তখন আমাদিগের সে আশা দুর হইল।
তাহাদিগের নিকট হইতে জানিতে পারিলাম, যে দিবস এই ঘটনা ঘটিয়াছিল, সেইদিবস সন্ধ্যার পর চাকরাণ হরর মা বাড়ী পরিত্যাগ করিয়া ভবর সম্মুখেই গমন করে।
সেই সময় রসিকলাল বাহিরে ছিলেন, রাত্রি প্রায় সাড়ে দশটার সময় তিনি প্রত্যাগমন করিয়া আহারাদি পূর্বক শয়ন করেন, এবং দেখিতে দেখিতে নিদ্রিত হইয়া পড়েন।
রসিকলাল নিদ্রিত হইবার অনেকক্ষণ পরে, ভব আপনার হস্তে দরজা বন্ধ করেন, এবং যে দরজা পূর্ব হইতে বন্ধ ছিল, তাহাও নিজহস্তে পরীক্ষা করিয়া শয়ন করেন। রাত্রি দুই প্রহরের পর ভব নিদ্রিত হন, তাহার পর আর যে কি অবস্থা ঘটিয়াছিল, তাহা তাঁহারা কিছুই অবগত নহেন। পরিশেষে যখন তাহাদিগের চৈতন্য হয়, তখন তাঁহার বুঝিতে পারেন যে, তাঁহারা হাসপাতালে রহিয়াছেন। ইহা ব্যতীত ইহারা আর কিছুই বলিতে পারেন না, কোন লোকের উপর তাহাদিগের সন্দেহ হয় না; এবং সম্প্রতি কোন অপরিচিত লোক তাঁহাদিগের বাড়ীতে আগমন করে নাই।
যে সকল দ্রব্য চুরি গিয়াছে, ভবর কথামত তাহার আর একটী তালিকা প্রস্তুত করিলাম। এখন সকলেই জানিতে পারিলেন, অলঙ্কার নগদ প্রভৃতিতে প্রায় ছয় হাজার টাকা ভবর গৃহ হইতে অপহৃত হইয়াছে।
লোহার সিন্ধুকের চাবি একটী কাষ্ঠ সিন্ধুকের ভিতর ছিল, তাহাতে কাপড় ভিন্ন অপর আর কোন দ্রব্য থাকিত না। সেই বাক্স যদিও ভগ্নাবস্থায় পাওয়া যায়, তথাপি তাহার মধ্যস্থিত কোন দ্রব্য অপহৃত হয় নাই, কেবল লোহার সিন্ধুকের চাবি পাওয়া গেল না।
এই সকল অবস্থা দেখিয়া এবং শ্রবণ করিয়া আমরা কিছুই স্থির করিয়া উঠিতে পারিতেছি না, এমন সময়
একখানি বেনামা পত্র ডাকে আসিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের হন্তে পড়িল। তিনি সেই পত্র উত্তমরূপে পাঠ করিয়া, পরিশেষে আমার হস্তে প্রদান করিলেন, আমিও সেই পত্র পাঠ করিলাম। উহাতে লেখা ছিল–ভব এবং রসিককে বিষ খাওয়াইয়া তাহাদিগের গৃহ হইতে যে সকল দ্রব্য অপহরণ করা হইয়াছে, তাহার অনুসন্ধানের নিমিত্ত আপনারা বিশেষ ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, ইহা আমি কয়েকদিবস হইতে দেখিতেছি। কিন্তু যখন আমি তৎসম্বন্ধে কোন কথা জানিতে পারিয়াছি, তখন আমার কর্তব্য সেই কথা আপনাদিগকে বলিয়া দেওয়া। কারণ আপনারা সেই অবস্থা জানিতে পারিলে, আমার বোধ হয়—অথবা বোধ কেন নিশ্চয়ই আপনা দিগের কষ্টের লাঘব হইবে। কিন্তু আপনাদিগের যে সুযশ শুনিতে পাই, কেহ আপনাদিগকে কোনরূপ সংবাদ প্রদান করিলে তাহাকে লইয়া আপনারা সর্বদা যেরূপ টানাটানি করিয়া থাকেন, তাহাতে আপনাদিগকে কোনরূপ সংবাদ প্রদান করিতে গিয়া কে আপনার নাম প্রকাশ করিতে সাহসী হয়? সুতরাং আমি আমার নিজের নাম গোপন করিলাম। ইচ্ছা হয়, আমার কথায় বিশ্বাস করিবেন, ইচ্ছা না হয়, বিশ্বাস করিবেন না; কারণ ইহাতে আমার কোনরূপ ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। একবার আপনারা দেখিবেন, ভবর মৃত্যুর পর যে তাহার উত্তরাধিকারী হইবে, সেই অতুলের সহিত ইহার কোনরূপ সংস্রব আছে কি না? অতুলের নিকট হইতে যদি প্রকৃত কথা বাহির করিতে পারেন, তাহা হইলেই আপনাদিগের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হইবে। অতুলের বাসস্থান যোড়াবাগান। একটু অনুসন্ধানেই তাহাকে বাহির
করিতে পারিবেন। ইতি।
পত্রপাঠ করা সম্পন্ন হইলে বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,এই পত্র সম্বন্ধে তোমার কি বিবেচনা হয়?
আমি। আমার বোধ হইতেছে, এ পত্রের কথা প্রকৃত হইলেও হইতে পারে।
বন্দ্যোপাধ্যায়। কি কারণে তুমি এই পত্রের কথা বিশ্বাস করিতেছ?
আমি। এই পত্রের কথা বিশ্বাস করিবার আমার কয়েকটা কারণ আছে। প্রথমতঃ অতুল যদি প্রকৃতই ভবর উত্তরাধিকারী হয়, তাহা হইলে অতুলের দ্বারা এই কাৰ্য্য সম্পন্ন হওয়া নিতান্ত অসম্ভব নহে। কারণ সে বেশ বুঝিতে পারিতেছে, ভবর যাহা কিছু আছে, তাহার সমস্তই সে রসিককে দিয়া যাইবে, তাহার আর কিছুমাত্র ভ্ৰম নাই। দ্বিতীয়তঃ-যোড়াবাগানের এক অতুলকে আমি জানি, সে কোন ডাক্তারখানায় কম্পাউণ্ডারের কর্ম্ম করেন। সেই যদি এই অতুল হয়, তাহা হইলে তাহার দ্বারা ক্লোরাফরম সংগ্রহ করা নিতান্ত সহজ; কিন্তু অপরের পক্ষে সেরূপ সহজ নহে। তৃতীয়তঃ-আমাদিগের দেশে যে সকল চোর সৰ্ব্বদা দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাদিগের মধ্যে অনেকেই অশিক্ষিত। ক্লোরাফরম যে কি, ও তাহার গুণই বা কি, তাহা তাহাদিগের বোধ হয়, কেহই অবগত নহে। এ সকল চুরি-হয় শিক্ষিত লোকের দ্বারা সম্পন্ন হইতে পারেন হয়, যাহাদিগের সহিত ডাক্তারখানার সংস্রব আছে, তাহাদিগের দ্বারাই সম্পন্ন হয়। অপর কাহারও দ্বারা এরূপ কাৰ্য্য হওয়া একেবারেই অসম্ভব।
বন্দ্যোপাধ্যায়। আমি তোমার যুক্তির পোষকতা করি, কিন্তু তোমার মতের অনুমোদন করি না। এ পত্ৰ আমি বিশ্বাস করি না, আমার বিশ্বাস এই পত্রের মূলে সত্যের লেশমাত্র নাই। অতুলের সহিত কাহারও মনান্তর আছে, সেই তাহাকে বিপদগ্রস্ত করিবার মানসে এই শক্রতাসাধন করিয়াছে। কিন্তু তুমি যে অতুলের কথা বলিতেছ, সেই যদি এই অতুল হয়, তাহা হইলে একটু সন্দেহের কারণ হয় বটে। যাহা হউক, এ সম্বন্ধে একবার উত্তমরূপে দেখা উচিত।
বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কথা শুনিয়া প্রথমে ভবর সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। তাহাকে জিজ্ঞাসা করায় জানিতে পারিলাম যে, বাস্তবিকই অতুল ভবর দুর সম্পর্কে উত্তরাধিকারী। যদি ভব তাহার বিষয় অপর কাহাকেও প্রদান না করিয়া যায়, তাহা হইলে পরিশেষে সমস্তই অতুলের হইবে।
