যুবকের নাম রসিকলাল ঘোষ, তাহার বয়ঃক্রম এখন অষ্টাদশ বৎসরের কম হইবে বলিয়া বোধ হয় না। রসিক লাল যে কে, কাহার পুত্র, তাহা পাড়ার অপর কেহই বলিতে পারেন না। কিন্তু বৃদ্ধা যে নিশ্চয়ই বলিতে পারেন, তাহার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। রসিকলালকে উত্তম রূপে না জানিলেও, পাড়ার কেহই কিন্তু তাহার বিপক্ষে কোন কথা বলেন না, বরং সকলেই কহেন, রসিক বড় ভাল ছোরা, তাহার স্বভাব চরিত্র উত্তম। প্রায় দশ বৎসর পূর্বে যখন রসিকের বয়ঃক্রম আট বৎসর ছিল, সেই সময় হইতে সকলেই রসিককে এইস্থানে দেখিতে পাইতেছেন। বৃদ্ধাই তাহাকে লালন-পালন করিয়া এত বড়টা করিয়াছে, লেখাপড়া শিখাইবার নিমিত্ত বৃদ্ধা বিশেষ যত্নও করিয়াছিল। কিন্তু সে ভালরূপ লেখাপড়া শিখিয়া উঠিতে পারে নাই, বৃদ্ধার আর কেহই নাই। বিশেষ সে রসিককে প্রাণের সহিত ভালবাসে, একদণ্ডের নিমিত্তও কোনরূপে তাহাকে চক্ষুর অন্তরাল করিতে চাহে না। তাহার ইচ্ছা সে যতদিবস বাঁচিবে, এইরূপেই তাহাকে প্রতিপালন করিবে। মৃত্যুকালে তাহার যাহা কিছু আছে, সমস্তই রসিকের হস্তে অৰ্পণ করিয়া যাইবে। যাহারা জানেন না, তাহাদিগের মধ্যে কেহই বলিতে পারেন না, যে রসিক তাহার পুত্র নহে। মাতা পুত্রকে যেরূপভাবে সৰ্ব্বদা দেখিয়া থাকেন, বৃদ্ধাও সেইরূপে রসিককে মেহচক্ষে দেখেন। রসিকের আহার না হইলে, বৃদ্ধার আহার হয় না, রসিক শয়ন না করিলে, বৃদ্ধার নিদ্রা আসে না। যদি রসিক কোনদিবস অসুস্থ হয়, তাহা হইলে বৃদ্ধা যে কিরূপ কষ্ট অনুভব করিয়া থাকেন, তাহা যিনি দেখিয়াছেন, তিনিই বুঝিতে পারেন। সম্প্রতি রসিকের বিবাহ দিবার নিমিত্ত বৃদ্ধা একেবারে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছেন, একটী সুপাত্রীর অনুসন্ধানের নিমিত্ত তিনি যে কত লোকের তোষামোদ করিতেছেন, তাহা কে বলিবে?
যে দুইজন এখন অচৈতন্য অবস্থায় হাসপাতালে পড়িয়া আছেন, তাহাদিগের অবস্থা ত এই। এই দুইজন ব্যতীত বাড়ীতে অপর কেহই থাকেন না, অপর লোকের মধ্যে এক হরর মা। সে রাত্রিদিন যদিও এই বাড়ীতে থাকে, তথাপি সে অনেকদিবস পর্যন্ত এই বাড়ীতে কর্ম্ম করিতেছে। তাহার চরিত্র সম্বন্ধে কোন দোষের বিষয় এ পর্যন্ত কেহই বলিতে পারেন না।
গৃহের অবস্থা দেখিয়া বিলক্ষণ বোধ হইতেছে, বৃদ্ধার যাহা কিছু সংস্থান ছিল, তাহার সমস্তই অপহৃত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তাহার কি ছিল, তাহার মধ্যে কি আছে, এবং কোন্ কোন্ দ্রব্যই যে অপহৃত হইয়াছে, তাহা যে পৰ্যন্ত বৃদ্ধা অচৈতন্য অবস্থায় থাকে, সেই পৰ্য্যন্ত স্থির হইতে পারে না। কিন্তু এরূপ বিষ-প্রয়োগের উদ্দেশ্য যে চুরি, তাহাতে আর কিছুমাত্র ভ্ৰম নাই।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কথা শুনিয়া স্থির-অন্তঃকরণে কিছুক্ষণ আমি সেইস্থানে বসিয়া রহিলাম। পরিশেষে তাহাকে কহিলাম, বৃদ্ধার গৃহ হইতে অনেক টাকার দ্রব্যাদি যে অপহৃত হইয়াছে, তাহার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু এই দুরূহকাৰ্য কাহার দ্বারা সম্পন্ন হইল? বৃদ্ধা এখন অচৈতন্য অবস্থায় হাসপাতালে আছে, তাহা ত দেখিতে পাইতেছি। আর ইহাও বেশ বুঝিতে পারিতেছি যে, তিনি ব্যতীত অপহৃত দ্রব্যের তালিকা প্রদানে আর কেহই সমর্থ নহেন। কিন্তু যখন আপনি প্রথম এখানে আগমন করেন, সেই সময়ে যদি তাহাকে মৃতাবস্থায় প্রাপ্ত হইতেন, বা ঈশ্বর না করুন, এখনও যদি এইরূপ অচৈতন্য অবস্থায় তিনি ইহজীবন পরিত্যাগ করেন, তাহা হইলে কি আমাদের অনুসন্ধান বন্ধ করিতে হইবে?
আমার কথা শুনিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কহিলেন, অনুসন্ধান বন্ধ হইতে পারে না, তুমি যাহা কহিতেছ, তাহা যথার্থ। বৃদ্ধা মরিয়া গিয়াছে, এই বিবেচনা করিয়াই, এখন আমাদিগের অনুসন্ধান করা কর্তব্য। দেখ দেখি, হরর মা, পাড়া-প্রতিবেশী প্রভৃতি লোকদিগের নিকট হইতে বৃদ্ধার অপহৃত দ্রব্যাদির কতদূর তালিকা প্রস্তুত করিতে পার।
বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কথা শুনিয়া সেইস্থানে অপরাপর যে সকল কর্ম্মচারী ছিলেন, তাঁহাদিগের মধ্যে একজন ইংরাজ-কর্ম্মচারী কহিলেন, কি কি দ্রব্য চুরি হইয়াছে, তাহার তালিকা প্রস্তুত হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। কিন্তু চোর কি প্রকারে বাড়ীর ভিতর আগমন করিল, কিরূপে গৃহের ভিতর প্রবেশ করিল, এবং কোন্ সময়েই না এই ভয়ানক কাণ্ড সম্পাদন করিয়া প্রস্থান করিল, আমার বিবেচনায় তাহাও অগ্রে স্থির করা কর্তব্য।
বন্দ্যোপাধ্যায়। অবশ্য সে সকল বিষয় স্থির করিবাব উপায় কিছুমাত্র নাই, অবস্থা দেখিয়া অনুমানে যতদূর স্থির হইতে পারে। আপনার বিবেচনায় চোর কিরূপে বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিল?
ইংরাজ-কর্ম্মচারী। সদর দরজার অবস্থা দেখিয়া এমন কিছুই বুঝিতে পারা যায় না, যাহাতে অনুমান করা যাইতে পারে, সেই দরজা ভাঙ্গিয়া বা বাহির হইতে কোনরূপে দরজা খুলিয়া বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়াছে। আমার বোধ হয়, প্রাচীর উল্লম্বন করিয়া প্রবেশ করিয়া থাকিবে।
আমি। সমস্ত প্রাচীর আমি উত্তমরূপে দেখিয়াছি; কিন্তু উহার কোনস্থানে কোনরূপ চিহু নাই, যাহা দেখিলে অনুমান করা যাইতে পারে যে, অপহরণকারী সেইস্থান দয়া বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিয়াছে।
বন্দ্যোপাধ্যায়। হয় ত হইতে পারে, বাহির হইতে দরজা ভাঙ্গিয়া বা খুলিয়া কেহই ভিতরে আইসে নাই। অথবা প্রাচীর উল্লম্বন করিয়াও কেহ বাড়ীর ভিতর প্রবিষ্ট হয় নাই, কোন ব্যক্তি ভিতর হইতে দরজা খুলিয়া দিয়া থাকিবে। নিয়মিত সময়ে সদর দরজা বন্ধ হইবার অগ্রে কোন ব্যক্তি অনায়াসেই বাড়ীর ভিতর কোন না কোন স্থানে লুক্কায়িত থাকিতে পারে। অথবা দৈবক্রমে সদর দরজা বন্ধ করিতে ভুলিয়া গিয়া থাকিবে। অথবা এরূপ কোন অবস্থা ঘটিয়াছিল, যাহা এখন আমরা অনুমান করিয়া উঠিতে পারিতেছি না। কিন্তু কত রাত্রিতে এই ঘটনা ঘটিয়াছে বলিয়া বোধ হয়?
