প্রহরী। যখন আপনি এরূপ ভাবে অনুরোধ করিতেছেন, তখন আপনার অনুবোধই বা রক্ষা না করি কি প্রকারে? তবে জানেন কি, আমরা পেটের দায়ে চাকুরী করিতে আসিয়াছি, তাই আপনাকে বলিতেছি।
হোসেন। ইহার জন্য এত গোলযোগ করিবার প্রয়োজন কি? আপনারা যখন যাহা চাহিতেছেন, আমি তখনই তাহা আপনা দিগকে প্রদান করিতেছি। প্রথমেই এ কথা আমাকে বলিতে পারিতেন! আপনাদিগের প্রস্তাবে যদি আমি সম্মত হইতে পারি তাম, তাহা হইলে উঁহাদিগের নিমিত্ত আহারীয় প্রস্তুত করিতাম, আর যদি সেই প্রস্তাব আমার সাধ্যাতীত হইত, তাহা হইলে আপনাদিগকে সেলাম করিয়া আমি ধীরে ধীরে প্রস্থান করিতাম। আচ্ছা, এখন বলুন দেখি, উঁহাদিগকে আহার করিবার অনুমতি দিবার নিমিত্ত আপনারা কি প্রার্থনা করেন?
প্রহরী। পঁচিশ টাকা।
হোসেন। আপনারা পাচজন আছেন, আপনাদিগের প্রত্যেক কেই পঁচিশ টাকা করিয়া আমাকে প্রদান করিতে হইবে?
প্রহরী। না, মোট পচিশ টাকা প্রদান করিলেই হইবে।
হোসেন। পঁচিশ টাকা আমি প্রদান করিতে পারিব না। আপনারা পাঁচজন আছেন, প্রত্যেককে দুই টাকা হিসাবে মোট আপনাদিগকে আমি দশ টাকা প্রদান করিতেছি। ইহাতে আপ নারা সম্মত হইয়া আসামীদ্বয়কে আহার করিবার নিমিত্ত অনুমতি প্রদান করেন ভালই, নতুবা আমি এ স্থান হইতে প্রস্থান করি তেছি, আপনাদিগের মনে যাহা উদয় হয়, তাহা করিবেন।
প্রহরী। আপনাকে আর প্রস্থান করিতে হইবে না। দশ টাকা নিতান্ত অল্প হইতেছে, আর পাঁচটী টাকা বাড়াইয়া দিন।
হোসেন। পাঁচ টাকা ত দূরের কথা, দশ টাকার উপর আমি আর পাঁচটা পয়সাও, বাড়াইয়া দিতে পারিব না। ইহাতে আপনা দিগের যাহা অভিরুচি হয়, তাহা করিতে পারেন।
প্রহরী। যে কাৰ্যে আপনারা অসন্তুষ্ট হন, সে কাৰ্য্য আমা দিগের কোনরূপেই কৰ্তব্য নহে। আচ্ছা, আপনার প্রস্তাবেই আমরা সম্মত হইলাম। টাকা দশটী কথন প্রদান করিবেন?
হোসেন। যখন আপনাদিগের আবশ্যক হইবে, তখনই আপনারা লইতে পারেন। এখনই চাহেন, তাহাও আমাকে বলুন, এখনই আমি উহা আপনাদিগের হস্তে প্রদান করিতেছি।
প্রহরী। সেই ভাল। আমি একাকী নহি, পাঁচজনের কাৰ্য্য, অগ্রে দেওয়াই ভাল।
প্রহরীর কথা শুনিয়া হোসেন আর কোন কথা কহিলেন, দশটী টাকা বাহির করিয়া তৎক্ষণাৎ সেই প্রহরীর হস্তে প্রদান করিলেন।
হোসেন টাকা প্রদান করিলেন সত্য; কিন্তু মনে মনে বড়ই অসন্তুষ্ট হইলেন। মনে করিলেন, এরূপ অত্যাচার করিয়া টাকা লওয়া নিতান্ত অন্যায়। আসামীর সহিত কথা কহিবার প্রয়োজন হইলে টাকা ভিন্ন হইতে পারিবে না! স্নানের নিমিত্ত টাকা, জলপানের নিমিত্ত টাকা, আহারের নিমিত্ত টাকা, এবং বিশ্রাম করিবার নিমিত্ত একখানি চারিপায়া প্রদান করিতে হইলেও টাকা! কি ভয়ানক অত্যাচার! এই সকল অত্যাচারের নিমিত্তই পুলিসের এত দুর্নাম।
হোসেন মনে মনে এইরূপ ভাবিতে লাগিলেন সত্য; কিন্তু প্রকাশ্যে কোন কথা কহিতে পারিলেন না।
গোফুর খাঁ ও ওসমান, প্রথমতঃ কিছুতেই আহার করিতে সম্মত হইলেন না। কিন্তু কোন প্রকারেই হোসেনের অনুরোধ লম্বন করতে না পারিয়া, আহার করিবার নিমিত্ত একবার বসিলেন মাত্র; ফলতঃ আহার করিতে পারিলেন না, চক্ষু-জলে আহারীয় ভাসিয়া যাইতে লাগিল।
আহারান্তে প্রহরীগণ আপনাপন চারিপায়ার উপর শয়ন করিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিল। কেবল একজন মাত্র প্রহরী আসামীদ্বয়কে পাহারা দিতে লাগিল। আসামীদ্বয় সেই গৃহের ভিতর কয়েদী অবস্থায় বিষন্ন মনে বসিয়া রহিলেন।
এইরূপে প্রায় সমস্ত দিবস সেই স্থানে অতিবাহিত হইয়া গেল। সন্ধ্যা হইতে অতি অল্পমাত্র বাকী আছে, সেই সময় একজন প্রহরী এক্কা-চালকগণকে ডাকিল ও কহিল, বেলা প্রায় অবসন্ন হইয়া আসিয়াছে। এখনও অনেকদূর আমাদিগকে গমন করিতে হইবে, আর বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই। একা সকল শীঘ্র প্রস্তুত করিয়া আন, আমরা এখনই এই স্থান হইতে প্রস্থান করিব।
প্রহরীর কথা শুনিয়া এক্কা-চালকগণ তখনই এ প্রস্তুত করিয়া আনিল। প্রহরীগণ আসামীদ্বয়ের সহিত উহাতে আরোহণ করিল, হোসেনও আপনার দুইজন পরিচারকের সহিত আপন একায় আরোহণ করিয়া তাহাদিগের এক্কার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। এক্কা-চালকগণ অখে কষাঘাত করিতে করিতে বেগে একা চালাইতে আরম্ভ করিল।
সন্ধ্যার অল্প পরেই সকলে একটী থানায় গিয়া উপস্থিত হইল। সেই স্থানে সকলে একা হইতে অবতরণ করিয়া থানার ভিতর প্রবেশ করিলেন। থানায় সেই সময় দারোগা উপস্থিত ছিলেন না, কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে তিনি স্থানান্তরে গমন করিয়াছিলেন। অনুসন্ধানে হোসেন জানিতে পারিলেন যে, সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্ম্মচারী অর্থাৎ দারোগাও একজন মুসলমান বংশ-সম্ভূত।
যে সকল এক্কায় আরোহণ করিয়া আমাশয়, প্রহরীগণ ও হোসেন প্রভৃতি গমন করিয়াছিলেন, এখন সেই সকল এক বিদায় করিয়া দিবার প্রয়োজন হইল। কারণ, তাঁহারা অনেকদূর আগমন করায়, তাহাদিগের অশ্বগণ সবিশেষরূপ ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে। তদ্ব্যতীত সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিবার সময় সেই স্থানে যতগুলি একার প্রয়োজন হইবে, ততগুলিই অনায়াসে পাওয়া যাইবে।
এইরূপ বন্দোবস্ত দেখিয়া, যে এক্কায় হোসেন তাহার ভৃত্য দ্বয়ের সহিত আগমন করিয়াছিলেন, তাহাকে ভাড়া দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন। সেই এক্কা-চালককে যে পরিমিত ভাড়া দিবার নিমিত্ত প্রহরীগণ বলিয়া দিল, হোসেন তাহাতে দ্বিরুক্তি না করিয়া তাহাই দিয়া দিলেন। একা-চালক আপনার ভাড়া পাইয়া থানার বাহিরে গিয়া উপবেশন করিল।
