিশ টাকা কেমন?
১ম প্রহরী। হ মহাশয়!
দারোগা। যখন তোমার বয়স পঞ্চান্ন বৎসর হইবে, সেই সময় তোমার পেন্সন হইবে। পেন্সন হইবার পর, তুমি আর কতদিবস বাঁচিবে।
১ম প্রহরী। তাহা কে বলিতে পারে। দশ বৎসরও বচিতে পারি।
দারোগা। দশ বৎসর কেন, যদি তুমি পনের বৎসরও বাঁচ, তাহা হইলে পেন্সন-বাবুদ তুমি সাত শত কুড়ি টাকা পাইতে পার। কেমন না?
১ম প্রহরী। হাঁ মহাশয়।
দারোগা। তাহা হইলে আজ হইতে তুমি যে পর্যন্ত বাঁচিবে, তাহাতে তুমি দুই হাজার এক শত ষাট টাকা বেতন বা পেন্সন পাইবে।
১ম প্রহরী।
দারোগা। এখন তোমাদিগকে একটা কাৰ্য্য করিতে হইবে। সেই কাৰ্য্য করিলে হয় ত তোমাদিগের চাকরী যাইলেও যাইতে পারে; কিন্তু আমি যেরূপ ভাবে কাৰ্য্য করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি, তাহাতে চাকরী না যাইবারই সম্ভাবনা। তথাপি তাহা অগ্ৰেই ধরিয়া লও। ধরিয়া লও, এই কাৰ্যে তোমাদিগের চাকরী গেলে, তোমাদিগের প্রত্যেকের দুই হাজার এক শত ষাট টাকার অধিক ক্ষতি হইবে না, কেমন?
সকল প্রহরী। উহার অধিক আর কি করিয়া ক্ষতি হইবে?
দারোগা। সেই টাকা আমি তোমাদিগকে এখনই এক বারে প্রদান করিতেছি, গ্রহণ কর। তদ্ব্যতীত আমার কাৰ্য্যের নিমিত্ত তোমাদিগকে আরও কিছু আমি প্রদান করিতেছি, অর্থাৎ তোমাদিগের প্রত্যেককে আমি তিন হাজার করিয়া টাকা প্রদান করিতেছি, গ্রহণ করিয়া আমার কাৰ্য্যে হত্যার্পণ কর।
এই বলিয়া দারোগা সাহেব প্রত্যেককে তিন হাজার করিয়া চারিজনকে মোট বার হাজার টাকা প্রদান করিলেন এবং কহিলেন, কেমন, এখন তোমরা আমার কাৰ্য্য করিতে প্রস্তুত আছ?
প্রহরীগণ। আমরা সকল সময়েই আপনার কাৰ্য্য করিতে প্রস্তুত। এখন আমাদিগকে কি করিতে হইবে বলুন।
দারোগা। আর কিছুই করিতে হইবে না। এখন তোমরা গোরস্থানে গমন করিয়া আজ যে সকল মৃতদেহ মাটি দেওয়া হইয়াছে, তাহার মধ্য হইতে দুইটী দেহ উঠাইয়া আন। কেমন পারিবে ত?
প্রহরীগণ। এই সামান্য কাৰ্য্য আর পারিব না?
দারোগা। এ কাৰ্য্য সামান্য নহে। কারণ, এই কার্যের নিমিত্ত তোমরা অপর কাহারও সাহায্য গ্রহণ করিতে পারিবে না। নিজ হন্তে খনন করিয়া তোমাদিগকে সেই স্থান হইতে মৃতদেহ উঠাইতে হইবে, এবং নিজেই উহা বহন করিয়া আনিতে হইবে।
