থানা গ্রামের বাহিরে। গ্রাম হইতে লোকজন আসিতে আসিতে হাজত-গৃহের সহিত সেই থানা ভস্মে পরিণত হইয়া গেল। দশ পনর মিনিটের মধ্যে সেই থানার আর কিছু মাত্র চিহ্নও রহিল না।
থানায় হঠাৎ আগুন লাগিয়া, দুইজন আসামীর সহিত উহা ভস্মে পরিণত হইয়াছে এই সংবাদ উর্ধতন কর্ম্মচারী গণের কর্ণগোচর হওয়ায়, তাঁহারা আসিয়া ইহার অনুসন্ধান করিলেন। কিরুপে থানায় অগ্নি লাগিল, তাহার কোন প্রমাণ পাওয়া গেল না। কিন্তু ইহা সাব্যস্ত হইল যে, কোন ব্যক্তি উহাতে অগ্নি প্রদান করিয়াছে। তাঁহারা সেই দগ্ধাবশিষ্ট মৃতদেহদ্বয়কে হাতকড়ির দ্বারা আবদ্ধ দেখিয়া, ইহাই স্থির করিলেন যে, গোফুর খাঁ ও তাঁহার পুত্র ওসমান অগ্নিদাহে প্রাণত্যাগ করিছে। প্রমাণে আসল কথা কিছু বাহির হইল না। কেবল দারোগা সাহেব এবং সেই সময় যে সকল প্রহরী থানীয় উপস্থিত ছিল, তাহাদিগের অসাবধানতা বশতঃ থানায় আগুন লাগিয়াছে, এই অপরাধে তাঁহারা কৰ্ম্মচ্যুত হইল মাত্র। এদিকে গোফুর খাঁ ও ওসমান দূরদেশে লুক্কায়িত অবস্থায় কালযাপন করিতে শাগিলেন। কিন্তু কিছু দিবস পরে লোকমুখে প্রকাশ হইয়া পড়িল যে, তাঁহারা পুড়িয়া মরেন নাই, এখনও জীবিত আছেন। অনুসন্ধানে তাহার কতক প্রমাণও হইল, কিন্তু কর্ম্মচারীগণ জেলে যাইতে পারে, এরূপ কোন প্রমাণ পাওয়া গেল না।
ছেলে-ভুল
ছেলে-ভুল (অর্থাৎ অপহৃত বালক উদ্ধারের অদ্ভুত রহস্য!)
DETECTIVE STORIES No. 79. দারোগার দপ্তর ৭৯ম সংখ্যা।
ছেলে-ভুল
(অর্থাৎ অপহৃত বালক উদ্ধারের অদ্ভুত রহস্য!)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে শ্রী বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। কার্তিক।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta,
ছেলে-ভুল।
প্রথম পরিচ্ছেদ।
ছেলে-ভুল, এই কথা শুনিয়া পাঠকগণ ত একবারেই চমকাইয়া উঠিবেন, পাঠিকাগণের ত কথাই নাই। ছেলে কুল, কি ভয়ানক কথা! যাহার পুত্র আছে, যাহার হৃদয়ে পুত্রস্নেহ একদিবসের নিমিত্তও প্রবেশ লাভ করিয়াছে, তাহাকেই মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিতে হইবে, ছেলেকে কি কখন ভুল হইতে পারে? আপন পুত্রকে পিতামাতা কি কখনও ভুল করিতে পারেন। তবে এক কথা এই হইতে পারে যে, কোন পিতামাতার পুত্র নিতান্ত শৈশবকালে যদি কাহারও দ্বারা অপহৃত হয়, বা সংসারচক্রের দুষ্পরিহার্য ঘটনাবলীর মধ্যে পড়িয়া, যদি কেহ আপনার প্রাণের রত্নকে হারান, এবং বহু বৎসর পরে যদি সেই পুত্রকে হঠাৎ দেখিতে পান, তাহা হইলে হয় ত পিতামাতা আপনার সেই প্রাণধনকে সহজে চিনিয়া উঠিতে পারেন না। কিন্তু একবারেই যে চিনিয়া উঠিতে পারেন না, তাহাও আমি মুক্তকণ্ঠে বলিতে সাহসী হই না। যে ছেলে-ভুলের বৃত্তান্ত আজ আমি পাঠকগণের সম্মুখে উপস্থিত করিতেছি, উহা কি তবে সেই প্রকারের ছেলে-ভুল? না, তাহা নহে। এ ছেলে-ভুলের অবস্থা যেরূপ, তাহা পাঠক-পাঠিকাগণ সহজে বিশ্বাস করিতে চাহিবেন না, টিটকারী দিয়া আমার কথা উড়াইয়া দিবেন, এবং আপনা দিগের মধ্যে পরস্পর বলাবলি করিবেন, ইহা কখনই হইতে পারে না; সম্পূর্ণরূপে ইহা অসম্ভব।
ইহা সম্ভবপর হউক, বা না হউক, পাঠক-পাঠিকাগণ আমার কথায় বিশ্বাস করুন, বা না করুন, যাহা ঘটিয়াছে, যাহা দেখিয়াছি, যাহা অনুসন্ধান করিয়াছি, তাহাই আজ সকলের সম্মুখে বলিতেছি। যাহার ইচ্ছা হয়, বিশ্বাস করিবেন, যাহার ইচ্ছা না হয়, তিনি বিশ্বাস না করিতে পারেন; কিন্তু যাহারা এই ঘটনা বিশ্বাস না করিবেন, তাঁহাদিগের নিকট আমার একটা কথা জিজ্ঞাস্য আছে। তিনি বাল্যকাল হইতে এ পর্যন্তু বর্তমান মানব-চরিত্র অধ্যয়ন করি। আসিতেছেন কি? বিশেষতঃ এতদঞ্চলের মানবগণের আচার কবহার, কাৰ্য-কলাপ প্রভৃতি আপনি বাল্যকালে যেরূপ দেখিয়া আসিয়াছিলেন, এখন আপনি তাহার কিছুমাত্র পরিবর্তন বুঝিয়া উঠিতে পারিয়াছেন কি? বলুন দেখি, পূর্বকালে সন্তান প্রতিপালনের ভার কাহার উপর ছিল? সন্তান জন্ম গ্রহণের পর হইতে তাহার মনুষ্যত্ব প্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত, কাহার দ্বারা সে লালিত-পালিত হইত? কাহার যত্নে বর্জিত হইত? যতদিবস পৰ্য্যন্ত বালক স্তনদুগ্ধ পান করিত, ততদিবস পৰ্য্যন্ত মাতা কি তাহাকে আপন ক্রোড়ের বহির্ভাগে গমন করিতে দিতেন? অপরের স্তনদুগ্ধ কোন্ মাতা শিগুগণের উদরে সহজে প্রবেশ করাইতে সম্মত হইতেন? সে সময়ের জননীমাত্রেই অশিক্ষিত ছিলেন, পাশ্চাত্য-শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে তাঁহাদিগের হৃদয়ে পাশ্চাত্যভাব তখন প্রবেশ করিয়াছিল না। সুতং তাঁহারা অশিক্ষিতা ছিলেন, তাহাদিগের বুদ্ধির লেশমাত্রও ছিল না, তাই তাঁহারা সামান্য ধাত্রীর কাৰ্য করিয়া, আপন আপন পুত্রকে প্রতিপালন করিতেন; তাই তাঁহারা আপন সন্তানকে ক্রোড়ের বাহির হইতে দিতেন না; তাই তাঁহারা দাসদাসীগণের উপর বিশ্বাস করিয়া, তাহাদিগের হস্তে আপন আপন বহুমূল্য রত্ন কখনই প্রদান করিতে সাহসী হইতেন না। সুতরাং ছেলে-ভুল এ কথা কখনও শুনিতে পাওয়া যাইত না।
আর এখন পাশ্চাত্য-সভ্যতা আমাদিগের অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়াছে। স্ত্রীগণ শিক্ষিত (?) হইয়া, বা শিক্ষিত হইয়াছেন এই ভান করিয়া দেশের মুখোজ্জল করিতেছেন! তাই মধ্যে মধ্যে এখন ছেলে-ভুল হইয়া থাকে। তাহাদিগের বিবেচনায় এখন গর্ভধারণের অন্যরূপ ব্যবস্থা হইলেই ভাল হইত; কিন্তু স্বভাবের নিয়ম একবারে পরিবর্তিত হইবার সম্ভাবনা নাই বলিয়াই, এই ভয়ানক যন্ত্রণা হা দিগকে সহ্য করিতে হইতেছে! তবে সন্তান প্রসুত হইবার পর, আর তাঁহাদিগের কোনরূপ কষ্ট থাকে না। সন্তান ভূমিষ্ট হইল, তিনিও তাহাকে চাকর-চাকরাণীর হস্তে সৰ্পণ করিয়া, যাহাতে নিজের মনকে সন্তুষ্ট রাখিতে পারেন, তাহার চেষ্টায় নিযুক্ত হইলেন। ভৃত্যগণই সন্তানের লালনপালনে নিযুক্ত হইল। মাতৃ-স্তনদুগ্ধের পরিবর্তে গর্দভীদুগ্ধে তাহাদের জীবন রক্ষা হইতে লাগিল। মাতৃ স্নেহের পরিবর্তে নীচ-বংশোদ্ভাবা অসচ্চরিত্রা পরিচারিকার স্নেহের সন্তান পরিবর্ধিত হইতে লাগিল। এরূপ অবস্থায় স্নেহময়ী জননী, তাঁহার স্নেহময় পুত্রকে ভুল না করিবেন ত কাহাকে ভুল করিবেন? অবশ্য এরূপ অবস্থা এখন পর্যন্ত সকলের গৃহে প্রবেশ করে নাই। পূৰ্বে নিয়মানুসারে এখনও কোন কোন প্রসূতি আপন আপন সন্তান প্রতিপালন করিয়া থাকেন সত্য; কিন্তু আরও কিছুদিবস পরে, বা তাহাদের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আরও যে কি হইবে, তাহা ভাবিয়া উঠিতে পারি না। এখন যাঁহাদের অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে, যাহারা পাশ্চাত্য-শিক্ষার অভিমানে অভিমানী হইয়াছেন, কমলা যাহার উপর কৃপানেত্রে দৃষ্টি করিয়াছেন, এক কথায় আজকাল যাঁহারা সভ্য এবং বড়মানুষ, তাহাদিগের মধ্যে অধিকাংশের গৃহেই এইরূপ ঘটনা ঘটিতেছে। তাহাদিগের ছেলে যদি ভুল না হইবে, তবে আর কাহাদিগের হইবে?
