আমি। তখন বেলা কত?
চাপরাশি। বৈকালে; কিন্তু বেলা তখন অতি অল্পই ছিল।
আমি। তাহার পর, রব্বানি কখন চলিয়া গিয়াছে, তাহা বলিতে পার?
চাপরাশি। আমি তাহাকে চলিয়া যাইতে দেখি নাই।
আমি। তুমি আমার সহিত একবার গমন করিতে পার কি? কারণ, যে লাসটী পাওয়া গিয়াছে, তাহাকে দেখিলে, তুমি বেশ চিনিতে পারিবে, সেই লাসটা রব্বানির কি না?
চাপরাশি। আপনি এই স্থানে একটু অপেক্ষা করুন, আমি সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিয়া আসিতেছি। তাঁহার আদেশ পাইলে, আমি এখনই আপনার সহিত গমন করিতেছি।
এই বলিয়া চাপরাশি আমাকে সেই স্থানে রাখিয়া সে তাহার সাহেবের নিকট গমন করিল, এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রত্যাবর্তন করিয়া কহিল, চলুন, সাহেব অনুমতি দিয়াছেন।
চাপরাশিকে আর কোন কথা না বলিয়া, তাহার সহিত আমি বাহিরে আসিলাম, ও মেহের আলির সহিত আপন গাড়িতে উঠি লাম। সেই বালকটীও গাড়ির উপর উঠিয়া বসিল।
চাপরাশি আমাকে যে সকল কথা বলিয়াছিল, তাহা আমি মেহের আলিকে কহিলাম। আমার কথা শুনিয়া মেহের আলি কিয়ৎক্ষণ চুপ করিয়া রহিল, এবং পরিশেষে কহিল, চাপরাশি কখনই এ কথা বলে নাই। আর যদি বলিয়াই থাকে, তাহা হইলে সে মিথ্যা কথা বলিয়াছে। পনর দিবসের মধ্যে রব্বানি এ কুঠীতে আইসে নাই।
মেহের আলির কথা শুনিয়া চাপরাশি কহিল, আমি মিথ্যা বলিতেছি, না তুই মিথ্যা বলিতেছিস্? তিন চারিদিবস হইল, সন্ধ্যার পূর্বে যে সে আসিয়া টাকার জন্য, তোর সহিত বকাবকি করিয়াছিল, সে কথা তোর মনে নাই কি?
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।
চাপরাশি ও মেহের আলির সহিত এইরূপ কথা হইতে হইতে আমাদিগের গাড়ি আসিয়া যে স্থানে মৃতদেহ রক্ষিত ছিল, সেই স্থানে উপস্থিত হইল।
আমরা গাড়ি হইতে অবতরণ করিয়া, মেহের আলি এবং চাপরাশিকে সঙ্গে লইয়া সেই মৃতদেহের সন্নিকটে গমন করিলাম। সেই মৃতদেহ দেখিবার নিমিত্ত তাহাদিগকে কহিলাম। মেহের আলি সেই মৃতদেহের দিকে দৃষ্টিপাত না করিয়াই কহিল, না মহাশয়! এ কাহার দেহ, তাহা আমি চিনিতে পারিতেছি না।
চাপরাশি। তাহা আর চিমিতে পারিবে কেন? তোমার জামাতাকে যে কখনও দেখিয়াছে, সে-ই এই মৃতদেহ চিনিতে পারিবে। কিন্তু তুমি চিনিতে পারিতেছ না, ইহা অপেক্ষা আশ্চর্যের বিষয় আর কি হইতে পারে?
যে স্থানে মৃতদেহটা ছিল, তাহার সন্নিকটেই সেই টিনের বাক্সটী রক্ষিত ছিল। সেই বাক্সটী দেখিয়া চাপরাশি কহিল,
ওই বাক্সটী কিসের মহাশয়?
আমি। এই বাক্সের ভিতর পূরিয়া এই মৃতদেহটী কোন ব্যক্তি গঙ্গার ধারে রাখিয়া দিয়াছিল।
চাপরাশি। তবে এই বাক্সের ভিতর ওই লাস পাওয়া যায়?
আমি। হাঁ।
চাপরাশি। মেহের আলি যে ঘরে থাকে, সেই ঘরে ঠিক এইরূপ একটা বাক্স ছিল। তাই এখন সেই স্থানে আছে কি না, তাহা মেহের আলিকে জিজ্ঞাসা করুন দেখি।
আমি। কি হে মেহের আলি! তুমি যে ঘরে থাক, সেই ঘরে এইরূপ একটা টিনের বাক্স ছিল, তাহা এখন কোথায়? উহা এখন সেই স্থানে আছে কি?
মেহের আলি। চাপরাশি কেবল মিথ্যা কথা কহিতেছে। যে ঘর আমার দ্বারা অধিকৃত, তাহার ভিতর এরূপ টিনের বাক্স কখনও ছিল না, এখনও নাই।।
চাপরাশি। আমি মিথ্যা কথা কহিতেছি? তোমার ঘরে যে টিনের বাক্স ছিল, তাহা কে না জানে? কুঠীর সমস্ত চাকরই তাহা দেখিয়াছে। তাহাদিগের মধ্যে যাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, সে-ই এ কথা বলিবে। চাকর-বাকরের কথাই বা জিজ্ঞাসা করিতেছি কেন? মনিব-সাহেব স্বয়ং ইহা বলিতে পারিবেন। একদিবস তিনি নিজে ওই বাক্স দেখিয়া, মেহের আলিকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, এ বাক্স কাহার?
আমি। হাতে মেহের আলি কি উত্তর করিয়াছিল?
চাপরাশি। তাহাতে মেহের আলি এই কথা কহে যে, অনেক দিবস হইতে এই বাক্স এই স্থানে পড়িয়া রহিয়াছে।
আমি। কেমন মেহের আলি! এই কথা কি প্রকৃত?
মেহের আলি। না মহাশয়। ইহার সমস্তই মিথ্যা কথা।
আমি। চাপরাশির সমস্ত কথা যদি মিথ্যা হয়, তাহা হইলে তোমার মঙ্গল। আর যদি প্রকৃত হয়, তাহা হইলে জানিও, এই হত্যা তোমা-ব্যতীত আর কাহারও দ্বারা হয় নাই।
মেহের। সেকি মহাশয়! তাহা হইলে আমি আমার জামাতাকে কি হত্যা করিয়াছি। আপনারা এইরূপ বিশ্বাস করেন?
আমি। কাজেই বিশ্বাস করিতে হইতেছে। তোমার নিজের কথার ভাবেই বেশ অনুমান হইতেছে, এই হত্যাকাণ্ডে তুমি সম্পূর্ণরূপে অপরাধী। তুমি এখন প্রকৃত কথা কি, তাহা বল দেখি। তাহা হইলে তুমি কতদুর অপরাধে অপরাধী, তাহা আমরা অনায়াসেই বুঝিতে পারিব, ও জানিতে পারিব, এই কাৰ্য্য তুমি ইচ্ছা করিয়া করিয়াছ, কি ক্রোধের বশবর্তী হওয়ায়, এই কাৰ্য্য হঠাৎ তোমার দ্বারা হইয়া গিয়াছে।
মেহের আলি আমার কথায় আর কোনরূপ উত্তর প্রদান না করিয়া সেই স্থানে বসিয়া পড়িল।
মেহের আলির কন্যা তখন সেই স্থানে উপস্থিত ছিল, আমা দিগের এই সকল কথা শুনিয়া সে কহিল, বাবা! এ কাৰ্য্য তুমিই করিয়াছ? তা বেশ করিয়াছ, নিজের কন্যাকে বিধবা করিয়া পিতার উপযুক্ত কাৰ্য্যই করিয়াছি! এই বলিয়া সে সেই স্থান হইতে একটু দূরে গিয়া ক্ৰমন করিতে লাগিল।
মেহের আলির কথা শুনিয়া ও তাহার অবস্থা দেখিয়া, আমা দিগের মনে স্পষ্টই প্রতীতি জন্মিল যে, মেহের আলি ব্যতীত এই কাৰ্য্য আর কাহারও দ্বারা হয় নাই। তবে লাস স্থানান্তরিত করিবার সময় অপর কোন ব্যক্তি সাহায্য করিলেও করিতে পারে।
