দারোগা। আমার নিমিত্ত আপনাকে ভাবিতে হইবে না। সহজে আমাকে কেহ জেলে দিতে পারিবে না। তবে ঈশ্বর
করুন, যদি আমি কোনরূপ গোযোগে পতিত হই, তাহা হইলে হোসেনকে বলিয়া দিন, তিনি যেন আমাকে সবিশেষরূপ সাহায্য করেন, লোকের দ্বারাই হউক, বা অর্থের দ্বারাই হউক।
হোসেন। হোসেন এরূপ নীচ-প্রকৃতিবিশিষ্ট লোক নহে যে, আপনাকে এইরূপ সাহায্য করিবার প্রয়োজন হইলে, মনিবের আদেশ গ্রহণ করিতে হইবে।
দারোগা। এখন আপনাদিগের এখানে আর অধিক বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই। শীঘ্র আপনারা এখান হইতে প্রস্থান করুন। রাত্রির ভিতরেই আপনাদিগকে এতদূরে গিয়া উপস্থিত হইতে হইবে যে, অনুসন্ধান করিয়াও পুনরায় যেন আপনাদিগকে আর পাওয়া না যায়।
হোসেন। আমরা এখন কিরূপ উপায়ে এই স্থান হইতে গমন করিব?
দারোগা। আমি তাহারও বন্দোবস্ত করিয়া দিতেছি।
এই বলিয়া দারোগা সাহেব তাঁহার বিশ্বাসী দুইজন এক্কাওয়ালাকে ডাকাইতে কহিলেন। একজন প্রহরী গিয়া তাহাদিগকে ডাকিয়া আনিলে, দারোগা সাহেব তাহাদিগকে কহিলেন, তোমাদিগের খুব দ্রুতগামী ঘোড় আছে?
এক্কাচালক। আছে।
দারোগা। সমস্ত রাত্রিতে কত ক্লোশ পথ অতিবাহিত করিতে পারিবে?
এক্কাচালক। ত্রিশ ক্রোশের কম নহে। চল্লিশ ক্রোশ যাইলেও যাইতে পারি।
দারোগা। এখান হইতে * * * রেলওয়ে ষ্টেশন পঁয়তাল্লিশ ক্রোশ হইবে, বেলা নয়টার ভিতর সেই ষ্টেশনে ইহাদিগকে পৌছিয়া দিতে হইবে।
এক্কাচালক। ভাড়া কত দিবেন?
দারোগা। কত চাহ?
এক্কাচালক। দুইখানি এক্কায় পনর টাকা করিয়া ত্রিশ টাকা লই।
দারোগা। তাহাই হইবে। তদ্ব্যতীত তোমরা যে কোথায় গিয়াছিলে, কাহাকে লইয়া গিয়াছিলে, এবং কাহার আদেশে গিয়াছিলে, এ কথা কিছুতেই কাহাকেও বলিবে না। ইহার নিমিত্ত তোমাদিগের প্রত্যেককে পঞ্চাশ টাকা করিয়া আরও এক শত টাকা প্রদান করিতেছি। তোমরা তোমাদিগের এক্কা এখনই লইয়া আইস।
দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া একাওয়ালাগণ তাহা দিগের একা আনিবার নিমিত্ত আপন স্থানে গমন করিল। হোসেন এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা দারোগা সাহেবের হন্তে প্রদান করিলেন। দেখিতে দেখিতে এক্কা-চালকগণ আপনাপন একা আনিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল। দারোগা সাহেবের আদেশমত হোসেন তাহাদিগের হতে এক শত ত্রিশ টাকা প্রদান করিয়া গোফুর খাঁ, ও ওসমান খাঁ এবং দুইজন পরিচারকের সহিত সেই এক্কায় আরোহণ করিয়া দ্রুতগতি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় ভোগা সাহেব উভয়ের হস্ত হইতে হাতকড়ি খুলিয়া লইয়া হোসেনকে বলিয়া দিলেন, ইহাদিগকে কোন স্থানে রাখিয়া দিয়া, দুই চারিদিবস পরে একবার এখানে আসিয়া এদিকের কিরূপ অবস্থা ঘটে, তাহার সংবাদ লইয়া যাইবেন।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
গোর খাঁ প্রভৃতি সকলে সেই স্থান হইতে গমন করিলে পর, যে পাঁচজন প্রহরী আসামীদ্বয়কে আনয়ন করিয়াছিল, দারোগা সাহেব তাহাদিগকে ডাকাইলেন। তাঁহারা তাহার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইলে, তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তোমরা যে খুনী মোকদ্দমার আসামীদ্বয়কে আমার থানায়, আনিয়াছ, তাঁহারা কি সমস্ত রাত্রি এই থানায় থাকিবে?
প্রহরী। হাঁ। কল্য প্রত্যুষে আমরা উঁহাদিগকে লইয়া যাইব। দারোগা। তোমরা আসামীদ্বয়কে নিজ জিম্মায় হাজতে রাখিয়াছ, কি আমাদিগের জিম্ম করিয়া দিয়াছ?
প্রহরী। আপনাদিগের জিম্ম করিয়া দিয়াছি। বাবোগা। যে সময় তোময়া আসামীদ্বয়কে এখানে আনিয়াছিলে, সেই সময় আমি থানায় উপস্থিত ছিলাম না; জমাদার সাহেব ছিলেন। তিনি আসামীদ্বয়কে থানার ডায়েরী ভুক্ত করিয়া লইয়াছেন কি?
প্রহরী। বোধ হয়, লইয়া থাকিবেন।
দারোগা। আসামীদ্বয়কে ভালো যে আমাদিগের জিম্মা করিয়া দিয়াছ, তাহার নিমিত্ত তোমরা রসিদ পাইয়াছ কি?
প্রহরী। না।
প্রহরীর এই কথা শুনিয়া জানোপা সাহেব জমাদার সাহেবকে ডাকাইলেন, এবং তাহাকে কহিলেন, খুনী মোকদ্দমার আসামীদ্বয়কে ডায়েরীভূক্ত করিয়া লইয়াছ কি?
জমাদার। লইয়াছি।
দারোগা। তবে সেই আসামীদ্বয়ের নিমিত্ত উঁহাদিগকে রসিদ দাও নাই কেন?
জমাদার সাহেব এখনই রসিদ দিতেছি। এই বলিয়া দারোগা সাহেবের সম্মুখেই একখানি রসিদ লিখিয়া প্রহরী গণকে প্রদান করিলেন।
রসিদ প্রদান করিবার পর দারোগা সাহেব প্রহরীগণকে কহিলেন, তোমরা এখন আসামীর রসিদ পাইয়াছ, আসামী দ্বয়ের নিমিত্ত এখন আর তোমাদিগের জবাবদিহি নাই। এখন তোমরা সন্নিকটবর্তী বাজারে বা সরাইয়ে গমন করিয়া অনায়াসেই সেই স্থানে আহারাদি ও বিশ্রাম লাভ করিতে পার। কল্য প্রাতঃকালে আগমন করিয়া এই রসিদ মামাকে প্রত্যর্পণ পূর্বক তোমাদিগের আসামীদ্বয়কে লইয়া যাইও।
প্রহরী। থানার ভিতর আমাদিগের থাকিতে কোন আপত্তি আছে কি?
দারোগা। আপত্তি কিছুই নাই। তবে আমার থানায় স্থান অতি সঙ্কীর্ণ, নিরর্থক কষ্ট সহ্ করিয়া এই স্থানে থাকি বার কোন প্রয়োজন নাই। বাজারে থাকিবার উত্তম স্থান আছে। এই থানায় একজন প্রহরীকে সঙ্গে লইয়া যাও। সে তোমাদিগকে উৎকৃষ্ট স্থানে রাখিয়া আসিবে। ইহাতে তোমাদিগের কোনরূপ ব্যয় হইবে না, অথচ সুখে থাকিতে পারিবে।
এই বলিয়া নোগা সাহেব তাহার থানার একজন প্রহরীকে ডাকিলেন, এবং তাহার সমভিব্যাহারে সেই প্রহরী পাঁচজনকে বাজারে পাঠাইয়া দিলেন ও বলিয়া দিলেন, ইহাদিগের আহারাদি করিতে যাহা কিছু ব্যয় হইবে, তাহা যেন দোকানদার প্রহরীগণের নিকট হইতে গ্রহণ না করিয়া আমার নিকট হইতে লইয়া যায়।
