কেবলমাত্র একখানি এক্কার ভাড়া দিতে দেখিয়া একজন প্রহরী কহিল, আপনি কেবলমাত্র একখানি একার ভাড়া দিয়া বিদায় করিয়া দিলেন দেখিতেছি। আর অপর এক্কা তিনখানি, যাহাতে আপনার মনিবদ্বয় এবং আমরা আসিয়াছি, তাহার ভাড়াও ওই সঙ্গে দিলেন না কেন?
হোসেন। আপনাদিগের একা-ভাড়া প্রভৃতি যাহা কিছু ব্যয় হইবে, তাহার নিমিত্ত আমি এককালীন আপনাদিগকে পঞ্চাশ টাকা প্রদান করিয়াছি। তাহা হইতে একা-ভাড়া প্রদান করিতে আপনাদিগের কোনরূপ আপত্তি আছে কি?
প্রহরী। আপত্তি আর কিছুই নাই, তবে এখন আপনি দিয়া দিলেও কোন ক্ষতি নাই।
হোসেন। আমি একবার প্রদান করিয়াছি। বলেন না হয়, আর একবার প্রদান করি। যখন আমরা সম্পূর্ণরূপে আপনাদিগের হাতে পড়িয়াছি, তখন যাহা বলিবেন, তাহাই করিতে হইবে।
প্রহরী। আপনি অসন্তুষ্ট হইবেন না। একা-ভাড়া এখন আপনি প্রদান করুন, বা আমরা প্রদান করি, তাহাতে কোনরূপ ক্ষতি নাই। কারণ, আমাদিগের নিকট আপনার যে পঞ্চাশ টাকা আছে, খরচ-পত্ৰ বাদে তাহা হইতে যাহা অবশিষ্ট থাকিবে, তাহা আপনারই। আর যদি উহাতে সমস্ত খরচের সঙ্কুলান না হয়, তাহা হইলে আর যাহা লাগিবে, তাহা আপনাকে দিতে হইবে। এরূপ অবস্থায় সামান্য একা-ভাড়ার নিমিত্ত এত গোলযোগ করিতেছেন কেন?
হোসেন। আমি কোনরূপ গোলযোগই করিতেছি না। যে টাকা আপনাদিগের নিকট আছে, তাহা হইতে এক্কা-ভাড়া প্রদান করিতে যদি আপনাদিগের কোনরূপ অসুবিধা হয়, তাহা হইলে এখনই আমি উহা প্রদান করিতেছি।
প্রহরী। অসুবিধা আর কিছুই নয়। তবে টাকাগুলি যেরূপ ভাবে বাঁধিয়া রাখা আছে, তাহা হইতে কিছু টাকা বাহির করিয়া লইতে হইলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। তাই যাহাতে এক্কা ওয়ালাগণের আর বিলম্ব না হয়, সেই নিমিত্ত ভাড়াটা এখন আপ, নাকে দিতে বলিয়াছিলাম। ইহাতে আমাদিগের কোনরূপ দুরভিসন্ধি নাই।
হোসেন। সামান্য টাকার নিমিত্ত আর অধিক কথার প্রয়ো জন নাই। আমি এখন উহা প্রদান করিতেছি, যেরূপ ভাল বিবেচনা হয়, পরিশেষে আপনারা তাহা করিবেন।
এই বলিয়া হোসেন আর তিনখানি একার ভাড়াও আপনার নিকট হইতে উঁহাদিগকে দিয়া দিলেন।
আপনাপন ন্যায্য মজুরি বুঝিয়া লইয়া একাওয়ালাগণ সেই স্থান হইতে তখনই প্রস্থান করিল।
প্রহরীগণের ব্যবহার দেখিয়া হোসেন মনে মনে ভাবিলেন, উঁহাদিগের খরচের নিমিত্ত যে পঞ্চাশ টাকা দেওয়া হইয়াছে, তাহা পাইবার আর কোনরূপ উপায় নাই। অথচ আরও যাহা কিছু খরচ হইবে, তাহার সমস্তই তাঁহাকে বহন করিতে হইবে।
এই সময় গোফুর খাঁ হোসেনকে তাহার নিকট ডাকিলেন। হোসেন তাহার নিকট গমন করিলে তিনি কহিলেন, হোসেন। আমি দেখিতেছি, তুমি নিরর্থক অনেক অর্থ নষ্ট করিতেছ।
হোসেন। আপনাদিগের জীবন অপেক্ষা কি অর্থের মূল্য অধিক? যে আপনাদিগের নিমিত্ত আমি সেই অর্থ ব্যয় করিব না?
গোফুর। আমাদিগের জীবন রক্ষার নিমিত্ত অর্থ ব্যয় করিতে আমাদিগের কিছুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু এইরূপ নিরর্থক অর্থ ব্যয় করিয়া কি আমাদিগের জীবন রক্ষা করিতে পারিবে?
হোসেন। এরূপ ভাবে অর্থ ব্যয় করিয়া, আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে পারি না সত্য; কিন্তু আপাততঃ আপনাদিগের কষ্টের অনেক লাঘব করিতে সমর্থ হইব।
গোফুর। যাহাদিগের জীবনের আর কিছুমাত্র আশা নাই, দুই চারিদিবসের নিমিত্ত তাহাদিগের শারীরিক কষ্ট নিবারণ করিয়া ফল কি? মানসিক কষ্টের নিকট শারীরিক কষ্ট কিছুই নহে। যে ব্যক্তি সর্বদা মানসিক কষ্ট ভোগ করিতেছে, তাহার যতই কেন শারীরিক কষ্ট হউক না, তাহার দিকে তাহার লক্ষ্যই হয় না।
হোসেন। আপনি যাহা বলিতেছেন, তাহা প্রকৃত। কিন্তু আমাদিগের সম্মুখে আপনি শারীরিক কষ্ট ভোগ করিবেন, অর্থ থাকিতে আমরা কিরূপে উহা দেখিতে সমর্থ হইব? আর আপনাদিগের জীবনের আশা নাই, এ কথাই বা আপনারা কিরূপে অনুমান করিলেন?
গোফুর। যাহার ফাঁসির হুকুম হইয়াছে, তাহার আর জীবনের আশা কি?
হোসেন। এখনও অনেক আশা আছে। যে বিচারালয় হইতে আপনাদিগের ফাঁসির হুকুম হইয়াছে, তাহার উপর বিচারালয় আছে। সেখানে আপীল করিব, যেরূপ ভাবে ও যত অর্থ ব্যয় করিয়া চেষ্টা করিতে হয়, তাহা করিব। ইহাতে কি কোনরূপ ফল প্রাপ্ত হইব না? ঈশ্বর না করুন, যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে ছোট লাটকে ধরিব; আবশ্যক হইলে বড় লাটের নিকট পর্যন্ত গমন করিব। পরিশেষে বিলাত পর্যন্ত চেষ্টা করিব। ইহাতেও কি সুবিচার হইবার সম্ভাবনা নাই? যদি ইহাতেও না পারি, তাহ হইলে অর্থ ব্যয় করিয়া, আপনাদিগের জীবনের নিমিত্ত অসৎ উপায় অবলম্বন করিতে ক্রটি করিব না। আপনি আপনার মনকে স্থির করিয়া রাখুন। দেখিবেন, যেরূপ উপায়েই হউক, কখনই আপনাদিগকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিতে দিব না।
গোফুর। তুমি যাহা মনে করিতেছ, তাহা সম্পূর্ণরূপ অসম্ভব। ইহা কখনই হইতে পারে না।
হোসেন। জগতে অসম্ভব কিছুই নাই; অর্থে না হইতে পারে, এরূপ কোন কাৰ্য্যই নাই। দেখিবেন, যাহা মুখে বলিতেছি, কাৰ্যে তাহা পরিণত করিতে পারি কি না!
গোফুর। আমার বিবেচনায় তুমি আর নিরর্থক অর্থ ব্যয় করিও না। আমাদিগের নিমিত্ত এইরূপ ভাবে যে অর্থ ব্যয় করিবে, তাহা আমাদিগের নামে দরিদ্র ব্যক্তিকে দান করিও। তাহা হইলে আমাদিগের পরকালের অনেক উপকার করা হইবে। ইহকালে যাহা হইবার, তাহা হইল।
