মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া সেই বাক্স ও উহার ভিতর যে ঔষধের শিশি পাওয়া গিয়াছিল, তাহা লইয়া মেহের আলি এবং চাপরাশির সহিত পুনরায় সেই স্কুলে গিয় উপস্থিত হইলাম।
সেই স্থানে গিয়া সেই সর্বপ্রধান সাহেবের সহিত প্রথমে সাক্ষাৎ করিলাম এবং যতদূর অবগত হইতে পারিয়াছিলাম, তাহার সমস্ত ব্যাপার তাহার নিকট খুলিয়া বলিলাম। সমস্ত ব্যাপার শুনিয়া তিনি আমাদিগের সহিত মেহের আলির থাকি বার স্থানে গমন করিলেন ও কহিলেন, এইরূপ একটী বাক্স আমি এই স্থানে পূর্বে দেখিয়াছিলাম। কিন্তু এখন উহা দেখিতে পাইতেছি না।
যে স্থানে সেই বাক্সটী পূৰ্ব্ব হইতে রক্ষিত ছিল বলিয়া জানা গেল, সেই স্থানটী আমরা উত্তমরূপে দেখিলাম। দেখিয়া স্পষ্টই বোধ হইল, সেই স্থানে অতবড় একটা বাক্স রক্ষিত ছিল, তাহার চিন্তু এখন পর্যন্তও বৰ্তমান রহিয়াছে।
ঔষধের শিশি দেখিয়া সাহেব কহিলেন, উহাতে যে নাম লেখা আছে, সেই নামের একটী বালক এই স্কুলে পূৰ্ব্বে পাঠ করিত; কিন্তু এখন স্থানান্তরে গমন করিয়াছে। আবশ্যক হইলে তাহার অনুসন্ধান পাওয়া যাইতে পারিবে।
অতঃপর সেই স্থানে অপর চাকরগণের বাসস্থান অনুসন্ধান করিলাম। সাহেব সেই অনুসন্ধানে নিজে আমাদিগকে সাহাব) করিতে লাগিলেন। এইরূপে কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করিতে করিতেই অল্পে অল্পে আসল কথা বাহির হইয়া পড়িল।
মেহের আলি যখন দেখিল যে, সকল কথা প্রকাশ হইয়া গেল, তখন সেও সমস্ত কথা স্বীকার করিল। সে যাহা কহিল, তাহার সার মৰ্ম্ম এইরূপ :
রব্বানি আমার জামাতা। এই স্কুলের ভিতর একখানি ক্ষুদ্র খোলার ঘন সে বাঁধিয়া দেয়, তাহাতে আমার নিকট তাহার কিছু পাওনা থাকে। সেই পাওনা টাকার নিমিত্ত সে আমাকে সৰ্ব্বদা বিরক্ত করিত, সময় অসময় কিছুই না মানিয়া সৰ্ব্বদা সে আমার নিকট সেই টাকার তাগাদা করিত, এবং সময় সময় আমাকে কটুবাক্যও কহিত।
গত পরশ্ব তারিখের সন্ধ্যার পূর্বে সে এই স্থানে আসিয়া আমার নিকট পুনরায় সেই টাকার তাগাদা করে। আমার নিকট সেই সময় টাকা না থাকায়, আমি উহা তাহাকে দিতে পারি নাই। সুতরাং সে আমার উপর অতিশয় অসন্তুষ্ট হইল, এবং আমাকে গালি প্রদান করিল। আমারও অত্যন্ত ক্রোধের উদ্রেক হওয়াতে আমি তাহাকে কহিলাম, তুমি আমার ঘরের ভিতর আইস, আমি হিসাব করিয়া তোমার সমস্ত টাকা পরিশোধ করিয়া দিতেছি। আমার কথায় বিশ্বাস করিয়া সে যেমন ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল, অমনি আমি তাহার,কর্ণমুলে সজোরে এক চপেটা ঘাত করিলাম। চড় মারিবামাত্র সে সেই স্থানে পড়িয়া গেল। তাহার উপর আমি তাহাকে দুই চারিটী পদাঘাতও করিয়াছিলাম। পরে দেখিলাম, সে মরিয়া গিয়াছে। তখন আর কোন উপায় না দেখিয়া একখানি চটে উহাকে উত্তমরূপে জড়াইয়া বাঁধিলাম, এবং পরিশেষে এই বাক্সের ভিতর পূরিয়া আমার এই ঘরের ভিতরেই রাখিয়া দিলাম। কিন্তু কোন উপায়ে সেই বাক্স আমি ঘর হইতে বাহির করিয়া লইবার অবকাশ পাইলাম না। ক্রমে রাত্রি প্রভাত হইয়া গেল। সমস্ত দিবস সেই বাক্স আমার ঘরের ভিতরেই ছিল। পরদিবস রাত্রি হইলে একটা কুলীর সাহায্যে আমি সেই বাক্সল স্কুল হইতে বাহির করিয়া একখানি ভাড়াটিয়া গাড়ি আনিয়া তাহার উপর রাখিয়া দিলাম, এবং সেই গাড়িতে করিয়া উহা আমি গঙ্গার ধারে লইয়া গেলাম। সেই স্থানে খোেলা জেটির ভিতর সেই বাক্সটা রাখিয়া দিয়া, আমি সেই গাড়ি বিদায় করিয়া দিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল যে, কোন গতিতে সেই বাটী গঙ্গাগর্ভে নিক্ষেপ করিব; কিন্তু তাহার সুযোগ করিয়া উঠিবার পূর্বেই একজন চাপরাশি সেই বাক্সটা দেখিতে পাইয়া তাহার নিকট গমন করিল। আমিও ভীত হইয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলাম।
মেহের আলি এইরূপে যাহা আমাদিগের নিকট কহিল, সে আর সে কথার পরিবর্তন করিল না। অনুসন্ধানে যে সকল প্রমাণের সংগ্রহ হইল, তাহাদিগের সাক্ষ্যে এবং মেহের আলির স্বীকারেই দায়রার বিচারে তাহার ফাঁসি হইয়া গেল।
সম্পূর্ণ।
যেমন তেমনি
যেমন তেমনি
(দারোগার দপ্তর ২৯ম সংখ্যা)
যেমন তেমনি (অর্থাৎ চতুর পালিত-পুত্রের বিদ্যা প্রকাশ!!)
শ্রী প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়-প্রণীত
সিকদার বাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে শ্রী বাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
All Rights Reserved.
তৃতীয় বর্ষ। সন ১৩০১ সাল। ভাদ্র।
PRINTED BY HARIDAS DEY, AT THE VINDU PRESS, 61, Aheeritollah Street, Calcutta
যেমন তেমনি!
প্রথম পরিচ্ছেদ।
আমি যে দিবস পুলিস বিভাগে প্রথম নিযুক্ত হই কৰ্ম্ম কাৰ্য্য শিখিবার নিমিত্ত সেইদিবসেই আমাকে *** বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের নিকট প্রেরণ করা হয়। বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় একজন বহুদর্শী পুরাতন কর্ম্মচারী, সহরের মধ্যে তাঁহার বেশ নাম-ডাক আছে। কাজ-কৰ্ম্মে তাহার যশ যথেষ্ট হইয়াছে, ও তিনি অনেক অসাধ্য সাধন করিয়াছেন। পুলিস বিভাগে কিরূপে কৰ্ম্মকাৰ্য্য করিতে হইবে, কোন্ পন্থা অবলম্বন করিয়া অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইতে হইবে, সর্বসাধারণের সহিত সৰ্ব্বদা কিরূপ ব্যবহার করিতে হইবে, এই সকল উপদেশ আমি তাহারই নিকট সর্ব প্রথম প্রাপ্ত হই; এবং তাহারই নিকট পুলিসের কৰ্ম্ম কাৰ্য্য শিক্ষা করি বলিয়াই, তাহাকে আমি গুরু বলিয়া মানিয়া থাকি।
