যে পিয়নের সহিত উঁহাদিগের পরামর্শ আছে, সে বিলি করিবার নিমিত্ত ডাকঘর হইতে পত্র পাইবার পরই, একটা নির্দিষ্ট স্থানে গমন করে। সেই স্থানে তাহাদিগের দলস্থিত কোন
কোন ব্যক্তির সহিত সাক্ষাৎ হইলে, তাহার হস্তে সেই পিয়ন তাহার নিজের নির্বাচন অনুসারে দুই একখানি পত্ৰ দিয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করে।
যাহার হস্ত দিয়া প্রত্যহ শত শত হুণ্ডি সম্বলিত পত্র বিলি হয়, তাহার হস্তে হুণ্ডি-পূরিত ধাম আসিয়া উপস্থিত হইলেই, সে অনায়াসেই অনেকটা উপলব্ধি করিয়া লইতে পারে যে, ইহার ভিতর হুণ্ডি আছে, কি না। সুতরাং সেইরূপ ভাবের দুই তিনখানি পত্র বাছিয়া লইয়া পূর্বোক্ত দলস্থিত কোন ব্যক্তির হস্তে প্রদান করিয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করে। পিয়ন সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলে পর, সেই ব্যক্তি সেই পত্র গুলি সবিশেষ সতর্কতার সহিত খুলিয়া দেখে যে, উহার ভিতর প্রকৃতই হুণ্ডি আছে কি না, এবং যদি হুণ্ডি থাকে, তাহা হইলে যে গদি হইতে উহার টাকা আনিতে হইবে, সেই স্থান হইতে সেই টাকা সহজেই প্রাপ্ত হইবার সম্ভাবনা কি না। এ সকল বিষয় বিবেচনা করা, আমাদিগের পক্ষে যেরূপ দুরূহ বলিয়া অনুমান কইতেছে, উঁহাদিগের পক্ষে কিন্তু সেরূপ নহে। কারণ, বড় বাজারের ভিতর যত মহাজনের হুণ্ডির কারবার আছে, তাহাদের সমস্তই তাঁহারা অবগত আছে, এবং কাহার গদিতে তাহাদিগের পরিচিত লোক আছে, ও কাহার গদি হইতে সহজেই সেই টাকা বাহির হইবার সম্ভাবনা, তাহাও তাঁহারা অনায়াসেই বুঝিতে পারে। পিয়ন প্রদত্ত পত্র খুলিয়া যদি তাহার ভিতর তাহাদিগের মনের মত হুণ্ডি প্রাপ্ত হয়, তাহা হইলে তাহা উঁহারা গ্রহণ করিয়া সেই পত্র নষ্ট করিয়া ফেলে। অন্যথা সেই সকল পত্র পূর্বের ন্যায় বন্ধ করিয়া পরিশেষে সেই পিয়নের হস্তেই প্রত্যর্পণ করে। তৎপরে পিয়নও সেই পত্র গুলি যথাস্থানে বিলি করিয়া দেয়।
পূৰ্ব্ব-কথিত উপায়ে একখানি হুণ্ডি বাছিয়া লইতে পারিলেই, তাহাদিগের একমাস বা সময় সময় দুই তিনমাসের কার্য্য হইয়া যায়। সুতরাং সেই সময়ের মধ্যে তাহাদিগকে সেইরূপ কার্যে আর হস্তক্ষেপ করিতে হয় না।
পূর্ব্ব-কথিত উপায়ে একখানি হুণ্ডি তাহাদিগের হস্তগত হইলে সেই হুণ্ডি যে কত টাকার, কেবল যে তাহাই তাহার অবগত হইতে পারে, তাহা নহে। কারণ, সেই হুণ্ডির সহিত বে পুত্ৰ থাকে, তাহা পড়িয়া উহা কে পাঠাইতেছে, কোথা হইতে আসিতেছে, কোন্ স্থানে ও কয়দিবস পরে ইহার টাকা পাওয়া যাইবে, তাহার সমস্ত অবস্থা অবগত হইয়া সেই দলস্থিত একটা লোক সেই হুণ্ডিসহ সেই গদিতে গিয়া উপস্থিত হয়। পরে সেই জুণ্ডি সেই স্থানে প্রদান করিলে, তথাকার নিয়ম অনুযায়ী যে টাকা পাইবার কথা, তাহা অনায়াসেই পাইয়া থাকে। এইরূপ উপায়ে একখানি হুণ্ডির টাকা প্রাপ্ত হইতে পারিলে, তাহাদিগের মনো বা উত্তমরূপে পূর্ণ হইয়া থাকে। কারণ, এক একখানি হুণ্ডিতে সময় সময় দশ হাজার পর্যন্ত টাকাও পাওয়া যায়। এইরূপে অসৎ উপায়ে জুয়াচোরগণ যে টাকা বাহির করিয়া লয়, তাহা তাহাদিগের মধ্যে নিয়ম অনুসারে সকলে মিলিয়া বণ্টন করিয়া লয়। ডাকঘরের পিয়নের অংশ, প্রায় অপর সকলের অংশ হইতে অধিক পরিমাণে হইয়া থাকে। এইরূপে একখানি হুণ্ডির টাকা তাহার হস্তগত করিলে পর, কিছু দিবস পৰ্য্যন্ত আর এরূপ কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করে না। যে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে হুণ্ডি পাঠাইয়াছেন, যখন তিনি জানিতে পারেন, তাঁহার মুণ্ডির টাকা বাহির হইয়া গিয়াছে, অথচ যাহার পাইবার কথা, তিনি পান নাই, তখন ইহার অনুসন্ধান আরম্ভ হয়, এবং ক্রমে এই জুয়াচুরির বিষয় প্রকাশিত হইয়া পড়ে। কিন্তু প্রায়ই প্রকৃত দোষী ধরা পড়ে না। এইরূপে হুণ্ডির জুয়াচোর কয়েকজন, কয়েকজন পিয়নের সহিত কয়েকবার আমা কর্তৃক ধৃত হয়, এবং দীর্ঘকালের নিমিত্ত কারা বাসে প্রেরিত হইয়াছে; কিন্তু অদ্যাপিও এই জুয়াচুরি বন্ধ হয় নাই।
.
নিলামে জুয়াচুরি।
মফঃস্বলবাসী প্রায় সমস্ত লোকেরই বিশ্বাস যে, সময় সময় কলিকাতায় নিলামে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে অনেক মাল বিক্রীত হইয়া থাকে। বাস্তবিক সময়ে সময়ে কোন কোন দ্রব্য নিলামে প্রকৃতই সুলভ মূল্যে বিক্রীত হয়!
জুয়াচুরিই যাহাদিগের ব্যবসা, তাঁহারা কি উপায়ে লোক ঠকাইতে পারিবে, রাত্রিদিন কেবল সেই চিন্তাতেই ঘূরিয়া বেড়ায়। সুলভ মূল্যে নিলামে মাল বিক্রয় হয়, ইহাই মফঃস্বলবাসীগণের বিশ্বাস। এই কথা যেমন জুয়াচোরগণ জানিতে পারিল, অমনি তাঁহারা সহরের মোড়ে মোড়ে এক একটী নিলামের দোকান খুলিয়া বসিল। এইরূপ নিলামের দোকান সহরের মধ্যে এক সময় অনেক গুলি স্থাপিত হইয়াছিল; আজকাল যে সে সমস্ত গুলি একবারে অন্তর্হিত হইয়াছে, তাহা নহে। এই সহরের স্থানে স্থানে এখনও সেইরূপ এক একটী নিলামের দোকান বর্তমান আছে, এবং প্রায়ই তাঁহারা মফঃস্বলবাসী কোন ব্যক্তিকে দেখিতে পাইলে, তাহার নিকট হইতে কিছু না কিছু গ্রহণ করিয়া থাকে। উঁহাদিগের কার্যপ্রণালী এইরূপ;–
রাস্তার ধারে একটা দোকানের মধ্যে অনেকরূপ উত্তম উত্তম দ্রব্যাদি সজ্জিত থাকে। সেই দোকানের সম্মুখে একজন বসিয়া অনবরত ঘণ্টাধ্বনি করিতেছে। দোকানের মধ্যে এক ব্যক্তি সেই সকল দ্রব্যের মধ্যস্থিত কোন একটা দ্রব্য হস্তে লইয়া অপরে যে মূল্য বলিয়াছে, সেই মূল্য বারে বারে উচ্চারণ করিয়া উহার মূল্য-বৃদ্ধি করিবার চেষ্টা করিতেছে। অর্থাৎ একজন কহিল, এক টাকা যে ব্যক্তি সেই দ্রব্য বিক্রয় করিতে বসিয়াছে, সে উহার দাম এক টাকা এক টাকা বলিয়া, যে পর্যন্ত অপর কোন ব্যক্তি উহার অধিক দাম না বলিল, সেই পৰ্য্যন্ত অনবরত সেইরূপেই চীৎকার করিতে লাগিল। অপর কোন ব্যক্তি যেমন তাহার দাম কিছু বাড়াইয়া বলিল, বিক্রেতার সুরও সেইরূপ পরি বর্তিত হইল। এইরূপে যাহার দরের উপর অপর আর কেহ অধিক দাম প্রদান করিতে স্বীকৃত না হয়, সেই দ্রব্য তখন সেই ব্যক্তি তাহার কথিত মূল্যেই পাইয়া থাকে। ইহাই নিলামের পদ্ধতি। কিন্তু এ নিলাম সেই প্রকারের হইলেও, ইহার উদ্দেশ্য স্বতন্ত্র। এই স্থানে প্রকৃত ক্রেতা একজনও নাই, ক্রেতারূপে যে সকল ব্যক্তি দোকানের ভিতর দাঁড়াইয়া বিক্রেয় দ্রব্যের দাম বর্ধিত করিবার চেষ্টা করিতেছে, তাঁহারা সকলেই একদল-ভুক্ত-জুয়াচোর, কেহবা জুয়াচোরের চাকর। উঁহারা যেমন দেখিল, একজন পল্লীগ্রাম-নিবাসী নিরীহ লোক সেই দোকানের সম্মুখ দিয়া গমন করিতেছে, অমনি তাঁহারা চীংকারস্বরে নিলাম আরম্ভ করিয়া দিল। সেই আগন্তুক ব্যক্তি নিলামের প্রলোভনে ভুলিয়া যেমন দোকানের ভিতর প্রবেশ করিল, অমনি দেখিতে পাইল, একটী লোক প্রয়োজনীয় দ্রব্য—যাহার দাম পাঁচ টাকার কম নহে, তাহা পচ পয়সায় বিক্রয় করিতে বসিয়াছে। এক ব্যক্তি ডাকিল, ছয় পয়সা, অপরে কহিল, নয় পয়সা আগন্তুক ডাকিল, দশ পয়সা। তাহার পর হয় ত আর কেহই ডাকিল না, যদি ডাকিল, কেবল উহার দাম আর এক পয়সা বাড়াইয়া দিল। সেই ব্যক্তি যেমন বার পয়সা ডাকিল, অমনি সকলে চুপ করিল। সুতরাং সেই দ্রব্য যিনি সৰ্বশেষে ডাকিয়াছেন, তাহারই হইল। আগন্তুক সবিশেষ হৃষ্ট অন্তঃকরণে সেই দ্রব্যটী আপন হস্তে গ্রহণ করিয়া তাহার ব্যাগ হইতে বারটা পয়সা বাহির করিয়া দিল। ব্যাগ হইতে সেই পয়সা বাহির করিবার কালীন জুয়াচোরগণ দেখিয়া লইল, তাহার নিকট আর কত গুলি টাকা আছে। তাহার পরই উহার সহিত গোলযোগ আরম্ভ করিল, যদি উহার নিকট আর সাত টাকা থাকে, তাহা হইলে সেই দ্রব্য-বিক্রেতা বলিয়া উঠিল, কি মহাশয়! কেবল পয়সা বারটী দিলেন, টাকা কয়েকটা দিলেন না? আগন্তুক বিস্মিত হইয়া কহিল, সে কি মহাশয়। টাকা কিসের? উত্তরে বিক্রেতা কহিল, কেন, ওই দ্রব্য যে আট টাকা তিন আনায় বিক্রীত হইয়া গেল। আপনি কি ভাবি তেছেন যে, কেবল তিন আনায় আপনি ওই দ্রব্য প্রাপ্ত হইলেন? দোকানদারের এই কথা শুনিয়া, আগন্তুক একবারে বিস্মিত হইয়া পড়িল। দেখিল, ক্রেতারূপী জুয়াচোরগণও সেই দোকানদারে কথা সমর্থন করিয়া কহিল, দোকানদার মহাশয় যাহা কহিতেছেন, তাহা প্রকৃত। ওই দ্রব্যের বিট প্রথমেই আটটাকা হইতে আরম্ভ হইয়া আট টাকা তিন আনায় বিক্রীত হইয়াছে।
