মনে মনে এইরূপ ভাবিয়া একজন কর্মচারীকে সেই স্থানে রাখিয়া আমি সেই স্কুলের সর্ব প্রধান সাহেবের উদ্দেশে গমন করিলাম। যে গৃহে সাহেব থাকেন, সেই গৃহের সম্মুখে তাহার চাপরাশি বসিয়াছিল। একখানি কার্ডে আমার নাম, আমি কে, এবং কি নিমিত্ত আমি তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাহি, তাহা সেই কার্ডে লিখিয়া চাপরাশির হাতে প্রদান করিলাম, ও আমি যে কে, তাহা চাপরাশিকেও বলিয়া দিলাম। চাপরাশি কার্ড লইয়া ভিতরে প্রবেশ করি বার অতি অল্পক্ষণ পরেই, সেই কার্ড হন্তে সাহেব বাহিরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও কহিলেন, আমি আপনাকে কিরূপ, সাহায্য করিতে পারি?
আমি। আপাততঃ অপর সাহায্যের কিছু প্রয়োজন নাই, কেবলমাত্র আপনার খানসামাকে আমি একবার চাহি। এক ঘণ্টার নিমিত্ত আমি তাহাকে লইয়া যাইব মাত্র।
সাহেব। তাহাকে প্রয়োজন?
আমি। আমরা একটা ভয়ানক হত্যার অনুসন্ধান করি তেছি। যে ব্যক্তি হত হইয়াছে, এখন বোধ হইতেছে যে, সে আপনার খানসামার জামাতা। এই নিমিত্ত তাহাকে লইয়া গিয়া একবার সেই মৃতদেহ দেখাইব। তাহা হইলে সেই ব্যক্তি তাহার জামাতা কি না, তাহা অনায়াসেই সে চিনিতে পারিবে। তখন কাহার দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়াছে, তাহার অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইব, এবং আপনার সাহায্যের আবশ্যক হইলে, পুনরায় আপনার নিকট আগমন করিব।
সাহেব। কিরূপে খানসামার জামাতা হত হইয়াছে?
আমি। কিরূপে হত হইয়াছে, বা কে হত্যা করিয়াছে, তাহা এখনও স্থির হয় নাই। সেই মৃতদেহ যে কাহার, এখন তাহারই অনুসন্ধান চলিতেছে।
সাহেব। সেই মৃতদেহ কোথায় পাওয়া গেল?
আমি। বড় একটা টীনের বাক্সের মধ্যে একখানি চটের দ্বারা আবৃত সেই মৃতদেহ রাস্তার ধারে পাওয়া গিয়াছে।।
সাহেব। আচ্ছা বাবু! আপনি আমার খানসামাকে লইয়া যান। আপনার কাৰ্য শেষ হইয়া গেলে, অমনি তাহাকে ছাড়িয়া দিবেন। ও আমাকে এই বলিয়া সাহেব তাহার চাপরাশিকে কহি লেন, আমার খানসামাকে আমার নিকট ডাকিয়া আন।
সাহেবের আদেশ পাইবামাত্র, চাপরাশি দ্রুতগতি গমন করিয়া মেহের আলিকে তাঁহার সম্মুখে ডাকিয়া আনিল। তাহাকে দেখিধামাত্রই সাহেব কহিলেন, তুমি এই বাবুর সহিত গমন কর, এবং ইহারা তোমার নিকট হইতে যেরূপ সাহায্য প্রার্থনা করেন, সেইরূপ সাহায্য প্রদান কর।
সাহেবের কথা শুনিয়া মেহের আলি আর কোন কথা কহিল না; স্থিরভাবে অথচ নিতান্ত ক্ষুন্ন মনে আমার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আগমন করিতে লাগিল।
আমি মেহের আলিকে সেই স্থানে আর কোন কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া সেই বাড়ী হইতে তাহাকে বাহিরে আনিলাম। কিন্তু তাহাকে আমার গাড়িতে তুলিবার পূর্বে তাহাকে দুই একটা কথা জিজ্ঞাসা করা কর্তব্য মনে করিলাম।
আমি। রব্বানি তোমার জামাতা?
মেহের আলি। হাঁ মহাশয়! রব্বানি আমার জামাতা হয়।
আমি। রব্বানি এখন কোথায়? মেহের আলি। তাহা আমি জানি না।
আমি। তোমার সহিত তাহার কয়দিবস সাক্ষাৎ হয় নাই?
মেহের আলি। এক সপ্তাহের মধ্যে তাহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হয় নাই।
আমি। তোমার বেশ মনে আছে যে, এক সপ্তাহকাল তোমার সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয় নাই?
মেহের আলি। আমার বেশ মনে আছে।
আমি। তোমার মনিবের কুঠীতে সে কতদিবস আইসে নাই?
মেহের আলি। প্রায় পূনর দিবস হইল, সে এখানে আইসে নাই।
আমি। অদ্য তিন দিবস হইল, সে এখানে আসিয়াছিল যে?
মেহের আলি। মিথ্যা কথা, এ কথা আপনাকে কে বলিল?
আমি। যেই আমাকে বলুক না কেন, তোমাকে আমি যে কথা জিজ্ঞাসা করিতেছি, তুমি তাহারই উত্তর প্রদান কর?
মেহের আলি। আমি ত তাহা বলিয়াছি যে, সে এখানে পনর দিবসের মধ্যে আইসে নাই।
মেহের আলির কথা শুনিয়া আমার মনে কেমন একটু সন্দেহ হইল। অপর একজন কর্মচারীর নিকট তাহাকে রাখিয়া আমি পুনরায় সেই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলাম। বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতেই সম্মুখে বড় সাহেবের সেই চাপরাশিকে দেখিতে পাইলাম। আমাকে পুনরায় বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিতে দেখিয়া, চাপরাশি আমার নিকট আগমন করিল ও কহিল, কি মহাশয়! পুনরায় ফিরিয়া আসিলেন যে?
আমি। তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করিব বলিয়া, ফিরিয়া আসিয়াছি।
চাপরাশি। আমাকে?
আমি। হাঁ। চাপরাশি। আমাকে যাহা জিজ্ঞাসা করিতে চাহেন, তাহা অনায়াসেই জিজ্ঞাসা করিতে পারেন।
আমি। মেহের আলি তোমার নিকট কত দিবস হইতে পরিচিত?
চাপরাশি। প্রায় দুই বৎসর হইল, আমি আমার সাহেবের নিকট কৰ্ম্ম করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি, সেই সময় হইতেই আমি মেহের আলিকে চিনি।
আমি। তাহার একটা জামাতা আছে, তাহা তুমি জান?
চাপরাশি। জানি, তাহার নাম রব্বানি। সম্প্রতি খোলার ওই ছোট ঘরখানি সে বাঁধিয়াছিল।
আমি। তুমি তাহাকে কয়দিবস হইতে দেখ নাই?
চাপরাশি। তিন চারি দিবস হইল, আমি তাহাকে দেখিয়াছি। কি পাওনা টাকার নিমিত্ত সে তাহার শ্বশুরের সহিত বকাবকি করিতেছিল।
আমি। কোথায়?
চাপরাশি। এই কুঠীর ভিতর তাহার শ্বশুর যে ঘরে থাকে, সেই ঘরের সম্মুখে।
আমি। সে যে তিন চারি দিবসের ঘটনা, তাই তোমার বেশ মনে আছে কি?
চাপরাশি। আমার বেশ মনে হইতেছে যে, উহা চারি দিবসের অধিক কোনরূপেই হইবে না।
আমি। পাওনা টাকার নিমিত্ত উহারা কতক্ষণ পর্যন্ত বকাবকি করিয়াছিল?
চাপরাশি। তাহা আমি জানি না। কোন কাৰ্য বশতঃ আমি সেই স্থানে গিয়াছিলাম, তাহাতেই জানি। আমি তখনই সেই স্থান হইতে চলিয়া আসিয়াছিলাম।
