এইরূপে মফঃস্বলের কত লোক কলিকাতায় আসিয়া যে জুয়া চোরগণের হস্তে পতিত হইতেছে, তাহার সংখ্যা করা নিতান্ত সহজ নহে।
.
বিবাহে জুয়াচুরি।
আজকাল ব্রাহ্মণ ও কায়স্থগণের মধ্যে কন্যার বিবাহ যে কি ভয়ানক ব্যাপার হইয়া দাড়াইয়াছে, তাহা আমার সবিশেষ করিয়া বর্ণন করিবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। কারণ, পাঠকগণের মধ্যে অনেকেই এ বিষয়ে সবিশেষরূপে ভুক্ত-ভোগী।
একটী কন্যার বিবাহ দিতে হইলে সময় সময় কন্যা-কর্তাকে তাহার ভদ্রাসন বাটী পৰ্যন্ত বিক্রয় করিতে হয়। সমাজের এরূপ অবস্থা যে পূর্বাপর ছিল, তাহা নহে; পাশ্চাত্য-শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে যে ইহা আমাদিগের দেশে প্রচারিত হইতেছে, তাহা কেহ কেহ অনুমান করিয়া থাকেন। পাশ্চাত্যগণের কন্যার বিবাহে একটী পন্থসামাত্রও ব্যয় নাই, ইহা যখন সৰ্ব্ব-বিদিত, তখন পাশ্চাত্য-শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কেন এরূপ প্রথা আমাদের দেশে প্রচলিত হইল, ইহাই আশ্চর্য্য!
যাহারা পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শিক্ষিত, তাঁহার সেইরূপ বা ততোধিক শিক্ষিত ব্যক্তির হস্তে তাহাদিগের কন্যাগণকে প্রদান করিতে যত্নশীল হন। সুতরাং যে সকল বালক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি প্রাপ্ত হন, সেই সকল বালকের উপরই তাহাদিগের প্রধান লক্ষ্য হয়। এইরূপে দুই চারিজনের লক্ষ্য একটী বালকের উপর পতিত হইলেই সেই বালকের পিতা মাতাও সেই সুযোেগ অবলম্বন করিয়া আপনাদিগের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিয়া থাকেন। এরূপ অবস্থায় অর্থের প্রতিযোগিতা ভিন্ন কেহই সেই বালককে হস্তগত করিতে পারেন না। এই সকল কারণেই যে বালক বিশ্ববিদ্যালয়ের যেরূপ উচ্চ পদবী প্রাপ্ত হইয়াছে, তাহার বিবাহে সেইরূপ পরিমাণে অর্থ গ্রহণ করা হইয়া থাকে। এইরূপ অবস্থা হইতেই ক্রমে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত সকল বালকেরই প্রায় একরূপ মূল্য (?) স্থির হইয়া পড়িয়াছে, এবং সময় সময় ইহার মধ্যে অনেক প্রকার জুয়াচুরি হইতেও আরম্ভ হইয়াছে। এ সম্বন্ধে পাত্র ও কন্যা উভয় পক্ষেরই একটা একটী জুয়াচুরির বিষয়, পাঠকগণকে সতর্ক করিবার নিমিত্ত নিম্নে বর্ণিত হইল।
(ক) কন্যাপক্ষের জুয়াচুরি।
কন্যার পিতা রামরতন, এই কলিকাতার একজন গৃহস্থ। টাকা-কড়ি অধিক নাই, কোনরূপে সংসারযাত্রা নির্বাহ করিয়া থাকেন মাত্র। নিজের একখানি বাড়ী আছে, তাহার কন্যার বয়ঃক্রম প্রায় বার বৎসর হইল; কিন্তু এ পর্যন্ত তাহার বিবাহের কিছুমাত্র স্থির করিয়া উঠিতে পারেন নাই। অথচ তাহার ইচ্ছা যে, একটী শিক্ষিত, বা পিতামাতার কিছু সংস্থান আছে, এরূপ একটী পাত্রের হস্তে তাহাকে অর্পণ করেন। তিনি অনেক দিবস পর্যন্ত এইরূপ একটী পাত্রের অনুসন্ধান করিয়া নিতান্ত জালাতন হইয়া পড়িয়াছিলেন। কারণ, সুবিধা মত সেরূপ পাত্র তিনি জুটাইতে পারিতেছিলেন না। যদিও দুই একটীর সন্ধান পাইতেছিলেন, কিন্তু অর্থাভাবে তাহার পিতামাতার নিকট তিনি অগ্রসর হইতে সমর্থ হইতেছিলেন না। সেইরূপ পাত্রের পিতা মাতার নিকট গমন করিয়া বিবাহের কথা পাড়িতেন সত্য; কিন্তু টাকার ফর্দ দেখিয়া আস্তে আস্তে তিনি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিতেন। পাত্রের পিতামাতা যে পরিমিত অর্থ প্রার্থনা করিতেন, তাহার ভদ্রাসন বাটী পৰ্যন্ত বিক্রয় করিয়া দিলেও, তাহাতে কুলাইত না।
রামরতন যখন বুঝিতে পারিলেন, সৎপথ অবলম্বন করিয়া কোনরূপেই আপন কন্যার নিমিত্ত পাত্রের সন্ধান করিয়া উঠিতে পারিলেন না, তখন অসৎপথ অবলম্বন করিতেও তিনি আর কোনরূপে কুণ্ঠিত না হইয়া একটা ভাল পাত্রের অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন।
এইরূপে দিন কয়েক অনুসন্ধানের পর, তিনি জানিতে পারি লেন যে, তিনি যেরূপ একটী পাত্রের অনুসন্ধান করিতেছেন, তাহা অপেক্ষাও একটী উৎকৃষ্ট পাত্র এক স্থানে আছে; কিন্তু সেই পাত্রের পিতামাতা যেরূপ ভাবে অলঙ্কার-পত্র প্রার্থনা করিয়া থাকেন, তাহাতে কোন পাত্রীরই পিতামাতা সেই অলঙ্কারাদি দিতে স্বীকৃত হইতে পারেন না। সেই জন্যই আজ পৰ্য্যন্ত তাহার বিবাহ হয় নাই।
রামরতন এই সংবাদ পাইয়া সেই পাত্রের বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলেন। তাহার পিতার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া তাহার কন্যার বিবাহের কথার উল্লেখ করিয়া কহিলেন, আমি শুনি আছি, আপনি আপনার পুত্রের বিবাহের নিমিত্ত একটী সুরূপা পাত্রীর অনুসন্ধান করিতেছেন। আমার একটী কন্যা আছে, আমার ইচ্ছ, আমি আমার সেই কন্যাটীকে আপনার পুত্রের হস্তে প্রদান করি।
পিতা। উত্তম কথা। আপনার কন্যাটী কেমন? কারণ, আমি সুরূপা কন্যা না পাইলে, আমার পুত্রের বিবাহ দিতে অভিলাষী নহি।
রামরতন। একথা আমি পূৰ্বেই শুনিয়াছি। তাই আমি সাহস করিয়া আপনার নিকট আসিয়া উপস্থিত হইয়াছি। পিতার নিকট তাহার কন্যামাত্রই সুশ্রী; আমার মেয়ে ভাল একথা সকলেই বলিয়া থাকেন। অতএব আপনি আমার কন্যাটীকে একবার স্বচক্ষে দর্শন করুন, তাহা হইলে আপনি বুঝিতে পারিবেন যে, আমার কন্যা আপনার পুত্রের উপযুক্ত কি না?
পিতা। দেখুন মহাশয়! কন্যা দেখিতে দেখিতে আমি জ্বালাতন হইয়া পড়িয়াছি। সকলেই আসিয়া বলেন, তাঁহার কন্যা খুব সুশ্রী; কিন্তু যখন দেখিতে যাই, তখন দেখি তিনি সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা কহিয়াছেন। এইরূপে এ পর্যন্ত আমি যত কন্যা দেখিয়াছি; তাহাদের একটীও প্রায় আমার মনোমত হয় নাই। দুই একটী যাহা মনোমত হয়, তাহার পিতামাতা আমার পুত্রের উপযুক্ত অর্থ প্রদান করিতে চাহেন না। এত ব্যয় করিয়া আমি আমার পুত্রের লেখা পড়া শিখাইয়াছি, সে এবার বি-এ, পাস করিয়া এম-এ, পড়িতেছে। তদ্ব্যতীত এই কলিকাতা শহরে আমার এত বড় বাড়ী, চাকরী না করিলেও রাজার হালে তাহার দিন অতিবাহিত হইবে। এরূপ পাত্রের হস্তে কন্যা দান করা কি যাহার তাহার অদৃষ্টে ঘটিয়া উঠে? কন্যার যে কখনই কষ্ট হইবে না, রাণীর মত সে দিন অতিবাহিত করিতে পারিবে, ইহা কি কন্যার পিতামাতার কম আনন্দের বিষয়? এরূপ অবস্থা অবগত হইয়াও তাঁহারা কিছুমাত্র খরচ করিয়া কন্যা দান করিতে চাহেন না, ইহা কি কম দুঃখের বিষয়!
