আমাদিগের মধ্যে এই বন্দোবস্ত ছিল, যে পর্যন্ত গোলযোগ না মিটিবে, ততদিবস পৰ্যন্ত সমস্ত দ্রব্যই লুক্কায়িত থাকিবে। গোলযোগ মিটিয়া গেলে, আমরা সকলে মিলিয়া উহা বণ্টন করিয়া লইব। আমি লইব অর্ধেক, এক চতুর্থাংশ লইবেন খুড়া মহাশয়, অবশিষ্ট অপর কয়েক জনেব মধ্যে বিভক্ত হইবে।
যাহা হউক,কত রাত্রিতে এই কাৰ্য্য তোমরা করিয়াছিলে? প্রাতঃকাল চারিটা হইতে পাচটার মধ্যে। গৃহের ঘড়ীর অবস্থা সেরূপ হইয়াছিল কেন?
তাহার কারণ ছিল। পাড়ার দুই একজন লোক সাড়ে দশটার সময় ভর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিল; তাহাদিগের উপর সন্দেহ পড়িবে, এবং আমাদের উপর একেবারে পড়িবে না বলিষা, ঘড়ীর কাটা ঘুরাইয়া সেইরূপে রাখিয়াছিলাম।
সেই সময় পাড়ার কোন লোক যে এখানে আসিয়া ছিল, একথা ত তোমর কেহই এ পর্যন্ত বল নাই।
ভয়েতে কেহ বলে নাই, কি ভুলিয়া গিয়া থাকিবে।
ভব সেইস্থানে উপস্থিত ছিল, সে তখন কহিল, রসিক যাহা বলিল, তাহা সত্য; একথা আমার মনেই ছিল না।
গৃহের পশ্চিমদিকের দরজায় অস্ত্রের চিন্তু ছিল কেন?
বাহিরের লোক অস্ত্রদ্বারা সেই দরজা খুলিয়া গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়াছে, ইহাই সাধারণকে দেখাইবার নিমিত্ত।
এইরূপে অনুসন্ধান শেষ করিয়া আসামীগণকে মাজিষ্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করা হইল। সেইস্থান হইতে মোকদ্দমা দায়রায় গেল। দায়রায় জুরির বিচারে রসিক, তারণ, এবং অপর দুই ব্যক্তি রসময় ও প্রিয়নাথ, সকলেই সাত সাত বৎসরের নিমিত্ত কারাগারে প্রেরিত হইল। বৃদ্ধা তাহার সমস্ত, দ্রব্য সামগ্রী লইয়া আপনার গৃহে প্রস্থান করিল। রসিক যেমন করিল, তাহার ফল ও তেমনি পাইল!
সম্পূর্ণ।
রকম রকম
রকম রকম (অর্থাৎ জুয়াচুরির অদ্ভুত অদ্ভুত বৃত্তান্ত!)
Detective Stories No.82, দারোগার দপ্তর ৮২ম সংখ্যা।
রকম রকম (অর্থাৎ জুয়াচুরির অদ্ভুত অদ্ভুত বৃত্তান্ত!)
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে শ্রীবাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। মাঘ।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.
দারোগার দপ্তর।
রকম রকম।
সূচনা।
এই কলিকাতা সহর জুয়াচোরে পূর্ণ, একথা প্রায়ই সর্বদা সকলের মুখেই শুনিতে পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে কলিকাতা একবারে জুয়াচোরে পরিপূর্ণ না হইলেও, ইহা যে অনেক জুয়া চোরের আবাস স্থল, সে সম্বন্ধে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। এখানে অনেক জুয়াচার অনেকরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া নিত্য যে কত নিরীহ লোকগণকে প্রতারিত করিতেছে, তাহার সংখ্যা কে করে? কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, যে সকল পুরাতন জুয়াচুরির কৌশল অবলম্বন করিয়া জুয়াচোরগণ নিত্য লোকগণকে ঠকাইয়া থাকে, সেই সকল পুরাতন কৌশল-জালে এখনও নিত্য অনেক লোক পতিত হইতেছেন। আপনা হইতে সতর্ক হইতে না পারিলে, জুয়াচারগণ কর্তৃক প্রতারিত হইবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা। এই নিমিত্তই আমি মধ্যে মধ্যে বিস্তর জুয়াচুরির বিবরণ এই দারোগার দপ্তরে বর্ণন করিয়া সৰ্বসাধারণকে সতর্ক করিয়া দিয়া থাকি। আমার লিখিত জুয়াচুরির বিষয় পাঠ করিয়া, অনেক পাঠক মধ্যে মধ্যে জুয়াচোরগণের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইয়া থাকেন, একথাও অনেক সময় আমি সেই সমস্ত পাঠকগণের প্রমুখাৎ শ্রবণ করিয়াছি। তথাপি নিরীহ মফঃস্বল-বাসীগণের মধ্যে অনেকেই কলিকাতায় আসিয়া জুয়াচোরগণ কর্তৃক এখনও প্রতারিত হইতেছেন! তাহাদিগকে সতর্ক করিয়া দিবার অভিলাষে, যে সকল জুয়াচুরি সর্বক্ষণ কলিকাতায় চলিতেছে, তাহার মধ্য হইতে কয়েকটীমাত্র এই স্থানে বর্ণনা করিলাম। এই সকল বিষয় সবিশেষরূপ সুখ-পাঠ্য না হইলেও, আশা করি, পাঠক মহাশয়গণ জুয়াচোরগণের হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাইবার মানসেই অন্ততঃ একবার ইহা সবিশেষ মনোযোগের সহিত পাঠ করিবেন। কেবল এগুলিই বা কেন, এ পর্যন্ত আমি জুয়াচুরির যে সকল কৌশল ইতিপূৰ্বে বর্ণন করিয়াছি, এবং ভবিষ্যতে আরও যে সকল বর্ণন করিব, সেই সকল বিষয় উত্তমরূপে অবগত থাকিলে জুয়াচোরগণ সহজে তাহাদিগের নিকট আসিতে সমর্থ হইবে না। অথচ এই সকল বিষয় পাঠ করিয়া যত লোক জুয়াচোরের হস্ত হইতে পরিত্রাণ লাভ করিবেন, আমি ততই আমার পরিশ্রম সার্থক মনে করিব।
(১) ডাকের চুরি।
ডাকঘরে আজকাল অনেক প্রকারের চুরি ও জুয়াচুরি আরম্ভ হইয়াছে, তাহার মধ্যে এই প্রবন্ধে আমি দুইটা বিষয় আজ পাঠকগণকে উপহার প্রদান করিতেছি। এই দুইটী বিষয় আইন অনুসারে চুরি হইলেও, ইহাকে জুয়াচুরির শ্রেণীভুক্ত করাই কৰ্ত্তব্য। উভয়কেই এক কথায় ডাকের চিঠি চুরি বলা যাইতে পারে; কিন্তু আমি উহার নাম এইরূপ প্রভেদ করিলাম যথা;—(ক) চিঠিতে জুয়াচুরি। (খ) হুণ্ডিতে জুয়াচুরি।
(ক) চিঠিতে জুয়াচুরি।
গোবিন্দচন্দ্র একজন পুরাতন জুয়াচোর। অনেক সময় অনেক জুয়াচুরি ব্যবসা অবলম্বন করিয়া সে মফঃস্বলের অনেক লোককে একাল পর্যন্ত ঠকাইয়া আসিয়াছিল; কিন্তু নিজে কিছুমাত্র সংস্থান করিয়া উঠিতে পারে নাই। সে অসৎ উপায় অবলম্বন করিয়া যাহা কিছু উপার্জন করে, তাহার ব্যয়ও প্রায় সেই রূপেই হইয়া থাকে। তবে তাহার লাভের মধ্যে কেবল এইমাত্র দেখিতে পাই যে, কোন কোন সময় দুই বেলা অন্নের সংস্থান হয়; কিন্তু কোন কোন সময় আবার তাহাও হয় না। কখন কখন গাড়ি ঘোড়ায় চড়িয়া, কথন বা টমটম হাঁকাইয়া, কলিকাতার রাস্তায় সে ছুটাছুটী করিয়া থাকে, কখন বা মলিন বস্ত্রে শরীর আবৃত করিয়া চটিজুতা পরিয়া রাস্তায় গমন করিবার কালীন, পূর্ব্ব নিয়োজিত সহিস-কোচবানগণের বেতন বাকী থাকা প্রযুক্ত, তাহাদের নিকট সুমধুর বাক্য শ্রবণ করিয়া থাকে, বা কখন কখন তাহাদিগের আদরের চড় চাপড় সহ্য করিয়া ধীরে ধীরে আপন পৃষ্ঠে হস্ত বুলাইতে থাকে। কখন বা বেশ্যা-পল্লীর ভিতর গমন করিয়া সুরাদেবীর প্রকট-শিষ্য হইয়া বার-নারীদিগের সুমধুর আদরের প্রেম-সাগরে সন্তরণ করিয়া থাকে, কখন বা তাহা দিগের দেনা পরিশোধ করিতে না পারিয়া হাসিতে হাসিতে তাহাদিগের আদর-মিশ্রিত পাদুকার ধূলি সকল আপন মস্তক হইতে ঝাড়িতে বাড়িতে স্থানান্তরে প্রস্থান করে। গোবিন্দ চন্দ্র এইরূপে কলিকাতার ভিতর অনেক দিবস পর্যন্ত আপনার লীলা খেলা করিয়া আসিতেছে। তাহার এইরূপ লীলা খেলা করিতে যে সকল অর্থ ব্যয়িত হয়, তাহার সমস্তই জুয়াচুরি-লব্ধ। সে অনেকরূপ জুয়াচুরির নূতন উপায় বাহির করিয়া অনেক লোককে ঠকাইয়াছে, এবং ক্রমে সেই সকল জুয়াচুরির বিষয় অনেকে অবগত হইবার সঙ্গে সঙ্গে তাহা পরিত্যাগ করিয়া অপর উপায় অবলম্বন করিয়াছে। আজকাল সে যে জুয়াচুরির উপায় অবলম্বন করিয়া আপনার খরচ-পত্রের সংস্থান করিতেছে, তাহার বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হইল।
