এই কথা শুনিয়া আগন্তুক চতুর্দিক অন্ধকার দেখিল, এবং উঁহাদিগের সকলের ভাব-গতি দেখিয়া অনন্যোপায় হইয়া সেই দ্রব্য গ্রহণ করিতে অসম্মত হই; কিন্তু যখন দেখিল, সেই দ্রব্য গ্রহণ না করিলে তাহার আর উপায় নাই, তখন তাহার নিকট যে সাত টাকা ছিল, তাহা প্রদান করিয়া পরিশেষে অব্যাহতি পাইল। আর যদি সে একটু উগ্রমূর্তি ধারণ করিয়া সেই টাকা প্রদান করিতে অসম্মত হইলে, তাহা হইল সেই দোকানের সমস্ত লোক একত্র হইয়া বল-পূৰ্ব্বক তাহার নিকট যে কিছু অর্থ পাইল, তাহা কাড়িয়া লইয়া তাহাকে সেই স্থান হইতে বহিস্কৃত করিয়া দিল। অনন্যোপায় হইয়া সে তখন আস্তে আস্তে আপন দেশ অভিমুখে প্রস্থান করিল। আর এইরূপে ঠকিয়া কোন ব্যক্তি যদি কলিকাতাবাসী কোন লোকের পরামর্শ মত থানায় গিয়া নালিশ করিলেন, তাহা হইলে পুলিস-কর্ম্মচারীও তাহার অভিযোগ শ্রবণ করিয়া এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইলেন বটে; কিন্তু কাৰ্যে কিছুই করিয়া উঠিতে পারিলেন না। সেই পল্লীগ্রাম-নিবাসী লোকটীর সপক্ষে একটীমাত্র ও প্রমাণ সংগৃহীত হইল না। অধিকন্তু জুয়াচোরগণ এক মিলিত হইয়া সেই নিলাম-কার জুয়াচোরের পক্ষ সমর্থন করিয়া, ফরিয়াদীর বিপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিল, ও ইহাই প্রতিপন্ন করিয়া দিল যে, দোকানদারের কিছুমাত্র অপরাধ নাই; সমস্ত দোষই সেই মফঃস্বল-বাসীর।
এইরূপে কত নিরীহ মফঃস্বলবাসী-লোক সুলভ মূল্যে নিলামে দ্রব্যাদি ক্রয় করিতে গিয়া নিত্য যে কত জুয়াচোরের হস্তে পড়িতে ছেন, তাহার আর সংখ্যা নাই।
ইহা ব্যতীত মফঃস্বলবাসীগণকে ঠকাইয়া লইবার নিমিত্ত কোন কোন জুয়াচার নিলামের ন্যায় আর এক প্রকার জুয়াচুরির দোকান খুলিয়া বসিয়া আছে, এবং দোকানের ভিতর প্রবেশ করিয়া নিত্য কত লোককে যে ঠকাইতেছে, তাহার ইয়ত্তা নাই। এই দোকানও নিলামের দোকান-সদৃশ; দোকানের সম্মুখে নিলামের ন্যায় ঘন্টা বাজিয়া থাকে। সেই দোকানে নিলাম হইতেছে ভাবিয়া, মফঃস্বলবাসীগণ প্রায়ই সেই দোকানে প্রবেশ করিয়া থাকেন। সেই দোকানের মধ্যভাগে পাতিত একটা টেবিলের উপর বা দোকানের মধ্যস্থিত গ্লাসকেসের মধ্যে নানা প্রকারের বহুমূল্য দ্রব্য সকল সাজান আছে। উঁহাদিগের কোন দ্রব্যেরই দাম পচিশ টাকার কম নহে, বরং একশত দুইশত টাকা পর্যন্ত হইতে পারে। সেই সকল দ্রব্যের প্রত্যেকগুলিরই উপর কাগজের টিকিটে একটী একটী নম্বর লেখা আছে। যিনি দোকানের অধিকারী বলিয়া পরিচয় প্রদান করিয়া থাকেন, তাহার সম্মুখে একটী খোলা বাক্সের মধ্যে কতকগুলি সাদা কার্ড আছে, উহাতেও একটী একটী নম্বর লেখা আছে। তাহার সম্মুখে পূৰ্ব্ব-বর্ণিত নিলামের দোকানের ন্যায় সেই দলের অপর কতকগুলি জুয়াচোর ক্রেতারূপে দণ্ডায়মান হয়। ইহাদিগের মধ্যে আছে-এমন জাতিই নাই। সাহেব আছেন, ইহুদি আছেন, মুসলমান আছেন, বাঙ্গালি আছেন, এক কথায় অনেক জাতির অনেক লোক সেই স্থানে এরূপ ভাবে দেখিতে পাওয়া যায় যে, তাহাদিগের অবস্থা বা চালচলন দেখিয়া, তাহাদিগের সহিত আলাপ পরিচয় করিয়া, কেহই বুঝিয়া উঠিতে পারেন না যে, উহার জুয়াচোর।
আগন্তুক দোকানের মধ্যে প্রবেশ করিবামাত্রই একজন নিজের পকেট হইতে একটী টাকা বাহির করিয়া সেই দোকানদারের হস্তে প্রদান করিল। দোকানদার তাহার সম্মুখস্থিত সেই খোলা কার্ডের বাক্সটী দেখাইয়া দিয়া কহিল, উহার ভিতর হইতে আপনি একখানি কার্ড বা টিকিট গ্রহণ করুন। তিনি তাহার ভিতর হইতে একখানি টিকিট গ্রহণ করিয়া সেই দোকানদারের হতে প্রদান করিলেন। দোকানদার সেই টিকিটের দিকে একবার লক্ষ্য করিয়া কহিল, আপনার টিকিটের নম্বর এক হাজার দুইশত দুই। এই নম্বর সংযুক্ত যে দ্রব্য এই দোকানে সাজান আছে, তাহা আপনার। এই কথা শুনিয়া তিনি দোকানের ভিতর অনুসন্ধান করিয়া দেখিতে লাগিলেন, কোন্ দ্রব্যের উপর এক হাজার দুইশত দুই নম্বর আছে। অমনি দোকানদারের আর একজন সাহায্যকারী সেই টেবিলের উপর হইতে একটা সুবর্ণ-নির্মিত একটী ঘড়ি বাহির করিয়া দিল ও কহিল, ইহাই এক হাজার দুইশত দুই নম্বরের দ্রব্য। এই কথা বলিয়া সেই ঘড়িটী তাহার হস্তে প্রদান করিল ও কহিল, আপনার অদৃষ্ট খুব ভাল, এক টাকায় আপনি দুইশত টাকা মূল্যের ঘড়িটা পাইলেন।
ইহার পরই আর একজন আর একটা টাকা দিয়া একখানি টিকিট ক্রয় করিল। সেও একখানি বড়গোছের গেলাস বা আয়না পাইল; তাহার মূল্যও চল্লিশ টাকার কম নহে।
আগন্তুক ব্যক্তি ইহা দেখিয়া, এবং মধ্যে মধ্যে ক্রেতারূপী জুয়াচোরগণের প্রলোভন-যুক্ত বাক্য শুনিয়া তিনিও একটী টাকা বাহির করিয়া একখানি টিকিট ক্রয় করিলেন; কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, তিনি মূল্যবান্ দ্রব্যের পরিবর্তে এক পয়সা মূল্যের একটা পেসিল পাইলেন। জুয়াচোরগণের প্রতারণায় পড়িয়া পুনরায় আর একটী টাকা বাহির করিলেন, সে বারে-পাইলেন এক বাণ্ডিল সুচি। তাহার নিকট আঠারটী টাকা ছিল, এইরূপে তাহার অনিচ্ছাসত্বে, অথচ জুয়াচোরগণের প্রতারণায় পড়িয়া ক্রমে ক্রমে তিনি তাহার সেই আঠার টাকাই সেই স্থানে অর্পণ করিলেন; কিন্তু তাহার পরিবর্তে তিনি আঠার পয়সা মূল্যের দ্রব্য পাইলেন কি না, সন্দেহ। যে দোকানে এইরূপ কাণ্ড সকল অহরহ চলিতেছে, জুয়াচোরগণ সেই দোকানের নাম দিয়াছে–মনোরম সখের বাজার। (Fancy Bazar.)।
