দ্বিতীয় চিন্তা—যদি প্রকৃতই চুরি হইয়া থাকে, তাহা হইলে কাহার দ্বারা এই কাৰ্য্য সম্পন্ন হইল? বাহিরের কোনও চোর আসিয়া এই কাৰ্য্য করিয়া গেল, কি রসিকের সহায়তায় এই কাৰ্য্য হইল?
তৃতীয় চিন্তা-রসিকের সহায়তায় এ কাৰ্য্য কিরূপে সম্পন্ন হইবে? যদি রসিকের সহায়তায় এই কাৰ্য্য হয়, তাহা হইলে সেই বা অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া থাকিবে কেন? আর ডাক্তারই বা কেন বলিবে, রোফরমেই রসিককে অজ্ঞান করিয়াছিল?
চতুর্থ চিন্তা—যদি রসিকের দ্বারা বা তাহার সহায়তায় এই কাৰ্য্য সম্পন্ন না হইয়া থাকে, তাহা হইলে বাহিরের লোক ভিতরে আসিল কি প্রকারে?
পঞ্চম চিন্তা-যে দরজায় অস্ত্রের চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হইতেছে, সেই দরজা দিয়াই যদি অপহরণকারী গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া থাকে, তাহা হইলে উহার বহির্ভাগের পুরাতন উর্ণজাল ছিন্ন হইল না কেন?
ষষ্ঠ চিন্তা—সেই দরজায় যে সকল চিহ্ন দৃষ্টিগোচর হইতেছে, তাহা যে বাহির হইতে হইয়াছে, তাহা ত বোধ হইতেছে না। ভিতর হইতে যদি অস্ত্রের চিহ্ন হইয়া থাকে, তাহা হইলে দগণ ভিতরে আসিবে কি প্রকারে?
সপ্তম চিন্তা–গৃহের সম্মুখ দরজা যদি ভিতর হইতে না খুলিয়া দেওয়া হইবে, তাহা হইলেই বা দস্যুগণ প্রবেশ করিবে কিরূপে?
অষ্টম চিন্তা-যে সিন্ধুকের ভিতর লোহার সিন্ধুকের চাবি ছিল, সেই সিন্ধুক কেবল চাবির নিমিত্তই ভাঙ্গিয়াছে বলিয়া বোধ হইতেছে। কারণ তাহার মধ্যে মূল্যবান্ কোন দ্রব্য থাকিত না। অথচ বস্ত্রাদি যাহা কিছু ছিল, তাহার একখানিও অপহৃত হয় নাই।
নবম চিন্তা–গৃহের লোক না হইলে দস্যুগণকে এই চাবির সন্ধান আশ্র কে প্রদান করিতে পারে?
দশম চিন্তা–গৃহের ভিতরে যে দুইজন ছিলেন, তাহার মধ্যে বৃদ্ধা ভব কি নিমিত্ত নিজের দ্রব্য অপরের দ্বারা অপহরণ করাইবে?
একাদশ চিন্তা-গৃহের ভিতরস্থিত অপর ব্যক্তি রসিক। সেই, গৃহের সমস্ত অবস্থা জানে, কিন্তু সেই বা অপরের দ্বারা চুরি করাইবে কেন? সে বেশ কানে, ভবর মৃত্যুর পর সবই তাহার, এখনও তাহার কোন কষ্ট নাই। তাহার মনে যাহা উদয় হইতেছে, ভবব পয়সায় সে তাহাই করিতেছে। তাহার বিবাহের নিমিত্ত ভব বিশেষরূপ চেষ্টা করিতেছে। এরূপ অবস্থায় রসিকই বা চুরি করিবে কেন?
যাহা হউক, যে দিবস অতুলকে ছাড়িয়া দিলাম, সেইদিবস দেখিলাম, বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় এবং সেই ইংরাজ-কৰ্মচাৰী ভবর বাড়ীতে পুনরায় গমন করিতেছেন। কি নিমিত্ত তাঁহারা যে পুনরায় গমন করিতেছেন, তাহা কিন্তু আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না; তাঁহারাও ভাঙ্গিয়া চুরিমা আমাকে কোন কথা বলিলেন না, কিন্তু আমাকে ডাকিয়া–দিগের সঙ্গে লইলেন। আমিও বিনাবাক্য-ব্যযে তাঁহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলাম।
বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়, এবং ইংরাজ-কৰ্মচাৰী উভয়েই গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া উপবেশন করিলেন। বসিক ও ভবকে সম্মুখে ডাকিয়া তাহাদিগকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। যে সকল কথা তাহাদিগকে বার বার জিজ্ঞাসা করা হইয়াছে, যে সকল কথা অনেকবার অনেক ৰূপে লিখিয়া লওয়া হইয়াছে, সেই সকল পুরাতন কথা আবার তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া লিখিয়া লইতে আরম্ভ কবিলেন।
যে সকল বিষয় অনেকবার শ্রবণ করিযাছি, যাহা অনেকবার লিখিয়া লইয়াছি, সেই সকল বিষয় শ্রবণ করিতে আমার আর ভাল লাগিল না। কিন্তু পুরাতন ও বহুদর্শী কর্ম্মচারীগণ যাহা করিতেছেন, তাহার কোনরূপ প্রতিবাদ করিতেও আমি সাহসী হইলাম না। ভাবিলাম, ইহাদিগের কোনরূপ গূঢ় অভিসন্ধি না থাকিলে, ইহার পুনরায় এরূপকার্যে কেন প্রবৃত্ত হইবেন?
উঁহারা যখন পূর্বোক্তরূপে কথােপকথন করিতে লাগিলেন, আমি তখন সেই গৃহের ভিতর বসিয়া বসিয়াই এদিক ওদিক চতুর্দিক দেখিতে লাগিলাম। কি দেখিতেছি, তাহার স্থির নাই, কোনদিকে বিশেষ লক্ষ্য নাই; তথাপি দেখিতে লাগিলাম।
সপ্তম পরিচ্ছেদ।
সেই গৃহ মধ্যে দেখিতে দেখিতে একটা চিঠির ফাইল আমার দৃষ্টিপথে পড়িল। দেখিলাম, দেওয়ালের এক কোণে একটী পেরেকের উপর উহা ঝুলিতেছে। সেইস্থান হইতে ফাইলটী আপনার নিকটে আনিলাম, ও উহাতে যে সকল কাগজপত্র ছিল,তাহা এক এক করিয়া পড়িতে লাগিলাম।
সেই ফাইলের কাগজগুলি যে কেন পড়িতে লাগিলাম, তাহার কারণ অন্যের জানা পরের কথা, আমি নিজেই জানিতে পারিলাম না। কৌতুহল-পরবশ হইয়াই হউক, বা অভ্যাসের দোষেই হউক, আমি কিন্তু উহা পাঠ করিতে লাগিলাম।
উহার ভিতর অনেক পত্র ছিল, এক এক করিয়া প্রায় সমস্তগুলিই মোটামুটি দেখিয়া লইলাম। কোনখানি বৃদ্ধা ভবর নামে, কোনখানি রসিকের নামে, কোনখানি বা অপর আর কাহারও নামে।
যখন আমি এইরূপভাবে সেই পত্রগুলি পাঠ করিতে লাগিলাম, তখন সেই ইংরাজ-কর্ম্মচারী আমার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিয়া একটু হাসিলেন ও কহিলেন, তোমার বিবেচনায় কি এই স্থির হইয়াছে যে, যাহারা এই দস্যুবৃত্তিতে পরিলিপ্ত, তাঁহারা অগ্রে পত্র লিখিয়া, পরিশেষে এই অসমসাহসিক কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছে? নতুবা এত আগ্রহের সহিত এই পত্রগুলি তুমি পাঠ করিতেছ কেন? অনাবশ্যক কর্মে মিথ্যা সময় নষ্ট না করিয়া ইহারা পুনরায় যাহা বলিতেছে, আমার মতে তাহা শ্রবণ কর তোমার কর্তব্য।
ইংরাজ-কর্ম্মচারীর কথায় আমি কোনরূপ উত্তর প্রদান করিলাম না। কিন্তু বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কহিলেন, এদিকের কাৰ্য্য আমরা করিতেছি, ও যাহা করে, তাহা উহাকে করিতে দেও। ইহারা এখন যাহা বলিতেছে, তাহা শুনিয়া যাহা করিতে হয়, তাহা আমরাই করিব। উহাকে সে বিষয় দেখিতে হইবে না।
