আমি। আপনি যেরূপ বুঝিয়াছিলেন, আমিও প্রথমে সেইরূপ বুঝিয়াছিলাম। কিন্তু যখন স্মরণ হইল, রাত্রি সাড়ে দশটা হইতে যে ব্যক্তি ক্লোরাফমের গুণে অচেতন হয়, তাহার পক্ষে প্রাতঃকাল ছয়টা পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকা অসম্ভব। সম্ভব অসম্ভব যদিও আমি তাহা ঠিক জানি না, কারণ আমি ডাক্তারী বিদ্যা কখনও অধ্যয়ন করি নাই। কিন্তু আমার মনে যে ভাবের উদয় হইয়াছিল, আমি তাহারই অনুসরণ করিলাম। ঘড়ীর ভিতরে যে কাঁটাটী একটু উপরের দিকে উঠাইয়া ধরিলে ঘড়িটী বাজিতে থাকে, তাহাই একবার উঠাইয়া ধরিলাম; দেখিলাম, ঠং ঠং করিয়া পাঁচটা বাজিয়া গেল। তখন আমার মনে বেশ বিশ্বাস হইল, এই ঘটনা চারিটা বাজিবার পর এবং পাঁচটা বাজিবার পূর্বেই সম্পন্ন হইয়াছে। আরও ভাবিলাম, ঘড়ীর কাঁটা ধরিয়া উল্টাদিকে কয়েকবার শীঘ্ন শীঘ্ন ঘুরাইয়া দেওয়া নিতান্ত সহজ। কারণ সেই বিষয়ে অপর কাহারও জানিবার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু যদি পূৰ্ব্বকথিত কাঁটা উঠাইয়া এক এক করিয়া এগারটা, বাটা, একটা, দুইটা, তিনটা, চারিটা এত বাজাইয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে সেই শব্দ নিকটবর্তী কোন লোকের শ্রবণ-পথে আকৃষ্ট হইতে পারে, অথচ এত বড় একটা ভয়ানক কাৰ্য্য সম্পাদনের পর, সেইরূপভাবে এইস্থানে দাঁড়াইয়া ঘড়ী বাজান নিতান্ত সহজ কৰ্ম্ম নহে, কারণ সেই সময় মনের প্রায় স্থির থাকে না। অধিকন্তু শীঘ্র শীঘ্র সেই গৃহ পরিত্যাগ করিয়া গমন করিবার চেষ্টা চোরমাত্রেই করিয়া থাকে। এই মহাশয়। আমার সময়-নিরূপণের কারণ। এই নিমিত্তই আমি বলিতে ছিলাম, এই ঘটনা রাত্রি চারিটা ও পাঁচটার ভিতর সম্পন্ন হইয়াছে।
দেখিলাম, আমার কথা শুনিয়া সকলেই পরিশেষে আমার মতে অনুমোন করিলেন।
সেই সময় বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আরও কহিলেন, এ ত হল, কিন্তু চোর কি প্রকারে গৃহের ভিতর প্রবেশ করিল?
ইংরাজ-কর্ম্মচারী। পশ্চিমদিকের দরজা দিয়া প্রবেশ করিয়াছে। দেখিতে পাইতেছেন না, উহাতে অস্ত্রের চিহ্ন এখনও পর্যন্ত বর্তমান আছে।
বন্দ্যোপাধ্যায়। তোমার কি বোধ হয়?
আমি। আমার বোধ হয়, সেই দরজা দিয়া কোন চোর গৃহের মধ্যে প্রবেশ করে নাই, বা গৃহের দক্ষিণ দিকের অর্থাৎ সম্মুখের দরজা দিয়া বহির্গত হইয়াও যায় নাই।
বন্দ্যোপাধ্যায়। তোমার এরূপ অনুমানের কারণ কি?
আমি। কারণ বিশেষ কিছুই নয়। পশ্চিমদিকের দরজার গাত্রে যদিচ অস্ত্রের দাগ দৃষ্টিগোচর হইতেছে সত্য, কিন্তু আমার বিবেচনায় সেই দাগ বাহির হইতে হয় নাই, ভিতর হইতে হইয়াছে। সুতরাং সেই দরজা দিয়া কোন লোক যে গৃহের ভিতর প্রবেশ করে নাই, ইহা স্থির। দরজার বহির্ভাগ যদি আপনারা বিশেষরূপে দর্শন করেন, তাহা হইলে স্পষ্টই বুঝিতে পারিবেন, সেই দরজা সর্বদা খোলা হইত না, প্রায়ই বন্ধ থাকিত। এবং ইহাও দেখিতে পাইবেন, উহাতে উর্ণনাভের পুরাতন সূত্র সকল এখনও বর্তমান আছে। সেই দরজার ভিতর দিয়া কোন লোক গৃহের ভিতর প্রবেশ বা গৃহ হইতে বহির্গত হইলে, সেই সুরাশি নিশ্চয়ই যে বিচ্ছিন্ন হইত, তাহার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।
বন্দ্যোপাধ্যায়। আমি তোমার অনুমানের সম্পূর্ণরূপ পোষকতা করি। কিন্তু তোমার বিবেচনায় চোর কিরূপে গৃহের ভিতর প্রবেশ করিল?
আমি। আমার বিবেচনায় চোর সম্মুখের দরজা দিয়া প্রবেশ করিয়াছে। কিন্তু গৃহের ভিতস্থিত সেই বৃদ্ধা, বা যুবকের মধ্যে কেহ দরজা যে খুলিয়া দিয়াছে, তাহা যখন সহজে অনুমান করিতে পারি না, তখন হয় উহা দিগের শয়ন করিবার পূর্বে চোর গৃহের ভিতর প্রবেশ করিয়া লুকাইয়াছিল, এবং সময়মত আপন কাৰ্যসাধন করিয়া চলিয়া গিয়াছে, নতুবা অনবধানতাবশতঃ রাত্রিকালে গৃহের দরজা খোলাই ছিল, সুযোগ পাইয়া সেই মুক্তপথে চোর প্রবেশ করিয়াছিল।
আমার কথা শুনিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় চুপ করিয়া বহিলেন। তাঁহার যে কি অনুমান, তাহার কিছুমাত্র আভাষ আমাদিগকে প্রদান করিলেন না।
পুলিসের প্রয়োজনীয় কাৰ্য সকল তখন সম্পন্ন হইতে লাগিল। পরের মুখে শুনিয়া যতদূর হইতে পারে, সেইখানে মালের একটা তালিকা প্রস্তুত হইল। হরর মা সম্বন্ধে কোনরূপ অনুসন্ধান বাকি থাকিল না; কোন্ কোন্ স্থানে তাহার যাতায়াত, কোন্ কোন্ ব্যক্তির সহিত তাহার আলাপ পরিচয়, সেই সমস্ত লোকের মধ্যে কোনরূপ কুচরিত্রের লোক আছে কি না, প্রভৃতি তাহার সম্বন্ধে যাহা কিছু অনুসন্ধানের প্রয়োজন, তাহার সমস্তই শেষ হইল।
বৃদ্ধার বাড়ীতে কোন্ কোন্ ব্যক্তির যাতায়াত আছে, তাহাদিগের মধ্যে কে কি চরিত্রের লোক, তাহাও বিশেষ রূপে দেখা হইল।
এইরূপভাবে চুরি করা যে সকল চোরের ব্যবসা, কলিকাতার সর্বস্থানের সেই সকল জানিত চোরের ভিতর উত্তমরূপে অনুসন্ধান হইল, কিন্তু কোনফলই ফলিল না।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
পূৰ্বরূপ অনুসন্ধান করিতে করিতে ক্রমে দুইদিবস অতীত হইয়া গেল, কিন্তু কাৰ্য্যে কিছুই হইল না। তৃতীয় দিবসে বৃদ্ধা ভব, এবং রসিকলাল ঘোষ উভয়েই সম্পূর্ণরূপ আবোগ্যলাভ করিয়া হাসপাতাল হইতে বাড়ীতে আসিয়া উপস্থিত হইল। উঁহাদিগকে দেখিয়া আমাদিগের মনে সাহস হইল। ভাবিলাম, ইহাদিগের নিকট হইতে এখন অনেক কথা জানিতে পারিব, সুতরাং মোক দমার অনুসন্ধানেও বিশেষ সুবিধা হইবে। দোষী ব্যক্তি ধরা পড়িলেও পড়িতে পারিবে, এবং অপহৃত দ্রব্যের অনুসন্ধান হইলেও হইতে পারিবে। কিন্তু যখন তাহাদিগের সমস্ত কথা উত্তমরূপে শুনিলাম,
