দারোগা। আমি ত কোন দোষ দেখিতেছি না।
হোসেন। মনে করুন, যে সকল কথা আমি প্রকৃত বলিয়া এখন বিশ্বাস করিতেছি, ও আপনি জানিতে চাহেন বলিয়া, আপনাকে যাহা বলিতে প্রবৃত্ত হইতেছি, সে সকল কথা আবশ্যকমত অস্বীকার করিলেও, আমি নিষ্কৃতি পাইব না।
দারোগা। আপনার নিষ্কৃতি না পাইবার কারণ কি?
হোসেন। আমি যদি অস্বীকার করি, তাহা হইলে যে সকল লোকের সম্মুখে আমি এখন সেই সকল কথা বলিতেছি, আবশ্যক হইলে সেই সকল লোকের দ্বারা আপনি উহা অনায়াসেই প্রমাণ করিতে সমর্থ হইবেন।
দারোগা। সেই সকল কথা আইনমত, ওরূপে প্রমাণ হইতে পারে না।
হোসেন। প্রমাণ হউক, বা না হউক, যদি আপনি নিতান্তই অবগত হইতে চাহেন, তাহা হইলে কাহারও সম্মুখে আমি সেই সকল কথা কহিব না। একাকী শুনিতে চাহেন, ত আমি বলিতে প্রস্তুত আছি।
দারোগা। আর যদি আমি আবশ্যকমত আপনাকে সাক্ষী স্থির করি, তাহা হইলে আপনি কি করবেন? আপনি এখন আমাকে যাহা বলিবেন, তখনও আপনাকে তাহাই বলিতে হইবে।
হোসেন। তাহা বলিব কেন? আবশ্যক হয়, সমস্ত কথা আমি অনায়াসেই অস্বীকার করিতে পারিব।
সম্পূর্ণ।
» ঘর-পোড়া লোক – ২য় বা মধ্যম অংশ
ঘর-পোড়া লোক (মধ্যম অংশ) (দারোগার দপ্তর ৭৫ম সংখ্যা)
(অর্থাৎ পুলিসের অসৎ বুদ্ধির চরম দৃষ্টান্ত!)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। আষাঢ়।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.
ঘর-পোড়া লোক।
(মধ্যম অংশ)
প্রথম পরিচ্ছেদ।
হোসেনের কথা শুনিয়া দারোগা সাহেব কহিলেন, আপনি কি অবস্থা শুনিয়াছেন বলুন দেখি, আমিও শ্রবণ করি।
বোগা সাহেবের কথার উত্তরে হোসেন কহিল, ওসমানের চরিত্র আপনি উত্তমরূপেই অবগত আছেন, এবং তাহার চরিত্র সম্বন্ধে আপনি যাহা কহিলেন, তাহার একবিন্দুও মিথ্যা নহে। যে মৃতদেহ গোফুর খাঁর বাড়ীতে পাওয়া গিয়াছে, তাহা যে হেদায়েতের কন্যার মৃতদেহ, সে সম্বন্ধে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। শুনিয়াছি, সেই কন্যাটা বেশ রূপবতী ছিল। তাহার রূপের কথা জমে ওসমানের কর্ণগোচর হইল। যুবতী রূপবতী স্ত্রীলোকের কথা শুনিয়া তিনি আর কোনরূপে স্থির থাকিতে পারিলেন না, তাহার নিকট ক্রমে লোকের উপর লোক পাঠাইয়া, তাহাকে কুপথগামিনী করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। ওসমানের প্রস্তাবে সে কোনরূপেই প্রথমে স্বীকৃত হয় নাই; কিন্তু অনেক চেষ্টার পর অর্থের লোভে ক্রমে সে আপন ধৰ্ম্ম বিক্রীত করিতে সম্মত হইল। যে সময় হেদায়েৎ কাৰ্যোপলক্ষে স্থানান্তরে গমন করিয়া
ছিলেন, সেই সময় একরাত্রিতে ওসমান একখানি পাকী পাঠাইয়া তাহাকে আপন বাড়ীতে আনয়ন করেন। প্রায় সমস্ত রাত্রি তাহাকে আপনার বৈঠকখানায় মাখিয়া, অতি অলমাত্র রাত্রি অবশিষ্ট থাকিতে, সেই পাল্কী করিয়া তাহাকে পুনরায় আপন বাড়ীতে পাঠাইয়া দেন। পরদিবস রাত্রিতে পুনরায় পাল্কী করিয়া
তাহাকে আপন বৈঠকখানায় আনয়ন করেন। সেই সময় গোফুর খাঁ বাড়ীতে ছিলেন না, কানপুরে ছিলেন। যে সময় ওসমান সেই স্ত্রীলোকটাকে লইয়া আপন বৈঠকখানায় আমোদ প্রমোদে উন্মত্ত ছিলেন, সেই সময় হঠাৎ গোফুর খাঁ বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হন। পাছে পিতা তাঁহার এই সকল বিষয় জানিতে পারেন, এই ভয়ে ওসমান তাঁহার বৈঠকখানার সম্মুখে একটা কুঠারীর ভিতর উহাকে লুকায়িত ভাবে রাখিয়া দিয়া সেই গৃহের তালাবদ্ধ করিয়া দেন। তৎপরে তাহার একজন অনুচরকে কহেন যে, তাঁহার পিতা যেমন এদিক ওদিক করিবেন, বা বাড়ীর ভিতর গিয়া শয়ন করিবেন, সেই সময় সেই স্ত্রী লোকটীকে সেই গৃহ হইতে বাহিরে আনিয়া, পাক্কী করিয়া তাহার বাড়ীতে যেন পাঠাইয়া দেওয়া হয়, এবং পাঠাইবার সময় সেই স্ত্রীলোকটাকে যেন বলিয়াও দেওয়া হয় যে, বৃদ্ধ কানপুরে গমন করিলে পুনরায় তাহাকে আনয়ন করা বাইবে।
অনুচর ওসমানের প্রস্তাবে সম্মত হন, এবং কহেন যে, একটু অবকাশ পাইলেই তিনি তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিবেন। অনুচর ওসমানের প্রস্তাবে সম্মত হইলেন বটে, কিন্তু কাৰ্যে তাহা করিয়া উঠিলেন না। পরদিবস প্রাতঃকালে ওসমান তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলে, তিনি মিথ্যা কথা কহিলেন।
তিনি যে তাহাকে পাঠাইতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন, এ কথা না। ধলিয়া, কহিলেন যে, গত রাত্রিতেই তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে। অনুচর যে তাহার কোনরূপ অভিসন্ধি বশতঃ এইরূপ মিথ্যা কথা কহিলেন, তাহা নহে; মনে করিলেন, উহাকে পাঠাইয়া দেওয়া হয় নাই, এই কথা জানিতে পারিলে, পাছে ওসমান তাহার উপর অসন্তুষ্ট হন। এই ভয়ে তিনি মিথ্যা কথা কহিলেন। তখন তিনি মনে মনে স্থির করিলেন যে, যেরূপ উপায়ে হউক, এখনই তাহাকে তাহার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিবেন। সেই সময় ওসমান অপর একটী কাৰ্য্যোপলক্ষে তাহাকে স্থানান্তরে প্রেরণ করেন। তিনিও সেই কাৰ্যোপলক্ষে এ দিকের কাৰ্য একবারে ভুলিয়া যান। অথচ ওসমানের বিশ্বাস যে, সেই স্ত্রীলোকটী তাহার বাড়ীতে গমন করিয়াছে; সুতরাং সেই স্ত্রীলোকটী গৃহের ভিতর যে বদ্ধ আছে, এ কথা আর কাহারও মনে হয় নাই, বা সেই ঘর খুলিবারও কোন প্রয়োজন উপস্থিত হয় নাই। এইরূপে অনাহারে এবং তৃষ্ণায় উহার মৃত্যু ঘটে। পরিশেষে আপনি বাড়ীর সমস্ত স্থান অনুসন্ধান করিতে করিতে, যখন সেই ঘরের দরজা খোলেন, তখন সেই মৃতদেহ বাহির হইয়া পড়ে। এই ব্যাপার দেখিয়া তখন ওমানের সমস্ত কথা স্মরণ হয়, এবং বুঝিতে পারেন যে, তাহার অনুচরের মিথ্যা কথার নিমিত্ত তাহার কি সর্বনাশ ঘটিল! গোফুর খাঁ ইহার ভাল মন্দ কিছুই জানেন না; সুতরাং এই অবস্থা দেখিয়া তিনি একবারে হতজ্ঞান হইয়া পড়েন। আমি যতদুর শুনিয়াছি, ইহাই প্রকৃত ঘটনা। আমি অকপটে আপনার নিকট যাহা বলিলাম, তাহা কিন্তু এখন অন্যরূপ ঘটনা হইয়া পড়িয়াছে।
