রুমাল দুইখানি হস্তে লইয়া উত্তমরূপে দেখিলাম। দেখিলাম, দুইখানিই সম্পূর্ণ মূইন, কোনস্থানে কোনরূপ চিহু নাই। কিন্তু উহা হইতে এখনও এক প্রকার বিকট দুর্গন্ধ বাহির হইতেছে, সেই গন্ধ আমার নাসিকার ভিতর প্রবিষ্ট হইবামাত্র আমার মস্তক ঘুরিয়া উঠিল। আমি তখনই উহা প্রহরীর হস্তে প্রদান করিয়া কহিলাম, দূরে ইহা দিগকে এখন রাখিয়া দেও। প্রহরী তাহাই করিল।
শিশিটী পরীক্ষা করিয়া দেখিলাম, উহার ভিতর এখনও এক প্রকার তরল পদার্থের অতি সামান্য অবশেষ রহিয়াছে। ছাপান অক্ষরে উহার গাত্রে ইংরাজী অক্ষরে লেখা আছে ক্লোরাফরম। কিন্তু উহা যে কোন্ ডাক্তারখানা হইতে আনীত, বা কাহার নিমিত্ত বিক্রীত হইয়াছে, তাহার কিছুমাত্র লেখা নাই। শিশিটী না খুলিয়া উহা যেরূপ অবস্থায় ছিল, সেইরূপ অবস্থাতেই সেই প্রহরীর হস্তে প্রদান করিয়া আমি গৃহের বাহিরে আসিলাম। পরিশেষে বাড়ীর চতুর্দিক একবার উত্তমরূপে দেখিলাম, কোনস্থানে সন্দেহ সুচক কোন দ্রব্যই দেখিতে পাইলাম না। বিশেষ মনঃ সংযোগ করিয়া সেই বাটীর চতুর্দিকে বেষ্টিত সেই ইষ্টকনিৰ্ম্মিত প্রাচীরের উপরিভাগ ক্রমে ক্রমে সমস্তই দেখিলাম, কিন্তু কোনস্থানে কোন লোকের পদচিহু বা অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয় অপর কিছুই দেখিতে পাইলাম না। বাড়ীর প্রাঙ্গনের কোনস্থানই উত্তমরূপে দেখিতে বাকী রাখিলাম না। কিন্তু সে দেখায় কোনফলই পাইলাম না; এমন কোন বিষয়ই চক্ষুতে পড়িল না যে, এই অনুসন্ধান উপলক্ষে অভাবপক্ষে সেইদিকে একবার দৃষ্টিনিক্ষেপ করি। যাহা হউক, এইরূপে সমস্তস্থান দেখিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের নিকট গিয়া উপবেশন করিলাম।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।
উক্ত বাটীর প্রাঙ্গনের মধ্যে একস্থানে বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বসিয়াছিলেন, সেইস্থানে আরও কয়েকজন ইংরাজ এবং দেশীয় কর্ম্মচারী উপস্থিত ছিলেন। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় আমাকে তাঁহার নিকট বসিতে কহিলেন, আমি সেইস্থানে উপবেশন করিলে, তিনি কহিতে লাগিলেন :
অদ্য প্রত্যুষে ৫টার সময় আমি সংবাদ পাই যে, এই বাড়ীর একটী স্ত্রীলোক, এবং একটী পুরুষ অচৈতন্য অবস্থায় তাহাদিগের গৃহের ভিতর পড়িয়া রহিয়াছে, ও তাহাদিগের গৃহস্থিত সিন্দুক বাক্স প্রভৃতি সমস্ত দ্রব্যই ভগ্নাবস্থায় আছে। এই সংবাদ পাইয়া আমি আর কালবিলম্ব করিতে পারিলাম না, দ্রুতপদে ঘটনাস্থানে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, বাড়ীর সদর দরজা খোলা। গৃহের দরজা দুইটাই ভালো, জিনিস পত্র এখন যেরূপ অবস্থায় দেখিলে, সেইরূপ অবস্থাতেই পড়িয়া আছে। গৃহের ভিতর যে দুইখানি পালঙ্ক দেখিয়াছ, তাহার একখানিতে একটা প্রবীণা স্ত্রীলোক, অপরখানিতে একটী অষ্টাদশ বৎসর বয়স্ক যুবক অচৈতন্য অবস্থায় পড়িয়া আছে। যুবকের নিকট ক্লোরাফরমের একটী শিশি পাইলাম। আরও দেখিলাম, দুইজনের মন্তকের নিকট দুইখানি সাদা রুমাল রহিয়াছে, বুঝিলাম, উহাতেও ক্লোরাফরম মিশ্রিত। এই সকল অবস্থা দেখিয়া কালবিলম্ব না করিয়া প্রথমেই, উঁহাদিগকে মেডিকেল কলেজে পাঠাইয়া দিলাম। তাঁহারা এখনও মরে নাই, সেইস্থানে চিকিৎসাধীনে আছে, কিন্তু এখনও জ্ঞানশূন্য। সুতরাং তাহাদিগের নিকট হইতে এখন কোন কথা জানিবার উপায় নাই। উঁহাদিগকে হাসপাতালে পাঠাইয়া পরিশেষে অনুসন্ধানে এইমাত্র জানিতে পারিলাম যে, উঁহাদিগের একটী পরিচারিকা আছে, তাহার নাম যাহাই হউক, হরর মা বলিয়া সে সকলের নিকট পরিচিত। সে এই বাড়ীতে থাকে না, তাহার পৃথক্ বাসা আছে; সকাল বৈকাল দুইবেলা আসিয়া আবশ্যক কাৰ্য্য সমাপন করিয়া যায়। কল্য সন্ধ্যার পর যখন সে আপনার কাৰ্য্য সমাপন করিয়া গমন করিয়াছিল, তখন বৃদ্ধা তাহার গৃহের সম্মুখে দালানে বসিয়াছিল, যুবক সেই সময়ে বাড়ীতে ছিল না। অদ্য প্রাতঃকালে যখন সে আপনার কাৰ্যে আগমন করে, তখন সে প্রথমেই দেখিতে পায়, বাড়ীর সদর দরজা খোলা, গৃহের দরজা খোলা, দ্রব্যাদির অবস্থা এইরূপ, এবং বৃদ্ধা ও যুবক অচৈতন্য অবস্থায় আপন-আপন বিছানার উপর পড়িয়া আছে। এই অবস্থা দেখিয়া সে গোলযোগ করিয়া উঠে, তাহাতে দুই একজন করিয়া পাড়ার অনেকেই আসিয়া উপস্থিত হয়। তৎপরে পাড়ার লোকের উপদেশ অনুযায়ী হরর মা থানায় গিয়া এই সংবাদ প্রদান করে। সংবাদ প্রাপ্তিমাত্র প্রথমেই আমি আগমন করি, এবং যাহা স্বচক্ষে দর্শন করি, তাহা পূৰ্বেই তোমাকে বলিয়াছি।
হরর মা এবং পাড়ার অপরাপর লোকদিগের নিকট হইতে আরও অবগত হইতে পারিয়াছি, সেই বৃদ্ধার নাম ভব। সে গোপাল বোসের বিধবা স্ত্রী। গোপাল বোস এই স্থানের একজন পুরাতন অধিবাসী ছিলেন; হাটখোলায় তাহার একখানি ভূষিমালের দোকান ছিল। তিনি যতদিবস জীবিত ছিলেন, সেই দোকানের উপস্বত্ব হইতেই স্বচ্ছন্দে দিনপাত করিতেন। পরিবারের মধ্যে তাঁহার স্ত্রী এই ভব ভিন্ন অপর আর কেহই ছিল না। এরূপ শুনা যায়, তিনি তাহার মৃত্যুকালে ভবর পরিধেয় অলঙ্কার প্রভৃতি ব্যতিরেকে নগদ অর্থও অনেক রাখিয়া গিয়াছিলেন। তাঁহার মৃত্যুর পর হইতেই সেই দোকান উঠিয়া যায়, কিন্তু সঞ্চিত অর্থ হইতেই ভব এতদিবস বিনাকেশে দিনযাপন করিয়া আসি তেছেন। হিন্দু বিধবার সতত আচরণীয় ব্রতনিয়ম প্রভৃতি সেই অর্থের দ্বারাই তিনি এ কাল পর্যন্ত সমাপন করিয়া আসিতেছিলেন। আমার বোধ হয়, সােণা ও রূপার অলঙ্কার প্রভৃতি বন্ধক রাখিয়া সুদ প্রভৃতিতে যে অর্থ তিনি প্রাপ্ত হইতেন, তাহার কিয়দংশের দ্বারাই তাঁহার বর্তমান সংসার খরচ নিৰ্বাহ হইত, অধিকন্তু মাস মাস কিছু জমাও হইত। বৃদ্ধার বয়ঃক্রম ক্রমে অধিক হইয়া আসিতেছে, তাহার বয়ঃক্রম এখন বোধ হয়, ৫৫ বৎসরের কম হইবে না।
