ভবর নিকট হইতে এই অবস্থা জানিতে পারিয়া, ঘোড়া বাগানে গমন করিলাম, সন্ধানে অতুলকেও পাইলাম। পুর্বে যাহা ভাবিয়াছিলাম, দেখিলাম, কাৰ্য্যে ও তাহাই ঘটিল। যে অতুল আমার পূর্বপরিচিত, যে ডাক্তারখানায় কম্পাউণ্ডারের কৰ্ম্ম করে, এ সেই অতুল। অতুল আমাকে দেখিবামাত্র কহিল, এখানে কি নিমিত্ত আপনার আগমন হইয়াছে?
উত্তরে আমাকে হঠাৎ একটা মিথ্যা কথা বলিতে হইল; অনুসন্ধানের সময় এরূপ মিথ্যা কথা বাধ্য হইয়া আমা দিগকে প্রায়ই বলিতে হয়। ইহা যেন আমাদিগের এক রূপ কৰ্ত্তব্য কর্মের মধ্যে পরিগণিত হইয়াছে। ঈশ্বর যে আর কতদিবস পরে এই পাপ হইতে মুক্ত করিবেন, তাহা তিনিই বলিতে পারেন। আমি কহিলাম, তোমার মনিবের সহিত আমার সাক্ষাৎ করিবার বিশেষ প্রয়োজন আছে। আমার কথা শুনিয়া সে তাহার মনিবকে সংবাদ প্রদান করিল। সংবাদ পাইবামাত্র ডাক্তার আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
যে ডাক্তারখানায় আমি এই অনুসন্ধান করিতে গমন করিয়াছিলাম, তাহা এখন একটি পুরাতন ঔষধালয় হইলেও সেই সময়ে কিন্তু নিতান্ত নূতন ঔষধালয় ছিল। এই সন্ধানের দুই বৎসর পূর্বে এই ঔষধালয় প্রথম স্থাপিত হয়।
ডাক্তারের নিকট আমি আমার মনের কথা গোপন করিলাম, এবং কহিলাম, এই ঔষধালয় সৃষ্টি হওয়ার পর আপনি কয় শিশি ক্লোরাফরম খরিদ করেন, তাহার কয় শিশি বিক্রয় হইয়াছে, এবং কয় শিশিই বা এখনও মজুত আছে, তাহার একটী হিসাবের প্রয়োজন।
আমার কথা শুনিয়া ডাক্তারবাবু নিজেই খাতাপত্র দেখিতে আরম্ভ করিলেন, এবং পরিশেষে কহিলেন, কেবল দুইশিশিমাত্র ক্লোরাফরম খরিদ করা হয়, তাহা আমার বেশ স্মরণ আছে, এবং কাগজেও তাহাই পাইতেছি। দুই শিশির মধ্যে একশিশি বিক্রয় করা হয়, অপর আর এক শিশি বোধ হয়, মজুতই আছে।
ডাক্তারবাবুর কথা শুনিয়া মজুত শিশিটা একবার দেখিতে চাহিলাম। ডাক্তারবাবু সেই শিশিটী আনিবার নিমিত্ত অতুলকে বলিলেন।
প্রায় অর্ধঘণ্টা পরে অতুল ফিরিয়া আসিয়া কহিল, কই মহাশয়! অনুসন্ধানে ক্লোরাফরমের শিশি আর ত পাইতেছি না!
অতুলের উপর পূর্বেই আমার কিঞ্চিৎ সন্দেহ হইয়াছিল, এই কথা শুনিয়া সেই সন্দেহ আরও বদ্ধমূল হইল। কিন্তু তাহাকে স্পষ্ট করিয়া কোন কথা না বলিয়া, সেইস্থান হইতে তাহাকে সঙ্গে করিয়া আপনস্থানে গেলাম, এবং বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে আদ্যোপান্ত সমস্ত কথা কহিলাম। দেখিলাম, অতঃপর তিনিও ক্রমে আমার অনুমান সম্পূর্ণ অনুসরণ করিলেন, এবং অতুলকে লইয়া অনেক রূপ জিজ্ঞাসাবাদ করিতে লাগিলেন।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
অতুলকে যে সকল কথা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলাম, সে স্থিরভাবে তাহার উত্তর প্রদান করিতে লাগিল। তাহার কথা যিনিই শ্রবণ করিতে লাগিলেন, তিনিই কহিলেন, এরূপ অবস্থায় অতুলের উপর কোনরূপ সন্দেহ হইতে পারে না, তথাপি আমরা অতুলকে ছাড়িতে পারিলাম না। ডাক্তারখানা হইতে যখন একশিশি ক্লোরাফরম চুরি গিয়াছে, তখন অতুলকে কি প্রকারে পরিত্যাগ করিতে পারি? অতুলকে লইয়া যথেষ্ট অনুসন্ধান হইল, তাহার বাসা পুরু পুঙ্খরূপে অন্বেষণ করা হইল। তাহার দেশের বাড়ী গৃহ প্রভৃতি উত্তমরূপে খানা-তল্লাসী হইতে বাকি থাকিল না, কিন্তু অপহৃত কোন দ্রব্য পাওয়া গেল না।
অতুলের নিকট হইতে কোন দ্রব্য পাওয়া যাইতেছে না, অথচ তাহাকে ছাড়িয়া দিতেও পারিতেছি না। তাহাকে লইয়া একরূপ বিপদেই পড়িলাম। কেহ কহিলেন, ইহারই দ্বারা এই কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়াছে; কেহ কহিলেন, ইহার দ্বারা হয় নাই, ক্লোরাফরমের শিশি অন্য কোনরূপে গোলযোগ হইয়া গিয়াছে; আমাদিগের মধ্যে এইরূপ মতভেদ হইতে লাগিল।
ক্রমে এইরূপে পাঁচদিবস অতীত হইয়া গেল। ষষ্ঠদিবসে দেখিলাম, একটী লোক আসিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে কি বলিয়া গেল। তিনি আমাকে ডাকাইয়া কহিলেন, যে সন্দেহের উপর নির্ভর করিয়া অতুলের বিরুদ্ধে আমরা অনুসন্ধান করিতেছি, সেই অপরাধে অতুল অপরাধী নহে। তাহাকে এখনই ছাড়িয়া দেও, সেই ক্লোরাফরমের শিশি অপহৃত হয় নাই। অতুলের পূর্বে যে ব্যক্তি সেই ডাক্তার খানায় কৰ্ম্ম করিত, সেই শিশি বিক্রয় করে। কিন্তু ভ্ৰম ক্রমেই হউক, বা ইচ্ছা করিয়াই হউক, সে সেই টাকা, খাতায় জমা দেয় নাই। যাহার নিকট সে উহা বিক্রয় করে, তাঁহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইয়াছে, এবং সেই পুরাতন কম্পাউণ্ডার আমার নিকট সকল কথা স্বীকার করিয়াছে। এখন বুঝিতে পারিতেছি, অতুল কোন দোষে দোষী নহে, এই কয়েকদিবস পর্যন্ত তাহাকে মিথ্যা কষ্ট সহ করিতে হইয়াছে।
বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কথা শুনিয়া সেই মুহূর্তেই অতুলকে ছাড়িয়া দিলাম। অতুল হাসিতে হাসিতে আমা দিগকে সহস্র গালিবর্ষণ করিয়া সেইস্থান পরিত্যাগ করিল। বিনাদোষে একজন লোককে নিরর্থক কষ্ট দিয়াছি বলিয়া, আমার মনেও কষ্ট হইতে লাগিল। আমার হৃদয় এখন যেরূপ কঠিন হইয়াছে, তখন সেইরূপ কঠিন হইয়াছিল না বলিয়াই বোধ হয়, কষ্ট হইল।
অতুল চলিয়া যাইবার পর আমার মনে কয়েকটা চিন্তার উদয় হইল।
১ম চিন্তা-ভবর যে সকল দ্রব্য অপহৃত হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ হইয়াছে, উহা প্রকৃতই অপহৃত হইয়াছে কি না? এই বিষয় অনেকক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা করিলাম। ভব মিথ্যা অভিযোগ করিয়াছে, ইহা আপনার মনকে বুঝাইবার নিমিত্ত অনেক চেষ্টা করিলাম। কিন্তু সে কথা মন আমার কোন রূপেই বুঝিল না।
