প্রহরী। অত গোলযোগে কায নাই। আমরা একরূপ জলযোগ করিয়াছি, এখন আর আহার করিবার ইচ্ছা নাই। সুতরাং আহারীয় প্রস্তুত করিবার আর প্রয়োজন কি? আপ নারা ইচ্ছা করেন, তাহা হইলে আহারাদি প্ৰস্তুত করিয়া অনায়াসেই আহার করিতে পারেন।
হোসেন। আমি আমাদিগের আহারের নিমিত্ত বলিতেছি না। আপনারা যে আসামীদ্বয়ের সহিত আসিয়াছেন, তাঁহাদিগের আজ কয়েকদিবস হইতে আহার হয় নাই; কোন দিন অনাহারে, কোন দিন জলাহারে, দিন অতিবাহিত করিয়া আসিতেছেন। ইহাদিগের অদৃষ্টে যাহা আছে, তাহা পরে হইবে; কিন্তু এখন আমাদিগের ইচ্ছ, উঁহাদিগকে কিছু আহার করাই। এই নিমিত্ত আপনাদিগকে এত অনুরোধ করিতেছি।
প্রহরী। উঁহারা ত এখনই আহার করিলেন?
হোসেন। বাজারের মিষ্ট দ্রব্যাদি ভোজন করিয়া কোন্ ব্যক্তি কয় দিবস জীবনধারণ করিতে পারে?
প্রহরী। যখন আপনারা আহারাদি প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত এতই ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, তখন আমার সম্মুখে আপনারা আমা দিগের সকলের আহারীয় প্রস্তুত করুন। আহারীয় প্রস্তুত করি বার সময় আমি অনায়াসেই বুঝিতে পারি যে, ইহাতে আপনা দিগের কোনরূপ দুরভিসন্ধি আছে কি না।
হোসেন। এ উত্তম কথা।
উভয়ের মধ্যে এইরূপ কথাবার্তা হইবার পর, হোসেন নিজের অর্থ ব্যয় করিয়া সকলের আহারাদির উদ্যোগ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
একজন প্রহরীর তত্ত্বাবধানে সময়মত আহারীয় দ্রব্য সকল প্রস্তুত হইল। তখন হোসেন কহিলেন, এখন আহারীয় প্রস্তুত হইয়াছে, অনুমতি হইলে সকলেই ভোজন করিয়া লইতে পারেন।
প্রহরী। সকলের ভোজন একবারে হইতে পারে না। প্রথমে তোমরা ভোজন কর, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।
হোসেন। আমরা অগ্রে ভোজন করিব কেন? আপনাদিগের আহারাদি হইয়া গেলে, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।
প্রহরী। তাহা হইতে পারিবে না। তোমরা অগ্রে ভোজন করিলে, তাহার পর আমরা ভোজন করিব।
হোসেন। যদি আপনারা নিতান্তই অগ্রে ভোজন না করেন, তাহা হইলে সকলেই এক সময় ভোজন করা যাউক। আপনারা থাকিতে আমরা কিরূপে অগ্রে খাইতে পাক্সি?
প্রহরী। তাহাও হইতে পারে না।
হোসেন। কেন?
প্রহরী। তোমরা ভোজন করিলে, তাহার পর তোমাদিগের কিরূপ অবস্থা হয়, তাহা অগ্রে দেখিয়া, পরিশেষে আমরা ভোজন করিব।
হোসেন। আপনার এ কথার অর্থ ত আমি কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না।
প্রহরী। বুঝিতে না পারিয়া থাকেন, আমি বুঝাইয়া দিতেছি। আমাদিগের তত্ত্বাবধানে আপনারা আহারীয় দ্রব্য প্রস্তুত করিয়াছেন সত্য; কিন্তু আমাদিগের অলক্ষিতে আপনারা উহার সহিত অনায়াসেই বিষ মিশ্রিত করিয়া দিতে পারেন। প্রথমে আপনারা আহার করিলেই, আমরা জানিতে পারি যে, সেই সকল আহারীয় দ্রব্যের সহিত কোনরূপ বিষাক্ত দ্রব্য মিশ্রিত আছে কি না। আহারান্তে যদি আপনাদিগের কোনরূপ বৈলক্ষণ না ঘটে, তাহা হইলে আমরা সহজেই অনুমান করিতে পারিব যে, উহার সহিত কোনরূপ বিষাক্ত ব্য মিশ্রিত নাই। ইহার পর আর আপনাদিগকে আহারীয় দ্রব্যের নিকট গমন করিতে দিব না। আমরা নিজ হস্তে সেই সকল দ্রব্য পরিবেশন করিয়া আহার করিব।
হোসেন। আপনার এ কথায় আমাদিগের কোন উত্তর নাই। আমরা আহারীয় দ্রব্যর নিকট আর গমনই করিব না। আপনারা উহা হইতে কিছু কিছু আমাদিগকে প্রদান করুন, আমরা দূরে বসিয়া আহার করি। আমরা আপনাদিগের আদেশ প্রতিপালন করিব মাত্র। কিন্তু আপনাদিগকে এবং মনিবদ্বয়কে পরিত্যাগ করিয়া, পরিতুষ্টির সহিত কখনই আহার করিয়া উঠিতে পারিব না।
ইহার পর হোসেনের প্রস্তাব-মতই কাৰ্য্য হইল। হোসেন ও তাহার পরিচারকদ্বয় দূরে আহার করিতে বসিলেন; একজন প্রহরী তাহাদিগকে পরিবেশন করিলেন। প্রহরীগণ যখন দেখিল, হোসেন বা তাহার পরিচারকদ্বয় সেই সকল দ্রব্য আহার করিয়া সুস্থ শরীরে রহিলেন, তখন তাঁহারা তাহাদিগের নিজের আহারের উদ্যোগ করিতে লাগিল। কিন্তু আসামীদ্বয় আহার করিবে কি না, সে সম্বন্ধে কোন কথাই কহিল না। তখন হোসেন কহিলেন, আপনাদিগের আহারের উদ্যোগ হইতেছে; কিন্তু আসামীদ্বয় কখন আহার করিবেন?
প্রহরী। আসামীদ্বয়েরও কি আহারীয় প্রস্তুত করিয়াছেন?
হোসেন। উঁহারাই আহার করিবেন বলিয়া, সকলের নিমিত্ত আহারীয় আমরা প্রস্তুত করিয়াছি। নতুবা আমাদিগের আহারীয় প্রস্তুত করিবার কোনরূপ প্রয়োজনই ছিল না।
প্রহরী। উহার ফাঁসি যাইবার আসামী। উঁহাদিগকে আমরা কিরূপে আহার করিতে অনুমতি দিতে পারি?
হোসেন। যাহাদিগকে ফাঁসি দিবার হুকুম হয়, ফাঁসির পূর্বে যে কয় দিবস তাঁহারা বাঁচিয়া থাকে, সে কয় দিবস কি তাহাদিগকে আহার করিতে দেওয়া হয় না। যদি সরকারের এরূপ কোন নিয়ম থাকে, তাহা আমি অবগত নহি। বরং লোক-পরম্পরায় শুনিতে পাওয়া যায়, ফঁসি যাইবার পূর্বে ফাঁসির আসামী যাহা খাইতে চাহে, সরকার হইতে তাহাই তাহাকে খাইতে দেওয়া হয়। সে যাহা হউক, এত পরিশ্রম করিয়া যখন আমরা আহারীয় প্রস্তুত করিয়াছি, তখন উঁহাদিগকে কিছু আহার করিতে দিয়া আমাকে সবিশেষরূপ অনুগৃহীত করুন।
প্রহরী। উঁহারা আহার করুন, বা না করুন, তাহাতে আপনার ক্ষতি-বৃদ্ধি কি?
হোসেন। ক্ষতি নাই? খুব ক্ষতি আছে। যিনি আমার অন্নদাতা, তিনি আহার করিতে পাইবেন না, আর আমরা আহার করিয়া বসিয়া আছি! ইহা অপেক্ষা দুঃখের বিষয় আর কি হইতে পারে? আমি আপনাদিগকে সবিশেষরূপ অনুবোধ করি তেছি, উঁহাদিগের আহার করিতে দিবার পক্ষে কোনরূপ প্রতি। বন্ধক হইবেন না। উঁহারা যেরূপ মনঃকষ্টে আছেন, তাহাতে যে আহার করিতে পারিবেন, সে ভরসা আমার নাই; তবে আহার করিতে বসিয়াছেন, ইহা দেখিলেই আমার মনটা একটু সন্তুষ্ট হইবে, এই মাত্র। এই অনুগ্রহের নিমিত্ত যদি আপনাদিগের আরও কিছু লইবার প্রত্যাশা থাকে, তাহাও আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারেন।
