অষ্টম পরিচ্ছেদ।
রসিকের কথাগুলি আমরা বিশেষ মনোযোগের সহিত শ্রবণ করিলাম। তাহার কথায় যদিও আমার কতক বিশ্বাস হইল; কিন্তু বুঝিলাম, বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় তাহার কথা একেবারে বিশ্বাস করেন নাই। তখন তিনি ক্রমে রসিককে নানাকথা জিজ্ঞাসা করিয়া তাহার খুড়ার বাসস্থান কোথায়, তাহার সঙ্গে আর কে কে আসিয়াছিল, তাহাদিগের বা বাড়ী কোথায় প্রভৃতি সমস্ত ব্যাপার জানিয়া লইলেন। সেই সকল বিষয়ে এরূপভাবে রসিককে প্রশ্ন করিলেন, যাহাতে রসিক কিছুমাত্রই বুঝিতে পারিল না যে, পুলিসের সন্দেহ এতক্ষণ পরে তাহাদিগের উপর পতিত হইয়াছে।
রসিক ও ভবকে তাহাদিগের বাড়ীতে রাখিয়া সময়মত আমরা সেইস্থান হইতে বহির্গত হইলাম। পথে আসিয়া দ্রুতগামী একখানি গাড়ী ভাড়া করিয়া তারণচন্দ্রের গ্রামাভি মুখে চলিলাম। সেই গ্রাম হাবড়া হইতে বহুদূরে নহে, কয়েক ক্রোশের মধ্যেই স্থাপিত।
গ্রামে গমন করিয়া তারণকে তাহার বাড়ীতেই পাইলাম। প্রথমে কোন কথা না বলিয়া উহাকে একেবারে বন্ধন করিলাম। তারণ নিতান্ত বিস্মিতের ন্যায় জিজ্ঞাসা করিল, কেন মহাশয় কি হইয়াছে, হঠাৎ আমাকে এরূপে বন্ধন করিতেছেন কেন?
কেন বন্ধন করিতেছি, তাহা তুমি জিজ্ঞাসা করিতেছ? কলিকাতায় কি কাৰ্য্য করিয়া আসিয়াছ, তাহা তোমার স্মরণ নাই? তোমার সমস্ত মন্ত্রণা বিফল হইয়াছে, রসিক সকল কথা বলিয়া দিয়াছে। বুঝিতেই ত পারিতেছ, রসিক যদি সকল কথা না বলিয়া দিবে, তাহা হইলে আমরা তোমার নাম কি প্রকারে জানিতে পারিব? এবং তোমার বাসা কিরূপে সন্ধান করিয়া লইব?
আমাদিগের কথা শুনিয়া তারণচন্দ্র একেবারে যেন মৃতবৎ হইয়া পড়িল। কিয়ৎক্ষণ তাহার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হইল, কোনরূপ বানিষ্পত্তি না করিয়া সেইস্থানেই বসিয়া পড়িল।
তারণের এইরূপ অবস্থা দেখিয়া আমাদিগের মনে আরও সাহস হইল। তখন পুনরায় তাহাকে কহিলাম, দেখ তারণ! যখন সমস্ত কথা প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছে, তখন তুমি আমাদিগকে আর মিথ্যা কষ্ট দিও না। অপহৃত দ্রব্যাদি সমস্ত এখনই আমাদিগের সম্মুখে আনিয়া উপস্থিত কর। নতুবা তোমার অদৃষ্টে যে কিরূপ দুঃখ আছে, তাহা আমি এখন কল্পনা করিয়াও ভাবিতে পারিতেছি না। আমাদিগের কথা শুনিয়া তারণচন্দ্র প্রথম প্রথম দুই একবার বলিল, আমি ইহার কিছুই জানি না, রসিক মিথ্যা করিয়া আমার নাম বলিয়া দিয়াছে। পরিশেষে কিন্তু ইচ্ছা করিয়া হউক, বা অনিচ্ছাসত্বেই হউক, তারণকে সকল কথা বলিতে হইল; তাহার সঙ্গে অপর কোন্ কোন্ ব্যক্তি ছিল, তাহাদিগের নামও করিয়া দিতে হইল। আর অপহৃত দ্রব্যাদি যাহা যেখানে রাখিয়াছিল, এক এক করিয়া তাহার সমস্তই বাহির করিয়া দিতে হইল। সেই সকল দ্রব্যের অধিকাংশই গ্রামের বাহিরে ময়দানের মধ্যে প্রােথিত করিয়া রাখা হইয়াছিল।
অপরাপর আসামীগণকে ধৃত করিয়া এবং অপহৃত সমস্ত দ্রব্য সঙ্গে লইয়া আমরা কলিকাতায় আসিলাম। আমা দিগের কাৰ্য দেখিয়া উৰ্দ্ধতম-কর্ম্মচারীরা, এবং পাড়া-প্রতি বেশী সকলে যেমন সন্তুষ্ট হইলেন, রসিকের মুখে তেমনি ভয় ও বিষাদের ছায়া পড়িল।
রসিক প্রথমে সমস্ত কথা অস্বীকার করিল। কিন্তু পরিশেষে কহিল, আমি কি করিব? খুড়া মহাশয়ের কুপরামর্শে পড়িয়াই আমি এই কাৰ্য্য করিয়াছি। এই কাৰ্য সম্পন্ন করিবার নিমিত্ত প্রায় দুই বৎসর হইতে আমরা ক্রমাগত চেষ্টা করিয়া আসিতেছি। কিন্তু এই বৃদ্ধার সাবধানতার নিমিত্ত কোনরূপেই কৃতকার্য হইতে পারিতেছি না। যে যে রাত্রিতে চুরি করিবার বন্দোবস্ত হইয়াছে, যখন যখন আমি আমার শয্যাত্যাগ করিবার বাসনা করিয়াছি, তখনই বৃদ্ধা জাগরিত হইয়াছে; অমনি আমা দিগের কার্যে ব্যাঘাতও পড়িয়াছে। যখন দেখিলাম, কোনরূপেই আমাদিগের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে পারিলাম না, তখন বাধ্য হইয়া আমাদিগকে এই শেষ উপায় উদ্ভাবন করিতে হইল। এই নিমিত্তই এই তৃতীয় সংখ্যক আসামীকে আমাদিগের দলে প্রবিষ্ট করাইতে হয়। ইনি ডাক্তারখানায় কৰ্ম্ম করেন, সুতরাং ইহার দ্বারা সহজেই ক্লোরাফরমের সংগ্রহ হইল। যখন দেখিলাম, বৃদ্ধা অচেতনবৎ নিদ্রিত হইয়া পড়িয়াছে। তখন শিশি হইতে কিয়ৎ পরিমাণ ক্লোরা ফরম লইয়া একখানি পূৰ্বসঞ্চিত রুমালে ঢালিয়া বৃদ্ধার নাসিকার নিকট রাখিলাম; ক্রমে বৃদ্ধা অজ্ঞান হইয়া পড়িল। তখন আমি গৃহের দরজা খুলিয়া বাহিরে গেলাম, সদর দরজা খুলিয়া যেখানে সকলে আমার অপেক্ষায় বসিয়াছিল, সেইস্থানে গমন করিলাম। আমার নিকট সমন্ত অবস্থা শুনিয়া উঁহারা আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গৃহের ভিতর প্রবেশ করিল। যে স্থানে লোহার সিন্ধুকের চাবি থাকিত, তাহা আমি জানিতাম; সেই বাক্স আমি উঁহাদিগকে দেখাইয়া দিলাম। পরিশেষে উঁহাদিগের সাধ্যমত সমস্ত দ্রব্য বাহির করিয়া প্রস্থান করিল। অপর রুমালখানিতে অতি সামান্য মাত্ৰ ক্লোরাফরম ঢালিয়া আমার নিকটে ফেলিয়া রাখিলাম, ইচ্ছা—যাহাতে আমারও সামান্য নেশা হয়। কারণ আমি ও ভব যদি একই ভাবে পড়িয়া থাকি, তাহা হইলে আমার উপর সন্দেহ হইবে না। আমার যতটা নেশা হইয়াছিল বলিয়া আপনারা স্থির করিয়াছিলেন, বাস্তবিক ততটা নেশা আমার হইয়াছিল না।
উহাবা চুরি করিলে তোমার কি লাভ ছিল?
