দারোগা। ইহাই যদি প্রকৃত ঘটনা হয়, তাহা হইলে এখন যেরূপ ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে, তাহা কি?
হোসেন। তাহা যে কি, তাহা আপনি আপন মনে বেশ অবগত আছেন, আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন কেন?
দারোগা। এই মোকদ্দমার যেরূপ প্রমাণ হইয়াছে, তাহা আপনি সমস্ত অবগত হইতে পারিয়াছেন কি?
হোসেন। তাহা সমস্তই জানিতে না পারিলে, আর আপনার নিকট আসিব কেন?
দারোগা। আপনি আমাকে যে সহস্র মুদ্রা প্রদান করিলেন, তাহার পরিবর্তে আমি এখন যে কোন উপকার করিতে পারি, তাহা বোধ হয় না।
হোসেন। মনে করিলে এখনও বিস্তর উপকার করিতে পারেন।
দারোগা। এরূপ অবস্থায় আমার দ্বারা আর কি উপকার হইবার সম্ভাবনা আছে, বলুন। আমি বিবেচনা করিয়া দেখি, সেই উপকার করিতে আমি কত দুর সমর্থ।
হোসেন। সময় মত বলিব। তখন আপনার যতদূর সাধ্য, সেইরূপ উপকার করিবেন; কিন্তু এখন যাহাতে অন্য কোন সাক্ষীর যোগাড় না হয়, তাহা করিলেই যথেষ্ট হইবে। আরও একটা বিষয়ের অনুরোধের নিমিত্ত আমি আপনার নিকট আসিয়াছি। যে সমস্ত ব্যক্তি আমাদিগের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে, তাঁহারা ওসমানের জ্বালায় সবিশেষ জ্বালাতন হইয়া, এইরূপে আমাদিগের সর্বনাশ করিতে বসিয়াছে। তাঁহারা যে কথা বলিয়াছে, পুনরায় যে তাহার অন্যথাচরণ করিবে, তাহা আমার বোধ হয় না। তথাপি অর্থ প্রলোভনে আমরা একবার চেষ্টা করিয়া দেখিব, যদি কোনরূপে কৃতকার্য হইতে পারি। আপনি তাহাতে প্রতিবন্ধকতাচরণ করিবেন না, ইহা আমার একটা প্রধান অনুরোধ।
দারোগা। তাহা কিরূপে হইবে? সাক্ষিগণ একবার যেরূপ কথা বলিয়াছে, এখন যদি তাহার অন্যথাচরণ করে, তাহা হইলে তাহাদিগকে সম্পূর্ণরূপে বিপদে পড়িতে হইবে, তাহা কি তাঁহারা জানে না? বিশেষতঃ একথা যদি তাঁহারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তাহা হইলে আমি কখনই বলিতে পারিব না যে, তোমরা পূর্বে যেরূপ বলিয়াছ, এখন অনায়াসেই তাহার বিপরীত বলিতে পার। আর সাক্ষীগণ যদি এখন অন্যরূপ বলে, তাহা হইলে তাহাদিগের ত বিপদ হইবেই; তদ্ব্যতীত আমাদিগের উপরও নানারূপ সন্দেহ উপস্থিত হইবে, আর হয় ত আমাকেও বিপদাপন্ন হইতে হইবে।
হোসেন। যাহাতে আপনাকে বিপদাপন্ন হইতে হইবে, এরূপ কাৰ্যে আমি কখনই হস্তক্ষেপ করিব না। আর যাহা কিছু করিতে হইবে, আপনার সহিত পরামর্শ করিয়া, এবং সেই বিষয়ে আপনার মত লইয়া সেই কাৰ্য্য করিব। আপনার অমতে কোন কাৰ্য্য করিব না।
এই বলিয়া হোসেন, সেই দিবস দারোগা সাহেবের নিকট হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন।
হোসেন চলিয়া গেলে, দয়োগা সাহেব মনে মনে স্থির করিলেন, যাহা কিছু পাইয়াছি, তাহা গ্রহণ করিয়াছি। আরও যদি কিছু পাই, তাহাও লইব। অধিকন্তু হোসেনের সাহায্যে সেই স্ত্রীলোকটীকেও পুনরায় আনাইয়া লইব। কিন্তু আসল কাৰ্য কোনরূপেই ছাড়িব না; যাহাতে গোফুর এবং ওসমানকে ফঁসি কাষ্ঠে ঝুলাইতে পারি, বিধিমতে তাহার চেষ্টা করিব।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
হেদায়েতের কন্যাকে হত্যার অপরাধে, গোফুর খাঁ এবং তাহার পুত্র ওসমান খাঁ মাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরিত হইলেন। দারোগা সাহেবও প্রাণপণে সেই মোকদ্দমার আয়োজন করিতে লাগিলেন। পিতা পুত্র উভয়েই হাজতে রহিলেন। পুলিসের নিকট যে সকল সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছিল, যাহাতে তাঁহারা মাজিস্ট্রেটের নিকট অন্যরূপ সাক্ষ্য প্রদান করে, তাহার নিমিত্ত হোসেন অনেক অর্থ ব্যয় করিয়া, অনেক চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই কৃতকার্য হইতে পারিলেন না। বরং পুলিসের নিকট তাঁহারা যেরূপ বলিয়াছিল, মাজিষ্ট্রেটের নিকট তাহা অপেক্ষা আরও অনেক অধিক কথা কহিল।
সমস্ত সাক্ষীর এজাহার হইয়া যাইবার পর, মাজিষ্ট্রেট সাহেব দেখিলেন যে, আসামীদ্বয়ের বিরুদ্ধে হত্যাকরা অপরাধ উত্তমরূপে প্রমাণিত হইয়াছে। সুতরাং চুড়ান্ত বিচারের নিমিত্ত তিনি এই মোকদ্দমা দায়রায় প্রেরণ করিলেন।
এই মোকদ্দমার বিচারের নিমিত্ত যখন দায়রায় দিন স্থির হইল, সেই সময় বিচারক মফঃস্বল পরিভ্রমণ উপলক্ষে, জেলা হইতে সুদূর মফঃস্থলে অবস্থান করিতেছিলেন। যখন যে গ্রামে বিচারক উপস্থিত হইতেছিলেন, সেই সময় সেই গ্রামেই আপন কাছারি করিয়া মোকদ্দমার বিচারও করিয়া আসিতেছিলেন।
যে দিবস গফুর খাঁ এবং তাঁহার পুত্র ওসমানের এই হত্যাপরাধ-বিচার আরম্ভ হইল, সে দিবস একটা নিতান্ত ক্ষুদ্র পলিগ্রামের ভিতর জজসাহেবের তাম্বু পড়িয়াছিল। সুতরাং সেই স্থানেই এই মোকদ্দমার বিচার আরম্ভ হইল।
এলাহাবাদ হাইকোর্ট হইতে উকীল কৌন্সলি আনাইয়া এই মোকদ্দমায় দোষ-ক্ষালনের যতদূর উপায় হইতে পারে, হোসেন প্রাণপণে তাহার চেষ্টা করিলেন; কিন্তু কিছুতেই আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে সমর্থ হইলেন না। সরকারী উকীল মোকর্দমার অবস্থা জজসাহেবকে উত্তমরূপে সর্বপ্রথম বুঝাইয়া দিবার পর হইতেই, জজসাহেবের মনে কেমন এক বিশ্বাস হইয়া গেল যে, আসামী পক্ষীয় উকীল কৌশলি অনেক চেষ্টা করিলেও, তাহার মন হইতে সেই বিশ্বাস অপনোদন করিতে পারিলেন না। তিন দিবস পৰ্য্যন্ত এই মোকদ্দমার সাক্ষিগণের এজাহার গৃহীত হইল। তাহাদিগের উপর যথেষ্ট জেরা হইল। উভয় পক্ষীয় উকীল কৌন্সলিগণ স্বপক্ষে সাধ্যমত বক্তৃতাদি করিতে ক্রটি করিলেন না; কিন্তু কিছুতেই আসামীদ্বয়ের পক্ষে কোনরূপ উদ্ধারের উপায় লক্ষিত হইল না।
