বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কথা শুনিয়া ইংরাজ-কর্ম্মচারী আর কোন কথা কহিলেন না। আমিও যে কাৰ্যে নিযুক্ত ছিলাম, তাহাই আপন ইচ্ছামত দেখিতে লাগিলাম।
এক এক করিয়া অনেক পত্র পড়িলাম, কিন্তু উহার একখানির মধ্যেও আমার আবশ্যক কোন কথা দেখিতে পাইলাম না। পরিশেষে একখানি পত্রের উপর আমার নয়ন আকৃষ্ট হইল, মনে যেন কেমন একরূপ সন্দেহ আসিয়া উপস্থিত হইল। সেই পত্রখানি একবার দুইবার করিয়া চারি পাঁচবার পড়িলাম। কিন্তু পরিশেষে বুঝিলাম, এই মোকদ্দমার সহিত এই পত্রের কোনরূপ সংস্রব নাই। এই ভাবিয়া পত্রখানি যে স্থানে ছিল, সেইস্থানে রাখিয়া দিলাম।
সেই পত্রখানি চারি পাঁচবার আমাকে পড়িতে দেখিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কহিলেন, এত মনঃ-সংযোগ করিয়া তুমি যে পত্রখানি পড়িতেছিলে, দেখি উহাতে কি লেখা আছে। এই বলিয়া পত্ৰখানি নিজহস্তে গ্রহণ করিয়া পাঠ করিলেন। সেই পত্রে লেখাছিল, কল্যাণবরেষু—
তোমার কথার কেন এরূপ গোলযোগ হইল? আময়া কয়জনেই তোমার অপেক্ষায় বাগানে প্রায় সমস্ত রাত্রি অতিবাহিত করিলাম। কিন্তু যখন দেখিলাম, তুমি আসলেও না, বা কোনরূপ সংবাদও পাঠাইয়া দিলে না, তখন কাজেই পরদিবস প্রাতঃকালে আমাদিগকে সেইস্থান পরিত্যাগ করিয়া আসিতে হইল। কি অবস্থা ঘটিয়াছে, তাহার সমস্ত ব্যাপার, হয়-পত্ৰযোগে আমাকে লিখিবে, না হয়,-সময়মত একদিবসের নিমিত্ত আসিয়া বলিয়া যাইবে। তোমার সহিত সাক্ষাৎ হওয়ার পর যেরূপ বন্দোবস্ত হইবে, সেইরূপভাবে কাৰ্য্য করিব। ইতি তারিখ * * *
আশীর্বাদকারী
তারণচন্দ্র ঘোষ
এই পত্রপাঠ করিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই পত্র পাঠ করিয়া তোমার মনে কোনরূপ সন্দেহ উপস্থিত হইয়াছিল কি?
আমি। হাঁ, কিন্তু পরে সে সন্দেহ দূর হইয়াছে।
বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমে কি সন্দেহ উদয় হইয়াছিল?
আমি। আমার মনে এই সন্দেহ উদয় হইয়াছিল যে, রসিক, তারণচন্দ্র প্রভৃতি কয়েকজন লোকের সহিত পরামর্শ করিয়া এইরূপ করিবার অভিসন্ধি করিয়াছিল, এবং চুরি করিবার নিমিত্তই উঁহারা সকলে আসিয়া বাগানে রসিকের অপেক্ষায় বসিয়াছিল। কিন্তু কাৰ্যগতিতে রসিক তাহাদিগের নিকট গমন করিয়া কোনরূপ সংবাদ প্রদান করিতে পারে নাই। সুতরাং সমস্ত রাত্রি তাহাদিগকে বাগানের ভিতর বসিয়া থাকিতে হয়, ও সঙ্কল্পিত কাৰ্য শেষ করিতে না পারিয়া, পরদিবস প্রাতঃকালে তাঁহারা সেইস্থান পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক প্রস্থান করে। পত্রপাঠ করিয়া প্রথমে আমার মনে এই প্রকার সন্দেহ আসিয়া উপস্থিত হয়। আরও আমার মনে হয়, এই ঘটনার পর আর একটা দিন স্থির হব, ও সেইদিবসেই উঁহারা এই কাৰ্য্য সম্পন্ন করে।
বন্দ্যোপাধ্যায়। তোমার মনে যে সন্দেহ প্রথমে উপস্থিত হইয়াছিল, তাহা নিতান্ত অযুক্তিযুক্ত নহে। কিন্তু পরিশেষে সে সন্দেহ দূর হইল কিসে?
আমি। যখন আমি সেই পত্রের তারিখ দেখিলাম, তখন আমার সেই সন্দেহ দূর হইল। দেখিলাম, চুরির প্রায় দেড়বৎসর পূর্বে যে পত্র লেখা হইয়াছে, সেই পত্রের সহিত বৰ্তমান চুরির যে কোনরূপ সংস্রব আছে, তাহা আমার মনে লয় না। সুতরাং পত্রের তারিখ দেখিয়া, আমার সেই সন্দেহ দূর হইয়াছে।
বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আমার কথা শুনিয়া আর আমাকে কিছু বলিলেন না। রসিকল সেইস্থানেই উপস্থিত ছিল। তাহার হন্তে সেই পত্রখানি প্রদান করিয়া কহিলেন, এই পত্রখানি পড় দেখি রসিকলাল!
পত্রখানি হন্তে লইয়া রসিকলাল পাঠ করিতে আরম্ভ করিল, কিন্তু তাহা সুস্পষ্টরূপে পাঠ করিতে পারিল না। কথা যেন জড়াইয়া জড়াইয়া বাহির হইতে লাগিল। তাহার অবস্থা দেখিয়া সকলেই মনে করিতে লাগিলেন, রসিকলের অন্তরে যেন পাপ আছে।
পত্রপাঠ শেষ হইলে বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই পত্ৰলেখক তারণচন্দ্র কে?
প্রথমে একটু ইতস্ততঃ করিয়া পরিশেষে রসিকলাল উত্তর দিল, তারণচন্দ্র তাহার খুড়া।
এ পত্রের অর্থ কি?
অর্থ আর কিছুই নহে, যে দিবস তাঁহারা আসিয়া বাগানে আমার অপেক্ষায় বসিয়াছিলেন, সেইদিবস থিয়েটার দেখিতে যাওয়ার কথা ছিল, আরও কথা ছিল, আমি গিয়া তাহাদিগের সহিত মিলিত হইলে সকলে একসঙ্গে গমন করিব। কিন্তু হঠাৎ আমার একটু অসুখবোধ হওয়ায়, আমি সে সময় তাহাদিগের নিকট যাইতে পারি নাই, বা অপর কাহারও দ্বারা সংবাদ পাঠাইতেও সমর্থ হই নাই। কাজেই তাঁহারা আমার অপেক্ষায় বসিয়া বসিয়া সমস্ত রাত্রি অতিবাহিত করিয়াছিলেন, এবং পরিশেষে বাড়ী গিয়া আমাকে এই পত্র লিখিয়াছিলেন।
তুমিই যেন যাইতে পারিলে না, বা অপর কাহারও দ্বারা সংবাদ পাঠাইতে সমর্থ হইলে না, কিন্তু তাহাদিগের মধ্যে কেহ না কেহ আসিয়া অনায়াসেই সংবাদ লইয়া যাইতে পারিত। আর থিয়েটার দেখা কিছু এমন দুষ্কৰ্ম্ম নহে যে, তাঁহারা তোমার বাড়ীতে না আসিয়া তোমার অপেক্ষায় চোরের মত বাগানের ভিতর বসিয়াছিলেন?
আপনি যাহা বলিতেছেন, তাহা প্রকৃত; কিন্তু তাহা দিগের মধ্যে কেহই আমার বাড়ী জানিতেন না বলিয়া পূৰ্ব্বের বন্দোবস্ত মত তাঁহারা বাগানের ভিতর বসিয়া ছিলেন; তাঁহারা চোর নহেন। সকলেই সম্রান্তবংশীয় ও আমার আত্মীয়; সুতরাং তাহাদিগের দ্বারা কোনরূপ অনিষ্টের আশঙ্কা করা যাইতে পারে না। বিশেষ এ ঘটনা আজিকার নহে, বহুদিবসের।
