বালক। তাহাও জানি না। সেটা একটা স্কুল।।
আমি। যেখানে তোমার নানা কায করেন, সেটা স্কুল?
বালক। হুঁ।
আমি। সে স্কুল তুমি চিন? বা
লক। চিনি।
আমি। কিরূপে চিনিলে?
বালক। আমি অনেকবার নানার সঙ্গে ও বাবার সঙ্গে সেই স্থানে গিয়াছি।
আমি। তুমি আমাকে সেই স্থানে লইয়া যাইতে পারিবে?
বালক। পারিব, কিন্তু এখান হইতে আমি চিনিতে পারিব না।
আমি। কোথা হইতে চিনিতে পারিবে?
বালক। আমি আমাদিগের বাড়ী হইতে চিনিয়া সেই স্থানে গমন করিতে পারি।
আমি। আমি যদি তোমাকে সঙ্গে লইয়া তোমার নানার বাড়ীতে লইয়া যাই, তাহা হইলে তুমি সেই স্থান হইতে তোমার নানা যে স্কুলে কায করে, সেই স্কুলে লইয়া যাইতে পারিবে?
বালক। পারিব।
আমি। তবে আমার সঙ্গে আইস।
বালক। আমার মা?
আমি। তিনি এখন এখানে থাকুন, আমরা এখনই ফিরিয়া আসি।।
এই বলিয়া আমি বালকটীকে সঙ্গে লইয়া গাড়িতে গিয়া উঠিলাম। রব্বানির স্ত্রী একরূপ অন্ধ-অচেতন অবস্থায় সেই স্থানে বসিয়া রহিল। সেই স্থানে আরও অনেক কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন, তাহাদিগের মধ্যে কেহব সেই স্ত্রীলোকটীর নিকটেই রহিলেন, কেহবা বালক-বালিকাগণের সহিত কথা কহিতে লাগিলেন, আর কেহবা আমার সহিতই গমন করিলেন।
গাড়িতে উঠিয়া গাড়িবানকে দ্রুতগতি চালাইতে কহিলাম। ক্রমে গাড়ি আসিয়া মেহের আলির বাড়ীর সম্মুখে উপস্থিত হইল।
মেহের আলির বাড়ীর সম্মুখে গিয়া গাড়ি উপস্থিত হইলে,। সেই বালকটী কহিল, আমি গাড়ির ভিতর বসিয়া রাস্তা ঠিক পাইব না, গাড়ির উপর গিয়া বসিলে যে রাস্তা দিয়া আমি সর্বদা গমন করিয়া থাকি, সেই রাস্তা দিয়া অনায়াসেই এই গাড়ি সেই স্কুলে লইয়া যাইতে পারিব।।
বালকের কথায় আমি সম্মত হইলাম। বালক গাড়ি হইতে বহির্গত হইয়া কোচবাক্সের উপর গিয়া উপবেশন করিল।
বালকের নির্দেশ মত গাড়ি চলিতে লাগিল। ক্রমে দেখিলাম, গাড়ি গিয়া পার্ক স্ট্রীটের একটা প্রকাণ্ড বাড়ীর সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইল। সেই প্রকাণ্ড বাড়ী আমরা চিনিতাম। উহা প্রকৃতই একটী প্রকাণ্ড স্কুল। ইহাতে ইংরাজ বালকের সংখ্যাই অধিক, এবং তাহাদিগের মধ্যে অনেকেই সেই স্কুলের ভিতর রাত্রিদিন বাস করিয়া থাকেন।
সেই স্থানে বালকটী গাড়ি হইতে অবতরণ কারয়া আমাকে কহিল, আমার সঙ্গে আসুন, এই স্কুলে আমার নানা কর্ম করিয়া থাকেন।
বালকের কথা শুনিয়া আমরা সেই গাড়ি হইতে অবতরণ করিলাম, এবং বালকের পশ্চাৎ পশ্চাৎ সেই প্রকাণ্ড বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলাম।
সেই স্কুলে যে সকল চাকর কৰ্ম্ম করিত, উহার এক পার্শ্বে তাহাদিগের থাকিবার উপযোগী কয়েকটা ঘর আছে। মেহের আলির থাকিবার নিমিত্ত উহার মধ্যে একটা ঘর নির্দিষ্ট ছিল।
বালক আমাদিগকে সঙ্গে লইয়া একবারে সেই ঘরের ভিতর গিয়া উপস্থিত হইল। দেখিলাম, ঘরের সম্মুখে
একটী লোক বসিয়া রহিয়াছে, তাহাকে দেখিয়াই বালবটী কহিল, নানা! ইহারা তোমাকে খুঁজিতেছেন। বাবা মরিয়া গিয়াছেন।
বালকের কথা শুনিয়া মেহের আলি আমাদিগকে লক্ষ্য করিয়া কহিল, আপনারা কাহার অনুসন্ধান করিতেছেন?
আমি। মেহের আলির। তোমারই নাম কি মেহের আলি?
মেহের আলি। হাঁ, আমার নামই মেহের আলি। আপ নার যে একবারে এখানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন, এ কথা আমাদিগের বড় সাহেব জানেন কি?
আমি। না, তোমাদের বড় সাহেব কে?
মেহের আলি। তিনি এই কুঠীতেই থাকেন, তাঁহার অনুমতি ব্যতীত বাহিরের কোন লোকের এই কুঠীর ভিতর প্রবেশ করিবার অধিকার নাই। তিনি না দেখিতে দেখিতে, আপনারা এখনই বাহিরে গমন করুন।
আমি। আচ্ছা, তাহাই হইবে, আমরা এখনই বাহিরে গমন করিব; কিন্তু তোমাকে দুই চারিটী কথা জিজ্ঞাসা না করিয়া যাইতে পারি না। তোমাকে যাহা যাহা আমরা জিজ্ঞাসা করিতেছি, তুমি তাহার উত্তর প্রদান কর, আমরা এখনই তোমার সাহেবের কুঠী হইতে বাহির হইয়া যাইতেছি।
মেহের আলি সাহেবের অনুমতি না লইলে আমি আপনাদিগের কোন কথার উত্তর দিতে পারিব না।
আমি। ইচ্ছা হয় ত তোমার সাহেবকে সংবাদ প্রদান কর, বা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাও যে, পুলিশের কয়েকজন লোক এখানে আসিয়াছে, তাঁহারা আমাকে কোন কোন কথা জিজ্ঞাসা করিতে চাহেন, আমি তঁহাদিগের কথার উত্তর প্রদান করিব কি না?
মেহের আলি। লাহেবকে জিজ্ঞাসা করিবার আমায় কোন প্রয়োজন নাই। ইচ্ছা হয়, আপনারা গিয়া জিজ্ঞাসা করিয়া আসিতে পারেন।
মেহের আলির কথা শুনিয়া আমার অতিশয় ক্রোধের উদ্রেক হইল, এবং সর্বশরীর যেন কাঁপিতে লাগিল। এক বার মনে করিলাম যে, ও যেরূপ ভাবে আমাদিগের সহিত কথা কহিতেছে, তাহাতে উহার সহিত আমাদিগের সেইরূপ ব্যবহার করাই কর্তব্য। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হইল, সাহেব দিগের কুঠীর ভিতর কোনরূল্প গোযোগ করিলে আমার কার্যের সুবিধা হইবার সম্ভাবনা নাই। কারণ, তিনি ক্রোধান্বিত হইলে তাহার চাকদিগের নিকট হইতে আমা দিগের অধিক কোন কথা পাইবার সম্ভাবনা থাকিবে না কিন্তু যদি তিনি ইচ্ছা করিয়া আমাদিগের সহায়তা করেন, তাহা হইলে তাহার ভৃত্যগণ তাঁহার নিকট কোন কথা গোপন করিতে পারিবে না, বা যদি কেহ গোপন করে, তাহা হইলে অপরের নিকট হইতেও তাহা প্রকাশ হইয়া পড়িবে। এরূপ অবস্থায় মেহের আলির উপর ক্রোধান্বিত হইয়া, তাহার মনিবের সহিতই আমার প্রথম দেখা করা কৰ্ত্তব্য। বিশেষতঃ, আমি বিলক্ষণরূপে অবগত আছি যে, ভাল ভাল ইংরাজগণের নিকট সরকারী কাৰ্য্য উপলক্ষে যদি কোনরূপ সাহায্য প্রার্থনা করা যায়, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ তাঁহারা তাহাদের সাধ্যমত সাহায্য প্রদান করিয়া থাকেন।
