জজসাহেব এই মোকদ্দমার রায় প্রদান করিবার কালীন কহিলেন, আসামীগণ! তিন দিবস পর্যন্ত বিশেষ যত্ন ও মনো–যোগের সহিত, এই মোকদ্দমার সমস্ত ব্যাপার আমি উত্তম রূপে শ্রবণ করিয়াছি, এবং তোমাদিগের পক্ষীয়, সুশিক্ষিত উকীল কৌন্সলিগন সবিশেষ যত্নের সহিত তোমাদিগের পক্ষসমর্থন করিয়া, তোমাদিগের স্বপক্ষে যাহা কিছু বলিবার আছে, তাহা অপেক্ষাও অনেক কথা বলিয়াছেন; কিন্তু উভয় পক্ষের সমস্ত ব্যাপার শ্রবণ করিয়া এবং সাক্ষিগণের সাক্ষ্য দিবার কালীন, তাহাদিগের ভাব-ভঙ্গি দেখিয়া আমার স্পষ্টই প্রতীতি জন্মিয়াছে যে, তোমাদিগের বিপক্ষে তাঁহারা বিন্দুমাত্রও মিথ্যা কথা কহে নাই। অবশ্য, অনেক সাক্ষ্যের অনেক স্থান অপর সাক্ষিগণের সাক্ষ্যের সহিত এক মিল হয় নাই। কিন্তু তাহা বলিয়া তাঁহারা যে, একবারে মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে, এ কথা আমি কখনই স্বীকার করিতে পারিব না। তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর তালা বন্ধ গৃহের মধ্যে হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ যে পাওয়া গিয়াছে, সে সম্বন্ধে কোন আপত্তি উত্থাপিত হয় নাই। বিশেষতঃ তোমাদিগের বিরুদ্ধে যে সকল ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে, তাঁহারা সকলেই তোমাদিগের জমিদারীর প্রজা। প্রজাগণ তাহা দিগের জমিদারের বিপক্ষে কখনই মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করিতে সম্মত হয় না। আর নিতান্ত সত্যের অনুরোধে যদি কোন প্রজাকে তাহার জমিদারের বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিতে হয়, তাহা হইলেও সেই প্রজা যতদূর সম্ভব, তাহার জমিদারকে বাঁচাইয়া যাইতে চেষ্টা করে, ইহাই এদেশীয় নিয়ম। তোমাদের প্রজাগণ তোমাদিগের বিপক্ষে যে সকল সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে, আমার বিশ্বাস, তাঁহারা তাহা অপেক্ষাও অনেক অধিক কথা অবগত আছে। কোনরূপে যদি আপনাদের জমিদারের উপকার করিতে পারে, এই ভাবিয়া সকল কথা তাঁহারা বলে নাই। সেই সকল সাক্ষী ওসমানের অত্যাচারে অত্যাচারিত হইয়া, তোমাদিগকে বিপদাপন্ন করিবার মানসে মিথ্যা কথা কহিতেছে, এ কথা সময় সময় মোদিগের কৌন্সলি উখাপিত করিলেও, তাঁহারা সেই সকল কথা একবারে অস্বীকার করে। অথচ তোমরাও তাহার সত্যাসত্য প্রমাণ করতে সমর্থ হও নাই, বা তাহার চেষ্টাও কর নাই। এইরূপ নানা কারণে আমি সাক্ষিগণের সাক্ষ্য কোনরূপেই একবারে অবিশ্বাস করিতে পারি না।
সাক্ষিগণের দ্বারায় বেশ প্রমাণিত হইয়াছে যে, হেদায়েতের নিকট হইতে খাজানা আদায় করিবার মানসে, তাহার অবর্ত মানে তাহার যুবতী কন্যাকে তোমরা বলপূৰ্ব্বক তাহার পরদার বাহিরে আনিয়া সৰ্ব্বসমক্ষে তাহাকে যেরূপ অবমাননা করিয়াছ, সেরূপ কাৰ্য ভদ্রবংশীয় কোন লোকের দ্বারা কোনরূপেই সম্ভব না। কেবল মাত্র সামান্য খাজানা আদায় করিবার অভিপ্রায়ে তোমরা সেই যুবতীর উপর কেবল যে এইরূপ ভয়ানক অত্যাচার করিয়াছ, তাহা নহে। আমার অনুমান হয় যে, তোমাদিগের এরূপ কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিবার অপর কোন বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। এইরূপে যুবতীর উপর ভয়ানক অত্যাচার করিয়াই যে, তোমরা তাহাকে নিষ্কৃতি দিয়াছ, তাহা নহে। সৰ্বসমক্ষে সেই অবলাকে বিনাদোয়ে ধৃত করিয়া, বিশেষরূপে অবমাননার সহিত কয়েক খানি গ্রামের মধ্য দিয়া তোমরা তোমাদিগের বাটী পৰ্যন্ত তাহাকে লইয়া গিয়াছ। এ কথা গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিত সকলেই একবাক্যে কহিতেছে। অবলা স্ত্রীলোকের উপর বিনা দোষে এরূপ অত্যাচার করা নিতান্ত পিশাচের কাৰ্য ভিন্ন আর কিছুই বলিতে পারা যায় না। এইরূপ অত্যাচার করিয়াই কি তোমরা তাহাকে নিষ্কৃতি লিয়াছ? তোমাদিগের নিজের অনুচর এবং ভৃত্যরর্গের দ্বারা প্রমাণিত হইতেছে যে, সেই হতভাগিনীকে অনশনে রাখিয়া হত্যা করিবার অভিপ্রায়ে তাহাকে তোমাদিগের বাড়ীর ভিতর একটা নির্জন গৃহের মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়া দিয়াছিলে। অনশনে যে লোকের মৃত্যু ঘটে, তাহা কি তোমরা জান না? ক্ষুৎপিপাসা সন্থ করিতে কোন্ ব্যক্তি কয়দিবস সমর্থ হয়, তাহা কি তোমাদিগের মনে একবারের নিমিত্তও উদয় হয় নাই? কেবল তাহাই নহে, তোমাদিগের নিজের পরিচারক কি বলিতেছে, তাহা একবার শোন। এক দিবস কোন গতিতে আমি সেই গৃহের চাবি সংগ্রহ করিয়া ঘর খুলিয়া দেখিলাম যে, ক্ষুধায় এবং তৃষ্ণায় যুবতী মৃত্যুশয্যায় শায়িতা। এই অবস্থা দেখিয়া আমার কঠিন হৃদয়েও দয়ার উদ্রেক হইল। ঘরবানের সহিত পরামর্শ করিয়া আমি কিছু আহারীয় এবং পানীয় আনিয়া উহাকে দিবার উদ্যোগ করিতেছি, এরূপ সময়ে ওসমান সাহেব তাহা জানিতে পারিয়া, সেই সকল দ্রব্য আমার হস্ত হইতে কাড়িয়া লইয়া দূরে নিক্ষেপ করিলেন, ও আমাকে যৎপয়োনান্তি গালি দিয়া পুনরায় সেই গৃহের তালা বন্ধ করিয়া দিলেন। এই ব্যাপার দেখিয়া আমার মনে নিতান্ত কষ্ট হইল। আমি গিয়া গোফুর মিঞার নিকট এই কথা বলিলে, কোথায় তিনি তাহার প্রতিবিধানের চেষ্টা করিবেন, না তাঁহার পরিবর্তে আমাকে সহস্র গালি প্রদান করিয়া, তাঁহাদিগের বিনা, অনুমতিতে আমি সেই গৃহের দরজা খুলিয়াছিলাম বলিয়া আমাকে চাকরী হইতে জবাব দিলেন, এবং তদখেই আমাকে তাঁহা, লিগের বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিলেন।
কি ভয়ানক! কি পৈশাচিক ব্যবহার! এই ব্যক্তি ও তাহার পোষকতাকারী ঘরবানের সাক্ষ্য যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে সেই যুবতীকে অনশনে রাখিয়া, ইচ্ছা-পূৰ্ব্বক তাহাকে যে হত্যা করিয়াছ, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। যাহাদিগের দ্বারা এরূপ কাৰ্য্য হইতে পারে, তাঁহারা কোনরূপেই দয়ার পাত্র নহে। আমার বিবেচনায় এরূপ প্রকৃতি-বিশিষ্ট লোকের উপর দয়া প্রকাশ করিলে ঈশ্বর তাহার উপর অসন্তুষ্ট হন। গোফুর খাঁ! তোমার বৃদ্ধ বয়স দেখিয়া, এবং তোমার পূর্ব-চরিত্র শ্রবণ করিয়া আমি পূর্বে মনে করিয়াছিলাম, এরূপ মোকদ্দমায় যদি কেহ দয়ার পাত্র হয়, তাহা তুমি। কিন্তু এখন আমি দেখিতেছি, দস্যু তস্করকে দয়া করা যাইতে পারে, মনুষ্য হত্যাই যাহাদিগের জীবিকা, তাহাদিগকেও দয়া করা যাইতে পারে, তথাপি তোমার উপর সে দয়া প্রকাশ করিতে নাই। তোময়া ইচ্ছা করিয়া যেরূপ ভয়ানক অপরাধ করিয়াছ, তাহার প্রকৃত দণ্ড আমাদিগের আইনে নাই। তোমাদিগের জাতীয় রাজার রাজত্বকালে যেরূপ কুকুর দিয়া খাওয়াইয়া ও ক্ষতস্থানে লবণ নিক্ষিপ্ত করিয়া মারিয়া ফেলিবার নিয়ম ছিল, আমার বিবেচনায় তোমরা সেইরূপ দণ্ডের উপযুক্ত। কিন্তু সেরূপ দণ্ড যখন আমাদিগের আইনে নাই, তখন আমাদিগের আইনের চরম দণ্ড আমি তোমাদিগের উপর বিধান করিলাম। যে পর্যন্ত তোমরা না মরিবে, সেই পৰ্য্যন্ত তোমাদিগের উভয়কেই ফাঁসিকাষ্ঠে লটুকাইয়া রাখা হইবে।
